বিজ্ঞান বিষয়ক

নবায়নযোগ্য শক্তি হিসেবে ইথানল উৎপাদনের প্রাসঙ্গিকতা

 

রজত কান্তি দাস

১৫ আগস্ট ২০২১

ভারতে নবায়নযোগ্য শক্তি বা রিনিউএবল এনার্জির উৎপাদন প্রতি মাসে বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে আছে সৌর বিদ্যুৎ, বায়ুচালিত টারবাইন যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন সহ অনেক কিছুই। বিশেষ করে যারা শেয়ার বাজার ও ব্যবসা বাণিজ্যের খবরাখবর রাখেন তারা জানেন যে ভারতে রিনিউএবল এনার্জির উৎপাদন বেড়েই চলেছে। টাটা পাওয়ার ইতিমধ্যেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে ১০০ শতাংশ সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। এছাড়া আদানি গ্রিন এখন বিশ্বের অন্যতম সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি। যারা আদানি গ্রিনের শেয়ার কিনেছিলেন তাদের ভাগ্য পালটে গেছে। ইথানলও তেমনি একটি নবায়নযোগ্য বিকল্প শক্তির উৎস হিসেবে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে‌ ওঠছে এবং তাই অসমে ইথানল উৎপাদনের কাজ শুরু করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য এক অত্যন্ত সুখবর তো বটেই। এবং এটা বলা যেতে পারে যে সমগ্র ভারতের ক্ষেত্রেই তা বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসতে চলেছে।

 

যাইহোক, প্রথমে বলে রাখি যে ইথানল কী কাজে লাগে। ইথানল (Ethanol) হলো এক ধরণের জৈব রাসায়নিক পদার্থ যা সাধারণভাবে ইথাইল অ্যালকোহল নামেও পরিচিত। সাধারণত লোকে এটিকে শুধু অ্যালকোহল বলে থাকেন যা কিনা কিছুটা সাইকো অ্যাকটিভ কেমিক্যাল হওয়ার কারণে মদ জাতীয় অ্যালকোহলিক বিভারেজে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু অসমে যে ইথানল প্রস্তুত করার জন্য কারখানা স্থাপনের শিলান্যাস হয়েছে গত ফেব্রুয়ারি মাসে তা মদ তৈরি করার জন্য নয়। তাছাড়া এই ইথানল প্রস্তুত হবে বাঁশ থেকে যা কী না ভারতে এই প্রথম। এই ইথানলকে কাজে লাগানো হবে মূলত পেট্রোলজাতীয় জ্বালানির বিকল্প হিসেবে। ইথানল এক ধরণের জৈব জ্বালানি (Bio Fuel)। তবে শুধু ইথানল দিয়ে কোন মোটরকার চালানো যায় না। কিন্তু পেট্রোলজাতীয় ফসিল ফিউয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে ইথানলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত করা যায়। 

 

ইথানলকে জৈব জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছিল দশ বছর আগেই। পৃথিবীর অনেক দেশেই এর ব্যবহার হচ্ছে। এর সুবিধা ও অসুবিধা নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে যারা পরিবেশদূষণ নিয়ে চিন্তিত তারা ইথানলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন কারণ তা পরিবেশকে দূষণের মাত্রাকে কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। বাতাসে কার্বন কম্পাউন্ডের মাত্রা কমানোর জন্য অনেক দেশই ইথানল ব্যবহার করে আসছে। এছাড়া ভারতের মতো দেশ যেখানে আমাদের জ্বালানি তেল আমদানি করতে গিয়ে বিদেশী মুদ্রায় টান পড়ে সেখানে ইথানলের মতো এক জৈব জ্বালানি হলো দেশজ উৎপাদন। এতে খরচ কম এবং বিদেশী মুদ্রার সাশ্রয় ঘটে। এছাড়া অন্য দেশ থেকে জ্বালানী কিনতে গিয়ে আমাদের যে বাণিজ্য ঘাটতি ঘটে তারও অনেকটাই নিরসন হতে পারে ব্যাপক হারে ইথানলকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। ইথানলকে রিনিউএবল এনার্জি বলা হয় এই কারণে যে ইক্ষু কিংবা বাঁশ বা অন্য কোন শস্য সূর্যালোক থেকে সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে সৌরশক্তিকে ধরে রাখে তাই পরে জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগে। অর্থাৎ এর মূলে সৌরশক্তি রয়েছে বলেই এটাকে রিনিউএবল এনার্জি হিসেবে দেখা হয়। তাছাড়া বছরের পর বছর ধরে একই জায়গা থেকে এর কাঁচামাল সংগ্রহ হতে পারে তাই এটাকে রিনিউএবল এনার্জি হিসেবে দেখা হয়।

