রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ভাষিক অধিকার হরণের নতুন ফন্দি ফিকির : মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের নয়া ফরমান


সঞ্জীব দেব লস্কর
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

Sanjib Deb Laskar.jpg

একষট্টির ছাত্র নেতা পরিতোষ পাল চৌধুরী বিশ্বাস করতেন "আসাম সরকারি ভাষা আইনে, প্রচুর ফাঁকফোকর রয়েছে। কাছাড়বাসী একটুকুন সংশোধনীতেই খুশি থেকে নিশ্চিন্তে ঘুমালে একদিন ছোঁ মেরে ভাষা সম্প্রসারণবাদীরা একাদশ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই অধিকারটুকু কেড়ে নেবেই। যে প্রবল শক্তি নিয়ে ওরা রাজ্য বিধান সভায় একটা অসাংবিধানিক বিল পাশ করিয়ে নিয়েছিল ১৯৬০ সালে, তাদের এ শক্তি এতাটুকুও ক্ষয় হয়নি। সময় সুযোগ পেলেই এরা ক্ষমতা প্রদর্শন করবে-- এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি বাহাত্তরে, ছিয়াশিতে, আর সাম্প্রতিককালে তো দেখছিই। রাজ্যের ২৮.৯২% বাঙালি জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে 8.৫৪% বড়ো জনগোষ্ঠীর ভাষাকে (এদের চিরসমৃদ্ধি আমরা যে কামনা করি এর জ্বলত্ত প্রমাণ রেখেছেন এতিহাসিক সুজিৎ চৌধুরী তার The Bodos ইতিহাস গ্রন্থে) রাজ্যের দ্বিতীয় সহযোগীভাষা হিসেবে ঘোষণা করা (১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১) ছাড়াও ২২ টি ভাষিকগোষ্ঠীর জন্য ৭৫ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল, করপাস ফান্ডের সংস্থান করে বাঙালি ভষিকগোষ্ঠীকে এর আওতার বাইরে রাখা (২৯ ডিসেম্বর ২০২০)--এসব হচ্ছে ক্ষমতা প্রদর্শনের বিশেষ মহড়া।

এ পর্যায়ে সর্বশেষ পদক্ষেপ হল বিগত ১৭ মার্চ ২০২১ তারিখে আসাম মাধ্যমিক শিক্ষাপর্যদের বিশেষ একটি ফরমান, আসামের স্কুলগুলোতে অসমিয়াভাষা চালু করার নির্দেশ (SEBA/AH/AG/26/2020/4 dated Guwahati 17th )। এর পেছনে রয়েছে বিধান সভায় পাস হওয়া একটি আইন 'আ্যাসামিজ ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং আ্যাক্ট'। কী সে আইন, সে প্রসঙ্গে যাবার আগে দেখে নিই কবে গৃহীত হল এ আইন।

সময়টি আমাদের জন্য মোটেই সুখের ছিল না, দেশে ছিল লক-ডাউন, কোভিড পেন্ডামিক তাড়িত মানুষ ছিল ভয়চকিত। ২০২০তে এমনই শেষবসন্তের এক মুহূর্তে ক'দিনের জন্য বিধানসভার দরজা খোলা হলে মুখে কাপড় বেঁধে বিধায়কেরা বসেছিলেন কিছু বিশেষ কাজ সেরে নেবার জন্য, এর মধ্যে অন্যতম ছিল ওই অসমিয়া ভাষাশিক্ষা আইন প্রস্তাব। এমনিতেই আমাদের প্রতিনিধিরা মুখ বন্ধ রাখতে ভালোবাসেন, আর মুখে কাপড় বাঁধা থাকলে তো আরও। তো চটজলদি পাস হয়ে যাওয়া আইনটিতে মহামান্য রাজ্যপালের সই সীলমোহরও পড়ে গেল ১৫ মে ২০২০ তারিখে।

