বিজ্ঞান বিষয়ক

আমরা কি মহাবিশ্বে একা ?

গোবিন্দ ভট্টাচার্য

(ভাষান্তর : জয়দীপ ভট্টাচার্য)

Gobinda Bhattacharjee_edited.jpg

আমরা কি এই মহাবিশ্বে একমেবোদ্বিতীয়ম ? কেউ কি মহাশূন্য থেকে আমাদের পর্যবেক্ষন করছে ? পৃথিবীর বাইরে আর কোথাও কি প্রাণের অস্তিত্ব আছে ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে গেলে প্রথমে আমাদের বুঝে নিতে হবে তিনটি রহস্যকে - প্রাণের সংজ্ঞা কি ?  প্রাণের উদ্ভবের জন্য পূর্বশর্ত কি কি ? এবং কিভাবে পৃথিবীতে প্রাণ বিকশিত ও বিবর্তিত হল ?

প্রাণের সংজ্ঞা কি কি বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল ? চারপাশে তাকালে আমরা প্রাণের কিছু বৈশিষ্ট্য অবশ্যই দেখতে পাই - প্রাণের বিকাশ হয়, প্রাণ তার প্রতিরূপ তৈরি করতে পারে, প্রাণের নিজস্ব বিপাক প্রক্রিয়া থাকে, প্রাণ তার শক্তি সংগ্রহ ও বেঁচে থাকার স্বার্থে চারপাশের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম। অর্থাৎ প্রাণের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাকে জড় পদার্থ থেকে নিঃসন্দেহে  আলাদা করে দেয়। প্রাণের একটি পরিশীলিত ব্যাবস্থা থাকে যার ফলে সে তথ্যকে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। প্রাণ নিজে থেকে বিকশিত ও বিবর্তিত হয়। কিন্তু এসবের মধ্যে এরকম খুব কম বৈশিষ্ঠ্যই রয়েছে যা জড় পদার্থের মধ্যে অবর্তমান। লবন (সল্ট) এর স্ফটিক নিজে থেকে বর্ধিত হয়, কম্পুটার প্রোগ্রাম প্রতিরূপ তৈরি করতে সক্ষম, এমনকি কম্পুটারের উন্নতমানের তথ্য সংরক্ষণ ও স্থানান্তরণ করার ক্ষমতা রয়েছে। আগুনের নিজস্ব বিপাক প্রক্রিয়া রয়েছে, জ্বলনের মাধ্যমে শক্তি সরবরাহ করতে সক্ষম। আবহাওয়ার অবিশ্বাস্য জটিল চরিত্র রয়েছে। তাই এইসব কোন বৈশিষ্ট্য প্রাণের ক্ষেত্রে একক বা অনন্য নয়।

নাসার বিজ্ঞানী জেরাল্ড জয়েস প্রাণের একটি সহজ সংজ্ঞা দিয়েছেন - প্রাণ একটি স্বনির্ভর রাসায়নিক ব্যাবস্থাপনা যা ডারউইনের মতবাদ অনুযায়ী বিবর্তিত হতে সক্ষম। কিন্তু দর্শনের অধ্যাপক ক্যারল ক্লিলেন্ড বলছেন যে আমরা এখনও সাধারণ বিজ্ঞানের সেই ভাষা আয়ত্ত করতে পারিনি যা দিয়ে প্রাণকে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব, যেমনটা জলের প্রকৃত সংজ্ঞা দিতে গেলে অনুর রসায়নের জ্ঞান থাকা জরুরি। যাইহোক, প্রাণের সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য ও কেজো সংজ্ঞা হল প্রাণ সেই, যা শক্তিকে ব্যাবহার করে নিজস্ব আনবিক গঠন তৈরি করতে পারে এবং যা নিজের মধ্যে প্রোথিত কিছু বিশেষ নির্দেশকে অনুসরণ করে নিজস্ব প্রতিরূপ তৈরি করতে সক্ষম।

বিজ্ঞানীরা সাধারণত মনে করেন যে প্রাণের উদ্ভবের জন্য কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে যার মধ্যে জলের উপস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া বাসযোগ্য একটি পরিবেশ দরকার যা প্রাণের জন্য অনুকুল অর্থাৎ এরকম একটি গ্রহ যা তার পূর্বজ নক্ষত্র থেকে যথাযথ দুরত্বে অবস্থিত যাতে সেখানে সাধারন তাপমাত্রায় ও চাপে জল তরল অবস্থায় বিদ্যমান থাকতে পারে। প্রচুর জৈব পদার্থের প্রাচুর্যও থাকা জরুরি যার সাহায্যে জটিল জৈব অনু তৈরি হতে পারে - সেরকম আনবিক গঠন যা প্রাণের জটিলতা ও বৈশিষ্ট্যকে আত্মস্থ করতে সক্ষম। পৃথিবীর নিরানব্বই শতাংশ প্রাণজ উপাদান শুধুমাত্র কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ফসফরাস এবং সালফার এই ছয়টি পদার্থ দ্বারা গঠিত। সমস্ত জীবিত অস্তিত্বের মধ্যে এই উপাদানগুলো জলের মধ্যে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে যার ফলে এসবের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া হওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান এবং এভাবেই সবাই নিজস্ব বিপাকপ্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

