রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

হিজাব গ্রহণ বর্জন, না শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার কৌশল ?


সীমা ঘোষ
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

Sima%20Ghosh_edited.jpg

গত কয়েকদিন ধরে মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরা নিয়ে দেশজুড়ে  শোরগোল চলছে। কর্ণাটক সরকার  দক্ষিণপন্থী একটি দলের যুবকদের আপত্তিতে মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরার অধিকার ত্যাগ করতে হবে বলে নোটিফিকেশন জারি করেছে । হ্যাঁ দাবি । রীতিমত সার্কুলার দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন । তাই , নিয়ে প্রতিবাদ আদালতের চত্বরে প্রবেশ করেছে । বিষয়টি এখন আইনের আওতায় । আইন কী বলবে জানিনা।  আর কবে বলবে তারও কোনো ঠিক নেই । । কিন্তু দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আপাতত কোনো ধর্মীয় পোশাক চলবে না এই ফতোয়া জারি হয়ে গেছে কর্ণাটক সরকারের লেজ ধরে ধরে, কোথাও লিখিত কোথাও মৌখিক ।

 

ধর্ম পালনের অধিকার ভারতবর্ষে সকলের । অন্তত সংবিধান সে অধিকার দেয় । কিন্তু হিজাব বোরখা ঘোমটা বা ঘুঙ্গঠ ধর্ম কিনা আমার জানা নেই । তবে, পোশাকের অধিকারে সকলেই স্বাধীন । তাই, অনেকেই  ,"হিজাব আমার ইমান , আমার আব্রু " "আমার ইজ্জত " এসব বলেছেন । আর পুরুষ নারী নির্বিশেষে এতে গলা মিলিয়েছেন । অনেক বোরখা হিজাব পরিহিত মহিলারা সোস্যাল মিডিয়ায় এসে বলছেন, এসব পরেও শিক্ষায়, কর্মে,  চাই কি শত্রুর উপর ক্ষেপনাস্ত্র প্রয়োগে, খেলার মাঠে কত সাফল্য অর্জন করা যায় !  কিন্তু সত্যি কী বিষয়টা তাই ?

 

 

হিজাব বোরখা ইত্যাদি পরা না পরার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের দেশের সংখ্যালঘু মেয়েদের ভবিষ্যৎ ? 

 

না , তা মোটেই নেই । দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই, তা হলো আমাদের ভারতবর্ষের এই রমণীরা আসলে কাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে সেটাই । দেশের বলিয়ে কইয়ে কর্মকর্তা অবশ্য চুপ করে দেখছেন, বোরখা পরার " "অপরাধে " একটি মেয়েকে কেমন করে তাঁর অনুগামী "দেশপ্রেমী' যুবকেরা ঘিরে ধরে " জয় শ্রীরাম " ধ্বনি দিয়ে দিয়ে হেনস্থা করছে ! না, তিনি এই লেখা পর্যন্ত সরাসরি এ বিষয়ে কিছু বলেন নি । যেমন কয়েকদিন আগে পাঞ্জাবে তাঁর কনভয়  আটকে পড়েছিল বলে ক্ষোভে দুঃখে ফেটে পড়েছিলেন তৎক্ষণাৎ । যদিও পরে বিস্তারিত জেনেছি, কোনো দল তাঁর পথ অবরোধ করেনি। কোনো বিরোধী পক্ষ তাঁর কনভয় আটকায় নি বা তেড়ে যায়নি, বিক্ষোভ দেখায় নি । তবু তিনি যে "ভাগ্যক্রমে ফিরেছেন" এই দুঃখ যন্ত্রণা নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন । দেশের ভক্তবাহিনীর সেন্টিমেন্ট উথলে উঠেছে । কিন্তু,  ঐ একলা মুসকান নামের মেয়েটির কোনো প্রতিরোধ করার শক্তি ছিল না । ভীত সন্ত্রস্ত মেয়েটি "আল্লাহু আকবর,আল্লাহু আকবর " -পাল্টা ছুঁড়ে দিয়েছিল ঐ গেরুয়া কাপড় ওড়ানো বীরপুঙ্গবদের দিকে প্রতিবাদ হিসেবে । সে প্রতিবাদ যে ঐ দলবদ্ধ নেকড়েদের হিংস্রতার সামনে আসলে কিছুই নয় , তা কি মুসকান জানত না ? খুব জানত । কিন্তু , তাকে পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল এই প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গটুকু ছুঁড়ে দিতে । সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লোকজন না এগিয়ে এলে মেয়েটির হিজাব ধরে টানাটানিও হয়তো হতো । কারণ,  সুযোগ পেলে যারা পিতার বয়সী বৃদ্ধদের দাড়ি ধরে টান দিয়ে," জয় শ্রীরাম" ," ভারতমাতা কি জয়" বলতে বাধ্য করে,  সেখানে ,তারা একাজও  করতে পারত - এ ভাবনা কি একেবারেই অমূলক ?

