বিজ্ঞান বিষয়ক

ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের নামে অবিজ্ঞান ও অপবিজ্ঞানের নির্ঘোষ

ড. শুভ্র প্রকাশ কাজলী

২১ মার্চ ২০২২

 

ড. শুভ্র প্রকাশ কাজলী, গবেষক ও এক্সিকিউটিভ সদস্য, ব্রেকথ্রু সায়েন্স সোসাইটি, সর্বভারতীয় কমিটি

সম্প্রতি একটা বিষয় নিয়ে সারা দেশে খুব বিতর্ক  চলছে। বিষয়টি হল – ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’, যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘ভারতীয় জ্ঞানধারা’। প্রশ্ন হলো – কী এই “ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম”? আর কেনই বা বিতর্ক চলছে এ নিয়ে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের অবশ্যই পড়তে হবে “জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০”। ইতিপূর্বে আমাদের দেশে বিশেষ একটি সংগঠনের  মুখে “ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম” – এই শব্দবন্ধটি কখনও কখনও শোনা গেলেও প্রথম কোনো সরকারি নথি হিসেবে “জাতীয় শিক্ষা নীতি-২০২০” –তে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। “জাতীয় শিক্ষা নীতি-২০২০”-র মধ্যে উল্লেখিত আছে যে, "ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম" বলতে আমাদের দেশের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা ‘প্রাচীন ও শাশ্বত ভারতীয় জ্ঞান এবং চিন্তাধারার’ যে দিকটাকে বোঝাতে চাইছেন, আগামী দিনে যেখানে যেখানে গণিত, জ্যোাতির্বিদ্যা, দর্শন, যোগব্যায়াম, স্থাপত্য, চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল, ভাষাবিজ্ঞান, সাহিত্য, প্রভৃতি পড়ানো হবে, সেখানে সেখানেই এই বিষয়গুলোকে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে তা অন্তর্ভুক্তও হয়েছে।

 
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সত্যি সত্যিই প্রাচীন ভারতে জ্ঞান বিজ্ঞানের নানান অগ্রগতি হয়েছিল, যা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। কিন্তু এ সম্পর্কে আমাদের দেশের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা তেমন কোনো মন্তব্য করছেন না। তার বদলে আমাদের দেশের নেতা ও প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে যে দাবিগুলো করেছেন, সেগুলো থেকেও ‘প্রাচীন এবং শাশ্বত ভারতীয় জ্ঞান এবং চিন্তাধারা’ বলতে ঠিক কী বলতে চান, তারও একটা সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। আর এখানেই সমস্ত আশংকা ও উদ্বেগের  কারণ অন্তর্নিহিত রয়েছে। 

 

খুব ভালভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, প্রাচীন ভারতের জ্ঞানধারার নামে যা কিছু দাবি করা হচ্ছে এবং শিক্ষা পাঠক্রমের মধ্যে যা কিছু অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে, সে সমস্ত কিছুর মূল ভিত্তি হল বিশ্বাস ও কল্পনা। এর কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। শুধুমাত্র ধর্মগ্রন্থের মধ্যেকার বিভিন্ন কাহিনী ও গল্পকাথাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার জোরালো চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি এটাও প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে যে, বৈদিক যুগেই আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সবকিছুই ছিল এবং বৈদিক সভ্যতাই ভারতের প্রাচীনতম সভ্যতা। সমস্ত কিছুর মধ্যেই একটা ধর্মীয় রঙ মেশানোর হীন অপচেষ্টা চলছে।


প্রাচীন ভারতের জ্ঞানধারার নামে যা কিছু দাবি করা হচ্ছে, তা কেন সঠিক নয় এ প্রসঙ্গে আসার আগে কতগুলি প্রাসঙ্গিক বিষয়ে বলা জরুরি। প্রথমত, যারা মনে করছেন আধুনিক বিজ্ঞান নতুন কী আর এমন করেছে, সবই তো মুনি ঋষিদের সময়ে ছিল, তারা এই কথা বলছেন আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিষ্কারগুলি হওয়ার পর। তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয় যে ধর্মগ্রন্থে যদি সব থেকে থাকে, তবে আজ থেকে পাঁচ বছর পর ঠিক নতুন কী আবিষ্কার হবে, ওসব পড়ে এখনই তা বলুন দেখি। নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে, এ প্রশ্নের কোনও সদুত্তর মিলবে না।