জলের কিছু অনন্য ধর্ম রয়েছে যা অন্য তরল থেকে পৃথক। হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের মধ্যে শক্তিশালী রাসায়নিক বন্ধন থাকার দরুন তাপমাত্রার এক বিস্তৃত পরিসীমা অব্দি জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে। এছাড়া বরফের ঘনত্ব জল থেকে কম থাকায় তা জলে ভাসমান থাকতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে যখনই তাপমান নীচের দিকে নেমে যাবে তখন সমুদ্রের জল যা প্রাণের আশ্রয়দাতা তার উপরিভাগ থেকে সাদা বরফের আস্তরণ তৈরি হওয়ায় তা তলদেশের জল এবং সাথে প্রাণজ অস্তিত্বকেও সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে। এর বিপরীতে যদি এমোনিয়ার তুলনা করা হয় তবে তা কিন্তু -৭৮ ডিগ্রি থেকে -৩৩ ডিগ্রি অব্দি তরল অবস্থায় থাকে এবং তাই সমুদ্রের পাদদেশ থেকে উপরের দিকে হিমায়িত হবে এবং তাতে আশ্রিত হলে সমস্ত জীবেরও মৃত্যু অবধারিত। তাই জল ছাড়া অন্য তরল প্রাণের পক্ষে অনুকূল নয়।

তরল জলের উপস্থিতি ছাড়া প্রাণের জন্য শক্তির স্থায়ী উৎস দরকার, যেরকম রোদ, যা জীবের বিপাক ক্রিয়ার জন্য জরুরি। এই শক্তি রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকেও পাওয়া যেতে পারে, এবং অপরিণত স্থলভাগ থাকা অবস্থায় এটিও প্রাণের বিকাশের জন্য, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে, উপযোগী হতে পারে। এছাড়া  জৈব পদার্থের নবায়নযোগ্য সরবরাহ এবং তারসাথে স্থলভাগ বা সমুদ্রের উপরিভাগে কঠিন তরল ও বায়বীয় পদার্থের সহ উপস্থিতিও প্রানের বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত।

কিভাবে পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হল ? J. E Lovestock তার "Gaia: A New Look at Life on Earth" এ লিখেছেন যে "প্রাণ সম্পুর্ন অসম্ভাব্য একটি ঘটনা এবং অনন্ত ঘটমান সম্ভাবনার আকর"। পৃথিবীতে প্রানের উদ্ভব হয়তো এক দৈবাৎ বা অকস্মাৎ ঘটনা যা কতিপয় রাসায়নিক পদার্থের সহযোগের ফল এবং যা আদিম সমুদ্রে ঘটেছিল লক্ষ লক্ষ বছরের পরিবর্তন ও রূপান্তরের সূত্রে এবং হয়তো এভাবেই বিকাশ ঘটেছিল সেই প্রথম জৈব অনুর যা নিজের প্রতিরূপ তৈরি করতে সক্ষম। আদিম সেই নীলাভ সমুদ্র যেখানে প্রাণের সম্ভাব্য উদ্ভব হয়েছিল সেই শৈশববস্থা থেকে ধীরে ধীরে প্রাণ সমৃদ্ধ হয়েছে অবিশ্বাস্য ভাবে লক্ষ কোটি বছর ধরে, কঠোর বাধাবিপত্তি পেরিয়ে, অগন্য গঠন এবং আকৃতির স্তর পেরিয়ে, অন্তহীন রূপান্তরের শৃঙ্খল পেরিয়ে।

নক্ষত্ররাজির মাঝে যে গ্যাসীয় মেঘ এবং ধুলিকনা ভাসমান, সাধারণ অনু ও পদার্থ বিদ্যমান, সেখানে নিকটস্থ নক্ষত্রের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একইভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণের বিকাশ হওয়া সম্ভব। এবং ১৯৬৮ সালেই মহাকাশ চর্চা ও আন্তনক্ষত্রীয় মহাশূন্য থেকে আসা মাইক্রোওয়েভ বিশ্লেষণ করে জলীয় এবং এমোনিয়ার বাস্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। ১৯৬৯ সালে মহাশূন্যে আরেকটি জৈব অনু ফর্মালডিহাইডের উপস্থিতিও ধরা পড়েছে। যদি পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ প্রক্রিয়া পৃথিবী সৃষ্টির ৮০০ মিলিয়ন বছর পরে শুরু হতে পারে, এবং যা তার বয়স, তাতে আন্তনক্ষত্রীয় মেঘে তেমন বিকাশের সম্ভাবনা অনেক বেশি কারণ তাদের বয়স কয়েকশো বিলিয়ন বছর। একই প্রক্রিয়া যে কোন ধুমকেতুর কেন্দ্রেও শুরু হওয়া সম্ভব কারন রেডিও এক্টিভ পদার্থের ক্ষয়জনিত যে উত্তাপ তাতে তৈরি হয় তা ঈষদুষ্ণ ছোট ছোট জলাশয় তৈরি করার উপযুক্ত যেমনটা পৃথিবীতে রয়েছে।

