রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

পুরনো পৃষ্ঠা থেকে : বিশ্বায়নের সংস্কৃতি, সংস্কৃতির বিশ্বায়ন


অমিতাভ দেব চৌধুরী
১৪ জানুয়ারি ২০২২

 

এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রতিশ্রোত লিটল ম্যাগাজিনে জ্যৈষ্ঠ ১৪১৩ বঙ্গাব্দ সংখ্যায়।

ঈশান কথার নতুন প্রয়াস "পুরনো পৃষ্ঠা থেকে"-র অংশ হিসেবে এই লেখাটিকে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তুলে ধরা হল...

Amitabha Dev Choudhury.jpg

বিশ্বায়ন? কিসের বিশ্বায়ন? বিশ্ব তো বিশ্বই। তার আবার নতুন করে 'গ্লোবালাইজেশন' কি? এ কি অনেকটা সেই রকমেরই ঘটনা নয় যে এককালে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের অস্তিত্ব মানচিত্রে বহাল তবিয়তে থাকলেও তাদেরকে কোনও না কোনও পশ্চিমি দেশের কাছে 'আবিষ্কৃত' হতে হত --- যেভাবে ভারতবর্ষ তো ভারতবর্ষে ছিলই, তবু একদিন তাকে 'আবিষ্কৃত' হতে হয়েছিল কেন? না, পশ্চিমের উপনিবেশ হতে হবে বলে। আজকের বিশ্বায়নও কি অনেকটাই সেরকমের এক ঘটনা নয়? পশ্চিমের সভ্যতা, বিশেষত আমেরিকা আমাদের ডেকে এনে যেন এখন বিশ্ব নাগরিকত্ব দিতে চাইছে। এবং এই নাগরিকত্বও শর্তাধীন --- শর্ত হল, বিশ্ববাজারে ক্রেতার অধিকার অর্জন করা। অর্থাৎ আমেরিকার বিশ্ববাজার ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বাড়িয়ে তোলার জন্যই আমরা ভারতবাসীরাও এখন বিশ্ব নাগরিক। যেন এতদিন আমরা বিশ্বের বাইরে ছিলাম! অবশ্য এই বিশ্ব মুক্তবিশ্ব নয়। পাসপোর্টমুক্ত ভিসামুক্ত পৃথিবী এটা নয়। তা এই বিশ্বায়নগ্রস্ত পৃথিবীতে আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির সম্ভাব্য মৃত্যু নিয়ে অনেকেই নানারকম ভবিষ্যদ্বাণী করে চলেছেন। আসলে ফিউচারোলজি বা ভবিষ্যৎবিদ্যা নতুন একটি অধিতব্য বিষয় হিসাবে ইতিমধ্যে আত্ম প্রকাশও করেছে। কল্পনা নয়, জল্পনা এই বিদ্যার বা বিজ্ঞানের প্রধানতম ভিত্তি। যার কারণে সায়েন্স ফিকশন আজ অনেকের কাছেই আর সায়েন্স ফিকশন নয়, হয়ে উঠেছে স্পেকুলেটিভ ফিকশন। কিন্তু ইতিহাসজ্ঞানহীন শুদ্ধ জল্পনা, প্রকৃত প্রস্তাবে, কল্পনারই নামান্তর। যারা ভাষার সংস্কৃতির মৃত্যু বিষয়ে মোটামুটি নিঃসংশয়, তারা ইতিহাসজ্ঞানকেই এক্ষেত্রে প্রধান সাক্ষী হিসেবে মানেন। আমি তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি না। কিন্তু ভাষার ও সংস্কৃতির মৃত্যুর চেয়েও যা আমাকে বেশি ভাবায়, তা হল ব্যক্তির মৃত্যু। ইতিহাসের এই রগড়ে আমি স্তম্ভিত না হয়ে পারি না। ইতিহাসের রগড় এখানেই, যে ধনতন্ত্র একটা সময়ে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের পূজারী ছিল, সেইন ধনতন্ত্রই আজ ব্যক্তি-প্রতিমার নির্দয় বিসর্জন চাইছে। পশ্চিমের ইতিহাস আমাদের এতদিন এই শিখিয়েছে যে আধুনিক অর্থে যাকে আমরা ব্যক্তি বলি, তার জন্ম ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভোলিউশনের পর। পুঁজির উদ্ভব ও বিকাশের হাত ধরে সেই প্রথম ইউরোপের মানুষ তার প্রাকৃতিক সত্তাকে ছাপিয়ে উঠতে চাইল। সে চাইল তার নিজের প্রকৃতি নিজেই রচনা করে নিতে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের এই অধ্যায়টি ইউরোপের সাহিত্যে রোমান্টিকাতার স্বর্ণযুগ হিসাবে চিহ্বিত হয়ে আছে। এর আগে ব্যক্তিসত্তার, ব্যক্তি প্রতিভার স্ফুরণের আর একটা যুগ আমরা পেরিয়ে এসেছি --- তা হল রেনেসাঁ যুগ। কিন্তু রেনেসাঁ যদি হয় মধ্যযুগীয় তথাকথিত 'ধর্মান্ধতার' প্রেক্ষাপটে মানবিক সত্তার প্রথম সার্বিক উন্মেষলগ্ন, তাহলে শিল্পবিপ্লোত্তর রোমান্টিকতা হল ব্যক্তির প্রথম ঈশ্বর হয়ে ওঠার স্পর্ধা । ইউরোপ আমাদের এতদিন শিখিয়েছিল যে মধ্যযুগ অন্ধকারের যুগ। মধ্যযুগের শিল্পসাহিত্য মানেই হল --- ঈশ্বরের প্রতি এবং তার চেয়েও বড় কথা, ধর্মের প্রতি দায়বদ্ধ সুর, রেখা কিংবা অক্ষরসাধন। এখন অবশ্য উপুর্যুপরি বাকবিতণ্ডায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্বচ্ছতর হয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি, আমাদের মধ্যযুগ ইউরোপের মধ্যযুগের হুবহু অনুবাদ ছিল না। অর্থাৎ ইউরোপের বা আরও প্রত্যক্ষভাবে, ইংরেজের অনুকরণে নিজেদের মধ্যযুগকে 'ডার্ক এজ' বললে আমাদের আলোকসন্ধানী অস্তিত্বেরই অপমান করা হয়। চাঁদ সদাগর তো মধ্যযুগেরই এক চরিত্র। তার মনসা বিরোধিতা তো তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যেরই অভিজ্ঞান। আবার আমাদের মধ্যযুগ যদি বৃহত্তর অর্থে ভক্তিযুগের নামান্তর হয়, তাহলে সেই ভক্তিযুগই তো জন্ম দিয়েছিল মীরা, কবিরের তুল্য আলোকবর্তিকার, যাঁদের মতন ব্যক্তি আমাদের আধুনিক যুগেও দুর্লভ।

