রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

আইএনএ-র জয়-পরাজয়


আ.ফ.ম. ইকবাল
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

AFM%20Iqbal_edited.jpg

বলছিলাম আইএনএ-র সফলতা বিফলতার কথা। হ্যাঁ, ঐতিহাসিকভাবে এটাই সত্য যে যুদ্ধকালে আইএনএ যে ভুমিকা পালন করতে পারে নি, তার চাইতে অনেক বড় ভুমিকা তারা পালন করেছিল তাদের দূর্দশার কালে, বন্দিত্বের দিনে। যুদ্ধক্ষেত্র তাদের অভিযান যেহেতু ছিল জাপানি সেনাপতির অধীনে, তাই সেখানে না ছিল তাদের স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ, না পরিমিত হাতিয়ারের যোগানের নিশ্চয়তা।

 

আইএনএ-র কর্ণেল শাহনেওয়াজ তাঁর স্মৃতিচারণ গ্রন্থে লিখেছেন- আইএনএ ছিল এক সুদক্ষ এবং সম্ভাবনাময় বাহিনী। এই বিতর্কটিও অনস্বীকার্য যে তারা কাঙ্ক্ষিত রূপে দক্ষতা দেখাতে সক্ষম হয় নি। আইএনএ-র স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপ কিন্তু কর্ণেল মোহন সিং এর অধীনে প্রথম আরাকান অভিযানে লক্ষণীয় দক্ষতা দেখিয়েছিল। পরবর্তীতে, ১৯৪৪-এর U-GO অভিযানের অংশিদার হয়ে আরাকান অঞ্চল এবং মণিপুর বেসিনে তারা কিন্তু বহুমুখী প্রতিভার নিদর্শন দেখাতে সক্ষম হয়েছে- সেই অভিযানের জাপানি সেনাপতি মুতাগুছি(MUTAGUCHI)র ১৫শ সেনার সঙ্গে। আইএনএ-র কমাণ্ডার এর.এস. মিশ্র, রাঠৌরি, মানশুক্লা, এম.জেড. কিয়ানি এবং অন্যান্যরা জাপান এবং ব্রিটিশ সেনাদের যথেষ্ট দৃষ্টি আকর্ষন করেছিলেন। 
     

প্রথমেই যেমনটি বলা হয়েছে আইএনএ-র সফলতা ছিল দুই পর্যায়ে- প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ ক্ষেত্রে এবং পরোক্ষভাবে যুদ্ধোত্তর কালে, যুদ্ধবন্দী রূপে। কোহিমা যুদ্ধে আইএনএ-র ভুমিকা নিয়ে আমরা পূর্ববর্তী এপিসোডে আলোচনা করেছি। যখন কোহিমা টেনিস কোর্টে আইএনএ-জাপান মিত্রবাহিনীর যুদ্ধ চলছিল ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর সঙ্গে, একই সময়ে মণিপুরের মৈরাং-এ আইএনএ-র বাহাদুর গ্রুপের মোকাবেলা চলছিল ব্রিটিশ সৈন্যদের। কর্ণেল শওকত মালিকের নেতৃত্বে আইএনএ-র সুইসাইড স্কোয়াড মৈরাং স্থিত ব্রিটিশ ডিফেন্স পুরোপুরি ভেঙে দিয়ে মৈরাং-এর দখল নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। তারিখ ছিল এপ্রিলের ১৪। সেই দিনটি আইএনএ সদস্যদের তথা সকল স্বাভীমানি ভারতীয়দের কাছে এক বিরল ঐতিহাসিক দিন। সেদিন বিকেল পাঁচটায় কর্ণেল শওকত মালিক প্রথমবারের মতো ভারতের মাটিতে ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। 
     

মৈরাং দখলের পর তারা প্রাগ্রসর হয়ে ইম্ফল-কোহিমা রোডের দখল নিয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কোহিমা ও শিলচরের যোগাযোগ রক্ষায় রীতিমতো হুমকি গড়ে তোলেন। 
     

অপরদিকে কর্ণেল গুলজার সিং এর নেতৃত্বে আজাদ ব্রিগেড ভারতের মানচিত্রের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করে ইঙ্গ-মার্কিনদের অবস্থান অনেকটা পিছিয়ে দিতে সক্ষম হন। 
     

