রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

সুরমা বরাকে উনবিংশের লুসাই অভিযান : একটি পর্যালোচনা


পর্ব ১-৪ (সম্পূর্ণ প্রবন্ধ একসাথে)
বিবেকানন্দ মোহন্ত 
৬-২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

 

এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গে ২০১১ সালে।
এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি চার পর্বে আবার ঈশান কথায় প্রকাশিত হচ্ছে। সম্পূর্ণ প্রবন্ধ (৪ পর্ব) একসাথে...

Vivekananda Mohanta_edited.jpg

 পর্ব ১ 

 

এক

মধ্যযুগের পূর্বকুল প্রদেশ, ঔপনিবেশিক পর্বের লুসাই এবং উত্তর আধুনিক পর্বের মিজোরাম - পুর্বোত্তরের ধলেশ্বরী, সোনাই, টিপাই, সিংলা, লঙ্গাই ও কর্ণফুলী বিধৌত গোটা পার্বত্য প্রদেশটি একসময় সুরমা-বরাকের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক মানচিত্রের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে প্রবল প্রত্যাহ্বান স্বরূপ পার্বত্য প্রদেশটি প্রাকৃবিটিশ পর্বে সময়াসময় ত্রিপুর-অধীনে থাকলেও সে দেশের রাজনৈতিক উথান-পতন তখন পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করত অববাহিকা ভিত্তিক চিফটেইন সাম্রাজ্যকেও। সাময়িকভাবে সুপ্ত হয়ে থাকা 'হাকুথুম্‌ সংস্কৃতি'র (১) ঢেউ তখন আছড়ে পড়ত প্রতিবেশী সমতলীয় পরিসরে, যার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকেনি সুরমা-বরাক সহ সমতল ত্রিপুরা | বিশিষ্ট মিজো চিন্তাবিদ Prof. Sangkima লুসাই প্রদেশ সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে জানান- .... the present Mizoram, then known as Lushai Hills, was a Terrain cognits (Terr-incognita?) inhabited by savage people who knew only raids and plunders... (২)

 

প্রাকব্রিটিশ পর্বের ঘটনাবহুল দিনগুলোর আবছা চিত্র আমরা দেখতে পাই ব্রিপুর রাজমালা কিংবা কাছাড়ি রাজাদের লিখিত গোপীচন্দ্রের পাঁচালী প্রভৃতি গ্রন্থে। কিন্তু ঔপনিবেশিক পর্বে সে চিত্রটির বিস্তৃত রূপ আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন লেখায় ও সরকারি নথিপত্রে, যেগুলো পরবতী প্রজন্মের অনুসন্ধিৎসু পাঠক, গবেষকদের কাছে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে সমাদৃত। ব্রিটিশপর্বে স্থায়ী লাঙ্গল ভিত্তিক সমতলীয় পরিসরের জনবিরল হয়ে পড়ার প্রবণতা রোধ এবং পার্বত্য প্রদেশটির এক সুনির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক মানচিত্রের রূপরেখা তৈরী করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসকরা প্রধানত যে মাটিকে ভিত্তি করে কঠোরতর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেই পরিসরটিই অর্থাৎ সমতল বরাক উপত্যকা, ব্রিটিশের প্রয়োজনেই চিরন্তন পরিচিতি হারিয়ে এক সংকীর্ণ পরিসীমায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল শত আন্দোলন সত্বেও ৷ সমতলীয় ওই পরিসরের ফেলে আসা দিনগুলির কথকতা নিয়েই এ আলোচনার অবতারণা।

দুই

উত্তর গোলার্ধের 22 degree 18 inches - 24 degree 19 inches উত্তর অক্ষাংশ এবং 92 degree 16 inches - 93 Degree 02 inches পূর্ব দ্রাঘিমাংশের অন্তর্বতীঁ ৭২২৭ বর্গমাইল এলাকা বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চলটির অধিবাসীরা মূলত পুরনো বা আদি কুকি (Old Kuki), নতুন কুকি (New Kuki) এবং পরবর্তী সময়ের লুসাই। ইন্দোমঙ্গোলয়েড শাখার প্রবজননশীল উপজাতি (Migratory Tribes) গোষ্ঠীর এ অঞ্চলে আগমন ঘটে খ্রিঃ দ্বিতীয় শতক থেকে ৷ আদি কুকিদের ক্রমাগত বিতাড়িত করে শক্তিশালী নতুন কুকি গোষ্ঠী। পরবর্তীতে চিন হিলস্‌ (দঃ মায়ানমার) থেকে এ অঞ্চলে প্রবেশ করে আরও প্রবল শক্তিশালী গোষ্ঠী, 'লুসাই' বা 'লুসি' হিসেবে যার পরিচিতি।

নবাগত লুসাইরাও ক্রমান্বয়ে তাড়িয়ে দেয় নতুন কুকিদের। মিজো চিন্তাবিদ Prof. Lalrimawia-র মতে আদি কুকি দলভুক্ত উপজাতিরা হল -- রাঙ্খল, বেতে, মার (Hmar) এবং তাদের শাখা-প্রশাখা। নতুন কুকি অন্তর্গত উপজাতিরা হলো -- থাডো (Thado), জাংসেন (Jangshen), পাইতে (Paites) এবং অন্যান্য শাখা-প্রশাখা। লুসাইরা এ অঞ্চলের সর্বশেষ প্রবজননশীল উপজাতি (the latest immigrants to the present Mizoram were Lushais who formed the bulk of the Mizo Population - Prof. Lalrimawia)।(৩) অষ্টাদশ উনবিংশে লুসাইরা পার্বত্য প্রদেশটির অধিকাংশ এলাকা তখন নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসে, বাৎসরিক শীতকালীন সমতল অভিযানের (Winter Raids) মাত্রাটিও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।

 

পার্বত্যজাতি হিসাবে আমরা 'লুসাই' বা 'লুসি' শব্দটির সর্বপ্রথম উল্লেখ পাই কর্নেল লিস্টারের ১৮৫৩ সালের প্রতিবেদনে। লুসাই জাতি সম্বন্ধে কর্নেল লিস্টারের অনুমান ছিল -- ‘... Lushai who appear to be a cross between the Kukies and Burmese ...’(৪)

 

তাঁর অনুমানের স্বপক্ষে বলতে গিয়ে তিনি জানান যে, ১৮২৪-২৫ সালে কাছাড়ে ব্রহ্মযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মান সেনাবাহিনীর এক বৃহত্তর অংশ পাকাপাকি ভাবে তিলাইন পাহাড়ে বসবাস শুরু করে। স্থানটি কাছাড়ের দক্ষিণ সীমান্তপ্রদেশ। কুকিরা প্রধানত যাযাবর জাতি, কোনও জায়গায় ২/৩ বছরের বেশি সময় থাকে না। কিন্তু লুসাইরা সে তুলনায় স্থায়ী এবং তাদের ঘরদোরের নির্মাণশৈলী অপেক্ষাকৃত স্থায়ী ধরণের, তাই তারা Settled tribes এর পর্যায়ভুক্ত। এটিই তাদের পৃথক করে রেখেছে কুকি জাতি থেকে। তাছাড়া কুকি সর্দার (চিফ) বারমুলিন এর সেনাবাহিনীতে ৩০০ জনের অধিক বার্মিজ সৈন্য ছিল।(৫)

 

লুসাই বার্মিজ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সাদৃশ্যের ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন Prof. Lalrimawia ও। 'Pre-historic & Historic Migration of the Mizos' শীর্ষক নিবন্ধে তিনি বলেন যে লুসাইরা বর্তমান মিজোরামে বসতি স্থাপন করার আগে কাবুই ভ্যালিতে ছিল এবং তখন উভয়ের মধ্যে গড়ে উঠেছিল নিবিড় সম্পর্ক । তার ভাষায় --

While living in Kabaw valley, the Mizoes might have a free mixing with the Burmese. This was clearly revealed by the similarity between many of the Mizo’s earlier games, musical instruments, dresses and those of the Burmese. Besides, the art of cultivating crops might had been learnt from the Burmese as most of their agricultural tools and implements or products had a prefix 'Kawi'.(৬)

 

উত্তর লুসাই হিলস এর Political Officer Mr. Mc. Cabe, ICS, ১৮৯২ সালে লুসাই প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে উপজাতি আক্রমণ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে লুসাই শব্দটির বিশ্লেষণ দিতে গিয়ে জানান যে -- "Lushai is a compound word, consisting of two component words : Lu (meaning 'head') and shai (meaning 'to cut'), the full meaning of which is the 'Head Cutter'.(৭)

 

এ প্রসঙ্গ উ্থাপন করে Prof. Sangkima 'লুসাই' শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তি সহকারে। তিনি লিখছেন, "Lushai is only an English Transliteration of the word ‘Lusei’, one of the major tribes who at the time of the British intrusion, dominently ruled the land under the tiele ‘Sailo’."(৮)

 

তিনি তাঁর যুক্তির স্বপক্ষে লুসাই প্রদেশে এক সময়ের Supdt. Major J. Shakespear এর উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। Shakespear লিখেছেন "Lushai is our way of spelling the word; the proper way to spell the word - is Lushei (Lusei)"।(৯)

 

Sangkima’র অনুমান, সম্ভবত কোন বিখ্যাত চিফ - এর নাম থেকে অথবা তাদের অধ্যুষিত কোনও স্থান থেকে লুসি (Lushei) শব্দটির উৎপত্তি হয়েছিল । |

 

তিন

 

'লুসাই' শব্দটির তাৎপর্য এবং উৎপত্তি নিয়ে মতান্তর থাকতে পারে, কিন্তু তাদের সংস্কৃতি নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই কারো। Prof. Sangkima মিজো কালচার সন্বন্ধে লিখতে গিয়ে অকপটে জানাচ্ছেন-

"As a matter of fact, Mizo’s were head-hunters before the coming of the British. But being a head hunting people and as a social group, they had their own established culture." (১০)

 

