রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ই-কমার্সের হাত ধরে কোন পথে আমরা ?

 

রাহুল রায়

Rahul%20Roy_edited.jpg

একটি বড় গ্রামের বাজার । নিত্য প্রয়োজনের জিনিষ থেকে বিলাসবহুল সামগ্রী কম বেশি সবই এখানে পাওয়া যায় । গ্রামের মানুষ তাঁদের সবধরণের কেনাকাটা সেই বাজার থেকেই করে । গ্রামের বাজারে যে সব কিছু পাওয়া যায় তা না, দোকানীরা পার্শ্ববর্তী শহর থেকে এনে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেয় । গ্রামের প্রচলিত নিয়ম মতে বাইরের দোকানীরা গ্রামে এসে দোকান খুলতে পারতো না কারণ এর ফলে গ্রামের স্থানীয় দোকানীদের স্বার্থক্ষুণ্ণ হতো । বাইরের দোকানীরা দেখল গ্রামে প্রচুর মানুষের বাস । অর্থনৈতিক ভাবে তাঁদের অবস্থা খুব ভালো না হলেও খারাপ না । সেই গ্রামের বাজার যদি দখল নেওয়া যায় তাহলে তাঁদের ব্যবসার প্রভূত লাভ হবে । তারা গ্রামের বর্তমান নীতিনির্ধায়কদের নিজেদের পাশে টানতে শুরু করল । সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ কোনো নীতিই বাদ গেল না । ধীরে ধীরে গ্রামের বাজারের অবরুদ্ধ দরজা বহিরাগতদের জন্য খুলে যেতে লাগল । মুক্ত অর্থনীতি, ভোক্তার ক্ষমতায়নের কথা ক্ষণে ক্ষণে প্রচার করা হল । এতে অবশ্য গ্রামবাসীদেরও সুবিধা হল । বাইরের দোকানীদের থেকে সরাসরি জিনিষ কিনতে পারায় তারা তুলনামূলক কম দামে জিনিষ কেনার সূযোগ পেলেন । বাজার খুলে যাওয়ায় দোকানীদের কাছে তারা আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও পরিষেবা পেতে শুরু করলেন । মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে শুরু করল । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাইরের দোকানীরা নিত্যনতুন পসরা সাজিয়ে গ্রামের বাজার দখল নিতে শুরু করল । তাঁদের ঝাঁ চকচকে দোকান, অনবরত ও সুকৌশলী প্রচার , আধুনিক পরিষেবা তথা সস্তা মূল্য খুব সময়েই মানুষকে তাঁদের দিকে টেনে আনতে শুরু করল । কিন্তু সমস্যা হল অন্যদিকে । একদলের উত্থান অন্যদলের জন্য পতনের বার্তা দিতে শুরু করল । স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সরাসরি আক্রান্ত হলেন । কম পুঁজি, সাধারণ মানের প্রচার, স্থানীয় মানের পণ্য ও পরিষেবা তাঁদের ক্রমশঃ পেছনের দিকে টানতে থাকে । তাঁদের ব্যবসা ও আয় কমে আসতে শুরু করে । যার ফলে একদিকে নতুন ব্যবসা, শিল্পের প্রতি স্থানীয়দের আগ্রহ কমে আসলো , অন্যদিকে পুরানো প্রতিষ্ঠিত দোকানীদের নাভিশ্বাস উঠতে শুরু করল ।

উপরে উল্লেখিত গ্রামের বাজারটা হল ভারতের বাজার ব্যবস্থা । ১৯৯০ সনের মুক্ত অর্থনীতির মুক্ত বাতাস ভারতের বাজার অনেক পরিবর্তন নিয়ে এনেছিল । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শিক্ষা , সরকারের উদ্যোগ ও সর্বোপরি ইন্টারনেট ব্যবস্থার আকাশচুম্বী উন্নতি ভারতের বাজারের চেহারাটাই বদলে দিয়েছে । এই কয়েক বছর আগেও যেখানে কিছু অতি শিক্ষিত মানুষের কাছেই ইণ্টারনেট নিয়ে ধারণা সীমাবদ্ধ ছিল আজ সেটা ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে । শিক্ষা ও কম্পিউটার ব্যবহারে সচেতনা একেবারে সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষকে আন্তর্জাতিক মানের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে । এই সুবর্ণ সূযোগ নিয়ে বহুজাতিক অনলাইন ভিত্তিক বানিজ্যিক সংস্থাগুলো । Amazon, Flipkart এর মতো কোম্পানীগুলোর ব্যবসা এতই বিস্তৃত যে এদের বাৎসারিক বিক্রি অনেক ছোটো দেশের জি.ডি.পি থেকেও বেশি । তারা তাদের বিস্তৃত পুঁজি , দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পরিক্ষিত কৌশলকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মধ্যে তাঁদের পণ্যের প্রতি আগ্রহ , বিশ্বাস বাড়াতে থাকেন । এক্ষেত্রে সরকারের প্রকল্পের সাহায্যও তারা যথেষ্ট পেয়েছে । ২০১৬ এর শেষ দিকে অতি সমালোচিত বিমূদ্রাকরণের সিদ্ধান্তের পর সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইন লেনদেনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা বেড়ে যায় । নানাবিধ প্রচার বাড়তে থাকে । এর ফলে সরাসরি লাভবান হয় অনলাইন কোম্পানীগুলো । তাঁদের ব্যবসার পসরা বাড়তে থাকে । ২০২০ এর শুরু থেকে এদেশে করোনার আগমন বাকিদের জন্য সর্বনাশের কারণ হলেও তাঁদের জন্য পৌষমাস হয়ে যায় । ঘরবন্দী মানুষ প্রয়োজন, অপ্রয়োজনে ইন্টারনেট ভিত্তিক কেনাকাটা বাড়িয়ে দেন । আগ্রহ অভ্যাসে পরিণত হতে সময় লাগে না, ভারতের মানুষেরও লাগে নি। লকডাউনের সময় মানুষের আয় অনেকটাই কমে আসলেও দেখা যায় ইন্টারনেট ভিত্তিক দোকানীদের ব্যবসা ২৫% বেড়ে যায় । বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন যে ২০২৪ পর্যন্ত এই বৃদ্ধির দর ২৭ শতাংশ থাকবে । তাঁরা বলছেন ওই সময়ের মধ্যে ভারতে ইন্টারনেট ভিত্তিক ক্রেতার সংখ্যা ২২ কোটি ছাড়িয়ে যাবে । ২০২৭ থেকে ২০৩০ এর মধ্যে মোট বানিজ্যের ৩৭ শতাংশ তাঁদের দখলে চলে যাবে । মুক্ত বানিজের আবহে স্বাধীনভাবেই সবল ব্যবসার বিস্তার হবে, দুর্বলরা ছিটকে যাবে । বাজার অর্থনীতির এটাই নিয়ম আর এখানে এটাই হবে ।