 

সে যাই হোক, পশ্চিমে যে ব্যক্তির জন্ম হয়েছিল ধনতন্ত্রের উদ্ভবের সঙ্গে, যার বিকাশও হয়েছিল ধনতন্ত্রের বিকাশেরই পথ বেয়ে, সেই ব্যক্তিই আজ, পুঁজিবাদের এই বিশ্ববিস্তৃত বাজার কিংবা বিশ্বায়নের যুগে মৃত্যুপথযাত্রী। বিশ্বায়ন কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না ব্যক্তিমেধার আস্ফালন, ব্যক্তিপ্রতিভার বিচিত্র ও মহৎ সিলমোহরগুলিকে। তার কাছে যেহেতু নারীর শরীরের মতন ব্যক্তির ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে ব্যক্তির প্রতিভা পর্যন্ত সব কিছুই পণ্য, সে কেন আর ব্যক্তিতান্ত্রিকতাকে সভ্যতার চালিকাশক্তি হিসাবে মেনে নেবে? সে তো চাইবেই ব্যক্তির মৃত্যু আর ক্রেতার বা কনজিউমারের জন্ম। এই বিশ্বায়নদষ্ট পৃথিবীতে, তাই আধুনিকতার ধারণাও আমূল বদলে যেতে বাধ্য। বাঙালি বিধবাদের দুঃখে প্রাণ-কেঁদে-ওঠা, বীরসিংহ গ্রামের আন্তর্জাতিক সেই বাঙালিটিকে আমরা এতদিন অবিভক্ত বাংলার তথাকথিত নবজাগরণের প্রধানতম স্থপতি অর্থাৎ চূড়ান্ত আধুনিক ব্যক্তিত্ব বলে গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু আজকের কলকাতায় মিডিয়া কিংবা মডেল দুনিয়ার একজন চ্যাঁই-য়ের সঙ্গে তুলনায়, বিদ্যাসাগরমশাইও অনাধুনিক এবং গেঁয়ো হিসেবে প্রতিপন্ন হন। আমাদের বিশ্বস্মার্টনেস এতদুর অব্দি শেকড় বিস্তার করেছে! আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের উন্মেষ ও বিকাশলগ্নে ইউরোপের শ্রেষ্ঠতম ও মহত্তম ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন যিনি, যিনি আমাদের এই সভ্যতার শরীরে বিবেক নামক একটি আশ্চর্য জিনিস অপারেশন করে জুড়ে দেবার কথা বলেছিলেন --- সেই মার্কস সাহেবের ব্যক্তিত্ব তো বিশ্বায়ন সহ্যই করতে পারবে না। পারলে, তাকেও সে টিভি-মিডিয়ার সহশ্রবাহু-আলিঙ্গনে পণ্য বানিয়ে ছেড়ে দেবে। অর্থাৎ যে ধনতন্ত্র একটা সময়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার আদর্শ ও দর্শনের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিল, সেই ধনতন্ত্রই এই ব্যাপ্ত বাজার অর্থনীতির যুগে ব্যক্তির মৃত্যু চাইছে।


স্বাভাবিকভাবেই, ব্যক্তির যা যা অভিজ্ঞান --- তার মধ্যে ভাষা এবং সংস্কৃতিই অগ্রগণ্য --- তাও এই সমাজে খুব বেশিদিন আর টিকে থাকতে পারে না। যে উপন্যাস নামক সাহিত্যমাধ্যমটি একটা সময়ে বিবেচিত হত ব্যক্তির মহাকাব্য-রূপে, তারও মৃত্যু সম্ভবত সূচিত হতে চলেছে এই বিশ্বায়নের আমলেই। ইতিমধ্যেই কোনও কোনওব চিন্তাবিদ, তাদের মধ্যে নোবেলজয়ী ওপন্যাসিক নাইপল সাহেবও একজন, নভেলের মৃত্যুঘণ্টাধ্বনি শুনে ফেলেছেন এবং শুনিয়েও ফেলেছেন। এই মৃত্যুর প্রধানতম কারণ সম্ভবত ব্যক্তির সম্ভাব্য মৃত্যুই। একটা সময়ে ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগতর প্রকাশকেও --- যেমন চিঠির কিংবা ডায়েরির মডেলকেও --- আমাদের উপন্যাস একটা বৃহৎ জায়গা দিয়েছিল। আজ তো সেই চিঠি-লেখাই উঠে গেছে ! ভবিষ্যতে হয়ত রবীন্দ্রনাথের 'ডাকঘর'-এর এমন সঠিক সংস্করণও বেরোবে যাতে ডাকঘর কী ছিল, কেন ছিল --- তা নিয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা থাকবে।

 

