বিজ্ঞান বিষয়ক

উত্তরপূর্ব ভারতের আদিবাসীদের জিনগত গঠন ও তাঁদের উৎস সন্ধানে

রাজ প্রদীপ চক্রবর্তী

 

লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত ব্লগে উনি আগে প্রকাশ করেছেন। এই বিষয়ে আমরা পূর্বে লেখকের সাক্ষাৎকার ও নিয়েছিলাম আমাদের ইউটিউব চ্যানেলের জন্য। একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হল...

Raj Pradip Chakraborty.jpeg

উত্তর-পূর্ব ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান এমনই যে এটি ৬০-৮০ হাজার বছর আগে  ‘আউট অফ আফ্রিকার’ ঘটনাবলী থেকে দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার মধ্যে মানব বিস্তারের জন্য একটি সরু স্থল সেতু হিসাবে কাজ করেছে (Wallace.et.al,1999,Rito.et.al.,2019,Metspalu,et.al,2004, Fernandes,et.al,2006)। ডেভিড রাইখ ৫০-৬০ হাজার বছর আগে উত্তর পূর্ব  ভারতে মানব বিস্তারের বর্ণনা দিয়েছেন (Reich David,2018)। অন্তিম সর্বাধিক হিমযুগ (Last Glacial Maximum)সময় অবধি বা তার পরে উত্তর পূর্ব  ভারতে মানব বসতির ব্যাপারটা অস্পষ্ট কারণ প্যালিওক্লিম্যাটোলজিস্টদের মতামত অন্তিম সর্বাধিক হিমযুগ (LGM) চলাকালীন হিমবাহের পরিমাণ এবং জলবায়ুর উপর এর প্রভাব সম্পর্কে একে অপরের থেকে আলাদা (Van Driem,2012)। উত্তরে পূর্ব হিমালয় এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এর মত ভৌগলিক বাধা উত্তর-পূর্ব ভারতের ভৌগলিক সঙ্কীর্ণতার কারন । মানব বিস্তারের জন্য একই ধরণের প্রবেশ পথ হ'ল আফ্রিকা এবং আরব উপদ্বীপের মধ্যবর্তী নীল নদ উপত্যকা, পশ্চিম ও পূর্ব ইউরেশিয়ার মধ্য মধ্য এশিয়া (Cordaux,et.al.2004)। এখানের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি হ'ল দ্রাঘিমাংশের ও অক্ষাংশের বিভিন্নতার সাথে সাথে জলবায়ু গত বিচিত্রতা , অসমান ভূপৃষ্ঠের গঠন , অতি সক্রিয় দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর কারণে ভারী বৃষ্টিপাত (Mehrotra.et.al,2014) এখানকার প্রাগৈতিহাসিক জনবিন্যাসের  পুনর্গঠন করাটা  চেলেঞ্জের ব্যাপার করেছে।

           

