রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ভাবনায় নির্বাচন ২০২১
পর্ব ২
বিষয় : "কাকে বলা হবে অসমিয়া : একটি নির্বাচনকালীন সুলুকসন্ধান"
সুরজ গগৈ, সোনেশ্বর নরহ (ভাষান্তর - জয়দীপ ভট্টাচার্য)
১৪ মার্চ ২০২১ 
 
দেখতে দেখতে এসে পড়লো ৫ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন।
আসামের নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়েছে ২৭ মার্চ, ০১ এপ্রিল এবং ০৬ এপ্রিল।
বরাক উপত্যকায় নির্বাচন আগামী ০১ এপ্রিল ২০২১।
আসন্ন নির্বাচন কে সামনে রেখে "ঈশান কথা" পুরো মার্চ মাস ধরে আপনাদের সামনে তুলে ধরবে এই ধারাবাহিক
"ভাবনায় নির্বাচন ২০২১"
যাতে থাকবে নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক,
বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকা মানুষ এবং ছাত্রছাত্রী দের ভাবনাচিন্তা, মত-অভিমত, অথবা বিশ্লেষণমূলক লেখা ...
আজ পর্ব ২ ...
Soneswar%20Naraha_edited.jpg
Suraj%20Gogoi_edited.jpg

একটি ভাষিক জনগোষ্ঠীর সদস্য হতে গেলে কি সেই ভাষায় কথা বলাটাই যথেষ্ট ?  বিশিষ্ট অসমিয়া জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিত্ব অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরী (১৮৮৫ -১৯৬৭) কিন্তু তেমনটাই ভাবতেন। তাই তৎকালীন পূর্ববঙ্গ  থেকে আগত অভিবাসী দের তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন অসমিয়া ভাষায় কথা বলার জন্যে। তিনি ভাবতেন কেউ অসমিয়া সত্তার সাথে একীভূত হয়ে পারে একমাত্র এই ভাষায় কথা বললেই। কিন্তু অসমিয়াদের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা যে ভিন্নপথে প্রবাহিত হয় ইতিহাস কিম্বা সাম্প্রতিক এন আর সি প্রক্রিয়া থেকে তা স্পষ্ট। এসব থেকে বোঝা যায় যে শুধু অসমিয়া কথ্য ভাষা হলেই কেউ অসমিয়াদের সমস্তরে উন্নীত হবার যোগ্যতা অর্জন করেন না, এর জন্য ভিন্ন সাংস্কৃতিক মানদণ্ড নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়।

অসমিয়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে অম্বিকাগিরি নিঃসন্দেহে এক সংকীর্ণ এবং স্বার্থপর দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। অসমিয়া জনগোষ্ঠীর উপাদান বা অন্তর্নিহিত শক্তি কাঠামো এবং রসায়ন যা দিয়ে গোষ্ঠীর বিশেষত্ব তৈরি হয় তা নিয়ে তার মনে কোনো প্রশ্নচিহ্ন ছিলনা। তার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এই জনগোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা বাড়ানো এবং সেজন্যই সবাইকে অসমিয়া ভাষা আত্মস্থ করার ডাক দিয়েছিলেন তিনি। এটা কি সংখ্যালঘু হয়ে যাবার মনস্তাত্ত্বিক ভয় থেকে ?

আদমশুমারি থেকে প্রাপ্ত আসামের বিভিন্ন ভাষাভাষীদের সংখ্যাগত তথ্য কিন্তু শিক্ষিত তথা নব্য অসমিয়া মধ্যবিত্তের মনে একধরনের আশঙ্কার সৃষ্টি ‌করেছিল। তাই অসমিয়া দের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার রাজনৈতিক ভাবনা তাঁকেও প্রভাবিত করেছিল। সেজন্যই অসমিয়া ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করে অসমিয়া জনগোষ্ঠীর অংশ হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন তিনি। সেই সময়কার অন্যান্য শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মতোই তিনিও এই ব্যাপারটি নিয়ে আশঙ্কায় ভুগছিলেন।