ব্যক্তির বিকাশ মানে বৈচিত্র্যের বিকাশ। কারণ প্রতিটি ব্যক্তি তার পাশের জন থেকে আলাদা। সুতরাং, ব্যক্তির ভাষার বিকাশ মানে ছিল ভাষার বহুগামিতা, বৈচিত্র্য। আর আজ বিশ্বায়নের, প্রধানতম অন্তর্লীন শ্লোগান হল রুচি ও সংস্কারের একমুখিনতা। যে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং অনমনীয়তা ঘোল-দই-মাঠার বাস্তবতার সংরক্ষণে পেপসি-কোলার বাস্তবতাকে বিজাতীয় এবং বিষমমেরুর বলে মনে করে, সেই সাংস্কৃতিক শুচিবায়ুতার যে ধ্বংস চাইবে বিশ্বায়ন --- এ তো অতি সাধারণ কথা। একটা সময়ে আমাদের সমাজে সমুদ্রযাত্রার তুল্য, ইংরেজদের অনেক ব্যবহারবিধি আর আচার কিংবা --- খাদ্যতালিকার অনুকরণকে যে অচ্ছুৎ বলে মনে করা হত, এর পেছনে আমাদের সামাজিক আধিপত্যবাদের ছায়া ছিল --- তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এরই পাশাপাশি, নিজেদের অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যরক্ষারও আয়াস যে একেবারে ছিলনা --- সে কথা জোর দিয়ে বলা যায় কি? অবশ্য বিশ্বায়নের হাত এমনই সুদূরপ্রসারী যে তা যেমন একদিকে আন্তর্জাতিক পণ্যের আঞ্চলিক বাজার চায়, তেমনি আবার আঞ্চলিক পণ্যকেও --- দহি কিংবা লস্যিরও --- সর্বজনীন চেহারা দিতে পারে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ তো 'লিচি' নামক পানীয়টির ক্রমাগ্রসরমান বাজার। যে নীতি বাজারজাত পণ্যের বেলায় খাটে, তা বাজারভুক্ত সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তো সমানভাবেই খাটবে! আর ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য যে বাজারে অনাকাঙ্ক্ষিত, সেই বাজারে ব্যক্তির অভিজ্ঞান ভাষার মৃত্যু ঘটাটা সম্ভবত অস্বাভাবিক নয়। হয়ত এখনই এর পদধ্বনি টের পাওয়া যাচ্ছে না। বরং পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, বিশ্বায়নের প্রধানতম হাতিয়ার তথ্যপ্রযুক্তি এবং তার সহযোগী প্রিন্টিং মিডিয়ার নতুন রমরমায় বাংলা বইয়ের জগতে এখন যষ্ঠীর দশা চলছে --- প্রচুর ফলনশীলতা এবং কাটতিতে ভরে উঠছে আজকের বাংলা বইয়ের বাজার। হয়ত এরই ছায়া পড়ছে আঞ্চলিক কোনও কোনও ভূগোলে। আমাদের পড়শি ত্রিপুরার, পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশের কোনও কোনও তথাকথিত প্রান্তীয় জনপদে। কারণ প্রিন্টিং টেকনোলজির ক্ষেত্রে নতুন নতুন এবং সহজলভ্য কিছু পদ্ধতির আবিষ্কার আজ বইপ্রকাশকে একেবারে জলভাত করে দিয়েছে। এককালে ভাল বাংলাবইয়ের প্রকাশ (মানের দিক থেকে বলছি না, বলছি অঙ্গ সৌষ্ঠবের দিক থেকে) কলকাতা ছাড়া অন্যত্র কোথাও সম্ভব বলেই ভাবা যেত না। আজ প্রিন্টিং টেকনোলজির সৌজন্যে সিলেট থেকেও এমন বই বেরোচ্ছে যা কিনা ছাপাই-বাঁধাই-প্রকাশনার মানে খোদ আনন্দ পাবলিশার্সের বইকেও টেক্কা দিতে পারে। কিন্তু একই সময়ে আমাদের এই ভূগোলে --- শিলচর-হাইলাকান্দি-করিমগঞ্জে কী ঘটছে? বইয়ের বিক্রি নেই। আগে যাও বা কেউ কেউ কিনতেন, ইদানীং বাংলা বই কেউ কেনেন না। ইন ফ্যাক্ট, এককালীন বই বিক্রেতাদের অনেকেই এখন সাইড বিজনেস ধরেছেন, বা ধরবেন বলে ভাবছেন। অনেকে গালে হাত দিয়ে নিজেদের দিন গেছে বলে ভাবছেন। সিডি ডিভিডির যুগে বাংলাগানের চলনও এখানে নিম্নাভিমুখী। তরুণোতর প্রজন্ম রবীন্দ্র-নজরুল --- এঁদের গান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বললে অত্যুক্তি হয় না। কেন এমনটা হচ্ছে? এর জবাব খুঁজতে গিয়ে আমি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, সেই সিদ্ধান্তকে মানে একটি আঞ্চলিক সত্যকে আমি এক্ষেত্রে এক সর্বজনীন বাস্তবতা হিসেবে আপনাদের সামনে প্রকাশ করতে চাই। অর্থাৎ, আমার বিচারে, আজ শিলচরে, করিমগঞ্জে যা ঘটছে, দূর ভবিষ্যতে অন্যত্রও তাই ঘটতে চলেছে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে যাবার আগে সংস্কৃতির প্রধানতম চিহ্ন ভাষা এবং ব্যক্তির ভাষা নিয়ে আরও দুটি কথা বলার আছে আমার।


