রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

সিলেট অন্তর্ভুক্তি ও বিযুক্তির রাজনীতি: 
আসামের অর্থনীতিতে প্রভাব
বিধায়ক দাশ পুরকায়স্থ
ভাষান্তর - জয়দীপ ভট্টাচার্য
১৬ - ২৮ জুন ২০২১

বিধায়ক দাশ পুরকায়স্থ পেশায় প্রযুক্তিবিদ।

পেশাগত দায়িত্ব ছাড়াও তিনি সমাজ কর্মী, প্রাবন্ধিক ও বিভিন্ন পত্র পত্রিকার নিয়মিত লেখক হিসেবে সুপরিচিত।

তার এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে swatantramag.comএ ২০ জানুয়ারি ২০২১ এর সংস্করণে।

প্রাসঙ্গিকতা বিচারে এটির বঙ্গানুবাদ এখানে প্রকাশিত হল। দুই পর্বের লেখা একসাথে  ...

 পর্ব ১ 

 

১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা সুবা ও সিলেট (করিমগঞ্জ সহ) এর দেওয়ানি অধিগ্রহণ করে। কাছাড়ের অধিগ্রহণ করা হয় ১৮৩২ সালে। সিলেট বা শ্রীহট্টের ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি একটি বিস্তীর্ণ উপত্যকা যা দুদিকে পার্বত্য অঞ্চল দ্বারা পরিবৃত। এর উত্তরে রয়েছে খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড়, পূর্বে কাছাড়, দক্ষিণে পার্বত্য ত্রিপুরা ও পশ্চিমে  ময়মনসিংহ ও তিপ্পেরা জেলার কিছু অংশ।১৮৭৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আসামকে তৎকালীন বাংলা থেকে বিছিন্ন করে পৃথক আসাম চিফ কমিশনারের অধীনে নিয়ে আসা হয়। নতুন নাম দেওয়া হয় নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স যার রাজধানী হিসেবে শিলংকে বেছে নেওয়া হয়।

 

এই প্রবন্ধে আমরা আসামের সাথে প্রথমে সিলেটের অন্তর্ভুক্তি ও পরে নাটকীয়ভাবে বিযুক্তি, যার অন্যতম কারণ হিসেবে এটির অর্থনৈতিক ঘাটতিকে উল্লেখ করা হয় তার সত্যতা বোঝার চেষ্টা করব। সত্যিই কি সিলেট জেলার ব্যায়ভার আয় থেকে বেশি ছিল, যেমনটা তখন বলেছিলেন গোপীনাথ বরদলৈ? এবং এই ভূমিকে এভাবে পরপর তিনবার বিভাজিত করে কি এই অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীকে এক ভয়ঙ্কর এবং দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়নি ? 

 

আসলে চা পাতার আবিস্কারই কিন্তু প্রথম সিলেট জেলার উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করে। এ নিয়ে এক উন্মাদনার সৃষ্টি হয় এবং অনেকেই এই নতুন পণ্য নিয়ে রাতারাতি বড়লোক হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ব্রিটিশ শাসক টি.আর লার্কিনস এই চা-পাতা আবিষ্কারকে "সব আডডভেঞ্চার এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ আডভেঞ্চার" বলে উল্লেখ করেছিলেন। চা আবিষ্কারের আগে বৃটিশ শাসকরা কোনো পার্বত্য অঞ্চলকে তাদের আওতাধীন এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করতে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু চা আবিষ্কার তাদের নীতিগত অবস্থান বদলে দেয়। লন্ডনের "টাইমস" পত্রিকাতে ১৮৫৮ সালে লেখা হয় 'আমাদের নীতি এখন পরিবর্তিত হয়েছে ..... কিছু লোক আবার ঔপনিবেশিক দখলদারি এবং চাগাছ রোপনের পনের দিবাস্বপ্ন দেখছেন, ফলে আমাদের এলাকার সীমানার সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে ।'

