বিজ্ঞান বিষয়ক

প্রাণদায়ী আজ প্রাণঘাতী

সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়

২১ মার্চ ২০২২

 

গ্রীণ হাউস এফেক্ট ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায় ...

Global Warming.png

পৃথিবীর ভৌত-রাসায়নিক বিবর্তনে প্রাণোপযোগী পরিবেশের আবির্ভাব :

 

৪৬০ কোটি  বছর আগে সদ্যোজাত পৃথিবীটা ছিল জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড। সাধারণ ১০০০-১২০০০C এর অগ্নিশিখা নয়, ৪০০০০Cএর অধিক উষ্ণ আগুনের গোলা। সব উত্তপ্ত বস্তুই তাপ ছেড়ে দেয়, দিয়ে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়, যদি না তার মধ্যে সূর্যের মত বিশাল ভর আর অবিরত নিউক্লিয়ার সংযোজন হতে থাকে। পৃথিবী ঠাণ্ডা হয়ে কোন কোন গ্যাস একসময় তরল অবস্থায় এল, কিন্তু তখনো তারা ফুটছে। অবিরত তাপ মহাশূণ্যে নির্গত হয়ে উষ্ণতা কমে ১৫০০০C হলে উত্তপ্ত তরলগুলির মধ্যে কোন কোনোটি কঠিন হয়ে গেল। ভেতরে ফুটন্ত তরল এর বাইরে বেষ্টন করে তৈরী হল কিছু কঠিন আস্তরণ, কমলালেবুর ওপরে খোসার মতো। উষ্ণতা কমে যখন ৭০০০C, খোসাটা তখন ৮ কিমি পুরু। এই খোসাটার দরুণ ভিতরের তাপ নির্গমনের হার কমে গেল। অভিকর্ষের দরুণ খোসাকে ঘিরে থাকল যে বাষ্প বা গ্যাসের আবরণ সেখানে তাপনির্গমন আর উত্তপ্ত অনুর অনন্ত ছোটাছুটি হতে থাকল। যে সব গ্যাস খুব হালকা তারা মহাশূণ্যে হারিয়ে গেল, অন্যরা আরো ঠাণ্ডা হয়ে শূরু হল বৃষ্টি, পৃথিবীতে পড়ে আর উবে যায়, আবার ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টি হয়। ৬০০০০ বছর ধরে বৃষ্টি কখনোই থামে না। অবিরত ধারাপাতে পৃথিবী অনেক শীতল হল, আরো পুরু হওয়া কঠিন আস্তরণের বহু জায়গা সংকুচিত য়ে খানাখন্দ হলো, যেখানে জল জমে হলো মহাসমুদ্র। এইভাবে ১৬০ কোটি বছর কেটে গেছে।
            

বিজ্ঞানীরা একমত যে এইসময়ে যে বায়ুমণ্ডল তৈরী হল তা বিজারক। অক্সিজেন ছিল না। এক দলের মতে বায়ুতে ছিল কার্বন ডাই অক্সাইড(CO2), অ্যামোনিয়া(NH3) ও মিথেন(CH4)। অন্যদলের মতে CO2, হাইড্রোজেন(H2) ও নাইট্রোজেন(N2), পৃথিবীতে তখনো ধেয়ে আসছে প্রাণঘাতী সৌর এক্সরশ্মি, সৌর অতিবেগুনী রশ্মি ও মহাজাগতিক রশ্মি, মাটিতে উল্কা আছড়ে পড়ছে ঘন ঘন। কিন্তু উভয় মতেই বায়ুমন্ডল তখন কার্বন-ডাই-অক্সাইডে ভর্তি যা ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ বেশ কিছুটা শোষণ করে বায়ুমন্ডলে আটকে রাখে। ১৯৫৯ সালে উরে ও মিলার গবেষনাগারে আবদ্ধ কাচগোলকে CO2, NH3, CO2 নিয়ে অবিরাম  বিদ্যুৎস্ফুলিঙ্গ প্রয়োগ করে অনেকটা ৩০০ কোটি বছর আগেকার পৃথিবীর মত পরিবেশ সৃষ্টি করলেন। ৭ দিন পরে দেখলেন অবশিষ্ট পদার্থে তিনটি অ্যামাইনো অ্যাসিড পাওয়া গেল। অ্যামাইনো অ্যাসিড পলিপেপটাইড শৃঙ্খল গঠনের মাধ্যমে প্রোটিন এর গঠনগত একক, প্রোটিন জীবকোষের প্রোটোপ্লাজম এর গঠনগত একক। সাত বছর পরে CO2, N2, H2 নিয়ে অনুরূপ পরীক্ষায় অ্যাবেলসন দেখালেন ফরম্যালডিহাইড (HCHO) ও হাইড্রোসায়ানিক অ্যাসিড(HCN) পাওয়া যায়। এই HCN ও অতিবেগুনী রশ্মির সংঘাতে ১৬ রকম অ্যামাইনো অ্যাসিড পাওয়া সম্ভব। উনি আরো দেখালেন HCN ও জল থেকে তৈরী হয় কিছু পলিপেপটাইড শৃঙ্খল। যে HCN তীব্র ঘাতক গ্যাস, হিটলার গ্যাস চেম্বারে প্রয়োগ করতেন, আদি পৃথিবীতে তা ছিল প্রাণের আদি রাসায়নিক। আর HCHO– একে উত্তপ্ত করলে পাওয়া যায় শর্করা যা জীবকোষের জীবনীশক্তি যোগান দেয়। জীবকোষ তৈরীর উপাদান হয়ে গেল।
           