ভাষার বিকাশে এবং বিস্তারে একজন ব্যক্তির ভূমিকা কীভাবে নির্ণয় করা হয়? মূলত দু'ভাবে। এক, ব্যক্তিকে যৌথ স্মৃতি ভাণ্ডারের সম্পদ বিতরণের অন্যতম একক হিসেবে মেনে নিয়ে এবং দুই, ব্যক্তির সমাজজীবন-সংলগ্নতায়। এক একজন ব্যক্তিই --- এতদিন ধরে আমরা দেখে এসেছি --- তাঁর সময়ের, তার অতীতের, আরও আগেকার, এমনকী তাঁর ভবিষ্যতেরও যৌথস্মৃতির এক একটি স্বাতন্ত্র্যচিহিত, অতলান্ত আধার হয়ে উঠতে পারতেন। যেহেতু প্রত্যেকের রুচি ও চিন্তার ক্ষেত্র আলাদা, তাই একেকজনের ভাষাচর্চায় ভাষার এক একটা নতুন দিগন্ত যেন খুলে যেত। একজন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় উপনিষদ এসে মিশে গিয়েছিল বাউলগানের ঠাটে, আবার একজন মুজিব ইরম সিলেটী লোকসঙ্গীতের অন্তর্নিহিত দার্শনিকতাকে অনায়াসে মিশিয়ে দিতে পারেন আধুনিকতাবাদের অন্তর্লীন প্রশ্নকাতরতায়। কিন্তু, এর সঙ্গে তুলনায়, বিশ্বায়ন আমাদের হাতে কি তুলে দিচ্ছে? ছোট্ট ছোট্ট ডিস্ক যা ধারণ করে শব্দকোষ, বিশ্বকোয, স্মৃতিকোষ। ব্যক্তি-স্মৃতির চেয়ে অনেক বেশি ধারণক্ষম এই ডিস্ক মানুষের স্মৃতিকেই তো প্রকারান্তরে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ব্যক্তিস্মৃতির অমোঘত্বকে লোপ করে, তার অবমাননা ঘটিয়ে কম্পিউটার, প্রকারান্তরে, তাকে তো অসারই প্রতিপন্ন করছে --- নয় কি? এই অসারত্বই তো কালে কালে মৃত্যু ঘটাবে ব্যক্তির মধ্যে নিহিত যৌথস্মৃতিরও --- যে স্মৃতি ভাষা-সংস্কৃতির আবহমানতার এক অফুরন্ত ভাণ্ডার বলে অভিহিত হত এতদিন। যে স্মৃতির
কারণে রূপকথা-লোককথাগুলি, লোকগান আর লোকশিল্পের বিভিন্ন আঙ্গিক প্রজন্মে পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকত। আর মানুষ যেহেতু যন্ত্র নয়, তার স্মৃতি তো ভাষা-সংস্কৃতির একধরনের আবেগময় সংরক্ষণই করে চলত। এই স্মৃতির মৃত্যু ঘটলে, ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে আবেগটাই যে লুপ্ত হয়ে যাবে ! আজকের কম্পিউটার, ভিডিও গেম, সিডি, টিভি সিরিয়াল দেখে দেখে বড় হয়ে উঠছে যে শিশু সে তো এক বিশ্ববাজারের নাগরিক, তার কাছে চন্দ্রপুলি, পার্টিসাপটা তো তখনই হ্যামবার্গার পিৎসার মত সমান লোভনীয় যখন এগুলির উপযুক্ত বাণিজ্যিক প্যাকেজিং ঘটছে। সুতরাং তার তো দেশ-কাল, নিজের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আবেগের বোধটাই লুপ্ত হতে বাধ্য।

 

দুই, ভাষা তো আর ব্যক্তির সৃষ্টি নয়, যেমনটা নয় সংস্কৃতিও। বিজ্ঞান শিক্ষার মত ভাষাশিক্ষার ক্লাস থাকলেও, পাড়ায় পাড়ায় গানের ইস্কুল থাকলেও, ভাষা-সংস্কৃতির প্রাণভোমরা তো লুকিয়ে থাকে অন্যত্র। কথা না বললে কি আর ভাষা বেঁচে থাকে ? একজন বোবা ভাষাবিজ্ঞানী তো তখনই মানুষ যখন তিনি কথা না-বলতে-পারার জন্য নিভৃতে কাদেন। যতক্ষণ তিনি তা করতে পারবেন না ততক্ষণ তিনি ভাষার ব্যাকরণই লিখে যেতে পারবেন কেবল। পারবেন কি কখনো ভাষার দেবীকে আলিঙ্গন করতে ? অর্থাৎ কথা বিহনে, ভাষা মৃত। সামাজিক সম্পর্ক এবং আদানপ্রদান বিহনে, সংস্কৃতি স্থবির। অর্থাৎ ভাষা এবং সংস্কৃতির লালনপালন মূলত একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। এই সমাজের মৌলিক ধারণাটাই কি পাল্টে দিতে চাইছে না বিশ্বায়ন?

কিন্তু এ প্রসঙ্গে যাবার আগে, আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা বিনিময় সেরে ফেলি। ভাষা যেমন ব্যক্তির অভিজ্ঞান, তেমনি প্রেমও এতদিন ছিল ব্যক্তিসত্তার স্বাতন্ত্র্যের এক অন্যতম চিহ্ন। কত কাণ্ড যে ঘটে গেল এই প্রেম নিয়ে --- জীবনে, সাহিত্যে --- বিশেষত উপন্যাস ও গল্পে। কত প্রেম যে প্রেমাস্পদর মুখ-ঘুরিয়ে-নেওয়ায় চিরকুমার কিংবা চিরমারী হয়ে রইল ! বস্তুত, প্রেম ছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের স্ফুরণের যুগে একটি  মূল্যবোধেরই অপর নাম। এই মূল্যবোধ-হয়ে-ওঠার কারণেই প্রকৃত প্রেম এতদিন সমাজের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারত। এতটাই সাহসী ছিল তা। কিন্ত আজ এই বিশ্বায়নের যুগে রুচি-নির্বাচন সব কিছুর স্বাধীনতাই যখন একচেটিয়া বাজারের সম্প্রসারণের শক্র বলে বিবেচিত হচ্ছে, তখন ব্যক্তির প্রধানতম অভিজ্ঞান প্রেমেরও মৃত্যু ঘটতে বাধ্য। কাম এবং যৌনতা প্রেমের জায়গা দখল করার জন্য ইতিমধ্যেই হন্যি হয়ে উঠেছে। আদর্শ কনজিউমারের জন্ম হলেই প্রেমেরও মৃত্যু সূচিত হবে। যেভাবে এক মডেলের গাড়ী ব্যবহার করতে করতে নব্য কনজিউমারদের বাজে লাগবে, বোরডম অনুভূত হবে, তেমনি একই নারীর সঙ্গে বেশিদিনের সম্পর্ক ক্লান্ত করবে তাদের। পরিণাম ? পরিণাম প্রেমের মৃত্যু। কারণ, নারী শরীর তো বহুদিন হল পণ্য, যে হৃদয় এতদিন এই পণ্যায়নের বিরুদ্ধে সরব ছিল আজ সেও বিশ্ববাজারের সোনার হরিণের পেছনে ধাওয়া করে করে আর্ত এবং জালে-পড়া। কারণ, 'ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর'। প্রসঙ্গত এই বিজ্ঞাপনটিকে বিশ্বায়িত পৃথিবীর আদর্শ কনজিউমারের একটি তীব্র হৃদয়ছবি বললে কি ভুল বলা হবে? খেয়াল করে দেখুন এর ভাষার দ্বিচারিতা। ভাষার শুচিবায়ূতা যেমন কাম্য নয়, তেমনি কাম্য নয় ভাষার অনাবশ্যক ভেজালপ্রবণতাও। দ্বিতীয়ত এর অন্তর্গত মৌলিক বাণী প্রতিমাটি তো হচ্ছে 'ইয়ে বডি মাঙ্গে মোর'।

