বিজ্ঞান বিষয়ক / Science Forum

গাছ তুমি ভালো আছো?

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

গোবিন্দ ভট্টাচার্য, সেন্টার ফর মাল্টিলেভেল ফেডারেলিজম, নতুন দিল্লী

লজ্জাবতী লতা মনে আছে? বৈজ্ঞানিক নাম Mimosa pudica. আমাদের ছোটবেলায় খুব দেখা যেত, আর যেখানেই দেখতুম হাত দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতুম । লজ্জাবনতা  লজ্জাবতীকে একটু অচেনা পরিবেশে দেখা গিয়েছিল  1901 সালের 10 মের সন্ধ্যায়। লন্ডনের রয়েল ইনস্টিটিউশনে জগদীশচন্দ্র বসু সেদিন সমবেত বিদ্বৎজনের কাছে প্রমাণ করেছিলেন যে মানুষের বা অন্যান্য প্রাণীদের মত  গাছেরও প্রাণ আছে, অনুভূতি আছে,  ভয় আছে, আনন্দ আছে।  লজ্জাবতী সেসব দেখাতে কিন্তু একটুও  লজ্জা পায় নি। নাক উঁচু সাহেবরা অবশ্য অত সহজে পরাধীন দেশের বিজ্ঞানীর কথা মেনে নেয় নি , তাই পরের মাসে  যখন রয়াল সোসাইটিতে জগদীশচন্দ্র সেই বিষয়টাই আবার ব্যাখ্যা করেন তখন দুজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী তাঁর প্রচন্ড বিরোধিতা করেন । ফলে রয়াল সোসাইটি তাঁর সেই গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছিল।


গাছের প্রাণ আছে এটা প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না - একটা শিশুও তা জানে । কিন্তু অনুভূতির ব্যাপারটা একটু জটিল। কোনো কোনো গাছের - যেমন ভেনাস ফ্লাই ট্র্যাপ বলে একটি মাংসাশী গাছ রয়েছে, কোনো মাছি  তার পাতায়, যা আসলে একটি মৃত্যুফাঁদ, বসলেই গাছটি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরে  যায়,  আর মাছিটাকে নিয়ে তার ট্র্যাপ বন্ধ হতে মাত্র আধা সেকেন্ড সময় লাগে। লজ্জাবতীর কথা আমরা সবাই জানি। সূর্যমুখী সূর্য্যকে অনুসরণ করতে থাকে, বনচাঁড়াল বা নাগেশ্বরের পাতা অতি দ্রুত কাঁপতে পারে। সেগুলোকে গাছের অনুভূতি বলা যায় কি না সেটা  নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ভিন্ন  মতামত  রয়েছে । অনেকে বলেন সেগুলি গাছেদের জীবনধারণের অত্যাবশক উপাদান, যেমন আলোর, খাদ্যের বা নিজেকে রক্ষা করার জন্যে - তাদের লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের আশীর্বাদ। গবেষণায় দেখা গেছে যে কিছু গাছপালা সেলুলার স্তরে যান্ত্রিক উদ্দীপনাগুলো বুঝতে পারে  এবং তাতে তাদের রিঅ্যাকশনও মাপা যায়। ব্যাথার বা অন্যান্য অনুভূতির জন্যে প্রয়োজনীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং মস্তিষ্ক। কিন্তু যেহেতু উদ্ভিদের ব্যথা রিসেপ্টর, স্নায়ু বা মস্তিষ্ক নেই, তাই  আমরা অর্থাৎ সচল প্রাণীরা যে ভাবে ব্যথা অনুভব করি, তাদের সেরকম ব্যাথার যে  কোনো অনুভূতি নেই এটা স্পষ্ট। অতএব নিশ্চন্ত থাকত পারেন যে একটা গাজর গাছ উপড়ে ফেললে বা গাছ থেকে পাকা টম্যাটো পেড়ে নিলে সেটা ঠিক বোটানিক্যাল নির্যাতনের আওতায় আসবে না। আরেকটি প্রশ্ন হলো যে উদ্ভিদের কাছে ব্যথার কি কোনো উপযোগিতা  আছে -  তারা  তো অনড় অচল। ব্যাথার কাছ থেকে পালাবার তাদের কোন উপায় নেই।  যে অনুভূতি বেঁচে থাকতে বা বংশবৃদ্ধি করতে কোন সাহায্য করবে না, বিবর্তন কেনই  বা তা গাছকে দিতে যাবে ?