দ্বিতীয়ত, গবেষণা কেবল সেসব বিষয়েই হয়, যার পেছনে একটা বাস্তব ভিত্তি থাকে। গবেষণার দ্বারা কোনো বিশেষ ঘটনার মধ্যেকার কার্যকারণ সম্পর্ককে খুঁজতে হলে প্রথমে কতগুলি আনুমানিক প্রকল্প দাঁড় করাতে হয়। সেই প্রকল্পগুলিকে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করতে হয় এবং পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত ফলাফল যদি তত্ত্বের সঙ্গে মেলে, তবেই ঐ বিশেষ প্রকল্পকে সত্য বলে গণ্য করা হয়। সম্প্রতি শুধু প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যের নামে নিছক কিছু দাবি করা হচ্ছে এটুকুই নয়, এই সব দাবির পেছনে প্রমাণ খুঁজতে গবেষণা করার কথাও উঠছে। নিছক বিশ্বাস বা কল্পনার পেছনে প্রমাণ খুঁজতে গবেষণা একেবারেই অযৌক্তিক। 


এবার আলোচনা করা যাক, ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের নামে যা চলছে, তার পেছনে সত্য কতটা। কোনোকিছু সত্য কিনা, তা জানতে হলে জানা দরকার প্রকৃত অর্থে সত্য কী? সত্য মানেই হলো বস্তুনিষ্ঠ সত্য, যা মানুষের চেতনা নিরপেক্ষভাবেই অবস্থান করছে অর্থাৎ কেউ বুঝুক কিংবা নাই বুঝুক, বস্তু জগতের মধ্যে, প্রকৃতি জগতের মধ্যে ও সমাজের মধ্যে একটা বিশেষ নিয়ম কাজ করছে, সেটাকেই সত্য বলা হয়। আর এই সত্যকে উদঘাটন করতে হলে চাই পরীক্ষা নিরীক্ষা। মনগড়া ধারণার দ্বারা সত্য নির্ধারণ হয় না। পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচাই ও যুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত সত্যই প্রমাণিত সত্য, বৈজ্ঞানিক সত্য। তাই বিজ্ঞান সবসময়-ই প্রমাণের দাবি করে। কার্ল পপারের ভাষায় (কনজেকচারস অ্যান্ড রেফুটেশনস): বিজ্ঞান প্রামাণ্য, কষ্টিপাথরে যাচাই না হলে বিজ্ঞানের কোনও মূল্য নেই। সত্য নির্ধারণের প্রকৃত মাপকাঠিতে ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমেরনামে যে সব দাবি করা হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাক, এইসব দাবির পেছনে সত্য কতটা রয়েছে। 


আই আই টি খড়গপুরের সেন্টার অফ এক্সেলেন্স ফর ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত ক্যালেন্ডারে সিন্ধু সভ্যতাকে বৈদিক সভ্যতারই অঙ্গ হিসাবে দাবি করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই সঠিক নয়। ১৯২২ সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কার এবং তার দু’বছর পর হরপ্পা আবিষ্কার হওয়ার পর খোঁড়াখুঁড়ি করে যেসব তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, তার ভিত্তিতে ঐতিহাসিকরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। এই সুত্রগুলি হল -

১) সিন্ধু সভ্যতার মানুষ ইটের ব্যবহার জানত, কিন্তু বৈদিক সভ্যতার মানুষ তা জানত না। বৈদিক সভ্যতার এক হাজার বছরের ব্যাপ্তিতে ইটের ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


২) খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত সিন্ধু সভ্যতার সিলমোহরগুলিতে লিপির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই লিপির পাঠোদ্ধার করা এখনও সম্ভব না হলেও এটা পরিষ্কার যে, সিন্ধু সভ্যতায় মানুষের লিখিত ভাষা ছিল। কিন্তু বৈদিক সভ্যতায় দীর্ঘকাল আর্যদের কোনো লিখিত ভাষা ছিল না। ঋকবেদ দীর্ঘদিন পর্যন্ত স্মৃতি ও শ্রুতিভিত্তিক ছিল। অনেক পরে লেখার প্রচলন হয়েছে।


৩) বৈদিক সভ্যতার কোনো সাহিত্যেই বাঁধানো রাস্তা, জল নিকাশি ব্যবস্থা, ঢাকা পয়ঃপ্রণালী প্রভৃতি নগর জীবনের বর্ণনা পাওয়া যায়নি।

 
৪) বৈদিক সাহিত্যের প্রধান পশু হল ঘোড়া। অথচ, কোনও ভারতীয় জঙ্গলে বন্য ঘোড়া নেই, ভারত ভূখণ্ডে কোনো ঘোড়ার ফসিলও পাওয়া যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার প্রধান পর্যায়ে ঘোড়া সেখানে ছিল না। তা হলে বলা যায়, ঘোড়া ভারত ভূখণ্ডে তার পরে এসেছে এবং এমন কোনও জায়গা থেকে এসেছে, যেখানে বন্য ঘোড়া ছিল। কিন্তু ভারতে এখন কোথাও বন্য ঘোড়া নেই, এর আগেও ছিল না। 


