রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা এবং
রাষ্ট্রের ভুমিকা


আ.ফ.ম. ইকবাল

AFM%20Iqbal_edited.jpg

'গণতন্ত্র’ শব্দের উৎস ইংরেজি Democracy। এর উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ‘দেমোক্রাতিয়া’ থেকে। যার অর্থ ‘জনগণের শাসন’। খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে অ্যাথেন্স সহ অন্যান্য গ্রিক নগররাষ্ট্রে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বোঝাতে শব্দটির প্রথম প্রয়োগ শুরু হয়েছিল। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ক্লিসথেনিস থিওরীতে নতুন ধরনের সরকার চালু হয় এবং সেই সঙ্গে বিশ্বের প্রথম গণতন্ত্র চালু হয় গ্রিসের ছোট্ট একটি নগর-রাষ্ট্র এথেন্সে।   
   

রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপজাতির মধ্য থেকে নেতাদের বেছে নেয়ার যে প্রচলিত রীতি চালু ছিলো, ক্লিসথেনিস তার অবসান ঘটান। তিনি মানুষের নতুন নতুন জোট তৈরি করে প্রতিটি ইউনিটকে ডিময় (Demoi) অথবা প্যারিশ (Parish)-এ বিভক্ত করেন। মুক্ত নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নগর-রাষ্ট্রের সরকার পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকার দেয়া হয়। বস্তুত এই ঘটনাই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রারম্ভিক উন্মেষরূপে পরিগণিত। নামকরণ করা হয় ডেমোক্রেশিয়া (Democratia)। এই ডেমোক্রেশিয়ার দুটি সিলেবল- ডেমস(demos), অর্থ হচ্ছে জনগণের, আর ক্রেটস(Kratos) মানে শক্তি। অর্থাৎ ডেমোক্রেশিয়া- অর্থ দাঁড়ালো জনগণের শক্তি।
     

একথা সত্য যে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন উপায়ে এবং নানাবিধ পদ্ধতিতে গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৪২২ সালে ক্লিয়ান ডেমোক্রেসিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে- ‘That shall be the democratic which shall be the people, for the people’. অর্থাৎ তা ই হবে গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা, যা মানুষের দ্বারা, মানুষের জন্য।   
     

আরও বেশ পরে আব্রাহাম লিঙ্কন তাঁর এক ভাষণে গণতন্ত্রের প্রায় অভিন্ন একটি সংজ্ঞা প্রদান করেন। যা বিশ্বের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বেশ জনপ্রিয়। আব্রাহাম লিংকন (Abraham Lincoln)  ১৯শে নভেম্বর, ১৮৬৩ তে তাঁর দেয়া প্যানসিলভানিয়া রাজ্যের (Pennsylvania state) গেটিসবার্গ বক্তৃতাতে (Gettysburg Address) গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছিলেন, ‘Government of the people, by the people, for the people.’ যার অর্থ দাঁড়ায়, গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য।

 
কিন্তু দীর্ঘকালের পরিক্রমায় ও গণতন্ত্রের উত্থান-পতনে আব্রাহাম লিংকনের দেয়া এই সংজ্ঞায় মৌলিকত্বের ক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যত্যয় ঘটেছে। আর এটিকেই গণতন্ত্রের সঙ্কট হিসেবে আখ্যা দেয়া যেতে পারে।
     

বস্তুত বিগত দশকগুলোতে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ একেবারে প্রান্তসীমায় নেমে এসেছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের গণতন্ত্র চর্চার প্রেক্ষাপটে তা আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। যা তাবৎ গণতন্ত্রপ্রিয় ও শান্তিকামী মানুষের কপালে রীতিমত ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। কারণ, গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের শাসন বলতে যা বোঝায়, তা আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রায়ই উপেক্ষিত হয়ে আসছে। যদিও আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত বিভিন্ন পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থার মধ্যে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাই অধিক জনপ্রিয় এবং বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। তথাপি একথা বলতেই হয় যে, এই পদ্ধতির শাসন পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত নয়। কিন্তু গণতন্ত্রের কুফলের চাইতে সুফলই অধিক বলে মনে করাও স্বাভাবিক।  
     

দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে গণতন্ত্র সম্পর্কে মানুষের যথাযথ জ্ঞান, গণতন্ত্র মনস্কতার অভাব ও আত্মকেন্দ্রীকতা, বিশেষত আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে মারাত্মক সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকটটা আরও প্রবল এবং প্রকট। 
     

সাম্প্রতিক বছরগুলো বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে যেভাবে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে, তাতে গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো আর কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত থাকেনি। বরং ক্ষেত্র বিশেষে তার রকমফের হচ্ছে এবং হয়ে আসছে। তাই সঙ্গত কারণেই গণতন্ত্রের কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞাও এখন খুঁজে পাওয়া বেশ দুস্কর হয়ে পড়েছে। কারণ, স্থান, কাল ও পাত্রভেদে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পার্থক্যের বিষয় জোরালোভাবেই হচ্ছে পরিদৃশ্যমান।         
     

গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সর্বোত্তম শাসনব্যবস্থা স্বীকার করেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে, তার পেছনে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কারণ আজকাল বহুদেশেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। গণতন্ত্রের নামে বহু ক্ষেত্রে স্থান করে নিয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা, গণবিরোধীতা ও আত্মপুজন ইত্যাদি নানাবিধ গণতন্ত্র বিরোধী অনুসঙ্গ।
     

আরোও সহজভাবে বলতে গেলে বিশ্বের তাবৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে বিস্তর ফারাকের বিষয়টি এখন রীতিমত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে এর বিচ্যুতিটাও রীতিমত চোখে পড়ার মতো। তাই গণতন্ত্রের সংজ্ঞার প্রশ্নটি এখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও বহুল আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে।  
     

বিগত কয়েক দশক ধরে গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ণ-বিষয়ক গবেষণা, আলোচনা, পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণে, গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও গণতন্ত্রের প্রকৃতি নিয়ে ব্যাপকভাবে চর্চা, আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ফলাফল আমাদেরকে কোন সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দিতে পারেনি। ফলে গণতন্ত্রের ব্যাপ্তী, পরিসর ও অবয়ব একেবারে খোলাসা করা সম্ভব হচ্ছে না।
     

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে দুটি প্রধান ধারার অস্তিত্ব বিদ্যমান। প্রথমটিতে গণতন্ত্রকে বিবেচনা করা হয় একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে, যা নির্দিষ্ট ‘নির্বাচনী’ ও ‘পদ্ধতিগত’ মানদন্ড অর্জনে সক্ষম। অপর ধারাটিতে গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ণকে সমাজে কতগুলো সঠিক গণতান্ত্রিক ‘সাংস্কৃতিক’ উপাদান অর্জিত হওয়ার নিরিখে বিবেচনা করা হয়। পদ্ধতিগত গণতন্ত্রের ধারণার জনক হিসেবে জোসেফ শম্পেটার'ই স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব।  
     

চেক অর্থনীতি ও সমাজ বিজ্ঞানী জোসেফ শম্পেটার ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত গ্রন্থ 'ক্যাপিটালিজম, সোশ্যালিজম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি'তে গণতন্ত্রকে বর্ণনা করেছেন নেতৃত্ব নির্বাচনের ব্যবস্থা হিসেবে। শম্পেটার লিখেছেন, ‘The democratic method is that institutional arrangement for arriving at political decisions in which individuals acquire the power to decide by means of a competitive struggle for people’s vote’. ‘গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হচ্ছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেখানে জনগণের ভোট পাওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা লাভ করে’। (শম্পেটার, ১৯৫০: ২৬৯)।
     

সহজ কথায় শম্পেটারের কাছে গণতন্ত্র হলো, যারা সিদ্ধান্ত নেবে তথা সমাজ-রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করবে, তাদেরকে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা (শম্পেটার, ১৯৫০: ২৯৬)। এই সংজ্ঞায় পদ্ধতিগত দিকটিই যে প্রাধান্য পেয়েছে তা খুবই সুস্পষ্ট।
     