এখানে উত্তর-পূর্ব ভারত বলতে সাতটি রাজ্য বোঝানো হয়েছে যেমন  অরুণাচল প্রদেশ, অসম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম এবং ত্রিপুরা। ১৯৭১ সালের ভারতের আদমশুমারির প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তর পূর্ব  ভারতে ২২০ টিরও বেশি জাতিগত- ভাষাগত গোষ্ঠী  রয়েছে, এখানে দুটি জনবহুল ভাষা পরিবার মিলিত হয়, যেমন, ইন্দো ইউরোপীয় এবং তিবেতো বর্মণ । অন্য দুটি হল অস্ট্রো এশিয়াটিক  এবং ক্রা-ডাই। তাই-কাদাই যা ক্রা-ডাই ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত ,অরুনাচল প্রদেশের এক ছোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ   এবং খাসি অ্যাসলিয়ান (Chaubey.et.al,2011) অস্ট্রো এশিয়াটিকের একটি উপগোষ্ঠী যা মেঘালয়ের ‘খাসি’ জনগোষ্ঠীর ভাষা। ইন্টারেস্টিং বিষয় হল মধ্য ও পূর্ব ভারতের (মুলতঃ ছোটনাগপুর মালভূমি ও তার আশপাশ অঞ্চল) মুন্ডা ভাষাভাষী জনসংখ্যার সংখ্যা ১ কোটির ও বেশি (Census of India: Abstract of speakers’ strength of languages and mother tongues –2001) স্পষ্টতই ভাষাতাত্ত্বিকভাবে খাসি জনগোষ্ঠীর সাথে যতটা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত তবে জীনগতভাবে ততটা ঠিক নয় (Chaubey.et.al,2011,Arunkumar.et.al.2015,Tätte.et.al,2019)। এটি ভারতে অস্ট্রো এশিয়াটিক ভাষার সম্প্রসারণ এবং এর প্রাচীনত্বের জটিলতা বোঝায়। যদিও বেশিরভাগ লোকেরা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা (অসমিয়া, বাংলা ও হিন্দি) ভাষায় কথা বলে, উত্তর পূর্ব ভারতে তাদের উৎস এবং বিস্তার ঐতিহাসিকভাবে প্রত্যয়িত (Van Driem,2012)। অস্ট্রো এশিয়াটিক এবং তিবেতো বর্মণ ভাষার বয়সের এবং ভৌগোলিক বণ্টনের দিকে লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হয় যে এই দুটিই উত্তর পূর্ব ভারতের বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীদের মধ্যে প্রাচীনতম এবং এই অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই দুটি ভাষাগোষ্ঠীর বিশেষ করে তিবেতো বর্মণের প্রভাব সবচেয়ে বেশী। সুতরাং, উত্তর পূর্ব ভারতে্র জনগোষ্ঠীদের উৎস বোঝার জন্য, অস্ট্রো এশিয়াটিক এবং তিবেতো বর্মণ   ভাষাগোষ্ঠীর উদ্ভব প্রথমে বোঝা জরুরি।

   

মানব ইতিহাসের পুনর্গঠনের জন্য  প্রত্নতত্ত্ব, প্যালিওএনথ্রোপোলোজি, প্যালিওক্লাইমেটোলজি, ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব এবং জিনোমিক উৎস (Jobling,et.al,2004) থেকে তথ্য সংগ্রহ ও তাদের সংশ্লেষন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যক্রমে  উত্তর পূর্ব ভারত সম্পর্কিত প্রত্নতাত্ত্বিক এবং প্যালিয়ো জলবায়ু গবেষণা এখনও পর্যন্ত অমীমাংসিত রয়ে গেছে (Van Driem,2012,Van Driem,2006)অধিকন্তু, উত্তর পূর্ব ভারত থেকে পূর্ব-নিওলিথিক প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের অপ্রতুলতা   (Cordaux,et.al,2004, Misra,2001) ছবিটিকে আরও ঝাপসা করেছে। উত্তর পূর্ব ভারতের অংশগুলিতে বাঁশের প্রাচুর্য , যা একটি দুর্দান্ত অস্থায়ী নির্মাণ উপাদান এবং বাঁশকে সহজেই শিকারের সরঞ্জামে রূপান্তর করা যেতে পারে, যদিও এটি কম টেকসই হয়, কাজেই বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বাঁশের ব্যবহার পুরানো প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের অভাবের অন্যতম কারণ হতে পারে । অস্ট্রো এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের উত্স সম্পর্কে ভাষাবিদদের মতামতের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের উপর ভিত্তি করে অধ্যয়নগুলি দক্ষিণ চীন (সিচুয়ান রাজ্য) এর মধ্য-ইয়াংটজি নদী অববাহিকায় অস্ট্রো এশিয়াটিক ভাষার উৎসের প্রস্তাব করেছে এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর তীর ধরে ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে (Sidwell,2010,Peiros,2011)। অন্যদিকে, অভিধান সংক্রান্ত বিশ্লেষণ (Lexicostatistical analysis) মেকং নদী উপত্যকায় একটি উৎসের প্রস্তাব করেছে যা থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস এবং কম্বোডিয়া জুড়ে প্রসারিত (Arunkumar.et.al.2015)। প্রাচীন জলবায়ু গবেষণা (Lake Sediment core study)) দেখায় (i) 22ºN --- 23ºN অক্ষাংশের অঞ্চলটিতে, বড় আকারের ঘাসের পরাগের উপস্থিতি, যা ৫৭০০ বছর আগে  উপস্থিত ছিল,যা মধ্য-হোলোসিনের মাঝামাঝি সময়ে ধান চাষের সূচনা নির্দেশ করে (ii)  26º N --- 27ºN অক্ষাংশ; অঞ্চলটিতে পেলিওবোটানিক্যাল তথ্য প্রমান ১০৮১০ এবং ৭৬৮০ বছর পূর্বে শীতল এবং শুষ্ক আবহাওয়ার নির্দেশ করে এবং কিছু খাদ্যশস্যের পরাগের উপস্থিতি মানুষের ক্রিয়াকলাপ এবং খাদ্যশস্য-ভিত্তিক পশুপালন  অভ্যাসগুলির সূচনার ইঙ্গিত করছে (Mehrotra.et.al,2014)।

