top of page

রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

উৎসবের ঋতুতে বাজে বিসর্জনের বাজনা


অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য

Tapodhir Bhattacharjee_edited.jpg

শারদীয় উৎসব পঞ্জিকার বিধি অনুযায়ী আবারও শুরু হতে চলেছে। কোভিদ অতিমারী আমাদের মনোযোগ গতবছর এমন ভাবে অধিকার করেছিল যে বাঙালির তথাকথিত জাতীয় উৎসব যে শাসকের উদ্ধত আধিপত্যবাদী ফতোয়ার ছায়ায় আবিল হয়ে গেছে তা আত্মবিস্মৃত জনপদের অধিবাসীরা আদৌ লক্ষ করেননি। এবার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদ-মাধ্যমগুলি ‘তৃতীয় ঢেউ’ নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর কাজ শাসকের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থপূরণের জন্যে শুরু করলেও শেষপর্যন্ত খুব একটা বাড়াবাড়ি করেনি। এরই মধ্যে এল বাঙালির প্রিয় মহালয়া। ঘুম-জড়ানো চোখ নিয়েও আমরা অনেকে নিশ্চয় উৎকর্ণ হয়ে উঠেছিলাম ‘বাজল তোমার আলোর বেণু, জাগল ভুবন’ শোনার জন্যে। কিন্তু সত্যিই কি প্রশ্নহীন ভাবে অভ্যাসের বন্দীশালায় রুদ্ধ থেকে জেগে উঠেছি আমরা? ঘুমের ঘোর কি ভেঙেছে?


যেভাবে দেশের সংবিধানের মান্য নীতি সহ ন্যূনতম চক্ষুলজ্জাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সহ তাঁর প্রশ্রয়ধন্য চুনোপুঁটিরা পর্যন্ত বাঙালির জাতিসত্তা-ভাষা-সংস্কৃতি-ইতিহাসকে প্রকাশ্যে ঝেঁটিয়ে বিদায় করছে বেপরোয়াভাবে- আত্মবিস্মৃত বাঙালিদের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা যাচ্ছে কি? ‘সংবাদ মূলত কাব্য' নয় আর; সংবাদ এখন জাতিবিদ্বেষ ও আততায়ী সুলভ ঘৃণার কালকূট বিষ। ‘জাগো মা জাগো দুর্গা জাগো অসুরবিনাশিনী তুমি জাগো’: এই গানের মধ্যেও কি কোনো তাৎপর্য  অবশিষ্ট আছে? রাষ্ট্রতন্ত্র আমাদের বিবেক-সংবেদনা পরম্পরাবোধকে পর্যন্ত এমনভাবে চেটে-পুটে গিলে খেয়েছে, প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক হুঙ্কার উগরে দিতে সাংবিধানিক পদাধিকারী জনেরাও মুহূর্তের জন্যে দ্বিধা করছে না। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে এত ঘৃণা ও আক্রোশ, সেই বাঙালিরাও নিজেদের মেরুদণ্ড পর্যন্ত ছোট-মেজো-বড়ো প্রভুদের শ্রীপাদপদ্মে সমর্পণ করে নিশ্চিন্ত নিরুদ্বেগ।