 

অসমে জৈব জ্বালানি হিসেবে বাঁশ ভিত্তিক ইথানল উৎপাদনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আলোচনা করার আগে এই ইথানলের ব্যবহার নিয়ে কিছুটা আলোচনা করে নিতে চাই। 


জ্বালানি হিসেবে ইথানল ব্যবহারের সুবিধা হলো এইগুলি।


১) ভারত সহ যে সমস্ত দেশ জীবাশ্মজাত জ্বালানি তেল (Fossil Fuel) আমদানি করে সেখানে ইথানল উৎপাদনের ব্যয় অনেকটাই কম। এর ফলে ফসিল ফিউয়েলের আমদানি কমিয়ে আনা সম্ভব।

২) ফসিল ফিউয়েলের ব্যবহার কমানোর ফলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কম হয়। ফসিল ফিউয়েল ও ইথানলের মিশ্রণ ঘটানোর অনুপাত হলো ৮৫/১৫। অর্থাৎ প্রতি ৮৫ লিটার ফসিল ফিউয়েল সঙ্গে ১৫ লিটার ইথানল মিশিয়ে যে ১০০ লিটার জ্বালানি পাওয়া যায় তা দিয়ে মোটরকার চালানো সম্ভব। তাই ১৫ শতাংশ হারে এক দিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমানো যায় তেমনি এই পরিমাণ জ্বালানি আমদানি না করে নিজের দেশেই উৎপাদন করা যেতে পারে। অর্থাৎ ফসিল ফিউয়েলের আমদানি ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করা সম্ভব। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব হয়। 

৩) ইথানলকে পুড়ালে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প বেরিয়ে আসে। অন্যদিকে পেট্রোল জাতীয় ফসিল ফিউয়েল, প্রাকৃতিক গ্যাস কিংবা কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করলে পরে তার থেকে গ্রিন হাউজ গ্যাস উৎপন্ন হয় তা পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে গ্লোবেল ওয়ার্মিঙের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। 

৪) পৃথিবীর সমস্ত ক্রান্তি মণ্ডলীয় দেশেই ইক্ষু, দানাশস্য কিংবা ভুট্টার চাষ হয়ে থাকে। এই সব থেকে ইথানল উৎপাদন হয়। তবে অসমে যে ইথানল কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে সেখানে বাঁশ থেকে ইথানল তৈরি করা হবে। এর ফলে চাষিরা এই ফ্যাক্টরিতে বাঁশ সাপ্লাই করে বাড়তি রোজগার করতে পারবেন।

৫) ইথানল উৎপাদনের কাঁচামাল যেহেতু কৃষিজাত তাই কৃষিক্ষেত্রে এবং ফ্যাক্টরিতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে এই ইথানল কারখানা। অসমে বাঁশভিত্তিক যে ইথানল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে সেখানে দেশের ১০ শতাংশ জ্বালানি তেল কম করে দেবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী বছর এর উৎপাদন শুরু হয়ে যাবে বলে জানানো হয়েছে।