           

স্পষ্টতই, উত্তরপূর্ব ভারতের জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে সংস্কৃতিগত, জাতিগত এবং ভাষাগত  বৈচিত্র্য রয়েছে এবং তাদের শারীরিক বৈশিষ্ঠ পূর্ব  বা দক্ষিণ পূর্ব  এশীয়দের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। জিনতত্ত্বগুলি স্পষ্টভাবে বলেছে যে জনগোষ্ঠীগুলি বেশিরভাগই জিনগতভাবে খুব একই রকম যেখানে অস্ট্রো এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষেরা লাওস এবং তিবেতো বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের সাথে হান চৈনিকদের খুব কাছাকাছি মিল রয়েছে। Cordaux,et.al,2004 এর মতে উত্তর-পূর্ব ভারতে অন্ততঃ তিবেতো বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীর আগমনের পর থেকে পূর্ব / দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিন এশিয়া  এই দুটি প্রধান উপমহাদেশীয় অঞ্চলকে সংযুক্ত করার জন্য উত্তর পূর্ব ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসাবে নয়,বরংচ একটা ভৌগোলিক বাধা হিসেবে কাজ করেছে ।

২০০০ সালের পর থেকে হিউম্যান পপুল্যাশন জেনেটিক্সের  সফল প্রয়োগের মাধ্যমে উত্তর পূর্ব ভারতের অস্ট্রো এশিয়াটিক এবং তিবেতো বর্মণ ভাষাগোষ্ঠী সম্পর্কিত অনেকগুলি গবেশনাপত্র যেমন Cordaux,et.al,2004,Chaubey,et.al,2011,Arunkumar,et.al,2015,Tätte,et.al,2019,Kumar,et.al,2007,Sahoo,et.al,2006,Shi,et.al,2000,Maity,et.al,2004,Tamang,et.al,2018, Reddy, et.al,2007 এবং Gazi,et.al.2013 প্রকাশিত হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতে পর্যবেক্ষণ করা ওয়াই-ক্রোমোজোম এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বৈচিত্রের বিভিন্ন নিদর্শনগুলি উত্তর-পূর্ব ভারতের মানববিস্তার ও বসতির সময় একটি পুরুষ-নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাতা প্রভাব (Male Founder Effect) দ্বারা সর্বোত্তমভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে (Cordaux,et.al,2004)। Arunkumar,et.al,2015 ওয়াই-ক্রোমোজোম তথ্যের বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে   প্রায় ৫৭০০ বছর আগে লাওসে,৫৩০০ বছর আগে উত্তর-পূর্ব ভারতে এবং ৪৩০০ বছর আগে পূর্ব ভারতে O-M95 এর বিস্তার শুরু হয়েছিল। সম্প্রতি একটি উল্লেখযোগ্য প্রাচীন ডিএনএ গবেষণা,Lipson,M.et.al,2018 দক্ষিণপূর্ব  এশিয়ার নব্যপ্রস্তর থেকে ব্রোঞ্জ যুগে মানব বসতির  বিস্তার নথিভুক্ত করেছে যা নব্যপ্রস্তর/নিওলিথিক থেকে ব্রোঞ্জ যুগের সময় উত্তর পূর্ব ভারতে মানববসতি সম্পর্কে অস্পষ্টতা দুর করেছে। ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব এবং ভাষাতাত্ত্বিক প্যালিয়োনটোলজিগত গবেশনাতে প্রাগৈতিহাসিক মানব বিস্তারের  কিছুটা দিশা দেখিয়েছে। গবেশনাগুলি যেমন, Van Driem,2012, Higham,2002, Sidwell,2010 & Diffloth,2001,2005 অস্ট্রো এশিয়াটিক স্পিকারদের সাথে প্রাথমিক ধান চাষের সাথে সম্পর্ক এবং প্রায় ৭০০০ বছর আগে ধানের চাষের প্রচলনের প্রস্তাব করে। প্রকৃতপক্ষে, জিনোমিক এবং ঐতিহাসিক ভাষাগত অধ্যয়ন দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতে মানববসতি বিস্তারের সময়রেখা এবং উত্তরপূর্ব ভারতের জিনোমিক গঠনে এর প্রভাব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করে।