গণতন্ত্রের এই পদ্ধতিগত ধারণাকে রবার্ট ডাল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'পলিয়ার্কিঃ পার্টিসিপেশন অ্যান্ড অপজিশন'-এ বিস্তারিত ও সম্প্রসারিত পর্যালোচনা উপস্থাপন করেছেন। রবার্ট ডাল পদ্ধতিগত গণতন্ত্রের সুস্পষ্ট নির্ধারকের তাগিদ দিয়ে বলেন যে, বহুজনের শাসনব্যবস্থার কতগুলো মৌলিক উপাদান রয়েছে। সেগুলো হলোঃ সরকারে সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত কর্মকর্তা থাকা; নিয়মিত, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন; সব পূর্ণবয়স্কের ভোটাধিকার এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; সরকার বা কোনো একক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমন উৎস থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ, সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার স্বাধীনতা। ডালের এই বক্তব্য থেকে একথা স্পষ্ট যে, বহুজনের শাসন হলো শাসনব্যবস্থার জন্য কতগুলো প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতির সমন্বিত রূপ। ডালের এই সংজ্ঞা বা বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে বিস্তর সমালোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও গুণাগুণ বিচারে এগুলোই বহুল আলোচিত ও প্রচলিত মানদন্ড। শুম্পিটার ও ডালের এই মানদন্ডকে গণতন্ত্রের পদ্ধতিগত (Procedural) এবং সবচেয়ে সীমিত (Minimalist) সংজ্ঞা বলা হয়ে থাকে।
       

চুলচেরা বিশ্লেষণে গণতন্ত্র বলতে জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন বা স্বশাসনকেই বোঝায়। এর মাধ্যমে জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিজেদেরকে শাসন করে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও একবিংশ শতাব্দীর সূচনার মধ্য দিয়ে বিশ্বে গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা এতেও কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের সংকট দেখা দিতে শুরু করছে এবং তা ক্রমবর্ধমানই বলতে হবে। গণতন্ত্রের বহু ত্রুটি-বিচ্যুতি বর্তমান সময়ে গণতন্ত্রমনা মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলছে। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগটি হলো এর মাধ্যমে জনরঞ্জনবাদী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তাধারাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে নির্বাচনে জয়লাভ করে। বিষয়টি আমাদের দেশের জন্য বেশ যুৎসই বলতে হবে।
     

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র বলতে কেবল নির্বাচনকে ও জনগণের ভোটাধিকারকেই মনে করা হয়। কারণ, একটি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যসহ যে সকল বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায়, তা কেবল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু এই সম্ভাবনা যতটুকু থিওরিটিক্যাল, প্রেকটিক্যালি আকসার তার উল্টোটাই পরিস্ফুট বলে প্রতিভাত হচ্ছে।  
     

মূলত গণতন্ত্রের সাফল্যের প্রথম এবং প্রধান শর্তটির নাম নাগরিকদের সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলা; মানুষকে গণতন্ত্রমনা, চিন্তাশীল ও আত্মসচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করা। গণতন্ত্রকে সফল ও সার্থক করতে আরো কয়েকটি শর্ত যেমন, রাজনৈতিক সচেতনতা, মানুষের অধিকার সচেতনতা, স্বাধীনতা, সাম্য, আইনের শাসন প্রয়োজন হলেও শিক্ষার সম্প্রসারণ ব্যতীত তা অর্জন সম্ভব নয়। 
     

এক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা বেশ প্রকট। এ বিষয়ে একজন মধ্যযুগীয় শাসক, সাধারণত যাদেরকে অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের প্রতিনিধি বলে ধারণা করা হয়, তাঁর অভিব্যক্তি কিন্তু প্রানিধানযোগ্য। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলে যে, তিনি তার রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন ? তার সাদামাটা জবাব ছিল, তিনি তার দেশের প্রতিরক্ষার জন্য প্রভূত সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাল্টা প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য কী কাজে আসবে ? তার ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ জবাব-  জাতি শিক্ষিত হয়ে উঠলেই তারা আত্মসচেতন হয়ে উঠবে। আর আত্মসচেতন মানুষই হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী অনুসঙ্গ।
   