 

বডি-র স্থলাভিষিক্ত হয়ে উঠল যে 'দিল', সেই দিল তো শরীরসর্বস্বতারই নামান্তর। অন্যভাবে বলতে গেলে, হৃদয়ের অস্তিত্বটাই যেখানে অবান্তর, সেখানে শরীর নিজেই তো এখন দিল হয়ে উঠবে। একে, এই দিলকে কি করে আর শোনানো যায় সেই অতীন্দ্রিয় প্রশ্ন : '"শরীর শরীর, তোমার মন নাই কুসুম ?" অর্থাৎ, বিশ্বীয়িত পৃথিবীতে প্রেমেরও অপমৃত্যু অবধারিত। সম্ভবত এই সময়ের একমাত্র কল্পনা হয়ে উঠতে চলেছে pornographic imagination ---যে পর্নোগ্রাফির চূড়ান্ত সাফল্য ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কে নয়, মনোহীন যৌনাঙ্গের সঙ্গে যৌনাঙ্গের সম্পর্কে। একই রকমভাবে, শিল্পের জায়গা দখল করতে চলেছে সম্ভবত বিজ্ঞাপন --- যা শিল্প-সৃষ্টির বিভিন্ন উপকরণকে কাজে লাগিয়ে দিনে দিনে আরও শৈল্পিক হয়ে উঠতে চাইছে। বহুত্ববাদ এবং বৈচিত্রের ধারণায় সমূলে আঘাত হানতে চাইছে যে একচেটিয়া বাজারবাদ, তার কাছে মন জিনিসটাই তো একটা মস্ত আপদ। কারণ মনই তো বৈচিত্র্যের প্রকাশে সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করে। মানুষের ভাষা, মানুষের প্রেম, মানুষের সংস্কৃতি সব কিছুই তো আসলে বহুত্ব এবং বৈচিত্রের স্ফুরণ। আমাদের সমাজ তো এতদিন ছিল এই বহুত্বেরই যেন এক স্বতঃস্ফূর্ত খামার।

 

আসলে ইউরোপে যেমন ছিল রাষ্ট্র, আমাদের তেমনই ছিল সমাজ। আমাদের বঙ্কিম ছাড়া আর কোনো ওপন্যাসিকেরই দৃঢ় ও পোক্ত (তা তিনি যতই প্রতিক্রিয়াশীল হোন না কেন) রাষ্ট্রভাবনা ছিল না। আর ইউরোপে ইউটোপিয়া ও ডিসটোপিয়া রাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসেরও দুটি মডেলের নামান্তর। ইউরোপে ধর্মের সঙ্গে বিরোধে সংশ্লেষে রাষ্ট্র এক চূড়ান্ত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, আমাদের দেশে ধর্ম, জাতপাত, ধর্মান্ধতা সব কিছুই সমাজকে আশ্রয় করেই বেঁচে থাকত। এই সমাজে রাষ্ট্রের যে ছায়া পড়ত না, তা নয়। একটি গ্রাম্য চণ্ডীমণ্ডপ হয়ত প্রকৃত প্রস্তাবে পার্লামেন্টেরই এক ক্ষুদ্র সংস্করণ হয়ে উঠত, কিন্তু তবু, রাষ্ট্রের অপ্রত্যক্ষতা, বায়বীয়তা ও সুদূরতা সেই সমাজে ছিল না। সেই সমাজই আমাদের অভিধানের ভেতরের এবং অভিধানের বাইরের শব্দভাণ্ডারের --- বিশেষত আমাদের দেশি শব্দভাণ্ডারের উদ্ভবের ক্ষেত্রে ধাত্রীর এবং মাতৃজঠরের কাজ করেছিল। আজ সেই সমাজজীবনই যখন টিভির অবসরহীনতার আবর্তে ভেঙ্গে পড়ছে, তখন ভাষার এবং সংস্কৃতির বেঁচে থাকাও তেমন সাবলীল রইল কই ? একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। কলকাতা শহরে চূড়ান্ত নগরায়ণের পরও ব্যস্ত জনশ্রোতের একটা স্পন্দনশীলতা টের পাওয়া যেত। এখনও যায়। একটি ফ্ল্যাটের একজন হয়ত দোতলাকে চিনে না, হয়ত তাদের পারস্পরিক মুখ দেখাদেখিরও সুযোগ ঘটেনি কোনোদিন, কিন্তু রাস্তা কিংবা বাসের ভেতরের চলমান ভীড় সবসময়ই মানবিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে ব্যাগ্র ছিল। উদাসীন ছিল না। কিন্তু বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছে গেলে,
হয়ত এই ভীড়েরই হৃদয় পরিবর্তন হয়ে যাবে। হয়ত সায়েন্স ফিকশন গল্পের বাস্তবতাই তখনকার বাস্তবতা হয়ে উঠবে। সেই যে ব্র্যাডবেরি সাহেব তার একটি গল্পে দেখিয়েছিলেন, সন্ধ্যারাত্তিরে শহরের বুকে হেঁটে বেড়ান লেখক মিড, স্মৃতি ও নস্টালজিয়া একমাত্র সঙ্গী তার, চারদিকের শহর নিঝুম, শুনশান। সবাই যে যার ফ্ল্যাটে আলো জ্বেলে কিংবা আলো নিভিয়ে টিভি সেটের সামনে মন্ত্রমুগ্ধ। কিংবা যে ছবি দেখিয়েছিলেন ব্যালার্ড সাহেব তাঁর একটি গল্পে বিশ্বায়নের অভীষ্ট তো তাই। সেই গল্পে, শহরে নতুন নতুন কেবল তার লাগানো হয়। তারা বিশেষ তড়িৎ চৌন্বকীয় প্রবাহে সম্মোহন ছড়িয়ে দেয় পথচারীদের কানে : buy more : you need a car, yeah, right now. কেনা, কেনা। আরও চাওয়া। ৬ মাস আগে কেনা ফ্রিজ পছন্দ হচ্ছে না ? তাতে কী হয়েছে ? এখনই তো এরকম কোম্পানি আছে যারা পুরনো ফিজ + আরও কিছু টাকা দিলে, নতুন ফ্রিজের মালিকানা হাতে তুলে দেয়। এরকমভাবে নতুন নতুন বাড়ির, গাড়িরও মালিকানা পাওয়া যাবে অবশ্যই। নতুন নতুন। নতুন চাওয়ার এই মোহ কি হৃদয়কেও ছেড়ে যাবে ? পুরনো নারী শরীর পছন্দ হচ্ছে না ? তাহলে ? তারও তো রাস্তা খোলাই থাকছে। অতএব বিবাহিত জীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন কেনা-বেচার নতুন নিয়মে পাল্টে যাবে। পাল্টে যেতে বাধ্য। আর এই পাল্টে যাওয়ার চলমান গতিময় দৃশ্যবদলের খেলায় মানুষের সেই অবসরটাই হারিয়ে যাবে যে অবসর ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদির লালন পালনেও এ ক্ষেত্রে নতুন নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনা হিসেবে ছিল অমোঘ |