লুসাই কুকিদের মুণ্ডশিকার এর কারণ সম্বন্ধে C.E.Buckland জানান যে, মৃত সর্দারদের সমাহিত করতে গিয়ে সামাজিক রীতি অনুসারে মুণ্ড মালার প্রয়োজন পড়ত। অন্যদিকে এ সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারটি ছিল সামাজিক আধিপত্য বিস্তার, আভিজাত্য এবং যৌধেয় সমাজের শৌর্য-বীর্যেরও প্রতীক।


ডঃ জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্যের ভাষায় -- 

"The Head hunting, among these tribe, was an art of chivalry affording them the greatest delight and social distinction as a man’s importance was Calculated by the no. of skulls decorating his house and according to their custom the funeral of the chiefs required a certian no. of skulls." (১১)

উপরোক্ত সংস্কৃতিচর্চা কিংবা সামাজিক রীতিনীতির বিষয়টি কতদূর গ্রহণযোগ্য, সেটি সংশিষ্ট বিষয় নিয়ে যাঁরা গবেষণা কিংবা চিন্তার্চচা করেন তাঁদের বিচার্য বিষয়। কিন্তু আমরা সাধারণ পাঠক মনে করি যে, আবহমান কাল থেকে বিভিন্নি ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অনুশীলিত নরমেধ, প্রাণীমেধ উৎসর্গ সম্পর্কিত ব্যাপারটিই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এবং "অপরের আহুতির বিনিময়ে নিজের পুণ্য অর্জন"- ধর্মের মোড়কে লালিত এ বিধান অনুপজাতি-উপজাতি কোনও সম্প্রদায়ের কাছেই বরণীয় হতে পারে না।


যাই হোক, লুসাই কুকিদের এরূপ লোমহর্ষক ঘটনাবলীর অনুশীলন ক্ষেত্র ছিল প্রধানত স্থায়ী ও লাঙ্গলভিত্তিক সমতলীয় জনপদ। প্রামাণ্য তথ্যমতে এর সূচনাকাল বরাক সমতলে ১৭১৬ খ্রিঃ এর পর থেকে। ত্রিপুর রাজমালার মতে এরূপ সংস্কৃতির সূচনাকাল খ্রিঃ ষোড়শ শতকের আগে থেকেই, এবং ওই সব দমন করতে গিয়ে ত্রিপুরার রাজারা 'হসম ভোজন' রীতির প্রচলন করেছিলেন। মূলত পার্বত্য চিফরাই Raid & Plundering ইত্যাদির পরিকল্পনা ও পরিচালনা করতেন, সুতরাং বাৎসরিক অভিযানকালীন সময়ে রাজপ্রদত্ত হসমভোজনের আমন্ত্রণ পেয়ে সব সর্দারদের ত্রিপুর রাজধানী চলে যেতে হত। সেখানে তাদেরকে প্রীতিভোজে আপ্যায়িত করার পাশাপাশি উপাধি বিতরণ করা হত, ফলে চিরায়ত সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারটি পার্বত্য পরিসরে মুলতুবি হয়ে থাকত, ত্রিপুর রাজারা এটিই চেয়েছিলেন। ত্রিপুর কুলতিলক ধন্যমাণিক্য পর্বে (১৪৮৫-১৫২০) 'হসম ভোজন' যেমন ছিল পরবর্তী সময়েও সে ধারাবাহিকতাটি বজায় রাখতে চেষ্টা করে গেছেন উত্তরসুরিরা ৷ লুসাই সামন্ত রাজাদের উপাধি প্রদানের প্রচলিত প্রথাটি মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য পর্বেও ছিল। ওই সময় অর্থাৎ ১৩৩২ ত্রিপুরাব্দের কার্তিক মাসে মহারাজের জন্মতিথি উপলক্ষে রাজধানী আগরতলার বিশাল সমারোহের সাথে অনুষ্ঠিত উৎসবে জাম্পুই রাজা হ্রাং ভুঙ্গা ও দইকুমা বাহাদুরকে উপাধি বিতরণ করা হয়েছিল।(১২)

 

কিন্তু ত্রিপুরার প্রাসাদ ষড়যন্ত্র কিংবা প্রশাসনিক শিথিলতা সময়াসময় সে ধারাবাহিকতাটি বজায় রাখতে পারেনি। অপরদিকে কুর্শি দখলের তাগিদে রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে কুকি সর্দার বাহিনীর শরণাপন্ন হয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়, যেটি লুসাই কুকি সর্দারদের স্বাধীন হয়ে পড়ার সুযোগ করে দেয়। যার পরোক্ষ প্রভাব নিদারুণভাবে রেখাপাত করত প্রতিবেশী সমতলীয় পরিসরে।(১৩)

 

এ ব্যাপারে আমরা উল্লেখ করতে পারি ১৭১৬ সালের এক ঘটনা। পরাক্রমশালী ত্রিপুর মহারাজ দ্বিতীয় রত্নমাণিক্য (রাজত্বকাল ১৬৮৫-১৭১২) নিহত হন প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে, পরবর্তী রাজা মহেন্দ্রমাণিক্য (১৭১২-১৪) এবং দ্বিতীয় ধর্মমাণিক্য (১৭১৪-২৯) প্রভৃতিরা ছিলেন তুলনামূলক দুর্বল, তদুপরি হারিয়েছিলেন প্রজাসাধারণের আস্থা। অরাজক পরিস্থিতির ঢেউ তখন আছড়ে পড়ে সামন্ত পরিসীমায়।একসময় (১৭০৯-১৫) যে কুকি প্রজারা ত্রিপুর-আহোম রাজদূত অভিযাত্রীদের সাদর অভ্যর্থনা করে মাচায় বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মিজোরাম অভ্যন্তরের চারদিকের পথ রাংরুং থেকে রুপিণীপাড়া - তৈজলপাড়া - কুমজাংপাড়া - ছাইরাংচুক; এই বশংবদ প্রজারাই পরবর্তীতে অরাজক পরিস্থিতির সুযোগে নেমে আসে বরাক সমতলে। আক্রান্ত হয় হাইলাকান্দির দক্ষিণাঞ্চল। ওই সময়, অথাৎ ১৭১৬ সালে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে আয়নাখাল-কৈয়া অন্তর্বতী অঞ্চলের বাঙালি অধ্যুষিত বেউল গ্রামে। প্রখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার ও প্রত্নতাত্বিক রাজমোহন নাথের পূর্বপুরুষদের অধিকাংশই সেদিন নিহত হয়েছিলেন। সেদিন থেকে তাঁদের বংশ লোকমুখে 'কাটাপাড়া বংশ' হিসাবে আখ্যায়িত হয়ে আসছে। রাজমোহন তাঁর কাটাপাড়া বংশ পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন যে, সে রাতে বাড়ির প্রধান দুজন সদস্য নরসিংহ নাথ ও দই নাথ অনুপস্থিত ছিলেন তাই বেঁচে যান। সাত ভাই-এর পরিবার, স্ত্রী-পুত্র সহ বাড়ির সদস্য সংখ্যা অন্যুন ১৫/১৬ জন তো ছিলই। উপরোক্ত দু'জন ছাড়া বাকি সবাই সেদিন কুকিদের শিকার হয়েছিলেন।

 

সিলেট লাইট ইনফ্যান্ট্রির সর্বাধিনায়ক কর্নেল লিস্টার ১৮৫৩ সালের এঁতিহাসিক প্রতিবেদনে জানাচ্ছেন যে-

"The Paitoo kookies who are located towards the South West, used to be very troublesome, and made many descents in the southern portion of pergunnah Hylakandy and they too drove the inhabitants away from thence, and caused lands that were under cultivation to run to jungle."(১৪)

 

উন্নতযৌবনা ধলেশ্বরী তীরবর্তী শক-আলা দিঘি সন্নিহিত অঞ্চলের শক-আলারপার, আব্দুল্লাপুর, সর্বানন্দপুর, কৃষ্ণপুর, রংপুর প্রভৃতি বিস্তীর্ণ সমতলীয় জনপদও সম্ভবত ওই সময়েই অর্থাৎ ১৭১৬ খ্রিঃ সমসাময়িককালে শ্মশানের রূপ নিয়েছিল।(১৫)

 

সমসাময়িক কালে দুর্বল কাছাড়ি রাজতন্ত্রের অস্তিত্বের বিপন্নতাও বরাক সমতলের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে পৌঁছিয়ে দেয় আরও শোচনীয় স্তরে। ক্রমান্বয়ে অঞ্চলটি পরিচিতি লাভ করে ভাগানের রাজ্য হিসাবে। জনশূন্য হয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ সমতল ক্ষেত্র, বিশেষ করে দক্ষিণ সীমান্তবর্তা সোনাই-ধলেশ্বরী-সিংলা-লঙ্গাই অববাহিকা অঞ্চল। গভীর অরণ্যে আচ্ছাদিত সমতল প্রদেশে ঔপনিবেশিক পর্বে পুনরায় জনবসতি গড়ে ওঠা শুরু হয়। কাছাড়-হাইলাকান্দি-করিমগঞ্জের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের লোকায়ত পরিসরে ঔপনিবেশিক পর্বের 'বন ফারার আমল'টি (বন আবাদি আমল) সমযচিহ্ন হিসাবে আজও সুপরিজ্ঞাত ও সুবিদিত ।


চার

"The people of Cachar and the Mizo already had contacts before the coming of the British to Cachar. Their contacts were mainly through raids and migarations. After 1832, however, the Govt. of India directed the relations between the two."(১৬)

 