 

আগে উল্লেখ করা গবেষণাগুলো থেকে জিনগত তথ্যের তুলনা,ওয়াই-ক্রোমোজোম হ্যাপলোগ্রুপ O-M95 অস্ট্রো-এসিয়াটিক স্পিকারের সাথে এবং O-M134 এর সাথে তিবেতো বর্মণ  স্পিকারের মধ্যে নিবিড় সম্পর্কের দিকে ইশারা করে । নিচের চিত্রটিতে  ইউরোশিয়ান ওয়াই ক্রোমোজোম অ্যাডামের সাথে তাদের এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ  করার জন্য ওয়াই ক্রোমোজম ফাইলোজেনেটিক ট্রিতে (সংক্ষিপ্ত) O-M95 এবং O-M134 এর অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।

east asian Y tree.jpg

 

সাম্প্রতিক প্রাচীন ডিএনএ সমীক্ষা, Lipson, et.al,2018 অনেক প্রয়োজনীয় যুগান্তকারী তথ্যের উন্মোচন করেছে (১৮ প্রাচীন ডিএনএ মিয়ানমার থেকে ভিয়েতনামে সংগৃহীত, বয়সসীমা ৪১০০-১৭০০ বছর)। এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ দক্ষিন পূর্ব এশিয়া এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে নিওলিথিকের  শেষদিকে থেকে সম্ভবত লৌহ যুগ পর্যন্ত একাধিক মানব প্রব্রজনের দিকে ইঙ্গিত করে।  প্রথম দিকের অস্ট্রো-এশিয়াটিক স্পিকার এবং ধান চাষিরা সম্ভবত ইয়াংজি নদী  অববাহিকা থেকে উদ্ভূত যা ভিয়েতনামের ম্যান ব্যাক প্রাচীন ডিএনএ নমুনায় প্রতিবিম্বিত বলে গবেষণা দাবী করছে। গবেষণায় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং নিওলিথিক থেকে ব্রোঞ্জের যুগে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে প্রত্যয়িত সংস্কৃতির রূপান্তর এবং ভাষা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখযোগ্য জিনগত ওলটপালটের মত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উন্মোচন করেছে।

           

শুধু যৌন নির্দিষ্ট জিন (ওয়াই ক্রোমোজোমাল এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ) কেন,যে কোন জিনেরই যে  ভাষার সঙ্গে প্রবাহিত হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তবে, ভারতের অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং তিবেতো বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, তাদের বিস্তারটি জিন প্রবাহের সাথে যুক্ত ছিল। পূর্ব/ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ানদের জিনগত সম্পর্কের সাথে উত্তরপূর্ব ভারতের অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং তিবেতো বর্মণ ভাষার সম্পর্ক সম্মন্ধে বিভিন্ন ধারণা রয়েছে। এটি এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে যে উত্তরপূর্ব ভারতের অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং তিবেতো বর্মণ স্পিকার উভয়ই জিনগতভাবে দক্ষিণপূর্ব / পূর্ব এশিয়ানদের কাছাকাছি (Chaubey,et.al,2011)। গবেষণায় দেখা গেছে যে অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং তিবেতো  বর্মণ স্পিকারের  জেনেটিক পিতৃকুলগুলি দক্ষিণপূর্ব / পূর্ব এশিয়ানদের সাথে যথেষ্ট সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে জেনেটিক মাতৃকুলগুলি  পূর্ব / দক্ষিণপূর্ব  এশীয় বংশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয় বংশেরও যথেষ্ট উপস্থিতি রয়েছে। । অটোসোমাল ডিএনএ তথ্য থেকে আরও জানা গেছে যে উত্তর পূর্ব ভারত এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অস্ট্রো-এশিয়াটিক দক্ষিণ এশীয়দের সাথে জিনগত ধারাবাহিকতা এবং এবং তিবেতো বর্মণ স্পিকারদের সাথে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে (Tamang,et.al,2018)। উত্তর-পূর্ব ভারতে বিশেষত তিবেতো বর্মণ স্পিকারগুলির মধ্যে উচ্চ জেনেটিক সখ্যতা , উত্তর-পূর্ব ভারত এবং ভারতের অন্যান্য অংশের মধ্যে জেনেটিক পিতৃকুল (ওয়াই-ক্রোমোজোম) এবং জেনেটিক মাতৃকুল (এম টি ডিএনএ) উভয় প্রকারের মধ্যে একটি পৃথক বিচ্ছিন্নতা  তিবেতো বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

