রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

পুরনো পৃষ্ঠা থেকে : আসামের ভাষা সমস্যার স্বরূপ


সুজিৎ চৌধুরী
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

 

এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রতিশ্রোত লিটল ম্যাগাজিনে।

ঈশান কথার নতুন প্রয়াস "পুরনো পৃষ্ঠা থেকে"-র অংশ হিসেবে এই লেখাটিকে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তুলে ধরা হল...

 

‘‘মোগলরা যদি আসাম অধিকার করতে সক্ষম হতো তবে হয়ত বাংলা অসমিয়া দুটো নামে দুটো ভাষা না হয়ে অন্য নামে একটাই ভাষা প্রচলিত হতে পারতো’’ (সুজিৎ চৌধুরী৷ ‘প্রতিস্রোত’জানুয়ারী সংখ্যা ১৯৮৭ইং)৷ ১৮শ শতকে ইংরেজ গৃহীত নীতি অনুযায়ী বাংলার প্রচলন (আসামে) তো সেভাবে অসমিয়ারা গ্রহণ করতে পারে নি৷ মোগলদের সে প্রচেষ্টা সফল হওয়া কি সম্ভব ছিল ? নাকি ভাষা সংসৃকতির বোধ সে পর্যায়ে ছিল না ?

ভাষিক ও সাংসৃকতিক যে পরিচিতি নিয়ে আজ আমাদের অস্তিত্ব, মোগলদের বাংলাদেশ (অবিভক্ত বাংলা) অধিকারের সময়ে সে বোধ গড়ে ওঠে নি৷ ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে লিখিত ভাষার ক্ষেত্রে বাংলায় প্রচলিত ভাষার সঙ্গে আসামের প্রচলিত ভাষার তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না৷ কৃত্তিবাস বা চৈতন্য চরিতামৃতের ভাষার সঙ্গে অনন্তকন্দলী বা শঙ্করদেবের প্রথমদিকের চরিতগ্রন্থের ভাষার তেমন কোনো তফাৎ নেই৷ ময়মন সিংহের কবি নারায়ণদেবের মনসামঙ্গল তাই সুকন্নানির (সুকবি নারায়ণ) মনসামঙ্গল হিসাবে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সমান জনপ্রিয়৷ আর ঐ সময়ে ঐ ভাষার নাম যে ‘বাংলা ভাষা’ সে কথাটাও তত সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপিত হয় নি৷ মোগলরা ঐ ভাষা চাপিয়ে দিলেই সেটা বঙ্গ-আসামে চলে যেতে, সে-কথা আমি বলি নি৷ আমি বলতে চাইছি যে একই রাজনৈতিক প্রশাসনের অধীনে থাকলে উভয় অঞ্চলের ভাষা মিলিয়ে পূর্বদেশীয় একটিমাত্র ভাষা গড়ে ওঠার সুযোগ পেত৷ তার নাম হয়তো বাংলা বা অসমিয়া না হয়ে হতো ‘পূর্বী’ বা এমনতর একটা কিছু৷ মোগলরা গোয়ালপাড়া অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অন্য অঞ্চলে স্থায়ী আধিপত্য স্থাপন করতে পারে নি বলে সে প্রক্রিয়াটা বন্ধ হয়ে গেল৷ আহোমরা তাঁদের ভুখণ্ডকে শুধু যে রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র রেখেছিলেন, তা নয়, সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও অঞ্চলটা স্বতন্ত্র হয়ে গেল৷ বিশেষ করে আহোম রাজসভায় বুরঞ্জী লেখার জন্য যে গদ্যের জন্ম হল, সেটা ঐ পর্যায়ে অসমীয়া ভাষার স্বতন্ত্র ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল৷ আর ইংরেজরা আসামে বাংলা ভাষা প্রচলনের চেষ্টা করেছিল ১৮৩৭ সালে, অর্থাৎ উনবিংশ শতকে, অষ্টাদশ শতকে নয়৷ ঐ সময়ে ঐ প্রয়াস সফল হওয়ার কথা ছিল না, কারণ অসমিয়া ভাষার স্বতন্ত্র চরিত্র তখন মোটামুটি সুপ্রতিষ্ঠিত আর পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত নব্য অসমিয়া বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের কাছে পাশ্চাত্য ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ধারণাও সুপরিচিত৷

 

যেহেতু বাংলা নামক একটি দেশে সেই ভাষা ইতিমধ্যে বহুল প্রচলিত এবং বলা যায় বেশ উন্নত, সেক্ষেত্রে পার্শবর্তি একটি রাজ্যের বাংলা ভাষীদের উপেক্ষা করে নতুন কোন ভাষার প্রচলন কি সম্ভব হতো ?

এই প্রশ্ণটা আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয় নি৷ বঙ্গভাষী বা অসমিয়া ভাষীদের মধ্যে নূতন কোনো ভাষা প্রচলন করার কথা আমি কোথাও বলি নি, আমি বলছি লোকসমাজে প্রচলিত মুখের ভাষার মধ্য থেকে লেখ্যভাষা গড়ে ওঠার কথা৷ ষোড়শ শতকে বীরভূম বাঁকুড়া হুগলি দিনাজপুর বা ময়মনসিংহের লেখ্য ভাষার সঙ্গে কোচবিহার কামরূপ গোয়ালপাড়া তেজপুরে প্রচলিত লেখ্য ভাষার তেমন কোনো তফাৎ ছিল না৷ তাই গোটা অঞ্চলে একটি মাত্র লেখ্যভাষা গড়ে ওঠার সুযোগ ছিল, প্রতিকূল রাজনৈতিক কারণে যা সম্ভবপর হয়নি৷

 

ঐতিহাসিক নানা কারণে আসামে অসমিয়া জাতিসত্তা বিকাশ লাভ করতে পারে নি৷ মহাপুরুষ শংকরদেব অসমিয়া জাতিসত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন কিন্তু তিনি তা পারেন নি শেষপর্যন্ত, তাকে আসাম থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল৷ এখান থেকেই কি আসামে ভাষা সমস্যার সূত্রপাত হয়েছিল ? এই প্রেক্ষাপট নিয়ে যদি বিস্তারিত বলেন————

এ-প্রশ্নের জবাব সংক্ষেপে দেওয়া দুরূহ৷ এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার চেষ্টা করছি একটি অর্ধসমাপ্ত বইতে, নাম The Assamese Quest For Homogeneity—Its Origin, Growth and Manifestations. বইটা আগামী বছর নাগাদ বের হবে৷ যাই হোক অন্যত্র যে আলোচনা করেছিলাম সংক্ষেপে, তা থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি : জাতিসত্তার বিকাশ একটি ঐতিহাসিক বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফসল, এবং সমাজ বিজ্ঞানীরা সে প্রক্রিয়ার পর্যায়গুলোকে মোটামুটি সঠিকভাবে নিরূপণ করতে সক্ষম৷ সে বিচারে অসমিয়া জাতির গঠন-প্রক্রিয়া নিশ্চিতই এখন পর্যন্ত অসমাপ্ত— বস্তুত সে পরিক্রমণ-পথের মধ্যস্থলেই তার বর্তমান অবস্থান৷ তদুপরি আসু’র আন্দোলন সে পরিক্রমণের গতি শুধু অবরুদ্ধ করে দেয় নি, অর্ধগঠিত অসমিয়া জাতিসত্তার মধ্যে যারা আশ্রয় নিয়েছিল তাদের মধ্যেকার অপেক্ষাকৃত নবাগতরা আজ নিজ নিজ গোষ্ঠীসত্তাকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার কথাও ভাবছেন৷ বোড়ো কাছাড়ি এবং তাদের সহযোগী অন্য জনজাতীয়রা, পূর্ববঙ্গাগত চাষী মুসলমান এবং হিন্দু উদ্বাস্তুর গ্রামীণ অংশ, চা-বাগানের শ্রমিক এবং তাদের অশ্রমিক বংশধর— কেউবা স্বাভাবিক নিয়মে, কেউবা অনন্যোপায় হয়ে অসমিয়া জাতিসত্তার শরিক হয়েছিলেন এবং এদের নিয়েই আসাম রাজ্যে অসমিয়াভাষীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ৷ এই আগন্তুক শরিকদের অনেকেই আজকে থমকে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের ধারণা আসাম আন্দোলনের অন্তর্লীন ভাবধারাটি তাঁদের সদিচ্ছার অবমাননা করেছে৷ অর্থাৎ আন্দোলনের সূত্রপাতের সময়ে অসমিয়া জাতি গঠন প্রক্রিয়া যে পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল, আজ তা থেকে কিছুটা পিছিয়ে গেছে৷