 

 

বিষয়টা এখানে থেমে গেল কি ? না, যেতে পারে ?

 

না । থেমে যেতে পারে না। কারণ , কর্ণাটক সরকার তার পরই "হিজাব বা বোরখা পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে । এরপর আদালতের দরজায় সে সমাজের একটি ক্লাস এইটের মেয়ে কড়া নেড়েছে । আপাতত সে অভিযোগ  আদালতের বিচারাধীন । তবে, আদালত জানিয়ে দিয়েছে ,  বিচারের রায় বেরনোর আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো গেরুয়া চাদর পরা বা হিজাব পরা চলবে না।

আইন নিশ্চয়ই আইনের পথে চলবে । তবে, আমার মতো আনাড়ি রায় বের হওয়ার আগেই কিন্তু দুটো হিজাবের বিরুদ্ধে রায় শুনতে পেল। একটা সরকারি ঘোষণার মধ্যে ও  অন্যটি আদালতের মধ্যে । দুটোই মোটামুটি এক যে , "আপাতত হিজাব বোরখা পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা চলবে না ।" এটাই তো একদল যুবকের অন্যায় রকমের আবদার  ছিল !  তাই না ? সুতরাং  বিচার শেষ হওয়ার আগেই আপাতত রায় তা কোন পক্ষের দিকে গেছে তা তো বেশ পরিষ্কার !

 

 

লক্ষ্য কি তবে মেয়েদের জন্য  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ করে দেওয়া ?

 

হিজাব বোরখা ইসুতে মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার রাস্তা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । অনেকে পরীক্ষা দিতে গিয়ে ফিরে আসছে। হিজাব পরার "অপরাধে" তাদের স্কুল কলেজে প্রবেশ নিষিদ্ধ করছেন কর্তৃপক্ষ। যা খুব-ই অবমাননাকর অসম্মানজনক মেয়েদের পক্ষে দেশের পক্ষে । কারণ, মেয়েদের কাছে  অনেকটা যেন দাবি করা হচ্ছে- তুমি ওড়না খোলো বা পোশাক খোলো তবে ক্লাসে যাবে ! এবং এখন সেটা বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মেয়েদের প্রতি । সত্যি ! কী নির্মম নিষ্ঠুর মানসিক লাঞ্ছনা !!

 