 

Cordaux,et.al,2004 এর করা কোয়ালেসেন্স  বিশ্লেষণ থেকে জানা যায় যে তিবেতো-বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীর মানুষেরা  উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রসারণ সম্ভবত  বিগত ৪২০০ বছরের মধ্যে হয়েছিল। ইন্টারেস্টিং বিষয় এই যে পূর্ব/ মধ্য ভারতের অস্ট্রো-এশিয়াটিক মুন্ডা স্পিকার যাদের মধ্যে বর্তমানে দক্ষিণ পূর্ব এশীয় O-M95 জেনেটিক পিতৃকুলের আধিপত্য পাওয়া যায়  (৬৭.৬৭% এর বেশি) (Arunkumar,et.al,2015) অন্যদিকে  দক্ষিণ এশীয় জেনেটিক মাতৃকুলের  আধিপত্য (Chaubey,et.al,2011) পিতৃভাষা তত্ত্বপ্রকল্প'(Father Tongue Hypothesis)-এর একটি সর্বোত্তম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে  (Forster & Renfrew ,2011)

 

উত্তর পূর্ব ভারতীয় উপজাতির মধ্যে স্পষ্টত বৈচিত্র সত্ত্বেও, ওয়াই ক্রোমোসোমাল এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ সমীক্ষায় সমস্ত তিবেতো বর্মণ এবং অস্ট্রো এশিয়াটিক স্পিকারদের মধ্যে পূর্ব এবং দক্ষিণ পূর্ব এশীয়দের প্রতি তাদের জিনগত ঘনিষ্ঠতা এবং দক্ষিণ এশীয়দের থেকে সমান দূরত্বের উদ্ভব ঘটে । অস্ট্রো এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত খাসি লোকদের দক্ষিণ এশীয়দের সঙ্গে কিছুটা জিনগত সখ্যতা রয়েছে।

           