আমাদের বিবেচনায় অসমিয়া জাতি-সত্তা ভ্রূণাবস্থা থেকেই একটা মৌলিক দুর্বলতায় ভুগছে এবং ঐতিহাসিক বিচারে সে দুর্বলতার স্বরূপ নির্ণয় সম্ভব৷ অবশ্য তার জন্যে অন্তত ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত ইতিহাসের পাতা উল্টে যাওয়া একান্তই আবশ্যিক৷ দুর্ভাগ্যত সে কাজটিতে কেউ হাত দেন নি, আসাম সমস্যার হেতু বিচারে ১৮২৬ সালের ওদিকে কাউকে দৃক্পাত করতে বড় একটা দেখি নি৷১৮২৬ সালে ইয়াণ্ডাবোর সন্ধির মাধ্যমে আসামে বৃটিশ-শাসনের সূত্রপাত হয়েছিল সে তো নিশ্চিতই একটা বড় ঘটনা, কিন্তু সেই সঙ্গে একথাও তো সত্যি আসামের তার আগেরও একটা ইতিহাস আছে এবং সে ইতিহাসের উত্তরাধিকার রাজ্যের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী আজও বহন করছেন৷

গুপ্তরাজাদের আমলেই কামরূপ রাজ্যের সম্মানজনক অস্তিত্বের প্রমাণ আমরা তাম্রলিপি থেকেই পাচ্ছি৷ কিন্তু সে রাজ্যের কেন্দ্রভূমি ছিল পশ্চিম কামরূপ এবং তার স্বাভাবিক সম্প্রসারণ-লক্ষ ছিল উত্তর পশ্চিমবঙ্গ বা বরেন্দ্র-পূণ্ড্রবর্ধন এবং পূর্ববঙ্গ বা বঙ্গ সমতট৷ কামরূপের তিনটি আর্যভাবাপন্ন রাজবংশ— বর্মন শালস্তম্ভ এবং পালবংশ— যারা ধারাবাহিকভাবে প্রায় আটশ বৎসর এই অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন, তারা আর্যীকৃত বরেন্দ্রবঙ্গ সমতটের উপর আধিপত্য বিস্তারেই সমধিক আগ্রহী ছিলেন- ভাস্করবর্মণ-শশাঙ্কের সংঘাতের ব্যাপারটাও সেই প্রয়াসেরই অঙ্গ ছিল৷ তাদের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং হয়তো বা আনুগত্যও ছিল আরেকটু পশ্চিম ঘেঁষা, অরা নালন্দায় দান করতেন এবং বারাণসীতে ছাত্র পাঠাতেন৷ অপরদিকে নিজ রাজ্যের পূর্বাংশে বসবাসকারী জনজাতীয় জনগোষ্ঠিগুলো সম্পর্কে তাদের আগ্রহ ছিল সীমাবদ্ধ৷ লিপিপ্রমাণগুলো থেকে এমন কোনো তথ্য আমরা পাইনি যাতে মনে করা যেতে পারে যে আজকের পূর্ব আসামের সে সময়কার বাসিন্দাদের সঙ্গে কামরূপীয় রাজাদের কোনো যোগাযোগ ছিল৷ এমনকি নিজ রাজ্যের কেন্দ্রভূমিতে বসবাসকারী বোডোজাতীয় উপজাতিরা ছিলেন রাষ্ট্রীয় করুণাধারা থেকে বঞ্চিত এবং রাষ্ট্রীয় কপিবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন৷ অথচ পণ্ডিতজনেরা অনুমান করেন যে উল্লিখিত তিনটি রাজবংশের তত দটির উদ্ভব ঘটেছিল ঐ ধরণের জনজাতীয় সমাজ থেকেই৷ এদের আমলের যে সমস্ত তাম্রলিপি এবং অন্যান্য স্মারক আমাদের হাতে এসেছে, তাতে একটা কথা স্পষ্ট যে খৃষ্টীয় একাদশ শতক পর্যন্ত কামরূপ রাষ্ট্রে পশ্চিমদেশাগত ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য উচ্চবর্ণরাই ছিলেন রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে পরিপুষ্ট, রাজ্যের স্থানীয় অধিবাসী জনজাতীয়রা নন৷ ফলে শেষোক্তরা থেকে গেলেন ট্রাইবেল সামাজিক-অর্থনীতিক কন্দরে— সামন্ততান্ত্রি কৃষি-অর্থনীতিতে উত্তরণও তাঁদের ভাগ্যে ঘটল না৷ অসমিয়া জাতিসত্তার জন্মলগ্নেই তাই একটা ফাঁক থেকে গেল৷ প্রতিবেশী রাঢ়, বঙ্গ, সমতটের সমকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলেই এই ব্যর্থতার গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব৷ পাল পর্বের আগেই সেখানে সামন্ততন্ত্র প্রতিষ্ঠিত, গোটা পালযুগ ধরে চলেছে ব্যাপক সমন্বয়, তাই সেনযুগের সূচনায় আধুনিক বাঙালি জাতির আদি অবয়বটি সুপরিস্ফুট৷

সকলেই জানেন যে ঠিক ঐ সময়েই পূর্বমাগধী থেকে বাংলা ভাষার স্বতন্ত্রভাবে গড়ে ওঠার লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ ইতিহাসের পরিহাস হচ্ছে এই যে বাংলা ভাষার ঐ আদিমরূপটির সঙ্গে সমকালীন কামরূপীয় ভাষার তেমন কোনো তফাৎ ছিল না৷ অসমিয়া ভাষার আদিমরূপটিও চর‌্যাপদেই বিধৃত আছে৷ এমনকি শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের কোনো কোনো বিশিষ্ট প্রয়োগের মধ্যে অসমিয়া বাকরীতির সাদৃশ্য অসমিয়া ভাষাবিদরা লক্ষ করেছেন৷ অর্থাৎ ইতিহাস যদি সহায় থাকত, তবে বাংলা এবং অসমিয়া ভাষার মধ্যে কোনোবিচ্ছেদনাও ঘটতে পারত, অন্তত সে বিচ্ছেদ অনিবার‌্য ছিল না৷ তখন হয়তো অন্যতর কোনো নামে দুটো ভাষার সমন্বিত রূপই বিস্তৃত এই পূর্বাঞ্চলে বিরাজ করত৷ কিন্তু ইতিহাস বাদ সাধল, তুর্কী আক্রমণ আজকের বঙ্গভাষী অঞ্চলেই সফল হল, তাদের একাধিক কামরূপ অভিযান হল প্রতিহত৷ পরবর্তী পাঠান-মোগল যুগেও কামরূপ পশ্চিমাগত বহিঃশত্রুর কাছে মাথা নোয়ালো নাএবং একই সময়ে পূর্বদিকের দরজা খুলে তাই জাতীয় আহোমরা আসামে টুকে বেশ জাঁকিয়ে বসে পড়ল৷ মোগল রাজ্য এবং আহোমরাজ্যের সীমারেখাটা তাই শেষপর্যন্ত একটা ভাষাগত সীমারেখায় দাঁড়িয়ে গেল৷

আহোম বিজয়ের পর পরিস্থিতির যে পরিবর্তনটা ঘটল, তাকে গুণগত বলা যেতে পারে৷ এতদিন পর্যন্ত আসামের রাষ্ট্রশক্তির কেন্দ্রভূমি ছিল পশ্চিম আসাম, রাষ্ট্র পরিচালকরা ছিলেন আর‌্যধর্মাশ্রিত৷ এবারকার রাষ্ট্রশক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করল পূর্ব আসামে এবং তার ধর্ম-