বাস্তবতা কিন্তু তা ই। মূলত শিক্ষাই একজন নাগরিককে পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো নিজ বিচার-বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন করার মাধ্যমে ত্যাগ, সহানুভূতি, স্বার্থহীনভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের সেবা, নিয়মানুবর্তীতা, কর্তব্য পরায়ণতা ও ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। শিক্ষার মাধ্যমেই নাগরিকের মানসিক, নৈতিক ও মূল্যবোধের স্ফূরণ ঘটে। তাই গণতন্ত্রের জন্যও নাগরিকদের প্রস্তুত করতে শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অনস্বীকার্য। বর্তমান সময়ের গণতন্ত্রের সাফল্যে বাধাসৃষ্টিকারী নানা সমস্যাসংক্রান্ত আলোচনায় শিক্ষার প্রসঙ্গটি অব্যক্ত ও অবিবেচিত রয়ে যাচ্ছে। আসলে আমরা এখনও সমস্যার কেন্দ্রেই পৌঁছতে পারিনি। মূলত গণতন্ত্রের সঙ্কটটা তো সেখানেই।
     

প্রাচীন গ্রিসে প্লেটো ও এরিস্টটল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিলেন। কারণ, তৎকালীন গ্রিসে কেবল যোদ্ধা ও ভূমির মালিকদের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হতো। এরা ছিল মোট জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ। অন্যদের অধিকাংশই ছিল অশিক্ষিত। প্লেটো তার `Republic’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘প্রশাসন হলো এমন একটি কলা যা সাধারণ মানুষের দ্বারা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। শুধু বুদ্ধিমান ও যোগ্য মানুষের পক্ষেই প্রশাসনকে অনুধাবন করা সম্ভব।’ বস্তুত একজন মানুষকে অসাধারণ, বুদ্ধিমান ও যোগ্য করে তুলতে শিক্ষার আলো সম্প্রসারণের কোন বিকল্প নেই। আর কোন সমাজ-রাষ্ট্রের মানুষকে শিক্ষা ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করা গেলেই কেবল সে সমাজ-রাষ্ট্রে গণতন্ত্র সহ সকল ইতিবাচক প্রচেষ্টাই সফল ও সার্থক হয়ে উঠবে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রবক্তা জন স্টুয়ার্ট মিল গণতন্ত্রের প্রধান দু’টি শর্ত হিসেবে শিক্ষা ও উত্তম নৈতিক চরিত্রের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। মিল তার ''Considerations on Representative Government’’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘জনগণের জন্য সার্বজনীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পূর্বে সার্বজনীন শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।’
   

গণতন্ত্র বলতে কোনও জাতিরাষ্ট্রের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও তৈরীর ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তা প্রত্যক্ষ নয় বরং পরোক্ষ। আর একটি সফল ও সার্থক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা বাস্তবায়ন করতে হলে সুশিক্ষিত, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং সমঝদার জনগোষ্ঠী আবশ্যকতার বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না। 
       

আমরা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্যই এক সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার শর্তগুলো অপূরণীয় থাকায় স্বাধীনতার অন্যতম চেতনা ‘অবাধ গণতন্ত্র’ আজও আমাদের কাছে অধরাই রয়ে গেছে।  আমাদের দুর্ভাগ্যটা সেখানেই।
       

আসলে আমরা গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার নিয়ে অনেক লম্বা-চওড়া কথা বললেও নিজেরা যেমন গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠিনি, ঠিক তেমনিভাবে আমরা গণতন্ত্রমনাও নই। আর অন্তরে কদর্যতা নিয়ে শুধু গণতন্ত্র নয় বরং সুন্দর ও সুকুমারবৃত্তির চর্চাও সম্ভব নয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য যে ধরনের হওয়া দরকার, আমরা হয়তো আজও তার ধারের কাছেও নেই। মূলত শিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চাদপদতা, আত্মসচেতনা বিমূখতা, মূল্যবোধের সঙ্কট, সর্বোপরি অবক্ষয়ের জয়জয়কারটাই আমাদের দেশের গণতন্ত্রকে মারাত্মক সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। এজন্য এযাবৎ শাসন ক্ষমতায় যেসব রাজনৈতিক দল বা জোট অবস্থান করছিলেন বা করে আছেন, তারা যেমন দায়ী, ঠিক তেমনি জাতি হিসেবে আমরাও এ দায় এড়াতে পারি না।
       

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকরী ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে আজকের দিনে পৃথিবীর অনেকে দেশে গণতন্ত্র নামেমাত্র কার্যকর রয়েছে।
       