মনে হয় যেন ছিন্নভিন্ন মানচিত্রে পরিণত হওয়া দেশ সম্পর্কেও কিছুমাত্র দায়বোধ নেই আমাদের। ভাষা? জাতিসত্তা? বিদ্যাসাগর? রবীন্দ্রনাথ? কী মানে আছে এদের? সবই তো নিছক শব্দ। আমরা বরং ব্যস্ত থাকি নিজেদের ‘উইপোকা’, ‘ঘুসপেটিয়া’ খেতাব সত্য বলে প্রমাণ করায়। নানারকম কৌশলে বাঙালির মধ্যে বিভাজন পাকাপোক্ত করার বন্দোবস্ত যাতে বাধাহীন ভাবে চলতে পারে, নিজেদের মধ্যে ‘ট্রয়ের ঘোড়া’ আমদানি করে তাদের পাহারাদার বিভীষণ-মিরজাফরদের ফুলবেলপাতা দিয়ে তুষ্ট করছি। গত দুবছরে কী দেখলাম! গোয়ালপাড়ার ভাষিক-চরিত্র যারা পালটে দিয়েছে, বরাক উপত্যকা সম্পর্কে অসহিষ্ণুতা থাকলেও তারা এতদিন অন্তত বাঙালির বুকের উপরে বসে দাড়ি উপড়ানোর চেষ্টা করেনি। এখন সেই প্রক্রিয়াও চলছে। নইলে ১৯৬০ সালের যে-কুখ্যাত ভাষাবিলের অগণতান্ত্রিক আক্রমণ প্রতিহত করেই রক্তে-রাঙা ১৯শে মে ইতিহাস তৈরি করেছিল, সম্প্রতি আমাদের আপসকামিতা ও ইতিহাস-বিস্মৃতির সুযোগ নিয়ে ভাষাবিলের মান্যতা প্রচার করা হলো। আর, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ধন্যধন্য করে বেণীর সঙ্গে মাথা দিতেও তৈরি হয়ে গেলেন। তাঁরা কীভাবে ভুলে গেলেন, ১৯৬১ সালের অক্টোবরে যে-সংশোধনী আসাম বিধানসভায় অনুমোদিত হয়েছিল, তারই জোরে বরাক উপত্যকায় সরকারি ও বেসরকারি কাজে বাংলা ব্যবহারই মান্য বিধি? সুতরাং ভাষা-গণতন্ত্র নস্যাৎ করে যেসব আধিপত্যবাদী ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ভাষাকে বরাকবাসীদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে, তাদের অভিসন্ধি দিবালোকের মতো স্পষ্ট।


শুধু তাই নয়, গত দু-তিন বছরে ফেসবুক-হোয়াটস্-অ্যাপে একতরফাভাবে বাংলাকে কোনঠাসা করার আয়োজন এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোয় বহিরাগতদের একচেটিয়া ভাবে চাকরিতে নিয়োগ সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নেরই দৃষ্টান্ত। অথচ আমরা ধুকছি এবং ধর্মান্ধতার বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন হয়ে আভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের আক্রমণও টের পাচ্ছি না। টের যাতে না পাই, এইজন্যে হুঙ্কারবাজেরা দু’দিন পরপর এন.আর.সি, শর্মা কমিটি, ব্রহ্ম কমিটির জুজুবুড়ি লেলিয়ে দিচ্ছে। নাগরিকতা তো দূর অস্ত, স্বতন্ত্র অস্তিত্বের অধিকারও কেড়ে নেবে প্রভুশক্তি। দুবছর আগেও সমন্বয়বাদের ঢাকঢোল পেটানো হত, আর এখন সরাসরি অজগর সাপের ঐক্যনীতির ঘোষণা।তবু উৎসবের ঋতু ঘুরে এসেছে। কিন্তু আদিগন্ত বিস্তৃত চোরাবালির উপর দাঁড়িয়ে উৎসবের মেজাজ কি সত্যিই টের পাচ্ছেন কেউ? সর্বব্যাপ্ত সন্ত্রাসের আতঙ্কে জেরবার হয়ে লক্ষ করছেন কি কেউ, বাঙালির জাতীয় উৎসব থেকে কত চতুরতার সঙ্গে পালের হাওয়া কেড়ে নেওয়া হচ্ছে? কোভিডের ভাইরাস তো আসলে প্রভুত্ববাদের হাতের তাস। যদি অতিমারী না হত, বিভীষণদের লেলিয়ে দিয়ে অন্য কোনো জুৎসই অজুহাত নির্ঘাত খুঁজে নেওয়া হত। বরাক উপত্যকা এখন খোলাখুলি গোয়ালপাড়ার দোসর! ১৮৭৪ সালের নিঃশব্দ বঙ্গভঙ্গ যারা ভুলে গেছে, তারা সুব্বুঙ্গবর্ষ (প্রাচীন কাছাড়) নাম শুনলেই মূর্ছা যাবে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তথ্য নিয়ে যাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, তারা বাঘের  পেটে যাবে নয়তো কুমিরের পেটে। তাদের ভাষাই বা কী, সংস্কৃতিই বা কী, উৎসবই বা কী?


