বিজ্ঞান বিষয়ক

প্রজাতির উৎস সন্ধানে

ধারাবাহিক প্রবন্ধ (পর্ব ১-৭)

রজতকান্তি দাস

২৩ জানুয়ারি - ০৩ এপ্রিল ২০২২

 

প্রজাতির উৎস নিয়ে এই ধারাবাহিক প্রবন্ধ টি লিখছেন প্রখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক, গবেষক রজতকান্তি দাস।

Rajt kanti Das.jpeg

 পর্ব ১ 

ইউটিউবে একটি সিনেমা দেখছিলাম যার নাম "Longitude"। ২০০২ সালে নির্মিত এই সিনেমাটি আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। এর বিষয় হলো মেরিন ক্রোনোমিটারের আবিষ্কার। একজন ঘড়ি নির্মাতার কাহিনী নিয়ে এই সিনেমাটি অসাধারণ। এই ঘড়ি নির্মাতা হলেন জন হ্যারিসন। ২০০২ সালের এক গণভোটে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ১০০ জন ব্রিটিশ নাগরিকের মধ্যে একজন হিসেবে জন হ্যারিসনকে ভোট দিয়েছেন ব্রিটিশ নাগরিকরা। এই ক্রোনোমিটার যন্ত্রের আবিষ্কার যে শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে এক বিশাল সাম্রাজ্যকে ধরে রাখার জন্য কাজে এসেছে তাই নয়। এই আবিষ্কার মানব সভ্যতার দিশা পাল্টে দিয়েছিল। বিশেষত নৌ-যোগে বিশাল পথ পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার এক যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়েছিল এবং পৃথিবীর দ্রাঘিমা রেখা নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও এই আবিষ্কার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। বলতে গেলে এই আবিষ্কার না হলে এ সময়ে দ্রাঘিমা রেখা নির্ণয় করাটাই সম্ভব ছিল না।


এখন প্রশ্নটা হলো এই ক্রোনোমিটার জিনিষটা কি? এটা আসলে এক ধরণের ঘড়ি। যে ঘড়ি কোন ধরণের ঝাঁকুনি স্বত্বেও সঠিক সময় নির্দেশ করে। এক সময়ে যখন নাবিকরা সমুদ্রযাত্রায় বের হতেন তখন তারা ঘড়ি ব্যবহার করতে পারতেন না। কারণ সমুদ্রের ঢেউয়ে জাহাজের দুলনিতে ঘড়ির কাটা সঠিক সময় নির্দেশ করতে পারত না। তাই ইংল্যান্ডের সময় নির্দেশ করা কোন ঘড়ি জাহাজে উঠালে কিছু সময়ের মধ্যেই জাহাজের দূলনিতে সেই ঘড়ির কাটা উল্টোপাল্টা সময় দেখাতো। তাই মহাসাগরের কোন এক দ্বীপে যখন সূর্যোদয় হয় তখন ইংল্যান্ডের সময় কি তা না জানলে এ দ্বীপের দ্রাঘিমা জানা যেতো না। অথচ সমুদ্রযাত্রাকে আরও উন্নত করতে হলে মহাসাগরের দ্বীপগুলোর দ্রাঘিমা নির্ণয় জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু এর জন্য যে ক্রোনোমিটার ঘড়ির আবিষ্কার বাঞ্চনীয় ছিল তার আবিষ্কার অতটা সহজ ছিল না। তবে দীর্ঘ কয়েক দশকের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে ১৭৬১ সালে জন হ্যারিসন তাঁর ক্রোনোমিটার যন্ত্রের আবিষ্কারের সাফল্যের জন্য ২০০০০ পাউন্ডের লঙ্গিচিউড পুরষ্কার জিতে নেন। এই জন হ্যারিসনের নিষ্ঠা এবং বারবার অসাফল্যের পরও শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে না দিয়ে কিভাবে তিনি এই যন্ত্রের আবিষ্কার করলেন তা সত্যিই খুবই প্রেরণাদায়ক। বর্তমানে সব ঘড়িই ক্রোনোমিটার কারণ ক্রোনোমিটার টেস্ট করার পরই ঘড়ি নির্মাতাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

 

ক্রোনোমিটার আবিষ্কারের সঙ্গে ডারউইনের বিবর্তনবাদ আবিষ্কারের সম্পর্ক রয়েছে। কারণ এই আবিষ্কারের পরই বিশ্বজুড়ে সমুদ্র দ্বীপগুলোর দ্রাঘিমা নির্ণয়ের জন্য ক্রোনোমিটার বসিয়ে বিগল নামের যে জাহাজটি বিশ্ব পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়েছিল সেই জাহাজের যাত্রী ছিলেন চার্লস ডারউইন। এই পরিভ্রমণের ফলে একটি দ্বীপের চুনাপাথরের স্তর দেখার পর তাঁর মন থেকে বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্ত্বের ছ'হাজার বছরের মিথ ভেঙে যায় এবং সেই সঙ্গে তিনি মহাকালের সন্ধান পেয়েছিলেন। এই দ্বীপটি ছিল মধ্য আটলান্টিকের সাঁউতিয়াগো যা কেপভার্দে দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত। পরে প্রশান্ত মহাসাগরের গ্যালাপ্যাগোস সহ অন্য কয়েকটি দ্বীপ পর্যবেক্ষণ করে প্রাণিজগতের অভিযোজন সম্পর্কে নিঃসংসয় হোন। ইংল্যান্ডে ফিরে আসার পর তিনি মালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করেন যা মানব সভ্যতায় এক উল্লেখযোগ্য দিক নির্দেশ করে আছে।


বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে সমস্যা
 

বিবর্তনবাদ মানুষকে এক অলীক ও ধোয়াশাচ্ছন্ন স্বর্গলোক থেকে নামিয়ে এনে এই বিশ্বমাঝারে তার সঠিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করে দিয়েছিল। ধর্মান্ধতা যেভাবে মানুষকে গবেষণাবিহীন ধ্যানধারণায় এক অস্বচ্ছ বাতাবরণের মধ্যে বন্দি করে রেখে দিয়েছিল তার থেকে মুক্তি লাভ করতে যে সব চিন্তাচর্চার প্রয়োজন তার মধ্যে বিবর্তনবাদ ছিল সব চাইতে উল্লেখযোগ্য। এই মতবাদ প্রাণিকুলের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তা গড়ে তোলে জীবজগতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সমগ্র জীবজন্তর প্রতি আমাদের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটাতে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা নিয়েছে। তাই বিবর্তনবাদের আলোচনা এমন কি আজকের দিনেও সমান প্রাসঙ্গিক কারণ ধর্মান্ধতার যে উল্লাস আমরা দেখতে পাই তার থেকে মুক্তি লাভের প্রথম ও প্রধান উপায় হলো আমাদের নিজেদের সঠিক পরিচয় লাভ করা। নিজেদের ভালভাবে চিনতে পারার পরই আমরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে চিনতে পারব বলেই আমার ধারণা।


বাইবেলের সৃষ্টিতত্ব ও ছ'হাজার বছরের সীমিত সময় নিয়ে সমস্যা


মনে করা যাক একজন বিজ্ঞানী যিনি ধর্মমতে বিশ্বাস করেন, তিনি গবেষণা করতে গিয়ে এমন সব প্রমাণ পেয়ে গেলেন যা ধর্মমতের বিরুদ্ধে, তাহলে তিনি ধর্মমতের উপর বিশ্বাস হারাবেন নাকি বিজ্ঞানের উপর। সাধারণভাবে বলা যেতে পারে যে তিনি ধর্মের উপরই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবেন। কিন্তু সমাজে যখন ধর্মবিশ্বাস প্রবল থাকে এবং ধর্মগ্রন্থে লেখা বিষয়কে ঈশ্বরের বাণী হিসেবে প্রচার করা হয় তখন উল্টোটাও ঘটে। অর্থাৎ বাইবেলে যা লেখা আছে তা যে ভুল তার চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়ার পরও এক বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের উপরই বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন কারণ তা ধর্মের বিরুদ্ধে ছিল। এই বিজ্ঞানীর নাম হলো নিকোলাস স্টেনো। যিনি বাইবেলের বিরুদ্ধে বই লেখার পর এতটাই অনুতপ্ত হয়ে পড়েন যে জীবনে আর বিজ্ঞানচর্চার ধার ধারেন নি। চার্চের পাদ্রী হয়ে বাকি জীবন বাইবেল পড়েই কাটিয়ে দেন। এক সময়ে তিনি উত্তর জার্মানি সহ সমগ্র স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের প্রধান পুরোহিত হয়ে যান। তবে তিনিই সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি যিনি বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বের কফিনে প্রথম পেরেকটি মেরেছিলেন। কোপার্নিকাস কিংবা গ্যালিলিও বাইবেলের ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সৃষ্টিতত্ত্বের বিরুদ্ধে কিছুই করেন নি।

 

চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ আবিষ্কারের প্রধান অন্তরায় ছিল এই যে এ সময়ে ইউরোপের মানুষ বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্ত্বকে বিজ্ঞানের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে মনে করতেন। তাই বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্ত্ব শুধু যে বিবর্তনবাদ আবিষ্কারের পথকেই কণ্টকাকীর্ণ করে রেখেছিল তা নয়, বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার উন্নতির ক্ষেত্রেও এই ধর্মীয় বিশ্বাস এক প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব হলো ঈশ্বর ছয়দিনে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড ও প্রাণিজগৎ সৃষ্টি করে সপ্তম দিন সকাল ৯টায় কাজ সেরে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তিনি প্রথম দিনে স্বর্গ, দ্বিতীয় দিনে আকাশ ও সমুদ্র, তৃতীয় দিনে স্থলভাগ ও উদ্ভিদ, চতুর্থ দিনে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র, পঞ্চম দিনে নভোচর ও জলচর প্রাণী এবং ষষ্ঠ দিনে স্থলভাগের প্রাণী ও মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তবে মানুষ সৃষ্টি করার সময় ঈশ্বর তা করেছেন নিজের অবয়ব অনুযায়ী। অর্থাৎ ঈশ্বর দেখতে মানুষের মতো। তা তিনি যখন মানুষের মতো এবং তিনি এক ও অদ্বিতীয়, কাজেই প্রশ্ন আসে তিনি নারী না পুরুষ। এখানেও বাইবেল তার খেল দেখিয়ে পুরুষতন্ত্রের ধ্বজা উড়িয়েছে। তাই লিখেছে ঈশ্বর তাঁর অবয়ব অনুযায়ী আদমকে (পুরুষ) সৃষ্টি করেছিলেন এবং পরে আদমের সঙ্গিনী হিসেবে ইভকে সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ ঈশ্বর পুরুষ। বাইবেল যে পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতিভূ এটা তারই প্রমাণ।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই বাইবেলীয় ধারণায় বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সহ উদ্ভিদ তথা প্রাণিজগৎ সৃষ্টির ধারণায় বিবর্তনের কোন স্থান নেই। কারণ সব কিছুরই সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ছয় দিনে। তাই ক্রমবিকাশের তত্ত্ব যে সম্পূর্ণ বাইবেল-বিরোধী তা অনায়াসেই বলা চলে।

 

যিশু খ্রিস্টের জন্মের ঠিক কতো বছর আগে এই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল তা বাইবেলে স্পষ্টভাবে লেখা না থাকলেও আদি পিতা আদমের জন্ম সময়ের কিছুটা আভাস পাওয়া যায় অন্যভাবে । যেমন Book of Genesis ধর্মগ্রন্থে আদম থেকে নোয়া, মোসেজ হয়ে আরো অনেকের পর যিশু খ্রিস্ট পর্যন্ত যে বংশলতিকা লিপিবদ্ধ আছে তার থেকেই ধর্ম যাজকরা ছ'হাজার বছরের অনুমান করেন। এবং গির্জাগুলোর তরফ থেকে এই ধারণাই সমাজে প্রচার করা হয়। তবে কিছু কিছু পণ্ডিতের এই ছ'হাজার বছরও বেশি মনে হয়েছিল। ১৬৫৪ খ্রিস্টাব্দে একজন আইরিশ ধর্ম যাজক জেমস আসার যিশুর জন্ম-লতিকা গণনা করে সাব্যস্ত করেন ঈশ্বর জগত সৃষ্টি করেছিলেন যিশুর জন্মের ৪০০৪ বছর আগে ২৩ অক্টোবর সকাল ৯'টায়। কিছুকাল পর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পণ্ডিত জন লাইটফুট নতুন ভাবে গণনা করে বের করেন আদমের জন্ম হয়েছিল ঐ একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখে সকাল ৯'টায়। দু'জন পণ্ডিতেরই ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে গাত্রে ব্যথা হলেও তৎকালীন ইউরোপের ধর্মভীরু সমাজে ছ'হাজার বছরের ধারণা এক বদ্ধমূল সংস্কারে পরিণত হয়। এই বদ্ধমূল ধারণার মুলে আঘাত করতে না পারলে ক্রমবিকাশ তথা বিবর্তনের ধারণার জন্ম দেওয়া সহজ ছিল না।

 

বিবর্তন ঘটে ধীর লয়ে যার জন্য কোটি কোটি বছরের ধারণা থাকা প্রয়োজন। তাই মাত্র ছ'হাজার বছরের সীমিত সময়ের মধ্যে প্রাণিজগতের বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব ছিল না। তবে এই বিবর্তনের ধারণাটি ইউরোপীয় বিজ্ঞানী মহলে আসে যখন এই ছ'হাজার বছরের সীমিত ধারণার মধ্যে কুঠারাঘাত ঘটে এবং বিজ্ঞানীরা নানা ধরণের সূত্র ও প্রমাণ থেকে এক মহাকালের সন্ধান পেয়ে যান। এই মহাকাল আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই বিবর্তনের ধারণাও জন্মাতে থাকে এবং পরিশেষে চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদের জন্ম হয়। তবে এই মহাকালের সন্ধান দিয়েছিলেন ভূতাত্ত্বিকরা। মূলত ভূতাত্ত্বিকরাই ছিলেন বিবর্তনবাদের আদি গুরু। এর মধ্যে প্রথমেই যার নাম করতে হয় তিনি ছিলেন নিকোলাস স্টেনো। তবে স্টেনো তাঁর ভূতাত্ত্বিক গবেষণামূলক গ্রন্থ লেখার পর বুঝতে পারেন যে তিনি বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বের কফিনে পেরেক ঠুকে দিয়েছেন। এই অনুশোচনা থেকেই তিনি বিজ্ঞানের সঙ্গে সমস্ত সংশ্রব ত্যাগ করে পাদ্রী হয়ে যান। তবে যে কুকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তিনি জীবনভর মানুষকে বাইবেল শিখিয়েছেন, সেই কুকর্মের জন্যই মানব সভ্যতা আজও তীকে স্মরণ করে, তাঁর বাইবেলচর্চার জন্য নয়।

 পর্ব ২ 

জীবাশ্মবিদ্যার সুচনা

১৬৬৬ সালে জড়বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গভীর বিভাজন রেখা রচিত হয়েছিল। কারণ ওই একই বছরে একদিকে যেমন নিউটন জড়বিজ্ঞানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলো করেছিলেন তেমনি এ বছরই বিবর্তনবাদেরও প্রথম বীজ রোপণ হয়েছিল।

 

আধুনিক ভূতত্ত্বের জনক যদিও নিকোলাস এগ্রিকোলা (১৪৯০-১৫৫৫) তথাপি জীবাশ্ম সংক্রান্ত প্রথম আবিষ্কারটি হয় ১৬৬৬ সালে তবে তা গ্রস্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল তার তিন বছর পর। সেই যুগে ইউরোপে বইয়ের নাম খুব দীর্ঘ হতো তাই ওই বইটির দীর্ঘ নামটি ছিল 'Preliminary discourse by Nicholas Steno concerning a solid body enclosed by a process of nature within a solid (একটি কঠিন বস্তুর আরেকটি কঠিন বস্তু দ্বারা আবৃত হওয়ার বিষয়ে প্রাকৃতিক ক্রিয়ার সম্বন্ধে নিকোলাস স্টেনো কর্তৃক প্রাথমিক আলোচনা)'। লেখকের নাম বইটির মধ্যেই নিহিত আছে।