সেটা বোধহয় 1973 সাল । তখন  সবেমাত্র স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছি । গাছে চড়া ছাড়া গাছ সম্বন্ধে আর কিছই জানি না। একদিন কলেজ লাইব্রেরীতে হটাৎ একটি বই হাতে এলো  - “সিক্রেট লাইফ অফ প্লান্টস”  - পিটার টম্পকিনস এবং ক্রিস্টোফার বার্ড নামে  দুজন সাংবাদিকের লেখা - কেউই কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞানী নন। বইটি বহুদিন নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার ছিল । এত আশ্চর্য্য তথ্যে ভরা এবং এতই আকর্ষক যে মনে  আছে রাত্রে ঘুমোতে পারি নি  - সম্মোহিতের মত পাতার  পর  পাতা  উল্টে  গেছি । কী নেই  তাতে -  মানুষের সাথে যোগাযোগে উদ্ভিদের অপরিসীম দক্ষতা, রেকর্ডে গান শুনে তাদের আশ্চর্যজনক প্রতিক্রিয়া, তাদের সৃজনশীল ক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা,  এমনকি জাপানী বর্ণমালা শুনে তা সাথে সাথে পুনরাবৃত্তি করতে সক্ষম হওয়া মায় বহির্বিশ্ব থেকে আগত সিগন্যাল পর্য্যন্ত ঠিক ঠিক বোঝার  ক্ষমতা - একটা কিশোরকে অনেকদিন সম্মোহিত করে  রাখার জন্যে যথেষ্ট। গাছেরা নাকি সত্যি মিথ্যের প্রভেদও বুঝতে পারে,  যা প্রমাণ (?)  করা হয়েছিল একটা পলিগ্রাফ বা লাই-ডিটেক্টর মেশিনের সাহায্যে। পরে বইটি নিয়ে একটি ডকুমেন্টারিও তৈরী হয়েছিল, হয়তো ইউটিউব খুঁজলে এখনো পেতে পারেন।

 
বেশ কিছুদিন লেগেছিল এটা বুঝতে যে এগুলো কোন বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যই  নয় - কবিগুরুর সেই কবিতার মত, "টিকিটা যে রাখা ওতে আছে ঢাকা ম্যাগ্নেটিজম শক্তি / তিলক রেখায়  বিদ্যুৎ ধায় তাই জেগে ওঠে ভক্তি।" শুধু লাগামহীন কল্পনা নিয়ে দায়িত্বহীন লেখনীর অবাধ বিচরণ। বিজ্ঞানের মুখোশের আড়ালে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং অলীক মতামত  প্রচার করার জন্য পরে বইটির তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। তবে ততদিনে লেখক দুজন রীতিমত বড়োলোক হয়ে গেছেন, সিউডোসায়েন্সের দাক্ষিণ্যে। না, মিথ্যের বেসাতি করার জন্যে তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়েছিল বলে জানিনা। আমাকে নিয়েও পরে অনেকে হাসাহাসি করেছিল - সঙ্গত কারণেই । তবে সেই থেকে আমি এই ধরণের বইয়ের ব্যাপারে খুবই সাবধান হয়ে যাই। তাই 2016 সালে যখন পিটার ওল্লেবেন নামে এক জার্মান বনরক্ষক (Forester) “দ্য হিডেন লাইফ অফ ট্রীস” বলে একটি বই লেখেন, আমার তাতে কোনোই উৎসাহ ছিল না । বইটি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বহূল প্রসংশিত হওয়ার পরেও নয় । ন্যাড়া কি আর সাধ করে দু’বার বেলতলায় যায় ? কিন্তু দু বছর পরে - ততদিনে বইটির 8 লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে এবং 11 টি দেশে বেস্টসেলার লিস্টে নাম উঠে গেছে - আমেরিকার বিখ্যাত স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিটের ম্যাগাজিনে একটি প্রবন্ধ পড়ার সুযোগ হয় -"ডু ট্রীস টক টু ইচ আদার ?" সেটা পড়ার পরে বইটি কিনতেই হয়েছিল। উল্লেবেনের বই তাঁর স্বদেশ  জার্মানী আর বেলজিয়ামের সীমান্তে আইফেল পর্বতের কোলে হুম্মেল গ্রামের সাথে আছে যে বন, তারই মধ্যেকার বীচ, ওক, এলম ইত্যাদি গাছের ওপর দুই দশকেরও বেশী সময়কাল নিয়ে পর্যবেক্ষণ  ও পরীক্ষা নিরীক্ষার ফল। এবারের আলেখ্য সেই বিষয়টা নিয়েই ।