এই কয়েকটি সুত্রের ভিত্তিতে ঐতিহাসিকরা প্রমাণ করেছেন যে, সিন্ধু সভ্যতা কোনোমতেই বৈদিক সভ্যতার অঙ্গ নয়। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ইতিহাসবিদরা প্রমাণ করেছেন যে, সিন্ধু সভ্যতা প্রাক্-আর্য সভ্যতা।


এছাড়াও গত পাঁচ বছরে জিনোম সিকোয়েন্সিং করে আরও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (ভারত সমেত) জনগণের Y-chromosome এর মধ্যে haplogroup R1a নামে একটি অংশ আছে, যেটি সিন্ধুসভ্যতায় পাওয়া কঙ্কালের জিনোমে পাওয়া যায়নি। এই haplogroup টির উৎসস্থল মধ্যএশিয়ার স্তেপভূমি। অর্থাৎ সিন্ধুসভ্যতার জনগোষ্ঠী আর পরবর্তীকালের ভারতীয় মানুষের জিনগত পার্থক্য আছে, আর পার্থক্যটা হয়েছে স্তেপভূমি থেকে আগত পুরুষপ্রধান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশ্রণের ফলে। এই মিশ্রণের সময়কালও চিহ্নিত হয়েছে: ৪০০০ থেকে ৩৫০০ বছর আগে।


আই আই টি খড়গপুরের এই ক্যালেন্ডারে আরও বলা হয়েছে যে, আর্যরা ভারতে অনুপ্রবেশ করেনি এবং ‘আর্য আক্রমণের তত্ত্ব’ ভুল। এটা আসলে হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ, কারণ ‘আর্য আক্রমণের তত্ত্ব’ ঐতিহাসিকরা বলেন না। বলেন স্তেপভূমির মানুষের ভারত ভূখণ্ডে আগমনের কথা, যা আজ প্রমাণিত।  আমাদের দেশের প্রশাসনিক কর্তাদের এই দাবি সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার তার গবেষণাপত্র দ্য থিওরি অফ আরিয়ান রেস অ্যান্ড ইন্ডিয়া: হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স-এ যুক্তির ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “যেহেতু অতীতে হিন্দুত্বের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা ছিল না, তাই একটি হিন্দু পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তাকে প্রণয়ন করতে হয়েছিল। যুক্তি ছিল যে আদি হিন্দুরা ছিল আর্য, ভারতের একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী… আর্যরা ভারতের আদিবাসী হওয়ায় আর্যদের কোনো আগ্রাসন ছিল না এবং তাই ভারতের মানুষের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ সম্ভবপর ছিল না... দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিল বহিরাগত, যেমন মুসলমান, খ্রিস্টানদের আগমনের সাথে সাথে। হিন্দু আর্যদের এই বিদেশীদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত যুদ্ধ করতে হয়েছে।”


বর্তমানে আমাদের দেশের সরকার প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যের নামে নানান অবৈজ্ঞানিক চিন্তাকে ও নানান আষাঢ়ে দাবিকে গায়ের জোরে সত্য বলে প্রমাণ করতে চাইছে, বিশেষত এটা প্রমাণ করতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যে, ভারতবর্ষ বিশুদ্ধ হিন্দুদের দেশ ও একমাত্র হিন্দু ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। পাশাপাশি প্রাচীন ভারতের সত্যিকার গৌরবকেও হেয় করছে। তাই আসলে তারা চায় চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা প্রচার এবং প্রসারের মধ্য দিয়ে যুক্তিবাদী মনকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে এবং প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যকে গৌরবান্বিত করে উগ্র জাতীয়তাবাদী মনন তৈরি করতে। এই উদ্দেশ্যেই একদিকে একের পর এক অবৈজ্ঞানিক দাবি করা হচ্ছে, তা সে মহাকাব্যকে ইতিহাস বলে দাবি করা হোক, কিংবা প্রাচীন ভারতে স্টেমসেল, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজির আবিষ্কারের কথা হোক, কিংবা আর্যদের ভারতের আদি বাসিন্দা বলে দাবি করা হোক।


বর্তমান সময়ে মুল্যবোধভিত্তিক বিজ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে সর্বভারতীয় বিজ্ঞান সংগঠন হিসেবে ব্রেকথ্রু সায়েন্স সোসাইটি একদিকে প্রতিটি অবৈজ্ঞানিক দাবিকে সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করে প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরছে, অন্যদিকে জনমানসে বিজ্ঞানভিত্তিক মানসিকতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দেশ জুড়ে বিজ্ঞান আন্দোলনকে তীব্রতর করার আহ্বান জানাচ্ছে। তাই আসুন, বিজ্ঞান আন্দোলনের ঝাণ্ডাকে উর্দ্ধে তুলে ধরে বর্তমান সময়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করি।