 

ডেনমার্কের অধিবাসী নিকোলাস স্টেনো (১৬৩৮-১৬৮৬) ছিলেন একজন শল্যবিদ চিকিৎসক। ইতালির টাসকানি রাজ্যের রাজা দ্বিতীয় ফার্ডিন্যান্ডের বন্ধুত্ব লাভের সুত্রে তিনি রেনেসাঁর বিখ্যাত শহর ফ্লোরেন্সে বসবাস করতে শুরু করেন। তখনই টাসকানির পশ্চিম উপকূলবর্তী লিগুরিয়ান সমুদ্রে ১৬৬৬ সালে একটি বিশাল কুকুর হাঙর (Dog Shark) ধরা পড়ে। রাজা ফার্ডিন্যান্ডের আদেশে হাঙরটির মাথা কেটে আনা হলো এবং স্টেনোকে দায়িত্ব দেওয়া হলো মস্তকটি ব্যবচ্ছেদ করতে। এই ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে স্টেনো হাঙরটির দাঁত দেখে অবাক হয়ে যান। কারণ ঠিক এই ধরণের বস্তু তিনি দেখেছেন বহু জায়গায়, বিশেষ করে মালটা দ্বীপে। ওই দ্বীপে এক ধরণের পাথর পাওয়া যায় যাকে বলে Tongue Stone অর্থাৎ জিহ্বা শিলা। কারণ পাথরগুলি দেখতে অনেকটা জিহ্বার মতো। এই পাথর নিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে এক ধরণের বিশ্বাস চালু আছে যে সন্ত পল যখন মালটা দ্বীপে আসেন তখন কতকগুলো সাপ তাঁকে জ্বালাতন করায় তিনি তাদের কঠিন শিলায় পরিণত করেন যা এ জিহা শিলা।

স্টেনো বুঝতে পারেন যে আসলে ওই কুকুর হাঙরের দাঁতই বহু বছরে কঠিন শিলায় পরিণত হয়ে ওই জাতীয় শিলার সৃষ্টি করেছে। তিনি তাঁর গবেষণাপত্রে এই মত ব্যক্ত করেন যে এক সময় এই মালটা দ্বীপটি গভীর সমুদ্রে জলমগ্ন হয়ে ছিল এবং ক্রমে ক্রমে তা সমুদ্রের উপরে উঠে আসে। জলমগ্ন অবস্থায় হাঙরের দাঁত সেখানে পড়েছিল যা কঠিন শিলায় পরিণত হয়। এভাবেই নিকোলাস স্টেনোর হাত ধরে জীবাশ্মবিদ্যার যাত্রা শুরু হয় যার উপর ভিত্তি করে ডারউইনের বিবর্তনবাদ আজ দাঁড়িয়ে আছে।

প্রায় তিন বছরের গবেষণায় স্টেনো আরও কতকগুলো জিনিস বুঝতে পারেন যা হলো সমুদ্রের তলায় পলির স্তর একসাথে জমা হয় না। বহু বছরের ব্যবধানে একেকটি স্তর পড়ে। এই স্তরগুলির প্রাচীনত্ব সমীক্ষা করার কিছু পদ্ধতিও তিনি আবিষ্কার করেন। অর্থাৎ একই সঙ্গে তিনি জীবাশ্বিদ্যা (Paleontology), স্তরবিদ্যা (Stratigraphy) ও ভূস্তর সময়ানুক্রমবিদ্যার (Geochronology) সুত্রপাত করেন। এ ব্যাপারে তাঁর কোন পূর্বসূরি ছিল না কারণ নিকোলাস এগ্রিকোলার ভূবিদ্যা মুলত মণিকবিদ্যার (Mineralogy) মধ্যেই সীমিত ছিল। অর্থাৎ ভূবিদ্যার সুচনা হয়েছিল এক শল্যবিদ ডাক্তারের হাত ধরেই।

নিকোলাস স্টেনো ভূস্তরের সমীক্ষা করার সময় তাঁর মনে বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্ত্বের ধারণাই ছিল। কিন্তু সমীক্ষা করতে গিয়ে তিনি বেশ কিছু পদ্ধতিরও উদ্ভাবন করেন যা আজ পর্যন্ত খুব বেশি পরিবর্তিত হয় নি। কিন্তু সমস্যা দেখা গেল অন্য জায়গায়। এই ভূস্তরের কাল নির্ণয় করতে গিয়ে তিনি দেখেন যে ছ'হাজার বছরের সীমিত সময়ের মধ্যে এতটা স্তর জমতে পারে না। তাই তিনি এক মহাকালের সন্ধান পেয়ে যান যা তাঁর ধর্মবিশ্বাসে জোর আঘাত করেছিল। তাই বিজ্ঞানের উপর তিনি সমস্ত বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে বিজ্ঞানচর্চা থেকে চিরতরে বিদায় নিয়ে ১৬৭৫ সালে রোমান ক্যাথলিক ধর্মের যাজক হয়ে যান। এভাবেই নিকোলাস স্টেনো ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও বাইবেলীয় বিজ্ঞানের শহীদ হয়ে গেলেন। তবে স্টেনো শহীদ হয়ে গেলেও বিজ্ঞান কিন্তু শহীদ হয়ে যায় নি। পরবর্তীকালে বিজ্ঞান তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়েছে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের হাত ধরে। এদের মধ্যে আমি আপাতত যে তিনজনে নাম করতে চাই তারা হলেন রবার্ট হুক, জেমস হাটন ও চার্লস লায়েল। পরবর্তি কয়েকটি পর্বে তাদের নিয়ে আলোচনা করব।

রবার্ট হুকের জীবাশ্মতত্ত্ব ও জেমস হাটনের মহাকালের সন্ধান

 

বিবর্তনবাদের আবিষ্কারের পেছনে ছিল বহু বিজ্ঞানীর অবদান। তাই প্রথমে সেই সময়ের কথা বলতে চাই যখনও ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে বেরিয়ে সত্যের পথ ছিল দুর্গম। তিনজন বিজ্ঞানীর উল্লেখ করব যারা হলেন রবার্ট হুক, জেমস হাটন ও চার্লস লায়েল, যারা বিজ্ঞানের জয়যাত্রার এই দুর্গম পথকে অনেকটাই সুগম করে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন।

রবার্ট হুকের জীবাশ্মতত্ত্ব

নিকোলাস স্টেনো ও রবার্ট হুক (১৬৩৫-১৭০৩) দুজনেই ছিলেন সমসাময়িক। রবার্ট হুক ছিলেন মূলত একজন পদার্থ বিজ্ঞানী, যদিও তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ১৬৬০ সালে ইউরোপে যে রয়েল সোসাইটির বিজ্ঞান একাদেমির পত্তন হয় সেখানে তিনি গবেষণাগারের কার্যাধ্যক্ষ পদে নিয়োজিত হন। তিন বছর পরই তিনি সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এই তিন বছরেই তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। পদার্থ বিজ্ঞানের হুক্স লো নামে পরিচিত নিয়মটিও তিনিই আবিষ্কার করেন। এমনকি বিখ্যাত ইনভার্স স্কোয়ার লো নিউটনের আগে তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন বলে দাবি জানিয়ে রয়েল সোসাইটির দ্বারস্ত হয়েছিলেন কিন্তু প্রমাণের ভিত্তিতে ওনার দাবি খারিজ হয়ে যায়।

রবার্ট হুকের মতে উচ্চতম পাহাড়চুড়া থেকে গভীরতম খনি পর্যন্ত সর্বত্র জীবাশ্মের উপস্থিতিতে এটাই প্রমাণিত হয় যে স্থলভাগ ও সমুদ্রতলের আলোড়নের ফলেই পর্বতমালা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এই ব্যাপারটা বাইবেলে বর্ণিত নোয়ার প্লাবনকে সমর্থন করে না। তবে রবাট হুকের মাথায় কিন্তু বাইবেলীয় ছ'হাজার বছরের ধারণাই ছিল। কিন্তু দু-আড়াই হাজার ফুট পাহাড় শ্রেণীর উদ্ভব হতে গেলে কোটি কোটি বছরের প্রয়োজন। তাই ছ'হাজার বছরের ভূকম্পের ফলে এত উচ্চ পাহাড় শ্রেণীর সৃষ্টি কী করে হলো তা নিয়ে হুক বিশাল ধন্দের মধ্যে পড়ে যান। হয়ত বা তিনিও এক মহাকালের সন্ধান পেয়েছিলেন কিন্তু চার্চের ভয়ে তা প্রকাশ করেন নি। এই ছ'হাজার বছরের মধ্যে প্রায় দু হাজার বছরের ইতিহাস তখন জানা ছিল। এই সময়ের মধ্যে এতটা বিধ্বংসী ভূমিকম্প তো হয় নি। তাই ছ'হাজার বছরের মধ্যে হাতে যেটুকু সময় তিনি পেয়েছিলেন যার ইতিহাস অজানা ছিল, সেই সময়ের মধ্যেই ক্রমাগত অতি ঘন ঘন বিধবংসী ভূকম্পের আমদানি করতে হয়েছিল তাঁকে। তবে রবার্ট হুক তাঁর বইয়ে বহু ধরণের জীবাশ্মের ছবি দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে এই জীবাশ্মগুলো যে সব প্রাণীর তা হয়ত এখন আর ভূপৃষ্ঠে নেই তবে পুরাকালে অবশ্যই ছিল। তিনি তাঁর বইয়ে প্রাচীনকালের বিরাটকার হাতির মতো দেখতে ম্যাস্টডনের অতিকায় দাঁত ও অদ্ভুতদর্শন সামুদ্রিক জীবাশ্মের উল্লেখ করেছিলেন। নিকোলাস স্টেনো ও রবার্ট হুক তাঁদের অজ্ঞাতসারেই ক্রমবিকাশতত্ত্বের যে বীজ রোপণ করেছিলেন তাই পরবর্তীকালে চার্লস লায়েল ও চার্লস ডারউইনের হাত ধরে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়।

জেমস হাটনের মহাকালের সন্ধান

আধুনিক ভূতত্ত বিজ্ঞানে নিকোলাস স্টেনো যেখানে থেমে যান, শতাধিক বৎসর পর জেমস হাটন (১৭২৬-১৭৯৭) সেখান থেকেই ভূতত্ত বিষয়ে তাঁর গবেষণা শুরু করেন যা ফুলে ফেঁপে আজকের ভূ-বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। হাটনই সম্ভবত প্রথম বাইবেলীয় ধারার সম্পূর্ণ বিরোধিতা করতে সাহস করেছিলেন কারণ এর আগে পর্যন্ত কেউই এতোটা প্রত্যয়ের সঙ্গে মহাকালের খোঁজ দিতে পারেন নি।

 

স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবারার বুদ্ধিজীবী মহলে এক স্বর্ণযুগের সুচনা হয়েছিল যখন রবার্ট বার্নস, ওয়াল্টার স্কট, ডেভিড হিউম, আ্যাডাম স্মিথ, জেমস ওয়াটের মতো দিকপালরা তাঁদের প্রতিভার আলোকে ইউরোপকে আলোকিত করে রেখেছিলেন। সেই সময়ই এডিনবারায় জেমস হাটনের জন্ম। এই এডিনবারায়ই পরবর্তীকালে চার্লস লায়েলের জন্ম হয়েছিল যিনি ক্রমবিকাশতত্ত্বের ভিত রচনা করেন।

 

জেমস হাটন এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে ভুষা থেকে নিশাদল (sal ammoniac) আবিষ্কার করেন এবং এই বস্তুর ব্যবসা করে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়ে যান। সেই সঙ্গে তিনি শখের ভূবিদ্যায়ও মেতে উঠেন। তিনি তাঁর ভূতত্ত্ব গবেষণার মধ্য দিয়ে এক অসীম কালের সন্ধান দিতে পেরেছিলেন যা এ সময়ে গির্জা আধিকারিকরা মেনে নিতে পারেন নি। হাটনের মতে তিনি সময়ের শুরু দেখতে পাচ্ছেন না, এমন কি শেষও দেখতে পাচ্ছেন না। এই পৃথিবী সুদূর অতীতকাল থেকে চলে আসছে এবং আবহমান কাল ধরে চলতে থাকবে।

 

১৭৯৭ সালে হাটনের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু জন প্লেফার সরল ও যুক্তিনির্ভর ভাবে এবং খুব সন্দর্পনে বাইবেলীয় বিতর্ক এড়িয়ে 'হাটনের পৃথিবীতত্তের চিত্রযোগে ব্যাখ্যা' প্রকাশ করেন। ১৮০২ সালে প্রকাশিত এই বইটির মাধ্যমেই ভূতাত্ত্বিকরা হাটনের ভূতাত্ত্বিক গতি বিজ্ঞান সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। জেমস হাটন সার্বিকভাবে বাইবেলীয় বিশ্বাস থেকে মানুষকে বের করে আনতে পারেন নি। তাই তাঁর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে তিনি হারিয়ে যেতে লাগলেন। তবে এই হাটনকে প্রায় কবর থেকে তুলে এনে জনসমক্ষে দাঁড় করিয়ে দিলেন আরেক স্কট যার নাম চার্লস লায়েল। আগামী পর্বে চার্লস লায়েলকে নিয়ে লিখব।

 পর্ব ৩ 

চার্লস লায়েলের অবিচল্বাদ খারিজ করে দেয় বাইবেলের প্রলয়বাদকে

যে বছর জেমস হাটনের মৃত্যু সেই বছরই চার্লস লায়েলের জন্ম। মানব সভ্যতায় এধরণের রিলে রেসের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। গ্যালিলিওর মৃত্যু ও নিউটনের জন্ম একই বছরে হয়েছিল।

বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বের কথা আগেই বলা হয়েছে। তবে বাইবেলের আরেকটি ব্যাপার ক্রমবিকাশতত্ত্ব আবিষ্কারের পথে বাধাস্বরূপ ছিল। যা হলো প্রলয়বাদ অথবা catastrophism। এই প্রলয়বাদ হলো এই যে ঈশ্বর মাঝে মাঝে ভূপৃষ্ঠে মহাপ্রলয় সংঘটিত করে প্রাণিজগৎ সহ সমস্ত কিছুর ধ্বংস করে দেন। যেমন মহাপ্লাবন কিংবা এক রাতের ভূমিকম্পে পাহাড় শ্রেণীর সৃষ্টি ইত্যাদি। এই ধারণাগুলো ক্রমবিকাশতত্ত্বের পরিপন্থী হলেও তৎকালীন ইউরোপীয় মানসিকতায় সমাজের সর্বস্তরে তা প্রোথিত হয়েছিল। সাধারণ লোকের কথা না হয় বাদই দিলাম, এমন কি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিপত্তিশালী অধ্যাপক ও ভূতত্ত বিভাগের প্রধান উইলিয়াম বাকল্যান্ডও এই একই ধারণা পোষণ করতেন। তাই ক্রমবিকাশের ধারণা ইউরোপীয় ভূখণ্ডে হয়ত বা সম্ভব হতো না যদি না চার্লস লায়েল তাঁর বইয়ে শান্ত, স্থির ও খুব ধীরে পরিবর্তনশীল এক পৃথিবীর ধারণা নিয়ে না আসতেন। লায়েলের এই ধারণাকে আমরা বলতে পারি "অবিচলবাদ" যা প্রলয়বাদকে খারিজ করে দিয়েছিল।

