top of page

রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

দ্বেশ নীতির অবগুণ্ঠনের আড়ালের মোদের দেশ


রাহুল রায়
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

Rahul%20Roy_edited.jpg

প্রতিশ্রুতি দেওয়াটা পৃথিবীর সহজতম কাজ যদি না সেই প্রতিশ্রুতি পালনের দায়িত্ব নিতে হয় । সেই প্রতিশ্রুতি যদি নির্বাচনীয় প্রচারের মঞ্চ থেকে দিতে হয় তাহলে তো কথাই নেই। চাঁদের মাটি বাড়ির পাশের হাটে এনে বিক্রি করার প্রতিশ্রুতি দিতেও সেখানে সমস্যা নেই। তবে অসমের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে যায়। এখানে শুধু নির্বাচনীয় প্রচার নয়, নির্বাচনের পরে বিধানসভায় দাঁড়িয়েও প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়। বিধায়ক থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সাংসদ থেকে মুখ্যমন্ত্রী কেউ এই তালিকা থেকে বাদ যান না। প্রত্যেকেই বাকরসিক এখানে। নিরলস ভাবে কথার ওপর কথা, প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে এঁরা জনগণের কাছে প্রতিদিন নানা রঙের স্বপ্নের ফেরি করেন।মানুষ ঝুলি পেতে সেই স্বপ্ন নেন, সেই স্বপ্ন নিয়ে নানা আশা করেন, সেই স্বপ্ন নিয়ে তুষ্ট থাকেন। তবে প্রকৃতির নিয়ম মেনেই সেই আত্মতুষ্টি বেশিদিন স্থায়ী হওয়ার কথা নয় । স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেখার বা সেটা যদি না হয় তাহলে সেটা নিয়ে মানুষের মনন জগতে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক ।সেই প্রশ্ন নিয়ে স্বপ্নের ফেরিওয়ালাদের বিচলিত হওয়ার কথা, কারণ প্রশ্ন আসলে জবাব দিতে হবে। জনগণের প্রশ্ন দীর্ঘদিন জবাবহীন থাকলে জনসমর্থন হারানোর ভয় থাকে । তবে অসমের ক্ষেত্রে এই অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মটাই কোথায় যেন নিজস্বতা হারায়।


প্রতিশ্রুতি যাই দেওয়া হোক না কেন রাজ্যে কাজ কতটা হচ্ছে দেখতে হলে বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই, এই শিলচরের দিকেই দেখা যাক । রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শহরে গত ছয় বছরে প্রতিশ্রুতি বর্ষণ কম হয়নি । মিনি সচিবালয় থেকে শুরু করে একাধিক পার্ক, ড্রেনেজ প্রকল্প, জাতীয় স্তরের গ্রন্থাগার, নর্মাল স্কুলের প্রাঙ্গনে জাদুঘর, প্লেনেটোরিয়াম থেকে শুরু করে নিউ শিলচর এলাকায় একটি স্টেডিয়াম, পুলিশ গ্রাউণ্ডে অ্যাথলেটিক্স গ্রাউণ্ড, বরাক নদীতে খনন করে বাংলাদেশ তথা পশ্চিমবঙ্গ থেকে জাহাজ চালানোর ব্যবস্থা করার পর্যন্ত স্বপ্ন ফেরি করা হয়েছে । করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকলে এক মাসের মধ্যে মেডিক্যাল কলেজের সামনে একটি জাতীয় স্তরের হাসপাতাল বানানো, মেডিক্যাল কলেজকে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, জরাজীর্ণ সিভিল হাসপাতালকে আধুনিক করার কথা বলা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতের ধাঁচে পুরসভা অঞ্চলে বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য বিক্রি করে পুরসভার আয় বৃদ্ধি করার কথা বলা হল। বাস্তবে যে কিছুই হয়নি, তা কিন্তু নয়, পরিকাঠামোগত উন্নতি অবশ্যই হয়েছে । তবে রাস্তাঘাট মেরামতি, নির্মাণ ও দুইটি সেতু নির্মাণ ছাড়া ফেরি করার স্বপ্নের আর বিশেষ কিছুই শহরবাসীর হাতে আসেনি। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে এখানে মানুষ শাসকদলের কাজে অত্যন্ত খুশী,নিজেদের প্রতিনিধি নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত। প্রাকৃতিক নিয়মে যদিও উল্টোটাই হওয়ার কথা ছিল, জনপ্রতিনিধিদের প্রশ্ন করার কথা ছিল,তাদের কাজকর্ম নিয়ে ক্ষোভ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ক্ষোভ, প্রশ্নের বদলে আছে তুষ্টি,গর্ব।