"বেটি বাঁচাও ,বেটি পড়াও" শ্লোগান তবে কি ''শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেটি হটাওয়ের" দিকে চলে যাচ্ছে ?  মেয়েদের পড়াশোনার দিকটাই তো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে! - আর এটাই এই বোরখা বা হিজাব নিষিদ্ধকরণের ভয়ঙ্কর দিক । মেয়েদের শিক্ষার শর্ত হয়ে উঠছে  বোরখা - হিজাব । এ একটা সভ্য দেশের দুর্ভাগ্য , যে দেশে মেয়েদের শিক্ষার হার এখনও ৭০.৩% ! অথচ একটি দলের অনুগামী, যারা হিজাবের বিরুদ্ধে গেরুয়া কাপড় গায়ে জড়িয়ে, হাওয়ায় উড়িয়ে রাস্তায় নেমেছে ,তারা তো আপন ধর্মের মেয়েদের জন্য খুব রক্ষণশীল ! এরা তো ছেলেমেয়েরা প্রেম করলে এই একুশ শতকেও হিক্কা তোলে ! উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীযোগী আদিত্য নাথ তো পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে গিয়ে , প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে 'অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড' বানিয়ে দেওয়ার  ! কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গে  এত বড় "লোভনীয়" প্রস্তাব কেউ কানে তুলল না, এই যা ! এই তো কদিন আগেই সংঘের নেতা মোহন ভাগবত বলেছেন, বিচ্ছেদ বাড়ছে ,কারণ মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে ,চাকরি করছে  । তিনি আরও বলেছেন , ''ছেলেরা বিয়ে করে সুখ পাওয়ার জন্য , মেয়েদের কাজ হলো সুখ দেওয়া । এর অন্যথা হলে স্ত্রীকে ত্যাগ করা যেতেই পারে ।" তাহলে সামগ্রিকভাবেই মেয়েদের শিক্ষা আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠা যাঁদের কাছে আক্ষেপের,  তাঁদের অনুগামীরা অন্য ধর্মের মেয়েদের আব্রুহীন করতে চাইছে কেন ?

 

 

মেয়েদের শিক্ষার অধিকারের কথা যখন এল তখন চলুন, একটু পিছনে ফিরে দেখা যাক-

 

উনিশ শতকে  মেয়েদের শিক্ষার জন্য পশ্চিমী শিক্ষায় শিক্ষিত মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ এগিয়ে এসেছিল । চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছিল শিক্ষায় মেয়েদের অধিকার নিয়ে। সুতরাং  তাদের শিক্ষার পাঠক্রম কী হবে, কীহবে সে শিক্ষার উদ্দেশ্য তা নিয়ে রীতিমত দাবি দাওয়া  আন্দোলন আলোড়ন ফেলেছিল যাকে বলে !  উনিশ শতকের সাংস্কৃতিক জগতে এগিয়ে থাকা ঠাকুরপরিবার এ ক্ষেত্রেও এগিয়ে এসেছিল ।' ভারতী 'পত্রিকায় জ্ঞানদানন্দিনী  দেবী লিখছেন মেয়েদের শিক্ষার উদ্দেশ্য কী হবে - ' গৃহ- পারিপাট্য , পরিচ্ছদাদির সুব্যবস্থা,গৃহাস্থিত ব্যক্তিদের সুখ বর্ধন, পীড়িতদের সেবা, আহারের দ্রব্য নির্ণয় ও প্রস্তুত এবং সন্তান-পালন এই কয়েকটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে সুশিক্ষিতা হইয়া তারপরে যে স্ত্রীলোক আর যত কিছু  বিদ্যা শিখিয়া নিজের মনের উন্নতি ,অন্যের সন্তোষ বৃদ্ধি বা দেশের হিতসাধন করিতে পারেন ততই ভালো ।' এখানে মেয়েদের অর্থনৈতিক নির্ভরতার বিষয়টি সম্পূর্ণ বর্জিত থেকে গেল । মেয়েদের নিজের চেতনাকে মানুষ হিসেবে চিনতে চাওয়ার মতো চেতনা বোধ তো বাদই ! মধুসূদন তখন স্ত্রী শিক্ষার প্রয়োজন নিয়ে লিখছেন , বললেন,  তারা যেন এনলাইটেড হয় । আলোকপ্রাপ্ত মেয়ে ছাড়া জীবনসঙ্গী নির্বাচন সে সময় শিক্ষিত তরুণদের কাছে একটি সমস্যা । তাই তাঁরা এনলাইটেড পার্টনার খুঁজেছিলেন। আর ঠিক সে যুগে সেই সময়ে বিলেত ঘুরে মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন কৃষ্ণভাবিনী, তাঁর "শিক্ষিতা নারী " প্রবন্ধে। তবে,  সেখানে তিনি শিক্ষার সঙ্গে আত্মনির্ভরতার কথাও বলেছিলেন । যে কারণে, তরুণ রবীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন । রীতিমত প্রতিবাদ করেছিলেন । "সাধনা" র একটি বিভাগ ছিল "সাময়িক সারসংগ্রহ"। এখানে এই বিভাগের মূল উদ্দেশ্য -ই ছিল  ইউরোপীয় মেয়েদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করা।সেখানে 'ক্ষিপ্তরমণী সম্প্রদায় ' নামের রচনাতেও তিনি কৃষ্ণভাবিনীর  "শিক্ষিতা নারী"র সমালোচনা করেছেন ।তবে, তিনি রবীন্দ্রনাথ। তাই, তিনি এই ভাবনা থেকে একসময় বেরিয়ে এসেছেন । তাঁর 'স্ত্রীর পত্র'র মৃণাল একা একা আত্মানুসন্ধান করছে  কবিতায় । 'শাস্তি' গল্পের চন্দরার কাছে  পতি আর 'দেবতা' নয় 'স্বামী' নামক রাক্ষস । সেই "রাক্ষস" থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল বিনা অপরাধে ফাঁসির আসামি চন্দরা । ১৯০৭ সালে প্রিয়ম্বদা দেবীকে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন , ' এ কথা খুবই সত্য যে আমাদের দেশের মেয়েদের কাছ থেকে খমরা যেআত্মবিলোপ দাবি করি,তাতে অনেকের পক্ষেই আত্মঘাত ঘটে - সেটাতে কখনোই মঙ্গল হয় না । তোমার মধ্যে ঈশ্বর যে শক্তি দিয়েছেন তাকে সম্পূর্ণ বিকশিত কলবার পথে কোনো সংকীর্ণ সামাজিক ও পারিবারিক বাধা মানবার কর্তব্যতা নেই ।পোষা জন্তুর মতো পরের জোয়াল ঘাড় পেতে নিয়ে চলাকে ধর্ম বলেই স্বীকার করিনে ।' এইভাবেই তিনি বেরিয়ে এসেছেন যুক্তির হাত ধরে মেয়েদের সত্যিকার মুক্তির ভাবনায় ।