Prof. Sangkima'র উপরোক্ত বক্তব্যটি সর্বাংশে প্রণিধানযোগ্য নয়। পাহাড় সমতল সম্পর্ক বহু পুরনো এবং সব ক্ষেত্রে নেতিবাচক ছিল না। ত্রিপুরার সিংহাসনচ্যুত রাজা নক্ষত্ররায় বা ছত্রমাণিক্য সপ্তদশ শতকের শেষার্ধে ছাতাচূড়া পাহাড়ে বসবাসরত কুকিদের আশ্রয়ে ছিলেন বেশ ক'বছর। জনশ্রুতি যে, ছত্রমাণিক্য নাম থেকেই সরসপুর পাহাড়ের দক্ষিণাংশের নাম ছাতাচুড়া হয়েছে। বর্তমান করিমগঞ্জ জেলার লঙ্গাইভ্যালির হালাম কুকিদের সংগ্রহে ত্রিপুর রাজ প্রদত্ত উপহার সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিল শতাধিক বছর আগে। তার মধ্যে একটি ব্রোঞ্জ নির্মিত অশ্বারোহী মূর্তি যার পিছনে খোদাই করে লেখা রয়েছে ত্রিপুর রাজা বিজয়মাণিক্য ও ছত্রমাণিক্যের নাম। একই এলাকা থেকে হালামদের সংগ্রহে থাকা ধাতুনির্মিত সিলমোহর সহ বাঘ ও হাতির মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। এগুলির পৃষ্ঠদেশে বাংলা হরফে সংস্কৃত কথাগুলো লেখা রয়েছে --

"পুর্ব্বাপর্য্য ক্রমাদ্ভবন্ত আত্মীয়া

ইদানিং যদি বৈপরীত্যমাচরন্তি।

তদোপরি ধর্ম্মঃশসানাশো ভবিষ্যতি

পশ্চাদগজ শাদ্দুলৌ।"(১৭)


অর্থাৎ তোমাদের সাথে পূর্ব থেকেই আত্বীয়তা রয়েছে। এখন তোমরা সেই আত্মীয়তা রক্ষা না করলে তোমাদের ধর্ম ও শষ্য নষ্ট হবে এবং পরে তোমরা হাতি অথবা বাঘের ছারা বিনষ্ট হবে। এই সূত্র ধরে ডঃ সুহাস চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন --

"... All these go to show that like the Bodo’s of Assam, the Kuki’s of Mizoram are original Indians living in the frontier regions from the ancient Past."(১৮)

 

ডঃ চট্টোপাধ্যায় কিংবা শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তকারের মতে কুকিরা প্রাচীন কিরাত জাতি। কিন্ত ডঃ সুজিৎ চৌধুরী তাঁর 'Mizo Quest in Retrospect' গবেষণাগ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কুকিরা মহাভারতীয় যুগের কিরাত সম্পর্কিত কোনও উপজাতি নয়। তাঁর বক্তব্য মতে -- "The Mizos are of Mongoloid origin but they are late entrants and do not belong to the Kiratas of the epics and Puranas ... the Mizos had their original home in China. This migration took place approx. in the 1st Century A.D."(১৯)

 

প্রাকব্রিটিশ পর্বে অনেক কুকি সর্দার তাদের অধীনস্থ লোকদের বাংলা নিয়ে লেখাপড়া করার জন্য উৎসাহ প্রদান করে গেছেন। বিখ্যাত কুকি চিফ লালচুকলার পৌত্র রাজা বানখামপুই বাংলায় কবিতা লিখতেন যেগুলো একসময় বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।(২০)

 

বিংশ শতকের দুই এর দশকে বর্তমান ত্রিপুরার অন্তর্গত জাম্পুই হিলস্‌-এর কুকি রাজকুমারদের পড়াবার জন্য ত্রিপুর দরবার থেকে একটি বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছিলো। সামন্ত কুকিরাজ দইকুমা বাহাদুরের সাম্রাজ্যে সেসময় সরকার থেকে অরুণচন্দ্র মোহন্তকে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি দেওয়া হয়েছিল মাসিক কুড়ি টাকা বেতনে।(২১) অবশ্য ত্রিপুর রাজ দরবারে চাকরি পাওয়ার ফলে তাঁকে সে শিক্ষকতায় যেতে হয়নি। অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্বে চরগোলাভ্যালির স্ব-ঘোষিত নবাব রাধারাম দত্তের সাথে কুকি সর্দারদের হৃদতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাঁর নিজস্ব আইন, বিচার ব্যবস্থা সহ প্রতিরক্ষা বাহিনীও ছিল। নিয়োজিত ছিল কুকি লেভি। সিলেটের রেসিডেন্ট ও কালেক্টার রবার্ট লিণ্ডসে অত্যাধুনিক অস্ত্র সহযোগে রাধারামের সাম্রাজ্য আক্রমণ করতে গিয়ে দুই-দুইবার পরাস্ত হয়েছিলেন মূলত কুকি লেভির পারদর্শিতায়। ত্রিপুরার মহারাজা দুর্গমাণিক্য চরগোলা অঞ্চলের ভূ-সম্পত্তির শাসনভার এক সময় তুলে দিয়েছিলেন নবাব রাধারামের উপর। রাধারামের উত্তর পুরুষদের সাথে ছিল কুকিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।(২২)

 

লুসাই প্রদেশের সঙ্গে বরাক সমতলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল মধ্যযুগ থেকে। বরাক, সোনাই, ধলেশ্বরী, সিংলা ও লঙ্গাই জলপ্রবাহ ছিল তৎকালীন Trade Routes। এই সব নদি দিয়ে লুসাই পাহাড়ের বনজ সম্পদ প্রধানতঃ বাঁশ, কাঠ এবং কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে লাউ, কুমড়ো, আদা, লেবু, কমলালেবু, কার্পাস তুলা ইত্যাদি বরাক সমতলে নিয়ে আসা হতো। কুকি সর্দারদের 'সিধা' এবং নদীপথ ব্যবহারের জন্য টোল টেক্স দিতে হত সমতলীয় ব্যবসায়ীদের। লেনদেনের ক্ষেত্রে মুদ্রার পরিবর্তে পণ্য সামশ্রীই ছিল বিনিময়ের মাধ্যম (বার্টার সিস্টেম)। বরাকপারের রাংরুং, সোনাই তীরের সোনাই হাট, ধলেশ্বরী তীরবর্তী ব্যাপারি বাজার (ব্রিটিশ পর্বের নাম চাংশিল বাজার), সিংলা পারের রংপুর এবং লঙ্গাই তীরের লোয়াইরপোয়া প্রভৃতি হাটগুলি আজও আছে, তবে ক্ষেত্র বিশেষে বিবর্তিত হয়েছে তাদের আদি পরিচিতি।(২৩)

 

মধ্যযুগ থেকে কাছাড়ি রাজধানী খাসপুর থেকে মিজোরাম হয়ে ত্রিপুরার রাজধানী উদয়পুর পর্যন্ত বহুল ব্যবহৃত যাতায়াত পথ ছিল (জল ও স্থল মিলিয়ে)। ঐ পথ ধরে কাছাড়, সিলেট, ত্রিপুরা ও মণিপুরের ব্যবসায়ী এবং সরকারি আধিকারিকরা আসা-যাওয়া করতেন। উভয় দেশের মধ্যে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষে আহোম-ত্রিপুর রাজদূতরাও এ পথই ব্যবহার করতেন। সে সময় মিজোরাম অভ্যন্তরের বরাক তীরবর্তী রাংরুং বাজার ছিল বিখ্যাত। ১৭০৯-১৭১৫ সালের মধ্যে বার কয়েক আহোম-ত্রিপুরার রাজদূত এবং সঙ্গীয় লোকজন ওই পথ ধরে আসা-যাওয়া করেছিলেন। ত্রিপুর বুরুঞ্জীর সাক্ষ্য মতে, ত্রিপুর রাজছত্রাধীন লুসাই প্রদেশের রাংরুং এ প্রশাসনিক আধিকারিক হিসাবে 'লস্কর' পদবীর একজন লোক নিযুক্ত থাকতেন বদলির চাকরিতে কর্মরত আধিকারিকরা রাজদূত-অতিথি-অভ্যাগতদের যথোপযুক্ত অভ্যর্থনা ও থাকা-খাওয়া এবং দিনকয়েকের পথশ্রম লাঘবের জন্য বিশ্রামের আয়োজন করে দিতেন। শাসনভার অর্পণ করা থাকত স্থানীয় হালাম সর্দারদের উপর। বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ব্রিটিশ পর্বের পলিটিক্যাল এজেন্টদের যথার্থ পূর্বসুরি ছিলেন দেশীয় 'লস্কর'রা ।

 

যাই হোক রাংরুং বাজারে কাছাড়, মণিপুর, ত্রিপুরার ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য নিয়ে যেতেন। কাছাড় সমতলের পণ্যসামগ্রীর মধ্যে ছিল ছাগল, হাঁস, মুরগি, শুটকি, চাউল, লবণ, তেল, গুড়, তামাক-পাতা ও শুকনো সুপারি। মণিপুরিদের পণ্য সম্ভারে ছিল সোনা, কাঁসার থালা কলস ও খেস কাপড় এবং ত্রিপুরা রাজার জন্য ঘোড়া। ত্রিপুরার ব্যবসায়ীদের পণ্যদ্রব্যের মধ্যে ছিল পিতল, লবণ, তেল, গুড়, তামাক-পাতা শুকনো সুপারি ও শুটকি। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৭০৯ সাল নাগাদ করিমগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চল ত্রিপুর অধীনে ছিল, সম্ভবত এখানকার ব্যাপারীরাই ত্রিপুরার ব্যবসায়ী হিসাবে তখন রাংরুং বাজারে পণ্যসামঘ্রী নিয়ে পশরা সাজাতেন। দেখা যায় ১৭০৯ সালে লুসাই প্রদেশ অন্তর্গত রাংরুং বাজারটি সাধারণ মানের ছিলনা এবং পণ্য সামগ্রীর ফর্দ নির্দ্বিধায় বলে দেয় যে কাছাড় ত্রিপুরার ব্যবসায়ীরা নিশ্চিতভাবেই ছিলেন সমতলবাসী বাঙালী। অষ্টাদশ শতকের প্রথম পর্বে এত বড় মাপের বাজারটি নিশ্চয় একদিনে গড়ে ওঠেনি, তাছাড়া চলাফেরার রাস্তা বিশেষ করে ভিনদেশী রাজদূত অতিথিদের আসাযাওয়ার সময় যেটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটিও নিশ্চয় তার আগে থেকেই বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এবং সবেপিরি শান্তি শৃঙ্খলা এবং আরক্ষী ব্যবস্থাপনাও ছিল বহুজাতিক, বহুদেশিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে ওঠার অনুকূল।