প্রমাণ হল দুই রকম বিজারক পরিবেশ এর দুটিই ঠিক, হয়ত দুই ছিল। সমুদ্রজলে বিচিত্র জৈব যৌগ উৎপাদনের খেলায় সালফার ফসফরাস ক্যালসিয়াম প্রভৃতি মৌলসমূহের আদান প্রদান হতে থাকল। ঘোরাতে ঘোরাতে নিতান্ত আন্দাজে যেমন রুবিক কিউবের সব কিছু হঠাৎ মিলে যায়, তেমন (যেন প্রকৃতির মনোনয়নে- by natural selection) একদিন গঠিত হল কোষপ্রতিম (Pro-cell)। দীর্ঘ “রাসায়নিক বিবর্তন”(chemical evolution) শেষে উৎপন্ন কোষপ্রতীম বস্তু যেন প্রাকৃতিক নির্বাচনে জয় পেল। কোষপ্রতিম থেকে দুটি ধারায় শুরু হলো জৈবনিক (biological evolution) বিবর্তন– উদ্ভিদকোষের আদি প্রোক্যারিওটিক টাইপ মনেরা (monera) ও প্রানীকোষের আদি প্রোক্যারিওটিক টাইপ প্রোটিষ্টা (protista)।
           

একটু একটু করে এককোষী উদ্ভিদ বিশ্বময় সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়লে বায়ুমণ্ডলে জমতে থাকলো অক্সিজেন(02), ৩০ কিমির উপরে তা অতিবেগুনী রশ্মির সংস্পর্শে উৎপন্ন করল ওজোন(O3)। ঊর্দ্ধাকাশে ওজোন জমে গেলে ব্যহত হল এক্সরশ্মি ও অতিবেগুনী রশ্মির আগমন, সম্পূর্ণ হলো জীব বিকাশের পরিবেশ। বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব বেড়ে গেলে বায়ুর ঘর্ষণে অনেক উল্কা বায়ুমন্ডলেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল। ভূপৃষ্ঠে উল্কার আঘাত কমে গেল অনেক। এই সব হতে সময় নিল আরো ১০০ কোটি বছর। মানে পৃথিবীর জন্মের পর থেকে ২৬০ কোটি বছর কাটল। পৃথিবীর খোসা ততদিনে আরো পুরু আরো শক্ত হয়েছে। পৃথিবীর খোসা শক্ত হয়ে বর্তমান স্থলভাগ পেলাম আজ থেকে ২৮০ কোটি বছর আগে। এবার জল থেকে কিছু উদ্ভিদ ডাঙায় এসে গেছে। পায়ে হেঁটে নয়, বায়ু প্রবাহ জলোচ্ছাস, আরো কত প্রাকৃতিক কাণ্ডকারখানায় আর প্রকৃতির ইচ্ছাধীন জৈবনিক বিবর্তনে।                        
             

ভূ-উষ্ণায়নের ইতিহাস:

 

পৃথিবীর প্রথম ২৮০ বা ৩০০ কোটি বছরের এই সময়ের বড়ই উপকারী ও প্রাণসঞ্চারী একটি প্রাকৃতিক ঘটনার নাম আধুনিক মানুষ দিয়েছে “সবুজ ঘর ক্রিয়া” বা “গ্রীন হাউস এফেক্ট”। বিশ্বের যে কোন গ্রহত্বকের (planet surface) উপর তাপশক্তি গ্রহের বাতাবরণে (atmosphere) আবদ্ধ হয়ে গ্রহত্বকের উষ্ণতা বাড়ালে সে ঘটনাকে গ্রীন হাউস এফেক্ট বলে। কেননা এই প্রধান শর্তেই গ্রহটি পৃথিবীর মত সবুজ হয়ে উঠতে পারে। এই কারণে আমাদের চেনা বিশ্বে পৃথিবী জীবধাত্রী হয়েছে। সূর্যরশ্মি পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে ভূ-ত্বকে পড়ে। ভূ-ত্বক থেকে এই শক্তির কিছু অংশ বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তাপশক্তির আকারে প্রতিফলিত হয়, কিন্তু বায়ুমন্ডল ভেদ করে সবটা বাইরে যেতে পাড়ে না। তা বায়ুতে উপস্থিত জলীয়বাষ্প, মিথেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড দ্বারা শোষিত হয়। ভূপৃষ্ঠ কর্তৃক প্রতিহত সৌরতাপ মহাশূণ্যে ফিরে না গিয়ে বায়ুমন্ডলে আবদ্ধ থাকে এবং পৃথিবীকে মৃত্যুশীতল হতে দেয় না। শীতপ্রধান দেশে কাচের ঘরের মধ্যে সৌরতাপ আবদ্ধ করে গ্রীষ্মপ্রধান বা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের উদ্ভিদ পালন করা যায়। তার সঙ্গে তুলনা করে এই প্রাকৃতিক ঘটনার নাম দেওয়া হয় Green House Effect যার প্রথম পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন বিজ্ঞানী আরহেনিয়াস ১৯৯৬ খৃষ্টাব্দে। এই ঘটনা ছাড়া পৃথিবী হত চাঁদের মত, +২২৫০F উষ্ণ দিনের বেলায়, রাতে -২৪৩০F শীতল। ‘সবুজ ঘর ক্রিয়া` এই গ্রহকে বাসযোগ্য করেছে।  
             