প্রথমদিকে আবাদকারীদের মধ্যে চা গাছের জমির উপযুক্ততা নিয়ে মতানৈক্য ছিল এবং অনেকেই ভাবতেন যে সিলেট অঞ্চলের জমির গুণগত বৈশিষ্ট্য চাপাতা আবাদের জন্য উপযোগী নয়। পরে মাটির গুণমান বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশ্লেষণ করে তারা নিশ্চিত হন যে পাহাড়ের পাদদেশে যেখানে গভীর জঙ্গল রয়েছে, যেখানকার আবহাওয়া উষ্ণ ও আর্দ্র  এবং যেখানে চা দেশীয় ভাবে উৎপন্ন হয় সেই চা- ই সর্বোৎকৃষ্ট।(১)


এটা মনে রাখতে হবে যে সিলেট জেলার মাটি ও আবহাওয়া সবকিছুই উপরোক্ত শর্তগুলোকে পূরণ করছে। তাই এই অঞ্চল চাপাতা উৎপাদনের জন্য আদর্শ অঞ্চল হিসেবে খ্যাতি লাভ করতে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সিলেট জেলার আসামে অন্তর্ভূক্তির দাবিও জোরদার হতে শুরু করে। যদি তৎকালীন আসাম সরকারের প্রতিনিধি মিঃ পি বথামের গোপন চিঠির বক্তব্য খতিয়ে দেখা যায়, তাহলে এটা জলের মতো পরিস্কার হয়ে যায় যে সেইসময় সিলেটকে আসামে অন্তর্ভূক্তির পেছনে অনেকগুলো কারণের মধ্যে তৎকালীন চা আবাদকারীদের এই প্রাথমিক পর্বে প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান করা ও তাঁদের স্বার্থে কাজ করা একটি অন্যতম কারণ ছিল। এই ব্যাপারে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ৩০ শে অক্টোবর, ১৯২৪ সালে লেখা গোপন চিঠিতে বিশদে জানান। তিনি লেখেন 'বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে তার থেকে আংশিকভাবে যদি আসামকে বিভাজিত করা হয় তবে তা প্রশাসনিক তথা রাজনৈতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।যদি এটি থেকে কিছু অঞ্চল ও বাসিন্দাকে কমিয়ে দেওয়া হয় তবে এটাকে ভবিষ্যতে গভর্নরের এলাকা (Governor's Province) হিসেবে মান্যতা দেওয়া যাবে কিনা তাতেও ‌সন্দেহ রয়েছে ।'(২)

তাই ১৮৭৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই নতুন প্রভিন্স তৈরি হয় মূল আসাম, কাছাড়, গোয়ালপাড়া, গারো হিলস এবং বাংলার আরো কয়েকটি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই এলাকার রাজস্ব আদায় আশানুরূপ ছিল না কিন্তু প্রথম পর্যায়ে এতে সিলেটকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ঔপনিবেশিক শাসকরা এরপর এই প্রভিন্সকে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ং সম্পূর্ণ করার জন্য এটির সীমানা পুনর্নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এবং মূলতঃ সেই উদ্দেশ্যেই ১৮৭৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাঙালি অধ্যুষিত জনবহুল সিলেট জেলাকে এর সাথে সংযুক্ত করা হয়, এই নতুন প্রভিন্স তৈরি হওয়ার ছ'মাসের মধ্যেই। সিলেটকে আসামের সাথে এই জুড়ে দেবার ফলে আসামের সীমানায় এক নতুন বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি হয়। যেহেতু অচিরেই সিলেট প্রশাসনিক স্তরে বাংলা ও আসামের সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয় ফলে পরবর্তী ১৮৭৪ থেকে ১৯৪৭ সাল অব্দি তা আসামের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা হয়ে ওঠে এবং আসামের সুস্থিতি, বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য প্রায় অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সিলেট তৎকালীন আসাম ও বাংলার সাথে জলপথে যুক্ত ছিল, এমনকি রেলওয়ে লাইন পত্তনের পরও। এই জেলা দিয়ে আসাম ও বাংলার মধ্যে তুলনামূলক সল্পদূরত্বের জলপথটি জনপ্রিয় হওয়ায় সিলেট ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক ভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং এই জেলাকে আসামে অন্তর্ভূক্তির পিছনে এটাই ছিল অন্যতম কারণ।