***
“অব্যক্ত” রচনাবলীতে জগদীশচন্দ্র লিখেছিলেন, "এই যে গাছগুলি কোনো কথা বলে না, ইহাদের যে আবার একটা জীবন আছে, আমাদের মত আহার করে, দিন দিন বাড়ে, আগে এ সব কিছুই জানিতাম না । … এখন ইহাদের মধ্যেও আমাদের মত অভাব, দুঃখ-কষ্ট দেখিতে পাই ।..... বৃক্ষদের মধ্যে একে অন্যকে সাহায্য করিতে দেখা যায়, ইহাদের মধ্যে একের সহিত অপরের বন্ধুতা হয় । তারপর মানুষের সর্বোচ্চ গুণ যে স্বার্থত্যাগ, গাছে তাহাও দেখা যায় । ..... গাছের জীবন মানুষের জীবনের ছায়ামাত্র।" আমরা মানুষেরা একাকীত্ব সাধারণত ভালোবাসি না। অনেক গাছেদেরও তা একেবারেই ভালো লাগে না।


উত্তর ভারতের প্রায় সর্বত্র শাল গাছ দেখা যায়, কিন্ত কখনো কোথাও কোন পার্কে বা রাস্তার পাশে, কোন গ্রামের চৌমাথায় একটামাত্র শাল গাছ দেখেছেন বলে মনে পড়ে? অথবা শুধুমাত্র কয়েকটি গাছ দিয়ে সাজানো কোনো শালবীথি? সম্ভবতঃ নয়। রেল  ট্রাকের স্লিপার বানাতে শাল কাঠ লাগত,  তাই  স্বাধীনতার  পরে বনবিভাগ অনেক চেষ্টা করেছিলেন যদি উত্তর ভারতের বাইরেও অন্যান্য জায়গায় শাল অরণ্য সৃষ্টি  করা যায়। কিন্তু সেসব কোন চেষ্টাই সফল হয় নি । মিনারেল, মাটি,  মোয়েশ্চার, বায়োকেমিস্ট্রি,  পি এইচ (pH) -  কোনো কিছু দিয়েই এই অসফলতা ব্যাখ্যা করা যায় নি । 1980 সালে দেরাদুনের কাছে চন্দ্রবনিতে যখন Wildlife Institute of India গড়া হয়েছিল,  তখন এর মূল ভবনটি বানাতে অনেক গাছ কেটে ফেলতে হয়েছিল -আর সেগুলো সব ছিল শাল গাছ। আশ্চর্জনকভাবে দেখা গেল যে গাছ কাটার ফলে বিচ্ছিন্ন এবং ‘একাকী’হয়ে যাওয়া গাছগুলি একে একে মারা যেতে শুরু করেছে। গ্রূপের বাকী গাছগুলোর সাথে তাদের যে যোগাযোগ হারিয়েছে, তা তারা বুঝলো কিভাবে?  গাছের তো চোখ নেই! ব্রিটিশ ফরেস্টররাও অনেক আগে লক্ষ্য করেছিলেন যে শালগাছ সব সময় বড় গ্রূপে বাড়ে, এককভাবে রোপণ করা হলে তারা বাঁচে না। শাল গাছের মধ্যে 'একাকীত্বের' প্রতি এই একান্ত এবং আশ্চৰ্য অনীহা তারা অবশ্য ব্যাখ্যা করতে পারেন নি । এরকম নিদর্শন প্রকৃতিতে আরো অনেক রয়েছে । উল্লেবেনের বই থেকে এই ধাঁধার কিছুটা জবাব পাওয়া যায় । গাছেদের মধ্যে একটি প্রধান যোগসূত্র হলো শেকড়। হয়ত পুরো অরণ্যটাই একসূত্রে বাঁধা সহস্র বৃক্ষের সমষ্টিগত জীবনের এক বিশাল অবয়ব। গাছেদের কমিউনিস্ট সোসাইটি ।