কাউকে একটি নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলতে প্ররোচিত করার পিছনে কিন্তু সর্বদাই কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িয়ে থাকে। এটা কিন্তু কিছু ব্যাপারে ইঙ্গিতবাহী। এক, হয় আপনি এই ভাষায় কথা বলুন নয় তো আপনি এই জনগোষ্ঠীর কাছে ব্রাত্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। দুই, যেহেতু আপনি এক্ষেত্রে  বহির্ভূত, ফলে আপনাকে বিভিন্ন নিপীড়নের সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা রয়েছে (সামাজিক বয়কট, হুমকি, ব্যঙ্গ বিদ্রূপ, শারীরিক নির্যাতন এমনকি জাতিবিদ্বেষ অব্দি)। তিন, শুধু ভাষা যদি একটি জনগোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় সেক্ষেত্রে তা সেই গোষ্ঠীর সামাজিক সাংস্কৃতিক ভিন্নতা এবং বহুত্বকে দমিয়ে দিতে বাধ্য। অম্বিকাগিরির আহ্বান তাই সেই আনুগত্যের আহ্বান যা কীভাবে অসমিয়া নামক জনগোষ্ঠীর পরিচিতিকে অভিন্ন ও একমুখী করার চেষ্টা হতে পারে, একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব কিভাবে তার ভাষাকে ঘিরে প্রবাহিত হতে পারে তার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করছে।

 

আফ্রিকার বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবে এক জায়গায় লিখেছিলেন - ' যখন কোন ভাষার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপ করা হয়, তাকে সত্য থেকে বিচ্যুত করা হয়, মানবজাতির উপর তখনই ভয়াবহতা নেমে আসে। '


বিভিন্ন অসমিয়া জাতীয়তাবাদী নেতারা অসমিয়া ভাষা ও সংস্কৃতি হুমকির মুখে বলে ভয় দেখান। এগুলো রাজনৈতিক শ্লোগান ছাড়া আর কিছু নয় যদিও এই ধরনের মন্তব্য অসমিয়াদের আবেগকে ভীষণ ভাবে নাড়া দেয়। এবং এই আবেগকে রাজনৈতিক আনুগত্যে রূপান্তরিত করে তারা লাভবান হন। তাই এই খেলা চলতেই থাকে।

অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতির উপর হুমকি বলে যা বোঝানো হয় সেই দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে কিন্তু সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে যদি আমরা অসমিয়া সংস্কৃতির গভীরে চোখ ফেরাই, যদি বিশ্লেষণ করি সেইসব ভিন্ন সত্ত্বাকে যা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে "অসমিয়া" নামক সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব। কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন যে কেনো আসামের বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠী থেকে বারবার সার্বভৌমত্বের  দাবি উত্থাপিত হয়? এসবের পিছনে শুধু প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে রয়েছে বলে কি তা উড়িয়ে দেওয়া যায়? এটা যে তাদের স্বশাসনের আকাঙ্ক্ষা প্রসূত নয়, তা কি হলপ করে বলা চলে? প্রথমত অসমিয়া সংস্কৃতির অংশ বলে খ্যাত এইসব জনজাতিরা উচ্চবর্ণ অসমিয়া মধ্যবিত্ত আধিপত্যবাদের বিপক্ষে গিয়ে নিজেদের জন্য স্বায়ত্তশাসন দাবি করছেন। কারণ তাঁরা বিচ্ছিন্ন, অপমানিত  এবং  অসমিয়া সাংস্কৃতিক চেতনায় তাদের সমদৃষ্টিতে দেখা বা সমগুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। মিসিং, কার্বি, বোড়ো, সনোয়াল-কাছাড়ি, দেউরি ইত্যাদি জনজাতি গোষ্ঠী সম্পর্কে উচ্চবর্ণ অসমিয়াদের সামগ্রিক উপলব্ধি কিন্তু অসমিয়া পরিচিতির একীভূত চরিত্র বা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে প্রতিভাত করেনা। "অসমিয়া" - এই সামগ্রিক পরিচিতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে এই ধরনের বৈপরীত্যকে বিশ্লেষণ করলে কেউ সহজেই বুঝতে পারবেন যে কীভাবে অসমিয়া সংস্কৃতি ভিতর থেকেই অসুস্থ ও দেউলিয়া হয়ে আছে।