ইথানল উৎপাদন ও ব্যবহারের কিছু অসুবিধাও রয়েছে। তবে বর্তমানে আমাদের দেশে যে পরিমাণে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয় তা অন্তত ১০ শতাংশ যদি কমানো যায় তার ফলে বিশাল পরিমাণে বিদেশী মুদ্রার সাশ্রয় হতে পারে। তাই সামগ্রিক ভাবে বিবেচনা করে এটুকু বলা যায় অসমে যে বাঁশভিত্তিক ইথানল উৎপাদনের কারখানা নির্মাণের কাজ চলছে তা আগামী বছর খানেকের মধ্যে এই অঞ্চলের কর্ম সংস্থান ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটিয়ে এক সুদূর প্রসারী সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। হয়ত বা আগামী দিনে ভারত বিশ্বের একটি বাঁশভিত্তিক ইথানল রপ্তানীকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। 

এখন আসি ফ্লেক্স ইঞ্জিন-এর প্রসঙ্গে। ফ্লেক্স ফিউয়েল ইঞ্জিন হলো এমন এক ধরণের ইন্টারন্যাল কম্বাশ্বন ইঞ্জিন যা দিয়ে পেট্রল, ইথানল কিংবা মিথানলের যে কোন অনুপাতের ব্লেন্ডিং দিয়ে মোটরকার চালানো যায়। এমন কি ১০০ শতাংশ ইথানল দিয়েও মোটরকার ইঞ্জিন চালানো সম্ভব। তাই ইথানলের চাহিদা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। ভারতে এই নিয়ে নানা ধরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একদিকে যেমন ফ্লেক্স ফিউয়েল ইঞ্জিন তৈরির উদ্যোগ হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে তেমনি কর্ণাটকে স্থাপিত হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ চিনি-ভিত্তিক ইথানল তৈরির কারখানা। অন্যদিকে অসমে যে বাঁশ-ভিত্তিক ইথানল কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে তাতেই দেশের ১০ শতাংশ ক্রুড ওয়েল আমদানি কমিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। 

ভারতে প্রতি বছর আট লক্ষ কোটি টাকা খরচ হয় শুধুমাত্র বিদেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার প্রায় খালি হয়ে যায়। এত বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা শুধুমাত্র জ্বালানি তেল আমদানির জন্য খরচ করাটা দেশের পক্ষে শুভদায়ক নয়। ২০২৫ সাল থেকে সরকার প্রতি বছর ৫০ হাজার কোটি টাকার ইথানল কিনবে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন শিল্প থেকে। তাই চিনি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। এর একটা বড় কারণ হলো চিনি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ইক্ষু থেকে ইথানল উৎপাদনে মনোযোগী হয়েছে। এর জন্য ইক্ষু উৎপাদনের জন্য সরকার ইক্ষুচাষের জন্য চাষজমির পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এদিকে অসমে বাঁশভিত্তিক ইথানল কারখানা ইথানল কারখানা স্থাপিত হতে চলেছে অসমের নুমুলিগড়ে। জ্বালানি হিসেবে চিনি-ভিত্তিক ইথানলের খরচ পড়বে লিটার প্রতি ৬০ টাকার মতো। ফিনল্যান্ডের একটি কম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে এই কারখানা নির্মাণের কাজ চলছে। ২০২২ সাল এই কারখানা থেকে উৎপাদন শুরু হয়ে যাবার কথা। অন্যদিকে বরাক উপত্যাকার পাঁচগ্রাম পেপার মিল বর্তমানে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এত বিশাল মাপের একটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার অকেজো হয়ে পড়ে থাকাটা রাজ্যের বিশাল ক্ষতির কারণ। তাই আমার মনে হয় এই কারখানাকে বাঁশভিত্তিক ইথানল উৎপাদনের জন্য কাজে লাগালে রাজ্যের উপকার হবে। এছাড়া এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ আসতে পারে এই ইথানল কারখানাকে কেন্দ্র করে।