সংস্কৃতি সবই মঙ্গোলীয় অর্থাৎ অনার্য৷ কিন্তু তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে৷ প্রাক্-আহোম রাজশক্তি পশ্চিম আসামে স্বমন্ততন্ত্রকে পুরো প্রতিষ্ঠিত করতে পারে নি, কিন্তু এই পথে স্থির-নিশ্চিত যাত্রা শুরু করেছিল৷ সে তুলনায় অহোম রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল একান্তই উপজাতীয়, এমনকি দীর্ঘ সাতশত বৎসরের রাষ্ট্র-পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তাঁদের রাষ্ট্রীয় সংগঠনকে পরিপূর্ণ সামন্ততান্তি্রক পর্যায়ে উন্নীত করতে পারে নি৷ কিন্তু তাঁদের সকল এবং বলিষ্ঠ উপজাতীয় সংগঠন প্রতিবেশী অন্যান্য স্থানীয় উপজাতিকে আকৃষ্ঠ করেছিল এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে না হলেও সমঝোতার মাধ্যমে বিভিন্ন উপজাতীয়রা মিলে অহোম রাষ্ট্রকে একধরণের আভ্যন্তরীণ শক্তি জুগিয়েছিল৷

কিন্তু আহোমদের এই নূতন রাষ্ট্রীয় সামাজিক আধা-উপজাতীয় দর্শন পশ্চিম আসামের প্রভাবিত সমাজের উচ্চকোটির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে নি, পারার কথাও নয়৷ সেখানে, আরেকটু পশ্চিমে সরে গিয়ে, কোচবিহারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল নতূন রাষ্ট্রশক্তি, কোচ বংশোদ্ভব রাজা নরনারায়ণের প্রচেষ্টায়৷ নরনারায়ণের দূরদৃষ্টি ছিল, তদুপরি তিনি কাশীতে দীর্ঘ দিন বিদ্যাভ্যাস করেছিলেন, অতএব উত্তর ভারতের সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও ছিল৷ পশ্চিম আসামের স্থানীয় যে সমস্ত উপজাতীয় গোষ্ঠীকে পূর্ববর্তী কামরূপীয় রাজশক্তি মূল সমাজকাঠামোর মধ্যে আনতে পারে নি, তিনি চাইলেন সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সে কাজটা সম্পূর্ণ করতে— পুরোদমে সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার এটাই ছিল পূর্বশর্ত৷

মহাপুরুষ শঙ্করদেবকে আহোমরা বিতাড়িত করেছিল, আর নরনারায়ণ তাঁকে কোচবিহার রাজসভায় আশ্রয় দিয়েছিলেন৷ নরনারায়ণের এই পৃষ্ঠপোষকতা এবং আহোমদের এই বিরোধিতা, দুটোর কোনোটাই কাকতালীয় নয়, সমসাময়িক আসাম-কোচবিহারের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে এমনটা ঘটাই ছিল অনিবার্য৷ আদিবাসী সমাজের মানুষকে বৈষ্ণবধর্মের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে একটি সংহত সমাজ-কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার জন্য শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের সুনির্দিষ্ট এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছিল এবং মহারাজ নরনারায়ণে রাষ্ট্রীয় চিন্তার বাস্তবায়নের ব্যাপারে এই ধরণের প্রকল্পের কার্যকরিতা এবং প্রয়োজনীয়তা ছিল প্রশ্ণাতীত৷ নরনারায়ণের সঙ্গে শঙ্করদেবের সমঝোতার ব্যাপারটা যে একটা রাজনৈতিক পরিকল্পনারই অংশ ছিল, অন্ততঃ নরনারায়ণের দিক থেকে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় এই থেকে যে রাজা নিজে কিন্তু শঙ্করীয় মহাপুরুষীয়া ধর্মে দীক্ষিত হন নি, কুলগত শাক্তধর্মে তিনি এবং তার বংশধরেরা অবিচলিত ছিলেন৷ শঙ্করদেব পেয়েছিলেন নরনারায়ণের আশ্রয় ও সহযোগিতা এবং কোচবিহার সহ পশ্চিম কামরূপে সামাজিক সমন্বয় সৃষ্টির ব্যাপারে শঙ্করদেব একটা বেগবান আন্দোলন সৃষ্টিতে সমর্থ হয়েছিলেন৷ জনজাতীয় সমাজের যে সমস্ত মানুষ সে সময়ে বা তার পরবর্তীকালে মহাপুরুষীয়া ধর্মের আশ্রয় নিয়েছিলেন, কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করার পর তাঁরা আজ পুরোপুরি অসমিয়া সমাজের অংশ৷ অসমিয়া জাতিসত্তাগঠনে শঙ্করদেবের এই পথিকৃতের ভূমিকা আজও যথার্থ মর্যাদায় বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে৷ দুর্ভাগ্যত নরনারায়ণের পরবর্তী সময়ে কোচরাজ্য খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় এবং চিলারায়ের যে বংশধররা পশ্চিম আসামে তাঁর উত্তরাধিকার বহন করলেন, তারা বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্তভাবে কখনও কখনও শঙ্করের শিষ্য-প্রশিষ্যদের সহায়তা করলেও রাষ্ট্রচিন্তা এবং সমাজচিন্তাকে একই খাতে বইয়ে দেওয়ার মত ধী-শক্তি তাদের ছিলনা৷ অতএব শঙ্করদেবের নেতৃত্বে এবং নরনারায়ণের পৃষ্ঠপোষকতায় সামাজিক আত্তীকরণের যে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল, পরবর্তীকালে তার গতিবেগ স্তিমিত হয়ে যায়৷ বোড়ো এবং সমজাতীয় গোষ্ঠিগুলির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি আর কামরূপীয় অসমিয়া প্রবাহের সঙ্গে মিশে যেতে পারল না, বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তারা টিঁকে রইল নিজেদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আদর্শকে আশ্রয় করে৷ এই বিচ্ছেদের দরুণই পুরোদস্তুর সামন্ততান্ত্রিক কৃষি-অর্থনীতি পশ্চিম আসামেও গড়ে উঠল না, কারণ ব্রাহ্মণ্য সামন্ততন্ত্র দেশের সর্বত্র উপজাতীয় শ্রেণীর লোকদের ধর্মের বন্ধনে টেনে এনেই ভূমিশ্রমিকের অভাবটা পূরণ করেছে, এখানে যে কাজটা শুরু হয়েও শেষ হয় নি৷ এতে কর্ষণযোগ্য ভূমির পরিমাণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ভূমিশ্রমিক যোগানের যে পার্থক্য সূচিত হল, বৃটিশযুগে তার সুযোগ নিয়েই পূর্ববঙ্গাগত মুসলমানরা বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে নিজেদের বসতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল৷ জনজাতীয়দের সঙ্গে পশ্চিম আসামের সংগঠিত হিন্দুসমাজের আর্থ-সামাজিক এই বিভাজন সেই ঐতিহাসিক আমলেই কোনো কোনো সময়ে রাজনৈতিক তাৎপর্যও লাভ করত৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে মোগল আক্রমণের সময়ে বর্ণহি ভূস্বামী জমিদাররা অনেক সময়েই বহিরাগত শত্রুদের সহায়তা করেছেন, কিন্তু জনজাতীয়রা দাঁড়িয়েছেন আহোম রাষ্ট্রশক্তির পেছনে৷

পূর্ব আসামে আহোমরা যে নূতন রাষ্ট্র গড়ে তুললেন তার আর্থ-সামাজিক গঠনটা ছিল অদ্ধউপজাতীয়৷ ডঃ অমলেন্দু গুহ ব্যাপারটা বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন৷ উল্লেখযোগ্য যে পর্ব আসামে সামন্ততান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থার যে দ্বীপগুলো ভূস্বামীদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল, রাজ্যবিস্তারের প্রথম পর্যায়েই আহোমরা সেগুলোর উপর আঘাত হেনেছিলেন৷ যেহেতু সামন্ততান্ত্রিকস্তরে উত্তীর্ণ হওয়ার কোনো আগ্রহ তাদের ছিল না, আহোম রাজশক্তির কাছে শঙ্করদেব ছিলেন অপ্রয়োজনীয় এবং শ্রেণী-পরিচয়ে শঙ্করদেব যে ভূস্বামীকূলের সন্তান, তারা ছিলেন আহোমদের প্রতিপক্ষ৷ অতএব শঙ্করদেব-প্রচারিত বৈষ্ণবধর্ম আহোমদের পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি, পেয়েছিল প্রতিরোধ ও উৎপীড়ন৷ প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছিল শঙ্করদেবের জামাতাকে এবং কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন মাধবদেবসহকজন প্রথম সারির শঙ্কর-শিষ্য৷ শঙ্করদেবের সঙ্গে আহোম রাজবংশের এই যে সংঘাত, এর জের কিন্তু তখনও মেটেনি, তিন’শ বছর পর এর চূড়ান্তরূপ আমরা পাই মোয়ামারিয়া বৈষ্ণবদের বিদ্রোহে তখন থেকে আহোম রাজত্বের ধবংসের সূত্রপাত৷ ধর্মের আবরণে সংঘটিত এই বিদ্রোহের কারণ ছিল আর্থ-সামাজিক, উত্তরপূর্ব আসামে মোয়ামারিয়া ছিলেন ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির পথিকৃৎ এবং শঙ্করদেবের ধর্ম থেকে তারা পেয়েছিলেন উচ্চতর সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলার শিষ্য৷ দুটি বিপরীত মুখী ধারার মধ্যেকার এই সংঘাত ছিল ঐতিহাসিক বিচারেই অনিবার্য৷