এখন দেখা যাক কী বলা হয়েছে এ আইনে? সেই একই কথা, রাজ্যের স্কুলগুলোতে প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে অসমিয়া বাধ্যতামুলক। তবে আসাম সরকারি ভাষা আইন-১৯৬০-এর একটি সংশোধিত (Sec. 5, 1961 as amended) ধারাকে মান্যতা দিয়ে এ কথাও জুড়ে দেওয়া হল যে, ষষ্ঠ তফশিলের অন্তর্গত আর সে সঙ্গে বড়ো অধ্যুসিত অঞ্চল এবং বরাক উপত্যকাকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। আপাতত দৃষ্টিতে মনে হয় এ নির্দেশে কোন ভিন্নতর অভিসন্ধির লেশমাত্র নেই। কিন্তু নথিটি একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায় খুব সুচতুর ভাবে এখানে বরাক উপত্যকায় বাংলা সহ অপরাপর ক্ষুদ্র ও মাঝারি ভাষিকগোষ্ঠীর (বড়ো বাদ দিয়ে) মাতৃভাষার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার একটা মৃদু কিন্তু সুতীক্ষ্ণ চাল। এসব না ভেবে চিন্তেই অনেকে বলা শুরু করেছেন, এটা আসামের বাঙালির জন্য হলেও বরাকের জন্য তো নয়। যেন "আসামের জন্য" এ ধরনের নির্দেশ খুব একটা গণতান্ত্রিক এবং মানবিক। যে-রাজ্যে বাঙালি সহ বড়ো, মিসিং, নেপালি, হিন্দুস্তানি, কার্বি, ডিমাসা, কোচ, মরান, বরাহি, তাই, কাছারি, নাগা, কুকি, হমার নিয়ে মোট জনসংখ্যার ৫২ শতাংশই অন-অসমিয়া সে রাজ্যে একটি ভাষা অর্থাৎ ৪৮.৩৮ শতাংশ অসমিয়া জনগোষ্ঠীর ভাষা বিশেষ মর্যাদা লাভ করবে নিশ্চয়ই, কিন্তু কোন্‌ যুক্তিতে অপরাপর ভাষার উপর এই "একটি ভাষার", আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতেই হবে? রাজ্যের নববুই লক্ষ অর্থাৎ ২৮. ৯২ শতাংশ বাঙালি কি তাঁদের সাংবিধানিক অধিকারটুকু পেতে পারে না?

 

অথচ ওই একই আইনে বড়ো টেরিটোরি বহির্ভূত অঞ্চল, যেখানে ৫০ শতাংশ বড়োভাষী মানুষের বাস, সেখানেও বাধ্যতামূলক অসমিয়া ভাষা গ্রহণের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে (সঙ্গত ভাবেই)। যারা এ ধরনের আইন প্রণয়ন করেন এরা বুঝি জানেন না যে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ৫০ শতাংশ বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চল যে অগুনতি! কিন্তু এদের মাতৃভাষার উপর এই অন্যায় জোর জবরদস্তি চলবেই আমাদের এ ধরনের সম্মতি নিয়েই। এখানে এ কথাটাও স্মরণ করা প্রয়োজন, যে- আইনের বিশেষ ধারায় (Sec 4. Safeguard of the use of language in the Autonomus District) বড়োভাষীদের জন্য বিশেষ ছাড়, এ আইনের প্রতিটি অক্ষরের মধ্যে লেগে রয়েছে বরাকের একাদশ ভাষাশহিদের রক্ত। মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য আত্মাহুতি দেওয়া এ শহিদের ভাষা কিন্তু বাংলা।

বলছিলাম এখানে বরাক উপত্যকাকে যে ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এরই মধ্যে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। মাধ্যমিক শিক্ষাপর্ষদ সচিব সুরঞ্জনা সেনাপতির সই করা নির্দেশনামার দ্বিতীয় পঙক্তিতেই ১৯৬১ সালের সংশোধিত 'রাজ্য ভাষা আইনের ৫ নম্বর ধারা মতে বাংলা ভাষার জন্য প্রদত্ত রক্ষাকবচ'- কে যথাস্থানে রেখেই বাংলা ভাষার অধিকার কেঁড়ে নেওয়ার ফন্দি নিহিত। কী রকম?