কিন্তু বিশ্বময় উদ্ভিদের বাড়বাড়ন্ত বাতাসের কার্বনডাইঅক্সাইড কমিয়ে দিল। সমুদ্র যেন তার জল ও ফাইটোপ্লাঙ্কটন (এককোষী ও স্বল্পকোষী সামুদ্রিক উদ্ভিদ) দ্বারা সব কার্বনডাইঅক্সাইড খেয়ে নিল। গ্রিনল্যান্ড ও দক্ষিন মেরুর বরফের তলে আবদ্ধ বায়ু বুদ্বুদের রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিল্পবিপ্লবের আগে বায়ুতে CO2 এর শতাংশ নিরূপন করা যায় এবং ২২০০০০ বছর আগে পর্যন্ত এই পদ্ধতি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফলপ্রসূ। দীর্ঘ অতীতের উষ্ণতাও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। দেখা গেছে বায়ুতে CO2 এর গাঢ়ত্ব এবং বাতাসের উষ্ণতার মধ্যে ধনাত্মক সম্পর্ক (Positive correlation) আছে। দীর্ঘ সময়কালীন একটা ধারণা পাওয়া যাবে ২ লক্ষ বছরের উষ্ণতার নথি থেকে। দেখা যাচ্ছে গত ২২০০০০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা মোটামুটি সুস্থিত ছিল ১৪.৮০C এ। ১৮০১ সালে বা তার আগে পৃথিবী গড়ে ১৪.৮০C বা ১৫০C উষ্ণ, বায়ুমণ্ডলে CO2 ০.০২৮% গড়ে । যন্ত্রের পরিমাপে পাওয়া পার্থিব উষ্ণতার নথি রাখা শূরু হয় ১৮৫০ সাল নাগাদ। ১৯০০ সাল নাগাদ পৃথিবীর গড় উষ্ণতা ছিল ১৫.৫০C, বায়ুতে CO2 ছিল ০.০৩% মাত্র, ১৯৫৮ সালে CO2 হল ০.০৩১৫%, ২০০৫ এ ০.০৪%। ১৮০১ থেকে ১৯০০ এই ১০০ বছরে গড় পার্থিব উষ্ণতার বৃদ্ধি ০.৫০C। কিন্তু ১৯০১ থেকে ১৯৯১ খৃষ্টাব্দের মধ্যে গড় পার্থিব উষ্ণতার বৃদ্ধি ১০ C। ২০০১ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে বৃদ্ধি ১.৪০C-৫.৮০C পর্যন্ত হতে পারে আশঙ্কা আছে। (Report IPCC 2001) 
 

গত ১৫০ বছরে মানুষ বৃহৎ মাত্রায় মিথেন, এরোসল সমূ্হ, নাইট্রাস অক্সাই্‌ড, CFC, CO2, বাতাসে ছেড়ে তৈরী করল সর্বাত্মক চিরস্থায়ী সমস্যা ভূ-উষ্ণায়ন (Global Warming)। ১০০০০ বছরের সভ্যতা সাম্প্রতিক মাত্র ১০০বছরের বাড়াবাড়িতে আজ বিপন্ন। বর্তমানে মানুষের বাড়াবাড়িতে এই সুস্থিতি কতটা ব্যহত হয়েছে তা পরিমাপ করার জন্য সুইডেনের ষ্টকহোমে পৃথিবী সম্মেলনে ১৯৯৭ খৃষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে স্থির করা হয়েছে বর্তমানের স্বাভাবিক গড় উষ্ণতা ১৬.৫০C যা ১৯৬০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত ৩০ বছরের উষ্ণতার গড়। ১৯৯৭ সালেই স্থির করা হয়, যদি গড় পার্থিব উষ্ণতা ১৬.৫০ অতিক্রম করে তবে তা ভূ-উষ্ণায়ন ধরা হবে এবং প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে। ভূ=উষ্ণায়ন গত ৩০ বছরে একটি আতঙ্কজনক সত্য।

 
ভূ-উষ্ণায়ন কি ভাবে হয় :

 

কোন কোন পদার্থ বায়ুতে তাপ আটকে দেয়? 

 

  • মিথেন (CH4), 

  • কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2),

  • নাইট্রাস অক্সাইড (NO2) 

  • CFC (chloro fluoro carbon Compounds), 

  • PFC (per fluoro carbon Compound), 

  • HFC(hydro fluoro carbon compounds)

  • ট্রপো্ফিয়ারে (সমুদ্র সমতল থেকে ১৫ কিমি উচ্চ পর্যন্ত) উপস্থিত ওজোন (O3) গ্যাস,

  • হ্যালোজেনেটেড গন্ধক যৌগ যথা SF6,

  • কঠিন এরোসল    

 

আর যে বস্তুগুলি বায়ুমন্ডলে উপস্থিত থাকলে পরোক্ষভাবে উষ্ণায়ন ঘটায় --


জৈব তরল এর আনুবীক্ষণিক ভাসমান কণা (liquid droplets) : কেরোসিন, গ্যাসোলিন, ডিজেল, পিচ্ছিলকারক, সুগন্ধি, কীটনাশক তেল এর নাড়াচাড়ায় liquid droplet ও বাস্পায়ন থেকে বাষ্প বাতাসে মেশে। তৈলকূপ ও অর্ণবপোত থেকে সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ে।


কঠিন কণা (Particulate matter =PM) : বালি, মাটি, সিমেন্ট, আসবেসটস, পাথর (গুঁড়ো করা), কাঠ চেরাই, ইত্যাদির নাড়াচাড়া থেকে বাতাসে মেশে।


জৈব বা অজৈব তরল এবং কঠিন কণা কলয়ডাল মাপের অর্থাৎ ১ nm থেকে ১০০ nm মাপের হলে তা বায়ুমন্ডলে প্র্রবেশ করলে এরোসল (aerosol) হয়ে যায়। যেমন ভাতের সূক্ষ্ম কণা জলে মিশে স্থায়ী ভাবে ভেসে থেকে ভাতের ফ্যান (তরল সল) তৈরী করে তেমন বাতাসে হয় এরোসল যা সবসময় চোখে দেখা যায় না (১ nm =  ১ মিলিমিটারের ১০ লক্ষ ভাগের ১ভাগ) স্থায়ী আপাত বায়ব আকার নেয়। 
     