এখন প্রশ্ন হল এই মুক্ত বানিজ্যের অর্থনীতির ধ্বজা নিয়ে দুর্বার গতিতে এগানো এই নতুন বানিজ্যপন্থায় দেশের ও দেশের মানুষের কি লাভ হবে । উত্তরটা দিতে সময়ের পরিসরটাকে ভাগ করতে হবে । প্রথমে আসা যাক ক্রেতাদের কথায় , Amazon, Alibaba, flipkart এর মতো বহুজাতিক সংস্থাগুলোর কাছে মানুষ যায় কারণ সেখানে মানুষ তুলনামূলক কম দামে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও পরিষেবা পেয়ে যান । সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পসরা দেখে , সামগ্রীর বৈশিষ্ট্য বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় । তবে একটা জিনিষ এখানে অবশ্য লক্ষণীয় যে ইন্টারনেট ভিত্তিক কোম্পানীগুলোও কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হচ্ছে । তাঁর প্রতিযোগীতায় পেরে উঠতে পারছে না । বিক্রিও হচ্ছে । Flipkart এর প্রতিষ্ঠাতা ভারতীয় হলেও পরবর্তীতে আমেরিকান কোম্পানী Walmart  তা কিনে নেয় । বাজারে প্রতিযোগীর সংখ্যা সীমিত হয়ে আসলে দাম ও মানের বর্তমান সুনাম এই কোম্পানীগুলো বজায় রাখতে পারবে কি না সেটা আজকের দিনে বড় প্রশ্ন । যদি না পারে তাহলে খদ্দেররা অত্যন্ত ক্ষতিকারক একচেটিয়া বাজারের অভিশাপ বহন করতে বাধ্য হবেন ।

তবে স্থানীয় বাজারের অংশীদারী যেভাবে ইন্টারনেট ভিত্তিক বাজার উদরপূর্তি করছে এতে আগামী দিনে বাজারের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে উঠবে । বাজারের অবস্থা খারাপ মানে বেকারত্ব বৃদ্ধি । ইতিমধ্যে বেকারত্বের দিক থেকে স্বাধীন ভারতের মারাত্মকতম অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে । চাকরী নেই, একরকম বাধ্য হয়েই অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন । বেশি দূর যাওয়ার দূর নেই, নিজের বাড়ির পাঁচশত মিটার পরিসীমা ঘুরে আসলেই নিত্যনতুন গজিয়ে ওঠা দোকানের ভিড়ে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যায় । এই অবস্থায় মুক্ত অর্থনীতির ধ্বজাবাহী অনলাইন ব্যবসার রমরমা তাঁদের পক্ষে অচিরেই বিষময় অসহায় পরিবেশ সৃষ্টি করছে । এই নতুন ব্যবসায়ে যে চাকরী সৃষ্টি হচ্ছেনা তা নয় কিন্তু সেটা হাতেগোনা বড় বড় শহরের সীমাবদ্ধ থাকছে । অন্যদিকে ছোটো শহরগুলোতেো চাকরী সৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু যে পরিমাণে স্থানীয় বাজার আক্রান্ত হচ্ছে সেই তুলনায় এই চাকরীর সংখ্যা নগণ্য বলতে হয় । আগামী দিনে বহুজাতিক দোকানীদের পসরা ও বাজারের বিস্তৃতি যখন আরো বাড়বে তখন পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা বোধহয় আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কল্পনাও করা সম্ভব না । মুক্ত বানিজ্যিক পরিবেশ সৃষ্টির নামে অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা আত্মঘাতী হয়ে উঠতে সময় লাগবে না ।