 

 

স্বাধীনতা আর মুক্তি -

 

আসলে স্বাধীনতা আর মুক্তি এই দুটো বিষয় এক নয় । স্বাধীনতা বাইরের বিষয় । কিন্তু মুক্তি অন্তরের , মুক্তি হলো আমাদের চিন্তা ও চেতনার সঙ্গে যা জড়িয়ে থাকে ।  সম্পত্তির অধিকার ,  বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার , বাইরে একা চলার অধিকার, চাকরির অধিকার, উপার্জনের অধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্বের অধিকার ইত্যাদি যা কিছু দাবি তার সবটাই স্বাধীনতার বিষয় । আমাদের দেশে স্ত্রী-শিক্ষার কথা হয়েছে, মেয়েদের স্বাধীনতার কথা হয়েছে কিন্তু, মুক্তির কথা হয়নি । নারী মুক্তি বিশ শতকের কথ। আমাদের দেশে লেখাপড়া জানার জন্য দাবি উঠেছিল উনিশ শতকে । তবে, মনে রাখতে হবে সে আন্দোলনও মেয়েরা করেনি ।  পুরুষরা করেছিলেন । কেন করলেন  ? অষ্টাদশ শতকেই  ইংল্যান্ড-এ মেরি উইলস্টোন ক্রাফট  মেয়েদের রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করছেন । আর আমাদের দেশে তখন মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ছাড়পত্র দাবি করতে  হচ্ছে । আর সেটাও করছেন মুষ্টিমেয় কিছু পুরুষ । তাঁরা কি তবে বিশ্বের সবচেয়ে মহানুভব পুরুষ ? প্রশ্ন তুলেছেন প্রাবন্ধিক সুতপা ভট্টাচার্য । খুব সংগত প্রশ্ন।