এরোসল কণাদূষক (Particulates as pollutants) একটি তাৎপর্যপূর্ণ অভিশাপ, আগ্রাসী সভ্যতায় মানুষ কত জৈব অজৈব কঠিন তরল কণা বাতাসে মিশিয়ে দেয়। এগুলো সূর্য রশ্মি শোষণ করে বায়ু উত্তপ্ত করে, মরুভূমিতে যেমনটা হয়। এরাই আবার গাছের পাতায় থিতিয়ে পড়ে এমন ঢেকে দেয় যে পাতার রং কালো ধূসর দেখায়। পাতা সূর্যকিরণ ও বায়ুর CO2 পায় না। বায়ুর CO2 ও সৌরতাপ গ্রহণ করে পৃথিবীকে ঠান্ডা রাখা উদ্ভিদের স্বাভাবিক কাজ-তাতে বাধা পড়ে। বায়ুর উষ্ণতা বাড়তে থাকে। দুই মেরুর তুষার এবং উচ্চ পর্বতের তুষার সূর্যতাপের ৮০% প্রতিফলিত করতে পারে। কণাদূষক মেরুবরফের তাপপ্রতিফলক মসৃণ তল ঢেকে থিতিয়ে পড়ে তাপ প্রতিফলন কমায়, আবার নিজে তাপ শোষণ করে বরফ গলিয়ে দেয়। এভাবে দুই মেরুর বরফ গলে সমুদ্রের আয়তন ও উচ্চতা বাড়ে তাপ প্রতিফলন ক্রমশ কমছে, সমুদ্রজল তাপশোষণ করে উষ্ণতর হচ্ছে। হিমালয়, কারাকোরাম, হিন্দুকশ ইত্যাদি পর্বতের হিমবাহগুলি ক্ষয়ে যাচ্ছে।
   

এরোসলই বিষাক্ত ধোঁয়াশা ও দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা সৃষ্টির জন্য দায়ী, ভূত্বক সংলগ্ন বায়ুতে গ্রীন হাউস গাস ওজোন সৃষ্টির জন্য দায়ী।     
               

যাবতীয় কয়লা-শোধনাগার ও কয়লা-উপজাত-প্রক্রিয়াকরণশিল্পে  খনিজতৈল শোধনাগার ও উপজাত প্রক্রিয়াকরনে, প্লাস্টিকশিল্প্‌ জৈব রাসায়নিক শিল্পে, কাঠ - কাঠকয়লা পোড়ানোতে, আলো জ্বালাতে মোটরগাড়ী ও ট্রেন চালাতে জ্বালানী তেলের দহনে হাইড্রোকার্বনের তরল কনা (liquid droplets) ও বাষ্প এবং কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস বাতাসে মেশে, সঙ্গে থাকে আরো বহু স্বাস্থ্যহানিকর গ্যাস। দাবানলেও জৈব তরল বাষ্প ও কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে মেশে।  
     

CO2 এর বৃদ্ধির ফল

 

উষ্ণতাবৃদ্ধির প্রধান কারণ বায়ুতে CO2 এর পরিমাণ বৃদ্ধি। গাছ কেটে ঘরবাড়ী কারখানা রাস্তা, কাগজ-কলম, রেলগাড়ী, আসবাব, রেলের স্লিপার, পশুপালন এর তৃণভূমি তৈরী, সমু্দ্রে দূষিত জল খনিজ তেল ফেলে ফাইটোপ্লাংটন (সামুদ্রিক ভাসমান উদ্ভিদ) নষ্ট করা- বায়ু থেকে CO2 অপসারণের প্রাকৃতিক ব্যাবস্থা নষ্ট করে দিয়েছে। যাবতীয় জীবাশ্ম জ্বালানী ও জৈব জ্বালানী (কয়লা-কাঠকয়লা, কোলগ্যাস-রান্নার গ্যাস, ডিজেল-গ্যাসোলিন-কেরোসিন) এর দহন, পরিত্যক্ত তৈলকূপ এর আগুন, পরিত্যক্ত কয়লাখনির আগুন, দাবানল বাতাসে মেশায় CO2। ৫৫% গ্রীন হাউস এফেক্ট বা পার্থিব উষ্ণায়ন হয় CO2 এর জন্য। 
                 

CO2 জলে দ্রবিভূত হয় খুব বেশি। ভূত্বকের ৭১% সমুদ্র। ৮০ শতাংশ বায়ব CO2  শোষিত হত সমুদ্রজল ও ফাইটোপ্লাংটন দ্বারা। বর্ধিত উষ্ণতায় CO2 এর জলে দ্রাব্যতা কমে যায়, দ্রবিভূত CO2  ফাইটোপ্লাংটন (জলজ উদ্ভিদ) এর খাদ্য বা খাদ্য তৈরীর উপাদান।খাদ্যের অভাবে জলজ এর বিস্তার কমে। ফলে সমুদ্রজল কর্তৃক CO2 এর শোষণ কমে গিয়ে বায়ুর CO2 সঞ্চয় বাড়ছে, গড় উষ্ণতা বাড়ছে। কিন্তু সমুদ্রে তৈলকূপের তেল নির্গমন, কলকারখানার বর্জ্য উষ্ণ তরল নির্গমন, পশুপালন ও মাংস প্রক্রিয়াকরণজাত বর্জ্যনির্গমন ও উষ্ণতর বায়ুর দ্বারা ফাইটোপ্লাংটন এর অপমৃত্যু ঘটে পুনরায় ভূ-উষ্ণায়ন ঘটাচ্ছে পাপচক্রের মত। সমু্দ্রে জায়গায় জায়গায় নিষ্প্রাণ এলাকা সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে গত শতাব্দীতে বায়ুমন্ডলের গড় উষ্ণতার বৃদ্ধি ১০C, আর সাম্প্রতিক ২৫ বছরে সমুদ্র উষ্ণতার বৃদ্ধি ১০C। International  Panel on Climate Change(IPCC) এই সংক্রান্ত গবেষণাগুলি নিরন্তর পর্যালোচনা করে। তার ২০০৭র রিপোর্ট অনুসারে ২১০০ সাল নাগাদ ভূউষ্ণায়ন সর্বাধিক ৬.৪০C পর্যন্ত এবং সমুদ্রতল উন্নয়ন সর্বোচ্চ ১ মিটার হবে।
     

ভূউষ্ণায়ন এর দ্বিতীয় কারণ মিথেন। এটি ১৬-২০% দায়ী। N2O-  ৪%-৫%, ওজোন ৭-৮% CFC, PFC  মিলিতভাবে ১১-১৬%।
     

N2O এবং মিথেন:-

 