সেই অগ্রগতির সময়ে দুটি বিপর্যয় একসাথে নেমে আসে আইএনএ-র সম্মুখে। প্রথমত, জাপান থেকে আসা হাতিয়ার ও খাদ্য সামগ্রীর সাপ্লাই ব্যাহত হয়ে পড়ে। আর তার চাইতে মারাত্মক এবং বিলকুল অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে, আইএনএ-র দুই সামরিক অফিসার চরম বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়ে ব্রিটিশ সেনাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নেন। এই দুই গাদ্দার অফিসার আইএনএ-র পরবর্তী পরিকল্পনার যাবতীয় গ্রাফিক দলিল ইংরাজ সেনার হাতে তুলে দেয়। পরিণাম স্বরূপ যে ব্রিটিশ বাহিনী পরিস্থিতির চাপে পড়ে পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, তারা আবার নব উদ্যমে নতুন পরিকল্পনা সাজিয়ে পুনরাক্রমণের প্রস্তুতি নিতে পারলো। মাথার উপরে উড়ে এলো ব্রিটিশ যুদ্ধ-বিমান বাহিনী । ক্লান্ত অভুক্ত পিপাসার্ত আইএনএ-জাপান সৈনিকেরা অবশেষে পিছু হটতে বাধ্য হলো। 
     

বিশ্বের নানা প্রান্তে বিশ্বযুদ্ধের যে মহড়া চলছিলো, তা চুড়ান্ত পর্যায়ের দিকে মোড় নিচ্ছে। ইঙ্গ-মার্কিনিরা ঘণঘণ তাদের মিত্রদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। জাপান ধীরে ধীরে গুটিয়ে আসছে- সেই ইঙ্গিত ছিল সুস্পষ্ট। ফাইন্যাল পেরেকটি কে কিভাবে মারবে? মিত্ররা অবশেষে আমেরিকাকে ছাড়পত্র দিয়ে দিলো জাপানের উপর আনবিক বোমা নিক্ষেপ করতে। তথাকথিত বিশ্বশান্তির ফেরিওয়ালা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ৬ই আগষ্ট-১৯৪৫ নিক্ষেপ করলো জাপানের হিরোশিমা শহরের উপর আনবিক বোমা। এবং তারপর ৯ই আগষ্ট ফের নাগাসাকি শহরে ! বিদ্ধস্ত জাপান অনন্যোপায়। পরদিনই, অর্থাৎ ১০ই আগষ্ট আত্মসমর্পণে সম্মতি দিতে বাধ্য হলো । 
     

তার আগ, আইএনএ-জাপান মিত্রবাহিনীর দক্ষিণ এশিয়া অভিযান শেষ হতেই কোহিমা ও ইম্ফল থেকে প্রায় পনেরো হাজার আইএনএ-র সদস্য ব্রিটিশ সেনাদের হাতে ধরা পড়েন। সেনা আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চালানোর জন্য তাদের নিয়ে আসা হয় দেশের বিভিন্ন বন্দিশালায়। জাপানের আত্মসমর্পণের পর কিছু আইএনএ সদস্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন ব্রিটিশ সেনাদের কাছে। কিছু সদস্যকে ধরপাকড় করে তুলে আনা হয়। মোট ৪৩০০০ আইএনএ সদস্যদের থেকে ১৬০০০ সদস্যই বন্দি হন। তাদের রাখা হয় ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর কঠোর প্রহরায়। 
     

যুদ্ধ অপরাধী হিসেবে আরম্ভ হয় আইএনএ সদস্যদের বিচার প্রক্রিয়া। এবং এই বিচার প্রক্রিয়াই হঠাৎ করে দেশ থেকে ব্রিটিশ বিতাড়ন আন্দোলনের ভয়ঙ্কর ইন্ধন হয়ে দেখা দিলো! 'আইএনএ সদস্যদের মুক্তি দাও, তাদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করো- এটিই হয়ে দাঁড়ালো স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচাইতে জবরদস্ত স্লোগান। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ Christopher Bayly লিখেছেন-  'INA was to become a much more powerful enemy of British empire in defeat that it had been during it's ill-fated triumphal march on Delhi'. 
       

ব্রিটিশ Viceroy's Journal ওই সময়টিকে অভিহিত করেছিল  'The Edge of Volcano' বলে! 
       