১৮৩০ সালের জানুয়ারিতে চার্লস লায়েলর যে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, তখনকার প্রথা অনুযায়ী তার দীর্ঘ নামটি ছিল 'Principles of Geology, being an attempt to explain the former changes of the Earth’s surface by reference to causes now in operation (ভূবিদ্যার মূলতত্ত্ব, পৃথিবীর পূর্বকালের পরিবর্তন সমূহের আজিকার সক্রিয় কারণের প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা)'। সংক্ষেপে 'Principles of Geology বা ভূবিদ্যার মূলতত্ব'। এই বইটি যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ও জনরোষ অর্জন করেছিল এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। লায়েল বইটির দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৩২ জানুয়ারি মাসে, এই একই বছরে প্রথম খণ্ডের পরিমার্জিত সংস্করণ জুন মাসে এবং ১৮৩৩ সালে তৃতীয় খণ্ডের প্রকাশ করেন। এই বইটি যে গির্জা আধিকারিকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। এই বইটি মূলত জনরোষের কারণেই ডারউইনের হাতে এসেছিল যা তাঁর জীবনে সন্ধিক্ষণ এনে দেয়। এই বইটির উপরই ভিত্তি করে ডারউইন তাঁর বিবর্তনবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


হাটনের পৃথিবীতত্ত্বের সঙ্গে চার্লস লায়েলের 'ভুবিদ্যার মূলতত্বে'র প্রতিপাদ্য বিষয়ের তফাতটা এই ছিল যে হাটন তাঁর বইয়ে জৈবিক জগতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন যা লায়েল করেন নি। এর প্রধান কারণ ছিল ফরাসী বিপ্লব পরবর্তী সময়ে স্মিথ, সাঁকিলায়ের, লামার্ক, কুঁভিয়ে প্রমুখ বিজ্ঞানীরা জীবজগতকে নিয়ে যে সব কাজ করেছিলেন, হাটন তা দেখে যেতে পারেন নি। এছাড়া লায়েল এক অবিচল পৃথিবীর কথা শুনিয়েছিলেন যা হাটনের মধ্যে ছিল না। লায়েল তাঁর বইয়ের প্রথম খণ্ডেই লিখেছিলেন "পুরাকালে জৈবিক ও অজৈবিক জগতের যা কিছু পরিবর্তন হয়েছিল তা সমস্তই বাধাহীন, ক্রমান্বয়ে সংঘটিত, প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং আজিকার নিয়মের মতোই চালিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের নিয়ম কখনই স্থির করা যাবে না যতক্ষণ এই মূল প্রশ্নটির বিষয়ে এক স্থির ধারণা তৈরি হবে না।


লায়েলের সমালোচনা প্রসঙ্গে ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক উইলিয়াম হেভেল uniformatarianism শব্দটি ব্যবহার করেন যাকে আমরা বাংলায় বলতে পারি 'অবিচলবাদ'। লায়েল তাঁর অবিচলবাদের সূত্রেই তখনকার বাইবেলীয় ভূতত্ব ও জীবতত্তবের অধিকাংশকে খারিজ করে দেন। সেই সময়ের বাঘা বাঘা পণ্ডিতরাও এটা অস্বীকার করতে পারেন নি যে পৃথিবীতে যে পলির স্তর জমা আছে তাতে মানুষ বা মানুষের সৃষ্ট কোন উপাদান যেহেতু পাওয়া যায় নি তাই বাইবেলীয় মহাপ্লাবন আদৌ ঘটেছিল কি না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা যায়। এভাবেই চার্লস লায়েল মহাকালসহ এক শান্ত ও ক্রমবিকাশশীল পৃথিবীর ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়ে পড়েন। এই লায়েলের হাত ধরেই চার্লস ডারউইন তীর বিবর্তনবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হোন।

 

বিবর্তনবাদের রঙ্গমঞ্চে চার্লস ডারউইনের প্রবেশ


ইংল্যান্ডের শ্রুসবারি শহরে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে চার্লস ডারউইনের জন্ম। এই একই দিনে আ্যাব্রাহাম লিঙ্কনেরও জন্ম। মনে হয় এই দিনটি পৃথিবীর দাসত্বমোচনের সূচনা করেছিল। কারণ আ্যাব্রাহাম লিঙ্কন চেয়েছিলেন মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে আর ডারউইন চেয়েছিলেন পশুদের। মূলত ডারউইনের মতবাদ থেকেই গড়ে উঠেছিল বিশ্বের পশু প্রেমী সংগঠনগুলো। এই প্রসঙ্গে পরে আসব। আপাতত ডারউইনের পারিবারিক বাতাবরণ ও শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।


বিবর্তনবাদ ডারউইনের জীবনে কোন নতুন কিছু নয় কারণ তাঁর পিতামহ এরাসমাস ডারউইন এ বিষয়ে প্রথম বই লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। চার্লসের বাবা রবার্ট ডারউইন ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার ও মাতামহ ওয়েজউড চিনামাটির কারখানা করে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হন। রবার্ট ডারউইনের কনিষ্ঠ পুত্র চার্লস ডারউইনের আট বছর বয়সেই মাতৃবিয়োগ ঘটে। তা সত্তেও দিদি, দাদা ও মামাবাড়ির ছত্রছায়ায় তাঁর ছোটবেলায় তিনি স্বর্ণযুগ কাটিয়েছেন। উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বিলাসব্যসনের মধ্যে শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের দিনগুলি কাটালেও চার্লসের প্রজাপতি, কীটপতঙ্গ, পাখির ডিম ইত্যাদির নমুনা সংগ্রহের বাতিক ছিল। তবে প্রথাগত শিক্ষার প্রতি তাঁর অনাগ্রহ আমাদের রবীন্দ্রনাথের কথাই মনে করিয়ে দেয়। চার্লসের এই প্রাণিদেহ সংরক্ষণের বাতিক যে একদিন জীববিজ্ঞানে বিপ্লব এনে দেবে তা কেউ ভাবতে পারেন নি। তাই তীর স্কুলের হেডমাস্টার যেমন এই কাজের জন্য তাঁকে বকাবকি করতেন, তেমনি বাড়ির লোকেরাও বিরক্ত হতেন।


ডাক্তারি পড়ার জন্য চার্লস ডারউইন গিয়েছিলেন এডিনবারায় কিন্তু হাসপাতালে শল্য চিকিৎসার ধরণ দেখে দু'বছর পরই পালিয়ে আসেন। ডাক্তারি আর পড়া হয় নি। এ ব্যাপারে আমরা গ্যালিলিওর কথা স্মরণ করতে পারি কারণ তাঁর ক্ষেত্রেও ঠিক একই জিনিস হয়েছিল। পুত্রের ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দেওয়ায় চার্লসের বাবা দুঃখিত হন এবং উপায়ান্তর না পেয়ে তাঁকে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করার জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত খ্রাইস্ট চার্চ কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। উদ্দেশ্য ছিল ছেলেকে গির্জার পাদ্রী বানানো। খ্রাইস্ট চার্চ কলেজের রেকর্ডসে চার্লস ডারউইন খুব সাধারণ মানের ছাত্র হলেও প্রথাগত এইসব শিক্ষার সঙ্গে প্রথা বহির্ভূত জ্ঞানলাভের একটি ধারাও তাঁর মধ্যে সদা জাগ্রত ছিল। মনে হয় এটাই স্বাভাবিক। কারণ যিনি পুরনো প্রথা ভেঙ্গে নতুন নিয়মের পরিচায়ক হবেন তিনি কলেজের সিলেবাসে আটকে থাকবেন এটা স্বাভাবিক নয়। তাই তিনি কলেজের বাইরে নবলব্ধ এক ভূতাত্ত্বিক ও দুজন প্রাণিবিদ বন্ধুদের সঙ্গে অবসর সময়ে এডিনবারার আশেপাশে ক্ষেত্র সমীক্ষায় বেরিয়ে পড়তেন। বিভিন্ন প্রাণীর নমুনা সংগ্রহের শখ তাঁর চিরকালই ছিল। কলেজে পড়ার সময়েও প্রাণিসংগ্রহশালার অধিকর্তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তেন নানা ধরণের প্রাণী সংগ্রহের কাজে। বস্তূত এই প্রাণী সংগ্রহের উপর ভিত্তি করেই তিনি তাঁর ক্রমবিকাশতত্ত্বের ব্যাখ্যা খুঁজে পান।


এডিনবারার পর কেমব্রিজে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়ার সময়ও হেন্সলোর মতো জীব বিজ্ঞানীর সান্ধ্যভ্রমণের সময়েও ডারউইন ছিলেন তাঁর নিত্য সহচর। এই হেন্সলোর পরামর্শেই ডারউইন উত্তর ওয়েলসে ভূতাত্তিক সমীক্ষা শিখতে গিয়েছিলেন, যদিও তাঁর বিষয় ছিল ধর্মতত্ত্ব। তাই মনে হয় ধর্মতত্ত্ব বিষয়টি ডারউইনকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তাই প্রথা বহির্ভতভাবেই প্রাণিবিদ্যা ও ভূতত্তের বিষয়ে তাঁর মন চলে গেছে বারবার। এই প্রথা বহির্ভূত শিক্ষাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে খ্যাতির চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। অন্যথায় হয়ত নিকোলাস স্টেনোর মত তিনিও এক পাদ্রীর জীবনই কাটাতেন।

 পর্ব ৪ 

ডারউইনের সমুদ্রযাত্রার আমন্ত্রণ

উনবিংশ শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যখন ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করে তখন সারা বিশ্বজুড়ে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যও বাড়তে থাকে। তাই সাম্রাজ্য রক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের তাগিদে গোটা পৃথিবী জুড়ে জরিপের কাজ সম্পন্ন করা জরুরি হয়ে পড়ে। এই উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ অ্যাডমিরেলিটি আমেরিকা ও মহাসাগরীয় দ্বীপগুলিতে ক্রোনোমিটার ঘড়ির সাহায্যে জরিপের কাজ শুরু করেছিল। তাই ১৮৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় ক্যাপ্টেন ফিজরয়ের নেতৃত্বে 'এইচএমএস বিগল' (HMS Beagle, HMS মানে হলো Her Majesty's Service) নামের জাহাজটি ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করে। প্রায় পাঁচ বছরব্যাপী যাত্রার উদ্দেশ্য নিয়ে বেরোনো জাহাজটিতে লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরের সঙ্গে সময় মেলানো কতকগুলো ঘড়ি ছিল কারণ জাহাজটি যে দ্বীপে যাবে সেখানের স্থানীয় সৌরসময়ের সঙ্গে ওই ঘড়িগুলোর সময়ের পার্থক্য দেখে এ স্থানটি কতো ডিগ্রি দ্রাঘিমা রেখার ওপর পড়ে তা চিহ্নিত করা যাবে। এই কাজ সম্পন্ন হলে অন্যান্য জাহাজের ক্যাপ্টেনরা মহাসাগরে পাড়ি দেবার সময় কম্পাসযন্ত্র ও ক্রোনোমিটারের সময়ের সঙ্গে নিজেদের ঘড়ি মিলিয়ে তাঁদের অবস্থান বুঝতে পারবেন।


এই জাহাজের ক্যাপ্টেন রবার্ট ফিজরয় ছিলেন বাইবেলীয় বিজ্ঞানে অত্যন্ত বিশ্বাসী ও সজ্ঞানে আধুনিক বিজ্ঞান বিরোধী। ওই বছরেরই গোঁড়ার দিকে চার্লস লায়েল ভূতত্ব বিষয়ে বই লিখে মহাপ্লাবন, পৃথিবীর আয়ু ইত্যাদি বিষয়ে বাইবেল বিরোধী মনোভাব নেওয়ায় ইউরোপে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল এবং গির্জা আধিকারিকরা নানা ধরণের সভাসমিতি করে লায়েলের নিন্দায় মুখর হয়েছিলেন। ফিজরয় এ ব্যাপারে অত্যন্ত ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি ভাবলেন যে তাঁর বিশ্বপরিক্রমায় তিনি বাইবেলের সপক্ষে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে এনে লায়েলের মুখে ঝামা ঘষে দেবেন। এই উদ্দেশ্যে তার এমন একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানীর প্রয়োজন হয়েছিল যিনি তাকে বাইবেলীয় মত প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবেন। ফিজরয় তখন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীনপন্থী উদ্ভিদ বিজ্ঞানী তথা ধর্মযাজক জন স্টিভেন হেন্সলোর শরণাপন্ন হন৷ এই হেন্সলোর পরামর্শেই ফিজরয় চার্লস ডারউইনকে তার সঙ্গী হিসেবে মনোনীত করেন। ডারউইনকে মনোনীত করার দুটো কারণ ছিল। একে তো তিনি অত্যন্ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, সেই সঙ্গে ধর্মতত্ব বিষয়ে গ্রাজুয়েট। তাছাড়া প্রকৃতি বিজ্ঞানেও ডারউইনের আগ্রহ ও ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় উৎসাহ দেখে ফিজরয় যে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিলেন এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে ফিজরয়ের এই নির্বাচন যে বুমেরাং হয়ে বাইবেলীয় বিজ্ঞানকেই ধরাশায়ী করেছিল তা আজ আর কারো জানতে বাকি নেই।

ফিজরয় তাঁকে মনোনীত করায় ডারউইন উৎফুল্ল হয়ে পড়েছিলেন মূলত আ্যাডভেঞ্জারের নেশায়। শিকারের নেশা তো তাঁর ছিলই। প্রায়ই তিনি বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তেন নেকড়ে শিকারের উদ্দেশ্যে। এই অভিযানে নেকড়ে শিকারের পরিবর্তে নানা ধরণের উদ্ভট জীবজন্তু শিকারের নেশাও তাঁকে প্ররোচিত করছিল। অভিযানের প্রথম দু'বছর তিনি শিকারও করেছিলেন। পরে বন্দুকটি এক অনুচরের হাতে দিয়ে পশুপাখিদের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করে দেন। এই পর্যবেক্ষণই তাঁকে ক্রমবিকাশতত্ব ও নতুন প্রজাতির উদ্ভবের কারণ আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছিল।

ডারউইনের সমুদ্রযাত্রা ও পৃথিবীর প্রাচীনত্তের সন্ধান

HMS Beagle নামের জাহাজটির বর্ণনা দেবার পরিসর এখানে নেই। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে বিগলের অর্থ হলো এক ধরণের ছোটখাটো শিকারি কুকুর। দু-তলা জাহাজটি শিকারি কুকুরের মতোই দুর্গম অজানা লক্ষ্যের পথে বেরিয়ে পড়েছিল। জাহাজটিতে একটি বড়সড় লাইব্রেরি ছিল। তবে ডারউইন নিজেও বেশ কিছু বই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চার্লস লায়েলের 'ভূবিদ্যার মূলতত্ত্ব' বইটির প্রথম খগু। দ্বিতীয় খণ্ড তখনও বেরোয়নি। ডারউইনের বন্ধু প্রাচীনপন্থী হেন্সলো এই বইটি ডারউইনের হাতে দিয়ে বলেছিলেন তিনিও যেন এই বইটি ভাল করে পড়েন এবং এর কোন বক্তব্যকে যেন বিশ্বাস না করেন। বইটি দেবার আসল কারণ ছিল হেন্সলো চেয়েছিলেন ডারউইন যেন ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করে বইটির বক্তব্যকে খারিজ করে দেন। হেন্সলো যা চেয়েছিলেন বাস্তবে তার উল্টোটাই হয়েছিল।

 