উল্লেখিত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে ১৮৭৪ সালে আসাম চিফ কমিশনার প্রভিন্স তৈরির পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রথমতঃ চা আবাদকারীদের স্বার্থে তাদের জন্য একটি একচেটিয়া এলাকা তৈরি করা। দ্বিতীয়ত আসামের অর্থনীতিকে সক্ষম করা। তৃতীয়ত বাংলার লেফটেন্যান্ট জেনারেলকে এরকম একটি বড় প্রদেশ পরিচালনার দায় থেকে আংশিক ভারমুক্ত করা এবং চতুর্থতঃ উত্তর পূর্বাঞ্চলের উপজাতিদের সমস্যাকে আরো দক্ষতার সাথে এবং কার্যকরীভাবে সমাধান করা।

উল্লেখ্য, ১৯৪৬ সালের ১ এপ্রিল ক্যাবিনেট মিশন আসামের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈর একটি সাক্ষাৎকার নেন। বরদলৈ এতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে জোর দেন এবং প্রতিটি প্রদেশ ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে তৈরি হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে আসামের সবসময়ই এক স্বতন্ত্র ও পৃথক পরিচিতি রয়েছে এবং সেজন্য ভারতের ভবিষ্যত সংবিধানে এই অঞ্চলকে একটি সম্পূর্ণ প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। তার এই মতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তিনি সিলেট জেলাকে আসাম থেকে বিযুক্ত করার দাবিও জানান।(৩)

 

বরদলৈ ক্যাবিনেট মিশনকে বলেন যে সিলেট একটি ঘাটতি জেলা। এই জেলাকে পূর্ব বাংলার সাথে যুক্ত করে দেওয়া হোক।(৪)

 

কিন্তু এরপর মাউন্টব্যাটেনের নীতি গৃহীত হওয়ায় আসামে দলবিরোধী আন্দোলনে ইতি পড়ে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে ওঠে সিলেট গণভোট। আসামের নাগরিকরা এই গণভোটের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। কারণ, তারা এর মাধ্যমে দুই পৃথক জনগোষ্ঠীর মানুষের কৃত্রিম বা চাপিয়ে দেওয়া মিলন এবং একটি ঘাটতি জেলাকে বয়ে বেড়াবার দায় থেকে মুক্তি পেতে চাইছিলেন।(৫)

সিলেট ও আসামের একত্রীকরণকে বৃটিশ ভারতে প্রথম বাংলা বিভাজন হিসেবে ধরা উচিত কারণ এটা এক বৃহৎ সংখ্যক বাংলাভাষী নাগরিকদের প্রভাবিত করে এবং এর ফলে তাঁরা আত্মীয় পরিজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিভাজনে প্রভাবিত লোকের সংখ্যার দিকে তাকালে ব্যাপারটি পরিস্কার হয়ে ওঠে। নবগঠিত এই আসাম প্রভিন্স এর মোট জনসংখ্যা হয় ৪১,৩২,০০১৯ এবং মোট এলাকার পরিমাণ হয় ৪১,৭৯৮ বর্গমাইল।(৬)

 

১৮৭২ এর আদমসুমারি থেকে বাংলার তিনটি জেলা- সিলেট, কাছাড় ও গোয়ালপাড়া (যা ১৮৭৪ এ আসামে অন্তর্ভুক্ত হয়)-র জনসংখ্যার হিসেব পাওয়া যায়। সিলেটের মোট এলাকা ছিল ৫,৪৪০ বর্গমাইল এবং মোট জনসংখ্যা ১৭,১৯,৫৩৯ জন। কাছাড় জেলার মোট এলাকা ছিল ৩,৭৫০ বর্গমাইল ও জনসংখ্যা ২,৫,০২৭। গোয়ালপাড়ার মোট এলাকা ছিল ৪,৪৩৩ বর্গমাইল ও জনসংখ্যা ছিল ৭,৭৭,৭৬১ জন। এই তিন জেলা মিলিয়ে তাই মোট জনসংখ্যা ছিল ২৭,০২,০২৭ জন এবং মোট এলাকা ১৩,৬২৩ বর্গমাইল।(৭)