একটি দেশে বাহ্যত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সে দেশে গণতন্ত্র নাও থাকতে পারে। কিভাবে, বা কোন কোন বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণ দেখে অনুভব করা যেতে পারে যে বাস্তবে সেখানে গণতন্ত্র নেই? নিম্নে সেরকম কিছু লক্ষণ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। 
   

১। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন:
   

গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো গঠনের মূল বিষয় হচ্ছে নির্বাচন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে নির্বাচন হলো 'গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা' । সেই নির্বাচন হতে হবে এবং অবাধ ও স্বচ্ছ।
   

যে দেশে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি এবং জবরদখল হয়, যেখানে অর্থবল পেশীবল, প্রাক নির্বাচনী স্কিম ঘোষণা, শিলান্যাস, উদ্বোধন স্বাভাবিক বিষয়, সেটিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে নারাজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা 
   

২। ব্যক্তি অথবা একনায়কত্ব ও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বলে বিবেচিত হয়। কারণ তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে একই শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। আর আজকাল নির্বাচনে কারচুপি শুধু জাল ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়না, এর নানা দিক আছে।
   

লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের গবেষক ব্রায়ান ক্লাস বলেন, নির্বাচনের সময় অধিকাংশ ক্ষমতাসীন দল বা শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রতিন্দ্বন্দ্বিকে নানা কৌশলের মাধ্যমে নির্বাচনে অযোগ্য করে দেন। যার পরিণামে প্রকৃতার্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলক নির্বাচন আর হয়ে উঠে না। 
   

৩। জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা: 
   

গণতন্ত্রে জনগণের মতামতের প্রাধান্য একটি বড় বিষয়। একটি সরকার নির্বাচিত হলেই গণতান্ত্রিক হয়না। কিভাবে?
   

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে গণতন্ত্র না থাকলে, অথবা মজবুত প্রতিপক্ষ না থাকলে, ক্ষমতাসীন দল বা সরকার একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়। সুতরাং এরকম পরিস্থিতিতে জনগণের মতামতকে সহিংসভাবে দমনের চেষ্টা করা হয়। যার ফলে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার, তথা স্বতন্ত্র মতামত ব্যক্ত করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে।
   

গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে 'সিভিলিয়ান অটোক্র্যাট' বা 'বেসামরিক স্বৈরশাসক' বলে একটি কথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চালু আছে। যেখানে অনেক সময় গণতান্ত্রিক সরকারের চরিত্র দেখে অনেক সামরিক শাসকও লজ্জা পেতে পারে। 
   

৪। ভোটদান প্রকৃয়ায় জনগণের অংশগ্রহণে ক্রমহ্রাশ: যে দেশে প্রকৃতার্থে গণতন্ত্র প্রতিপালিত হয় না, সেখানে শাসকগোষ্ঠী নিয়মিত নানা ধরণের নির্বাচন অনুষ্ঠান করলেও সেসব নির্বাচনের প্রতি মানুষের কোনো আস্থা থাকেনা। ভোটাররা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। তারা ভোট দেবার জন্য ভোট কেন্দ্রে যেতে চায়না। আর আজকাল অনেক দেশে ভোট প্রকৃয়ায় NOTA (None of the above) ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হওয়াতে বিরাট সংখ্যক ভোটার ভোটপ্রার্থী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বির উপর ভরসা করতে না পেরে বহুল সংখ্যক ভোটার নোটা বটম ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি তাদের অনাস্থা ব্যক্ত করে থাকেন।
   

৫। সংসদ বা বিধান পরিষদ যখন হবে একদলীয়:
   

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে একটি দেশ যখন গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হবার দিকে ধাবিত হয়, তখন সংসদে ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে। কার্যত সংসদ বা বিধান মণ্ডলীতে কোনো বিরোধী দল থাকেনা।
   

৬। নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রসাশনের প্রভাব:
   

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো মজবুত না হলে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী তথা পুলিশ প্রশাসন নানা ধরণের আইন-বহির্ভূত কাজে জড়িয়ে পড়ে। কারণ, শাসক গোষ্ঠী তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিরাপত্তাবাহিনীকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং সাধারণ মানুষকে দাবিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করে।
     