 

 

শিক্ষক্ষেত্রে মেয়েদের প্রবেশ পুরুষের ইচ্ছা অনিচ্ছা

 

আমাদের দেশে মেয়েদের শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশ আসলে পুরুষের ইচ্ছা অনিচ্ছা হয়ে থেকে গেছে । আমাদের দেশের মেয়েদের ভোটের অধিকার অর্জনের জন্য  মাঠে নামতে হয় নি । সেটাও স্বাধীন ভারতের সংবিধানকৃত  অনিবার্য বিষয় হয়ে তা আপনাআপনি এসে গেছে। অথচ সম্প্রতি আমেরিকান সৈন্যদের হাত থেকে  "স্বাধীনতা" ফিরে পাওয়ার পর সাংবাদিক যখন তালিবানীয় শাসক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিকে জিজ্ঞাসা করেন , মেয়েরা ভোট দিতে পারবে কিনা ? তাঁর প্রশ্নটি  এতই হাস্যকর মনে হয় যে, তিনি এ প্রশ্নে রীতিমতো লজ্জা পেয়ে যান ।  ভাবখানা এমন, মেয়েদের ভোট দেওয়ার অধিকারের মতো আজব কথা সে দেশে  কেউ বলে নাকি?

   

এ দেশে মহানুভব পুরুষদের দয়ায়  স্কুলে যাওয়াকেই অনেকে নারীমুক্তি ভাবছেন । অথচ দেখছি  উইলস্টোন  ক্রাফটের সময়ের পর  তিনটি শতক চলে গেছে। এখন এই একুশ শতকে, চাঁদে যখন মানুষ জমি কিনছে, তখন এদেশে  দুটি দল কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে মেয়েরা হিজাব পরবে না পরবে না   । এবং এখানেও সে দাবি মূলত পিতৃতান্ত্রিক দাবি । যাঁরা বলেছেন ,, শিক্ষাঙ্গনে মেয়েরা হিজাব পরবে না ,আর যারা বলছে পরবে  , উভয় দলই আসলে তো শুধু মুসলমান সমাজের মেয়েদের নয় , তাঁরা দেশের সব মেয়েদের উপর নিয়ন্ত্রন চাইছে । কারণ, এদেরই নানা সংস্করণ রাজ্যে রাজ্যে ধর্ম নির্বিশেষে অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াডের সদস্য ,এরাই গির্জায় হিন্দুর প্রবেশ নিষেধের বার্তাবাহক, এরাই ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে টর্চ হাতে যুগল তরুণ তরুণী সন্ধান করে বেড়ায়,   সবক শেখাতে কান ধরে ওঠবোস করায় । ধর্মীয় বিদ্বেষ তো আছেই ! কারণ, এরা তো মুসলমান সমাজের মেয়ে ! তারা হয়তো ভাবছে,   কয়েকদিন আগেই তিন তালাক নিষিদ্ধ করে এ সমাজের পুরুষদের গালে থাপ্পড় মেরেছি । আর এখন দেখাচ্ছি , তোদের ধর্মের মেয়েদেরকেও আমরা নিয়ন্ত্রণ করব । সর্বোপরি এদের তো আমরা "হিন্দুর দেশেই চাই-ই না । তাই বলছি , "হিজাব- বোরখা পরতে চাইলে পাকিস্তান যাক, বাংলাদেশ যাক।"  আর ঠিক এই সময়েই সনাতনী ভাগবত-বচন শুনলাম , " হিন্দুর হিত মানে দেশের হিত !''

তো আর যায় কোথায় ! লাইসেন্স তো দিচ্ছেই শাসক ও শাসকদলের নেপথ্য কারিগরেরা ! স্বয়ং শাসক দলের লোকজন প্রত্যক্ষভাবে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বিবৃতি দিচ্ছে এই ইসুতে ! যা দুর্ভাগাজনক, আগামী ভারতের জন্য ভয়ঙ্কর !