 

আসলে, মানুষের মনটাই তো পাল্টে গেছে, পাল্টে যাবে। যে মানুষ ভাষাপ্রেমিক ছিল, হাছন রাজার গান শুনলে, রবীন্দ্র নাথের নাটক দেখলে, শেক্সপীয়ারের পংস্তি পড়লে যার মন-কেমন করত, জল আসতো চোখে, সেই মানুষ আজকেই এই অফুরন্ত চাহিদার ধারক 'আদর্শ ক্রেতা' ছিল না। তার একটা চোখ, কান, হাদয়-সর্বস্ব নিজস্ব জগৎ ছিল। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যারা নতুন জমানার ক্রেতা --- তারা কীভাবে বড় হচ্ছে? একটু চলুন, দেখে আসি।

 

এই যে একটা বাড়ি। একটা শিশু। বছর সাতেক বয়স তার। এখন দুপুর। বাবা মা অফিসে। ছেলেটা দুপুরে ঘুমোয় না। কাজের মাসির কাছে বড় হচ্ছে সে। মাসি তাকে বলছে চ্যানেল ঘোরাতে। সে কিন্তু কার্টুন নেটওয়ার্কের ভক্ত। তা-ই দেখছে সে। কী দেখছে ? দেখছে হিম্যানকে, স্পাইডারম্যানদের। কিন্তু তার বাবাও তো এককালে স্কুল কিংবা কলেজ পালিয়ে অমিতাভ বচ্চনকে দেখত। একটু মিলিয়ে দেখুন, সে দেখা আর এ দেখা এক নয়। প্রথমত : তাঁর লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ বা শত অবাস্তবতা সহ অমিতাভ বচ্চন ছিলেন একজন মানুষ। কিংবা একজন ব্যক্তিই। অর্থাৎ ওই ছেলেটির বাপের আমলে তখনকার হিন্দি সিনেমারও একটা সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল। ভারতীয় রাজনীতির, ভারতের সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে তার একধরনের যোগাযোগ ছিল। আসুন, একটু মনে করে দেখি। রাজকাপুরের ওই ছবিটা --- ওই যে মেরা নাম জোকার --- তাতে রাশিয়ান একটা সার্কাস দলকে ব্যবহার করা হয়েছিল। একটা রুশি মেয়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাতে। নেহরু জমানার, পরবর্তী ইন্দিরা জমানার ভারত-রুশ আন্তর্সম্পর্কের আলোয় এই ভূমিকাকে দেখা যায় নাকি ? কিংবা ধরুন, ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার যত বেশি রাজনীতিকরণ হয়েছে স্বাধীনতাউত্তর কালে, ভারতীয় রাজনীতির যত বেশী দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, ততই কি বদলে যায়নি হিন্দি সিনেমার নায়কের রোল --- তাঁর কানুন নিজের হাতে তুলে নেবার পেছনে কি কোনই সামাজিক, রাজনৈতিক বাস্তবতা নেই ? অর্থাৎ ওই ছেলেটির বাবার জগৎ কার্টুনের জগৎ ছিল না। যন্ত্রের জগৎ ছিল না। ছিল একটা সম্পর্কময় জগৎ। কিন্তু এই ছেলেটির ? এর জগৎ তো শুধুই মার্কিনি ধাঁচে তৈরি ত্রাতার। আক্রমণ আর আক্রান্তের। হিংসার আর বিজয়ের। সুপারম্যান কখনো পরাজিত হয় না, যেভাবে মার্কিনি ভোগবাদ কখনো পরাজিত হয় না। সে ত্রাতা। তুমি আর্ত। সুতরাং তোমার একমাত্র রক্ষাকবচ, একমাত্র ভরসা সে-ই। এই ত্রাতার মধ্যে কিন্তু কোনও যীশুর নেপথ্য ছায়া নেই, আত্মিক সংকটের কোনো কথা নেই। এর ভালো-খারাপের মোটা দাগের পেছনে নীতিশাস্ত্রেরও কোনো ছায়া নেই। বরং আছে রাষ্ট্রের ছায়া, বিচার ব্যবস্থার ছায়া --- ভালোর ছায়া দিয়ে ঢাকা যা আসলে পরোক্ষভাবে পেশি আস্ফালনেরই রূপক। আর কী আছে তাতে ? ত্রাতা যীশুর তো একমাত্র শক্তি আত্মিক শক্তি, নতুন যুগের ত্রাতা সুপারম্যান আর হিম্যানরা কোন শক্তির বলে অপ্রতিরোধ্য ? বিজ্ঞানের ও প্রযুক্তির। প্রতিটি