 

কাজেই সেই সময়ের হিসেবে এই ধরনের এক বৃহৎ সংখ্যক লোককে যদি শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, এবং তাদের বসবাসের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে যদি বিভাজিত করে দেওয়া হয় তবে তাকে দেশভাগ ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে ? এই ঘটনা তাই অবিভক্ত ভারতে প্রথম দেশভাগ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত।

 

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বর্ণহিন্দুদের ক্ষমতা হ্রাস করে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা, যাকে কংগ্রেস রাজনীতি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো যেতে পারে, তাকে উৎসাহিত করতে বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ নেন। পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ তৈরি হয় ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর, যার আয়তন ছিল ১,০৬,৫৪০ বর্গমাইল ও জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি,১০ লক্ষ। কিন্তু, এই দেশভাগ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি কারন এতে বিভিন্ন দিক থেকে প্রচণ্ড বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে এবং সেই চাপে অবশেষে ১৯১২ সালে একে ভেঙে দেওয়া হয়। আসামকেও আবার কমিশনারের অধীনস্থ প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কাজেই এটা বলা হয়তো অন্যায় নয় যে বৃটিশ ভারতে ১৯০৫ সাল থেকে পরবর্তী এই সাতবছর সময়সীমার জন্য আসাম ও পূর্ব বাংলার বিভাজনকে ঐতিহাসিক ভাবে দ্বিতীয় দেশভাগের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

সবশেষে স্বাধীনতার প্রাক্কালে সিলেট জেলাকে আবার দেশভাগের শিকার হতে হয় গণভোটের মাধ্যমে। যদিও সিলেটকে পাকিস্তানে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল গনভোটের (বিভিন্ন কায়েমী গোষ্ঠীর স্বার্থে) ফলাফলের ভিত্তিতে, কিন্তু এর পেছনে তৎকালীন কংগ্রেস হাইকমান্ডের উদ্দেশ্য কিন্তু ছিল বাঙালি জনগোষ্ঠীকে বিভাজিত করা এবং আসামের প্রত্যেক ক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্য ও ক্ষমতায় রাশ টানা। এবং এই বিভাজনকে তাই অবশ্যই তৃতীয় দেশভাগ হিসেবে গণ্য করা উচিত।

এই প্রবন্ধের অবশিষ্ট পর্বে আমি ১৮৭৪ থেকে ১৯৪৭ সাল সময়সীমায় সিলেট জেলার অর্থনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরার চেষ্টা করব যাতে পাঠকেরা আসামের সাথে এই জেলার "অন্তর্ভুক্তি ও বিযুক্তির" রাজনীতিকে নিজেরাই অনুধাবন করতে সক্ষম হন।

 

 

 পর্ব ২ 

১৮৭০ সালে সিলেটের জলপথে যান চলাচলের তথ্য থেকে তখনকার বাণিজ্য সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা করা যেতে পারে। শেষ রিপোর্ট অনুযায়ী সিলেট থেকে যেসব পণ্য মূলতঃ রপ্তানি হত তা হল - চা, চূনাপাথর, সর্ষবীজ, পাট, পশুর চামড়া, শুকনো মাছ, শীতল পাটি, সর্ষের তেল, মাছের তেল, লেবু, আলু, তুলা, ঘি, মাদুর, বাঁশ, রাবার, কমলালেবু, মোম, হাতির দাঁত, এবং মধু। স্টিমার, দেশি নৌকা ও স্থলপথে এগুলোর রপ্তানি মূল্য ছিল ২৯,০৯,৩০৩ পাউন্ড থেকে ৫,৯৭৫,৫০০০ পাউন্ডের মধ্যে। চা এবং চূনাপাথরের রপ্তানি মূল্য ছিল যথাক্রমে ২,৮৫,৬৭৮ পাউন্ড ও ৭৯,০৩২ পাউন্ড।(৭) আমদানি কৃত পন্যের মধ্যে মূখ্য ছিল কাপড়, মশলা, লবন, তামাক, চিনি, সোনা, রুপা, গুড় এবং পানীয়। ১৮৭০ সালে আমদানির জন্য মোট খরচের পরিমাণ ছিল ৯,৮৭,৯৩৫ পাউন্ড থেকে ৪৪,০৭,৫৫৭ পাউন্ড।(৮)