অর্ধ-উপজাতীয় সামাজিক সংগঠন নিয়ে একটি রাষ্ট্র কিভাবে আর অপরিণত অর্থনৈতিক বিকাশকে সম্বল করে সাতশত বৎসর টিঁকে রইল, সেটা স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়৷ আমাদের শুধু এইটুকু মনে রাখলেই চলবে যে উত্তরপূর্ব ভারতে এটা ছিল একটা সাধারণ লক্ষণ— জয়ন্তীয়া, ত্রিপুরা, কাছাড় তারই নিদর্শন, ভারতের বাইরে ভূটান, তিব্বতও রয়েছে৷ কিন্তু সেই সঙ্গে এও সত্যি যে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অনিবার্যভাবেই তার সহযোগী উপাদানগুলোর চাহিদ তৈরী করে, তাই আহোম রাজশক্তিও পরবর্তীকালে সামন্তবাদী সংগঠনের কথা চিন্তা করেছিলেন৷ তারই উপরিকাঠামো তৈরী করার জন্য তারাও ধর্মকে ব্যবহার করার কথা চিন্তা করেছিলেন, কিন্তু বৈষ্ণবধর্মের সঙ্গে বৈরিতাটা ততদিনে এতখানিই মজ্জাগত হয়ে গেছে যে আহোমরা তখন ধর্মগুরু হিসাবে বাইরে থেকে শাক্ত ব্রাহ্মণদের আমদানি করতে শুক করলেন৷ কিন্তু যেহেতু আসামের বিশিষ্ট প্রয়োজনগুলো সম্পর্কে এই সমস্ত শাক্তদের কোনো ধারণা ছিল না, অতএব আরোপিত এই ধর্ম-উন্মাদনা সমাজদেহে নূতন কতক জটিলতারই সৃষ্টিকরল মাত্র৷ শঙ্কর-শিষ্য দামোদরদেব ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাঁর অনুগামীদে বলা হত দামোদরীয়া, এরা শঙ্করীয়া ধর্মের সাম্যমূলক পথ থেকে অনেকটাই সরে এসেছিলেন৷ এদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও চালানো হয়েছিল, কিন্তু ব্রাহ্মণ্য-অভিমান প্রসূত দামোদরীয় পন্থাও মূল মহাপুরুষীয়া ধর্মের বিকল্প হতে পারে নি, রাজশক্তির সাময়িক পৃষ্ঠপোষকতা সত্বেও৷ তাই আহোম রাষ্ট্র-সংগঠনের পূর্ণ সামন্তবাদে উত্তরণের ব্যাপার৷ পর্যন্ত আর ঘটল না৷ এবং সেই সঙ্গে আসামের জাতিসত্তার বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়টাও অসমাপ্ত থেকে গেল, আহোম রাজশক্তি সামাজিক আত্তীকরণের বাহিকা শক্তি হিসাবে হায় ইতিহাস-নির্দিষ্ট ভূমিকাটি পালন করতে ব্যর্থ হওয়ার দরুণ৷

একথা স্পষ্ট যে ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা গঠনের যে পর্যায়টা সামন্তযুগেই উত্তীর্ণ হওয়ার কথা, অসমিয়া জাতির ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেছিল৷ ঐ পর্যায়ে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বস্তিকর ঘটনা ঘটেছিল৷ আহোমরা তাদের আদিম ভাষা (তাই-আহোম) বর্জন করে অসমিয়া ভাষা গ্রহণ করেছিলেন৷ ফলে দুটো সুফল পাওয়া গেল৷ মঙ্গোলীয় ইতিহাস চেতনার উত্তরাধিকারী হিসাবে আহোম রাজারা স্ব স্ব কালের ইতিহাস (বুরঞ্জী) লেখাতেন, এতদিন তা লেখা হত ‘তাই’ ভাষায়, এবার তা স্থানীয় ভাষায় লেখা শুরু হল৷ ফলে অসমিয়া গদ্য একটা পরিণত রূপ পেয়ে গেল বাংলা গদ্য হাঁটি হাঁটি পা পা শুরু করার অনেক আগেই৷ দ্বিতীয়ত এতদিন পর্যন্ত পশ্চিম আসামে প্রচলিত ‘কামরূপী’ ভাষাই ছিল শিষ্ট ভাষা, তার সঙ্গে পূর্র্বেত্তর বঙ্গের কথ্যভাষার তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না, যে কারণে ভাষাতত্ত্ববিদরা পূর্র্বেত্তর বঙ্গের কথ্যভাষাকে আজও ‘পশ্চিম কামরূপী’’ বলে অভিহিত করেন৷ এই ‘পশ্চিম কামরূপী উপভাষাকে কিন্তু বাংলা ভাষা আত্মস্থ করে নিয়েছে৷ ‘পূর্ব কামরূপী’র ক্ষেত্রেও তা ঘটত কিনা, তা নিশ্চয় করে বলা যায় না, কিন্তু আহোমরা এই ভাষাকে গ্রহণ করে তার মধ্যে পর্যাপ্ত মঙ্গোলীয় শব্দ এবং বাঙ্গি ঢুকিয়ে দিলেন এবং সেই সঙ্গে এই রাজভাষার শিল্পরূপটির নূতন কেন্দ্রভূমি হয়ে দাঁড়াল আহোম-অধ্যুষিত শিবসাগর জেলা৷ পূর্বমাগধী অপভ্রংশের একেবারে পূর্ব-প্রান্তিক রূপটি যে আহোম সংস্পর্শে এসেই নিজ বিশিষ্ট স্বাতন্ত্র অর্জন করে আজকের অসমিয়া ভাষায় পরিণত হয়েছে, সে কথা স্বীকার করে নিতে ঐতিহাসিক বিচারে কোনো আপত্তি হওয়ার কারণ নেই৷ এতসব সত্বেও ক্ষত কিন্তু কিছু থেকেই গেল৷ আহোম রাজ্যের অভ্যন্তরে স্বতন্ত্র ভাষা ও সংসৃকতি নিয়ে অনেকগুলি ক্ষুদ্র বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী রয়ে গেল, যারা অসমিয়া সমাজের কলেবর-বৃদ্ধিতে সহায়ক শক্তি হিসাবে এগিয়ে এল না, কারণ আহোম রাজত্বের অর্ধ-উপজাতীয় চরিত্র আত্তীকরণের উপযোগী আর্থ-সামাজিক কাঠামোটি গড়ে তুলতে পারে নি৷

তাই বৃটিশ শাসনে আসাম যখন সরাসরি বিদেশী পুঁজি, আধুনিক রাষ্ট্রসংগঠন এবং এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনিবার‌্য সমস্ত দেশী-বিদেশী প্রভাবের সামনে উন্মোচিত হয়ে গেল, অসমিয়া জাতি তখন আত্মবিশ্বাসের অভাবে দোলায়মান এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ়৷ এই পর্বেই ধারাবাহিকভাবে এমন কিছু ঘটনা ঘটল, যা অসমিয়া জাতির অর্ধবিকশিত সত্তাকে আরো জটিলতার মধ্যে ফেলে দিল৷

এই জটিলতার স্বরূপ বুঝতে হলে ১৮৭৪ সালে তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসাম নাম দিয়ে যে নূতন একটি চীফ কমিশনার শাসিত প্রদেশ গড়া হল, তার স্বরূপাট অনুধাবন করা প্রয়োজন৷ মূলতঃ চারটি স্বতন্ত্র অংশনিয়ে এইনূতন প্রদেশের জন্ম, যার মধ্যে ছিল

