রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

জাতীয় শিক্ষানীতি  ও মাতৃভাষার গুরুত্ব


পরিতোষ চন্দ্র দত্ত
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

 

কয়েকদিন আগে পেরিয়ে গেলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ঈশান কথার এই সংখ্যার থিম ও হচ্ছে মাতৃভাষা। 

মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ তে কি আছে, তাই নিয়ে কলম ধরেছেন স্বনামধন্য অধ্যাপক, লেখক, গবেষক পরিতোষ চন্দ্র দত্ত...  

Paritosh Chandra Dutta_edited.jpg

সরকারের কাছে শিক্ষার বাস্তব উন্নয়নের ব্যাপারে কথা উঠলেই এদেশে শিক্ষাবিস্তারের রাজকোষে অর্থের অভাব দেখা যায়৷ শিক্ষাবিস্তারের জন্য যে অবকাঠামোর উন্নতির প্রয়োজন তার জন্য দেশের অর্থভান্ডারে অর্থ বরাদ্দ কমে যায়৷ এই দেশের বাজেট তৈরি করার সময় শিক্ষাখাতে উন্নতির জন্য অর্থের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়৷ এই কথাগুলো উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে স্বাধীনতার ৭৫ বছর ধরে চলতে থাকা শিক্ষানীতির ফলাফল দেখার পর দেশের নতুন শিক্ষানীতি নিয়ে কিছু আলোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে৷ ভারতে প্রথম শিক্ষানীতির আবির্ভাব ঘটেছে ১৯৬৮ সালে এবং দ্বিতীয় শিক্ষানীতির কথা এসেছে ১৯৮৬ সালে৷ পি ভি নরসিমা রাওয়ের রাজত্বকাল সময়ে ১৯৯২ সালে শিক্ষানীতির কিছুটা সংশোধন করা হয়েছিলো৷ তৃতীয় শিক্ষানীতি এসেছে ২০২০সালে৷ সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর দুই দশক পেরিয়ে যাবার পর অন্তরীক্ষ যাবার ইচ্ছে থাকলেও সেখানে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সাধনা করার ক্ষমতা নেই৷ এই নতুন শিক্ষানীতি দেশের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎপন্থা তৈরি করার লক্ষ্যে সঠিক রাস্তা দেখাতে সক্ষম হয়নি৷ নতুন শিক্ষানীতিতে রয়েছে ভবিষ্যতে নানারকম সঙ্কট তৈরির সম্ভাবনা৷ তবে এটাও ঠিক সঙ্কটরূপী রোগ নির্নয় করা সম্ভব হলেও রোগ সারানোর জন্য যে ঔষধের প্রয়োজন রয়েছে সেটার জন্য বেশ কষ্ট পেতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও পেতে হবে৷ আবার এটাও অনেকে মনে করছেন, আগামী দিনগুলোতে এই গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রীয় সেবক সঙ্ঘ দ্বারাই পুরোপুরি শিক্ষানীতি চালু হওয়ার সম্ভবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷ জাতীয় শিক্ষানীতির পরিচ্ছেদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম প্রনয়ণ এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে সঙ্ঘ পরিবার নির্দেশিত পথ ও অভিপ্রায় সুস্পষ্ট৷ বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ তৈরি করার জন্য পাঠ্যসূচি সেভাবেই তৈরি করা উচিত৷  কিন্তু এব্যপারে এটা নিশ্চয় আশ্চর্য হবার কথা যে নতুন শিক্ষা পদ্ধতি শুরু করতে গিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষাবিদদের কোনও পরামর্শ নেবার প্রয়োজনই মনে করা হলো না যা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়৷ এছাড়াও লক্ষ্য করা যায়, বহুভাষিকতা ও ভাষার সামর্থ্য নিয়ে প্রচুর সুন্দর সুন্দর কথা উচ্চারন করলেও ভারতীয় ভাষাগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা এবং বাঙালির জাতিক সত্তা হয়েছে আক্রান্ত৷ যাই হোক আপাততঃ এই কথাগুলো বাদ দিয়ে অন্য দিকগুলোর বিষয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন৷