১৯৬৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার 'মার্চিনসন' নামক একটি স্থানে একটি উল্কাপিন্ড ভুপৃষ্টে আঘাত করে। ধ্বংসাবশেষ থেকে সন্ধান পাওয়া যায় পাঁচ টি এমিনো এসিড - গ্লাইসিন, এ্যলামিন, গ্লুটামিন, ভ্যালিন এবং প্রোলিন। কিন্তু এসব জৈবসৃষ্ট নয়। প্রকৃতপক্ষে এরাই জৈব বিবর্তনের রাসায়নিক অগ্রদূত হতে পারে। পৃথিবীতে প্রানের বীজ তাই বাইরে থেকেও বাহিত হতে পারে, মহাশূন্যের কোন গ্রহ থেকে, উল্কা বা সেরকম অন্য কোন বস্তুর মাধ্যমে যেহেতু পৃথিবী সৃষ্টির প্রাথমিক যুগে এসব বস্ত অবিরত ভুপৃষ্টে বর্ষিত হত। অথবা সৌরঝড় বা নক্ষত্রীয় ঝড়ের মাধ্যমেও তা বাহিত হওয়া সম্ভব। কিন্তু শুরুর সেইসব দিনে যে ধরণের জৈব অনুই থাকুক না কেন, বা তাঁদের উৎপত্তিস্থল যাই হোক না কেন, আমাদের চারপাশের জীবন যা দেখে আমরা অভ্যস্ত তার সাথে প্রায় কোন মিলই ছিলনা। এরজন্য পরের কয়েক বিলিয়ন বছরের বিবর্তনের দরকার পড়েছে। চেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের জন্য এরপরও লেগেছে আরো অনেক মিলিয়ন বছরের বিবর্তন।

সবকিছু মিলিয়ে এটা বলা যায় যে প্রাণ পৃথিবীর প্রারম্ভিক বৈশিষ্ট্য, আদিম জীবনের উদ্ভাস সেই সময়ে যখন ভুপৃষ্ট সবে কঠিন হতে শুরু করেছে। গ্রীনল্যাণ্ড থেকে কানাডার দিকে স্থলভুমির যে পরিসর চলে গেছে, যা আটলান্টিক ক্রেটন নামে খ্যাত, সেখানে কিছু পাথর পাওয়া গেছে যা এই গ্রহের প্রাচীনতম, যাদের সৃষ্টি হয়েছিল ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে। গ্রীনল্যান্ডের অভ্যন্তরে রয়েছে "ইস্যুয়া সুপ্রাক্রাস্টাল বেল্ট" বলে একটি জায়গা, যেখানে আদিম পাললিক শিলা বহু আগে প্রোথিত হয়ে কালক্রমে রুপান্তরিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে এই শিলাগুলিতে রয়েছে খনিজ গ্রাফাইট, যা শুধু দুটি উৎস থেকেই আসতে পারে : আদিম অজৈব কার্বন যা আগ্নয়গিরির অগ্নুৎপাত জনিত অথবা জৈব কার্বন থেকে যা জৈব পদার্থের মৃত্যুর ফলে সমুদ্রের পাদদেশে সঞ্চিত হয়েছিল। কার্বনের দুটি স্থিতিশীল 'আইসোটোপ' রয়েছে যাদের আনবিক ওজন ১২ এবং ১৩। প্রানীদের ক্ষেত্রে প্রথমটির আধিক্য দেখা যায় কারন কার্বন ১২ অধিক প্রতিক্রিয়াশীল। 'ইস্যুয়া'র গ্রাফাইটের ক্ষেত্রে কিন্ত একই ব্যাপার পরিলক্ষিত হয়েছে। এগুলোতে কার্বন ১২ অন্যটি থেকে প্রায় দুই শতাংশ বেশি যা এগুলোর জৈব উৎপত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামুদ্রিক অনুজীব যা সেইসময়ে মৃত হয়েছিল তাই এই পলিতে প্রোথিত হয় এবং ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত ও রুপান্তরিত হয়ে গ্রাফাইটে পরিণত হয়। আর যদি তাই হয়ে থাকে তবে এইসব শিলাসৃষ্টির আগেও অনুজীবের উপস্থিতি ছিল। তাই প্রাণের উদ্ভব এই গ্রহের উদ্ভবের ভুলে যাওয়া কোন এক প্রান্তকালে, অনুমান করা হচ্ছে তা পৃথিবী সৃষ্টির ৮০০ মিলিয়ন বছর পরে।

সূর্য তখন এখানকার তুলনায় এক চতুর্থাংশ উজ্জ্বল কারণ তার মধ্যেকার 'ফিউশন' বিক্রিয়া তখন মোটেই যথেষ্ট নয়। তাই পৃথিবীতে আলো বা তাপজনিত শক্তি কম আসছে যেহেতু উৎসতেই কম শক্তি উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু  আবহাওয়াতে গ্রীনহাউস গ্যাস যেমন কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মিথেনের আধিক্য থাকার কারণে এবং ক্ষীন সূর্যরশ্মির নিষ্ক্রিয়তার কারণে পৃথিবী তখন এক হিমায়িত গ্রহ যার সমস্ত ভুমি বরফাবৃত এবং প্রাণের বিকাশের পক্ষে প্রতিকুল। এছাড়া সমুদ্র, যা গ্রহের অধিকাংশ দখল করে রেখেছে তাও অন্ধকারাচ্ছন্ন হবার ফলে সূর্য রশ্মিকে শুষে নিচ্ছে। যে বরফাবৃত শৃঙ্গগুলি সূর্যরশ্মিকে প্রতিফলিত করে আবার শূন্যে পাঠাতে পারত তার সংখ্যাও নগন্য। তাই তাপমাত্রার এক ভারসাম্য রক্ষিত হচ্ছিল যা সেই সময়ে প্রাণের বিবর্তনের জন্য অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