নির্দেশনামার দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে আছে যাদের মাতৃভাষা অন-অসমিয়া এরা এ ভাষাটিকে এম-আই-এল (M.I.L.) হিসেবে নিতে পারে, নাও নিতে পারে। যারা নেবে না এদের জন্য একটা বিকল্প অর্থাৎ অপশন্যাল বিষয় আছে। এটা কী? ঐ পড়ুয়াদের ইলেকটিভ বা ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে অসমিয়া নিতে হবে। লক্ষ্য করুন শব্দটি 'ইলেকটিভ'। অর্থাৎ এখানে একাধিক বিকল্প রয়েছে (থাকাই স্বাভাবিক) যেমন, প্রাগ্রসর গণিত, বিজ্ঞান, কমপিউটার, সঙ্গীত, চিত্রকলা, কৃষি, হোম সায়েন্স ইত্যাদি কিন্তু এদিকে তাকাতে পারবে না যদি মাতৃভাষা এম-আই-এল রাখো। এই না রাখতে পারা ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্যে ক্লাসিক্যাল সাবজেক্ট-- সংস্কৃত, আরবি-ফারসি ভাষাও রয়েছে। যাক্‌ গে বাবা, সংস্কৃতের মুণ্ডচ্ছেদ করেও দুটো যবনদোষে দুষ্ট ভাষাকে তো আটকানো গেল, এই বা কম কিসে?

তা হলে দেখা গেল, এম-আই-এল হিসেবে মাতৃভাষা নেওয়ার কত হ্যাপা? এটা নিলে তো আমাদের ছেলে মেয়েদের বিজ্ঞান, বাণিজ্য পড়ার স্বপ্ন ছাড়তে হবে, ছাড়তে হবে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল বা অন্যান্য বৃত্তিমূলক পাঠক্রমে প্রবেশের সুযোগ। হায় হায়, মোদের গরব মোদের ভাষা আ মরি মাতৃভাষার প্রতি আনুগত্যের জন্য এত বড় ত্যাগের বিকল্প দেশের আর কোন্‌ রাজ্যে আছে? তাহলে প্রশ্ন হল, ঐচ্ছিক শব্দের অর্থই আর কোথায় রইল? হ্যাঁ, শব্দটি স্বমহিমায় থাকছে ওই ওদের ক্ষেত্রে যাদের মাতৃভাষা অসমিয়া এবং যারা এ ভাষাকে এম-আই-এল হিসেবে নিচ্ছে। অথচ আসাম সরকারি ভাষা আইন-১৯৬০ এর ৭ নং ধারায় NCB (Rights of the various linguistic groups)--

ক) বিভিন্ন ভাষিকগোষ্ঠীর শিক্ষার মাধ্যম সংক্রান্ত ভারতীয় সংবিধান প্রদত্ত অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে।
খ) সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক সংস্থাসমূহকে সহায়তা দানের ক্ষেত্রে ভাষার ভিত্তিতে কোন বৈষম্য করবে না (The state shall not , in granting aid to educational and cultural institutions discriminate against any such insitituion on ground of language)।

 

ভাষা আইনের এ ধারাকে লঙ্ঘন করে এই বৈষম্য যে সরকার বাহাদুর করেননি তা কিন্তু বিশ্বনিন্দুকও অস্বীকার করবেন না, অন্তত এই সেদিনের ৭৫ কোটি টাকা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তো বটেই।

এবার আরও একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক নির্দেশনামাতে। এতে বলা হয়েছে যারা অসমিয়া ছাড়া অন্য ভাষা এম-আই-এল হিসেবে রাখবে এদের জন্য রয়েছে 'বাধ্যতামূলক এচ্ছিক' অসমিয়ার (কাঁঠালের আমসত্ব আরকি) নিদান। মূল বয়ানটি এরকম--- "Students who opt M.I.L. subject other than Assamese, will have to opt Assamese as elective subject. So these students will not get any other options, as there is provision of only one elective subject"।