৭। প্রসাশনিক প্রতিষ্ঠান সমূহের দূর্বলতাঃ 
     

গণতন্ত্রকে যথাযথভাবে কায়েম করতে হলে কিছু প্রতিষ্ঠানকে থাকতে হয় স্বাধীন, স্বতন্ত্র এবং নিরপেক্ষ। যেমন নির্বাচন কমিশন, তদন্তকারী সংস্থা সমুহ, সংসদ, বিচার বিভাগ ইত্যাদি। কিন্তু যখন একটি দেশে এসব প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত, ক্ষমতাসীন সরকারের বশংবদ হয়ে থাকে এবং সেগুলো ভঙ্গুর অবস্থার দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে বুঝতে হবে সে দেশে গণতন্ত্র সুস্থ অবস্থায় নেই।
     

৮। জনগণের মতপ্রকাশে ভীতিঃ
   

গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রকৃতার্থে কার্যকর না থাকলে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। এবং সেই ভীতিকর পরিবেশকে আরও। ভয়াবহ করে তোলে ক্ষমতাসীন সরকারের তল্পিবাহক পুলিশ ব্যবস্থা। এরকম ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমও স্বাধীনভাবে কাজ করতে ভয় পায়। সংবাদ মাধ্যমকে খুদকুড়ো ছিটিয়ে অনুগত তথা বশংবদ করে রাখা গণতন্ত্রের মুখোশধারী স্বৈরতান্ত্রিক সরকার সমুহের লেটেস্ট ট্রেন্ড-এ পরিণত হয়েছে। এমনকি আজকাল ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার- যেমন ইন্টারনেটের সুবিধাও খেয়ালখুশিমতো যত্রতত্র নিয়ন্ত্রণ করতে চায়,  যাতে করে মানুষ সেখানে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে না পারে, অবগত হতে না পারে বৃহত্তর সমাজ তথা দেশের হালহকিকত।
     

৯। দুর্নীতি মাথাচাড়া দেওয়া:
     

গণতন্ত্রের আড়ালে দলীয় বা ব্যক্তিগত একনায়কতন্ত্রে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্রয় করার জন্য এই দুর্নীতির ব্যবহার সবচাইতে ব্যাপকহারে হয়ে থাকে। প্রধানতঃ বিরোধীদের ক্ষমতার ধারেকাছে আসতে না দেওয়া, অথবা যেখানে বিরোধীরা ক্ষমতাসীন, তাদের মধ্যে প্রলোভনের ঘুটি বিস্তার করে ডিরুটেড করে দিতে লালসা আর দূর্নীতির বিশাল জাল গড়ে তোলা হয়ে থাকে। এই ব্যবস্থায় দুর্নীতি এমন সুন্দরভাবে সাজানো হয় যে, সেটি নিয়ন্ত্রিত হয় অতি সুক্ষ্মভাবে, ছলচাতুরীর মাধ্যমে। শাসকের অনুগত হবার বিনিময়ে বশংবদদের দুর্নীতি করার ব্যাপক সুযোগ করে দেয়া হয়।  ফলে দেশের সম্পদ কুক্ষিগত হয় দলদাসদের হস্তে। আর যেখানে সংশয় বা বেলাগাম হবার সম্ভাবনা, সেখানে দমন, ভীতি প্রদর্শন তো আছেই, রাষ্ট্রীয় শক্তির অপপ্রয়োগ আর বিভিন্ন সংস্থা লেলিয়ে দেবার ব্যাপার অতি স্বাভাবিক। 
   

১০। ক্ষমতা হারানোর ভয়ঃ 
   

লাগামহীন ক্ষমতা ভোগের মাধ্যমে যেমন ব্যক্তির মধ্যে স্বৈরাচারী মনোভাব গড়ে উঠে, তেমনি লাগাতার একদলীয় শাসন কায়েম থাকলে সেখানে গড়ে উঠে দলীয় স্বৈরতান্ত্রিক। এরকম পরিস্থিতিতে একনায়ক শাসক অথবা সুদীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা দলীয় কর্মী তথা কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর ভয় ভীষণভাবে ত্রস্ত করে তোলে। আশঙ্কা থাকে ক্ষমতা হারানোর পর প্রতিপক্ষ প্রতিশোধ নিতে পারে। সুতরাং যেনতেন প্রকারে চাই ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা! এই শঙ্কা থেকে জন্ম নেয় নানা ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি- যা একটি গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর জন্য মোটেও সুখকর হয় না । 
   