 

 

একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মেয়েদের মধ্যযুগীয় চাদর পরাতে চাইছে ।  হিজাবের বিরোধিতা নেহাত একটি উপলক্ষ মাত্র ।

 

আর, সুযোগ বুঝে  মুসলিম সমাজর কাঠমোল্লারা হিজাব বোরখা তাদের আল্লাহর নির্দেশ বলে বিরোধীদের শুধু বার্তা দিচ্ছে না , তাঁদের ধর্মের শুষ্ক আচারটি আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরার জন্য পরোক্ষভাবে চাপ দিতে চাইছে । এই বিতর্কের মধ্যেই দেখুন, বাজারে হিজাবের চাহিদা ২৫ -৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

 

আর হিজাব বোরখার  ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা মেয়েরা এখন স্যান্ডউইচ ! একদিকে দেশভক্তরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে অন্যদিকে রক্ষণশীল সমাজ তাকে অন্ধকারে টানছে । বর্হিজগতে আসার যেটুকু স্বাধীনতা হিজাব কিংবা ঘোমটার আড়াল ঠেলে তাদের কাছে এসেছে, স্বাভাবিক ভাবেই তাকে কোনো মূল্যেই তারা হারাতে চায় না । তাই হিজাব তাদের কোনো কাজের অন্তরায় নয় -  এটি  পরেই তারা বিমান চালাতে পারে, ইউনিভার্সিটির উচ্চতম ডিগ্রি অর্জন করতে পারে, মাঠে হা ডু ডু ফুটবল ভলিবল খেলতে পারে । মোট কথা তাদের হিজাব স্বাধীন চলাফেরার কোনো প্রতিবন্ধকতা আনে না -এইসব বিবৃতি দিচ্ছে বা তাদের দিয়ে দেওয়ানো হচ্ছে। মনে হয়, হায় ! রোকেয়া "অবরোধ-বাসিনী" কেন লিখেছিলেন ?

 

অবরোধ-বাসিনীর 'নিবেদন'-অংশে রোকেয়া বলছেন "২৫ বৎসর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইয়াছি ।" প্রথম রচনায় শ্লেষ করে লিখেছেন, " মেছোনীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, "পচা মাছের দুর্গন্ধ ভাল না মন্দ ?" - সে কী উত্তর দিবে ?" আমাদেরও পরিষ্কার বুঝতে হবে এই জিজ্ঞাসা নিয়েই, হিজাব বোরখা ঘোমটা এগুলো কি মেয়েদের নির্দিষ্ট সীমায় বেঁধে রাখার কৌশল নয় ? পিতৃতন্ত্র মেয়েদের পায়ে কি এগুলো দিয়ে বেড়ি পরাতে চায় না ? যারা বলছেন এগুলো কোনো প্রতিবন্ধকতা নয় ,তারা আজ নিরুপায় হয়েই বলছেন নাকি ?

 

তাই , মুক্তির বোধ চাই । অন্তরে মুক্তি চাইতে হবে । 'বোরখা হিজাব আমার গর্ব' ,'বোরখা আমার সম্মান' এগুলো অনেকটা খাঁচার পাখির শেখানো বুলি । পাখি খাঁচার ফাঁকে যে আকাশটা দেখে ওটাই তো অখন্ড আকাশ নয় !  আকাশ একটি ব্যাপক সীমহীন অনন্ত হয়ে আছে । বন্দিদশা কখনো অহংকার করার বিষয় নয়, হতেই পারে না । আর একথাও তাই আমাদের বলতেই হবে মেয়েদের হিজাব পরা আর শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার দুটো ভিন্ন বস্তু । একসময় মেয়েদের ঘর থেকে বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল । তাই সম্পন্ন পরিবারের হিন্দু মেয়েদের পালকিসহ গঙ্গায় ডুবিয়ে স্নান করিয়ে আনা হতো । এখন কেউ যদি বলে, এতে কোনো সমস্যা নেই , তাহলে তার নিরুপায় অবস্থাটিই অনুধাবন করতে হবে । আরো মনে রাখতে হবে উনিশ শতকে মেয়েদের শিক্ষার সূচনা লগ্নে যে সামান্য কজন এ  লেখাপড়া শিখেছিল তাদের বিরুদ্ধে প্রবল সংখ্যায়  ছিল মেয়েরাই - যারা পিতৃতান্ত্রিক চেতনায় মেয়েদের শিক্ষাকে ঘৃণা করত, এবং বিশ্বাস করত, লেখাপড়া শিখলে মেয়েরা বিধবা হয়। আর এসব পিতৃতন্ত্রের শেখানো কথা । তাই, এদের কাছে ইংল্যান্ডের শিক্ষিত লেখপড়া করা মেয়েদের উদাহরণ হিসেবে দেখা বা দেখানোর মতো যুক্তিবোধ আশা করা অর্থহীন সময়ের প্রেক্ষাপটে ।