কখনো কোনো ঢালু জায়গায়, যেমন পাহাড়ের ঢালে, বাড়তে থাকা বৃক্ষরাজির পাদদেশ লক্ষ্য করে থাকলে হয়তো দেখেছেন যে বৃষ্টিতে মাটি ধুয়ে গিয়ে মাটির নীচের শেকড়ের নেটওর্য়াক উন্মুক্ত হয়ে গেছে। আবার যখন দেখার সুযোগ পাবেন, একটু ভালোভাবে খেয়াল করে দেখবেন কীভাবে তাদের শেকড়গুলো  অঙ্গাঙ্গীভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকে, যাতে করে আলাদা করে কোনো গাছের শেকড় চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। গাছেদের নিজস্ব  ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক, তাদের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার  মাধ্যম। বিশেষ করে একই প্রজাতির গাছগুলো তাদের শেকড় সিস্টেমের মাধ্যমে একে অপরের সাথে সংপৃক্ত থাকে - অনেকটা পিঁপড়েদের এক বিশাল কলোনীর মত। যদিও একই অরণ্যে বিভন্ন প্রজাতির গাছপালা থাকে, কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেছে যে এক প্রজাতির গাছ একই অরণ্যে অন্তর্ভুক্ত অন্য প্রজাতির শিকড় থেকে তাদের নিজস্ব শিকড়কে পুরোপুরি আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে। কিন্তু সবাই মিলে একসাথে তারা একটি পরিবেশ ব্যবস্থা তৈরি করে যা তাপ এবং শীতকে সম্যকভাবে নিয়ন্ত্রণ, জল সঞ্চয় এবং তাদের জন্যে  প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা সৃষ্টি করতে সক্ষম। বলতে পারেন  গাছেদের নিজস্ব স্যোশাল নেটওয়ার্ক। এই সংপৃক্ত শেকড় ব্যবস্থারই মধ্যে দিয়ে হয়ে থাকে তাদের মধ্যে সংবাদ আদান প্রদান, নিউট্রিয়েন্টসের বিনিময় এবং প্রয়োজনের সময়ে প্রতিবেশীদের সহায়তা করা। সহায়তা করাটাই কিন্তু নিয়ম এবং এই নিয়মের ব্যতিক্রম সাধারণতঃ দেখা যায় না। পুরো অরণ্যটাই সেই অর্থে যেন এক সুপার-অর্গানিজম, একই ব্যবস্থায় একযোগে নিয়ন্ত্রিত। শেকড়ের মধ্যে দিয়ে যোগাযোগের এক বাহক হল বৈদ্যতিক তরঙ্গ বা ইম্পালস, আমাদের মস্তিষ্কের  নিউরোনগুলোর মধ্যে বৈদ্যুতিক ইম্পালসের মাধ্যমে যেভাবে সংবাদের আদান - প্রদান হয়ে থাকে,  অনেকটা  তারই মত। তাছাড়া আছে  শব্দতরঙ্গ, স্বাদ এবং গন্ধও -এদের মাধ্যমেও গাছেরা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে। ডালপালা আর শেকড়ের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যোগাযোগ করার জন্য গাছগুলি রাসায়নিক, হরমোনাল এবংবৈদ্যুতিক সংকেত প্রেরণ করে।