টিপাইমুখ অঞ্চলের রাংরুং এর মত মিজোরাম অভ্যন্তরের আরও কয়েকটি প্রসিদ্ধ স্থান ছিল, যেখানে রাজদূতরা আসা যাওয়ার সময় দিন কয়েকের বিশ্রাম নিয়েছিলেন। রূপিণীপাড়া ছিল সেরকমই একটি স্থান যেখানে রাংরুং এর মতই কুকি সর্দারদের উপর ন্যস্ত থাকত শাসক কর্তৃত্ব এবং ত্রিপুর দেশীয় পলিটিক্যাল এজেন্ট হিসেবে নিয়োজিত থাকতেন 'মুনশী' পদবীর একজন আধিকারিক।(২৪)

 

সময়ের স্রোতে বদলে গেছে জনবিন্যাস এবং তার সাথে তাল মিলিয়ে বিবর্তিত হয়েছে স্থান-নাম, নদী-নাম। তাই আজ ১৭০৯ সালের লিপিবদ্ধ করা নামগুলি সবকটির সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা প্রায় দুঃসাধ্য। ঔপনিবেশিক পর্বের ধলেশ্বরী ভ্যালির চাংশিল বাজারটিও তেমন অর্বাচীন নয়, তার পূর্ব নাম ছিল ব্যাপারী বাজার। নামটিই বলে দেয় কারা যেতেন সেখানে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রয়োজনে। খ্রিঃ ষোড়শ শতকের প্রথম পর্বে ত্রিপুর মহারাজা ধন্যমাণিক্য পূর্বকুল প্রদেশ জয় করেছিলেন, তখন থেকেই এ পার্বত্য প্রদেশটি ত্রিপুর সংশ্রবে ছিল। জাম্পুই হিলস্‌ -এর 'বেতলং শিব' এবং পূর্বকূল প্রদেশের 'কলাশিব', শৈবতীর্থ সংশ্লিষ্ট ঐশীস্থল দুটিও সম্ভবত গড়ে উঠেছিল ওই সময়। কুকি জনবিন্যাসের মধ্যে হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এগুলো নিশ্চয় এক গুরুতৃপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। সুতরাং অনুমান করা যায় যে, সমসাময়িক কাল থেকে ত্রিপুর-বরাক সমতলের সাথে পূর্বকুল বা পরবর্তীকালের লুসাই প্রদেশের পারস্পরিক ইতিবাচক সম্পর্কও বিদ্যমান ছিল।

 পর্ব ২ 

পাঁচ

ক) বরাক-লুসাই সম্পর্ক ক্রমশ নেতিবাচক রূপ নেয় ঔপনিবেশিক পর্বে এসে; তার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বর্তমান বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ জেলা ১৭৬৫ এবং কাছাড়-হাইলাকান্দি ১৮৩২ সালে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাজনৈতিক বিবর্তন কুকি সর্দারদের কাছে আগ্রাসন এবং অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ প্রতীয়মান হয়। ১৮২৬ সালের করিমগঞ্জ অন্তর্গত প্রতাপগড় পরগণায় কুকি আক্রমণের পেছনে এই কারণটিই ছিল মুখ্য। পূর্ব থেকে পরগণার জমিদারের কাছ থেকে কুকি চিফরা রীতি অনুযায়ী উপহার, সিধা ইত্যাদি পেয়ে আসছিলেন, ঔপনিবেশিক পর্বে সেটি বন্ধ হয়ে পড়ায় ত্রিপুর সামন্ত কুকিরাজ বুন্তাই (বৃন্তাই) এবং রাজা লারুর (বিখ্যাত চিফ লালচুকলার পর্ব পুরুষ) বাহিনীর হাতে নিহত হয় স্থানীয় কয়েকজন কাঠুরিয়া। তথ্য অনুসন্ধানের জন্য সরকার প্রেরিত প্রতিনিধিদের কুকিরা বন্দি করে নিয়ে যায়; বাধ্য হয়ে মুক্তি পণের বিনিময়ে সরকার তাদের মুক্ত করে আনেন।(২৫)  সিলেটের রেসিডেন্ট ও কালেক্টার ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ সি টকার (C.Tukar) এর কার্যকালেই (কার্যকাল : ৮-৭-১৮২৪ --- ১৭-১২-১৮২৪ এবং ৮-৩-১৮২৬ --- ২৪-২-১৮২৯) সংঘটিত হয়েছিল উপরোক্ত ঘটনা। পরবর্তী সময়েও ‘Ransom’ এর বিনিময়ে বন্দি মুক্ত করে আনা হয়েছিল ব্রিটিশ পর্বে; অপহরণ বাণিজ্যের ধারাবাহিকতাটি প্রান্তিকায়িত পরিসরে আজও অম্লান।

অপরদিকে সমতল কাছাড়ে বার্মিজ আগ্রাসন, কুকি আক্রমণ প্রভৃতি পরপর সংঘটিত হওয়া রক্তক্ষয়ী ঘটনাবলী যখন কাছাড়কে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল উনবিংশের দ্বিতীয় দশকে, ঠিক সে সময় পূর্বকূল প্রদেশেও চলছিল বৈপ্লবিক পরিবর্তন, সুপ্রাচীন জনবিন্যাসের পায়ের তলার মাটি তখন ধীরে ধীরে সরিয়ে নিচ্ছিল নবাগত আগ্রাসী শক্তি। অপেক্ষাকৃত দুর্বলতর জনগোষ্ঠী তখন বাধ্য হয়ে নেমে আসে প্রান্তীয় বরাক সমতলে, ক্রমান্বয়ে পিছনের তাড়া তাঁদের পৌঁছিয়ে দেয় উত্তর সীমান্তে। উনবিংশের প্রথমার্ধের প্রব্রজন দুর্বলতর এবং ত্রিপুর-অনুগত indigenous গোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশকে পূর্বকুল প্রদেশ থেকে ভিটে ছাড়া করতে থাকে অসাধারণ শক্তিশালী লুসাই জনগোষ্ঠী। ভাষা-সংস্কৃতি-দৈনন্দিন জীবনচর্যায় এক  বৈপ্লবিক পরিবর্তন নেমে আসে অববাহিকা ভিত্তিক চিফটেইন সাম্রাজ্যে; পরিবর্তন নেমে আসে যুদ্ধাস্ত্রের ক্ষেত্রেও। পূর্বতন দা, বর্শা, ঘুং (বৃহৎ কাঁসর-রণবাদ্য)-এর সমান্তরালে তাদের হাতে পৌঁছে যায় বন্দুক (musket) গোলাবারুদ প্রভৃতি। এখানে উল্লেখ্য যে মেষোক্ত মারণাস্ত্র গুলি প্রথমদিকে সরবরাহ করা হত মায়ানমার, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চল থেকে এবং বিনিময়মূল্য ছিল বন্দুক-পিছু দুইজন ক্রীতদাস। মিজো চিন্তাবিদ Prof. O. Rosango তাঁর ‘British Trade Relations with Mizoram Till 1930 and its Impact.’ শীর্ষক নিবন্ধে জানাচ্ছেন -

 

‘It was after 1825 that large no. of guns began to find its way in Mizoram. It was largely obtained from the Chittagong Hill track & Burma. It was usually exchanged with slaves - one gun for two healthy slaves.’ বলাবাহুল্য, ওইসব দাসরা প্রধানত সংগৃহীত হত সমতলীয় জনপদ আক্রমণ – লুণ্ঠন - নরহত্যাকালীন সময়ে। সুতরাং অস্ত্র সংগ্রহের মোহ এবং চাষাবাদের প্রয়োজনে দাস – সংগ্রহের তাগিদ Raids এর মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। অপরদিকে বাঙালি দাস ছাড়াও পরাক্রমী লুসাই চিফদের অধীনে দাস জীবন যাপনে বাধ্য করা হত দুর্বলতর Indigenous জনগোষ্ঠীর কুকিদের। এছাড়াও উপটৌকন সামগ্রী হিসাবে দাস-দাসী সংগ্রহের তাগিদ লুসাই-কুকিদের বরাক সমতলে নেমে আসার প্রেরণা জোগাত।

এক সময় পূর্বকুল ভূমিও তার পরিচিতি হারিয়ে নাম নেয় লুসাই প্রদেশ । ১৯০১ সালের সরকারি পরিসংখ্যান মতে লুসাই প্রদেশের জনবিন্যাসের চিত্রটি দীড়ায় এরূপ –

VM Lushai 2.png

পাইতে, থাডো, আর লাখের কে দুর্বলতর জনগোষ্ঠী হিসেবে ধরা যায়

সেন্সাস অনুসারে লুসাই প্রদেশে ১৯০১ সালের মোট জনসংখ্যা ছিল ৮২,৪৩৪ যার মধ্যে এককভাবে লুসাই জনগোষ্ঠীর অংশ ছিল শতকরা ৪৪ ভাগের উপর এবং দুর্বলতর গোষ্ঠীর সম্মিলিত অংশ ছিল শতকরা ৮ ভাগ। (২৬)