বিবর্তনবাদ আবিষ্কার করতে গেলে প্রথমে দুটো জিনিসের প্রয়োজন ছিল। এক হলো ছ'হাজার বছরের সীমিত সময়ের ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে এক অনন্ত সময়ের ধারণা করা যা বাইবেল বিরোধী। এছাড়া বাইবেলের প্রলয়বাদকে খারিজ করে দেওয়া যা হলো ঈশ্বর কিছুদিন পরপর সমগ্র প্রাণিজগতসহ সবকিছুকে ধ্বংস করে দিয়ে আবার নতুন করে সবকিছু সৃষ্টি করেন। এই ধারণা নিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে চলতে থাকা অবিরাম বিবর্তনের জন্ম দেওয়া যায় না। আজ আমরা জানি যে এই পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে এবং পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টিকারী DNA (Dioxyribo Nucleic Acid) সৃষ্টি হয়েছিল আনুমানিক ৩৫০ কোটি বছর আগে। কিন্তু এ সময়ে এতটা সময়ের ধারণা করা সম্ভব না হলেও এটা কল্পনা করা জরুরি ছিল যে বহু প্রাচীনকাল থেকে ক্রমান্বয়ে চলতে থাকা পরিবর্তনের ফলে এই পৃথিবীর ভূস্তর ও প্রাণিজগতের উদ্ভব ঘটেছে। এই প্রাচীনত্ব ছাড়াও প্রলয়বাদকে খারিজ করে দিয়ে শান্তভাবে ক্রমবিকাশের ধারণা করাটাও জরুরি ছিল। লায়েল তাঁর বইয়ে ঠিক এই ধারণাই দিয়েছিলেন, সেই সঙ্গে এর সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণও দাখিল করেছিলেন। ডারউইন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, লায়েলের 'ভূবিদ্যার মূলতত্ত্ব' বইটি পড়লে যেন মনের সুরটি বদলে যায় এবং সেই সঙ্গে দৃষ্টি বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। তাই লায়েল যা লিখেন নি তাও তিনি দেখতে পেয়েছিলেন লায়েলের চোখ দিয়েই। লায়েল তাঁকে এমন এক দৃষ্টিপ্রদান করেছিলেন যা তার পরবর্তী জীবনের সমগ্র ভাবধারাকেই পাল্টে দিয়েছিল। অভিযান শেষ করে দেশে ফিরে আসার পর ডারউইনের সঙ্গে চার্লস লায়েলের প্রগাড় বন্ধুত্ব হয়ে যায় কারণ দু'জনের মন ছিল একই সুরে বাঁধা।


সমুদ্র পরিক্রমায় বেরিয়ে প্রথমদিকে সামুদ্রিক তাণ্ডব ঝড়ে পড়েছিল বিগল জাহাজ। তবে ফিজরয়ের জাহাজি অভিজ্ঞতায় সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছিলেন সবাই। তারপর মোটামুটি সাবলীলভাবেই এগিয়েছিল জাহাজটি। প্রথমে আ্যার্জোরেস দ্বীপ দেখার পর আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমে প্রায় মধ্য আটলান্টিকের একটি নগণ্য দ্বীপ পর্যবেক্ষণ করার পরই ডারউইনের এক বিশাল অনুভূতি হয়। যাকে অনায়াসেই বলা যেতে পারে তাঁর জীবনের সন্ধিক্ষণ। এই দ্বিতীয় দ্বীপটি ছিল সীউতিয়াগো যা কেপভার্দে দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত। এই দ্বীপটির দিকে যখন জাহাজটি এগিয়ে যাচ্ছিল তখন ডারউইন জাহাজ থেকেই জলের উপর মাথা তুলে দাঁড়ানো দ্বীপটিতে জল থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ফুট উচুতে একটি সাদা ফিতের মতো রেখা দেখতে পান। ডারউইনের কৌতুহল হলো এই সাদা রঙের ফিতের মতো ভূস্তরের রহস্য জানতে। আগের ভূতাত্ত্বিক জ্ঞান ও বুদ্ধিদীপ্ত মনন থেকে তাঁর বুঝতে কষ্ট হয় নি যে এই সাদা রঙের চুনা পাথরের স্তরের উপাদান হলো কম্বোজ (Mollusk) জাতীয় সামুদ্রিক প্রাণীর পরিত্যক্ত প্রস্তরীভূত বহির্কঙ্কাল বা খোলস যা বহুকাল ধরে সমুদ্রে জমা হয়েছিল। পরে লাভাস্রোতের বিস্তার খোলসের স্তরকে চুনপোড়া কঠিন পাথরে পরিণত করে।


ডারউইন সমীক্ষা করে দেখলেন যে এই দ্বীপটি মূলত গঠিত হয়েছে সমুদ্রের তলদেশে আগ্নেয়গিরির লাভার উচ্ছ্বাসের ফলে। ধীরে ধীরে ভূকম্পের ফলে পাহাড়টি মাথা চাড়া দিয়ে জলের উপরে উঠে দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। ডারউইন বুঝতে পারলেন যে লাভার উচ্ছ্বাস, দ্বীপড়ুবি, উত্তোলন ও সেই সঙ্গে সামুদ্রিক প্রাণীর বদল হওয়া মাত্র ছ'হাজার বছরে সম্ভব নয়। গোটা ব্যাপারটা খুব প্রাচীনকাল থেকেই ধীর লয়ে ও অবিচলভাবে ঘটেছে যে ভাবে লায়েল লিখেছেন তাঁর বইয়ে। পরে অন্যত্র ভূসমীক্ষার ফলে তিনি মহাকাল সম্পর্কে নিঃসংশয় হয়েছিলেন। এই মহাকালের সন্ধান ও ধীর গতিতে অবিচলভাবে চলতে থাকা এক পৃথিবীর ধারণাই তীর ক্রমবিকাশতত্ত্বের আবিষ্কারে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছিল। তবে নতুন প্রজাতি উদ্ভবের আবিষ্কারের জন্য তখনও অনেকটা পথ পরিক্রমণ করা বাকি ছিল তাঁর।


ডারউইনের দক্ষিণ আমেরিকায় প্রবালদ্বীপ পর্যবেক্ষণ


দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছানোর পর সেখানকার বিশাল ও বিস্তৃত ভূখণ্ড দেখে ডারউইন অবাক হয়ে যান। একই ধরণের ভূখণ্ডের এত বিশাল বিস্তার একজন ইংল্যান্ডবাসীকে অভিভূত করারই কথা। কারণ ইংল্যান্ডে এ জিনিস দেখা যায় না। একই ভূস্তরের পাঁচশো থেকে ছশো মাইলের বিস্তার। কোনরূপ বদলের চিহ্ন নেই। ডারউইন চিলি থেকে পেরু পর্যন্ত বিস্তৃত আ্যান্ডেজ পর্বতমালার সমীক্ষা করেন। এই সমীক্ষা করে তিনি বুঝতে পারলেন যে বহুকালব্যাপী ধিকিধিকি লাভার উচ্ছ্বাসের ফলেই এই পাহাড় শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। এত বিশাল ভূখণ্ডের সমীক্ষা করতে গিয়ে তিনি সেই সময়ের নিরিখে মোটের উপর সঠিক ধারণাই করেছিলেন। কারণ তখনও আধুনিক প্লেট টেকটনিক্সের প্রক্রিয়া আবিষ্কৃত হয় নি।

 

এরপর বিগল জাহাজটি যখন প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি দিচ্ছিল তখন ডারউইন টাহিটি দ্বীপের কাছে সমতল পাহাড়বিহীন গোল চাকার বেড়ের মতো ছোট ছোট দ্বীপ দেখতে পান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এগুলো হচ্ছে প্রবাল দ্বীপ। এছাড়া তিনি ভারত মহাসাগরের কোকস ও রিইউনিয়াম দ্বীপ দুটিতেও গিয়েছিলেন যেগুলো প্রবালদ্বীপ। ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন এই দ্বীপগুলো অসংখ্য ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রবাল ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবের পাথুরে কঙ্কালের ধ্বংসাবশেষ থেকে সৃষ্টি হয়েছে বহুকালব্যাপী সময়ে। প্রবাল কীটের সূর্যের আলো ও তাপের প্রয়োজন হয় তাই প্রাণীগুলি গভীর জলে থাকতে না পেরে অগভীর সমুদ্রতটে আশ্রয় নেয়। এই সব দ্বীপ কোন কারণে জলের তলায় ডুবে যাওয়ার কারণে উপরে প্রবালের স্তর জমতে থাকে। পরে ভূকম্পনের ফলে ধীরে ধীরে সমুদ্রের উপর মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। এই প্রবালের স্তর যে কতটা গভীর ডারউইন তা আন্দাজ করতে পারেন নি।


ডারউইনের খুব ইচ্ছে ছিল কোন এক ধনকুবের যদি এ ধরণের প্রবাল দ্বীপে ড্রিলিং করে এর ভিত্তি প্রস্তর শনাক্ত করেন তাহলে বিজ্ঞানের খুব উপকার হয়। এ রকম ধনকুবেরের সন্ধান পাওয়া যায়নি বটে তবে তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর ১৯৫২ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সরকার হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার জন্য এরকমই একটি প্রবাল দ্বীপের ভূস্তর সমীক্ষার জন্য ড্রিলিং করে। এই দ্বীপটি ছিল প্রশান্ত মহাসাগরেরে এনিয়েটক দ্বীপ যা হলো এক ধরণের অটল। এই ড্রিলিং-এ দেখা যায় প্রবালের স্তর চার হাজার ফুট পর্যন্ত গভীর। প্রায় ছয় কোটি বছরে এই প্রবালের স্তর জমা হয়েছে। ডারউইনের পক্ষে এতটা গভীরতা আন্দাজ করা সম্ভব ছিল না।

চার্লস লায়েল তাঁর বইয়ে এই কথাটি বলেছিলেন যে মানুষসহ সমগ্র প্রাণিজগৎ ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যদি মাত্র ছয় দিনে সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে পৃথিবীর প্রাচীন ভূস্তরের মধ্যে মনুষ্যসৃষ্ট কোন উপাদান পাওয়া যায় না কেন। ডারউইনও একটা কথা বুঝতে পেরেছিলেন যে শুরু থেকেই এই ভূপৃষ্ঠে মানুষের অস্তিত্ব ছিল না। একটা সময়ের পরই মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। তবে প্রাণিদেহের অভিযোজনের কথা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পরে যখন তিনি এই যাত্রায় বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগতের সন্ধান পান।

ডারউইনের বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগতের সন্ধান

ইউরোপের শীতল আবহাওয়ায় প্রাণিজগতের বৈচিত্র্য খুব একটা দেখা যায় না। বরং পৃথিবীর ক্রান্তিমণ্ডলীয় উষ্ণ তাপমাত্রায় জৈব বৈচিত্র্য খুব বেশি! ডারউইন তাঁর যাত্রাপথে এই ক্রান্তিমণ্ডলীয় ভূভাগে যে জৈববৈচিত্র দেখেছিলেন তা তাঁকে অভিভূত করে দিয়েছিল। ইংল্যান্ডে বা স্কটল্যান্ডে বসে য বৈচিত্র্যের কথা তিনি ভাবতেও পারেন নি তাই দেখে আনন্দে অধীর হয়ে গিয়েছিলেন। যেখানেই গেছেন সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে জীবের দেহাবশেষ ও জীবাশ্ম সংগ্রহ করে তিনি তা অন্যান্য জাহাজ যোগে ইংল্যান্ডে তীর বন্ধু হেন্সলোর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। ক্যাপ্টেন ফিজরয়ের পক্ষে অবশ্য বোঝা দুঃসাধ্য ছিল ডারউইন কেন এইসব অপ্রয়োজনীয় আবর্জানা রাশি জড়ো করে জাহাজে স্তূপীকৃত করে রাখছেন। জীবাশ্মগুলির মধ্যে ছিল মুলত বিশাল দৈত্যাকৃতি প্রাণী আর্মাডিলোর বহিরাবরণ, শ্লথ নামক প্রাণী বিশেষ ও প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর বিশালাকায় দাঁত ইত্যাদি যা বিজ্ঞানের কাছে অজ্ঞাত ছিল। এছাড়াও ছিল সাপ, টিকটিকি, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শুষ্ক উদ্ভিদ, মাছ, বীজ, গোবর পোকা ও বহু ধরণের প্রাণীর নমুনা। এক অদ্ভুত দর্শন ব্যাঙের তিনি মজা করে নাম দিয়েছিলেন diabolicus কারণ diabolic শব্দের অর্থ হলো পৈশাচিক। এ ব্যাঙটিকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল ইডেনের বাগানে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল যে শয়তান তার চেহারা এরকমই হবে। এই বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগতে তিনি দেখলেন কীভাবে বিভিন্ন প্রাণী অভিযোজনের (modification) মধ্য দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে।

ডারউইনের বয়স যখন মাত্র বাইশ বছর অর্থাৎ অভিযানের এক বছরের মধ্যেই তিনি আবিষ্কার করে ফেললেন যে অভিযোজনের ফলে পেলিক্যান জাতীয় পাখি ডুব সাঁতারের উপযুক্ত হয়। দক্ষিণ আমেরিকায় তিনি দেখলেন অস্ট্রিচ জাতীয় রিয়া (Rhea) নৌকোর পালের মতো ডানা মেলে দৌড়য়। আবার এক প্রকারের হাঁস নৌকোর দাঁড়ের মতো ডানা দুদিকে ব্যবহার করে। তিনি দেখলেন দক্ষিণ আর্জেন্টিনার পাম্পাসে ঘাসের পর্যাপ্ত জোগানের ফলে দৈত্যকায় রিয়া পাখি দক্ষিণ পাটাগোনিয়ার মরু অঞ্চলে ছোট প্রজাতিতে রূপ নিয়েছে। তিনি আরো দেখলেন মরু অঞ্চলের ব্যাঙ সাঁতার কাটা ভুলে গেছে এবং মানুষের সংস্পর্শে না থাকা কুকুর ও বিড়াল বৃহদাকার ও হিংস্র হয়ে উঠেছে। অথবা হয়ত এই দুটো প্রাণী এরকমই ছিল, এখন গৃহপালিত হয়ে বদলে গেছে। আমি খুব কম বিড়াল দেখেছি যে ইদুর ধরে খায়। বরং চুরি করে খাওয়ার ব্যাপারে বিড়ালের মতো প্রাণীর জুড়ি নেই।


ডারউইন তাঁর গভীর অনুসন্ধিৎসা ও প্রখর বুদ্ধিবলে বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রাণিদেহে এই ধীর বদল ঘটে মূলত প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেবার তাগিদে। তখনও নতুন প্রজাতির উদ্ভব ও তার কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা তাঁর মাথায় আসে নি।

গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জে চার্লস ডারউইন

চার বছর ধরে অভিযানের পর ক্যাপ্টেন ফিজরয় কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন। অবশ্য অধৈর্য হওয়ারই কথা। কারণ বাইবেলে সপক্ষে তিনি কোন ভূতাত্তিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন নি। এদিকে ডারউইনের মধ্যে যে নবচেতনার জন্ম নিয়েছিল তা নিঃসন্দেহে বাইবেলবিরোধী। ডারউইন যখন জাহাজে চাপেন তখন কিন্তু তিনি বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বেই বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু একদিকে চার্লস লায়েলের বই তাঁর মধ্যে এক নবচেতনার জন্ম দিয়েছিল এবং অন্যদিকে ভূতাত্ত্বিক তথ্য তাঁর মানসিকতাকে বাইবেল থেকে সরিয়ে এনে প্রকৃত বিজ্ঞানসাধকের স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যেখানে কোন ধরণের পূর্বানুমান এই সাধনার ক্ষেত্রে অবাঞ্ছনীয় হিসেবে প্রতিভাত। তাই ফিজরয়ের সঙ্গে তাঁর বাক্যালাপ হতো খুবই কম। তাছাড়া ফিজরয় ছিলেন দাসত্ব প্রথায় বিশ্বাসী যা ডারউইন একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। এই নিয়ে ফিজরয়ের সঙ্গে তাঁর বচসাও হয়েছিল। পরে অবশ্য তিনি ফিজরয়কে তাঁর বক্তব্য যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পেরেছিলেন। সে যাই হোক মানসিক স্তরে ফিজরয়ের সঙ্গে তাঁর মেরুসাদৃশ্য ব্যবধান থাকায় তিনি একাকী হয়ে পড়েছিলেন। ডারউইনের এই একাকীত্বই তাঁকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল।