 
গাছের শিকড় দিয়ে যে বৈদ্যুতিক আবেগগুলো যাতায়াত করে, তাদের গতিবেগ অত্যন্ত কম - প্রতি সেকেন্ডে মাত্র এক ইঞ্চির  এক তৃতীয়াংশ বেগে তারা চলাচল  করে, আমাদের মত মিলিসেকেন্ডে নয়। পৃথিবীতে গাছের উদ্ভব হয়েছে আমাদের চেয়ে লক্ষ কোটি বছর আগে। তাই তাদের টাইমস্কেল আমাদের চেয়ে আলাদা।পৃথিবীর প্রাচীনতম গাছগুলির মধ্যে একটি হল সুইডেনের একটি  spruce গাছ, তার বয়স সাড়ে ন’হাজার বছর। এত দীর্ঘ জীবনকাল যখন, তখন আশা করা অন্যায় যে আমাদের মত গাছেরাও জীবনধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় সবকিছু কাজ তড়িঘড়ি করে করার জন্যে ব্যস্ত থাকবে। গাছেদের জীবন ধীর গতির হলেও কিন্ত নিস্তেজ কখনোই নয়। সুইজারল্যান্ডের লসান ইউনিভার্সিটির বৈজ্ঞানিক এডওয়ার্ড ফার্মার গাছের মধ্যে বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ-ভিত্তিক একটি সিগন্যালিং সিস্টেম শনাক্ত করেছেন,  প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্রের সাথে যার  অনেক মিল রয়েছে। অবশ্য তার মানে এটা নয় যে উদ্ভিদেরও প্রাণীদের মত মস্তিস্ক বা নিউরন আছে ।

 
বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ছাড়াও গাছেদের যোগাযোগের আরেক মাধ্যম হল শব্দতরঙ্গ। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ইউনিভার্সিটির মনিকা গাগালিয়ানো যন্ত্র দিয়ে মেপে দেখিয়েছেন যে কিছু গাছপালা তাদের শেকড়ের মধ্যে দিয়ে যোগাযোগের জন্যে শব্দতরঙ্গের যে ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে, সেটি প্রধানতঃ 220 হার্টজ। আমরাও তো যোগাযোগের জন্যে শব্দ ব্যবহার করি, পাখিরা এবং প্রাণীরাও তাই করে থাকে । হয়তো এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পুরোটাই এক অখন্ড অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিকতায় একসূত্রে গাঁথা।


***
বিদ্যুৎ আর শব্দতরঙ্গের কথা বলেছি,  এবারে আসা যাক গন্ধ ও স্বাদের কথায়। গাছ বিভিন্ন ফেরোমোনস এবং অন্যান্য ঘ্রাণ সংকেত তৈরী করে বাতাসের মাধ্যমে সেগুলো বিনিময় করে। সাব-সাহারান আফ্রিকার উত্তপ্ত শুষ্ক সাভান্নাতে এক রকমের কাঁটাযুক্ত বাবলা গাছ (acacia) দেখা যায় যা জিরাফদের প্রিয় খাদ্য। কিন্ত কোন গাছই শুধু পরোপকারার্থ বহূজনহিতায় বহূজনসুখায় জন্ম নেয় নি। জিরাফের জন্যে আত্মাহুতি দেওয়া বাবলা গাছের জীবনের  উদ্দেশ্য হতে পারে না। তাই যখনই কোন জিরাফ বাবলা পাতা চিবোতে শুরু করে, গাছটি সঙ্গে সঙ্গে ইথিলিন গ্যাস ছাড়তে শুরু করে দেয়। ইথিলিনের গন্ধ বাতাসের মধ্যে দিয়ে প্রতিবেশী গাছগুলোর কাছে বিপদের সংকেত নিয়ে আসে,  তারা সাথে সাথে তাদের পাতায় ট্যানিন পাম্প করতে শুরু করে। ট্যানিন এক ধরণের এলকালয়েড - এদের স্বাদ তেতো। বাবলাগাছের পাতার ট্যানিন বেশ বিষাক্তও, এই যৌগগুলি জিরাফের মত বড় প্রাণীদেরও অসুস্থ করে দেবার এমনকি মেরে ফেলারও ক্ষমতা রাখে। জিরাফরাও  কিন্ত এ বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন, তারাও জানে যে গাছগুলো একে অপরের সাথে কথা বলছে। বাতাসে ইথিলিনের গন্ধের আভাস পেলেই তাই  তারা সাথে সাথে স্থান পরিবর্তন করে, কিন্ত সতর্কতা হিসেবে পাতা খাওয়ার জন্যে কাছের গাছগুলোতে কক্ষনো যায় না । যদি বাতাস না থাকে, তবে জিরাফরা অন্ততঃ 100 গজ দূরের একটি বাবলা গাছ বেছে নেয়, কারণ স্থির বাতাসে ইথিলিন গ্যাসের ততদূর পৌঁছাতে সাধারণতঃ আরো বেশি সময় লাগে।