আধুনিক জনগোষ্ঠীর জিনোমিক গবেষণাগুলি এবং আরও তাৎপর্য্যপূর্ণ প্রাচীন ডিএনএ সমীক্ষায় একাধিক মানব বিস্তারের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমদিকে বিস্তারগুলি অস্ট্রো এশিয়াটিক বক্তাদের সাথে যুক্ত ছিল , পরবর্তীতে প্রায় লৌহযুগ পর্যন্ত মানব বিস্তার হয় তিবেতো বর্মণ -এর সাথে। পরবর্তীকালের  এই মানব সম্প্রসারণগুলি দক্ষিণপূর্ব  এশিয়ার কেন্দ্রস্থল থেকে আরও পূর্ব এবং পশ্চিমে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীদেরকে সরিয়ে দিয়েছে। উত্তর পূর্ব ভারতে  এর প্রভাব সম্ভবত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মতোই, যেখানে নব্যপ্রস্তর যুগের শেষদিক থেকে ব্রোঞ্জ যুগের সময় পর্যন্ত তিবেতো বর্মণ দ্বারা অস্ট্রো-এশিয়াটিক  ভাষাগোষ্ঠীদের  প্রতিস্থাপন বা সংহত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য জিনগত, ভাষাগত টার্নওভার ঘটেছিল। তিবেতো-বর্মণ আগন্তুকরা  সম্ভবত জায়গাগুলোতে  জনবসতির সন্ধান  পেয়েছিল, সেই ক্ষেত্রে তারা হয় মূলত উত্তর-পূর্ব ভারতের পূর্ববর্তী বাসিন্দাদের প্রতিস্থাপন নয়ত নিজেদের মধ্যে মিশিয়ে নিয়েছিল। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই প্রাক তিবেতো বর্মণ বাসিন্দারা সম্ভবত অস্ট্রো-এশিয়াটিক স্পিকার,যাদেরকে  আজকাল উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘খাসি’ এবং পূর্ব ও মধ্য ভারতের ‘মুন্ডা’হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অস্ট্রো-এশিয়াটিকরা মেঘালয়ে খাসি জনগোষ্ঠী হিসেবে একটি পকেটে সীমাবদ্ধ থেকে বাকিরা ভারতীয় মূল ভূখণ্ডে চলে এসেছিল। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে উত্তর পূর্ব ভারত পর্যন্ত  নিওলিথিকের শেষ দিক থেকে ব্রোঞ্জ যুগের সময়ে একাধিক প্রব্রজনের ঢেউ  এবং পূর্ব-ভারতের মধ্যে এই ঢেউয়ের ধারাবাহিকতা সম্ভবত উত্তর-পূর্ব ভারতের  সমস্ত আধুনিক অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং তিবেতো বর্মণ জনগোষ্ঠীর জিনগত কাঠামো তৈরি করেছে।

         

যদিও উত্তর পূর্ব ভারতীয় উপজাতিদের জিনোমিক গঠনের সাথে সম্পর্কিত অনেক অগ্রগতি অর্জন করা গেছে তবে এখনও অনেকগুলি উপজাতির জিনগতভাবে প্রতিনিধিত্ব করা হয়নি বলে বিশদ চিত্রের অভাব রয়েছে। উচ্চ গুনমানের পক্ষপাতহীন পুর্নাঙ্গ ছবি ফুটিয়ে তোলার জন্য, সমস্ত নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী পুরো জিনোম সিকোয়েন্সিং (Whole Genome Sequencing) সহ একাধিক বিভাগীয় ভিত্তিক গবেষণা(Multidisciplinary Study), প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ সনাক্ত করার জন্য উপগ্রহের রিমোট সেন্সিং এর সাহায্য, জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (GIS)এর প্রয়োগ ইত্যাদির প্রয়োজন।

 

তথ্যসুত্রঃ- 

 

Arunkumar,G.et.al.(2015),A late Neolithic expansion of Y chromosomal haplogroup O2a1-M95 from east to west, J. Syst. Evol. 9999 (9999): 1–15. 

 

Census of India: Abstract of speakers’ strength of languages and mother tongues –2001. Available at,  http://www.censusindia.gov.in/Census_Data_2001/Census_Data_Online/Language/Statement1.aspx 

 

Chaubey,G.et.al.(2011), Population Genetic Structure in Indian Austroasiatic Speakers: The Role of Landscape Barriers and Sex-Specific Admixture, Mol. Biol. Evol. 28(2):1013–1024 

 

Cordaux,R.et.al.(2004), The Northeast Indian Passageway: A Barrier or Corridor for Human Migrations? Mol. Biol. Evol. 21(8):1525–1533. 

 

Diffloth, Gérard.,(2001),Tentative calibration of time depths in Austroasiatic branches. Paper presented at the Colloque Perspectives sure Phylogénie des Langues d’Asie Orientales at Périgueux. 

 

Diffloth,Gérard.(2005).The contribution of linguistic palaeontology to the homeland of Austroasiatic.” In Laurent Sagart, Roger Blench and Alicia Sanchez-Mazas, eds., The Peopling of East Asia: Putting Together the Archaeology, Linguistics and Genetics, pp. 77-80. London: Routledge Curzon. 

 

Fernandes,et,al. (June 2006). Absence of post-Miocene Red Sea land bridges: biogeographic implications, Journal of Biogeography. 33 (6): 961–66. 