রাজশক্তির পরিকল্পনা ছিল আইএনএ সদস্যদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে, যাতে এদেশে আর কেউ বিদ্রোহের নাম নিতেও ভয় পায়। কিন্তু এই অত্যুৎসাহী পরিকল্পনা যে তাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়াবে, তা তারা ভাবতেই পারে নি! কল্পনাও করতে পারেনি যে এই আইএনএ বন্দিরাই তাদের উল্টো জাজমেন্ট শুনিয়ে দেবে  'ক্যুইট ইণ্ডিয়া ইমিডিয়েটলি'! যদিও অত্যন্ত নীচ মানসিকতা নিয়ে তাদের চিরাচরিত 'ডিভাইড এন্ড রুল'- এর নোংরা খেলা এই ক্ষেত্রেও খেলতে চেয়েছিল।
       

সকল বন্দিদের নিয়ে আসা হলো লালকেল্লায়। আরম্ভ হলো বিচার প্রক্রিয়া। খবর ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী সংবাদ পত্রের মাধ্যমে। দেশের জন্য যারা জীবনপণ নিয়ে লড়তে গিয়েছিল, তারাই আজ বড় অপরাধী, দেশদ্রোহী! গণমানুষের বিবেক চেতনা অনুভূতি দ্বীপ্ত তেজে জেগে উঠলো ! একদিকে সেনা আদালতে বিচার নাটকের চলছিল অভিনয়, অপরদিকে দেশব্যাপী হরতালে জনরোষ বাঙ্ময়! 
     

প্রথম দুদিনেই হাজার হাজার ছাত্র জনতা বেরিয়ে এলো পথে। গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়লো দক্ষিণের ভেলোর মাদুরাই সালেম থেকে উত্তরের চণ্ডীগড় ভোপাল লখনৌ এলাহাবাদ, পূর্বের কলকাতা পাটনা থেকে পশ্চিমের করাচি লাহোর পর্যন্ত! 
       

অপরদিকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে জাগ্রত হলো তীব্র আলোড়ন। আইএনএ বন্দিদের প্রহরায় নিরত অবস্থায় ভারতীয় সৈনিকেরা জ্ঞাত হয়েছিল কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে তাঁরা আইএনএ- তে যোগ দিয়েছিলেন, দেশের জন্য কি শপথ নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ইত্যাদি সবকিছুই। অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দাবানলে পরিণত হয়ে উঠলো ক্রমশ! দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত দাউদাউ করে উঠলো ব্যাপক সেনাবিদ্রোহ !
       

ছেচল্লিশের ফেব্রুয়ারি মাস। বোম্বে সমুদ্র বন্দর। রয়েল ইণ্ডিয়ান নেভির প্রায় কুড়ি হাজার নাবিক, যারা ছিলেন ৭৮ টি যুদ্ধ জাহাজের দায়িত্বে, খোলাখুলি বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। বোম্বে শহরের বিভিন্ন স্থানে নেতাজির ছবি হাতে নিয়ে ছড়িয়ে পড়লেন। যেখানে যে ইংরাজকে পেলেন, 'জয় হিন্দ' এবং আইএনএ-র অন্যান্য স্লোগান উচ্চারণ করতে বাধ্য করলেন! নাবিকরা সকল ব্রিটিশ জাহাজ থেকে নামিয়ে দিলেন ইউনিয়ন জ্যাক ! ঘোষণা করে দিলেন এখন থেকে তারা আর কোনও ব্রিটিশ কর্তার নির্দেশ পালন করবেন না। 
       

একই ধরনের বিদ্রোহ দেখা দিলো রয়েল ইণ্ডিয়ান এয়ার ফোর্স এবং জব্বলপুরের ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান আর্মি ছাউনিতে। পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে আড়াই মিলিয়ন, অর্থাৎ পঁচিশ লক্ষ ভারতীয় ব্রিটিশ সৈন্যকে ডি-কমিশনড করা হলো। এতোসবের পরও ব্রিটিশ মিলিটারি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে খবর এলো- যতই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, আগুনে ততই ঘৃতাহুতি হচ্ছে! ভারতীয় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে, তা আর নিবৃত্ত করা সম্ভব হবে না! উল্লেখ্য যে ভারতে তখন মাত্র ৪০,০০০ ব্রিটিশ সৈনিক। বিশ্বযুদ্ধ লড়ে তারাও বিধ্বস্ত পর্যুদস্ত। সবাই ঘরে ফিরতে উন্মুখ! এই মুহূর্তে ২৫ লক্ষ দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ বিদ্রোহী ভারতীয় সেনার মোকাবেলা ইংরাজ কর্তৃপক্ষ করবে কাদের দিয়ে? সুতরাং সামনে একটিই বিকল্প- ভারতবাসীর কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা হস্তান্তর!  
       