উপনিবেশিত বরাক উপত্যকার ভাষিক স্বাতন্ত্র্য লুপ্ত করার চক্রান্ত এখন রেসকোর্সে তেজী ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে। আমরা সবাই চোখ-থাকতেও অন্ধ। দেখেও দেখছি না কিছু। আকাশবাণী, শিলচর এর ডানাছাঁটা সম্পূর্ণ। এখানকার দূরদর্শন-কেন্দ্র থেকে বাংলা সম্প্রসারণ বন্ধ করে দেওয়াতে প্রতি ঘরে প্রতি সন্ধ্যায়  অসমিয়া চ্যানেলের দাপট। আমাদের অভ্যস্ত করে নেওয়া হচ্ছে প্রভুশক্তির ভাষায়। এই সবই যে সাংস্কৃতিক  আগ্রাসনের দৃষ্টান্ত, এনিয়ে ভুলেও কি ভাবেন কেউ? বাংলা বই, বাংলা গান নিয়ে কেউ চিন্তিত নন, যাঁরা কলমচি তাঁরাও নন। কেননা ধর্মান্ধতায় যাদের চেতনা অসাড়, তারা কি মহাতিমিঙ্গিল-যুগলের কাছে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বিক্রি হওয়া নিয়ে আদৌ চিন্তিত? অতিমারীর হাজার হাজার শত শত শব গঙ্গাকে দান করলেও কিংবা অন্নদাতা কৃষকদের উপর হিংস্র আক্রমণ অব্যাহত থাকলেও অথবা অসহায় পরিযায়ী শ্রমিকরা রাস্তায় মারা গেলেও কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙে কি? ভাঙে না;বরং কোটি কোটি টাকায় নিজেদের আত্মা বিক্রি করা চ্যানেলওয়ালাদের নির্জলা মিথ্যায় বুঁদ হয়ে এদের ঘুমঘোর গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। বাঙালি-মৃগয়া অলক্ষে চলতেই থাকে, তবু এদের নিঃসাড় মনে কেউ আচড়ও কাটতে পারে। এবং এরই মধ্যে উৎসব আসে, রাঘববোয়ালেরা আরও হৃষ্টপুষ্ট হয়। মধ্যবর্গীয় জনেরা নিচুতলায় নেমে যায় আর নিচুতলার মানুষেরা অন্ধকারের বলয়কে ক্রমাগত প্রসারিত করে। তাদের জন্যে উৎসব কোথাও নেই। নিজেরাই অন্ধকার হতে হতে ভুলে যায়, ভোট-পার্বণে আড়কাঠিদের হাতে ওরা শৃগাল-ভেড়ার পর্যায়ে নেমে যায়। এবং নিজেদেরই ভোটের বিনিময়ে ওরা কিনে নেয় ক্ষয়, মৃত্যু, সর্বনাশ। এরাই অন্তহীন বন্দীশালাকে নিয়তি বলে মেনে নেয়। ভোট-পার্বণে ওরাই হয় ভিড় ও মিছিলের একক।


অসুরবিনাশিনী মহাশক্তি দানব-পিশাচ-রক্তবীজদের কবে নিশ্চিহ্ন করবেন, এই ভাবনায় দিন যায়, দিন যেতে থাকে। প্রশ্নহীন স্তব্ধতায় আত্মসমর্পিতজনদের প্রহর গড়ায় প্রশ্নহীন প্রতিবাদহীন স্তব্ধতায়...

bottom of page