ওপরের  তথ্যাগুলো  থেকে এটা দেখা যাচ্ছে যে ১৮৭০ সালে সিলেট জেলার মোট উদ্বৃত্ত রাশির পরিমাণ ৪৯,৭১৪ পাউন্ড অর্থাৎ এই জেলা থেকে রপ্তানিকৃত পণ্যমূল্য আমদানির দ্রব্যমূল্য থেকে অনেক বেশি ছিল। ঔপনিবেশিক শাসকের খাতায় রাজস্ব আদায়ের দিক থেকে এই জেলা উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে গন্য হয়েছিল। Tea Cultivation of Sylhet & Assam বইতে এইচ.বট্টাম উল্লেখ করেছেন যে এই জেলা থেকে সরকারি লভ্যাংশ ১৮৭৩ সালে ছিল ৪.৯৫১ শতাংশ যা ১৮৭৪ সালে হয় ৬.৫৫০ শতাংশ এবং ১৮৭৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭.৩০৩ শতাংশ। কাজেই এটা বলা যেতেই পারে যে ১৮৭৪ সালে যখন সিলেট আসামে অন্তর্ভুক্ত হয় তখন এটি প্রচুর সম্পদ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে একটি সম্পন্ন জেলা হিসেবে মান্যতা লাভ করেছিল।

এবারে আসুন আমরা ১৮৭৪ এর পর থেকে এই জেলার অবস্থান বোঝার চেষ্টা করি। ১৮৭৬ সালে সুরমা উপত্যকার বাঙালিদের দ্বারা প্রথম 'জয়েন্ট স্টক কোম্পানি' প্রতিষ্ঠিত হয় যার নাম ছিল 'কাছাড় নেটিভ জয়েন্ট স্টক কোম্পানি'। চা ব্যাবসার ক্ষেত্রে এটাই প্রথম দেশজ কোম্পানি এবং তার শুধু আসাম নয় বাংলায়ও। লিপ্টন টি কোং লিমিটেড এর সূত্র অনুযায়ী ১৯০৩ সাল অব্দি ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় চা শিল্পে মোট বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৩৫,০০০,০০০ পাউন্ড।(৯) ১৮৯৩ সাল অব্দি সিলেটে উৎপাদিত চায়ের মূল্য ছিল ২০,৬২৭,০০০ পাউন্ড যা সেই সময়ের শিবসাগর জেলার উৎপাদনের সমতুল্য ছিল। কিন্তু ১৯০০ সালে সিলেটের উৎপাদন মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫,০৪২,০০০ পাউন্ড যা তখনকার আসামের অন্যান্য যে কোন জেলার উৎপাদন মূল্য থেকে ৪,০০০,০০০ পাউন্ড বেশি ছিল।(১০) উইলিয়াম হান্টার প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ১৮৭৬ - ৭৭ অর্থবর্ষে চাল ও পাট রপ্তানি থেকে সিলেট জেলার মোট আয় হয়েছিল ৯,৪৩,৬৩১ পাউন্ড।(১১)


১৮৮০ সালে 'ভারত সমিতি' নামে সিলেটে প্রথম দেশীয় ব্যাবসায়িক উদ্যোগ প্রতিষ্ঠিত হয় যা পঞ্জিকৃত হয় ১৮৯৫ সালের ২০শে আগস্ট। এতে অনুমোদিত মূলধন (authorised capital) ৫,০০,০০০ টাকা, গ্রাহক মূলধন (subscribed capital) ১,৭৭,৫০০ টাকা এবং প্রাপ্ত মূলধন (paid up capital) ১,০০,৪৭৫ টাকা ধার্য্য করা হয়েছিল। ১৮৯৬ সালের ১০ এপ্রিল 'ইন্দেশ্বর টি এন্ড ট্রেডিং কোং' নামে সিলেটের আরেকটি উদ্যোগের পঞ্জিকরণ করা হয়েছিল যার অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ছিল ১,০০,০০০ টাকা, গ্রাহক মূলধন ১,০০,০০০ টাকা এবং প্রাপ্ত মূলধন ৮৮,৭৮৫ টাকা।(১২)

