বিজ্ঞান বিষয়ক

শরৎকালীন প্রকৃতি ও পরিবেশ বন্দনা


ডঃ পার্থঙ্কর চৌধুরী

Parthankar Choudhury.jpg

‘নবপত্রিকা’! সেদিন একটা বাচ্চা ছেলেকে জিজ্ঞেস করায় সে বলছিল, এটা আবার কোন পত্রিকা? আনন্দবাজার পত্রিকা জানি, যুগশঙ্খ-সাময়িক-গতি-প্রান্তজ্যোতি-বার্তালিপি এমনকি দৈনিক নববার্তা-র নামও জানি। এটার নাম তো কোথাও শুনিনি। তবে কি এটা নতুন কোন খবরের কাগজ? কোথা থেকে বেরুচ্ছে? কারা বের করলো? ইত্যাদি… ইত্যাদি… যাক গে…! এই প্রজন্মের কাছে ‘দশভুজা’, ‘মহিষাসুর-মর্দিনী’… এই শব্দগুলোর চাইতে দুর্গাপূজার এই ক’দিন শুভেচ্ছা বিনিময়ের ভাষা, ‘Happy Pujo…’ 

দুর্গাপূজার প্রচলনের একেবারে গোঁড়ার দিকে যে কৃষি নির্ভর অর্থাৎ agrarian একটা দৃষ্টিকোণ ছিল, সে দিকটা আমাদের ক’জনেরই বা জানা?  গাছ-লতা-পাতা ইত্যাদির সংরক্ষনের একটা যে গভীর দার্শনিক তত্ত্ব এর পিছনে নিহিত রয়েছে এর কোন কিছুই আজকের দিনের বিগ বাজেটের এবং সাড়ম্বরপূর্ণ শারদীয়া পূজার বাহ্যিক জাঁক-জমক এবং বহিরাম্বরে ধরা পড়ে না। পড়ার কথাও নয়! ‘কলাবউ’-এর কথাই ধরুন না। ‘নবপত্রিকা’, এটা কি জিনিস ওই ছেলেটা যেমন বোঝে নি, এবং ওর মা-বাবা গোছের লোকেরা যাকে সাধারনতঃ গণেশের বউ বলে ভ্রম করেন, আসলে তিনি যে আসলে গণেশের বউ নন, মা… এই ধন্ধে তো অনেক মা বাবাই রয়েছেন। মাকে বউ বলে চালানোর একটা  অজ্ঞতা-নির্ভর-প্রয়াশ! বলিহারি!

‘রম্ভা কচ্চী হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্ব দাড়িমৌ।
অশোকা মানকচোব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা’।। 


গাছ-লতা-পাতা ইত্যাদি বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ দিয়ে বানানো প্রকৃতি-স্বরূপিনী প্রতীকী দেবী দশভুজা। ‘নবপত্রিকা’- আক্ষরিক অর্থে বোঝায় নয়টি পাতা। কলাগাছ, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, অমলতাশ (মানকচু), ধান এই উদ্ভিদ-ই নবপত্রিকা বানানোর উপাদান। নবপত্রিকার মধ্য দিয়ে এক্ষেত্রে নয়টি গাছের ব্যবহার এবং তাদের সংরক্ষণের বার্তাই দেওয়া হয়েছে। ভেষজ গুনের দিক দিয়ে গুরুত্ব পূর্ণ এই নয়টি উদ্ভিদ আসলে দেবী দুর্গার নয়টি রূপের প্রকাশ। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত নয়টি গাছের প্রত্যেকটির মধ্যে রয়েছেন এক একজন অধিষ্ঠাত্রী দেবী। কলাগাছে দেবী ব্রহ্মাণী। দেবী ব্রহ্মাণী হচ্ছেন রক্তবর্ণা দেবী। আর ওদিকে কলার মোচার রং-ও লাল। কচু গাছে দেবী কালিকা। কৃষ্ণ-কচু গাছের রং অনেকটাই কালীর গায়ের মতো। হলুদ গাছে দেবী ঊমা। দেবী উমা, অর্থাৎ মা দুর্গার গায়ের রং কাচা হলুদের মতই উজ্জ্বল। জয়ন্তী গাছ (Sesbania sesban)-এ দেবী কার্ত্তিকী। কার্ত্তিকের বাহন ময়ুরের গলার রং জয়ন্তী ফুল এর মতই। যেহেতু মহাদেবের প্রিয় গাছ হচ্ছে বেলগাছ তাই বেল গাছে দেবী শিবা। আর যেহেতু ডালিম ফুলের রং আর রক্তদন্তিকা-র রং একই, তাই ডালিম গাছে দেবী রক্তদন্তিকা। অশোক গাছ (Saraca asoca )-এ দেবী শোকরহিতা। অশোক গাছকে ইংরেজিতে ‘sorrow-less’ অর্থাৎ দুঃখ-নাশক গাছ বলে বিবেচনা করা হয়। ঘরে অশোক গাছ লাগালে সমস্ত বাধা বিপত্তি দূর তথা সুখ সমৃদ্ধি বাড়ে বলে বাস্তুশাস্ত্রেও বলা রয়েছে। দেবী চামুণ্ডার জিহবা মানকচু-র পাতার মতই, তাই ওই গাছটিতে রয়েছেন দেবী চামুণ্ডা। আর ধান মানেই শস্য, এবং শস্য মানেই লক্ষ্মী। তাই ধান গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী। নবপত্রিকা বানানোর সময় কলাগাছের কাণ্ড (stem) টাকে মুল কাঠামো বানিয়ে বাকি সব লতাপাতাগুলোকে বিছিয়ে পুরোহিত একটা স্ত্রীলোকের আকৃতি বানিয়ে তোলেন। বিভিন্ন গাছ গাছালির এই প্রতীকী পূজাই সুদূর অতীতকাল থেকে চলে আসা সংরক্ষণবাদী মানসিকতার সাক্ষ্য বহন করে আসছে। পরিবেশ মনস্ক এরকম হাজারো উদাহরন ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের লোকেদের মধ্যে তথা বিভিন্ন উপজাতিদের মধ্যেও বিলক্ষণ দেখা যায়। 