সুপার হিরোর পেছনে একটা না একটা শক্তি কাজ করে। Power, game of power— এই নেটওয়ার্কের পৌনঃপুনিক উপস্থাপনায় এই সিরিজগুলি কি ঠাণ্ডাযুদ্ধ চলাকালীন পৃথিবীর কথাই মনে করায় না যখন এই পৃথিবীতে দ্বিতীয় একটা শক্তি ছিল ? মনে হয় না কি যে এই কমিকস্ট্রিপগুলির উদ্ভাবক আমেরিকা, এখনও কোনও এক 'শক্তির' কিংবা 'অক্ষশক্তির' জুজুর ভয়ে কাবু ? অর্থাৎ এগুলো দেখছে যে শিশু সে কি করে আর গ্রহণ করবে রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষকে ? তার তো মনের সেই চোখটাই হারিয়ে গেছে ! সুকুমারবৃত্তি বলে যে কথাটি এককালে বাংলাভাষায় শিশুদের সম্পর্কে অবশ্যব্যবহার্য ছিল, তা তো এই শিশুটির ধারেকাছে কখনো আসবে না। কারণ তার জগৎ তো বিপন্নতা আর ত্রাণ, জয়ী হওয়া আর হেরে যাওয়া ইত্যাদির সম্মোহনী আবর্তে ইতিমধ্যেই ডুবে গেছে। এখন, এই শিশুটি বড় হয়ে কোন সমাজ গঠন করবে ? স্মৃতিশূন্য, ইতিহাসজ্ঞানশৃন্য এই শিশুটির কাছে মাতৃভাষার কী আবেদন থাকতে পারে ? কী আবেদন আছে তার কাছে ইংরেজি ভাষারই নানান সংবেদনশীল প্রয়োগের ? তার কাছে পৃথিবীটা, বেঁচে থাকাটা তো আর বিস্ময়ের জগৎ নয়। এর সব কিছুই পূর্বনির্ধারিত। বড় হব --- বিয়ে করব --- বৌ পাল্টাবো --- বড় চাকরি --- বড় বাড়ি-গাড়ি --- এই তো তার জগৎ।

 

আর, আজকের এই শিশুই তো ভবিষ্যতের বিশ্বনাগরিক ! তার কাছে আঞ্চলিক সংস্কৃতির, তার মাতৃপ্রতিম সংস্কৃতির তো চাইবার কিছুই নেই। অর্থাৎ আজকের বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক দাদা-আমলাদের পেছনে দৌড়ানো, দালালির আর কন্ট্রাক্ট এর পয়সায় ফুলে ফেঁপে-ওঠা স্মৃতিহীন, শিকড়হীন, সংস্কৃতিহীন নব্যমধ্যবিত্ত সমাজ তো আসলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীরই ভবিষ্যৎ নাগরিকের এক মিনিমডেল ! আজ বরাক উপত্যকার মধ্যবিত্ত সমাজ বই পড়া, ভালো গান শোনা, হলে গিয়ে সিনেমা দেখা, মঞ্চে নাটক দেখা ইত্যাদি থেকে যেভাবে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, আজকের কলকাতায় বড় হওয়া, কার্টুনখোর শিশুটিও ভবিষ্যতে তার নিজের জীবনে তাদেরই অনুসরণ করবে। অবাধ গ্রহণযোগ্যতার পশ্চাদপটটি তৈরি করে দিয়েছে এই কার্টুনগুলিই। হ্যারি পটার সিরিজ যেন প্রকারাস্তরে কোনো না কোনো কার্টুন সিরিজেরই সুলিখিত সংস্করণ। আর হ্যারি যে এই টেকনো জমানারই প্রতিনিধি তা তো স্বতঃই প্রতীয়মান হয়ে ওঠে যখন দেখি যে পটার সিরিজে মনুষ্যকুল দু'ভাগে বিভক্ত। এক, মাগল যারা ম্যাজিকের ব্যবহার জানে না আর দুই, উইজার্ড যারা ম্যাজিকের ব্যবহার জানে। এই ম্যাজিক নির্ভরতার পেছনে আছে বাস্তবতার কোন ম্যাজিক ? একি প্রযুক্তিরই ম্যাজিক নয় ? বিশেষত মাগলদের কাছে, যারা প্রযুক্তির ব্যবহার জানে না, তাদের কাছে প্রযুক্তি তো চিরকালই ম্যাজিক সদৃশ ! অর্থাৎ পটার সিরিজের অন্তর্লীন নব্যম্যাজিকবাদের পশ্চাদপট আছে যে আধুনিক উইচক্র্যাফট তার নাম তথ্য প্রযুক্তি --- এর সাম্প্রতিক রমরমা। এখানে একটি তথ্যের উল্লেখ সম্ভবত অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে কম্পিউটার-পরিভাষায়ও 'উইজার্ড' একটি 'সাব মেনু'র নাম।

 