বাতাসে আসে কৃষি ও পশুপালনের উপজাত বর্জ্যের পচনে। মানুষের মাংসাহার  ও গবাদি পশুর অপ্রাকৃতিক সংখ্যাবৃদ্ধি CH4 ও  N2O দূষণের ৬৫% এর জন্য দায়ী। মাংসাহার ও পশুপালনই বনভূমি ধ্ংসের একক বৃহত্তম কারণ। এটি সমু্দ্র-দূষণের একক বৃহত্তম উৎস। কয়লাখনি, জীবাশ্মতেল ও জ্বালানী গ্যাসের পাইপলাইন ও অন্য পরিকাঠামো থেকে মিথেন বাতাসে মিশতে পারে। মিথেন CO2 অপেক্ষা ২৩ গুন উষ্ণায়নকারী, N2O ২৯৬ গুণ। পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলের উপরে ১.৫ কিমি পুরু তুষারের নিচে বহু কোটি বছর ধরে আবদ্ধ আছে অজস্র পেটাগ্রাম (১ P.g.= ১০১৫ g.) মিথেন। পৃথিবীর গড় উষ্ণতার দ্রুত বৃদ্ধিতে মেরু প্রদেশের বরফের আচ্ছাদন পাতলা হতে শূরু করেছে, অনেক বিশালায়তন হিমবাহ তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ছে। সাম্প্রতিক ২০ বছরে আদিম মিথেন মুক্ত হতে শুরু করেছে। Dr.Walter বলেন “Permafrost is like a time-bomb waiting to go off as it continues to throw so many petagrams of CH4।`` Dr.Gregory Ryskin বলেন, “একদিন বিপুল মিথেন বি্স্ফোরণের মত ফেটে বেরিয়ে আসতে পারে জলে স্থলে সমূহ বিপর্যয় ঘটিয়ে। যা অতীতে ঘটেছে তা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে”। অতিশীতল সমু্দ্র তলদেশে যেখানে কঠিন মিথেন-হাইড্রেট সঞ্চয় রয়েছে তা ও নির্গত হতে শূরু করবে যদি উষ্ণতা ০০C তে পৌঁছায়।
   

ওজোন গ্যাস:-

 

সমুদ্রতলের ২৫ কিমি উচ্চতা থেকে ৪০ কিমি উচ্চতায় প্রাকৃতিক ক্রিয়ায় অক্সিজেন গ্যাস থেকে ওজোন গ্যাস তৈরী হয় যা সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মিকে ট্রপোস্ফিয়রে (সমুদ্রতল থেকে ১৫-১৬ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত) আসতে দেয় না। ওজোনস্তরটি ছাতার মত কাজ করে বলা যায়। জৈব তরল এর আনুবীক্ষণিক ভাসমান কণা (liquid droplets) -- কেরোসিন, গ্যাসোলিন, ডিজেল, পিচ্ছিলকারক, সুগন্ধি, কীটনাশক তেল এর নাড়াচাড়া থেকে বাতাসে মেশে। তৈলকূপ ও অর্ণবপোত থেকে সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ে। তা আবার বাস্পায়ন হয়ে বাতাসে যায়, এগুলি হাইড্রোকার্বন বা জৈব এষ্টার। এগুলির দহনে বাতাসে মেশে নাইট্রোজেন এর অক্সাইড। হাইড্রোকার্বন, এষ্টার ও নাইট্রোজেনের অ্ক্সাইড সূর্যালোকে সক্রিয় হয়ে ট্রপোস্ফিয়ারের কিছু অক্সিজেনকে ওজোনে পরিণত করে। ট্রপোস্ফিয়ারের এই অস্বাভাবিক ওজোন ৭-৮% উষ্ণায়নে দায়ী ।
     

ফ্রেয়নসমূহ:

 

প্লাস্টিকশিল্পে, এরোসলে, অগ্নিনির্বাপক ও হিমায়ক ব্যাবস্থায় CFC, HFC বা PFC র ব্যবহার থেকে সেগুলো বাতাসে মেশার সুযোগ পায়। সেগুলো CO2 অপেক্ষা ১৭৫০০ গুন উষ্ণায়নকারী। ট্রপোস্ফিয়ারে এগুলো উষ্ণায়নকারী, রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়, কিন্তু উচ্চস্তরে অতিবেগুনী রশ্মি দ্বারা সক্রিয় হয়ে ওজোনস্তর ক্ষয় করে।
                             

উষ্ণায়নের পরিণতি : 


a) উষ্ণায়নের দরুণ বায়ু ও সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়ছে, মেরুবরফ কমছে, হিমবাহ গলে যাচ্ছে,  সমুদ্রতলের উচচতা বাড়ছে, উপকূলীয় ভূমি নিমজ্জিত হচ্ছে।


b) বিশ্বময় আবহাওয়া ও জলবায়ু এলোমেলো হচ্ছে। শীত, গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্ত ঋতুগুলি নিয়মমাফিক ফিরে আসছে না, ঋতুচক্রর পর্যাবৃত্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।


c) পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বাড়লে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল উষ্ণ ও উষ্ণ অঞ্চল মরুভূমি হয়ে যাবে। ফলে স্বাভাবিক উদ্ভিদের বংশবিস্তার কমে বায়ব CO2 শোষিত হওয়ার হার কমবে, বাড়বে বায়ুর CO2 -তুল্যাঙ্ক এবং উষ্ণতা। স্থলভাগের যেগুলো ছিল শীতল জনবিরল, সেস্থান সহনীয় উষ্ণতা আর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতে সুজলা সুফলা হতে পারে। ফলে ধনী দেশগুলো আরো ধনী হবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য ও বাসস্থানের অভাব বাড়বে। খাদ্য-নিরাপত্তার উপর ভূউষ্ণায়নের প্রভাব সংক্রান্ত বিশ্বসমীক্ষায় দেখা গেছে এইভাবে উষ্ণায়ন চলতে দিলে ২০৬০ সাল নাগাদ ৩ কোটি মানুষ অনাহারে থাকবে। উন্নয়নশীল দেশে কৃষি সম্পদ ১০% কমবে, উন্নত দেশে ১০% বাড়বে। উন্নত ও শীতপ্রধান দেশের ফলের বাগানে ও কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়বে।