 

কিন্তু, বর্তমানে এই একুশ শতকে এসে পিতৃতান্ত্রিক মনুবাদী ভাবনা মেয়েদের জীবনকে "সুপথে" চালানোর মাতব্বর হয়ে উঠেছে । তারা মেয়েদের জীবনকে সীমারেখা দিয়ে বাঁধতে চাইছে । আজ মুসলিম সমাজের মেয়েদের বলছে । কাল নয়, প্রতিদিন হিন্দু মেয়েদের জীবনের লক্ষ্য কী হবে কী হওয়া উচিত - তার নানা অলিখিত আইন কানুন করছে । তাই মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে  স্বাধীন হবে কেন ? মেয়েদের কাজ হলো তো "পতিসেবা"! এই একুশ শতকের দুনিয়ায় এরা এমন সহজ উচ্চারণ করছে - একে সহজভাবে নেওয়ার দরকার নেই ধর্মনির্বিশেষে কারোরই । শিক্ষাঙ্গনে হিজাবের নিষিদ্ধকরণ একটি উপলক্ষ্য মাত্র ! আসল উদ্দেশ্য মেয়েদের মনুবাদী পাঠশালায় "সংস্কারী'' করে তোলা  ।

 

শেষ করি, মেয়েদের লেখাপড়া শেখার অধিকার নিয়ে "বামাবোধিনী" পত্রিকায় একটি লেখার প্রসঙ্গ এনে । ১২৮৩ সালে এ পত্রিকার 'স্ত্রীশিক্ষা' নামে একটি লেখায় বলা হচ্ছে , '' যদিও পুরুষেরা স্ত্রীশিক্ষার জন্য যত্নবান হইতেছেন, দেখা যাইতেছে ,তত্রাপি তাহা হইতে এমত বোধ করা যায় না , যে তাঁহারা নিঃস্বার্থ হইয়া এ কার্যে  ব্রতী হইয়াছেন ।... এক্ষণে যে পুরুষজাতি স্ত্রীলোকের মূর্খতাদোষে কষ্ট পাইয়া তাহা দূরীকরণার্থ তাহাদিগকে শিক্ষা দিতে অগ্রসর হইয়াছেন  তাঁহাদেরই মধ্যে অনেকে যখন দেখিবেন যে, স্ত্রীলোকেরা শিক্ষিতা হইয়া অধীনতা পাশ মোচোনোন্মুখী হইয়াছে ,তখন আবার ক্রমে অভিমত পরিবর্তন করিয়া তদবিরোধী হইতে থাকিবেন।''

তাই তিন তালাকের বিরোধিতা, মোহন ভাগবতের উল্লিখিত বচন আর এর সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি  র কা -বিরোধী আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক মেয়েদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিস্মিত জিজ্ঞাসা " আন্দোলনে মেয়েরা কেন?" এই সব কিছুর সঙ্গে বিষয়গুলো মিলিয়ে নিন । "ক্রোনোলজি" বুঝে নিন।