কিন্তু এ তো গেল মধ্যবিত্ত সমাজে সংস্কৃতির সংকটের কথা। সমাজের সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষ যে স্তরে বাস করেন, সেই নিম্নবিত্ত সমাজে এবং গ্রামীণ পৃথিবীতে সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কি রকম ? আসলে তথাকথিত 'মাস পিপল'-এর আগের রূপ লোকমানবের তো ছিল লোকসংস্কৃতি যার একটা অংশ ছিল শ্রমজীবনের সংস্কৃতি --- সারি গান, জারি গান, ছাদ পেটানো গান-নাচ সবকিছুই। এসবের, লোকসংস্কৃতির বিকাশের সুবর্ণযুগ তো আসলে ছিল সেই যুগ যাকে এখন আমরা 'মধ্যযুগ' বলে থাকি। মধ্যযুগ যে ইউরোপের কায়দায় 'ডার্ক এজ' ছিল না তার আরেকটি প্রমাণ হল মধ্যযুগের সাহিত্য-সংস্কৃতির গ্রামীণ-নাগরিক দ্বন্দ্ব কখনই তেমন তীব্র ছিল না। পুঁজির বিকাশের পথ ধরে আধুনিক শহরের গড়ে ওঠার পরই সাহিত্য-সংস্কৃতিতে গ্রাম-শহরের দ্বন্দ্ব তীব্র আকার নিল। সেই তথাকথিত মধ্যযুগের কিংবা সামন্তযুগের সাংস্কৃতিক ঘরানারই তো উত্তরসূরি হলেন আমাদের হাছন রাজা আর রাধারমণ যারা সমাজের নীচের তলার লোক না হয়েও যে গান বেঁধে গেছেন তা ওপর নীচ সকল স্তরের মানুষের মনকেই ছুঁয়ে যেতে পারতো। অর্থাৎ লোকসংস্কৃতির, শ্রেণীবৈষম্যসচেতনতা, শহুরে সংস্কৃতির সঙ্গে তুলনায়, তেমন তীব্র ছিল না। সেই সমৃদ্ধ, ঐশ্বর্যবান, বৈচিত্রময় লোকসংস্কৃতি ইতিমধ্যে শহুরে সংস্কৃতির ড্রয়িংরুমে দাসী চাকরের কাজও করতে বাধ্য হয়েছে। তাকে দিয়ে নানা রকমের বেগার খাটানোও হয়েছে। নানারকমের আপোষ করে করে ইতিমধ্যেই তার শরীরে বহু আবর্জনা জমা হয়ে গেছে। কেঁদুলির মেলায় সত্যিকারের বাউলসঙ্গীত শোনার শ্রোতা যেমন আস্তে আস্তে দিনকে দিন কমে আসছেন, ভেজাল এবং শহুরে বাউলগীতির চাহিদাও তেমনি বেড়ে চলেছে। নাগরিক ঔদাসীন্য, নাগরিক ঠাটবাটের সঙ্গে এসব আপোষ করতে করতে লোকসংস্কৃতির অনেক প্রকৃত সম্পদ ইতিমধ্যেই অবলুপ্তির পথে।

 

গ্রামের মানুষ, প্রান্তীয় মানুষ, সমাজের নীচুতলার মানুষ যারা বিশ্বায়িত পৃথিবীর 'আদর্শ ক্রেতা' সম্ভবত কখনই হয়ে উঠতে পারবেন না--- তারাই যে এই লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবেন--- এমন আশা অযৌক্তিক। কারণ তারাও ইতিমধ্যে বিশ্বায়নের সংস্কৃতির--- টিভি চ্যানেলের কুহকের আর সিডি ভিডিওর পর্নোমায়ায় দিব্যি ধাতস্থ হয়ে পড়ছেন।


তবু বিশ্বায়নের একমাত্র প্রতিরোধ আয়োজন করার ক্ষমতা রয়ে গেছে তাদের হাতেই। এই ইন্টারনেট প্রযুক্তি আসার বহু যুগ আগে যে লৌকিক ঐতিহ্য অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ছড়িয়ে দিতে পারত একটি সুর কিংবা একটি গানকে এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে, কিংবা ধারণ করে চলত দীর্ঘ ও আবহমান লোককথা আর হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ গানের পদকে --- সেই লোকস্মৃতি, লোকশ্রুতি, লোকমনকে অবিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না।


আর কেউ না থাকলেও, আউল বাউলরা কি থাকবেন না ? যারা সভ্যতার ও সমাজের নানারকম দম্ভ আর অমানবিকতার প্রান্তে বসেও প্রাণের গান বেঁধে গিয়েছেন একদা, বেঁধে গিয়েছেন এতদিন। যাদের গান-বাঁধা এবং জীবনযাত্রা দুটোই তথাকথিত 'ভদ্র' ও 'বাবু', তথাকথিত 'সভ্য' ও 'সংস্কৃত' জীবনের অনেক মেকি প্রহসনের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা এক ভয়ঙ্কর নিঃসঙ্গ, প্রান্তীয়, সুদূর কিন্তু প্রতিবাদী কণ্ঠ। আমাদের সভ্য জীবন যত মনোহীন হয়েছে ততই ভাববাদের পূজারী হয়েছে। আর আউল বাউল মরমীয়াদের সৃষ্টিতত্বে দেহাত্মবাদ যত গভীর হয়েছে তাদের গানে 'মনের মানুষ' ততই উজ্জল হয়ে উঠেছেন। হয়ত এই বাউলপ্রতিম কিছু নিঃসঙ্গ একক স্বর এই মনহীন সভ্যতায় মনের মানুষের গহন নির্জন পথে প্রতিবাদের মত জেগে থাকবে।

 

সেই নিভৃত পথের জন্য কান পেতে থাকা ও তার কথা লিখে যাওয়া এবং এই একচেটিয়া বাজারের সময়ে বহুত্ববাদের কথা সাড়ম্বরে প্রচার করে যাওয়া --- এছাড়া আমাদের সম্ভবত আর কোনও বিকল্প পথ নেই।