d) ২০৪০ সালে ভারতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে না। কারণ হিমালয়ে বরফ থাকবে না। ৫৭০০ বর্গকিমি কৃষিজমি ও ৪২০০ কিমি রাজপথ জলের তলায় মিলিয়ে যাবে।


e) ২০৬০ সালের মধ্যে সাইবেরিয়া, আলাস্কা, গ্রীনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে হতে পারে কয়েকটি সমু্দ্রর নাম। ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার এর বিশাল অংশ ডুবে যাবে। মালদ্বীপ হয়ত অবলু্প্ত হবে।


f) যারা বেঁচে থাকবে তারা কি সুখে থাকবে? IPCCর মতে শুধু মিশর ও বাংলাদেশে ২ কোটি গৃহহারা বুভুক্ষু লোক থাকবে। ভারতে খাদ্য উৎপাদন ৫০% কমবে। বিশ্বময় দুর্ভিক্ষ বাড়বে। কারণ ঘন ঘন ঝড়ঝঞ্ঝা, বৃষ্টিপাতের সময়ে নিয়মহীনতা, পর্বতে নদীর উৎস নষ্ট হওয়া, ঊর্বর বদ্বীপ অঞ্চলকে সমুদ্র গ্রাস করা, ইত্যাদি।

 

g) বিগত সহস্রাব্দী পরিচিত ঋতুচক্র বিপর্যস্ত হয়ে বছরে বারবার প্রবল দাবদাহ ও প্রবল বৃষ্টিপাত একসময়ে অভ্যস্ত ঘটনা হয়ে যাবে। যাবতীয় ঝড়-ঝঞ্ঝার ও  খরা-দাবদাহের প্রাবল্য  বাড়বে।


h) অধিক সংখ্যক রোগজীবানু উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। রোগজীবানুর বাহক মশা, ইঁদুর প্রভৃতি প্রাণীদের বাড়বাড়ন্ত হবে।


এজন্য গত ৩০বছরে ৩০টি রোগ নতুন করে দেখা দিচ্ছে। যথা- 

 

  • সমুদ্রে কিছু ব্যাকটিরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে- ফুড পয়জনিং, সেপটিসিমিয়া, গ্যাসট্রোনটেরাইটিস এর ব্যকটেরিয়া আক্রান্ত সামুদ্রিক খাবার খেলে মানুষের শরীরে এই রোগগুলি দেখা যাবে।

  • বিশ্বময় বছরে ৪০ লক্ষ টিবি আক্রান্ত লোক পাওয়া যায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ভারত টিবির প্রসারে আতঙ্ক ও সাবধানবাণী জানিয়েছে।   

  • সারা বিশ্বে বছরে ১০-২০ লক্ষ মানুষ ম্যালেরিয়ায় মারা যায়। বিশ্বের অর্ধেক মানুষের (প্রায় ৩২০ কোটি) ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি আছে। ১০৬টি উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ দেশে। ২০০৯ সালে ২২.৫ কোটি ম্যালেরিয়া সনাক্ত হয়, তার মধ্যে ৪ লক্ষ মারা যায়। রোগীদের ৯০% আফ্রিকা ও এশিয়ায়। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে এই রোগ নেই, কিন্তু উষ্ণায়নের জেরে চিত্র বদলে যেতে পারে। ৫০ বছর পরে ম্যালেরিয়া ইউরোপ-আমেরিকায় ছড়াতে পারে। ২১ শতকের প্রথম ৫ বছরে ম্যালেরিয়া ৪ গুণ বেড়েছে। এর সঙ্গে উষ্ণায়ন ও আর্দ্রতার সরল সম্পর্ক আছে, বর্ধিত উষ্ণতায় মশার জনন-হার বাড়ে, তারা বেশি করে রক্ত খায়, তাদের প্রজননঋতু দীর্ঘ হয়, লার্ভা দ্রুত বড় হয়ে পরিণত মশা তৈরী করে, তারা যে জীবাণু বহন করে তার পরিণমন দ্রুত হয়।

  • উষ্ণায়নের জেরে উত্তর আমেরিকায় ইডিস ইজিপ্টাই ও ইডিস এ্যালবোপিকটাস মশার বংশবিস্তার ঘটবে। এরা পীতজ্বর ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া ভাইরাস বহন করে। যদিও ক্রান্তীয় উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ দেশে এদের বসবাস, শীতলতর দেশেও এরা সফল অভিযোজিত হয়েছে। পীতজ্বর ও ডেঙ্গু রোগের ভাইরাস এর মশার দেহে পরিণতি ও বংশবৃদ্ধি উষ্ণতর আবহাওয়ায় ভল হয়, মশা দ্রুততর রোগবিস্তার ক্ষমতা অর্জন করে। সম্প্রতি আমেরিকাতে ডেঙ্গুজ্বরের খোঁজ মিলেছে ৩২০০০! 