২.৮ বিলিয়ন বছর আগে অধিকাংশ ভূপৃষ্ঠ কিন্তু তৈরি হয়ে গেছে, মহাদেশ ও তাদের চারপাশের ধাচা তখন তৈরি হচ্ছে। আবহাওয়ার প্রভাবে এইসব স্থলভুমি থেকে পৌষ্ঠিক পদার্থ জমা হচ্ছে সমুদ্রে এবং তারফলে দ্রুতগতিতে সামুদ্রিক অনুজীবদের সংখ্যাবৃদ্ধি হতে শুরু করে। আর্চিয়ান যুগের শেষভাগ অর্থাৎ ২.৫ বিলিয়ন বছর আগে তখন কিন্তু আবহাওয়ায় মিথেনের আধিক্য, আনবিক অক্সিজেনের পরিমাণ এক পিপিএম (part per million) এরও কম। আবহাওয়ার অক্সিজেন সমৃদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া চলতে থাকে ধাপে ধাপে - প্রথম ২.৪ বিলিয়ন বছর আগে তা দাড়ায় ২ শতাংশে, এরপর আবার ৭৫০ মিলিয়ন বছর আগে আবহাওয়ায় অক্সিজেনের পরিমাণ পৌঁছয় ৩ শতাংশে এবং সবশেষে ৫৮০ মিলিয়ন বছর আগে আবহাওয়ায় অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে হয় ১০ শতাংশ। এই অক্সিজেন বৃদ্ধির মূল উৎস সমুদ্রের উপরিভাগে অক্সিজেন সরবরাহকারী 'সাইনোব্যাক্টেরিয়া' (cyanobacteria)র উদ্ভব, যারা সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম এবং এবং এরাই বর্তমানের "ব্লু গ্রীন এ্যলগি" (Blue Green Algae) দের পূর্বজ, যেসব অনুজীবদের উপস্থিতি পৃথিবীর জলাশয় এবং সমুদ্রে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিলক্ষিত হয়। অক্সিজেনের এই পরিমান বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে এরপর বিবর্তন পথ ধরে বিকাশ হয় জটিল বায়ুজীবির যারা নিঃশ্বাসের সাথে অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকে।

তখন অব্দি জীবিত উপাদান গুলি বেঁচে থাকত জটিল অনুকে বিভাজিত করে এবং এই প্রক্রিয়ার ফলে  মুক্তিপ্রাপ্ত শক্তিকে ব্যাবহার করে।এইসব জটিল অনু যা অনুজীবের খাদ্য হিসেবে ব্যাবহৃত হত তা পুনর্নিমিত হত সমুদ্রে যেসব উপাদান রয়েছে তাদের সংমিশ্রণে এবং অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাবে। কিন্তু আবহাওয়ায় যখন অক্সিজেন তৈরি হতে শুরু করল তখন সূর্যরশ্মির প্রভাবে অক্সিজেন অনু বিভাজিত হয়ে অন্য আরেকটি অক্সিজেন অনুর সাথে জোট বাঁধতে শুরু করল, তৈরি হল ওজোন (Ozone)। এইভাবে মুক্তিপ্রাপ্ত ওজোন এরপর আবহাওয়ার উপরে তৈরি করল ওজোন স্তর, যা ঢাল হিসেবেএরপর থেকে আজ অব্দি পৃথিবীকে অতি বেগুনি রশ্মির থেকে সুরক্ষা দিয়ে চলেছে।

তবে যদিও ওজোন স্তর অতি বেগুনি রশ্মির বিধ্বংসী প্রভাব থেকে গ্রহকে রক্ষা করতে শুরু করল কিন্তু অতি বেগুনি রশ্মিকে আটকে দেবার ফলে বিবর্তনের গতিও কমতে শুরু করল কারণ জৈবঅনুর খাদ্য তৈরি করার ব্যাপারে এটির বড় ভুমিকা ছিল। 'ইউ ভি রে' বিহনে খাদ্যের নবায়ন ও পুনঃসরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার ফলে অনুজীবদের মধ্যে খাদ্যের জন্য শুরু হল বিষম প্রতিযোগিতা। সমুদ্রের আদিম সেই "রাসায়নিক স্যুপ" এইভাবে যখন নিঃশেষ হচ্ছিল, বেঁচে থাকার স্বার্থে, তখন সেইসব অনুজীবের বিকাশ হওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল যারা নিজের খাদ্য নিজেই বানাতে পারে এবং তাও সূর্যরশ্মিকে ব্যাবহার করে কারণ বিকল্প শক্তি হিসেবে তখন একমাত্র সূর্যরশ্মিই উপলব্ধ। কিন্তু তুলনামূলক ভাবে এই কম শক্তি সম্পন্ন সূর্যরশ্মির ব্যাবহার করে খাদ্য বানাতে হলে অনুজীবদের এই শক্তিকে কিভাবে ধরে রাখা যায় তা শিখতে হবে! এটা করতে পারে "মাইটোকন্ড্রিয়া"র মতো কিছু পদার্থ যাতে থাকে "ক্লোরোফিল" - সেই  'ব্লু গ্রীন এ্যলগি'। আর সে চেষ্টা থেকেই জন্ম নিল এক নতুন ধরনের অনুজীব। সেদিনের সমুদ্র নিবাসী সেইসব অনুজীবই প্রথম সম্ভাব্য কোষ (Cell) - অতি সাধারণ প্রোক্যারিওটস' (prokaryotes) - যা আধুনিক ক্লোরোপ্লাস্ট এর পূর্বজ - সেই উপকোষিয় কাঠামো যা উদ্ভিদ কোষের  মধ্যে ক্লোরোফিলকে ধরে রাখে এবং যেখানে শালোকসংশ্লেসন হয়ে থাকে।