পশ্চিমবঙ্গের উপজাতি অধ্যুষিত ঝারগ্রাম মেদিনীপুর জেলার একটা গ্রামে ৬০ একর জায়গা জুড়ে ‘পবিত্র স্থান’ বা ‘Sacred Grove’ নামক অরণ্য রয়েছে। অরণ্যের পূজিতা দেবী হচ্ছেন, ‘কনক-দুর্গা’। ‘কনক-দুর্গা’-র নামে সংরক্ষিত এলাকাতে চারশো-ও বেশি মুল্যবান প্রজাতির গাছ গাছালি সংরক্ষিত হয়ে আসছে। দেব-দেবীর পূজার্চনার নামে ‘সেক্রেড গ্রুভ’ বা ‘পবিত্র স্থান’ সংরক্ষনের এই ধ্যান-ধারনা এ দেশের উপজাতি লোকেদের মধ্যে বেশ পুরনো রেওয়াজ।

আবার ওদিকে দুর্গার কাঠামে থাকা বন্যপ্রাণীদের কথাই ধরুন না। ক্রমবিবর্তনের দিক দিয়ে বলতে গেলে পৃথিবীর বুকে একে একে যে সব বর্গের প্রাণীদের উদ্ভব হয়েছে, সেগুলো হল, যথাক্রমে, মাছ, উভচর, সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী। প্রথম দুটোর উদাহরন মৎস্যাবতার, কূর্মাবতার ইত্যাদিতে রয়েছে। এ দুটোকে বাদ দিলে, বাকি সবগুলো বর্গের প্রাণীরাই স্থান পেয়েছে দেবীর কাঠামে। সরীসৃপ –দের মধ্যে রয়েছে সাপ, মহাদেবের গলায় মাফলারের মতো পেছানো থাকে বিষধর কিং কোবরা। পাখিদের মধ্যে রয়েছে ময়ূর, পেঁচা আর রাজহাঁস। আর বিবর্তনের পথে সবচাইতে পড়ে সৃষ্টি হওয়া, অর্থাৎ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে সিংহ, মোষ, ষাঁড় এবং ইঁদুর। 

এদেশের লোকাচার তথা ধর্মাচারের দিক দিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় যে জীব-বৈচিত্র সংরক্ষন এদেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে গেঁথে রয়েছে। পাঁচ হাজারের বছরেরও বেশী সময় ধরে এটা আমাদের বদ্ধমূল সংস্কার। প্রতীকী অর্থে, এটা তো স্বীকৃতিই বোঝায়। প্রতিটি পশু-পাখির জন্য তো আলাদা আলাদা বৈদিক মন্ত্রও রয়েছে। শাস্ত্রের বিধান মেনে এদের তো পুজা করা হয়। সিংহের জন্য, ‘ ওঁ সিংহস্ত্বং হরিরূপসি স্বয়ং বিষ্ণুর্ণ সংশয়। পার্বত্যা বাহন স্ত্বং হি দংস্ট্রায়ুধোমহাবলঃ’।  ইঁদুরের জন্য, ‘এতে গন্ধ পুষ্পে ওঁ মূষিকায় নমঃ’। ঠিক একই ভাবে পেঁচা, ময়ুর, সাপ, হাঁস, মহিষ ইত্যাদি অন্যান্য সব বাহনের জন্যও আলাদা আলাদা মন্ত্রোচ্চারন  করে দুর্গা-লক্ষ্মী-সরস্বতীর  মতই পূজার তিন দিন এদেরও পুজা করা হয়।

সংরক্ষনের দিক দিয়ে বলতে গেলে এদের মধ্যে মধ্যে বেশ কিছু প্রাণীর সংখ্যাই কমে আসছে, তাই এদের সংরক্ষণের আওতায় রাখা আছে। সিংহ (Asiatic lion) এবং ময়ূর (Indian Peafowl) বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন, ১৯৭২ [Wildlife (Protection Act, 1972] মতে ১ম তপসিল (Schedule-1)এ রয়েছে, অর্থাৎ এদের সংরক্ষণের প্রয়োজন সবচাইতে বেশী। পেঁচাদের মধ্যেও বেশ কয়েকটি প্রজাতি যেহেতু ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তাই এরাও সংরক্ষণের দাবীদার। মহাদেবের গলায় থাকা বিষধর সাপটাও কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থা আই, ইউ, সি, এন-এর লাল-বই মতে  (Red Data Book of IUCN) মতে ক্রমশঃ কমে আসা অর্থাৎ Vulnerable পর্যায়ে পড়ে।

দশভুজার দশটি হাতের দুটির কথা যদি বিশেষ করে বলি, তাহলে বলতে হয়, এই দুটোর একটিতে রয়েছে ‘সাপ’, অপরটিতে ‘পদ্ম’। এই দুটোই যথাক্রমে ‘প্রাণী’ ও ‘উদ্ভিদ’ জগতের প্রতীকী। সামগ্রিক অর্থেই তাই শারদীয়া পূজা হল, পরিবেশ ও প্রকৃতির বন্দনা; প্রকৃতি-রূপিণী দেবী দুর্গার আরাধনা।

WhatsApp Image 2021-10-14 at 11.23.53 AM.jpeg