এরপর সিলেটের স্থানীয় উদ্যোগপতিরা ১৯১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি 'অল ইন্ডিয়া টি কোম্পানি লিমিটেড' নামে আরেকটি পঞ্জীকৃত উদ্যোগে তৈরি করেন যার অনুমোদিত মূলধন, গ্রাহক মূলধন ও প্রাপ্ত মূলধন ছিল যথাক্রমে ১,০০,০০০ টাকা, ৮,৪৭,৫০০ টাকা ও ৭,১০,৯৮৫ টাকা।(১৩)


যদি একটি জেলা আর্থিক ভাবে অক্ষম হত তবে তার প্রভাব সর্বত্রই দেখা যেত এবং সেই ক্ষেত্রে এই জেলায় পরপর এরকম বৃহৎ ব্যাবসায়িক উদ্যোগের জন্ম হতে পারত কি?

১৮৯৭-৯৮ অর্থবর্ষে শিবসাগর জেলায় চা আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল ৭৫,৯৪৫ একর, যা আসামের জেলাওয়াডি  হিসেবে ছিল শীর্ষ অবস্থানে। সিলেটের স্থান ছিল দ্বিতীয়, চা আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল ৭১,৬৬০ একর। চা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও শিবসাগর জেলার স্থান ছিল প্রথম, দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিলেট জেলা।(১৪) ১৯২১-২২ অর্থবর্ষের তথ্য অনুযায়ী সারা আসামে দেশীয় স্টক কোম্পানির সংখ্যা ছিল ২৯, যার মধ্যে ২৩ টি পঞ্জীকৃত হয়েছিল সিলেট থেকে, ৩ টি কাছাড় এবং বাকি ৩ টি অন্যান্য জেলা মিলিয়ে। এই কোম্পানি পঞ্জীকরণের এর তথ্য থেকে নিঃসন্দেহে সিলেট জেলার তৎকালীন আর্থিক সাচ্ছল্যের ব্যাপারটি অনুধাবন করা যায়।

২৪শে জুলাই, ১৯১৭ সালে আসামের কৃষি বিভাগের ডিরেক্টর জে. ম্যাক সাহানি উল্লেখ করেন - ' চা শিল্পের সম্ভাবনা এতদঅঞ্চলে উজ্জ্বল বলেই প্রতিভাত হচ্ছে, যা একের পর এক চাবাগান খোলার উদ্যোগের মধ্য দিয়েই ধরা পড়ছে। সিলেট জেলায় চা শিল্পে ভারতীয় পুঁজির বিনিয়োগ উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।' (১৫)

চা শিল্প ছাড়াও সিলেটের জয়েন্ট স্টক কোম্পানি গুলো কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন ব্যাঙ্কিং, পরিবহন, বিমা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ছাপাখানা, কাপড় কল, করাত কল, চিনির কল, তেলের কল, ডেয়ারি, পৌল্ট্রি, নির্মাণ শিল্প, রিয়াল এস্টেট ইত্যাদি শিল্পেও তাদের ব্যাবসার পরিধির বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। ১৮৯৭ সালে নিউইয়র্ক টাইমস এ একটি সাক্ষাৎকারে মি. থ্যাকারে জানিয়েছেন যে তৎকালীন সিলেট হাতির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। হাতি এবং চূনাপাথরের ব্যবসা তার ভাগ্যই বদলে দেয়, এবং এরফলে তিনি ধনী ও সম্পন্ন ব্যাক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।(১৬)


সিলেটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম প্রতিনিধি উইলিয়াম মেকপিস ঠাকরে সেযুগে সিলেটের আর্থিক সম্ভাবনা নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। তিনি লেখেন, সিলেটের চূনাপাথর বা' চূনম' এর চাহিদা প্রচণ্ড কারণ ভারতীয় উপমহাদেশের আর কোথাও এই পাথর সিলেটের মতো বিশুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় না। সিলেট চূনাপাথরের রপ্তানিতে অগ্রগণ্য ছিল। যেহেতু চূনাপাথর কোলকাতা শহরে দূর্গ বা অন্যান্য অট্টালিকা নির্মাণের ক্ষেত্রে অপরিহার্য ছিল ফলে এটি একটি লাভজনক পণ্য ছিল।(১৭)

১৮৮২ খৃষ্টাব্দে ইন্ডিয়ান জেনারেল নেভিগেশনে কোম্পানি এবং রিভার স্ট্রিম নেভিগেশনে কোম্পানি কর্তৃক  কাছাড় সুন্দরবন জলপথে যোগাযোগ সাধিত হবার পরই পরিবহন ক্ষেত্রে সিলেটে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়।(১৮) আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের মূখ্য নিরীক্ষকের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে ১৯০৫ -০৬ অর্থবর্ষে সিলেট থেকে রেলযোগে ৯,১৪৯,৪৯৮.৬ কেজি চা রপ্তানি হয়েছিল। বিপরীতে সমস্ত উজান আসাম থেকে রপ্তানিকৃত চায়ের পরিমাণ ছিল ৭,৬৫০,০৯৫.২ কেজি।(১৯) তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সিলেট থেকে রপ্তানির পরিমাণ অন্য যে কোনও জেলা থেকে বেশি ছিল এবং ফলে সিলেট জেলার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও অন্য জেলার তুলনায় বেশি ছিল।

১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর লেখা এক চিঠিতে পূর্ব বাংলা ও আসামের কৃষি বিভাগের যুগ্ম অধিকর্তা জানান ' যথারীতি সুরমা উপত্যকা ব্লক এবারও ধানের মূখ্য রপ্তানিকারক এবং ঢাকা ব্লক এই পণ্যের মূখ্য আমদানিকারী। '(২০)

১৯৫১ সালের জন গণনা রিপোর্টে বলা হয় যে দেশভাগের ফলে আসাম নগণ্য এক ভুখণ্ড (মোট জমির আট ভাগের এক ভাগ) এবং তিনভাগের এক ভাগ জনগণকে হারিয়েছে। কিন্তু তার সাথে সিলেট জেলার এক বিস্তৃত এলাকা যা ধান-জমি, চা আবাদ, চূনাপাথর ও সিমেন্ট শিল্পের প্রাচুর্যের জন্য সমৃদ্ধ ছিল তাও হারিয়েছে। এবং এই ক্ষতির সুদূরপ্রসারী প্রভাব আগামী অনেক বছর ধরে আসাম ও বৃহত্তর ভারতের অনুভূত হবে।(২১)
 
একই আশঙ্কার কথা শোনা গেছে শুক্লা কমিশনের রিপোর্টেও। ১৯৯৭ সালের এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ' দেশভাগের ফলে বহির্সীমানার মাত্র দুই শতাংশ ভুমিখণ্ড বাকি ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ায় উত্তর পূর্বাঞ্চলকে এক ব্যাতিক্রমী অসুবিধাজনক পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে .....যা জম্মু ও কাশ্মীর ছাড়া কোনো ভু-খণ্ডের সাথে তুলনীয় নয়, এর ফলে এখানকার প্রচলিত বাজার ব্যাবস্থা এবং চিরাচরিত যোগাযোগ পরিকাঠামো সবকিছু বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং এই  সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার ফলে এই অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবাক্ষেত্রে ব্যায় জাতীয় মানের অনেক ওপরে , অন্যদিকে পরিবহন ভর্তুকিও এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। '
 
ঐতিহাসিক ডেভিড লাডেন (David Ludden) লিখেছেন ' এক্ষেত্রে দেশভাগ যেভাবে যোগাযোগের প্রচলিত পথ ও এই নতুন সীমান্তের দুই পারে যাওয়া আসার প্রক্রিয়াকে নাটকীয়ভাবে শেষ করে দিয়েছে বিশ্বের প্রায় কোথাও এমনটা দেখা যায়নি। বাংলা-আসাম রেলপথটিকে ১৯৬৫ সালে কাছাড়-সিলেট সীমান্তে বন্ধ করে দেওয়া হয় যার ফলে ঢাকা-লন্ডনের মধ্যে যোগাযোগ ঢাকা গৌহাটি যোগাযোগ থেকে সহজ হয়ে পড়ে।(২২)