এই শিক্ষানীতিতে জাতিসঙ্ঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো), আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার, বিশ্ব ব্যাঙ্ক ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ এছাড়াও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে৷ কিন্তু এগুলোর সমান্তরালভাবে আরও অনেক কথা রয়েছে৷ শিক্ষাব্যবস্থায় যেসব সংস্কার আনার জন্য নানারকমের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেই সংস্কারগুলোর উদ্দেশ্যসহ সমস্তদিকে খোলাখুলিভাবে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে৷ সমাজের কোন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য এই সংস্কারকাজে সরকার এগিয়ে এসেছে সেটা কিছুটা হলেও বোঝা যাচ্ছে৷ জাতীয় শিক্ষানীতি যে ভবিষ্যত প্রজন্মকে মানসিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সে কথাও অনেকে প্রকাশ করেছেন৷ শৈশবের শিক্ষার মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চরম ধর্মান্ধতা ও মারাত্মক কিছু কুসংস্কারের বেড়াজালে জড়িয়ে টেনে নীচে নামানোর জন্যে এক নীল নক্সা তৈরি করা হয়েছে৷ এভাবেই এক বিশেষ ধরণের যান্ত্রিকতার মাধ্যমে শৈশবকালে সৃষ্টি হওয়া সুকোমল বুদ্ধিমত্তাসহ চিন্তাগুলোকে ধ্বংস করে দিয়ে এক বিশেষ রোবট তৈরি করে দেওয়ার প্রবনতার গন্ধ রয়েছে যাতে প্রভুদের স্বার্থরক্ষার বাইরে অন্য চিন্তা করার মত ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়৷ জাতীয় শিক্ষানীতিতে বিজ্ঞানমনস্কতার পরিবর্তে চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক, অযৌক্তিক আলোচনার মাধ্যমে অতীতের রক্ষণশীল অবৈজ্ঞানিক সমাজের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে৷ অথচ সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে ভারতের মনীষীগণ জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উন্নতিসাধন করার মাধ্যমে বিজ্ঞানমনষ্ক সমাজ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন৷ একইভাবে ভাষার বিষয়ে বলতে হয় যে পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে তাদের নিজের নিজের মাতৃভাষা হৃদয়ের ভেতরে রাখার মত আদরের এবং স্বাভাবিকভাবেই তাই হয়তো সবচেয়ে খুব কাছের একটি বিষয় বলে মনে করা যেতে পারে৷ মানুষের জীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব নিয়ে যত কিছুই বলা হোক না কেন তবুও শেষ করা যাবেনা কারণ মাতৃভাষা ছাড়া সেই জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিসহ জাতির অস্তিত্ব যে কোন মূহূর্তে সংকটের মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে৷ মাতৃভাষা মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলে লুকিয়ে থাকা আবেগকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে৷

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ভাব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা এবং সেই ভাষাগুলোর অবলম্বনকারী বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠী। একইভাবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সন্তানেরা তাদের জন্মলগ্ন থেকে ঐতিহ্যগতভাবে যে নির্দিষ্ট ভাষাটির মাধ্যমে নিজেদের ভাব প্রকাশ করতে শেখে, সেটিই হল তাদের মাতৃভাষা। বিশ্বজুড়ে ৩০.৫ কোটি মানুষ স্থানীয় ভাষাভাষী এবং অন্য প্রায় ৩.৯ কোটি দ্বিতীয় ভাষা বক্তা হিসাবে রয়েছে৷ বাংলা হচ্ছে পঞ্চম সর্বাধিক কথ্য মাতৃভাষা এবং বিশ্বের মোট ভাষাভাষীদের সংখ্যার ভিত্তিতে ষষ্ঠ সর্বাধিক কথ্য ভাষা৷ একুশে ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বের সমস্ত বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী জনগণের কাছে স্মৃতিবিজড়িত এক গৌরবের দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে৷ ২০০০ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোতে যথাযথ মর্যাদার সাথে প্রতি বছর আলাদা আলাদা প্রতিপাদ্যকে গুরুত্ব দিয়ে দিনটি পালন করা হয়ে থাকে৷ যেমন গত বছর ২০২১ সালের মূল প্রতিপাদ্য ছিল "শিক্ষা ও সমাজে অন্তর্ভুক্তির জন্য বহুভাষিকতা উত্সাহিত করা"৷ তবে আগের বছর অর্থাৎ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাব উথ্থাপিত হওয়ার পর পৃথিবীর ১৮৮টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানানোয় ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়৷ যে কোনো ব্যক্তির কিংবা গোষ্ঠীর কাছে তার মাতৃভাষা ভাব প্রকাশের মাধ্যম ছাড়াও নির্দিষ্ট ভাষাটির সাথে জড়িয়ে থাকে নানারকমের ঐতিহ্যসহ ঐতিহাসিক সংস্কৃতি তথা মহান আবেগ। মানুষের সেই আবেগকে তথা সংস্কৃতিকে সম্মান তথা শ্রদ্ধা জানাতেই একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