 

(১) আহেমদের রাজ্য, যা ছিল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সীমায়িত এবং যাকে পাঁচটি জেলায় অগ করা হয়েছিল, যথা কামরূপ, দরং, শিবসাগর, লখিমপুর ও নগাঁও৷ নগাঁও জেলার দক্ষিণাংশ অবশ্য আমে রাজ্যের অংশ ছিল না, এই অংশ ছিল ডিমাসাদের অধীন৷ বস্তুতঃ যমুনা নদীর পশ্চিম তীরবর্তী মহং ছিল আহোম রাজ্যের সীমা এবং নদীর পূর্ব তীরবর্তী দিজুয়া ছিল ডিমাসা রাজ্যের সীমা৷ নগাঁও জেলার একটা বড় অংশ যে ডিমাসা রাজ্যের অন্তর্গত ছিল৷

 

এসত্য আজ সবাই প্রায় সুবিধাজনকভাবে বিস্মৃত৷

 

(২) গোয়ালপাড়া জেলা, যা ছিল মের্া আমলের বাংলা সুবার অংশ এবং ইংরেজরা দেওয়ানি লাভের সূত্রে এই জেলার উচ্চ আধিপত্য বিস্তার করে ১৭৬৫ সালে, আহোম রাজ্য ব্রিটিশ অধিকারে যাওয়ার ৬১ বৎসর আগে৷

 

(৩) গারো পাহাড়, খাসি জয়ন্তীয়া পাহাড়, উত্তর কাছাড়, মিকির পাহাড়, নাগ পাহাড় সহ পার্বত্য অঞ্চল সমূহ৷ যার সঙ্গে পরবর্তীকালে বিহিত অন্য পার্বত্য অঞ্চল সমহও যুক্ত হয়৷

 

(৪) শ্রীহট্ট ও কাছাড়ের সমভূমি, যার তৎকালীন অভিধা ছিল সুরমা উপত্যকা৷ ভাষিক বিচারে প্রথম অংশটি ছিল মুখ্যত অসমিয়াভাষী, যদিও এর অভ্যন্তরেও বিস্তৃত জনজাতীয় অঞ্চল ছিল, যারা নিজস্ব ভাষা ও সংসৃকতি নিয়ে তখনও ছিলেন, এখনও রয়েছেন৷ দ্বিতীয় অংশের অধিবাসীরা ছিলেন বঙ্গভাষী, যদিও পূর্বাংশের কথ্য ভাষা বাংলা ও অসমিয়া এই উভয় ভাষারই লক্ষণাক্রান্ত ছিল, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের যা সাধারণ লক্ষণ৷ তৃতীয় অংশে ছিল পার্বত্য উপজাতীয় গোষ্ঠী সমূহের বাস যাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা ও সংসৃকতি বর্তমান৷ চতুর্থ অংশের ভাষা বাংলা এবং এই অঞ্চলের ভাষিক সংখ্যালঘুদের মধ্যে রইলেন মণিপুরী, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, ডিমাসা এবং চা-শ্রমিক বিভিন্ন ভাষিক গোষ্ঠী, যাদের মধ্যে হিন্দী ভাষীর সংখ্যাধিক্য রয়েছে৷ ফলে প্রদেশের নাম যদিও দেওয়া হল আসাম, কিন্তু ভাষিক বিচারে প্রদেশটি দাঁড়াল বহুভাষিক৷

 

রাজনৈতিক ইতিহাস, ভৌগোলিক পটভূমি, সাংসৃকতিক পটভূমি সমস্ত বিচারেই অঞ্চলগুলির মধ্যে রইল বিভিন্নতা৷ বৈচিত্রে্যর মধ্যে ঐক্য কথাটিযত সহজে উচ্চারণ করা যায়, তত সহজে কার‌্যকর করা যায় না৷ আসাম প্রদেশের এই বৈচিত্র্যময় ভাষিক চরিত্র তার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে ঐক্যের পরিবেশ সৃষ্টি করে নি, বস্তুতঃ ব্রিটিশ রাজশক্তির উদ্দেশ্যও তা ছিল না৷ একদিকে অসমিয়া জাতিসত্তা তার জন্মলগ্ণের মৌলিক দুর্বলতা নিয়ে নিজের আত্মরক্ষার ক্ষমতা সম্পর্কে খুব একটা নিঃসংশয় ছিল না৷ মানসিক এই ভয়কে আরেকটু বাড়িয়ে দিল রাজ্যের বাস্তব ঊ পরিস্থিতি৷ বিস্তৃত আবাদযোগ্য পতিতভূমি টেনে নিয়ে এল প্রতিবেশী পূর্ববঙ্গের ভূমিহীন কৃষকদের৷ পর্বত সানুদেশের টিলাভূমিগুলো পরিণত হল চা-বাগানে, সেখানকার শ্রমিক ঊ বাহিনীও সংগ্রহকৃত হল বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ বা মধ্য প্রদেশের উদ্বৃত্ত কৃষিশ্রমিক বা অর্ধ-যাযাবর উপজাতীয়দের মধ্য থেকে৷ আর প্রশাসনিক ক্ষেত্রের মাঝারি বা নিম্নতর পর্যায়ের আসনগুলোর অধিকাংশই প্রথম দিকে অধিকৃত হল বঙ্গভাষীদের দ্বারা, কারণ ইংরেজী ভাষার দ্বার তাদের কাছে আগেই উন্মোচিত হয়েছিল৷ অর্থাৎ প্রাচীন ইতিহাসের  নেতিবাচক উত্তরাধিকার এবং পরবর্তী বৃটিশ শাসকদের প্রতিকূল প্রশাসনিক পরিকল্পনা, এ দুটোই অসমিয়া জাতিসত্তাকে বিভ্রমের মধ্যে ফেলে দিল৷

এই বিভ্রমের মধ্যে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যপর্যায়ে অসমিয়া বুদ্ধিজীবীরা দুটো অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন৷ গুণাভিরাম বরুয়া বা বলিনারায়ণ ডেকা জাতীয় উদারপন্থীরা চাইতেন যে দেওয়া নেওয়ার মাধ্যমে অসমিয়া বাঙ্গালীর মধ্যে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠুক৷ কিন্তু আরেকদল সংঘাত ও দ্বন্দ্বের মধ্যেই অসমিয়া জাতিসত্তার বিকাশ সম্ভব বলে মনে করতেন৷ দুর্ভাগ্যতঃ ধীরে ধীরে বৃটিশ রাজশক্তির সক্রিয় প্রশ্রয়ে দ্বিতীয় দলটিই প্রবল হয়ে ওঠে৷ আজও অসমিয়া সমাজে দুটি ধারাই বহমান কিন্তু সংকীর্নতাবাদী গোষ্ঠী এখন আগের চাইতে শতগুণে বলীয়ান৷ যাই হোক, সুদীর্ঘ বৃটিশ শাসনেরকালে এই সংকীর্নতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির দরুল যে সমস্ত উত্তেজনার সৃষ্টি হত, তার বহিঃ প্রকাশের ক্ষেত্র ছিল সীমাবদ্ধ, মূলতঃ তা এসে সংহত হত ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা উপত্যকার মধ্যেকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে৷ গোয়ালপাড়া জেলায় অবশ্য লোকগণনা এবং নির্বাচনের সময়েও সংকীর্নতাবাদী উত্তাপের তীব্র প্রতিফলন লক্ষ করা যায় ১৯১১ সালের লোক গণনার সময় থেকেই৷ প্রাক স্বাধীনতা যুগের সেইক্লান্তিকর অধ্যায়ের আলোচনায় আমরা যাচ্ছি না৷ শুধু এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে শ্রীহট্টকে পাকিস্তানের হাতে সঁপে দেওয়ার মাধ্যমে আসামের সংকীর্নতাবাদী রাজনীতি একটা বড় রকমের সাফল্য অর্জন করে৷

 

১৯৬১ সনে ভাষা আইনের প্রয়োগগত দিকটিতে সামান্য কিছু পরিবর্তন ঘটে৷ কিন্তু যতটুকু পরিবর্তন ঘটে তার বাস্তবায়ন ন্যূনতম পর্যায়েও হয় নি আজ অবধি৷ গত ১৯শে মে শহিদ দিবসে প্রকাশিত পুস্তিকায় আপনি এর কার‌্যকারণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন৷ যে দলই দিশপুরের ক্ষমতায় আসীন থাকে সে দলই অসমিয়া উগ্র জাতীয়তাবাদকে প্রশ্রয় দিতে বাধ্য হয়৷ প্রশাসন সেই নেতিবাচক রাজনীতিকে মদত দিয়ে যায়৷ বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এহেন শাসক-সরকার বা প্রশাসনের চরিত্রের কোনও পরিবর্তন প্রত্যাশা করতে পারে না৷ তাহলে উপায় কী? আক্রান্ত ভাষিক জনগোষ্ঠীদের সতর্ক ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিরোধের প্রয়োগ পদ্ধতি কী হবে?