চার বছর পর এই অভিযানের শেষ লগ্নে ফিজরয় দক্ষিণ আমেরিকা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি দেবার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৩৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ডারউইন বিকেলের দিকে দিগন্তের স্থলভাগে একটি ক্ষুদ্র বিন্দু দেখতে পান। এই দ্বীপটি ছিল গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জের কোন একটি দ্বীপ, যেখানের প্রাণীসংগ্রহ তাঁকে ভবিষ্যতে নতুন প্রজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে পথ দেখিয়েছিল। আফ্রিকার আটশো কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে তিনি এক অসীমকালের সন্ধান পেয়েছিলেন। এবারে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমে আরেক দ্বীপপুঞ্জে তিনি তাঁর ক্রমবিকাশতত্ত্বের ভিত্তি খুঁজে পেলেন। মূলত ডারউইনের জন্যই এই গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ আজ সারা পৃথিবীর অভিযাত্রীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে পড়েছে। বর্তমানে গ্যালাপ্যাগোসে নির্মিত চার্লস ডারউইন রিসার্চ সেন্টারে অভিযাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে সারা বছর।

 

গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপটির নাম ছিল 'আর্লবেমার্ল'। তবে বর্তমানে এই দ্বীপটির নাম পাল্টে হয়েছে 'ইসাবেলা'।স্পেনের রাণী ইসাবেলার নামেই এই দ্বীপটির বর্তমান নামকরণ। এই ইসাবেলা দ্বীপটির আয়তন হলো প্রায় ৪৬৪০ বর্গ কিলোমিটার। তবে গ্যালাপ্যাগোসে সবকটি দ্বীপের আয়তন হবে মোট আট হাজার বর্গ কিলোমিটারের মতো। সাঁও তিয়াগোর মতো এই দ্বীপগুলোও আসলে আগ্নেয়গিরির লাভা থেকেই সৃষ্ট।

 

গ্যালাপ্যাগোসের দ্বীপগুলোর উদ্ভিদের প্রায় চল্লিশ শতাংশই সম্পূর্ণ স্থানীয় যা অন্যত্র দেখা যায় না। পেয়ারা জাতীয় গাছের জঙ্গল, ক্যাকটাস, সেই সঙ্গে ঝোপঝাড়ের সমাবেশ ও ঘাসজমির বিস্তারে এখানকার প্রকৃতি অনেকটাই ভিন্ন। এই পরিবেশে প্রাণীগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য অতি সামান্য। তবে কম বৈচিত্রের মধ্যেও বেশ কিছু অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করেছিলেন ডারউইন। যেমন দৈত্যকায় কচ্ছপ, বিরাট ইগুয়ানা যা এককালে স্থলচর ছিল এখানে এসে জলচর হয়েছে। স্প্যানিশ ভাষায় দৈত্যাকার কচ্ছপকে বলা হয় Galapagos, এবং এই নামেই দ্বীপগুলোর পরিচয়। একেকটা দ্বীপের কচ্ছপ একেক রকম এবং মজার কথা হলো সুকুমার রায়ের গোঁফ দিয়ে মানুষ চেনার মতো স্থানীয় লোকেরা কচ্ছপ দিয়েই দ্বীপপ্তলোকে শনাক্ত করতেন। যে দ্বীপগুলো মোটামোটি জলসিক্ত সেখানে ঝোপঝাড় খেয়ে কচ্ছপগুলো বেঁচেবর্তে আছে। কিন্তু যে শুকনো দ্বীপগুলোতে ঝোপঝাড় নেই সেখানে কচ্ছপগুলোর গলা লম্বা হয়ে গেছে যাতে ক্যাকটাস সহ অন্য গাছগুলোর পাতা খেয়ে বাঁচতে পারে। ব্রাজিলের ডুবুরি পাখি করমোরেন্ট যা দীর্ঘ ডানা মেলে উড়তে পারে, এখানে এসে উড়ানশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। গ্যালাপ্যাগোসে খাদ্য নিয়ে লড়াই নেই, তাছাড়া কোন প্রাণীই অন্যটির খাদ্য নয়, তাই এই শক্রহীন পরিবেশে প্রাণীগুলো তাদের আত্মরক্ষার প্রত্যঙ্গগুলো হারিয়ে ফেলেছে।

 

গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ থেকে ডারউইন বিভিন্ন প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যান। এই সংগ্রহগুলোর মধ্যে বিশেষত ফিঞ্চ পাখি (Finch), কিছু নকলনবিশ পাখি (Mocking Bird) ও বেশ কিছু দৈত্যকায় কচ্ছপ তাঁর 'নতুন প্রজাতির উদ্ভব'-এর সুত্র আবিষ্কারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।

দীর্ঘ অভিযানের সমাপ্তি

১৮৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর বিগল জাহাজটি ইংল্যান্ডের প্লাই মাউথ বন্দর থেকে রওনা হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ বছর ৯ মাস ৫ দিন পর ১৮৩৬ সালের ২ অক্টোবর এই অভিযাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটে। এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় ডারউইন তাঁর প্রাণী সংগ্রহের নমুনা ও ভূতাত্বিক ধারণার কথা চিঠি লিখে বন্ধু হেন্সলোকে পাঠাতেন। হেন্সলো ডারউইনের চিঠির নির্বাচিত অংশগুলো নিয়মিত লন্ডনের ভূতাত্ত্বিক সমিতি ও কেমব্রিজের দর্শনশাস্ত্র সমিতির সভায় পড়ে শোনাতেন। তাই ডারউইন ফিরে আসার আগেই বিশেষত লন্ডন ও কেমব্রিজে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি ফিরে আসায় এ দুটো জায়গাতেই তাঁকে ভূতাত্ত্বিক সমিতির সভ্য ও ১৮৩৯ সালে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত করা হয়। দেশে ফেরার আগেই চার্লস লায়েলের সঙ্গে তাঁর মানসিক যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবেই দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই দুজনের মধ্যে প্রগাড় বন্ধুত্ব হয়ে যায়।

 পর্ব ৫ 

বিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দিল সামান্য ফিঞ্চ পাখি

"সবচেয়ে বড়কে বুঝতে হলে সবচেয়ে ছোটকে বুঝতে হবে আগে"। কথাটি বলেছিলেন গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস, খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৪০০ বছর আগে। তবে ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের প্রাক কালে এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। লামার্ক ও তাঁর সহযোগীরা মনে করতেন সূক্ষ্ম গবেষণার প্রয়োজন নেই। কারণ এতে জনগণের মনে রেখাপাত করে না। তাই প্রয়োজন মহাজাগতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের মৌলিক সূত্র বের করা। তবে অন্য একদল বিজ্ঞানীরা ছিলেন যারা মনে করতেন সুক্ষ্ম গবেষণার প্রয়োজন সবচাইতে বেশি। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর পুরোভাগে ছিলেন আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের জনক ল্যাভোয়েসিয়ের। আজ আমরা জানি যে পরমাণুকে বুঝতে না পারলে গোটা ব্রহ্মাণ্ডকেই বোঝা যায় না। অথচ ফরাসী বিপ্লবের বিদ্রোহীরা এই ল্যাভয়েসিয়েরকেই মধ্যপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে গিলোটিনে চড়িয়ে হত্যা করেছিল। ফরাসী বিপ্লবের গৌরবময় ইতিহাসের এটা একটা কলঙ্কময় অধ্যায়।

যাই হোক, চার্লস ডারউইন তাঁর অভিযানে প্রাণিদেহের যে বিশাল নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন তার প্রায় সবটাই তিনি তুলে দেন কেমব্রিজ ও লন্ডনের বিশেষজ্ঞদের হাতে সঠিক সনাক্তকরণের জন্য। ভেবেছিলেন যে মানুষের মতো অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও গোষ্ঠী থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যখন জানতে পারলেন গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ থেকে তিনি যে ফিঞ্চ পাখির নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন তার মধ্যে তেরোটিই ভিন্ন প্রজাতির, তখন তিনি অবাক হয়ে যান। এছাড়াও গ্যালাপ্যাগোস থেকে সংগৃহীত মোকিং বার্ডেরও ছিল তিনটি প্রজাতি ও দৈতাকায় কচ্ছপগুলোর ছিল দুটি প্রজাতি। পরে গ্যালাপ্যাগোসের প্রায় হাজার কিলোমিটার উত্তরে কোকোস (Cocos) দ্বীপে ফিঞ্চ পাখির আরো একটি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়।

 

অভিযানের সময় এই ফিঞ্চ পাখিগুলোকে নিয়ে ডারউইন বেশি চিন্তাভাবনা করেননি। তাঁর ডায়েরিতে তিনি এই পাখিগুলোর নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেননি। অথচ এই চড়ুই পাখির মতো ছোটখাটো ফিঞ্চ পাখিই ডারউইনের চিন্তাজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে আসলে শুরুতে একই ধরণের ফিঞ্চ পাখি ধীরে ধীরে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে রূপ নিয়েছে। তাই নতুন প্রজাতি সৃষ্টি সম্পর্কে তাঁর মনে আর কোন সংশয় রইল না। তবে নতুন প্রজাতি সৃষ্টির মূল প্রক্রিয়া সম্পর্কে তখনও তিনি কোন ধারণা করতে পারেন নি।

চার্লস ডারউইনের পূর্বসূরিরা


চার্লস ডারউইনই যে প্রথম বিবর্তনের কথা ভেবেছিলেন তা মোটেই সত্যি নয়। এর আগে অন্যরাও এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে চার্লস ডারউইনের পিতামহ এরাসমাস ডারউইনও ছিলেন। এছাড়াও ডিভ্যারো, লামার্ক, কুভিয়ে, জ্যোফে এঁরা তো ছিলেনই, এছাড়াও ছিলেন ডারউইনের বন্ধু চার্লস লায়েল। কাজেই বিবর্তন কিংবা ক্রমবিকাশ ব্যাপারটি চার্লস ডারউইনের কাছে নতুন কিছু ছিল না। তথাপি আজ বিবর্তনবাদের সঙ্গে 'ডারউইনিজম' শব্দটি সমার্থক হয়ে গেছে মূলত যে কারণে তা হলো তিনি বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি ধরতে পেরেছিলেন।

 

ডারউইনের জীবদ্দশায় জনমনে লামার্কের প্রভাবই ছিল বেশি। এমন কি বিংশ শতাব্দীর গোঁড়া পর্যন্ত লামার্ককেই বিবর্তনবাদের মূল প্রবক্তা হিসেবে ধরা হতো। তাছাড়া বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়ার কম্যুনিস্টরা লামার্কের তত্বকেই বেশি প্রাধান্য দিতেন মূলত রাজনৈতিক কারণে। চার্লস ডারউইনের 'প্রাকৃতিক নির্বাচনে'র তত্ত্ব কম্যুনিস্টদের মনঃপুত ছিল না এবং সোভিয়েত রাশিয়ায় মস্তিষ্ক গবেষণার সঙ্গে জেনেটিক্স বা জিন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাকেও ব্যান করে দেওয়া হয়। গ্রেগর জোহান মেন্ডেল নামে এক বিজ্ঞানী ১৮৬৬ সালেই এই জিন তত্ত্বের আবিষ্কার করেন এবং বিংশ শতাব্দীতে এই জিন তত্ত্ব নিয়ে গোটা বিশ্বব্যাপী গবেষণা শুরু হলেও সোভিয়েত রাশিয়াতে এর চর্চা বন্ধ রাখা হয় কারণ কম্যুনিস্টদের পয়গম্বর হলেন কার্ল মার্ক্স যার সমস্ত কথাই ঈশ্বরের বাণীর মতো বিশ্বাস করেন কম্যুনিস্টরা, তিনি বলে গেছেন 'মানুষ হলো তার পারিপার্শ্বিকতায় সৃষ্ট'। বংশানুক্রমিক কোন গুণ মানুষের থাকে না। এ ব্যাপারে আমার একটি বোকার মতো প্রশ্ন আছে যে বংশগত গুণাবলি যদি না-ই থাকে তাহলে মানুষের পেটে মুরগির বাচ্চা জন্মায় না কেন। যাই হোক কম্যুনিস্ট সরকারের আমলে ওই দেশে ডারউইনের পরিবর্তে লামার্কের মতবাদকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে জিন তত্ত্ব বিশ্বাসী বিজ্ঞানীদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তাই বলতে হয় যে ধার্মিকদের সঙ্গে কম্যুনিস্টদের যতই লড়াই থাকুক না কেন, সত্যের প্রতি নিষ্ঠার ব্যাপারে দু-দলেরই অবস্থানই এক। তাই সত্যনিষ্ট বিজ্ঞানীদের লড়াই এই দু'দলের সঙ্গেই ছিল। প্রায় তিন হাজার জীব বিজ্ঞানী জিন তত্ত্ব কিংবা ডারউইনের মতবাদে বিশ্বাস করার কারণে প্রতি বিপ্লবী হিসেবে চরম শাস্তি ভোগ করেন।


স্বনামধন্য লামার্কের পুরো নামটি ছিল জ্যাঁ ব্যাপতিস্ত দে লামার্ক (১৭৪৪-১৮২৯)। তিনি ছিলেন ফ্রান্সের জাতীয় প্রাকৃতিক ইতিহাসের প্রদর্শশালার অমেরুদণ্ডী প্রাণী বিভাগের অধিকর্তা। যদিও তিনি সর্বসাধারণের জন্য সর্বজনীন তত্ত্বকে গুরুত্ব দিয়ে প্রথমে চারটি বই লিখেছিলেন কিন্তু বিজ্ঞানীমহল তাঁর এইসব বইয়ের মূল্য দেন না। কারণ বিজ্ঞানীরা ল্যাভোয়েসিয়েরের দেখানো পথকেই সঠিক বলে গণ্য করতেন। সর্বসাধারণের জন্য বৈজ্ঞানিকতত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ ও হতাশ লামার্ক শেষ পর্যন্ত ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে 'প্রাণিবিদ্যার দর্শন' নামে যে বইটি লিখেছিলেন তাই তাঁকে সাধারণ শিক্ষিত সমাজে স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। যদিও অমেরুদপ্তী প্রাণীর বিষয়ে কতকগুলো বই তিনি লিখেছিলেন ১৮০১ থেকে ১৮২২ সাল পর্যন্ত।


যে বছর চার্লস ডারউইনের জন্ম সেই বছরই প্রকাশিত লামার্কের 'প্রাণিবিদ্যার দর্শন' বইটি ছিল মূলত বিবর্তনবাদকে নিয়ে। চার্লস লায়েল তখনও রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করেননি তবে লামার্কের বইয়ে জেমস হাটনের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রাণিজগতের বিবর্তনকে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন 'অসীম কালের মহাকন্দরে' যা অবশ্যই বাইবেলবিরোধী। তাঁর মতে সময় প্রকৃতি বিজ্ঞানকে কখনও বিপদে ফেলবে না কারণ প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য সীমিত সময়ের ধারণাকে আঁকড়ে রাখার প্রয়োজন নেই। তাঁর কাছে 'সময়' একটি অসীম শক্তি। প্রাণিদেহের সংগঠনের ব্যাপারে লামার্কের মন্তব্য ছিল দেহের বিভিন্ন আকৃতি ধারাবাহিকভাবে সারিবদ্ধ সিঁড়ির ধাপে সামান্য থেকে থেকে জটিল আকার নিয়ে ক্রমশ উচ্চমানে পৌঁছেছে। তিনি মনে করতেন কোন প্রত্যঙ্গের অধিক ব্যবহারে সেই প্রত্যঙ্গ উন্নত হবে এবং অব্যবহারে দুর্বল হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে উন্নত ও অবনত প্রত্যঙ্গ পরের প্রজন্মে বর্তাবে। এভাবেই বহু প্রজন্মের ব্যবধানে কোন প্রত্যঙ্গের রূপ বদলে যাবে এবং বংশ পরম্পরায় অব্যবহৃত প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যাওয়ায় প্রত্যঙ্গটির বিলুপ্তি ঘটবে। লামার্ক তাঁর মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য জিরাফের উদাহরণ দিয়েছিলেন। তাঁর মতে মগডালের পাতা খাওয়ার দুর্নিবার ইচ্ছার কারণে বহু প্রজন্মের বিবর্তনে জিরাফের গলা ও সামনের দুটো পা লম্বা হয়ে গেছে। তবে লামার্কের এই ব্যবহারের ফলে কোন প্রত্যঙ্গের পরিবর্তন পরের প্রজন্মে সঞ্চারিত হওয়ার তত্ত্বের পেছনে কোন গবেষণা ছিল না। এটা ছিল এক ধরণের অনুমান। পরবর্তীকালে গ্রেগর মেন্ডেল ও লুই মরগ্যানের জিন তত্ত্ব বা প্রজননবিদ্যার মাধ্যমে লামার্কের তত্ত্ব খারিজ হয়ে যায়। লামার্কের বিবর্তনবাদের তত্ত্ব ডারউইনকে প্রভাবিত করেছিল নিশ্চয়ই। তবে মূলত চার্লস লায়েলের বইয়ে জীবনের প্রগতি বনাম বদল নিয়ে যে বিস্তারিত আলোচনা ছিল তাই ডারউইনের দিগদর্শনের কাজ করেছিল বেশি।