আদিম সমুদ্রে এইভাবে ক্লোরোপ্লাস্ট এর সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে ব্লু গ্রীন এ্যলগিরা সালোকসংশ্লেষণ এর জন্য কার্বন ডাই অক্সাইডকে ব্যাবহার করে অক্সিজেন অনুর জন্ম দিতে শুরু করল এবং এইভাবে আমাদের আবহাওয়া পরিবর্তিত হতে থাকল। ব্লু গ্রীন এ্যলগিরা যে চূন নিঃসরণ করত তা জমা হচ্ছিল অগভীর সমুদ্রে যা সূর্যরশ্মির সান্নিধ্য পেয়ে জন্ম দিল প্রথম জীবিত আকৃতির - 'স্ট্রোমেটোলাইটস' এর। সালোকসংশ্লেষণের ফলে অক্সিজেন যুক্ত বুদ্বুদ তৈরি হচ্ছিল, এইসব স্ট্রোমেটোলাইটস এর উপরিভাগে, যা ধীরে ধীরে বাহিত হচ্ছিল রৌদ্রস্নাত সমুদ্র পৃষ্ঠে তারপর জল থেকে বিযুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল বায়ুমণ্ডলে। একবার বায়ুমণ্ডল এইভাবে অক্সিজেন সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়া এবং ওজোন স্তরের সম্পুর্ন বিকাশের পর প্রাণজ জীবদের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠ নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠল এবং পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে তাদের স্থানান্তরন শুরু হল স্থলভুমিতে এবং বিবর্তনের ফলে এভাবেই সৃষ্টি হল বায়ুজীবি প্রাণীর। এরপর থেকে প্রাণের বিবর্তন চলবে দুইটি নির্দিষ্ট পথে - এক, অক্সিজেন খেকো ও দ্রুত চলৎশক্তিসম্পন্ন প্রাণীকুলের, যা সুচনা করবে বায়ুজীবিদের বিবর্তনের। দুই, চলৎশক্তিহীন উদ্ভিদ জগতের যারা কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যাবহারকারী। এই দুই প্রজাতির মধ্যে তাই এক পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্কের সুচনা হবে। অক্সিজেনের প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন তাই প্রাণের বিকাশ ও বিবর্তনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এরপর ধীরে ধীরে সাধারণ 'প্রোকেরিওট' থেকে জন্ম হবে 'ইউক্যারিওটস' (eukaryotes) এর যাদের থাকবে কোষ এবং কোষকেন্দ্র (nucleus)। পরবর্তী ধাপে যৌন প্রজননের সুচনা হওয়ার ফলে বিবর্তনের গতি বেড়ে যাবে বহুগুণ যা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠবে, সুচনা হবে প্রজতিকরণের, সৃষ্টি হবে একের পর এক প্রজাতির এবং সৃষ্ট হবে সেই জীববৈচিত্রের যা আমরা এখন দেখতে পাই।

ফসিল বা অন্যান্য সুত্র বিশ্লেষন করে আমরা দেখতে পাই যে অস্তিত্বরক্ষার স্বার্থে পৃথিবীতে প্রাণীকুল অদম্য সহনশীলতাকে আত্মস্থ করতে সক্ষম, চরম প্রতিকুল পরিবেশেও তারা দিব্যি বেঁচে থাকার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। ২০১৩ সালে আন্টার্কটিকার এক কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত Whillans হৃদ থেকে একটি অনুজীবকে উদ্ধার করা হয়েছে। মেক্সিকোর একটি গুহার ৫০ ফিট গভীরে আবিস্কৃত হয়েছে অনুজীবদের উপনিবেশ। গুহাটিতে কার্বন মনোক্সাইড আর সালফারের বিষাক্ত পরিবেশ বিরাজমান। একইভাবে সমুদ্রের পাদদেশে প্রচন্ড উত্তপ্ত হাইড্রোকার্বন স্রোতের মধ্যেও সমৃদ্ধ অনুজীব উপনিবেশের সন্ধান মিলেছে। তাই প্রাণ ছড়িয়ে আছে এবং বর্ধিত হচ্ছে এই গ্রহের সর্বত্র, চরম প্রতিকুলতার মধ্যে, সে উষ্ণ প্রস্রবনেই হোক আর হিমায়িত হৃদেই হোক এবং সেই হৃদ ভুপৃষ্ঠের যতই গভীরে অবস্থিত হোক না কেনো। প্রাণ রয়েছে চরম অম্ল বা ক্ষারযুক্ত পরিবেশে কিংবা রেডিওএক্টিভ বিকিরণের মাঝেও। তাই এ থেকে নিঃসন্দেহে প্রমানিত হয় যে ছায়াপথের যে কোন প্রান্তে একইভাবে প্রাণের বিকাশ ও বিবর্তন সম্ভব।