এই বিশেষ দিবস উদযাপনের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষ তার নিজের মায়ের ভাষার পাশাপাশি  পৃথিবীর সকল ভাষাকে সম্মান করতে সক্ষম হয়৷ এই গুরুত্বপূর্ণ দিনটি পালনের মাধ্যমে মানুষ তার নিজের জাতির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে সচেতন হওয়া সম্ভব হয়৷ স্বাভাবিকভাবে সাংস্কৃতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ হয় সমগ্র মানব সমাজ। তাছাড়া একে অপরের ভাষাকে সম্মান করতে শেখার মধ্যে দিয়ে মানব সভ্যতা পারস্পারিক সহাবস্থানের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ওঠে। আমাদের মনে রাখা একান্ত প্রয়োজন যে পারস্পরিক সম্মান এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছাড়া মানবসভ্যতা টিকে থাকা অসম্ভব। মাতৃভাষা হচ্ছে মায়ের ভাষা। প্রত্যেকের কাছেই মাতৃভাষা হচ্ছে মায়ের মতন যা রক্তে মিশে থাকে৷ মা যেমন তার সন্তানকে স্নেহের বন্ধনে আগলে রাখেন, তেমনি মাতৃভাষাও একটি নির্দিষ্ট ভাষাগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে ইতিহাসের স্নিগ্ধ বন্ধনে জড়িয়ে রাখে। সেজন্যেই মাতৃভাষা আমাদের সকলের কাছে পরম আবেগের। নিজেদের এই আবেগকে রক্ষা করার জন্য আমাদের সর্বদা আন্তরিকভাবে সচেতন থাকা উচিত। এটা সকলের জানা যে ভাষা হচ্ছে চলমান এবং সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন প্রানের সৃষ্টি করে৷