ডারউইনিজমের উদ্ভাবনে ব্লাইথ ও ম্যালথাসের অবদান

১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পত্রিকা 'ম্যাগাজিন অব ন্যাচারেল হিস্ট্রি'-তে এডওয়ার্ড ব্লাইথ নামে জনৈক ব্যক্তির একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ডারউইনের বিখ্যাত নোট বইটিতে দেখা যায় তিনি এই লেখাটি পড়েছিলেন। তিনি পত্রিকার নাম উল্লেখ করে লিখেছেন যে এই জাতীয় ছোট পত্রিকায় ভাল প্রবন্ধ থাকে যা অনেক বিদেশী পত্রিকাতেও থাকে না। যারা লিটল ম্যাগাজিন চালান তাদের জন্য এটি একটি সুখবর বটে।

 

ব্লাইথের মতে মানুষ যদি বিভিন্ন গৃহপালিত প্রাণীকে তাদের বাসস্থান থেকে সরিয়ে এনে তাদের স্বভাব ও শারীরিক গঠনকে পাল্টে দিতে পারে তাহলে এই একই কাজ প্রকৃতি কেন করতে পারবে না। তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন যে এখন যেভাবে আমরা ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি দেখতে পাচ্ছি তা কি অতীতের কোন এক বিশেষ প্রজাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যা অভিযোজনের ফলে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে রূপ নিয়েছে। ব্লাইথের মতে প্রাণিসমূহের মধ্যে যারা তাদের ক্ষিপ্রতা, শক্তি অথবা কোন ইন্দ্রিয়ের সূক্ষ্মতার সাহায্যে খাদ্য আহরণ করে তাদের মধ্যে যে সর্বাধিক সংগঠিত, সে নিশ্চয়ই অন্যদের চাইতে বেশি খাদ্য আহরণ করতে পারবে এবং শারীরিকভাবে শক্তিমান হয়ে প্রতিপক্ষদের পরাজিত করবে, সেই সঙ্গে নিজেদের উচ্চতর গুণগুলি সন্তানদের মধ্যে সঞ্চারিত করবে। তবে ব্লাইথ এ ব্যাপারে বেশি দূর এগোতে পারেন নি। শক্তিমানের জেতা ঈশ্বর নির্দিষ্ট বলেই ক্ষান্ত হয়েছিলেন।

চার্লস ডারউইনের প্রজাতির উৎস সন্ধানে এডওয়ার্ড ব্লাইথের প্রবন্ধ তাঁকে কতটা সহায়তা করেছিল তা নিয়ে সংশয় থাকলেও আরেক চিন্তাবিদ থমাস রবার্ট ম্যালথাস (১৭৬৬-১৮৩৮) যে বইটি লিখেছিলেন তা ডারউইনের বিবর্তনবাদ আবিষ্কারে যে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল তা স্বয়ং ডারউইনই অকপটে স্বীকার করে গেছেন।

ম্যালথাস ছিলেন ইউরোপের একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, রয়্যাল সোসাইটির সদস্য, লন্ডনের স্ট্যাটিস্টিক্যাল সমিতির সহ-প্রবর্তক এবং তাঁরই উদ্যোগে রাজনৈতিক অর্থনীতির বিভাগ খোলা হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লন্ডনস্থ কলেজে। ১৭৯৮ সালে ম্যালথাসের যে চটি বইটি বেরিয়েছিল, তখনকার প্রথা অনুযায়ী তার দীর্ঘ শিরনামটি ছিল 'An Essay on the Principles of Population as it Affects The Future Improvement of Society, with Remarks on the Speculation of M. Godwin, M. Condorcet and other Writers', সংক্ষেপে 'Principles of Population' অর্থাৎ 'জনসংখ্যার মুলতত্ত্ব'। পরে এই চটি বইটির একটি বর্ধিত সংস্করণও বেরিয়েছিল।

ম্যালথাসের পিতার বয়েসি অনেক দার্শনিকরাই তখন নতুন সহস্রাব্দের সুখকর চিন্তায় বিভোর ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন নতুন সহস্রাব্দের মানুষ যুক্তিবাদী হবে ও মিলেমিশে দুঃখহীন পৃথিবীতে বাস করবে। কিন্তু তাঁদের এই ভাবনায় যেন কিছুটা ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিল ম্যালথাসের জনসংখ্যার মূলতত্ব। তিনি দেখালেন যে জনসংখ্যা গুণোত্তর প্রগতির হারে বাড়ে কিন্তু খাদ্যের জোগান বাড়ে গাণিতিক প্রগতির হারে। অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যদি ১, ২, ৪, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪... এইভাবে হয় তাহলে এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খাদ্যোৎপাদন বাড়তে পারে এইভাবে, যেমন ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ... । কাজেই জনসংখ্যার বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যের জোগান পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি না হওয়ায় জনসংখ্যার দ্রুতহারে হ্রাস অবশ্যম্ভাবী। তাই যুদ্ধ বিগ্রহ, মহামারি, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির মাধ্যমে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার খাদ্যোৎপাদনের বৃদ্ধির হারের সঙ্গে মানিয়ে নেবে।

 

এটা ঠিক যে ম্যালথাসের এই তত্ত্বের মধ্যে কিছুটা অতিসরলীকরণ ছিল। বর্তমান পপুলেশন থিওরি আরো অনেক জটিল। আর সত্য সব সময়ই জটিল। আসলে ম্যালথাস তাঁর সমসাময়িক যুগের ছন্নছাড়া ইউরোপীয় সমাজ, উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর গরিবি দেখেই অভ্যস্ত ছিলেন। কৃষি ব্যবহার উন্নতি, জন্ম নিয়ন্ত্রণ এবং পুঁজিবাদের সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবেন নি।

ডারউইন দেখলেন যে ম্যালথাস মানব সমাজ নিয়ে যা লিখেছেন তা পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর জন্যই প্রযোজ্য। তাই প্রতিটি প্রজন্মে অস্বাভাবিক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং খাদ্য ও বাসস্থানের জোগানের তারতম্যই তাঁকে 'Struggle for Existence' অর্থাৎ বেঁচে থাকার সংগ্রামের নির্দেশ করেছিল। এই বেঁচে থাকার সংগ্রামের কারণেই যে বিবর্তন ঘটে তা তাঁর বুঝতে অসুবিধা হয় নি। কেউ একজন মন্তব্য করেছিলেন বিবর্তন যদি হয় মেশিন তাহলে 'প্রাকৃতিক নির্বাচন' হলো তার ইঞ্জিন এবং খাদ্যের জন্য ক্রমাগত লড়াই হলো তার জ্বালানি। তাই ডারউইন বিবর্তনবাদ আবিষ্কারের জন্য ম্যালথাসের জনসংখ্যার মূলতত্বের কাছে তাঁর খণ স্বীকার করে গেছেন।

 পর্ব ৬ 

চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ

ডারউইনের বিবর্তনবাদ আবিষ্কারে সময় লেগেছে অনেক। সামাজিক স্তরে দেখতে গেলে প্রায় দু'হাজার বছরের ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে মানব সমাজকে এগিয়ে যেতে হয়েছে অনেক দূর। ছ'হাজার বছরের সীমিত সময়ের ধারণা, বাইবেলের বিপর্যয়বাদ থেকে মুক্তি এবং এক অবিচল তথা ধীর পরিবর্তনশীল পৃথিবীর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতেই বহু বছর পার হয়ে গেছে। এছাড়াও বিবর্তনের মূল কারণ ও প্রক্রিয়াকে উদ্ধার করতেও ডারউইনকে থাকতে হয়েছে কোন দিশারীর প্রতীক্ষায়। সমকালীন সমস্ত তথ্য ও উন্নতমানের চিন্তাভাবনাকে মূলধন করে শেষ পর্যন্ত ডারউইন বিবর্তনের যে বিশেষ প্রক্রিয়াকে আবিষ্কার করলেন তা হলো 'প্রাকৃতিক নির্বাচন' বা 'Natural Selection'। এই প্রাকৃতিক নির্বাচন হলো সেই ইঞ্জিন যা প্রাণিদেহের মধ্যে অভিযোজন ঘটিয়ে অবশেষে নতুন প্রজাতির জন্ম দেয়। এই বিশ্বে মানব প্রজাতি শুরু থেকেই ছিল না। এই বিবর্তনের ধারায় মানব প্রজাতিরও উদ্ভব ঘটেছে। তবে এই প্রসঙ্গে আমি পরে আসব প্রথমে আমাদের দেখতে হবে এই 'প্রাকৃতিক নির্বাচন' প্রক্রিয়াটি কি?


ডারউইন লক্ষ্য করেছিলেন প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে কিছু না কিছু শারীরিক তফাৎ থাকে। এমন কি ছোট ছোট একই প্রকার প্রাণীগুলির মধ্যেও কিছু না কিছু তফাৎ থাকেই এবং কোন দু'টো প্রাণী সম্পূর্ণ সাদৃশ্য হয় না। বিশেষত যৌন প্রজননজাত প্রাণীগুলির মধ্যে বেশি পরিমাণে বৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া প্রতিটি প্রাণীই এত বেশি সন্তানের জন্ম দেয় যে সব সন্তানের জন্য খাদ্য ও বাসস্থানের সংকুলান করা প্রকৃতির পক্ষে সম্ভব নয়। তাই প্রকৃতি যোগ্যতমকে টিকিয়ে রাখার জন্য নির্বাচিত করে অন্যদের ধীরে ধীরে বিলুপ্তি ঘটায়। প্রকৃতির এই অমানবিক দিকটির কথা ডারউইনের বই প্রকাশিত হওয়ার আগেই আঁচ করতে পেরেছিলে ইংরেজ কবি টেনিসন। তিনি লিখেছেন প্রকৃতি প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে যতটা সাবধান কিন্তু ব্যক্তির প্রতি ততটাই উদাসীন। তাই মানব সভ্যতার সঙ্গে এই প্রাকৃতিক নির্বাচনের বিরোধ নিয়ে আমি লিখব আমার উপসংহারে তবে বিজ্ঞানের কাজ হলো সত্যকে প্রকাশ করা তাই ডারউইন একজন বিজ্ঞানী হয়ে নিজের কাজটি তিনি নির্লিপ্ত ভাবেই করে গেছেন। কারণ বৈজ্ঞানিক সত্য আমাদের পছন্দ-অপছন্দের তোয়াঞ্কা করে না।


ডারউইন ভেবেছিলেন যেহেতু প্রত্যেক প্রাণীর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যের সংকুলান নেই তাই যেসব প্রাণীর দেহজ গঠন অধিক খাদ্য সংগ্রহ করার অনুকূল সেই সব প্রাণীগুলি বেশি পরিমাণে খাদ্য সংগ্রহ করে বেশি সংখ্যক সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম হবে। এই শারীরিক গঠন যেহেতু জন্মসূত্রে পাওয়া তাই এই গঠনই তাদের সন্তানের মধ্যে বেশি পরিমাণে সঞ্চারিত হবে। তাই পরের প্রজন্মে ওই প্রজাতির মধ্যে অনুকূল গঠনের সদস্যই বেশি সংখ্যায় জন্মাবে। সেখানেও থাকবে একই ধরণের প্রতিযোগিতা। এভাবেই একটি একটি করে বহু সফল প্রজন্মের মধ্য দিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশি পরিমাণে অনুকুল গঠন সম্পন্ন নতুন প্রজাতির উদ্ভব হবে এবং একই সঙ্গে কিছু কিছু প্রতিকূল গঠন সম্পন্ন প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটবে।


ডারউইন ভাবলেন যে ফিঞ্চ পাখিরা গ্যালাপ্যাগ্গোস দ্বীপে এসেছিল বাইরে থেকে। কিন্তু আসার পর দেখল এখানে খাদ্যের জন্য কোন প্রতিযোগিতা নেই। তাই মনের আনন্দে এখানে রয়ে গেল। কিন্তু বংশ পরম্পরায় যখন ফিঞ্চ পাখিদের সংখ্যা বাড়তে লাগল তখনই শুরু হলো প্রতিযোগিতা। এই পরিবেশে যে ফিঞ্চ পাখিগুলোর জন্মসূত্রে ঠোঁট কিছুটা বড় তারা বড় আকারের পোকা ধরতে সক্ষম ছিল। বড় পোকার আমিষ অংশ যেহেতু বেশি তাই এই পাখিগুলোরই স্বাস্থ্য ভাল হওয়ায় বেশি পরিমাণে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে ঠৌট ছোট পাখিগুলির ক্ষেত্রে পুরো ব্যাপারটাই ঘটেছে উল্টোভাবে। এই ভাবেই বহু প্রজন্মের ব্যবধানে এতটাই পরিবর্তন ঘটে যায় যে একই প্রজাতি থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির জন্ম হয়।


খাদ্য ও বাসস্থানের লড়াইকে ডারউইন মোট তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন, নিজের প্রজাতির মধ্যে লড়াই, অন্যান্য শক্রভাবাপন্ন প্রজাতির মধ্যে লড়াই ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেবার জন্য লড়াই। গ্যালাপ্যাগোসে তিনি মুলত শেষোক্ত লড়াইকেই বেশি করে দেখেছিলেন। কারণ এই দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দ্বীপগুলির মধ্যে পরিবেশগত পার্থক্য ছিল। যেমন কোনটা আর আবার কোনটা শুকনো। কোনটাতে ঘাস আছে পর্যাপ্ত পরিমাণে, আবার কোনটাতে অপর্যাপ্ত। কোথাও ঝোপবাড় বেশি, কোথাও বা কম ইত্যাদি। এই বিভিন্ন পরিবেশে খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একই প্রজাতির শারীরিক গঠনের মধ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়েছে বিশাল সময়ের ব্যবধানে। এসবই তিনি লক্ষ্য করেছিলেন তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে। তবে তাঁর সঙ্গী ফিজরয়ের এসব কিছুই নজরে আসেনি কারণ বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব তার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।


বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য ও বাসস্থানের অপ্রতুল সম্ভারের জন্য লড়াইয়ে শুধুমাত্র যোগ্যতমের সংরক্ষণই হলো 'প্রাকৃতিক নির্বাচন' যা ডারউইনের সময়ে কেউ কল্পনাও করতে পারেন নি। ওই সময়ে এটা কল্পনা করা খুব সহজ ছিল না তা বোঝা যায় যখন দেখি ডারউইনের মৃত্যুর ষাট বছর পরও অনেকেই তা বুঝতে পারেন নি। তবে পরবর্তীকালে জিনতত্ত্ব, ভ্রূণবিজ্ঞান, শরীরবিজ্ঞান, সেই সঙ্গে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার অগ্রগতির ফলে এটা মোটের উপর প্রমাণিত যে ডারউইন ছিলেন অভ্রান্ত। তবে ডারউইনের সমালোচকরা বলেন যে তিনি বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে পরস্পর নির্ভরতা নিয়ে কিছুই বলেনি। এই ধরণের সমালোচনা ডারউইনের মতবাদের অসম্পূর্ণতা নির্দেশ করে ঠিকই কিন্তু তা খারিজ করে দেয় না।

শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পেলো ‘On the Origin of Species’ 

চার্লস ডারউইনের 'অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস' বইটি ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ নভেম্বর তারিখে প্রকাশিত হয় এবং সেই দিনই সমস্ত বই বিক্রি হয়ে যায়। বোঝা যায় যে বইটির চাহিদা কি হতে পারে প্রকাশক তা অনুমান করতে পারেন নি। এই বইটির পুরো নাম হলো 'On the Origin of Species by Means of Natural Selection, or The Preservation of Favoured Races in the Struggle for Life’। এতো জনপ্রিয় এই বইটি কিন্তু প্রকাশিত হওয়ার কুড়ি বছর আগেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ডারউইন তা প্রকাশ করতে আগ্রহবোধ করেন নি। তিনি সম্ভবত এ ব্যাপারে কোপার্নিকাসের পদাঙ্কই অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ মৃত্যুর আগে ধর্মবিরোধী বই লিখে ইহলোক ত্যাগ করা। ডারউইন তাঁর বই নিয়ে যে সব বন্ধুদের সঙ্গে গোপনে আলাপ-আলোচনা করতেন তারা ছিলেন চার্লস লায়েল, লুকার ও হাক্সলি। এই বন্ধুরা ডারউইনকে বইটি প্রকাশের জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। লায়েলতো তাঁকে সাবধান করে বলেই দিয়েছিলেন যে তিনি যদি দেরি করেন তাহলে অন্য কেউ এই একই জিনিস প্রকাশ করে বিজ্ঞানজগতে নিজের স্থান করে নেবে। ডারউইনের তখন আর কিছুই করার থাকবে না। তাও কেন জানি বাইবেলবিরোধী বইটি প্রকাশ করতে ডারউইনের মন সরছিল না। তাছাড়া তাঁর পত্নীও ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিক ও ধর্মবিশ্বাসী। এখানে প্রসঙগক্রমে বলতে চাই কেপলারেরও একই সমস্যা ছিল। তিনিও বই লিখে ফেলে রেখে দিয়েছিলেন এবং তাঁর ধর্মভীরু মায়ের মৃত্যুর পরই নিজের বই প্রকাশ করেন।


যাই হোক শেষ পর্যন্ত চার্লস লায়েলের কথাই সত্যি হলো। ১৮৫৮ সালে এই বিষয়ে দাবিদারের আগমন ঘটে যায়। আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস নামে এক স্কুল শিক্ষক যিনি ক্রমবিকাশ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতেন এবং সময়-সুযোগ পেলে এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অভিযানে বেরিয়ে পড়তেন, তিনি নতুন প্রজাতির উদ্ভব নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। ওয়ালেস যখন ইন্দোনেশিয়ার টারনেট দ্বীপে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে বিবর্তনবাদ ও প্রজাতির উৎস নিয়ে ভাবছিলেন তখন তাঁর মাথায় ম্যালথাসের জনসংখ্যাতত্তের উপর ভিত্তি করে বেঁচে থাকার লড়াই ও ক্রমবিকাশের যে ধারনা এসেছিল তার সঙ্গে ডারউইনের ধারণার বিস্ময়কর মিল। আশ্চর্যের বিষয় যে তিনি তাঁর ধারণার কথা লিখে জাহাজযোগে ডারউইনকেই পাঠালেন লেখাটি সংশোধন করে দেবার জন্য। এত লোক থাকতে তিনি ডারউইনকেই কেন পাঠালেন সে এক বিস্ময়।


ওয়ালেসের এই প্রবন্ধটি ডারউইনের কাছে পৌঁছয় ৩ জুন, ১৮৫৮ সাল। ডারউইন এই সময়ে বিবিধ বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ করছিলেন। সেসব লেখায় বিবর্তনবাদের প্রায় কিছুই ছিল না। তাই ওয়ালেসের প্রবন্ধটি পড়ে তাঁর মনের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে, যাকে বলে জোরকা ঝটকা জোরসে লাগার অবস্থা। ডারউইন ভাবলেন এখন যদি নিজের কুড়ি বছর আগের লেখা বই প্রকাশ করেন তাহলে ওয়ালেস হয়ত ভাববেন তাঁর ধারণা চুরি করে তিনি নিজের নাম ফলাতে চাইছেন। এই সংকটের মধ্যে থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন তাঁর নিজের লেখার পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলবেন। কিন্তু বন্ধু-বান্ধবরা তাতে বাঁধ সাধলেন। শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের কথায় তিনি ওয়ালেসের সম্পূর্ণ প্রবন্ধসহ নিজের প্রস্তাবিত বিশাল বইটির সারাংশ পড়ে শোনান লিনিয়ান সোসাইটির সভায়। তারিখটা ছিল ১ জুলাই ১৮৫৮, তাই আসলে এই ১ জুলাই তারিখটিই ক্রমবিকাশতত্ত্বের আত্মপ্রকাশের দিন। যদিও ডারউইনের সম্পূর্ণ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল এর প্রায় ১ বছর ৪ মাস পর। ডারউইনের এই বইটি কিছুদিন আগেও ছিল বাইবেলের পর সর্বাধিক বিক্রিত বই। পরে অবশ্য স্টিফেন হকিঙের 'A Brief History of Time' বইটি এই রেকর্ডকে ভেঙেছে। ডারউইনের এই বইটি বিজ্ঞানজগতে যে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিল তার নজির খুব একটা দেখা যায় না।
 

'The Origin of Species’ প্রকাশের পর

'The Origin of Species'-এ মানুষের উদ্ভব সম্পর্কে প্রায় কিছুই লিখেন নি ডারউইন। সম্ভবত তিনি কিছুটা অনুকূল পরিবেশের প্রতীক্ষায় ছিলেন। তবে এটুকু বলেছিলেন যে শিগগিরই মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে। এটুকু ইঙ্গিতই সম্ভবত যথেষ্ট ছিল। কারণ ধর্মবিশ্বাসী ও আভিজাত্যপ্রেমীরা ইতিমধ্যেই এক দুর্যোগের আশঙ্কা করেছিলেন এবং প্রতিবাদে ময়দানে নামতে শুরু করেন। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রায় আভিজাত্যপ্রেমীদের মনের অবস্থা নিয়ে লেখা লর্ড টেনিসনের একটি কবিতা থেকে কয়েকটি লাইন এখানে তুলে দিচ্ছি।

"A time to sicken and to swoon,

When science reaches forth her arms

To feel from world to world, and charms

Her secrets from the latest moon."

যাই হোক, ডারউইনের পক্ষে তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠা করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল ঠিকই, তবে তিনি যখন এই যাত্রা শুরু করেন তখন পরিস্থিতি অনেকটাই অনুকূলে এসে গিয়েছিল। তাই এই বন্ধুর যাত্রা পথে তাঁর বন্ধুর অভাব হয় নি কখনও। থমাস হাক্সলি, চার্লস লায়েল প্রমুখ বন্ধুরা তাঁর হয়ে লড়াই করে গেছেন বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে। এই হাক্সলিই ১৮৬০ সালের জুন মাসে ব্রিটিশ এসোসিয়েশন ফর দ্য এনভায়রনমেন্ট অব সায়েন্স দ্বারা আয়োজিত এক সভায় বিশপ উইলবারফোর্সকে তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রপের সমুচিত জবাব দিয়েছিলেন।উইলবারফোর্স হাক্সলিকে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি যে উল্লুকের বংশধর তা তিনি তাঁর পিতার সুত্রে হয়েছেন না মাতার সুত্রে। হাক্সলি জবাব দিয়েছিলেন এই বলে যে একজন গুণী ব্যক্তি যার সমাজে যথেষ্ট প্রতিপত্তি আছে এবং তিনি নিজের প্রতিভাকে নিয়োগ করেন বিজ্ঞানের মতো সিরিয়াস বিষয়কে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রপ করার কাজে, এই ধরণের এক ব্যক্তির বংশধর হিসেবে নিজের পরিচয় দেবার চাইতে তিনি বরং উল্লুকের বংশধর হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে বেশি সম্মানিত বোধ করবেন।

ডারউইনের বইটি আদ্যোপান্ত পড়ার পর ঈশ্বরবিশ্বাসী চার্লস লায়েলের মনে যা কিছু ধন্দ ছিল তা দুর হয়ে যায় এবং ডারউইনের মতবাদকে তিনি সম্পূর্ণভাবে মেনে নেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি যে চার্লস লায়েলের ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে কিছুটা সমস্যা ছিল। তিনি বাইবেল নিয়ে সমালোচনা করলেও বাইবেল থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেন নি। না হলে লায়েলই বিবর্তনবাদের আবিষ্কার করতেন। অন্তত বিশেষজ্ঞদের এটাই মত। 'অরিজিন অব স্পিসিস' প্রকাশ হয়ে যাবার পর লায়েল নিজেও কিছুটা গবেষণা করে ১৮৬৩ সালেই প্রকাশ করলেন আরেকটি বই, নাম, 'The Geographical Evidence of the Antiquity of Man' অর্থাৎ 'মানুষের প্রাচীনত্বের ভৌগোলিক প্রমাণ'। বইটির প্রতিপাদ্য বিষয় বাইবেলবিরোধী ও ডারউইনের মতবাদের অনুকূলে। লায়েল তাঁর বইয়ে শুধু যে ডারউইনের তত্ত্বকে মেনে নিয়েছিলেন তাই নয়, তিনি জোরালো যুক্তির প্রয়োগে ডারউইনের তত্ত্বকে আরো আকর্ষণীয় করে তুললেন। ১৮৬৫ সালে নিজের 'ভূবিদ্যার মূলতত্ত্ব' বইটির বড় রকমের সংশোধন করে প্রকাশ করলেন যা ডারউইনের মতবাদকে আরো জোরদার করেছিল।

'দ্য অরিজিন অব স্পিসিস' অথবা 'প্রজাতির উৎস' বইটি প্রকাশিত হওয়ার দু'বছরের মধ্যেই আবিষ্কার হলো আরকিওপটেরিক্সের জীবাশ্ম। যে প্রাণীটি সরীসৃপ ও পাখির একটি মাঝামাঝি স্তর। এছাড়াও এক ফরাসী অভিযাত্রী আফ্রিকার জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে সেখান থেকে নিয়ে এলেন এক গরিলার স্টাফড দেহ। এরকম প্রাণী ইউরোপের মানুষ আগে কখনও দেখেননি। ডারউইনের তত্ত্ব নিয়ে এমনিতেই জোরদার তর্ক-বিতর্ক চলছিল। এই পরিবেশে এমন এক প্রাণী যার সঙ্গে মানুষের যতটা সাদৃশ্য তার চাইতে কম সাদৃশ্য বানরের সঙ্গে। এর মধ্যে কিছু লোক এটাকে ডারউইনপন্থীদের চালবাজি বলে প্রচার চালাতে শুরু করে দেন। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন একটা প্রাণীর দেহ অথচ বিশ্বাস করতে পারছেন না এই প্রাণীটি আছে। তবে এই পরিবেশকে নিজেদের সপক্ষে নিয়ে আসার জন্য ১৮৬৩ সালেই ডারউইনের বন্ধু থমাস হাক্সলি লিখে ফেললেন একটি বই, নাম 'Evidence as to Man's Place in Nature'।বইটির বক্তব্য গরিলা কিংবা শিম্পাঞ্জীর সঙ্গে মানুষের সাদৃশ্য। এছাড়াও ডারউইনের বই ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল। তাই জার্মানি থেকে আর্নেস্ট হাকেল লিখলেন দুটি বই যার বক্তব্য ছিল বিবর্তনবাদের সপক্ষে। ১৮৬৬ ও ১৮৬৮ সালে প্রকাশিত
এই বই দুটি ছিল যথাক্রমে 'General Morphology' ও 'The Natural History of Creation'।

কাজেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিওর সময়ে বিজ্ঞানীরা যেভাবে নিজমত প্রকাশে একাকীত্বের শিকার হয়েছিলেন, ডারউইনের সময়ে পরিস্থিতি ততটা বিরুদ্ধে ছিল না। তবে আজও বিশ্বের অনেক জায়গাতেই চিন্তাবিদদের নিজমত প্রকাশের অনুকূল পরিবেশ নেই। এমন কি আমেরিকার মতো রাষ্ট্রেরও দুটি প্রভিন্সের স্কুলগুলিতে ডারউইনের মতবাদের পরিবর্তে বাইবেলীয় সৃষ্টিতত্ত্বের কথাই পড়ানো হয় মূলত ধর্মীয় কারণে এমন কি ভারতেও মানুষের ধর্মীয় ভাবালুতা ও পশ্চাদপদতা কিছু লোকের অর্থ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক জীবনের উন্নতির সহায়ক। তারাও ডারউইনের তত্ত্ব সম্পর্কে কিছু না জেনেই এর বিরুদ্ধে প্রচার চালান। তবে চার্লস ডারউইনের মতবাদ সমাজে যতটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, এক মার্ক্সবাদ ছাড়া আর কোন মতবাদ এতটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বলে মনে হয় না।

 পর্ব ৭ 

বিবর্তনের ধারায় মানব প্রজাতির উদ্ভব

মানুষ যে বিবর্তনের ধারাতেই পৃথিবীতে এসেছে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না চার্লস ডারউইনের। প্রশ্নটা ছিল গোটা প্রাণিজগতই তো লতায় পাতায় আমাদের আত্মীয়। তবে বিবর্তন যে সরল রেখায় ঘটে নি এটাও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। এক কোষী প্রাণী থেকে বিভিন্ন শাখাপ্রশাখার মধ্য দিয়ে গোটা প্রাণিজগতের সৃষ্টি। তাই এখানে সবার সঙ্গে আত্মীয়তা সত্ত্বেও কিছু প্রজাতি যেমন নিকট আত্মীয় আবার কিছু প্রজাতির সঙ্গে আত্মীয়তা লতাপাতায়। যেমনটা মানব সমাজে হয়ে থাকে তেমনি প্রায় ৩৫০ কোটি বছরের ব্যবধানে এমন হয়েছে যে কিছু আত্মীয়কে আর আত্মীয় বলে পরিচয় দিতেই লজ্জা করে। তবে এদের মধ্যে নিকট আত্মীয়দের খুঁজে দেখতে গেলে খুব বড় মাপের চশমার প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে যেখানে স্তন্যপায়ীদের সঙ্গে আমাদের মিল এতো বেশি। ওদের শিশুরা যেমন স্তন্যপান করে তেমনি আমাদের শিশুরাও করে। ওদের গায়েও আমাদের মতো লোম আছে। বানর, শিম্পাঞ্জী, গরিলা কিংবা ওরাংওটাং-এর হাবভাবের সঙ্গে আমাদের হাবভাবের প্রচুর মিল। আমরা অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় এদের মনের কথা বেশি বুঝতে পারি। ওরাংওটাং-এর মস্তিষ্কের সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের মিল প্রায় খাঁজে খাঁজে। মানুষের জন্য প্রস্তুত অনেক ঔষধ ওদের শরীরে কাজ করে অনুরূপভাবে। এই প্রাণীগুলোর সঙ্গে যখন মানুষের এতটাই মিল তাই এটাই স্বাভাবিকভাবে চিন্তায় আসে যে মানুষের উদ্ভব ঘটেছে এই সব প্রাণী থেকেই।

 

ডারউইনের জীবদ্দশায় মানুষ ও বানর জাতীয় প্রজাতির অন্তর্বতীঁকালীন প্রজাতির জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয় নি। তাই এই যোগসূত্র বের করে ডারউইনকে বিবর্তনের ধারা প্রমাণ করতে গিয়ে অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল। তিনি নানা ধরণের তথ্য সংগ্রহ করে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করলেন তাঁর বিখ্যাত বই 'The Descent of Man, and Selection in Relation to Sex'। তার পরের বছরই তিনি প্রকাশ করলেন আরেকটি বই, 'The Expression of the Emotions in Man and Animals'। এই দুটি বই প্রকাশ করে ডারউইন তাঁর অসমাপ্ত কাজকে সম্পূর্ণ করলেন।