যাই হোক, উনবিংশের প্রথমার্ধ থেকে স্বাধীন মননশীল শক্তিশালী জনগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে প্রবল প্রত্যাহ্বানস্বরূপ আত্মপ্রকাশ করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্রিটিশ প্রশাসন দক্ষিণ কাছাড় অঞ্চলের বনরাজ পরগণার কাজিডহর এবং হাইলাকান্দি পরগণার দক্ষিণাঞ্চলে Sylhet Light Infantry-র দুটি Outpost গড়ে তোলেন ১৮৩২ সালের পর পরই। অপরদিকে ১৮৩৪-৩৫ সালে সিংহাসনচ্যুত মনিপুররাজ ত্রিভূবনজিৎ এবং তাঁর অধীনস্থ রায়তদের পুনর্বাসন দেওয়া হয় ঝাঁপিরবন্দ, মণিপুর নিষ্কর প্রভৃতি সীমান্তবর্তী এলাকায়। হাইলাকান্দির প্রান্তীয় অঞ্চলের সুরক্ষার তাগিদেই Supdt. Capt. Thomas Fisher মণিপুরি Settlement এর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। অনুরূপ মণিপুরি বসতি বিস্তারের চিত্রটি আমরা দেখতে পাই দক্ষিণ কাছাড়, দক্ষিণ করিমগঞ্জ সহ শ্রীহট্টের প্রান্তিকায়িত পরিসরেও। ধর্মনগর কিংবা কৈলাসহরের পাইতুর বাজার (পাইতু কুকিদের আবাসস্থল) সন্নিহিত অঞ্চলের মণিপুরি Settlementও সম্ভবত ওই পর্বেরই। দক্ষিণ হাইলাকান্দির সুরক্ষার তাগিদে Settlement দেওয়া ত্রিভুবনজিৎকে সরকার থেকে নগদ ২৬৩৬ টাকার অনুদান দিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রশাসন। তদুপরি ধলেশ্বরী-বাহিত বনজসম্পদের টোল ট্যাক্স, লেভি আদায় করারও ছাড়পত্র পেয়েছিলেন ত্রিভুবনজিৎ এবং তীর উত্তরসুরিরা। এখানে উল্লেখ্য যে, যৌধেয় সমাজ অন্তর্গত শক্তিশালী ও অসমসাহসী মণিপুরি সম্প্রদায় ব্যতীত সমতলবাসী বাঙালিদের পক্ষে তখন প্রান্তিকায়িত পরিসরে পুনর্বসতি বিস্তারের ধারণাটিই ছিল অবান্তর। Capt. Fisher-এর চিন্তাধারার সুফলও পাওয়া গিয়েছিল, ত্রিভুবনজিৎ-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ১২টি বন্দুক (Muskets)। তাঁর জীবিতকাল (১৮৪৪ খ্রিঃ) পর্যন্ত দক্ষিণ হাইলাকান্দি নিরুপদ্রব ছিল।

তবে, ত্রিভূবনজিৎ-এর ক্ষমতার অপব্যবহার পক্ষান্তরে কাল হয়ে দাড়িয়েছিল অন্যপ্রান্তের মণিপুরি পরিসরে। ১৮৪৪ সালের ১৬ এপ্রিল পাইতু কুকিরা অভিযান চালায় মণিপুরি সম্প্রদায় অধ্যুষিত বৈঠাখাল নিকটবর্তী কচুবাড়ি গ্রামে। সংগ্রহ করে ২০টি নরমুণ্ড এবং ৬ জন মণিপুরি রমণী। প্রেক্ষাপট যথেষ্ট অর্থবহ। দক্ষিণ হাইলাকান্দি অঞ্চলের ত্রিভূবনজিৎ ব্রিটিশ আনুগত্য প্রকাশ করে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার পাশাপাশি মণিপুর সিংহাসন পুনর্দখলের চিন্তা করেন। সে অনুযায়ী লুসাই প্রদেশের ত্রিপুর সামন্তপতি রাজা লারুর (লালহুরিয়া) কাছে অর্থ এবং ৫০০ জন সৈনিক চেয়ে পাঠান ছোটভাই রাম সিংহকে। রাজা লারুর অস্বীকৃতি পরবর্তীকালে তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনে। পুত্র লালচুকলা পিতার মৃত্যুর প্রতিকার চেয়ে ত্রিপুর দরবারের শরণাপন্ন হয়েও তেমন কোনও ইতিবাচক সাড়া পাননি। অপরদিকে সামাজিক রীতি অনুসারে চিফ্দের মরদেহ আঙ্গিনায় দিনকয়েক শুকিয়ে রাখার পর নরমুণ্ড অলংকৃত করেই সমাহিত করতে হয়। সুতরাং পুত্র লালচুকলা পরিকল্পনা করেন মণিপুরি ভিলেজ আক্রমণের এবং সে অনুযায়ী লঙ্গাইভ্যালির প্রত্যন্ত জনপদ কচুবাড়িকেই বেছে নেন তার শিকারস্থল হিসাবে। (২৭)

কচুবাড়ি আক্রমণের পিছনে আরও  একটি অর্ততনিহিত কারণ রয়ে গেছে। প্রতাপগড় পরগণা সহ চরগোলা ভ্যালির দক্ষিনাঞ্চল, পাথারিয়া পরগণা এবং দক্ষিণ সিলেটের সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে ঔপনিবেশিক সরকার ও ত্রিপুরার মধ্যে সীমানা সংক্রান্ত বিরোধিতা তখন তুঙ্গে এবং আদালতে বিচারাধীন পর্যায়ে ছিল, Surveyor তথা 24th Native Infantry-র Commandant Lt. Thomas Fisher এর ১৮২১ সালের জরিপ এবং সীমানা নির্ধারণ নিয়ে ত্রিপুরায় মতবিরোধ ছিল, (২৮) তদুপরি এলাকাগুলি ছিল ত্রিপুর সামন্তপতি রাজা লারু-লালচুকলাদের অধীনে। আলোচ্য কচুবাড়ি ভিলেজটি ছিল প্রতাপগড় পরগণার এবং Disputed পরিসীমায়। সুতরাং আগ্রাসন প্রতিরোধের মতো ব্যাপারটিও এখানে জড়িত ছিল বলেই অনুমিত | Alexander Mckanzie - এর মতে - “But a grave suspicion arose... that the kookies had been directed to the Manipuri village by the emissaries of the Raja who had a dispute with the colonists about the land on which it stood.” (২৯)

যাই হোক কচুবাঁড়ি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার থেকে Sylhet Light Infantry- এর সর্বাধিনায়ক Capt. Blackwood -কে লুসাই অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অবশেষে ১৮৪৪-এর ৪ ডিসেম্বর লালচুকলা আত্মসমর্পণ করেন। বিটিশের বিচারে তাঁর দ্বীপান্তরের সাজা হয়েছিল।

Capt. Fisher-এর সীমানা নির্ধারণ ১৮৪৪-এর পরবর্তীতে আরও  তিনটি জায়গায় রক্তক্ষয়ী কুকি হামলার মুখ্য কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জুন ১৮৪৭-এর লঙ্গাই ভ্যালির দক্ষিণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে-- ১৫০ জনের মৃত্যু, নভেম্বর ১৮৪৯-এ চরগোলা ভ্যালির দক্ষিণাঞ্চল -- মৃত্যু ডেকে এনেছিল অনেকের, তবে অধিকাংশই হালাম শ্রেণির প্রজা। ১৮৫০ এর ১৩ জানুয়ারি -- এবার কেন্দ্রস্থল সোনাইভ্যালির (লাতু অঞ্চলের লঙ্গাই তখন সোনাই নামে অভিহিত হত) লাতু সন্নিহিত অঞ্চল।(৩০)

 

খ) কাছাড় সমতলের আক্রমণ এ সময় একটি ভিন্ন মাত্রা নিয়েছিল, যার পরোক্ষ প্রভাব গিয়ে পড়েছিল বাঙালি জনবসতিগুলিতে। দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের বনরাজ পরগণায় মণিপুর থেকে নেমে এসে Thado কুকিরা আক্রমণ করে কয়েকটি গ্রাম, সংগ্রহ করে ৮টি নরমুণ্ড, সব ক'টিই মহিলাদের। তদন্তের অভিযুক্তরা স্বীকার করে যে, তাদের চিফের নির্দেশেই নরমুণ্ড সংগ্রহ করতে হয়েছিল। ১৮৪৪ সালের জুন মাসের উপরোক্ত ঘটনায় সরকার থেকে আশানুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, মাঝপথে ভীতসন্ত্রস্ত বাঙালিরা গ্রাম ছেড়ে পলায়ন করে। ৬ নভেম্বর, ১৮৪৯ সালে লুসাই চিফ্‌ লালিংভুঙ্গ বাহিনীর ২০০ জন সদস্য দিনে দুপুরে হানা দেয় সোনাপুর পরগণার অন্তর্গত বোয়ালজুরের সাইপোয়া কুকি ভিলেজে।সংগ্রহ করে ২৯টি নরমুণ্ড (১৫ জন পুরুষ, ১৪ জন মহিলা) এবং অপহরণ করে ৪২ জনকে।

এরপরই তারা হানা দেয় সাহাবাজপুর পরগণার লিলং রাজার অধীন লালং ও অঙ্গাম কুকি ভিলেজে। উভয় ক্ষেত্রেই অবাধে লুণ্ঠন, গৃহদাহ, বাজারহাট ছারখার করে দিয়ে যায় লুসাইরা । কাছাড় Suptd. G. Verner পুলিশ পাঠিয়ে উদ্ধার করেন মুণ্ডহীন দেহ। উপরোক্ত ঘটনায় স্থানীয় কুকি সহ বাঙালিরা জনপদ শুন্য করে পালিয়ে যায় অন্যত্র। প্রশাসন সোনাবাড়িঘাট ও নগদিরগ্রামে ২টি সেনাচৌকি বসান, জনসাধারণের আস্থা তবুও ফিরে আসতে সময় নিয়েছিল। এ অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে অধ্যাপক ডঃ জয়ম্তভূষণ ভট্টাচার্য লিখেছেন --

“The Bhawlijoor Punji was already deserted, every hut was burnt and there remained nothing but the dead bodies which having been lightly covered with earth made them unhygienic and offensive for superstitious security guards from Bengal and upcountry.” (৩১)

 