ধরে নেওয়া গেল নির্দেশকে মান্যতা দিয়ে অন-অসমিয়া পড়ুয়া হিসেবে অসমিয়াই রাখল, কারণ তখন তাদের পছন্দ মতো ইলেকটিভ বিষয় নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এতে করেও এদের সামনে যে আরেকটি ধর্মসঙ্কট খাড়া হবে। এম-আই-এল অসমিয়া রাখলে 'কোর, (core)' বিষয়, অর্থাৎ সমাজ বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি কি মাতৃভাষায় পড়তে পারবে বা পারা সম্ভব? এ অবস্থায় (অসমিয়া এমআইএল নিলে) 'কোর সাবজেক্ট' গুলো যে মাতৃভাষায় পড়া অসম্ভব এটা তো দিনের আলোর মতো স্পষ্ট, এ আর বিশদ ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই।

বলেছিলাম, সুচতুর ভাবে সরকারি ভাষা আইন ১৯৬০-কে পাশ কাটিয়ে ওই আইনে প্রদত্ত বিশেষ অধিকার অর্থহীন করে দেওয়ার এ একটা চক্রান্ত। এটা বুঝতে পারছেন না ওরাই যারা জেগে থেকে ঘুমোবার খোরাক পেয়ে গেছেন। নির্দেশের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে যে এতগুলো কথা বলা হল, এগুলো যে বরাক উপত্যকার (বা "বড়ো অঞ্চলে"র জন্য) প্রযোজ্য নয় তা কিন্তু স্পষ্ট করে বলা হয়নি। এখানে যে শুভঙ্করের দ্বিতীয় ফাঁকি, এ দিয়ে আমাদের স্তোক দেওয়া হবে, আপনারা তো এর আওতার বাইরে আছেন। মস্তককে বাইরে রেখেও কী করে লাঙুল টেনে অবশেষে ভেতরে ঢুকিয়ে নেওয়া যায় সহাদয় পাঠকরা নিশ্চয়ই এ বিষয়ে সম্যক অবগত আছেন।

শেষ করার আগে স্মরণ করি ১৯৮৬ সালের মাধ্যমিক শিক্ষাপর্ষদের অনুরূপ আরেকটি নির্দেশনামা জারির কথা, যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলনকারীদের উপর করিমগঞ্জ সরকারি আবর্তভবন সংলগ্ন মাঠে মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্পকুমার মহন্ত মহোদয়ের চোখের সামনেই পুলিশের গুলিতে দুই যুবক শহিদত্ব বরণ করেন। তারিখটি ছিল ২১ জুলাই, ১৯৮৬। এ দিনটি বরাক উপত্যকায় তৃতীয় ভাষাশহিদ দিবস হিসেবে পালিত হয়।

প্রশ্ন হল, এমনি করে কি দশকে দশকে আমাদের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহিদের সংখ্যাও বেড়ে চলবে? এখানে স্মরণ করা উচিত, 'অসমিয়া জাতির অন্যতম পথপ্রদর্শক', অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি (১৯৬৪), সত্রাধিকারি মিত্রদেব মহন্ত আসাম রাজ্যে এ ধরনের ভাষার পীড়ন দেখে আত্মদহনের জ্বালায় বলেছিলেন, "এনে ধরণে যদি আমার ভাষা বচাব লাগে, তেন্তে মোক ভাষা নালাগে", অর্থাৎ এ ধরনের নিপীড়ন করে যদি আমাদের ভাষা বাঁচাতে হয় তবে এ ভাষা আমার প্রয়োজন নেই। এই সেই নমস্য মনীষী, যিনি অসমিয়া জাতির জন্য রচনা করেছেন সেই অনুপম মাতৃভাষা বন্দনাগীত "চির চেনেহী মোর ভাষা", ঠিক যেমনটি রচনা করেছিলেন আমাদের অতুলপ্রসাদ সেন, "মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা/ মাগো তোমার কোলে তোমার বোলে কতই শান্তি ভালোবাসা"