নেতাজি সুভাষ এবং আইএনএ-র এটাই সবচাইতে বড় সাফল্য! যুদ্ধক্ষেত্রে তারা যে প্রত্যাশিত সফলতা দেখাতে সক্ষম হয় নি, যুদ্ধোত্তর বন্দিত্বের কালে তাঁরা সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করে দিলেন। সুতরাং সময় হয়েছে , সমকালের ইতিহাসের পর্যালোচনা করে, স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজি এবং আইএনএ-র গভীর অবদানের স্বীকৃতি জানানোর । 
       

বর্তমানে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ইতিহাস বইগুলোতে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, ব্রিটিশ রাজশক্তি যেন কেবল সত্যাগ্রহ, অহিংস আন্দোলন, গান্ধীজি আর ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে ভয় পেয়ে এ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেখানে নেতাজি তথা আইএনএ-র উল্লেখ মাত্র নেই- যা বাস্তবতার চরম অস্বীকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়। 
       

হ্যাঁ, একথা সত্য যে গান্ধীজি তথা কংগ্রেস এবং অন্যান্য সংগঠনের আন্দোলন বিদ্রোহের পটভূমি তৈরি করছিল, কিন্তু অকস্মাৎ ইংরেজদের পাততাড়ি গুটানোর মতো পরিবেশ কিন্তু তাতে তৈরি হয়নি। সুস্পষ্টভাবে তার নেপথ্য কারণ ছিল আইএনএ সদস্যদের সাথে ব্রিটিশ ভারতীয় সৈনিকদের সান্নিধ্য।  
       

আবারও বলি আইএনএ সদস্যদের বিচার প্রক্রিয়ার কথা। ৪৫ এর নভেম্বর থেকে ৪৬ এর মে মাস পর্যন্ত লালকেল্লায় লোকচক্ষুর সামনেই হলো দশ দশটি কোর্ট মার্শাল। ব্রিটিশ সেনা কমান্ডার ভেবেছিলেন এই বিচার প্রক্রিয়া দেখে পাবলিক ওপিনিওন আইএনএ সদস্যদের বিরুদ্ধে যাবে, দেশবাসীর ঘৃণা জন্মাবে তাদের প্রতি। কিন্তু বাজি পাল্টে গিয়েছিল পুরোপুরি। দেশের মানুষ আইএনএ-র বীর যোদ্ধাদের দেখতে পেলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক রূপে, দেশের শত্রু অবশ্যই নয়, নয় কোনো প্রতারক! পরিস্থিতি উপলব্ধি করে লণ্ডনে চিঠি লিখলেন ফিলিপ ম্যাসন, ব্রিটিশ সেক্রেটারি অব ওয়ারস- '...... in a matter of weeks........ in a wave of Nationalist emition, the INA were acclaimed heroes who faught for the freedom of India'.
       

অপরদিকে, রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয় দলের নেতারা প্রত্যক্ষ করলেন আইএনএ-র বিচার প্রক্রিয়া দেশের মানুষের মধ্যে প্রভূত ভাবে জনজাগরণ তৈরি করে ফেলেছে। সুযোগটা কি ছাড়া যায়? উভয় সংগঠনই নেমে পড়লেন ঘোলা জলে মাছ ধরতে। আইএনএ-র প্রতি দেশবাসীর দরদকে কাজে লাগাতে তারা নেমে পড়লেন রাজনীতির ময়দানে। 
       

অবশ্য এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলো আইএনএ-র বিচার প্রক্রিয়া, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক বিচারধারার দুটি সংগঠনকে একই মঞ্চে নিয়ে আসতে। এই সেন্সিটিভ ইস্যুতে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ একই সাথে একই মঞ্চে নিজেদের তেরঙ্গা এবং সবুজ পতাকা নিয়ে হাজির হলো। একই সঙ্গে পাশাপাশি উড়তে লাগলো দুটি ভিন্ন ফিলসফির নিশান। যদিও পরবর্তীতে দুই দলেরই নেতৃত্বের ইগো এবং অনমনীয় মানসিকতা সেই সেতুবন্ধন টিকে থাকতে দেয়নি। 
       

বিচার প্রক্রিয়া চলছে। কোর্ট মার্শাল করে অনেককে চরম শাস্তি শুনানো হচ্ছে, কিন্তু কার্যকর করার হিম্মত হচ্ছে না বাহাদুর ইংরাজদের! 
       

গান্ধীজি এই পরিস্থিতিকে তুলে ধরেছেন এইভাবে: "...... the whole Nation has been roused, even the regular forces have been stirred in to a new political consciousness and began to think in terms of Independence'. 
       

হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, হঠাৎ করে ভারতের স্বাধীনতা তরান্বিত হবার কারণ কি ছিল? প্রসঙ্গটি বিশাল। এই টপিকের উপর অনেক স্বনামধন্য ঐতিহাসিক প্রভুত কাজ করে গেছেন। এর যথোপযুক্ত জবাব দিয়ে গেছেন। তাদের তিনজন ঐতিহাসিক সুমিত সরকার, সুগতা বোস এবং ফরিদা জালাল এই ঐক্যমত্যে পৌঁছেছেন: '... INA trials and it's after effects brought a dicisive shift in British Policy towards Independence'. কিছু ঐতিহাসিক তৎকালীন রয়েল ব্রিটিশ আর্মির দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধকালীন কমাণ্ডার ফিল্ড মার্শাল ক্লুড জন আয়ার আচিনলেক(Claude John Eyre Auchinleck), যিনি সেই সময় ভারতে ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান আর্মি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন : '... assessment of the situation to suggest this shortened the Raj by at least 15 to 20 years. অর্থাৎ আচিনের হিসেবে আইএনএ-র বিচার প্রক্রিয়া এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ রাজের আয়ু অন্তত পনেরো থেকে কুড়ি বছর এগিয়ে দিয়েছে। এই উক্তির পেছনে একটি সুস্পষ্ট যুক্তিও অবশ্য রয়েছে। তা হলো যুদ্ধ বিধ্বস্ত ব্রিটেনের যে যথেচ্ছ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ভারতের মতো সমৃদ্ধ কলোনিতে অন্তত আরও কুড়ি বছর শাসন করতে পারলে তার অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো। 
       

ইংরাজরা ভালোই অনুধাবন করতে পেরেছিল ভারতীয় সৈন্যদের দ্বারা ভারতবাসীর এবারের আন্দোলন দমন করা আর সম্ভব নয়- যেমন তারা সফল হয়েছিল ৪২ এর ভারত ছাড়ো বা তার আগের অন্যান্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে! 
       

ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে লণ্ডনে শুরু হয়ে গেলো হৈচৈ- কেমন করে সসম্মানে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। পরিস্থিতি বিচার করে ব্রিটিশ সরকার দিল্লিতে পাঠালো ক্যাবিনেট মিশন। দায়িত্ব দেওয়া হলো ভারতের ভবিষ্যত সাংবিধানিক কাঠামো কেমন হবে, তার পরিকল্পনা তৈরি করতে। 
       

পরিশেষে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট এ্যটলির এক সুস্পষ্ট স্বীকারোক্তি তুলে ধরে এই নিবন্ধের ইতি টানবো। কথোপকথনটি উদ্ধৃত করেছেন নেতাজি বিশেষজ্ঞ, প্রক্তন সেনা আধিকারিক জেনারেল জি ডি বকশি, তাঁর 'Bose: An Indian Samurai' গ্রন্থে। 
       

১৯৪৫-এ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট এ্যটলি এসেছিলেন ভারতে। সেই ভ্রমণের সময় তিনি কলকাতা ও এসেছিলেন । আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন বাঙলার গভর্নর তথা কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জাস্টিস পি বি চক্রবর্তীর। সেই কথোপকথনের বিবরণ একটি চিঠির মাধ্যমে জাস্টিস চক্রবর্তী জানিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস প্রণেতা ও প্রকাশক আর সি মজুমদার মহাশয়কে- তাঁর বাসনা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হোক এই ঐতিহাসিক সত্যটি। সেই চিঠিটির এ্যবস্ট্রেক্ট তুলে ধরছি : 
       
"When I was acting Governor, Lord Attlee, who had given us independence by withdrawing British rule from India, spent two days in the Governor's palace at Calcutta during his tour of India. At that time I had a prolonged discussion with him regarding the real factors that had led the British to quit India. 


My direct question to Attlee was that since Gandhi's Quit India movement had tapered off quite some time ago and in 1947 no such new compelling situation had arisen that would necessitate a hasty British departure, why did they had to leave?"
   

"In his reply Attlee cited several reasons, the principal among them being the erosion of loyalty to the British crown among the Indian army and Navy personnel as a result of the military activities of Netaji," 
   

"Toward the end of our discussion I asked Attlee what was the extent of Gandhi's influence upon the British decision to quit India. Hearing this question, Attlee's lips became twisted in a sarcastic smile as he slowly chewed out the word, m-i-n-i-m-a-l!" 
   

শেষ কথাটি 'মিনিমেল' !