দূর্ভাগ্যজনকভাবে রাজ্যের শাসকগোষ্ঠী বরাক উপত্যকার মানুষদের ওপর জোর করে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে নানাভাবে৷ রাজ্যের জনগণের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বাংলাভাষী হওয়া সত্ত্বেও সংবিধানের তোয়াক্বা না করে শুধুমাত্র ক্ষমতার জোড়ে বা অপব্যবহার করে বাঙালিসহ অন্যান্য ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে ধ্বংস করে দেবার প্রচেষ্টা সরকার অব্যাহত রেখেছে৷ এটা সকলেরই জানা রয়েছে, কোনো জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার বিস্তৃতির সাথে সাথে সেই ভাষাগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও আবেগেরও বিস্তৃতি ঘটে৷ তাই স্বাভাবিক ভাবেই জোড় করে নানারকম সুবিধার সুযোগ নিয়ে উগ্রজাতীয়তাবাদের ধ্বজা ধরে উগ্রভাষাবিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে  ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছে উপত্যকার জনগণ৷ স্বাধীনতার পর থেকেই রাজ্য সরকারের বাংলা ভাষার ওপর জোরজুলুম চলতে থাকার প্রতিবাদে তীব্র হয় ভাষা আন্দোলন৷ বাংলা তথা মাতৃভাষার জোরালো গণদাবি ও রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে ১১ জন শহীদের প্রাণের বিনিময়ে উপত্যকায় সরকারি ভাষা (Official State Language) হিসেবে বাংলা ভাষার  ব্যবহার স্বীকৃতি পেয়েছিলো৷ পরবর্তী সময়ে এই মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতেই আরও চারজনকে শহীদ হতে হয়েছে৷ এপ্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের নিজস্ব ভাষায় জ্ঞান চর্চার ফলে নিজ নিজ দেশের সার্বিক উন্নয়নের গতিধারা তরাণ্বিত করতে সক্ষম হয়েছে৷ ফলস্বরপ দেশের সর্বক্ষেত্রে মাতৃভাষার প্রয়োগের মাধ্যমে জটিল কর্মপ্রক্রিয়াগুলো সহজসাধ্য হয়ে উঠেছে এবং লক্ষ্য করলে দেখা যায়, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে সেই দেশগুলোতেই মাতৃভাষা সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে থাকে। এক কথায় মাতৃভাষার যথার্থ প্রয়োগে শিক্ষার প্রসারতা দ্রুত এগিয়ে যায়৷

এটাই বাস্তব সত্য যে মাতৃভাষায় দুর্বল থেকে বিদেশি ভাষায় সবলতা অর্জনের চেষ্টা একপ্রকার দুরাশার নামান্তর৷ তাইতো কবি নিজের ভুল স্বীকার করে লিখেছিলেন – “হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন/ তা সবে অবোধ আমি অবহেলা করি/ ….ওরে বাছা মাতৃকোষে রতনের রাজি/এ ভিখারি দশা তবে কেন তোর আজি/যা ফিরি অজ্ঞান তুই যারে ফিরি ঘড়ে/ মাতৃভাষা রূপখনি পূর্ণ মনিজালে”৷ মাতৃভাষার সার্বিক প্রয়োগে সমাজ ও জাতিকে যে কোন বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব৷  ঊনিশ এবং একুশের চেতনা মানেই তো বাস্তবতার আলোকে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসারতা৷ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার যথাযথ ব্যবহারে সক্ষম হতে পারলে মানুষ নিজেকে, সমাজ ও দেশকে সঠিক ও ভালোভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হওয়া সম্ভব৷ সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোন কারণে যখন কোনও জাতি তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে এড়িয়ে চলে, তখন জাতির নিজস্ব জাতিসত্তা হারিয়ে ফেলার উপক্রম হতে পারে৷ মাতৃভাষাকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হলে শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষার ব্যবহারে পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট৷ একইভাবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টিতে উল্লেখ করেছিলেন, “জ্ঞানবিজ্ঞান যেখানকারই হোক, ভাষা মাতার হওয়া চাই”৷

 