আসামে যে-দলই শাসন ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের মধ্যেকার রাজনৈতিক ভিন্নতা এই রাজ্যের শাসক শ্রেণীর মধ্যে কোনো বিভাজন ঘটায় না৷ এই রাজ্যের শাসক শ্রেণী এক এবং অবিভাজ্য৷ অন্যত্র ব্যক্তিগত পুঁজির বৃহৎ অংশ যাদের কজায়, তারাই শাসক শ্রেণী গঠন করে৷ আসামে ব্যক্তিগত পুঁজির সে-জোর নেই, তাই রাষ্ট্রীয় অর্থকোষের উপর যাদের কজা রয়েছে, তারাই এ রাজ্যের শাসক শ্রেণী৷ অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীই আসামের শাসক শ্রেণী এবং এই শ্রেণীকে উপেক্ষা করে এই রাজ্যের শাসন চালানো সম্ভব নয়৷ স্বাধীনতার ঠিক পরবর্তী দশকে গোপীনাথ বরদলৈ কংগ্রেস সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থকোষের উপ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতেতুলে দিয়েছিলেন৷ আজকে এই শ্রেণীর প্রাধান, hegemony, তা এই রাজ্যের রাষ্ট্রযন্ত্র শুধুনয়, অসমিয়া সমাজের উপর সন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায় বসছেন, তাদেরই যে শুধু এদের কথা শুনে চলতে হয় গু ক্ষমতায় যারা আসতে চান বা তার কাছাকাছি থাকতে চান, তাদেরও এই শাসক আনুকূল্য ব্যতিরেকে চলে না৷ তথাকথিত বিদেশী বিতাড়ন আন্দোলনের সময়ে মরণপণ লড়াই করল সি পি এম, তাদেরও যে আজ অসম গণ পরিষদ দলের সঙ্গে আঁতাত করতে হয়, বা সি পি আই-এর প্রেমোদ গগৈ-কে যে ‘আসু’র চাইতেও কট্টরপন্থী বিবৃতি দিতে হয়, তার মূলে এই কারণটি রয়েছে৷

এখন বিগত দেড়শত বৎসর ধরে অসমিয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস যদি খুঁটিয়ে দেখা যায়, তবে আবিষ্কৃত হবে যে জন্মলগ্ণ থেকেই ভাষা বিদ্বেষ ও ভাষাসম্প্রসারণবাদ তার মৌলিক উপাদান হিসাবে কাজ করেছে৷ প্রথম অবস্থায় বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এই মানসিকতার পরিপোষক কিছু ব্যাপার ছিল, কিন্তু গত একশ বছরের মধ্যে সে ব্যাপারগুলো সম্পূর্ণ অপসৃত হয়ে গেছে৷ কিন্তু অসমিয়া সমাজের মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব আদি সেই মৌলিক উপাদান, অর্থাৎ ভাষা বিদ্বেষ ও ভাষা-সম্প্রসারণবাদকে ভিত্তি করেই সমাজের উপর নিজেদের অধিষ্ঠানকে আজও কায়েম রাখছেন৷ কারণ বহু ব্যবহার দ্বারা পরীক্ষিত এই উপাদান দুটির প্রয়োগকৌশল অতীব সহজ এবং প্রয়োগ সফলতা প্রায় প্রশ্ণাতীত৷ আরো বড় কথা হচ্ছে অসমিয়া সমাজের বঞ্চিত নিপীড়িত অংশকে চোখে ঠুলি পড়িয়ে নিজেদের লুণ্ঠনের মহোৎসবকে অবাধ করে তোলার ব্যাপারে এই বিদ্বেষের প্রচার-প্রসারের চাইতে উপযোগী৷ হাতিয়ার আর নেই৷ এখানে বলা প্রয়োজন যে বর্তমান অবস্থায় অসমিয়া মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের চরিত্রের কোনো পরিবর্তন প্রত্যাশা করা যায় না সত্য, কিন্তু অসমিয়া সমাজের বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের চেতনা যদি বাড়ে, তবে তার প্রতিফলন মধ্যবিত্ত সমাজেও পড়বে এবং তখন তার নেতৃত্বেরও গুণগত পরিবর্তন হওয়া সম্ভব৷ অদূর ভবিষ্যতে সে-সম্ভাবনা হয়তো নেই, কিন্তু অসমিয়া সমাজের অভ্যন্তরে সে-ধরনের ইতিবাচক শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা আদৌ নেই, এমন কথা বললে ভুল হবে৷

সতর্ক ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিরোধ সম্পর্কে চট-জলদি কোনো পন্থা বাৎলানোক সম্ভব? আক্রমণ যখন প্রত্যক্ষ ও সরাসরি হয়, তখন তাকে প্রতিরোধ করার জন্য একটি পদ্ধতির কথা তো আমরা জানি৷ ১৯৬১, ১৯৭১-৭২ ও ১৯৮৬ তে সে-পদ্ধতি আমরা ব্যবহারও করেছি৷ এবং কমবেশি সফলতাও এসেছে৷ কিন্তু আরো গুরুতর এবং ধারাবাহিক আক্রমণ আসছে চোরাগোপ্তাভাবে, প্রচারপত্রে, পুস্তিকায়, নিয়োগ ক্ষেত্রে, সাংসৃকতিক অবিচারে৷ তার কৈছে একটা সহজ প্রতিরোধের ব্যবস্থা হতে পারত আমাদের নির্বাচিত বিধায়কদের কার‌্যকলাপের মাধ্যমে, কিন্তু সেদিক দিয়ে জমার ঘরে তো শূন্য ! গত পনেরো বছরের মধ্যে সিগান সভায় আমাদের ভাষিক ও সাংসৃকতিক বঞ্চনার ব্যাপারে আমাদের নির্বাচিত বিধায়করা কোনোদিন কোনো প্রশ্ণ তুলেছেনএমন ঘটনা মনে করতে পারছি না৷ তাই নিশ্চিতই আমাদের অন্যপথ খুঁজতে হবে, সে পথের কোনোটাই অবশ্য সহজ সরল নয়৷ পরের প্রশ্ণের জবাবে সে-কথাগুলো হয়তো আসবে৷

 

অর্থনৈতিক অধিকার এবং সরকারিস্তরে ক্ষমতাসীন থাকার ব্যাপারগুলো সুনিশ্চিত না হলে শুধুমাত্র সাংসৃকতিক স্তরে বিভিন্ন বঞ্চিত ভাষিক গোষ্ঠীর প্রবল প্রতিবাদ ধবনির কোনও প্রভাব নেই’’ কথাটি কি সত্যি ? যদি সত্যি না হয় তাহলে সাংসৃকতিক স্তরে আজ কোন ধরণের আন্দোলন পদ্ধতি গৃহীত হবে ? আর যদি সত্যি হয় তাহলে ভাষিক গোষ্ঠীগুলোর ইতিকর্তব্য কী ?