  • রক্তমোক্ষণকারী নতুন রোগ যেমন এবোলা, ম্যাকুপো, হান্টা ভাইরাস উষ্ণায়নের  কুফল। আমেরিকায় ১৯৯৩ সালে যেখানে হান্টা প্রথম ধরা পড়ে সেখানে তার আগে ৬ বছর খরা হয়েছিল, এর পর শূরু হয় প্রচড বৃষ্টি যা রোগের বাহক ইঁদুরের ১০ গুণ বংশবৃদ্ধি করে। 

  • কলেরার ব্যাকটিরিয়া জলের বেশী তাপমাত্রায় ভাল থাকে বেশি বংশবিস্তার করে। দক্ষিন আমেরিকায় ১৯৯১ সালে কলেরার মড়কে ৫০০০ মানুষ মারা যায়। কলেরার ব্যাকটিরিয়া ভিব্রিও কলেরি। ভিব্রিও প্যারাহিমোলাইটিকাস ঘটিত আন্ত্রিক রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ২০০৫ সালে। এর জন্য বর্ধনশীল সমুদ্র উষ্ণতাকে দায়ী করা হয়। 

  • ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পালিত পশুর নীলজিভ (blue tongue) রোগ ছড়ানোর মূলে উষ্ণতা, যে কীটের দংশনে এই রোগ ছড়ায় সেই কীট উষ্ণতর জলবায়ুতে বেশি বংশবৃদ্ধি করে।

  • রাশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে হান্ট ভাইরাসের সংক্রমণ, ক্রিমিয়ান কঙ্গো, টুলারেমিয়া এবং জলাতঙ্ক বাড়ছে। এর সঙ্গে  যোগ রয়েছে ইঁদুর(rodenta) জাতীয় প্রাণীর সংখ্যাবৃদ্ধির।  

  • চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে উষ্ণায়নের জেরে তাপীয়পীড়ন বাড়বে বিশেষত ক্রান্তীয় শহর অঞ্চলে, দরিদ্র মানুষ বেশি অসুস্থ হবে হিট স্ট্রোকে বা চামড়ার ক্যানসারে বা ডায়াবেটিসে। বাসস্থানের যথাযথ সুবিধার অভাবে তারা বেশী করে তাপ প্রবাহের সংস্পর্শে আসেন। নতুন নতুন আলোক-সংবেদী চর্মরোগ ও আলোকসংবেদী অসুস্থতার উদয় হবে, গরিব ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে যার প্রকোপ বেশি হবে। 

 

নীতিনির্ধারকদের জন্য সংক্ষিপ্তসার: 


১৯৮৮ সাল থেকে IPCC, ভূ-উষ্ণায়ন সম্পর্কিত যাবতীয় গবেষনা পর্যালোচনা করে ১৯৯২ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পাঁচ বার তাদের রিপোর্ট পেশ করে। সেখানে নীতিনির্ধারকদের জন্য সংক্ষিপ্তসারে (Summary for policy-makers) প্রধান বক্তব্যের চু্ম্বকসার নিম্নরূপ:


ভূ-উষ্ণায়ন সন্দেহাতীত ঘটনা, বিশ শতকে জলবায়ুর গড় তাপমাত্রার যে বৃদ্ধি তা নিঃসন্দেহে মনুষ্যসৃষ্ট গ্রীনহাউস গ্যাস ও এরোসল এর জন্য। এখানে মানুষের প্রভাব বহির্ভূত কোন প্রাকৃতিক কারণ অকিঞ্চিৎকর। যেমন সূ্র্যের অতিসক্রিয়তার মত কোন কারণ নেই। ১৯৯০ সালের গড় উষ্ণতা ১৬.৫০C তে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া আর সম্ভব নয়। পরিবেশের উষ্ণতার বৃদ্ধি অনিবার্য। সমুদ্রতলের উন্নয়ন বন্ধ করা যাবে না। সচেতন প্রচেষ্টায় গ্রীনহাউস গ্যাস বা এরোসল  নির্গ্মন কমানো যেতে পারে। এতে উষ্ষ্ণায়নের হার কমবে। গড় উষ্ণতা কিন্তু পবরতী কয়েক শতক ধরে বাড়তে থাকবে। যেমন ২০০১ থকে ২১০০ এই ১০০ বছরে উষ্ণতার বৃদ্ধি ১.৪- ৬.৪০C, সমুদ্রতলের উন্নয়ন ৬০ সেন্টিমিটার। বিগত সহস্রাব্দী পরিচিত ঋতুচক্র বিপর্যস্ত হয়ে বছরে বারবার প্রবল দাবদাহ ও প্রবল বৃষ্টিপাত একসময়ে অভ্যস্ত ঘটনা হয়ে যাবে। যাবতীয় ঝড়-ঝঞ্ঝার ও  খরা-দাবদাহের প্রাবল্য  বাড়বে। বাৎসরিক ঝড়ঝঞ্ঝার সংখ্যা বাড়বে। স্বাভাবিক ঋতুর বাইরে অকাল-বর্ষণ এবং সামুদ্রিক জলোচ্ছাস এর প্রাবল্য্ ও বার্ষিক গড় সংখ্যা বাড়বে। এ শতাব্দীর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধ্বংসলীলায় বিগত শতাব্দীর রেকর্ডমাত্রা ছাপিয়ে যাবে। বাড়বে সময়ের সাপেক্ষে অপ্রত্যাশিত ভূমিকম্পের সংখ্যা (frequency of earth-quake all over the globe)

                
সতর্কবাণী:  

 

উষ্ণায়নের পরিণতির এই পূর্বাভাষ সম্পর্কে ২০১৪ সালে বিজ্ঞানী মাইকেল মান বলেন, The computer model determines how the average surface temperature responds to changing natural factors, such as volcanoes and the sun, and human factors—greenhouse gases, aerosol pollutants, and so on. (Although climate models have critics, they reflect our best ability to describe how the climate system works, based on physics, chemistry and biology. And they have a proved track record: for example, the actual warming in recent years was accurately predicted by the models decades ago.)। বিশ্বে যদি বর্তমান হারে জীবাশ্ম জ্বালানী দহন হতে থাকে তবে ২০৩৬ এ উষ্ণতা ১৯৯০ অপেক্ষা ২০C বেশি হয়ে একটি বিপদসীমা অতিক্রম করবে যা মানবসভ্যতার সব বিষয় বিপর্যস্ত করবে- খাদ্য পানীয়জল স্বা্স্থ্য বিদ্যুৎ অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা।