এবার তাকানো যাক এই গ্রহকে ছাড়িয়ে। আমাদের ছায়াপথের অভ্যন্তরে বা বাইরে অন্য নক্ষত্রের বাসযোগ্য দূরত্বে অগুন্তি পৃথিবী সদৃশ শিলাযুক্ত গ্রহ থাকার এবং তাতে প্রাণের বিকাশ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতের বাইরে আজ অব্দি এরকম ৩৪০০ গ্রহের খোঁজ পেয়েছেন যাদের বলা হয় "এক্সোপ্ল্যানেট"কিন্তু এখন অব্দি কোন 'এলিয়েন' এর অস্তিত্বের প্রমাণ পাননি। 'এস্কোপ্যানেটের' উপস্থিতির প্রমান পাওয়া যায় নক্ষত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য যথা উজ্বলতা, অবস্থান ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে, যা নিকটস্থ গ্রহের উপস্থিতিতে প্রভাবিত হয়। আকাশে নক্ষত্রের গতিবিধি যা নক্ষত্রীয় বর্ণালীর ডপলার স্থানান্তরণ (Doppler Shift) দিয়ে পরিমাপ করা হয়, অথবা গ্রহের আবর্তনের ফলে নক্ষত্রীয় জ্যোতির পর্যায়ক্রমে হ্রাসবৃদ্ধি অথবা মাইক্রোবেন্ডিং নামক প্রযুক্তি (যাতে নক্ষত্রীয় মহাকর্ষ দ্বারা আলোকরশ্মির নমন (bending) এসবের প্রয়োগ করে এক্সোপ্ল্যানেটের অস্তিত্ব বোঝা সম্ভব। এছাড়া উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন টেলিস্কোপ দিয়ে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষনও জারি রয়েছে যেমন হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (২০০১), স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপ (২০০৩), ক্যারট (২০০৬) কিংবা কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ (২০০৯)।

কোন এক্সোপ্ল্যানেট আবিস্কৃত হবার পরই বিজ্ঞানীরা তাতে প্রাণিজ নিদর্শন খোঁজার চেষ্টায় ব্রতী হন। তার দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য অবলোহিত (infra red) বর্ণালী বিশ্লেষন করে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন এবং মিথেনের উপস্থিতি বোঝা সম্ভব। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সালোকসংশ্লেষণ বা অন্যান্য প্রানিজ প্রক্রিয়ায় এই দুই গ্যাস মুক্ত হয়।তাঁরা তরল জলেরও খোঁজ করতে পারেন কারণ প্রানের বিকাশের ক্ষেত্রে এটিও অপরিহার্য। ওজোন, কার্বন ডাই অক্সাইড বা জৈব সালফারের উপস্থিতিও প্রাণের ইঙ্গিতবাহী। যদিও প্রাণের অস্তিত্ব ছাড়াও অন্য কোন জৈব প্রক্রিয়ায় এইসব গ্যাস উৎপন্ন হতে পারে। আবার এরকম কোন নিদর্শন না পাওয়া সত্ত্বেও এমনটাও হতে পারে যে প্রানের কোন প্রকারের অস্তিত্ব হয়তো এসব গ্রহপৃষ্ঠের গভীরে বহমান - হয়তো সমুদ্রের গভীরে অথবা মিথেন বা এমোনিয়া জাতীয় জৈব পদার্থের অন্দরে প্রান তার নিজস্ব ছন্দে বর্ধিত হচ্ছে।

 

বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতের অভ্যন্তরে এরকম নয়টি স্থানের খোঁজ পেয়েছেন যেখানে সমুদ্রের উপপৃষ্ট বা তরলীকৃত মিথেন অথবা এমোনিয়া জাতীয় জৈবের মধ্যে প্রাণের বিকাশ হওয়া সম্ভব। যেমন মঙ্গল, সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহাণু 'সেরেস', বৃহস্পতির চাঁদ - ইউরোপা, গ্যানিমেইড, ক্যালিস্ট্রো ও নেপচুন ও প্লুটোর বৃহত্তম উপগ্রহ। মঙ্গলপৃষ্ঠে একসময় জলস্রোত প্রবাহিত হত যার কিছু নিদর্শন এখনও গ্রহাভ্যন্তরে বহমান। ইউরোপার বহির্পৃষ্ঠে রয়েছে অনেকগুলো ফাটল যা বরফাবৃত। এর অভ্যন্তরে রয়েছে সমুদ্র যা জলীয় অবস্থায় রয়েছে কারণ বৃহস্পতির অন্য চাঁদের প্রভাবে আভ্যন্তরীন তাপশক্তির সৃষ্টি হচ্ছে, জোয়ার ভাটা হবার ফলে। এই সমুদ্রের পাদদেশে হাইড্রোকার্বণের স্রোতও থাকা সম্ভব যেমনটা দেখা যায় এই গ্রহে। এনসিলাডাস (Enceladus) এ রয়েছে ভুগর্ভস্থ জল, টাইটান এ রয়েছে বিশাল সমুদ্র, রয়েছে মিথেন ও ইথেনের হৃদ। প্লুটোকে খুব গুরুত্ব দিয়ে নাসার মহাকাশযান "নিউ হরাইজন" থেকে পর্যবেক্ষন করা হচ্ছে। এই গ্রহের উত্তরাংশের বরফাবৃত পর্বতমালার মাঝে বিশাল আকারের হিমায়িত সমতল ভুমির খোঁজ পাওয়া গেছে। এটির নামকরণ করা হয়েছে 'Tombaugh Region' - বিজ্ঞানী Clyde Tombaugh' এর নাম অনুসারে, যিনি ১৯৩০ সালে প্লূটো আবিস্কার করেছিলেন। কিন্তু এখন অব্দি এরকম কিছু পাওয়া যায়নি যা দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে বা থাকা সম্ভব।