হানাদার লুসাইদের আবাসস্থল কাছাড় সীমান্ত থেকে ১০ দিনের পথ এবং মিজোরামের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ। তাদের গ্রাম গুলি চট্টগ্রাম-কুমিল্লার নিকটবর্তী এবং সেখানকার হাটবাজারের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং কাছাড় সীমান্তের হাটবাজার বন্ধ করলে তাদের কিছুই যায় আসে না, বরং ক্ষতির সম্মুখীন হবে স্থানীয় অনুগত কুকিরাই। তাই আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যদি কোনও ব্যবস্থা নিতে হয় তবে তাদের গ্রামগুলিই হবে সরকারি Expedition-এর মূল লক্ষ্য। তদনুসারে Sylhet Light Infatry-এর Commandant এবং খাসি হিলস্‌ এর Agent কর্নেল লিস্টারকে নিয়োগ করা হয় পরিচালনা করার জন্য।

১৮৫০ সালের ৪ জানুয়ারি শিলচর থেকে রওয়ানা হয়ে ১০ দিনে অর্থাৎ ১৪ জানুয়ারি লিস্টার বাহিনী গিয়ে পৌছে মুল্লার (Mullah) সাম্রাজ্যে, অধিকার করে তার ভিলেজ ও দুর্গ। এখানে উল্লেখ্য যে দক্ষিণ হাইলাকান্দির রূপাছড়ার গ্রামাঞ্চল আক্রমণ, লুণ্ঠন, হত্যাকাণ্ডের সাথে মুল্লার বাহিনী জড়িত ছিল। মুল্লার দুর্গ আক্রমণ করার ফলে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয় ৪২৯ জন বন্দি এবং আশ্রয় নেয় কাছাড় সমতলে। কর্নেল লিস্টার মুল্লার সাম্রাজ্য ছেড়ে আসার পর পরই লুসাইরা তাদের অধীন Thado কুকিদের নেতৃস্থানীয় ২০ জন রায়তকে নৃশংসভাবে হত্যা করে বন্দি পালানোর প্রতিশোধ নেয়।(৩২)

কর্নেল লিস্টারের অভিযান স্বাধীন লুসাইদের সার্বিক পরিস্থিতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় ঔপনিবেশিক প্রশাসকদের, যেটি পরবর্তীকালের বৃহত্তর অভিযানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা নিয়েছিল। লিস্টারের প্রতিবেদনের অংশ বিশেষ এখানে উদ্ধৃতি স্বরূপ তুলে ধরা হল --

“The Lushais are a very powerful tribes under the Govt. of six Sirdars of whom one is acknowledged Chief. They all have their separate cantonments with a no. of dependent villages attached. In these cantonments the fighting men reside; in the dependent villages are located their ryots, who are merely used as coolies, and for tilling the soil. They consist, in many instances, of the captives they have brought away in their different expeditions, a great part of them probably taken as mere children and gradually reconciled to their captivity. The fighting part of the Lushai population are composed firstly of Lushais, who appear to be a cross between the Kookies and Burmese. Secondly of a certain no. of true Burmese... thirdly of refugees and outlaws from Munipore and our own frontier. (অর্থাৎ বরাক সমতল)” (৩৩)

এখানে উল্লেখ্য যে বনরাজ, সোনাপুর প্রভৃতি পরগণায় যেসব Thado এবং অন্যান্য কুকি অধ্যুষিত গ্রাম / পুঞ্জি আক্রান্ত হয়েছিল তাদের পিছনে ছিল ওইসব Cantonment এর সেনাবাহিনী। পণ্ডিতগণের মত যে প্রব্রজন করে আসা আক্রমণের শিকার নিরীহ কুকিদের পূর্ব নিবাস ছিল সেইসব অঞ্চলেই যেখানে শক্তিশালী লুসাই জনগোষ্ঠীর সাক্ষাৎ ঘটেছিল কর্নেল লিস্টারের । এবং সম্ভবত আগে থেকেই উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ বহমান ছিল, যার ফলশ্রুতিতেই সংঘটিত হয়েছিল কাছাড় অভ্যন্তরের কুকি ভিলেজ আক্রমণ। কিন্তু আমরা মনে করি দুর্ধর্ষ লুসাই ক্যান্টনমেন্ট, রায়তদের ভিলেজ প্রভৃতির যে চিত্র এঁকেছেন কর্নেল লিস্টার, তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে কোনও একসময় Thado এবং অন্যান্য দুর্বল শ্রেণির কুকিরা ওই জাতীয় ভিলেজে লুসাই অধীন রায়ত অথবা বন্দি হয়ে দাস জীবন কটাচ্ছিল এবং সময়ে সুযোগে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল বরাক সমতলে । মুল্লার ভিলেজ থেকে বন্দি পালানোর ঘটনা অন্তত সে সাক্ষ্যই বহন করে । এ ব্যাপারে Alexander Mckenzie-র বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য | তিনি লিখেছেন - “The jungles in south of Cachar had formerly been joomed by Thadoes, most of whom had been driven into our territory (i.e., Cachar) by dread of the Lushais, and others carried south (অর্থাৎ বন্দি করে নেওয়া) and compelled to cultivate for that tribe.”(৩৪)

উপরোক্ত কারণ ছাড়া আরও একটি মুখ্য কারণ রয়েছে এর পেছনে। কাছাড় সমতলে লুসাইদের থাডো কুকি ভিলেজ আক্রমণ করার সম্ভাব্য কারণ ব্যক্ত করতে গিয়ে ১৯ জুলাই ১৮৭০ তারিখে ‘Mr. Edgar among the tribes’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘Pioneer’ জানাচ্ছে – “....many of the outrages in Cachar had been committed by the Lushais to avenge wrongs done to them by the Kookies living there under our protection. A fearful source of raids has been the possession of certain mysterious gongs, carried off, as the Lushai allege, from them and kept for many years by certain Thado Kookies in Cachar.’

Lister’s Expedition সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে এক একজন  লুসাই চিফদের Cantonment-এ কম করেও তিন হাজার জন যোদ্ধা ছিল, দা, বর্শা ছাড়াও গোলাবারুদ ছিল তাদের প্রধান হাতিয়ার। লিস্টারের মতে সীমান্ত অঞ্চলের রক্তক্ষয়ী ঘটনাবলীর মুখ্য কারিগর তারাই, সুতরাং ওইসব লুসাই চিফদের স্বাধীনতা খর্ব করার উপরই নির্ভর করছে ঔপনিবেশিক পরিসরের সুনিশ্চিত সুরক্ষা। পরবর্তী বৃহত্তর লুসাই অভিযানের প্রয়োজনে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করার ব্যাপারটি যে জরুরি, সে ব্যাপারেও আলোকপাত করেছেন কর্নেল লিস্টার।

 পর্ব ৩ 

১৮৫০ সালের Expedition আশানুরূপ সফলতা অর্জন করতে না পারলেও বছর কয়েক বরাক সমতল শান্তিপূর্ণ ছিল। এদিকে, ১৮৫৫ থেকে কাছাড়ে এবং ১৮৫৬ থেকে সিলেটে চা শিল্প বিস্তৃতির সূচনা ঘটে; অধিকাংশ চা বাগান গড়ে ওঠা শুরু হয় সুরমা-বরাকের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। এই অঞ্চলগুলির অধিকাংশ এলাকা একসময় কুকিদের সরাসরি অধিকারে না থাকলেও তাদের স্বাভাবিক বিচরণস্থল হিসাবে পরিগণিত ছিল।

প্রায় বছর বারো সুরমা-বরাকে শান্তি বিরাজ করলেও সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৮৬২ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় লুসাই কুকিদের Winter Raids। এবারের আক্রমণস্থল দক্ষিণ শ্রীহট্টের আমদপুরের চন্দ্রাই পাড়া। অবাধ লুণ্ঠন, গণহত্যা, গৃহদাহ এবং অপহরণ সংঘটিত হয় পরপর তিনটি গ্রামে। ঘটনার পরের বছর এপ্রিল ১৮৬৩ তে ৪ জন অপহৃতা মহিলা কাছাড়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। তাঁদের বয়ান মতে, চন্দ্রাই পাড়ার কাণ্ডে কুকি চিফ্ মরছুইলাল (যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হওয়া লালচুকলার পুত্র), ধলেশ্বরী ভ্যালির সুকপাইলাল, রাংভুম, লালহুলন (লালচুকলার জেঠতুতো ভাই) প্রভৃতিরা জড়িত ছিলেন। কুকি চিফ্ সুকপাইলালের সাথে কাছাড় প্রশাসনের সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে ১৮৪৯ সাল থেকে, তাই বাংলার লেফঃ গভঃ তাঁর সাথে কোনওরূপ সংঘর্ষে না গিয়ে বরং বন্দি হস্তান্তরের ব্যাপারে তার সহযোগিতার উপর জোর দেন। তাছাড়া অন্যান্য চিফদেরকে ব্রিটিশ আনুগত্য প্রকাশ করানোর জন্য সুকপাইলালকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। সীমান্তে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সুকপাইলাল সহ সোনাই ও টিপাই ভ্যালির চিফ্দের বার্ষিক নগদ অর্থ অনুদানেরও ব্যবস্থা করা হয় সরকার থেকে। সীমান্ত অঞ্চলে নির্বিঘ্নে চা-ক্ষেত্র সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েই এরূপ ব্যবস্থা। ফলে দঃ শ্রীহট্টের অপহৃত বন্দিদের মধ্যে ৪টি বালক ১৮৬৬ সালে মুক্তি পায় সুকপাইলালের সৌজন্যে। সুকপাইলাল কাছাড় Suptd.-কে জানান যে অন্যান্য বন্দিরা আসেনি যেহেতু তারা ইতিমধ্যে বিবাহসূত্রে আবহ।(৩৫)

 

সমতলবাসী অপহৃতা রমণীরা যে ফিরে আসেনি তার অন্যতম কারণ সমতলীয় সমাজ ব্যবস্থা। বাঙালি রমণী সংযোগে যে মঙ্গোলীয় চেহারায় বিবর্তন সাধিত হচ্ছিল, সে বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি Captain Lewin এর দৃষ্টিতে। ১৮৭১ সালের লুসাই এক্সপেডিশন, চট্টগ্রাম কলাম-এর দায়িত্বে’রত লেউইন তাই লিখেছেন-