শুধুমাত্র সাংসৃকতিক স্তরে প্রতিবাদ করে বঞ্চিত ভাষিক গোষ্ঠী কোনো স্থায়ী লাভ তুলতে পারবে না এ-কথা সত্যি৷ সরকারী স্তরে ক্ষমতাসীন থাকা তো অনেক দূরের কথা, সরকারী স্তরে প্রভাব বিস্তার করতে পারলেও অনেকখানি কাজ হতো, সেটাও তো সম্ভব হচ্ছে না৷ এখন আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর সরকারী স্তরে প্রভাব বিস্তার করার প্রক্রিয়াটি কী? নিশ্চয়ইবিধানসভা লোকসভার মাধ্যমে ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যান্য উপাদানকে ব্যবহার করে৷ কিন্তু প্রশ্ণ হচ্ছে, ভাষা ও সংসৃকতির অধিকার আমাদের সংসদীয় রাজনীতিকে কে আদৌ প্রভাবিত করতে পারে? ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে আমাদের বঞ্চনার কথা একবারও উচ্চারন নাকরে এখানে যে কেউবিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচন জিততে পারে, এমন কী মাতৃভাষার দাবীর বিরোধিতা করে, ভাষা সম্প্রসারণবাদীদের প্রকাশ্যে মদৎ দিয়ে বিধায়ক মন্ত্রী হতে পারাও এখানে সম্ভব৷ অতএব সরকারী স্তরে ক্ষমতাসীন থেকে ভাষার জন্য সম্মানের স্থান নিরঙ্কুশ করার স্বপ্ণ দেখার অধিকারও আমাদের নেই অন্ততঃ বর্তমান বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নেই৷

অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্ণটাও প্রাসঙ্গিক, কিন্তু আরো জটিল৷ ভাষা ও সংসৃকতির ব্যাপারে বঞ্চনা মূলতঃ যে শ্রেণীকে ব্যথিত করে তা হল মধ্যবিত্ত শ্রেণী— সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ সরাসরিভাবে এই ব্যথা-বেদনার শরিক হন না, হওয়ার কথাও নয়৷ কিন্তু ভাষার প্রশ্ণটা কিন্তু হসববর্গের মানুষকেও আঘাত করে, শুধু সে-আঘাতের স্বরূপটা অতটা প্রকটিত নয়৷

শুধুমাত্র বঙ্গভাষী বলেইবরাক উপত্যকা উন্নয়নমূলক যে-সমস্ত প্রকল্প থেকে বঞ্চিত, উচ্চবর্গ নিম্নবর্গ দুই শ্রেণীকেই স্পর্শ করছে৷ কার‌্যতঃ অর্থনৈতিক যত বঞ্চনার শিকার বরাক উপত্যকা, তার ভাষিক পরিচিতি তার একমাত্র কারণ আর সেই বঞ্চনা আমারে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রাকে নিত্য অনাহারেরস্তরে প্রায় কায়েম করে রেখে দিয়ে বরাক উপত্যকার প্রতিটি মানুষই সরকারের দৃষ্টিতে প্রাথমিকভাবে বিদেশী, শুধমান, দেওয়ার পরই তাকে ভারতীয় হিসাবে গ্রহণ করা হয়৷ এটা ভাষিক পরিচিতিরই ফল এবং ... ব্যাপারে নিম্নবর্গের মানুষেরই বিপন্ন বেশি হওয়ার কথা এবং হচ্ছেনও৷ দুর্ভাগ্যতঃ, আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ ভাষা সমস্যার সার্বিক ও ব্যাপক রূপটি সম্পর্কে এ-উপত্যকার সাধারণ মানুষকে অবহিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন৷ তাই ভাষার সমস্যাকে এখনো এখানে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সংসৃকতিগত বা বড়জোর বৃত্তিগত সমস্যা হিসাবে দেখা হয় এবং এ নিয়ে আমাদের আন্দোলন সমাজের সর্বস্তরে সমানভাবে ব্যাপ্ত হয় না৷ তাই আমাদের অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা তো দূরের কথা, ভাষা সমস্যার সঙ্গে অর্থনৈতিক যে-প্রশ্ণগুলি জড়িত রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কেও আমরা মানুষকে অবহিত করতে পারি নি৷

বঞ্চিত ভাষিক গোষ্ঠীর আন্দোলন পদ্ধতি সম্পর্কে দুটো কথা বলব৷ দুটোই আন্তোনিও গ্রামশ্চি থেকে নেওয়া৷

 

(ক) আগে বলেছি যে ভাষার প্রশ্ণে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটা ঘটে মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যে এবং স্বাভাবিকভাবে এই ধরনের আন্দোলনের নেতৃত্ব আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক বিকাশের স্তরে তাদেরই দেওয়ার কথা৷ কিন্তু তা করতে হলে প্রথমতঃ আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজকে সংহত ও সংগঠিত হতে হবে৷ তার জন্য প্রয়োজন শ্রেণী চেতনা৷ আমি অন্যত্র দেখিয়েছি যে বরাক উপত্যকার কোনো গোষ্ঠীই নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থানকে অবলম্বন করে কোনো শ্রেণীতে সংঘবদ্ধ হননি৷ বরাক উপত্যকার মধ্যবিত্তসম্প্রদায় জাত, ধর্ম, জীবিকা, আবাস ইত্যাদিকে অবলম্বন করে অসংখ্য গোষ্ঠীতে বিভাজিত, অর্থনৈতিক অবস্থান-নির্ভর সংঘবদ্ধ শ্রেণী চেতনা তাদের নেই৷ নিজেরা সংঘবদ্ধ না হওয়ার দরুণ নিজেদের মধ্যে তাদের কোনো চিন্তাগত সাম্য নেই, ফলে সমাজের অন্যান্য অংশের উপর চিন্তাগত আধিপত্য স্থাপনের কথা তারা চিন্তাই করতে পারেন না৷ অথচ সমাজের উপর Intellectual hegemony বা চিন্তাগত প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে কোনো ব্যাপক গণ আন্দোলন গড়ে তোলা যায় না৷ ফলে ভাষার প্রশ্ণে ধারাবাহিক প্রতিরোধের দুর্গ শক্তপোক্ত করে গড়ে তুলতে আমাদের যে অসামর্থ্য, তার মূলে রয়েছে আমাদের মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের শ্রেণীগত চেতনার অভাব এবং তজ্জনিত ব্যর্থতা৷ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার দৃষ্টান্ত দিলে ব্যাপারটা ভাল বোঝা যাবে৷ ভুল হোক, শুদ্ধ হোক সেখানে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের hegemony পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত, তাই তারা গোটা সমাজকে বোঝাতে পেরেছেন যে তারা যেটাকে অসমিয়া সমাজের স্বার্থ বলছেন, সেটাই যথার্থ কথা৷ আমাদের মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে জাতিবিদ্বেষ পচার করতে আমি বলছি না, আমি দৃষ্টান্ত হিসাবে দেখাচ্ছি যে একটা সংহত মধ্যবিত্ত সমাজ নিজের hegemony প্রতিষ্ঠা করলে গোটা সমাজকে কীভাবে চালাতে পারে৷

(খ) বরাক উপত্যকার মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের এই ব্যর্থতাকে চিরন্তন ব্যাপার বলে ধরে নিলে ডল হবে৷ বস্তুত এই ব্যর্থতাকে কাটিয়ে ওঠার একটা প্রক্রিয়াও চলছে৷ এই যে প্রশ্ণগুলি করে পাঠিয়েছে, সেটাও এই প্রক্রিয়ারই একটা অঙ্গ৷ এমনতরো আরো বহুতর প্রয়াস চলছে, কিছুটা প্রস্তুতিও৷ কথা হচ্ছে, এই যে প্রয়াস, এটা সফল হতে পারে যদি পর্যাপ্ত সংখ্যক organic intellectual (এটা গ্রামশ্চির কথা) যদি আমরা তৈরি করতে পারি৷ Organic intellectual কারা? যাঁরা এই উপত্যকার মাটি থেকে রসদ সংগ্রহ করে বুদ্ধির আলোকে বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত জ্ঞানকে বরাক উপত্যকার স্বার্থেই কাজে লাগাবার কথা ভাবছেন৷ উপত্যকার জনজীবন, অর্থনীতি, সমাজজীবন, ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে আরো ব্যাপক চর্চা ও অনুসন্ধান খুবই জরুরি, তবেই আমরা নিজেদের জানতে ও বুঝতে পারব এবং তারই আলোকে আমাদের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বরক্ষার আন্দোলনের সঠিক পন্থাও আবিষ্কার করতে পারব৷ বলা প্রয়োজন, আমরা একটা জটিল সময়ের অধিবাসী, আর আমার অবস্থানের ক্ষেত্রটি জটিলতর৷ তাই আমাদের সমস্যার নিরসনের কোনো চটজলদি সূত্র নেই, সুদীর্ঘ কঠিন পথ পরিক্রমাই আমাদের ভবিতব্য৷

 

সংখ্যালঘু ভাষিকগোষ্ঠির বিভিন্ন চাকুরে ও আমলারা আত্মস্বার্থরক্ষার্থে এবং অনেকক্ষেত্রে৷ চাকরী বা ক্ষমতা হারানোর ভয়ে উগ্রজাতীয়তাবাদকে মদত দিয়ে থাকে৷ তাছাড়া অনেকেই জড়িয়ে পড়ে প্রশাসনিক গ্যাড়াকলে৷ এধরণের রাজাকার শ্রেণীটি বরাক উপত্যকা ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও রয়েছে৷ এই বিষয়টিকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখবো ?