এটাই সেই আশঙ্কা যার প্রতিধ্বনি শোনা গেছিল ঔপন্যাসিক আচেবের মন্তব্যে। এই আশঙ্কা এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপট কিন্তু বহুদিন ধরে তৈরি করেছেন অসমিয়া জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দরা। বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে কেউ যে অসমিয়া সংস্কৃতিতে অন্তর্লীণ হতে পারেন এই সত্যকে তারা কখনো ধীরে ধীরে, কখনো জোর খাটিয়ে ধারাবাহিক ভাবে চাপা দেবার চেষ্টা করেছেন। বিষ্ণু রাভা বা জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা যেভাবে চেয়েছিলেন, তাঁরা অসমিয়া সংস্কৃতি তথা অস্তিত্বের সেই অন্তর্ভুক্তি মূলক উদারবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়েছেন অথবা তাকে বিকৃত করে প্রচার করেছেন। এই বিচ্যুতি কিন্তু ধরা পড়েছিল ইতিহাসবিদ অমলেন্দু গুহের চোখে, এবং তিনি এর বিরুদ্ধে ছিলেন। অসমিয়া সংস্কৃতির বিকাশে যে এই অঞ্চলের অন্য ভাষিক গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে সেই সত্যকে অস্বীকার করে তাদের অনেক দুরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এক পুরুষালী জাতীয়তাবাদের উত্থান আমরা দেখতে পাই, যে জাতীয়তাবাদ একদিকে "বহিরাগত" ইস্যুতে অতি স্পর্শকাতর আবার অন্যদিকে জনজাতি, আদিবাসী বা অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে সমগুরুত্ব দিতে অস্বীকার করছে, তাদের মানুষ বলেই গণ্য করছে না। এইসব অ-সাংস্কৃতিক চরিত্র, যাকে আগরওয়ালা "দুষ্কৃতি" বলে অভিহিত করেছিলেন, যা অসমিয়া সমাজে অন্তর্দ্বন্দ্বের মূলে, আজ তাঁদেরই বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছে স্থানীয় এবং জাতীয় স্তরে। এই সত্য আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।

জয়িতা শর্মা সহ বিভিন্ন ইতিহাসবিদ বারবার উল্লেখ করেছেন যে আসামের কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন ও বর্ধিত উৎপাদনের পিছনে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে আগত কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এই অঞ্চলের আর্থ- রাজনৈতিক উন্নয়নে আদিবাসী এবং চা জনজাতিরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁরা উদ্বৃত্ত তৈরি না করতে পারলে এই অঞ্চলে চা শিল্পের উত্থান এবং তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতনা। মিসিং জনগোষ্ঠীর আত্মনির্ভরশীল চরিত্র এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে তাদের অবদান সর্বজনবিদিত কারণ  কৃষি ক্যালেন্ডার যা তাঁরা "আউশ চাষ" এর জন্য মেনে চলতেন তা আসামের সমতলবাসী অন্য গোষ্ঠী থেকে ভিন্ন ছিল। ফলে তাদের মাধ্যমে এই রাজ্যে কৃষিপণ্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হত। এইসব গোষ্ঠী, অসমিয়া সংস্কৃতির বিকাশে যাদের অসামান্য অবদান রয়েছে তাদের কেনো সামগ্রিক অসমিয়া চেতনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়না, কেনো ব্রাত্য করে রাখা হয়?

 

মোদ্দা কথা হল - তাহলে কে অসমিয়া? বা কীভাবে কেউ অসমিয়া হতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আদমশুমারির তথ্য থেকে এনআরসি সেবা কেন্দ্র অব্দি এক দীর্ঘ যাত্রাপথ ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। এবং অবশ্যই এটা প্রমাণিত যে শুধু অসমিয়াতে কথা বললেই সবাইকে অসমিয়া হিসেবে সমদৃষ্টিতে দেখা হবেনা বা তিনি যে বৃহত্তর অসমিয়া সমাজে অন্তর্ভুক্ত হবেন তেমন কোন গ্যারান্টি নেই।

আসন্ন আসাম বিধানসভা নির্বাচন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রেক্ষাপট হয়ে উঠতে পারে। আশা করতেই পারি আমাদের সাংস্কৃতিক মানদণ্ড কে আবার নতুন করে ভাবার, পর্যালোচনা করার সুযোগ এনে দেবে এই নির্বাচন। 

 

কে জানে, হয়তো এই  নির্বাচনকে সামনে রেখে সুস্থ বিতর্কের পরিসর আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে সুস্থ সামগ্রিক সমাজ গঠন প্রক্রিয়ায় দিকে।