 

উপরোক্ত তথ্যাবলী থেকে এটা বোঝা যায় যে বিদেশি এবং ভারতীয় উভয় শাসকগোষ্ঠীর জন্য এই ভু-খণ্ডের সাধারণ নাগরিকদের কীভাবে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ধাপে ধাপে চলা এই দেশভাগ প্রক্রিয়ায় আপাত যতি পড়ে ১৯৪৭ সালে কিন্তু এই অসম্পূর্ণ এজেন্ডা, বিস্তৃত প্রভাব নিয়ে এখনো বহমান। একই প্রতিক্রিয়া আজও চলছে শুধু স্লোগান পাল্টেছে, রাজনীতির ধরন পাল্টেছে, কিন্তু হেনস্থা আর নিপীড়ন কিন্তু চলছেই। আসামকে সিলেট এবং সিলেটিদের থেকে মুক্তি দিতে গিয়ে আঞ্চলিকতা ও উগ্র ভাষিক জাতীয়তাবাদ দ্বারা প্রভাবিত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অভিজাত শ্রেণি তাদের নিজস্ব জমিকে ত্যাগ করতেও কুন্ঠা বোধ করেন নি, সেই জমি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্বচ্ছল জেনেও। যে ভুখণ্ডকে প্রায় "সোনার হাঁস" বলা চলে তাকেই তাঁরা উপহার দিয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানকে। ট্র্যাজেডি এটাই যে সিলেট ভাগজনিত এই সুদুরপ্রসারী আর্থিক বিপর্যয়ের প্রভাব আসাম আজও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যদি এই জেলা আসামের অন্তর্ভুক্ত থাকত তবে আজ আসামের অর্থনীতির চেহারা ভিন্ন হতে পারত।

তথ্যসূত্র -

১) Govt of Assam, Report on Tea operations in the Province of Assam,1873-74, Shillong ,P - 10
২) IOR/V/11/1976, Letter from Govt of Assam ,No.Pol-1917-5685 dtd 30th October,1824
৩) Political History of Assam ,Bhuyan and De ,Vol lll ,P - 338
৪) For further details readers can consult ,Manserg,Ed no.36, Vol 7 , London 1978,P 38-44
৫) Political History of Assam , Bhuyan and De ,Vol - lll , P -389
৬) W.W Hunter , Statistical Account of Assam , Vol l ,P - 1

৭)W.W Hunter , Statistical Account of Assam , Vol l ,P - 17,259,361

৭/৮) A . Hunter , Statistical Account of Assam ( Sylhet ) P 306/ 307
৯) Lipton Ltd ,All About Tea , London 1903,P 7
১০) B.C Allen , Sylhet ,P 135-136
১১) W.W.Hunter , Statistical Account of Assam,Vol ll , London 1879, Sylhet ,P 306
১২) অচ্যুৎ চরণ  চৌধুরী তত্বনিধি  , শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত ,পৃ. ২৪
১৩) Chowdhury,Smriti & Pratiti,P 122
১৪) Report on Tea Culture of Assam ,1898,P 1
১৫)Report on Tea Culture of Assam ,1898,P 2
১৬) Thackeray, The New York Times, 6th February, 1897
১৭) Thackeray - Ancestors of his who were fighters &: Administrators in India , New York Times ,6th February,1897
১৮) Chowdhury - Smriti & Pratiti  P 122
১৯) Govt.of Assam - Report on the rail & river borne trade of the province of Assam for the year ending 31st March 1906, Shillong ,P 4
২০)Govt. of Eastern Bengal & Assam, Report on the trade carried by Rail & River, 1909-10 ,P 5
২১) Census Report of India ,1951,P 2 - 15
২২) Ludden 2003 : 21