এই পরিচিত্র কিন্তু শুধু শিলচরের না , অসম জুড়েই। এর কারণ অতি অবশ্যই সরকারের নীতি। সরকার ভালো করেই জানে তার ভাঁড়ে কি আছে।কেন্দ্র সরকারের কাছেও কতটুকু অবধি ঋণ পাওয়া যেতে পারে। সরকার এটাও ভালো করেই জানে এই টাকা দিয়ে আর যাই হোক প্রতিশ্রুতি মতো কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইচ্ছা থাকলেও না।কিন্তু গণতন্ত্রে মানুষকে পাশে রেখেই ক্ষমতাতে থাকতে হয়। সেই ‘পাশে রাখতে’ যা যা করণীয় সরকার খুব ভালো করেই তা করে যাচ্ছে। কাজ যে একেবারেই রাজ্যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। প্রতিশ্রুতির তুলনায় সেটা নগণ্য হলেও হচ্ছে । রাজ্য জুড়েই পরিকাঠামো উন্নতি হচ্ছে।রাস্তাঘাট তথা একের পর এক সেতু নির্মাণ, বিদ্যুতায়নের মতো কাজ দক্ষতার সঙ্গে করা হচ্ছে। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে পাশে রেখে সেটার প্রচার করা হচ্ছে। বর্তমানকে সযত্নে পাশে সরিয়ে আগামীতে কি হবে সেটার স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে । মানুষ সেই স্বপ্নে বিভোর হচ্ছেন, খুশী হচ্ছেন, তুষ্ট থাকছেন। সরকারের পাশে দৃঢ় ভাবে দাঁড়াচ্ছেন ।


মানুষের এই সমর্থনকে ধরে রাখতে অনবরত স্বপ্ন দেখানো, কিছু পরিমাণ কাজ ছাড়াও অহরহ যা ব্যবহার করা হচ্ছে তা হল ভেদনীতি। হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অসমিয়া, খিলঞ্জীয়া-অনখিলঞ্জিয়া বিদ্বেষকে খুব যত্ন করে ব্যবহার করা হচ্ছে । ধর্মের নামে, ভাষার নামে, অধিকারের নামে মানুষের আবেগকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্পদ যেখানে কম, সম্পদের জন্য প্রতিযোগীতা তথা দ্বন্দটাও সেখানে বেশি । অসমের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই দাঁড়াচ্ছে।উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্যে সম্পদের প্রাচুর্য কোনোকালেই সেভাবে ছিল না। সম্পদের এই অভাব সময়ে সময়ে ভাষিক জনজাতিগুলোর মধ্যের বিদ্বেষকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে বা বলা যায় কূটকৌশলীরা নিয়ে গেছেন। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় স্বাধীন ভারতের আর কোনো রাজ্যকে অসমের মতো ভাগ হতে হয়নি । রাজনীতিবিদরা নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে ভাষার ভিন্নতাকে সময়ে সময়ে ব্যবহার করেছেন । একের পর এক নরহত্যার সাক্ষী হতে হয়েছে এই রাজ্যের মাটিকে। আজ রাজ্যে অসমিয়া-বাঙালি, খিলঞ্জীয়া-অনখিলঞ্জীয়া বিভেদ,দ্বেষ,পারস্পরিক সন্দেহের আবহ প্রায় নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, রাজনৈতিক কূটকৌশলীদের সৌজন্যে মানুষ একে অপরের রক্তপিপাসু হয়ে উঠছে, যাবতীয় সমস্যার জন্য একে অপরকে দায়ী করার মতো একটি বিষাক্ত পরিস্থিতি তৈরী হয়ে যাচ্ছে তখন ভাবতে বাধ্য হতে হচ্ছে যে সমস্যার মূল অন্যত্রে। যা দেখানো হচ্ছে, যে পরিস্থিতি তৈরী করা হচ্ছে তার কারণ শুধু ভাষার বিবিধতা নয়, কারণ এই বিবিধতা ভারতের সব রাজ্যেই আছে। অথচ এই পরিস্থিতি, পরিবেশ শুধু অসমেই আছে। এবং এর কারণ অসমের অর্থনৈতিক অবস্থা।