“They differ entirely from other hill tribes of Burman, Arracanese origin, in that their faces bear no marks of Tartar or Mongolian descent. They are swarthy in complexion and their cheeks are generally smooth among the Howlong tribes. However, one meets many men having long bushy beards. I should be inclined to attribute this to a mixture of Bengali blood from the many captives they have, from time to time carried away.” (Source-The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers therein-- T.H.Lewin page-103)(৩৬)

 

গ) ১৮৬৩ সালের সিলেটের ঘটনার পর লুসাই আক্রমণ সংঘটিত হয় কাছাড় অঞ্চলের লোয়ারবন্দ ও মণিয়ারখাল চা ক্ষেত্রে। ১৫ জানুয়ারি ১৮৬৯ সালের ঘটনায় লুসাই চিফ্ সুকপাইলাল ও বনপুইলাল (মুল্লার পুত্র) জড়িত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে মত প্রকাশ করেন বি সি চক্রবর্তী। মারজিত-এর পুত্র কানাই সিংহের জ্ঞাতসারেই যে ঘটনাগুলি ঘটেছিল তার কারণ হানাদার বাহিনী চা-ক্ষেত্র আক্রমণ করে সিংহ-সহযোগে মণিপুর অভিমুখে রওয়ানা দেয়। ব্রিটিশ অনুগত মণিপুর রাজের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানোর অভিপ্রায়ে লুসাই চিফ্দের সাহায্যপ্রার্থী ছিলেন কানাই সিংহ। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে Expedition চালানো হয় তিন প্রান্ত থেকে। প্রথম অভিযানটি সিলেট থেকে ত্রিপুরার মধ্য দিয়ে অর্থাৎ Western Column, দ্বিতীয়টি ধলেশ্বরী ভ্যালি অর্থাৎ Central Column এবং তৃতীয়টি সোনাই ভ্যালি অর্থাৎ Eastern Column। এই তিন প্রান্ত থেকে Expedition শুরু হয়। প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য ১৮৬৯ সালের অভিযান ফলপ্রসূ হয়নি, তবে সোনাই ভ্যালির Eastern Column-এর দায়িতে থাকা Major Stephenson কিছুটা সফলতা লাভ করেন। যাই হোক, ত্রিকোণ অভিযান এবং অর্থনৈতিক অবরুদ্ধতা সীমান্ত অঞ্চলের চিফদের বাধ্য করে Dy. Commissioner John Edgar এর কাছে আনুগত্য প্রকাশ করতে। সাময়িক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ Edgar-কে প্রেরণা জোগায় লুসাই প্রদেশ পরিদর্শনের। সে অনুযায়ী তিনি ডিসেম্বর ১৮৬৯ সালে সেখানে যান। উভয় অঞ্চলের সম্পর্কের উন্নতির লক্ষ্যে Edgar ভারত সরকারের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব পাঠান যেগুলি সরকারি অনুমোদন লাভ করে।

প্রস্তাবগুলি ছিল-

১) Dy. Commissioner বা তাঁর প্রতিনিধি প্রতি বছর লুসাই সফরে যাবেন এবং পৃথক পৃথক ভাবে এক এক জন চিফ-এর সাথে মত বিনিময় করবেন।

২) পার্বত্য চিফদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রতিরোধ এবং অনুগত চিফ্দের পুরস্কৃত করা।

৩) আশানুরূপ কাজের অভিজ্ঞান স্বরূপ চিফদের সনদ প্রদান (Charter) ।

৪) সমতলের ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে টোলট্যাক্স, মাশুল আদায়ের ক্ষেত্রে চিফদের অধিকার প্রদান।

৫) প্রান্তীয় সমতলে ভূ-বাসন।

৬) পার্বত্য ত্রিপুরায় Political Agent নিয়োগ।

৭) মণিয়ারখাল থেকে বংখং এবং ধোয়ারবন্দ থেকে রেংটি পাহাড় (অর্থাৎ কলাশিব পর্যন্ত), এই দুই রাস্তা নির্মাণ ইত্যাদি।(৩৭)

 

Edgar-এর লুসাই পরিদর্শনে সহযাত্রী হয়েছিলেন Major Macdonald, Officiating Superintendent of Revenue Survey। সীমানা নির্ধারণের ব্যাপারটিও তখন প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল।

 

ছয়: বরাক সমতলে 1871 সালের ঐতিহাসিক লুসাই অভিযানঃ

ভারত সরকারের অনুমোদনক্রমে Edgar পুনরায় লুসাই প্রদেশ সফরে যান ১৮৭০-৭১ সালে, সেখানে যাওয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল লুসাই চিফ সুকপাইলালের সাথে পূর্বনির্ধারিত আলোচনা অনুসারে সীমানা নিশ্চিতকরণ। ওই পর্বে ১৬ জানুয়ারি ১৮৭১ সালে উভয়ের মধ্যে একটি সনদ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যেখানে সীমানা নির্ধারণ ছাড়াও ছিল ব্রিটিশ আনুগত্য স্বীকার করে নেওয়ার চুক্তিও। সুকপাইলাল সাম্রাজ্যের চাংশিলে অবস্থানকালীন সময়েই লুসাইরা হাউলং, সাইলো- কুকি সহযোগে পরিকল্পনামাফিক সুরমা-বরাক সমতলে ধারাবহিক আক্রমণে নেমে পড়ে। বস্তুতপক্ষে এত বড় সংঘবদ্ধ আক্রমণ ঔপনিবেশিক পর্বে কিংবা তার আগে সংঘটিত হয়নি বরাক সমতলীয় পরিসরে। তার সাথে একমাত্র তুলনা করা চলে ১৮৬০ সালে জেলা ত্রিপুরার অন্তর্গত খণ্ডল পরগণার ছাগলনাইয়া থানার ভয়াবহ ঘটনা। সরম্বতী পূজার দিন একে একে ১৫ খানা গ্রাম লুণ্ঠন, গণহত্যা সহ ১৮৫ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায় হানাদার বাহিনী। তার মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন স্ত্রীলোক, বিশেষত যুবতী।(৩৮) তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুরমা-বরাকের আক্রমণের ঘটনাটি এক ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছিল।

সুরমা-বরাকে লুসাই আক্রমণের ঘটনাটি ঘটে ২৩ জানুয়ারি ১৮৭১ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৭১ পর্যন্ত। মাত্র এক মাস ৪ দিনের মধ্যে আক্রমণকারীরা ১২টি লোমহর্ষক অভিযান সংঘটিত করে। হতাহতের সংখ্যা অনেক। আক্রান্ত স্থলগুলি হল –

VM Lushai 4.png

সুরমা-বরাকে সংঘটিত হওয়া উপরোক্ত ঘটনার বছর কয়েক আগে কর্ণফুলি ভ্যালির লুসাই চিফ্ রতন পুঁইয়ার নেতৃত্বে সমতল কাছাড়ের বাঙ্গালী অধ্যুষিত গ্রামাঞ্চলে নৃশংস আক্রমণ সংঘটিত হয়েছিল। পাশবিক এই অভিযানের বর্ণনা দিয়েছিল রতন পুঁইয়ার কিশোর বয়সী এক সহচর। চট্টগ্রাম কলামের সিভিল অফিসার Cap.T.H.Lewinকে দেওয়া সেই ভয়ানক বিবরণ এখানে বিধৃত করার কোনো অভিপ্রায় নেই; তবে এটুকু অন্তত বলা যায় যে, কিশোরবয়সী শিক্ষানবিশরা চীফের সৌজন্যে সেসময় হাতেকলমে সফল অভিযানের 'সহজপাঠ' নিয়েছিল। 'বিহ্বল শিকারের' তাজা রক্ত কিংবা কলজের স্বাদ নেওয়াটা ছিল শিক্ষানবিশদের পাঠ্যাভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া সফল অভিযান শেষে রক্তস্নাত দেহেই 'ভিলেজে' ফেরাটাও ছিল প্রচলিত রীতি (---when successful in a forey, they are careful not to wash the blood-stains from their hands until they return home.---- A Fly on the Wheel by T.H.Lewin, page-244-246). অভিযান শেষে তাদের জন্য অপেক্ষা করত জমকালো আবাহন এবং সাদর আপ্যায়ন পর্ব।

  

সেদিনের সেই চিফ্ রতন পুঁইয়া পরবর্তীকালে আনুগত্য প্রকাশ করে ব্রিটিশ পরিচালিত লুসাই Expeditionএ চট্টগ্রাম কলামের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিলেন।

  

সমসাময়িককালে অনুরূপ আক্রমণ সংঘটিত হয়েছিল ত্রিপুরা এবং মণিপুরে। ১৫ ফ্রেব্রুয়ারি মণিপুরের ঘটনায় ৪০টি নরমুণ্ড সংগ্রহ করে ২০ জনকে বন্দি করে নিয় যায় লুসাই কুকিরা। পরবর্তীতেও দক্ষিণ হাইলাকান্দি অঞ্চলের বরুণছড়া চা-ক্ষেত্রে লুসাই আক্রমণ সংঘটিত হয়েছিল। এপ্রিল ১৮৯২ সালের উক্ত ঘটনায় ৪২ জন চা-শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল এবং আহত অনেক। যে ঘটনাগুলি পরবর্তীতে লুসাই অধিগ্রহণের (Annexation) পথকে প্রসারিত করেছিল। সুরমা-বরাকও একসময় পরিচিতি হারিয়ে বৃহত্তর বাংলার ভৌগোলিক মানচিত্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। আম  জনতার শত  প্রতিরোধ, গণ-আন্দোলন সত্তেও। ব্রিটিশরা পার্বত্য লুসাই প্রদেশের প্রশাসনিক কর্মসম্পাদনের জন্য  বেছে নিয়েছিলেন বরাকের মাটি, তারই ফলশ্রুতিতে সুরমা-বরাক ১৮৭৪ সালে বাংলার মানচিত্র থেকে বেরিয়ে এসে অন্তর্ভুক্ত হয় নবগঠিত আসাম প্রদেশের মানচিত্রে। ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে সামিল হয়েও সুরমা-বরাক তাঁর হৃত মর্যাদা ফিরে পায়নি, যেমন ফিরে পায়নি ১৯২৪ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনোত্তর পর্বেও। এসবের অন্যতম কারণ বরাকের মাটি ব্যবহার করে ব্রিটিশের ‘লুসাই শাসন’।