 

বিবর্তনের ধারায় মানুষ যে তার নিকটতম প্রজাতি থেকে বহুদূর এগিয়ে গেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। আর এখানেই গোল বেঁধেছিল ডারউইনবাদকে নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে 'Missing Link' নিয়ে। কারণ মানুষ ও বানর প্রজাতির মধ্যে মধ্যবর্তী স্তর যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ মানুষের উদ্ভব যে বিবর্তনের ধারাতেই হয়েছে এ ব্যাপারে ডারউইন ছিলেন নিশ্চিত। যেহেতু তখনও এই মধ্যবর্তী স্তরগুলোর জীবাশ্ম পাওয়া যায় নি তাই এই যোগসূত্র বের করতে তিনি অবশিষ্ট অঙ্গের (Vestigal Organ) আশ্রয় নিলেন। যেমন আমাদের শরীরে অনেকগুলো অবশিষ্ট অঙ্গ আছে যেগুলো আমাদের আর কোন কাজে লাগে না। এই অঙ্গগুলো হলো আমাদের আগের প্রজাতির কাছ থেকে পাওয়া। আসলে বিবর্তন ঘটে অত্যন্ত ধীর লয়ে এবং লক্ষ লক্ষ বছরে একেকটি অঙ্গ যেমন জন্ম লাভ করে তেমনি বহু প্রজন্ম ধরে নতুন প্রজাতির শরীরে অবশিষ্ট অঙ্গ হিসেবে থেকেও যায়। যেমন আমাদের পাকস্থলীর Appendix যা বর্তমানে আর কোন কাজে আসে না। এই Appendix কথাটার অর্থই হলো পরিশিষ্ট বা অবশিষ্ট। আমাদের শরীর থেকে এটাকে বাদ দিয়ে দিলেও কোন সমস্যা নেই। এরকম আরো বহু প্রত্যঙ্গ আছে আমাদের দেহে যা প্রমাণ করে যে আমরা বিবর্তনের ধারাতেই এই পৃথিবীতে এসেছি। যেমন মেরুদণ্ডের নীচে টেল বোন অথবা coccyx bone যা আসলে ল্যাজ। ছোট হতে হতে সামান্য ঝুলে আছে এখনও অনেকের এই ল্যাজে ব্যথাও হয় যাকে বলে coccygitis অথবা coccydynia। তখন অপারেশন করে এটিকে শরীর থেকে বাদ দিতে হয়। আমাদের গায়ের লোম, ঘ্রাণশক্তি, টনসিল, সাইনাস ইত্যাদি অনেক প্রত্যঙ্গ আমাদের শরীরে আছে যা বেঁচে থাকার জন্য আজ আর কোন কাজে আসে না। এই প্রত্যঙ্গগুলো আমরা পেয়েছি আমাদের আগের প্রজাতির কাছ থেকে। সময়ের ধারায় একদিন এগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই অকেজো অঙ্গগুলোই বিবর্তনের ধারাকে প্রমাণ করে। প্রমাণ করে আমরা কোন বিশেষ প্রজাতি হয়ে আসিনি এই ধরাধামে। বিবর্তনের ধারায় অন্যান্য প্রাণীকুল যেভাবে এসেছে এই বসুন্ধরায়, আমরাও সেভাবেই এসেছি।

 

আমাদের মধ্যে যারা মানুষের অবতারত্বে বিশ্বাস করেন তাদের পক্ষে বিজ্ঞানের এই সত্যকে মেনে নেওয়া সহজ নয়। মানুষের সঙ্গে এই পৃথিবীতে বসবাসকারী তার নিকটতম প্রজাতির ব্যবধান এতটাই হয়ে গেছে যে এটা মানতে কারো কারো পক্ষে কষ্ট হতে পারে যে আমরা আসলে একই ধরণের বস্তু শুধু গুণমানে কিছুটা ভিন্ন। যেমন কুয়াশা ও হিমবাহকে দেখলে বোঝা যায় না যে দুটোই আসলে একই বস্ত দ্বারা সৃষ্ট।

 

বানর জাতীয় প্রজাতি ও মানুষের অন্তর্বর্তী স্তরগুলোর জীবাশ্ম এখন পাওয়া গেলেও ডারউইনের জীবদ্দশায় তা পাওয়া যায় নি। তাছাড়া ইউরোপে যে সমস্ত জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল সেগুলো ততটা স্পষ্ট নয়। তাই এই বিচ্ছিন্ন যোগসূত্র বা মিসিং লিঙ্ক নিয়ে ইউরোপীয়রা উত্যক্ত করত ডারউইনকে। অবশ্য উত্যক্ত করারই কথা, কারণ বিজ্ঞান যদি প্রমাণ দিতে না পারে তাহলে তা ধোপে টেকে না। বিজ্ঞান কোন ধর্মগ্রন্থ নয় যে যা লেখা আছে সব ঠিক বলে শুধুমাত্র প্রচারের জোরে চালাতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে যে মানল না তার গর্দান নিতে হবে। বিজ্ঞান হলো সভ্যতার মাপকাঠি যা মানুষের অগ্রগামীতাকে নির্দেশ করে। মানুষ হিসেবে আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার এই বিজ্ঞানের দায়িত্বও তাই অনেক বেশি। যাই হোক ডারউইনের জীবদ্দশায় না হলেও পরবর্তীকালে এই মধ্যবর্তী স্তরগুলোর জীবাশ্ম পাওয়া গেল আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ায়। মানুষের প্রাচীনতম জীবাশ্ম যা পাওয়া গেছে তা প্রায় ১ কোটি ৮৪ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৪০ লক্ষ বছর অতীতের। এই যুগের নাম দেওয়া হয় মাইওসিন যুগ। এর আগে ছিল অলিগোসিন যুগ। এই মাইওসিন যুগেই মানুষের আদিমতম প্রজাতি শিবাপিথেকাস (Sivapithecus) ও রামাপিথেকাস (Ramapithecus)- এর সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো মানুষের দেওয়া নাম, এর সঙ্গে শিব ও রামের কোন সম্পর্ক নেই। আসলে গ্রিক ভাষায় Pithecus শব্দের অর্থ হলো Ape অর্থাৎ ল্যাজবিহীন বানর জাতীয় প্রাণী। এই দুটি প্রজাতিই এখন বিলুপ্ত, তবে এদের মধ্য থেকে শিম্পাঞ্জি ও গরিলার উদ্ভব হয়েছিল আনুমানিক ষাট লক্ষ থেকে এক কোটি বছর আগে। এই পিথেকাসরা ছিল হোমিনয়েড গোত্রের আদি রূপ। পরবর্তীকালে মাইওসিন যুগের শেষের দিকে অস্ট্রেলোপিথেকাস (Australopithecus) গণ বা Genus এর উদ্ভব হয়। এই গোত্রের জীবাশ্ম যেহেতু শুধুমাত্র আফ্রিকাতেই পাওয়া গেছে তাই ওরকম নাম দেওয়া হয়েছে। কারণ Austral শব্দের অর্থ হলো দক্ষিণ। যেমন দক্ষিণের মহাদেশ হলো 'Australia'।

দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া ও তানজানিয়ায় আরো কিছু গণের সন্ধান পাওয়া শেছে। এদেরই কোন একটি থেকে Homo জাতীয় গণের উদ্ভব যা প্রথমে Homo Habilis-এ রূপ নিয়েছে। এই ধারায় বিবর্তিত হতে হতে আজকের বুদ্ধিমান মানুষের উদ্ভব হয়েছে যাদের বলা হয় Homo Sapiens। পৃথিবীর সমস্ত মানুষই এই একই প্রজাতির। অন্যান্য প্রাণীকুলের অনেকগুলো করে প্রজাতি থাকলেও মানুষের অন্যান্য প্রজাতিগুলি বিলুপ্ত হতে হতে এই একটি মাত্র প্রজাতি রয়ে গেছে এই বিশ্বজুড়ে। অর্থাৎ "জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে সে জাতির নাম মানুষ জাতি"। যারা মিসিং লিঙ্ক নিয়ে এখনও ভাবেন তাদের জ্ঞাতার্থে এটুকু বলতে পারি যে আজ আর বিজ্ঞানীমহলে মিসিং লিঙ্ক নিয়ে কোন ভাবনা নেই কারণ মধ্যবর্তী স্তরগুলোর সন্ধান পাওয়া গেছে। আমি এখানে যা বললাম তা যথেষ্ট নয় কারণ এই মধ্যবর্তী স্তর নিয়ে বিস্তর তথ্য পাওয়া গেছে যা নিয়ে আলোচনা করার মতো পরিসর এখানে নেই এবং আমার সেই ক্ষমতাও নেই। তবে বানর প্রজাতি থেকে শাখা-প্রশাখায় মানুষের উদ্ভব ঘটলেও অতীতের সব প্রজাতিই এই ধরাধাম থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় নি। তবে তাদের সংখ্যা যে ভাবে কমছে তাতে মানুষের সহযোগিতা ছাড়া বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব বর্তমানে আমাদেরই উপর ন্যস্ত। অন্যথায় অতীতের অসংখ্য প্রজাতির মতো এদেরও বিলুপ্তি ঘটে যেতে পারে।


পশুদের বুদ্ধিবৃত্তি


একথা সত্য যে বিজ্ঞান মানুষকে স্বর্গলোক থেকে নামিয়ে এনে মর্তভূমিতে ঠাঁই দিয়েছে। মানুষের অহংকারকে চূর্ণ করে তাকে তার সঠিক আসনে বসিয়ে দিয়েছে। তবে আজ পেছন ফিরে মানুষের মিথ্যা অহংকারের দিকে তাকালে শরীরে শিহরণ জাগে। যেমন খ্রিস্টের জন্মের আগে গ্রিক দার্শনিক ক্রাইসিপ্নাসের মন্তব্য, "বাগানে ময়ূর কেন?" কারণ ঈশ্বর সৌন্দর্য ভালবাসেন তাই মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য তিনি ময়ূরের পাখা সৃষ্টি করেছেন। পাখিটি যাতে সুন্দর পাখা নিয়ে আমাদের সামনে চলাফেরা করতে পারে তাই ময়ুরের সৃষ্টি। তা পাঁঠা কেন? কারণ মানুষ মাংস খেতে ভালবাসে তাই ঈশ্বর মানুষের খাদ্য হিসেবে পাঁঠা বানিয়েছেন? তবে কু-তার্কিকের অভাব তো কোন কালেই ছিল না তাই প্রশ্ন "তা ছারপোকা কেন?" উত্তর "ও, ছারপোকা? ঈশ্বর ছারপোকা বানিয়েছেন আমাদের ঘুম ভাঙানোর জন্য। কারণ ছারপোকা না থাকলে যে আমরা সময় মতো ঘুম থেকে উঠতে পারব না।" অর্থাৎ ঈশ্বর এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁর সন্তান মানুষের জন্য, যে মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর নিজের অবয়ব অনুযায়ী। এই জন্যই গোটা বিশ্ব এই পৃথিবীর চারপাশে আবর্তমান কারণ এই পৃথিবীতে থাকেন ঈশ্বরের সন্তানরা। এভাবেই ধার্মিক ও দার্শনিকরা এক সময়ে মানুষকে তার অহংকারের চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছিলেন সেখান থেকে যাকে বলে 'কাট টু সাইজ' করে মানুষের সঠিক অবস্থান নিরূপণে কোপার্নিকাস থেকে যে ধারা প্রবাহিত হয়ে আসছিল তারই চরম পরিণতি হলো চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ। যে মতবাদ এক দিকে আভিজাত্যের অহংকারকে চূর্ণ করে দিলেও মানুষকে দিয়েছে ৩৫০ কোটি বছরের বিবর্তনের সম্মান। অর্থাৎ এই প্রকৃতি সামান্য ডিএনএ থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে এত দীর্ঘ সময় নিয়েছে। তাকে দিয়েছে প্রাণিজগতে শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান এবং একই সঙ্গে গড়ে তুলেছে এক গভীর আত্মীয়তা।


অতীত যুগের অনেক ইউরোপীয় দার্শনিকরা মানুষ ভিন্ন অন্যান্য প্রাণীদের প্রতি ততটা সহানুভূতিশীল ছিলেন না। তেমনি আধুনিক দর্শনের জনক দেকার্তে মন ও বস্তুর মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে পারেন নি। তাঁর মতে মন ও বস্তুর মধ্যে আছে সমান্তরাল অবস্থান। তবে এটুকু বলেই তিনি যে ক্ষান্ত হয়েছিলেন তা নয়। তিনি আরো বলেন যে মানুষ ও প্রাণীদের মধ্যে তফাৎটা হলো মানুষের দেহ ও মন দুটোই আছে যেখানে অন্যান্য প্রাণীদের শুধু দেহই আছে মন নেই। তাই নিষ্প্রাণ বস্তুর প্রতি আমাদের মমত্ব যেমন অর্থহীন, তেমনি অন্যান্য প্রাণীদের প্রতি মমত্বও তাই। দেকার্তে সহ আরো কিছু দার্শনিকদের এইরূপ চিন্তাধারা ইউরোপে পশুপ্রেমী সংগঠনের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে পড়েছিল। এই বাঁধা দূর করতে ডারউইনের বিবর্তনবাদ বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। পশুদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠায় পশুশ্রম কিংবা পশুনির্যাতনের প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতা বাড়তে থাকে যার ফলে গড়ে উঠে বিভিন্ন পশুপ্রেমী সংগঠন।

 

বিজ্ঞানীরা একটি মাছের উপর গবেষণা করে দেখেছেন যে মাছেরও স্মৃতিশক্তি আছে এবং চার সংখ্যা পর্যন্ত গুণতেও পারে। মাছ তো হলো মেরুদণ্ডী প্রাণী যা বিবর্তনের ধারায় অনেকটা এগিয়ে গিয়েই এসেছে এই পৃথিবীতে। ফলমূলের উপর বেড়ায় এক ধরণের ফলভুক কীট যাদের বলা হয় 'ফ্রুট ফ্লাই'। গ্রিনস্প্যান নামে একজন বিজ্ঞানী প্রমাণ করেছেন যে এই ফ্রুট ফ্লাইরাও ঘুমোয়। শুধু তাই নয় এককোষী জীব প্রটোজোয়ারাও ঘুমোয়। একদল চিত্তাবিদের ধারণা ছিল যে 'ভাষা' জিনিসটা কেবল মানুষেরই আছে, অন্য প্রাণীদের নেই। তাদের ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে অন্য প্রাণীরাও অঙ্গভঙ্গি, স্বরনিক্ষেপণ ইত্যাদি দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। ডলফিন তো নিজেদের একটা করে নামও দেয় এবং সে নিজে এ নামেই পরিচিত হয় ডলফিন সমাজে। মার্কিন বিজ্ঞানী হারবার্ট টেরেস এক শিম্পাঞ্জির উপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে শিম্পাঞ্জির শাবককে মানুষের পরিবারে বড় করলে সে মানুষের মতো অনেক কিছুই করতে পারে। 'নিম চিমপস্কি' নামের শিম্পাঞ্জিটি ১২৪টি শব্দের অর্থ বুঝতে পারতো। তাই পশু মানেই অনুভূতিহীন গবেট ভাবার প্রয়োজন নেই। নির্যাতনে মানুষের যেমন কষ্ট হয় তেমনি পশুদেরও কষ্ট হয়। তবে মোটর আবিষ্কার হওয়ার ফলে পৃথিবীতে পশুর উপর নির্যাতন অনেকটা কমেছে ঠিকই কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে অন্য অনেক দিক দিয়েই পশু নির্যাতন বেড়েছে বৈ কমে নি। যার ফলে পশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনও বেড়েছে ততধিক হারে। আগামী পর্বে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

 ক্রমশঃ