 

এটা বোঝা যাচ্ছে যে যদি সেরকম কোনো 'এলিয়েন' বুদ্ধিদীপ্ত সভ্যতা থেকে থাকে, যারা অন্তত বুদ্ধিমত্তায়  আমাদের সমকক্ষ এবং যদি তারা আমাদের মতোই যোগাযোগ করতে ইচ্ছুক তবেই পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাবার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা। ১৯৬১ সালে ফ্র্যাঙ্ক ড্রেইক নামক একজন রেডিও মহাকাশবিদ পৃথিবী থেকে কতটি 'এলিয়েন' সভ্যতা সনাক্ত করা যেতে পারে তার সংখ্যাতত্ব নিয়ে একটি সমীকরণ তৈরি করেন যা ড্রেইক সমীকরণ ( Drake Equation) নামে পরিচিত। 

এটি এরকম :


N = R*.fp. ne. fl. fi. fc. L, w

যেখানে 
N - আমাদের ছায়াপথের অন্তর্গত সেইসব সভ্যতার সংখ্যা যাদের তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণ সনাক্ত করা সম্ভব।
R* - বুদ্ধিদীপ্ত প্রাণের বিকাশের উপযোগী নক্ষত্র সৃষ্টির হার।
fp - সেইসব নক্ষত্রের শতাংশ যাদের গ্রহমন্ডলী রয়েছে।
ne - প্রতি সৌরজগতে সেরকম গ্রহের সংখ্যা যাতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ বর্তমান।
f1 - সেইসব গ্রহের শতাংশ যাতে বাস্তবিক প্রাণের উদ্ভব হয়েছে।
fi - প্রাণের বিকাশযুক্ত সেইসব গ্রহের শতাংশ যাতে উন্নত সভ্যতা তৈরি হয়েছে।
fc -  যারা প্রযুক্তি ব্যাবহার করে, সনাক্ত করা যায় এমন 'সিগন্যাল' পাঠাতে সক্ষম এবং যা দিয়ে মহাশূন্যে তাদের অস্তিত্ব ধরা পড়ে সেইসব সভ্যতার শতাংশ
L - সেইসব সভ্যতার বয়সসীমা।

এতে শুধু প্রাণের বিকাশের উপযোগী নক্ষত্র সৃষ্টির হার অনেকটা নির্ধারণ করা সম্ভব। বাকি সমস্ত বিষয় অনিশ্চিত ও আমরা শুধু কল্পনা করতে পারি। এরপরও কিন্তু ড্রেইক আমাদের ছায়াপথে এরকম ১০০০০ সভ্যতার সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন। ড্রেইকের এই সমীকরণ সাধারণ হলেও খুবই চিত্তাকর্ষক। এ থেকে বোঝা যায় যে প্রানের বিকাশ প্রাকৃতিক ও মহাজাগতিক কিছু ঘটনার ফলশ্রুতি মাত্র এবং সেভাবে দেখতে গেলে এই মহাবিশ্বে আমাদের কোন বিশেষ অবস্থানগত উৎকর্ষ নেই, যদিও আমরা ছাড়া আর কোথাও প্রাণের খোঁজ মেলেনি এখন অব্দি।

যদিও "সার্চ ফর এক্স্ট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স" (SETI) একটি যৌথ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রকল্প যা মহাবিশ্বে বুদ্ধিদীপ্ত সভ্যতার খোঁজ করার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত হয়েছিল। এই খোঁজ শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে ইউ.কে-এর ম্যানচেস্টার এ লভেল রেডিও টেলিস্কোপের প্রথম প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। ১৯৮৪ সালে SETI সংগঠন স্থাপিত হয়। উদ্দেশ্য - 'মহাবিশ্বে প্রানের প্রকার ও ব্যাপকতার সন্ধান, উপলব্ধি ও উৎসের অধ্যয়ন'। বর্তমানে এই সংস্থার অধীনে অগুন্তি রেডিও টেলিস্কোপ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্যমান। এই সব টেলিস্কোপের ক্ষমতাবৃদ্ধির ফলে এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এখন অনেক বৃহত্তর ও গভীরতর রূপ পেয়েছে। কিন্তু সবকিছুর পরও আমরা অন্য কোথাও প্রাণের খোঁজ পাইনি। এটাই একটা হেঁয়ালি।