শিক্ষামন্ত্রী হোক বা প্রধানমন্ত্রী হোক বা শিক্ষাবিভাগীয় অন্য যে কোন মন্ত্রীই হোক ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারায় সবাই নিজের নিজের মত করে প্রযুক্তিগততার কথা শুনিয়ে আসল উত্তরকে এড়িয়ে যাচ্ছেন৷ বুদ্ধিবৃত্তিকতা, বৌদ্ধিকতা সমস্ত শেষ হয়ে যাচ্ছে৷ দেশের সংসদে যুবপ্রজন্মের উন্নতিকল্পে সুস্থচিন্তার বিতর্ক সহ আলোচনার পরিসর দিনদিন কমে আসছে৷ দেশের শিক্ষা মন্ত্রী হোক বা প্রধানমন্ত্রী হোক কেউই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুস্থ বিতর্ক আলোচনায় অংশ নেবার মানসিকতাই তৈরি করতে পারেননি৷ যুবপ্রজন্মের উথ্থাপিত কোনরকম ন্যায্য প্রশ্নের যুক্তিযুক্ত বিচার করে উত্তর দেবার মত ক্ষমতা সরকারের নেই বলেই মনে করছে জনগণ৷ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র উন্নয়ণশীল দেশগুলোর বাজেটের দিকে লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে ভারতের বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ করা হচ্ছে যা দিয়ে সরকারের যে দুরদৃষ্টির অভাব রয়েছে সেটা প্রমানিত হয়৷ গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে দেশের মোট দেশীয় পণ্যের মাত্র ০.৭৫ শতাংশই খরচ করার বিধান দেওয়া রয়েছে৷ এই পরিস্থিতিতে যুব প্রজন্ম এসব সমস্যা নিয়ে ভাবা উচিৎ যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করে বেকারদের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে বা দেশের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে দেশের মসনদে বসার জন্য নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিৎ যার মাধ্যমে সমস্ত রকমের নোংরা বিভেদের রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে সুস্থ চিন্তার যুব প্রজন্মের নতুন ভারতবর্ষ গড়ে উঠে৷ কারণ সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা এবং শিক্ষান্তে চাকরি প্রাপ্যতার দাবি তুলতে গিয়ে যদি সরকারের লাঠিপেটা খেতে হয় তাহলে দেশের যুবপ্রজন্মের নিশ্চয় সুস্থ গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের কথা চিন্তা করা উচিৎ৷

সরকারের কাছে শিক্ষার ব্যপারে তিনটি প্রশ্ন খুবই মাহাত্ম্যপূর্ণ৷ প্রত্যেক বছর মাধ্যমিক শিক্ষান্তে বা উচ্চতর মাধ্যমিক শিক্ষান্তে ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিজেদের পায়ের উপর দাঁড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট কোনও প্রকল্প না থাকলে বা শিক্ষান্তে চাকরির ব্যবস্থা না থাকলে সেই শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি মূল্যহীন হয়ে যাবে৷ এব্যপারে দেশের যুবসম্প্রদায়কে চিন্তা করতে হবে৷ দ্বিতীয়তঃ দেশের বিভিন্ন শহরে যে ছাত্রছাত্রীরা আলাদা আলাদাভাবে রাস্তায় বের হয়েছে শিক্ষানীতির ব্যপারে তাদেরকে শিক্ষার প্রকৃত উন্নতির ব্যপারে একছাতার নীচে এসে চিন্তা করতে হবে৷ শিক্ষা শুধুমাত্র ডিগ্রিলাভ নয়, শিক্ষান্তে রোজগারের ব্যবস্থা থাকতে হবে কারণ রোজগারের মাধ্যমেই দেশের আর্থিক উন্নয়ন সম্ভব৷ আবার অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমেই দেশের মোট দেশিয় পণ্যের পরিমানও বাড়বে৷ তৃতীয়তঃ  শিক্ষিত যুবকেরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে যে রাজনীতির ব্যবসায়ীরা তাদের নিজেদের স্বার্থে দেশের শিক্ষিত যুবসম্প্রদায়কে কিভাবে ব্যবহার করে চলেছে তাই নিজেদের অধিকারের ব্যপারে তাদেরকে সচেতন হতে হবে৷ মাধ্যমিক থেকে বিভিন্ন স্তর পর্যন্ত পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকা ছাত্রছাত্রীরা এক সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এগিয়ে যেতে থাকে৷ কিন্ত পরীক্ষান্তে রোজগারের পথ খুঁজে না পেয়ে সমস্ত সুন্দর স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়৷ তাই ব্যবসায়িক রাজনীতিকদের খপ্পরে না গিয়ে এক নতুন ভারতবর্ষ তৈরি করার লক্ষ্যে সবাই মিলে একত্রিত হয়ে চিন্তা ভাবনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে৷