 
অসমের ঋণ অর্থবর্ষ ২০১৫-১৬ সনে ছিল ৩৯,০৫৪ কোটি টাকা, ২০১৯-২০২০ অর্থবর্ষে সেটা দাঁড়ায় ৭২,২৫৬ কোটিতে।রাজকোষ সামলাতে রাজ্য সরকারকে একের পর এক শিল্পোদ্যোগ বিক্রি করার কথা ভাবতে হচ্ছে।অসমের দারিদ্র (৩২.৬৭ শতাংশ) দেশের পিছিয়ে থাকা রাজ্যের মধ্যে ছয়, উত্তর-পূর্বে রাজ্যগুলোর মধ্যে পেছন থেকে দুই। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে জাতীয় গড় থেকে এই রাজ্যের মানুষের আয় ৪৩৪৬৮ টাকা কম। এই পার্থক্য ২০১০-১১ অর্থবর্ষে ছিল ২২৩২০ টাকা, ২০১৯-২০২০ অর্থবর্ষে তা প্রায় ৯৫ শতাংশ বেড়ে যায় । অর্থাৎ ২০১০-১১ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবর্ষের মধ্যে একজন গড় ভারতবাসীর তুলনায় একজন অসমবাসীর আয়ের বৃদ্ধির দর প্রায় অর্ধেক। কৃষিপ্রধান এই রাজ্যে কৃষিক্ষেত্রের বৃদ্ধির দর করোনার প্রাক সময়ে ছিল মাত্র ২.৩৫ শতাংশ । বানিজ্য, পরিবহন ও আবাসিক শিল্পে এই দর ছিল যথাক্রমে ২.৪৫, ০.৬৫ ও ২.১৮ শতাংশ মাত্র । পরিষেবা ক্ষেত্রে দর ছিল মাত্র ৪.৪৮ শতাংশ । অথচ এই ক্ষেত্রগুলোতেই রাজ্যের ৮০ শতাংশ মানুষ কাজ করেন । এই অবস্থা করোনা কালে স্বাভাবিক ভাবেই আরো মারাত্মক হয়েছে। বেকারত্ব বর্তমানে আকাশছোঁয়া , বাইরে থেকে বিনিযোগ আনা সম্ভব হচ্ছে না । রাজ্য সরকার নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না।  গত বছর ডিসেম্বর মাসে জব ফেয়ারের নামে গুয়াহাটিতে ঘটে যাওয়া ঘটনা রাজ্যবাসীর কাছে সেই বার্তাই দিয়েছিল। সমস্যা হল মানুষ এই বার্তাগুলোকে ধরতে পারছেন না । যাদের ধরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল তারা সে কাজে চরম ভাবে ব্যর্থ। বাস্তবে বিরোধী দলগুলো মৌনতা, সংবাদমাধ্যমের নিস্তব্ধতা, জনগণের চেতনাহীনতা ও ভাষিক তথা ধর্মীয় হীনমন্যতা এখানে সরকারের কাজকে সহজ করে দিয়েছে। তাই তো সমস্যাদীর্ণ এই রাজ্যের সরকারের জনভিত্তি ও সরকারের প্রধানের জনপ্রিয়তা প্রশ্নহীন ভাবে ক্রমবর্ধমান । তবে এটাও মনে রাখতে হবে নিঃশব্দে হলেও সমস্যাগুলোও বাড়ছে বই কমছে না।

bottom of page