মনে রাখতে হবে পৃথিবী মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন বছর পুরোনো এক গ্রহ এবং যে সূর্যকে তা আবর্তন করে চলেছে তাও মহাবিশ্বে তুলনামূলক ভাবে কমবয়সী। যদি প্রাণের উদ্ভব একটি যদৃচ্ছিক ঘটনা হয় তবে তবে অন্য গ্যালাক্সিতে অনেক আগেই তার উদ্ভব হয়েছে অন্ততঃ এই গ্রহের প্রচুর আগে। তাই এখন হয়তো সেইসব সভ্যতা মহাশূন্যে সফর, এমনকি সময় সফর (Time Travel) করার মতো প্রযুক্তি আয়ত্ব করে নিয়েছে। এমনকি হয়তো আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে তারা চলাচল করতে সক্ষম। তাঁরা এতদিনে হয়তো ছায়াপথে উপনিবেশ তৈরি করে ফেলেছে। বেঁচে থাকার স্বার্থে তাদের এইধরনের উপনিবেশ তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কারণ এতদিনে তাদের গ্রহস্থিত শক্তি নিঃশেষিত হতে বাধ্য, হয়তো তাদের সূর্যের দীপ্তিও ক্ষীয়মান এবং শক্তি সরবরাহ করতে অনেক আগেই অক্ষম হয়ে পড়েছে। তাই তাঁরা অন্য কোন সৌরমন্ডল, অন্য কোন ছায়াপথে আশ্রয় নিতে বাধ্য। তাহলে তাঁরা কেন আমাদের এতদিনে খুঁজে পেলনা ? কেন আমাদের আবিষ্কার করতে পারলনা ? কেন তাঁরা এতদিনে মহাশূন্যে আমাদের পাঠানো রেডিও সিগন্যাল রোধ করলনা বা তাতে সাড়া দিলনা  ? এই প্রশ্নই করেছিলেন বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি ১৯৫০ সালে, যা ফার্মির বৈপরীত্য বা Fermi Paradox নামে খ্যাত।

হয়তো এই মহাবিশ্বে আমরা একা যা আমাদের অসাধারণত্ব দিয়েছে এবং আমাদের গ্রহও হয়তো মহাবিশ্বে প্রাণের একমাত্র আশ্রয়দাতা হিসেবে বিরলতম এক গ্রহ। সেইক্ষেত্রে ড্রেইকের সমীকরনের একটি সংখ্যা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হতে বাধ্য। অথবা হয়তো সেইসব 'এলিয়েন' দের অন্য গ্যালাক্সিতে উপনিবেশ গড়ার দরকার পড়েনি কারন প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা আয়ত্ব করে হয়তো তারা নিজেদের গ্রহের শক্তির আকালকে কাটিয়ে ওঠতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু মহাবিশ্বের ব্যাপকতা ও গভীরতাকে ভাবলে এই উত্তর সম্ভাব্য বলে মনে হয়না। আরেকটি সম্ভাবনাও উঁকি দেয় - হয়তো কোন ভয়ঙ্কর আনবিক যুদ্ধের ফলে তাঁরা নিজেরাই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে, যার প্রায় দোড়গোড়ায় আমরাও দাঁড়িয়ে ছিলাম বিগত শতাব্দীতে।

এছাড়া অন্য একটি সম্ভাবনাও রয়েছে। হয়তো তারা আমাদের আবিষ্কার করেছে, আমাদের পর্যবেক্ষনও করছে কিন্তু আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে চাইছে না। যে সভ্যতা এক গ্যালাক্সি থেকে অন্য গ্যালাক্সিতে চলাচল করার মতো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা আয়ত্ব করেছে তাঁরা নিশ্চয়ই অনেক পরিণত। তাঁরা নিশ্চয়ই এতদিনে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অসুস্থতা এমনকি শারীরিক মৃত্যুকেও জয় করার পদ্ধতি আয়ত্ব করে ফেলেছে। মানুষে মানুষে হানাহানি, যুদ্ধ ইত্যাদি নিশ্চয়ই তাদের কাছে সুদূর অতীতের ব্যাপার। তেমনি ঘৃনা, ধর্মান্ধতা, সামাজিক বিভেদ ইত্যাদি হয়তো তাদের মধ্যে অনেক আগেই অবলুপ্ত। পৃথিবীতে আমাদের ধরণধারণ - যেভাবে আমরা পরস্পর হানাহানি, রক্তপাত করি, যেভাবে আমরা পাশের মানুষটির উপর তুচ্ছ কারনে চড়াও হই, হত্যায় মাতি, ভয়ঙ্কর হিংসায় লিপ্ত হই তা হয়তো তাদের একদমই পছন্দ নয়। তাই একটি উন্নত আধুনিক সভ্যতার অংশ হবার ফলে আমাদের দেখে হয়তো তাদের বিতৃষ্ণা হয়, বিকর্ষণ হয়। 

কাজেই তাদের দোষ দেওয়া যায়না উল্টে আমাদেরই নিজেদের জন্য লজ্জিত হওয়া উচিত।

তথ্যসূত্র : 

1.Lemonick, Michael D.,“Is Anybody Out There”, National Geographic, July 2014; 

2. Caltling, David C., Astrobiology, A Very Short Introduction, OUP, New York, 2013;

3. Asimov, Isaac, Asimov’s Guide to Science, Penguin Books, 1987; 

4. Cockell, Charles, Astrobiology and the Search for Extraterrestrial Life, University of Edinburgh, 
Coursera, 2015;

5. Bhattacharjee, Govind, Story of the Universe , Vigyan Prasar,2018