এটা উল্লেখ করতেই হয় যে দেশের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমান ক্রমাগত কমানো হচ্ছে৷ গত সাত বছরের বাজেটে চোখ রখলেই দেখা যাবে যে ২০১৪-১৫ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ যেখানে মোট খরচের ৪.১৪ শতংশ ছিল, সেখানে ২০২০-২১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩.২৬ শতাংশে৷ ওই বরাদ্দ মোট দেশীয় পণ্যের (জিডিপি) অনুপাতেও ০.৫৩ শতাংশ থেকে নেমে হয়েছে ০.৪৪ শতাংশ৷ অর্থাৎ, বর্তমান সরকার শিক্ষাব্যবস্থার ব্যপারে ঢেলে সাজানোর কথা জোড় গলায় বললেও জোগানোতেই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে৷ অবশ্য এটাও ঘটনা যে সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) রাজত্বকাল সময়েও শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ বাজেটের বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ২০০৪-০৫ থেকে ২০১১-১২ সালের মধ্যে তা ঘোরাফেরা করেছে জিডিপির ০.৬ শতাংশ থেকে ১.১ শতাংশে, ২০১১-১২ সালে ছিলো ১ শতাংশ৷ দেশের মোট জাতীয় আয়ের শতাংশ হিসেবে দেখলে শিক্ষাক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মিলিত ব্যয় গত পাঁচ বছর ধরেই ২.৮ থেকে ৩.০শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই যা তিন-এর অনেক উপরে৷ এ পর্যন্ত ভারতবর্ষে যতগুলি শিক্ষা কমিশন হয়েছে, সবাই একবাক্যে বলেছে— জাতীয় আয়ের অন্তত ছয় শতাংশ শিক্ষায় খরচ করা উচিত৷ কিন্তু অনুমান করে বলা যেতে পারে যে সে সম্ভাবনা স্বপ্নেই থেকে যাবে৷ তাই সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় শিক্ষা যে পড়ে না তা বুঝতে কোনরকম অসুবিধা হয় না৷ ২০১৯-২০ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা৷ ২০২০-২১ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ৯৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা থেকে ৬ শতাংশ ছাঁটাই করায় ৯৩ হাজার ২২৪ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে, যা গত তিন বছরের হিসাবে নিম্নতম৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার কোটি ছেঁটে দেওয়া হয়েছে স্কুলশিক্ষা খাতে৷ সরকারের শিক্ষানীতি নিয়ে যে দলিলগুলি প্রস্তুত করা হয়ে থাকে তার সঙ্গে প্রত্যেক বছরের বাজেট বরাদ্দ ও অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতাকে মিলিয়ে দেখলে একটা পরিস্কার ছবি উঠে আসাটা উচিৎ হলেও আশ্চর্য হতে হয় যে গত কয়েক বছর থেকে যে ছবিগুলি দেখা যাচ্ছে সেগুলো জনগণের মনে কোনো ভরসা যোগাতে সক্ষম হয়নি৷

গত দুই বছর ধরে চলতে থাকা জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কিছু বলতে হলে প্রথমেই নীতিকাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে হয়৷ শিক্ষা নিয়ে একটি সঠিক বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিকাঠামো তৈরি করে যথাযথভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা উচিত কারণ বর্তমানে কম্পাসবিহীন একটি জাহাজের মতো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে৷ ফলস্বরূপ বেকার সমস্যায় জর্জরিত হয়ে রয়েছে ছাত্রযুবসমাজ৷ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার চলমান সংকটে উদ্বেগের সাথে বলতে হচ্ছে যে শিক্ষার উন্নয়ন ঘটাতে অবশ্যই বরাদ্দ বাড়ানো উচিৎ৷ সংবিধানের আলোকে এবং শিক্ষানীতির সঠিক বাস্তবায়ন করতে না পারলে শিক্ষা জগতের অন্ধকার আরো ঘনীভূত হবে৷ সারা বিশ্বের প্রমাণগুলির একটি ইন্ডিয়াস্পেন্ড বিশ্লেষণ অনুসারে বলা যেতে পারে একটি শিশুর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, নতুন জাতীয় শিক্ষা নীতিতে সুপারিশকৃত, শিক্ষার উন্নতি ঘটাতে পারে, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে এবং ড্রপআউটের সংখ্যা কমাতে পারে৷