গাছেরা যেমন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্যে গন্ধের ব্যবহার  জানে, তেমনি তারা স্বাদেরও ব্যবহার করতে জানে। বিভিন্ন যৌগ উৎপাদন করার ক্ষমতা হ'ল গাছেদের  আরেকটি বৈশিষ্ট্য যা তাদেরকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে সহায়তা করে। প্রতিটি পোকামাকড়ের প্রজাতির লালার স্বাদ পৃথক এবং গাছ তা জানে। কোন ডেটাবেসে কোথায় সেসব তথ্য রাখা আছে আমরা এখনো জানি না, কিন্তু লালার স্বাদ থেকে গাছ তার আক্রমণকারীকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে। তারপর গাছের কাজ হল একটি বিশেষ রাসায়নিক যৌগ বা ফেরোমোন তৈরি করা যা সেই বিশেষ কীট বা পতঙ্গের শিকারীদের কাছে গন্ধের মাধ্যমে সঙ্কেত পাঠিয়ে তাদের ডেকে এনে প্যারাসাইটদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করে। কখনো  কখনো তাদের  প্রতিশোধ কিন্তু আরো ভয়ঙ্কর হতে পারে। যখন  শুঁয়োপোকারা এলম অথবা পাইন গাছের পাতা খেতে শুরু করে, তখন নিজেদেরকে রক্ষা  করার  জন্যে গাছেরা শুঁয়োপোকার লালা সনাক্ত করে একটি বিশেষ ফেরোমোনকে নিষ্কৃত করে যা পরজীবী একটি পতঙ্গকে আকর্ষণ করে আনে। সেই পতঙ্গ আবার আবার ডিম পাড়ে  শুঁয়োপোকার শরীরের ভিতরে এবং তাদের লার্ভা ভিতরে থেকে শুঁয়োপোকাকে খেতে থাকে। শুঁয়োপোকার জন্যে মোটেই খুব সুখকর অভিজ্ঞতা নয়। কিন্তু এর থেকে এটা বোঝা যায় যে মস্তিস্ক না থাকলেও গাছেদের স্মৃতিশক্তি রয়েছে এবং তা খুব  অনুন্নত নয়। হয়ত ভবিষ্যতে আমরা এ বিষয়ে আরো অনেক কিছু জানতে পারব।


লেপজিগ বিশ্ববিদ্যালয় এবং German Centre for Integrative Biodiversity Research-এর এক সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে যে শুধু কীটপতঙ্গেরই নয়, গাছেরা বড় বড় প্রাণী যেমন  হরিণের লালার স্বাদও  জানে। হরিণ যখন গাছের পাতা খেতে থাকে, তখন তার পাতাগুলোকে বিস্বাদ বানাতে গাছ একটি বিশেষ রাসায়নিক  যৌগকে সেই পাতাদের মধ্যে পাঠিয়ে দেয়, হরিণ তখন বাধ্য হয় তার ভোজন বন্ধ করতে। আবার যখন মানুষ বা অন্য প্রাণী তার ডাল ভাঙে, গাছ তখন তার ক্ষত নিরাময়ের জন্য অন্য যৌগ সেখানে নিয়ে আসে। ঠিক যেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার - রোগ বুঝে যথাযোগ্য দাওয়াই।