 

Forster, P. & Renfrew, C (2011), Mother Tongue and Y Chromosomes, Science 333, 414 1390–1391 

 

Gazi, NN&Tamang, R& Singh, VK&Ferdous, A&Pathak, AK.et. al. (2013), Genetic Structure of Tibeto- Burman Populations of Bangladesh: Evaluating the Gene Flow along the Sides of Bay-of-Bengal, PLoS ONE, 8(10), e75064 

 

Higham CFW. (2002). Languages and farming dispersals: Austroasiatic languages and rice cultivation. In:  Bellwood PRC ed. Examining the farming/language dispersal hypothesis. Cambridge: McDonald Institute. 223–332. 

 

Jobling,M.et.al.(2004),Human Evolutionary Genetics,Garland Science, New York. 

 

Kumar, Vikrant.et.al.( 2007), Y-chromosome evidence suggests a common paternal heritage of Austro-Asiatic populations, BMC Evolutionary Biology, 7:47 

 

Lipson, M., et.al, (2018). Ancient genomes document multiple waves of migration in Southeast Asian prehistory. Science (New York, N.Y.), 361(6397), 92–95.  

 

Maity, B.et.al,(November 2004),Tracking the genetic imprints of lost Jewish tribes among the gene pool of Kuki-Chin-Mizo population of India,Genome Biology 6: P1 

 

Mehrotra,N.et.al. (2014), Review of palaeoclimate records from Northeast India based on pollen proxy data of Late Pleistocene-Holocene, Quaternary International 325: 41-54 

 

Metspalu, M.et.al,(2004). Most of the extant mtDNA boundaries in south and southwest Asia were likely shaped during the initial settlement of Eurasia by anatomically modern humans. BMC genetics, 5, 26. 

 

Misra,V.N.(2001), Prehistoric human colonization of India, J. Biosci. 26:491–531. 

 

Peiros I. (2011). Some thoughts on the problem of the Austro-Asiatic homeland. Journal of Language relationship 6: 101–113. 

 

Reich, David. (2018), Who we are and how we got here, Pantheon Books, New York, p.187-206 

 

Reddy, BM& Langstieh, BT& Kumar, V& Nagaraja, T& Reddy, ANS.et.al (2007), Austro-Asiatic Tribes of Northeast India Provide Hitherto Missing Genetic Link between South and Southeast Asia, PLoS ONE ,2(11), e1141. 

 

Rito, Teresa.et.al. (March 2019). A dispersal of Homo sapiens from southern to eastern Africa immediately preceded the out-of-Africa migrationScientific Reports. 9(1), (4728). 

 

Sahoo, S, et al. (2006), A prehistory of Indian Y chromosomes: Evaluating demic diffusion scenarios, Proceedings of the National Academy of Sciences 103(4): 843-848. 

 

Sidwell P. (2010). The Austroasiatic central riverine hypothesis. Journal of Language Relationship 4: 117–134. 

 

Tamang, R.& Chaubey, G.& Nandan, A. et al. (2018), Reconstructing the demographic history of the Himalayan and adjoining populations, Hum Genet 137: 129. 

 

Trivedi R.et.al.(2008). Genetic imprints of Pleistocene origin of Indian populations: A comprehensive phylogeographic sketch of Indian Y-Chromosomes.International Journal of Human Genetics 8: 97–118. 

 

Tätte ,Kai.et.al.(2019),The genetic legacy of continental scale admixture in Indian Austroasiatic speakers, Scientific Reports,9:3818 

 

Van Driem, George. (2006), The prehistory of Tibeto-Burman and Austroasiatic in light of emergent population genetic studies, Mother Tongue,issue XI,pp-160-211. 

 

Van Driem, George. (2012), Glimpses of the ethnolinguistic prehistory of northeastern India, in Toni Huber and Stuart Blackburn, eds., Origins and Migrations in the Extended Eastern Himalayas. Leiden: Brill. pp. 187-211. 

 

Wallace, D& Brown, MD& Lott, MT (1999). Mitochondrial DNA variation in human evolution and disease, Gene. 238 (1): 211–30. Wells, R. S.&Yuldasheva, N & Ruzibakiev, R.et. al. (2001). The Eurasian heartland: a continental perspective on Y-chromosome diversity, Proc. Natl. Acad. Sci. USA 98:10244–10249.