মানুষের আশু মুনাফা-মুখিতা:- 


অকারণ আগুণ ও অকারণ নির্বনীকরণ: আজ পৃথিবীতে অনেক পরিত্যক্ত কয়লাখনি ও তৈলকূপ জ্বলছে। সভ্য মানুষ, বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্র সে আগুন নেভানোর গা করেনি, কারণ সে কর্ম মুনাফামুখী উৎপাদনশীল নয়। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলের অরণ্যের বহমান দাবানল কোন প্রয়াসে কিভাবে মিটবে জানি না। ২০১০ নাগাদ একটি NGOর পর্যবেক্ষনে পাওয়া গেল অসমর্থিত চাঞ্চল্যকর তথ্য। পূর্ববর্তী ২০ বছরে ক্রান্তীয় নির্বনীকরণ (Deforestation in the Tropics) গড়ে সেকেণ্ডে এক একর হারে হয়েছে। অর্ধেকটা হয়েছে মানুষের খাদ্য মাংসের যোগান দেওয়ার জন্য পশুপালনের প্রয়োজনে। পূর্ববর্তী ১৫ বছরে ২০ কোটি হেক্টেয়ার এর বেশী জঙ্গল হারিয়ে গেছে যা ক্ষেত্রফলে দক্ষিন আফ্রিকার দ্বিগুন।মালয়েশিয়ার সাতগুন। আমরা আর কতকাল ঘুমিয়ে থাকব?


প্রতিকার:


বিশ্বউষ্ণায়নের হার প্রশমণের জন্য কাজ করা প্রাণধারণের মতই জরুরী। উদাহরণ:- 


a) CCS (carbon capture and storage) প্রযুক্তিতে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের CO2 নির্গমণ ৯০%কমানো যায়। 


b) ESP (electrostatic precipitator) প্রযুক্তিতে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বা রাসায়নিক শিল্পকেন্দ্রের (chemical hub) বাতাসে ধোঁয়া ও ধূলি (smokes and dusts)তে PM-নির্গমণ বন্ধ করা যায়। 


c) CNG, LNG, LPG ইত্যদি যা কম গ্রীনহাউস গ্যাস উৎপন্ন করে সেগুলির ব্যবহার বাড়িয়ে অন্য জীবাশ্ম জ্বালানী বাতিল করতে হবে। 


d) হিমায়ক, অগ্নিনির্বাপক, শীতাতপনিয়ন্ত্রক ইত্যদিতে ফ্লুয়োরোকার্বন (ফ্রেয়ন)কে অন্য বিকল্প দ্বারা প্রতিস্থাপিত করতে হবে।

 
e) প্রযুক্তি ও পরিকাঠামোর পরিবর্তন করে জৈব জ্বালানীকে হাইড্রোজেন জ্বালানী বা সৌরশক্তি দ্বারা প্রতিস্থাপিত করাতে হবে। 


f) ভারতে আজকাল প্রচার হচ্ছে পরমানু বিদ্যুৎ দূষণমুক্ত। তা জল ও বায়ু দূষিত করবে না, মাটির অবক্ষয় ঘটাবে না। হতে পারে যদি তার জন্য অবিরত অসীম সতর্কতা নেওয়া হয়। যা অসম্ভব। তা সত্ত্বেও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রচুর তাপের অপচয় হয়, যা বাতাবরণে ও সমুদ্রে মিশে বিশ্ব উষ্ণায়নের কুফল দেয়। হাইড্রোজেন ব্যাটারী বা সৌর বিদ্যুতের প্রয়োগ বাড়ালে সবচেয়ে ভাল হয়। 


g) কিছু তেলখেকো ব্যাকটিরিয়া জেনেটিক প্রযুক্তিতে তৈরী করা সম্ভব যা সমুদ্রজলে ভাসমান তেল droplet ক্ষয় করতে পারে। 


h) ব্যাক্তিগত পরিবহন (personal car, bike) কমিয়ে গণ-পরিবহন বাড়ানো।

 
i) LED ও সৌরবাতির ব্যবহার বাড়ানো। 


j) বাতি, পাখা, জলের কল, বাড়ী বা গাড়ীর এ সি বাড়তি সময় ধরে না চালানো।

                                        
k) প্রকৃতির গ্রীনহাউস গ্যাসশোষক বা অপসারক পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা- সমুদ্র্র ও পুকুরকে দূষণমুক্ত রেখে ফাইটো-প্লাঙ্কটন ও জলজ উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি, স্থলভাগে বনাঞ্চলের বিস্তার, পথের  ধারে ও লোকালয়ে বৃক্ষের সংখ্যা বৃদ্ধি। 


l) আগুন লেগে যাওয়া ও অন্য কারণে পরিত্যক্ত কয়লাখনি ও তৈলকুপ দ্রুত নির্বাপিত ও বন্ধ করতে যত্নশীল হতে হবে। 


m) প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে দাবানল দ্রুত নির্বাপিত করে বনাঞ্চল হ্রাসের গতি থামাতে হবে।
                                                                           

সকল কার্যক্রমের দুটি মূলনীতি:


যেখানে কোন গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গত হয় সেখানেই পরিকাঠামো ও প্র্রযুক্তির পরিবর্তন করে গ্রীনহাউস গ্য্যাস নির্গমন কমানো এবং সবশেষে একেবারে বন্ধ করা। প্রকৃতির স্বাভাবিক পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করা। এই দুটি মূলনীতির সর্বাত্মক ও আপ্রাণ প্রয়োগই পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে উষ্ণ মৃত্যুর হাত থেকে। এ ব্যাপারে আপ্তবাক্য হল-if profit-motive and economic competition govern supreme, nuclear giants remain free to carry on their tests and dumping,  scientists are only exchanging papers on united nation`s sponsored conferences, superpower statesmen are only brooding for years, no amounts of outcry, agitation and warning would succeed in stopping environmental pollution leading to total disaster in global life-sustaining system . 


তথ্য উৎস:-

১) না-মানুষী বিশ্বকোষ – নারায়ণ স্যানাল

২) গ্লোবাল ওয়ার্মিং বিজ্ঞান ও রাজনীতি – অতীশ চট্টোপাধ্যায়।

৩) IPCC-reports in internet

৪) more details in - www.suprememasterTV.com