আগেই বলেছি যে অরণ্য একটি সমষ্টিগত অখণ্ড সত্তার মত। প্রতিটি গাছই পুরো অরণ্যের কাছে অপরিহার্য, কারণ একটা গাছও যদি মরে যায় তাহলে সম্মিলিত গাছগুলোর ঘনসন্বদ্ধ ছাউনিতে ব্যবধান সৃষ্টি হবে, আর সেই ফাঁক দিয়ে বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে গ্রীষ্মের প্রখর উত্তাপ এবং বর্ষার প্রবল ঝড়, যা সমষ্টিগত ভাবে  অরণ্যের আর তার প্রতিটি গাছের পক্ষেই ক্ষতিকর। কাজেই সম্প্রদায়ের সামাজিক দায়িত্ব হল প্রতিটি গাছকে বাঁচিয়ে রাখা, কোনো গাছ  অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে পুষ্টি সরবরাহ করা, তার যত্ন নেওয়া, সাহস জোগানো। দেখা গেছে কখনো কখনো কোনো গাছ মরে যাবার পরও বহুবছর ধরে অন্য গাছেরা তার মরে যাওয়া শেকড়কে শর্করা এবং অন্যান্য নিউট্রিয়েন্টস নিয়মিত সরবরাহ করে চলেছে, মায়ের যত্নে বেঁচে ওঠার রসদ জোগাতে। গাছ মরে গেছে কিন্তু তার শেকড় জীবিত রয়েছে। আবার গাছে  গাছে  সখ্যতাও  হয়, তখন তাদের শেকড়গুলো এতই ওতপ্রোত থাকে যে দুজন একই সঙ্গে মারা যায়। ঠিক যেন এক দুজে কে লিয়ের মতন। বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই তো? গাঁজাখুরি গপ্পো নয় কিন্তু। 


***
এডিটরের দেওয়া শব্দসংখ্যার উর্দ্ধসীমা আমি অনেক আগেই অতিক্রম করেছি, এখন না থামলে এডিটরের রোষে পড়তে হবে।  কিন্ত শেষ করার আগে আপনাদের একটা ছোট্ট অনুরোধ করব।


আপনারা অনেকে নিশ্চয়ই রোজ ভোরবেলা বাড়ির কাছাকাছি কোন পার্কে বা মাঠে বেড়াতে যান। এর পর যখন যাবেন, একটু তাড়াতাড়ি যাবেন, যখন ভীড় কম থাকবে। হাঁটতে হাঁটতে যখন কোন গাছের কাছে আসবেন, আশেপাশে একটু দেখে নিয়ে গাছটিকে একটু  জড়িয়ে ধরুন। বন্ধু যেমন করে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে, তেমনি করে। তার ডালে পাতায় হাত বুলিয়ে একটু আদর করুন। দেখবেন যে ঘুরে আবার যখন সেই  গাছটির নীচে আসবেন, তার পাতারা একটু যেন  জোরে নড়তে শুরু করেছে আপনাকে একটু  বেশি হাওয়া দেবার জন্যে। যদি রোদ উঠে যায়, পাতাগুলো দেখবেন আপনার মাথার ওপরে আরেকটু  নিবিড় ঘন হয়ে এসেছে  আপনাকে একটু বেশি ছায়া দিতে ।
এটা শুধুই আপনার মনের অলীক কল্পনা নয়। আমরা না বুঝলেও গাছেরা ভালবাসা বোঝে। আমাদের চেয়ে লক্ষ কোটি বছরেরও বেশি বিবর্তনের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান তাদের দেহের গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে নিবিষ্ট রয়েছে। ওদের কখনো ভুল হয় না।
***

এই বিভাগের লেখা ও ভিডিও নিয়ে আপনার মতামত

ঈশানের যোগাযোগ

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 by Ishan Kotha. Site Developed by CHIPSS