এটাকে নিশ্চয়ই আমরা গুরুত্ব দেব, কারণ এইসব শক্তিই এই উপত্যকার মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ঘটিয়ে আমাদের শক্তিহানি ঘটিয়ে থাকে৷ তবে এটা রোগের লক্ষণমাত্র, রোগের কারণ নয়৷ গ্রামশ্চি দেখিয়েছেন যে ক্ষমতাসীন উত্তর ইতালি পশ্চাদপদ দক্ষিণ ইতালিকে শাসন ও শোষণ করার জন্য দালাল বাহিনীকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে ছেড়ে দিত৷ তারা ব্যর্থ হলেই পুলিশ ও সৈন্যবাহিনী নিয়ে সন্ত্রাস চালাত৷ আমাদের এখানে হুবহু ঐ ব্যাপারটা ঘটছে৷ এর জবাব হচ্ছে ‘যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে৷’’

 

বরাক উপত্যকা তো ঐতিহাসিকভাবেই আসামের করদ অঙ্গ৷ বঞ্চনা শুরু থেকেই কাছাড় তথা বরাকের ললাট লিখন৷কেউ বলেন স্ব-শাসন, কেউ বলেন পৃথক বরাক৷ কেউ বলেন আলাদা হলে মুসলিমদের প্রাধান্য বেড়ে যাবে৷ কেউ বলেন আলাদা রাজ্য হলেও নেতা তো হবে সেই নেতিবাচকরাই৷ আপনার কি মনে হয় পরিত্রাণের উপায় কি আসামের মাঝে থেকেই বের করতে হবে ?

স্বশাসন আর স্বতন্ত্র বরাক মূলতঃ একই দাবী, প্রভেদটা পরিণামগত, গুণগত নয়৷ স্ট্র্যাটেজিক কারণে আজ যারা স্বশাসনবাদী, তারাও নিশ্চয়ই অনুকূল সময়ে পৃথক বরাক রাজ্যের কথা বলবেন৷ প্রকৃতপক্ষে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এ-দাবী বরাক উপত্যকার হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কখনোদানা বাঁধছে না৷ এ-প্রসঙ্গে দু-একটি কথা প্রাসঙ্গিক৷ পঞ্চাশের দশক থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত এই দাবীর বিরোধিতা আসত মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব থেকে, তারা ভয় দেখাতেন যে এ-দাবী মূলতঃ ত্রিপুরার সঙ্গে বরাককে মিলিয়ে দেওয়ার দাবী আর তা যদি হয়, তবে ত্রিপুরার হিন্দুদের চাপে বরাক উপত্যকার মুসলমানরা বিপন্ন হবেন৷ এখনো এ-ধরনের প্রচার চলে, অসম্ভব জেনেও তার খদ্দেরও পাওয়া যায়৷ প্রথম অবস্থায় এ-উপত্যকার মুসলমান কংগ্রেস নেতারা মুখ্যতঃ এ-দাবীর বিরোধিতা করতেন, এখন অগপ দল এ-দায়িত্ব নিয়েছে৷ এখন অন্য একটা মতও বেশ প্রবল৷ হিন্দুদের মধ্যে আর স্বতন্ত্র বরাক রাজ্য সম্পর্কে সেই নিরঙ্কুশ ঐক্যমত নেই, বরঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু নেতাই বলছেন যে বরাক রাজ্য হলে আর উপায় নেই, মুসলমানরা এমনিতেই প্রবল, তখন একেবারে সব নিয়ে নেবে৷ এইমতের রাজনৈতিক অভিভাবক হচ্ছে বিজেপি৷ এর মধ্যে আরো কৌতূহলপ্রদ সব ব্যাপার রয়েছে৷ ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত মৈনুল হক চৌধুরী ছিলেন স্বতন্ত্র বরাকের সমর্থক, তখন আবার অন্য সময়ে স্বাতন্ত্রের সমর্থক বর্ণহিন্দুদের একাধিক নেতা স্বতন্ত্র বরাকের বিরোধিতা করেছিলেন৷ তারা কেউ কেউ তখন মুখ্যমন্ত্রী মহেন্দ্র মোহন চৌধুরীর আনুকূল্য পেয়েছিলেন৷ নেতৃত্বের স্তরে ব্যাপারটা মোটামুটি এই রকম ছিল যে, যাঁরা যখন আসাম মন্ত্রিসভার সভ্য বা স্নেহধন্য, তারাই তখন স্বতন্ত্র বরাকের বিরোধী৷ সাধারণ মানুষের স্তরে কিন্তু তা নয়, তারা প্রশ্ণটাকে খুব গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করেন৷ কিন্তু যেহেতু কোনোদিনই প্রকাশ্য কোনো ব্যাপক বিতর্কের মাধ্যমে ‘ইস্যু’টা আলোচিত হয় নি, তাই সহজপাচ্য কিছু আরোপিত ধারণা দ্বারাই তারা কখনো এ-পক্ষে, কখনো ওপক্ষে হেলছেন বা দুলছেন৷

 

মোদ্দা কথা হচ্ছে, বরাক উপত্যকার হিন্দু ও মুসলমান শুধু দুটি ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, দুটো রাজনৈতিক গোষ্ঠীও বটে৷ আর ভাষিক বিচারে যাই হোক, তারা মূলতঃ হিন্দু ও মুসলমান, বাঙ্গালিত্বের চাইতে হিন্দুত্ব ও মুসলমানত্বই তাদের কাছে বড়৷ অতএব বরাক উপত্যকার সার্বিক স্বার্থের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র বরাক রাজ্যের প্রশ্ণটি বিবেচিত হওয়ারই সুযোগ হয় নি, সকলেই কথাটাকাকে চেপেচুপে রাখেন৷ ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি স্বতন্ত্র বরাক রাজ্য গঠন আমাদের সমস্যার সর্বশ্রেষ্ঠ সমাধান নয় সত্য, কিন্তু যদি এটা হয়ে যায় তবে বহু উটকো সমস্যা থেকে আমরা রক্ষা পাব৷ ভাষার সমস্যা তখনো থাকবে, যেমন পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে< কিন্তু তার মাত্রা বদলে যাবে৷ অর্থনৈতিক সমস্যা থাকবে, কিন্তু দিল্লি থেকে আমাদের জন্য যা পাঠানো হবে, তা আমরাই পাব, দিশপুরে বসে দই মারবে না৷ আর সবচাইতে বড় কথা, এতদিন বরাক উপত্যকার হিন্দু-মুসলমান নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করেছে, আর দিশপুর থেকে রেফারির বাঁশি কখনো এ-পক্ষে কখনো ও-পক্ষে বাজছে৷ আমরা কখনো হাততালি দিচ্ছি, কখনো কান্নাকাটি করছি৷ স্বতন্ত্র বরাকে বরাক উপত্যকার হিন্দু মুসলমানকে সহাবস্থানের একটা কার্য্যকর পদ্ধতি বাধ্যতামূলকভাবেই বের করতে হবে৷ সে-পথও বড় সহজ নয়, কিন্তু এখন দিশপুরের উস্কানিতে যত জটিল মনে হচ্চে, তত জটিল আর থাকবে না৷

কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, যে বরাক উপত্যকার হিন্দু-মুসলমান উভয় গোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ঐকমত না হলে তো স্বতন্ত্র বরাক রাজ্য ব্যাপারটা ঘটবে না! আর সেই ঐক্যমত যদি আমরা গড়ে তুলতেই পারি তবে সেই পথপরিক্রমায় আরো বহু বড় কাজও আমরা করতে পারব৷ আমাকে যদি একটিমাত্র বরাক উপত্যকার সমস্যার মূল কারণ নির্ণয় করতে বলা হয়, তবে আমি নিদ্বিধায় বলব সেই শব্দটি হচ্ছে “সাম্প্রদায়িকতা”৷