গণতন্ত্রের এসব সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ আলোচনার পর দুঃখজনকভাবে একথা প্রতিভাত হয় যে এসব লক্ষণের অনেকটাই আজ আমাদের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত। যদি সংবিধানের আধারে আমাদের গণতন্ত্রকে সমুন্নত এবং সুরক্ষিত রাখতে হয়, তাহলে তার জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে আমাদের সরকারকে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের স্বাতন্ত্র্য তথা সুরক্ষা বিধান করা। 
   

নির্বাচনী পরিকাঠামো নিয়ে আমাদের দেশে অভিযোগের অন্ত নেই। ইভিএম আর ব্যালট পেপারের মতানৈক্য তো রয়েছেই, তার চাইতে বড় কথা নির্বাচন প্রকৃয়ায় যে বিশাল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে, তা যে আর কোনও লুকোনো কথা নয়। 
   

তাছাড়া বাহুবল পেশিবল এসবের মাধ্যমে ভোটারদের বিপথগামি করা তো আছেই। 
   

মজবুত বিরোধী দলের অবস্থান গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার অন্যতম শর্ত, যা আজ আমাদের দেশে কেমন যেন কর্পূরের মতো হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। সংসদ বিধাসভাগুলোতে যখন কোনো দলের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত থাকে, তখন গণবিরোধী আইন কানুন পাশ করা বামহাতের খেলায় পরিণত হয়। যার বহু প্রমাণ আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। 
   

প্রসাশন, বিশেষ করে পুলিশ প্রসাশন যদি সরকারের বশংবদ ফোর্সে পরিণত হয়, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত হওয়া দূরের কথা, বরং লাই পেয়ে পেয়ে পুলিশি সন্ত্রাস শুরু হয়ে যায়। এর নজির ও আমরা প্রত্যক্ষ করছি। 
   

গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রের এক অপরিহার্য অঙ্গ। সকল সমালোচনা কেবল বিরোধিতার জন্য করা হয় না। সমালোচনা মানেই বিরোধিতা নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে সচেতন বুদ্ধিজীবী জনতা সরকারের দোষত্রুটি তুলে ধরেন। জনমত থেকে ফিডব্যাক নিয়ে সরকার বা শাসক গোষ্ঠী নিজেদের সংশোধন করে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে আরও সুদৃঢ় করে তুলতে পারে। কিন্তু তা না করে যদি সমালোচনাকারী মাত্রেই বিরোধী বিদ্বেষী ধরে নিয়ে আলোচকদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নিতে সরকারী ব্যবস্থাপনা সাম্প্রতিক কালে অহরহ ভেসে আসছে। 
   

এভাবে বহুক্ষেত্রেই আমাদের প্রতিবেশে নিত্যদিন এমন কিছু কাজকর্ম ঘটে চলেছে,যা সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচায়ক বলে বিবেচিত হতে পারে না। কিন্তু এসব নঞর্থক কার্যক্রম প্রতিরোধ বা নিরসন করার দায়িত্ব মুখ্যত সরকারের। গণতান্ত্রিকভাবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠন করা একটি সরকার চাইলে যেমন কঠোর হাতে দমন করতে পারে সকল প্রকার স্বৈরাচারিতা, তেমনি প্রশ্রয় দিলে গড়ে উঠতে পারে গণতান্ত্রিক বিপন্নতা। 
   

তাই কামনা করবো, বিশেষ করে আমাদের দেশের জনগণ নিজেদের জন্য নিজেরা যে সরকার গঠন করেছেন, সেই সরকারের সকল কর্মসূচি গড়ে উঠুক গণমুখী হয়ে। মনে রাখতে হবে গণতন্ত্রে জনগণের রায়ই শেষ কথা। 
     

পরিশেষে গণতন্ত্র প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের তিনটি কথা উল্লেখ করে শেষ করছি এই আলোচনা। তিনি বলেছেন-  প্রথমত, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে হলে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র কতটা উৎকর্ষ লাভ করলো, সেই বিতের্ক না গিয়েও এর বিকাশের প্রতিই নজর দেওয়া জরুরি। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রে আলোচনা ছাড়া কিছু সম্ভব নয়।