যাই হোক, আমরা ফিরে আসি ১৮৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহে। তৎকালীন সংঘটিত হওয়া সবকয়টি নৃশংস ঘটনা ব্রিটিশ অধিকৃত অথবা ব্রিটিশ অনুগত অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছিল অত্যন্ত সংঘবদ্ধভাবে।এবং প্রায় প্রতিটি অভিযানে হানাদার বাহিনীর সংখ্যা ছিল অগুনতি। এটি নিশ্চিতভাবেই ছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। আলেকজান্ডারপুর চা-বাগানের প্ল্যান্টার এর বাংলোটি ছিল কাৎলাছড়া থেকে বোকাবিল হয়ে ছাতাচুড়া পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তার ডানপাশের বেশ উঁচু টিলায়। এবং বাগানের কুলি লাইন থেকে অনেকটা দূরে। ২৩ জানুয়ারি ভোরবেলার আকস্মিক ঘটনায় একাকী উইনচেস্টার এবং তাঁর মণিপুরি পত্নী কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই নৃশংস আক্রমণের শিকার হন। তাঁদের হত্যা করে আক্রমণকারীরা অপহরণ করে নিয়ে যায় ৬ বছরের শিশুকন্যা মেরিকে। ‘M/s Bagshawe and Cooke’ কোম্পানির অধীন কাৎলাছড়া চা-বাগানের আধিকারিকরা যদিও তাঁদের বাংলো আক্রমণ প্রতিহত করতে পেরেছিলেন, তবে তাঁদের বাগানের কুলি লাইন আক্রান্ত হয়। ৫ জন চা-কুলি নিহত এবং আহত হয় অনেক। পরে পার্শ্ববর্তী বাগানের প্ল্যান্টার উইনচেস্টারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে দুইজন কাবুলি ফল ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নিয়ে আলেকজান্ডারপুর যান, উদ্ধার করেন হতভাগ্যদের মরদেহ সহ গুরুতরভাবে আহত  চা-শ্রমিকদের। কর্ণফুলি ভ্যালির হাউলং চিফ ভেঙ্কুইয়ার নেতৃত্বে আলেকজান্ডারপুর-কাৎলাছড়ার নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য যে জেমস্উইনচেস্টারের সহধর্মিণী ছিলেন তারাপুরের মণিপুরি রমণী। চা-বাগান সন্নিহিত এলাকায় একাধিক তারাপুরের উপস্থিতি রয়েছে সুরমা-বরাকে, যেখানে উনবিংশের সূচনাপর্ব থেকে মণিপুরি বসতি গড়ে উঠেছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, দর্মিবাজার পার্শ্ববর্তী বন তারাপুর, বিহাড়া-বিক্রমপুর-ডলু বাগান সন্নিহিত অঞ্চলের তারাপুর, দক্ষিণ-শ্রীহট্টের ‘চা- সাম্রাজ্য’ শ্রীমঙ্গল সন্নিহিত অঞ্চলের তারাপুর। ওইসব জায়গাই মণিপুরি অধ্যুষিত অঞ্চল। উইনচেস্টার সহধর্মিণীর পূর্ব নিবাস সম্ভবত শেষোক্ত দু'টির মধ্যে যে কোনও একটি হতে পারে। লুসাই আক্রমণে নিহত হন সস্ত্রীক উইনচেস্টার, কিন্তু ইউরোপীয় লেখকদের কলমে উপেক্ষিতাই রয়ে গেলেন ‘নেটিভ রমণী’, এমনকী উপেক্ষিতা হয়েই থাকলেন পরবর্তীকালের স্মৃতিতর্পণেও। রাজমালাকার কৈলাশচন্দ্র সিংহের মতে সমতল  বরাক সহ ত্রিপুরা ও মণিপুরের ঘটনাবলীর সাথে জড়িত ছিলেন সাইলো চিফ্ সাবোঙ্গা, হাউলং চিফ্ লালসোবানা ও সাইপোয়া, খচাই চিফ বোনপুইলাল এবং তার মা ইস্পানু, বনোলাল ও তার দুই ছেলে লালবোরা ও জোংদা, ধলেশ্বরী ভ্যালির সুকপাইলাল ও তার দুই ছেলে এবং বোন ভানুইথাঈি।(৪০)

বরাক উপত্যকায় লুসাই আক্রমণের সময় কাছাড়ের Dy. Commissioner Mr. John Edgar পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুসারে লুসাই প্রদেশ সফরে ছিলেন। ধলেশ্বরী ভ্যালির চাংশিলে অবস্থান করে তিনি লুসাই চিফ্ সুকপাইলালের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত করছিলেন। আলেকজান্ডারপুর চা-ক্ষেত্র আক্রমণ, লুণ্ঠন, গণহত্যা ইত্যাদি সংঘটিত হওয়ার মাত্র সপ্তাহখানেক আগে ১৬ জানুয়ারি উভয়ের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সে সময় সুকপাইলালকে সনদ প্রদান করেন Edgar। তাঁর লুসাই সফর সংক্রান্ত রিপোর্ট ‘Paper Regarding the Lushai Country and Policy’- Part-1 থেকে জানা যায় যে লুসাই সফররত Edgar চাংশিল অবস্থানকালীন সময়ে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাছাড়-সিলেট আক্রমণের আগাম আভাস পান, তবে আক্রমণের সম্ভাব্য স্থল নিয়ে তাঁর কাছে বিভ্রান্তিকর খবর পৌঁছোচ্ছিল।  ৯ জানুয়ারি ১৮৭১ তারিখে সুকপাইলালের লোক তাঁকে জানায়, হাউলং চিফ্ বাহিনী হিচক পাহাড় ধরে লঙ্গাই ভ্যালিতে নামছে। উদ্দেশ্য চিফের প্রয়োজনে নরমুণ্ড সংগ্রহ। তিনি তৎক্ষণাৎ Mr. Mc. William-কে নির্দেশ দেন সিলেট-ঢাকায় তারবার্তা পাঠানোর জন্য। ১৬ জানুয়ারি সুকপাইলাল জানান, হানাদার বাহিনীর উদ্দেশ্যস্থল জাম্পুই রেঞ্জ অতিক্রম করে ত্রিপুরা। পরদিন চাংশিল-এর দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের লোক এসে জানায় যে ৫০০ জনের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে বনোলালের পুত্র সোনাই ভ্যালির দিকে এগোচ্ছেন৷ উদ্দেশ্য বাঙালি অধ্যুষিত গ্রাম আক্রমণ। Mr. William-কে সাথে সাথে খবর পাঠানো হয় সোনাই সীমান্ত সুরক্ষার জন্য। কিন্ত আলেকজান্ডারপুর, কাৎলাছড়া কিংবা ধলেশ্বরী ভ্যালির অন্যান্য চা-বাগান আক্রমণের কোনও পূর্বাভাস Edgar-এর কাছে পৌঁছেনি। পরস্পর বিভ্রান্তিকর সংবাদ তাঁকে সন্দিহান করে তুলছিল। দক্ষিণ সীমান্তের কুকি চিফ্ রতন পুঁইয়া যেভাবে চিটাগাঙ হিল ট্র্যাক্ট- এর অফিসারদের বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়ে সময় সময় অর্থকরী খেয়ালে মেতে উঠছিলেন, এডগারের মনে হল সুকপাইলালও এবার বোধহয় সে পন্থাই অবলম্বন করছেন। এরূপ ডামাডোল পরিস্থিতির প্রায় শেষ মুহূর্তে ১৯ জানুয়ারি রাত্রিবেলা একদল লোক এসে জানায়, সোনাই ভ্যালির হানাদার বাহিনী তাদের গন্তব্য পরিবর্তন করে এবার রেংটি পাহাড়ের দিকে এগোচ্ছে অর্থাৎ কলাশিব অভিমুখে। এই সংবাদের মাত্র একদিন পর অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি ভোরবেলায় আলেকজান্ডারপুর এবং ঘণ্টা দু'এক পর কাৎলাছড়া চা-ক্ষেত্র আক্রমণ!একইদিনে নৃশংস আক্রমণ ঘটে আয়নাখাল চা-বাগানেও, পরবর্তীতে আবারও লক্ষ্য কাৎলাছড়া। অর্থাৎ ধলেশ্বরী ভ্যালির চা-ক্ষেত্র সুরক্ষার কোনরূপ সুযোগই রইল না কাছাড় প্রশাসনের কাছে।

রেংটি পাদদেশের ঝালনাছড়া চা-ক্ষেত্রে পরবর্তীতে (২৩-২-৭১) আক্রমণ ঘটলেও তেমন কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি জেলা প্রশাসনের সময়োচিত হস্তক্ষেপে, তবে আক্রান্ত হয়েছিল কুলি লাইন এবং মৃত্যু ডেকে এনেছিল ৪ জন শ্রমিকের।

 পর্ব ৪ 

সাত : ব্রিটিশের লুসাই অভিযান (Expedition)

 

বরাক সমতলের বুকে ঘন ঘন সংঘটিত হওয়া লুসাই কুকিদের Winter Raids ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। ১৮৭১-এর ঘটনাবলী চা-শিল্পোদ্যোগ ও চা-মানচিত্রের সুদৃঢ় ভিতকেই কাঁপিয়ে তুলে, সংবাদটি British House of Commons এ পৌঁছে যায় যথাসময়েই। ভারত সরকার থেকে বৃহত্তর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয় এবং সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রশাসনের তরফ থেকে রিপোর্ট তলব করা হয়। এর উপর ভিত্তি করে বাংলার লেফঃ গভঃ Sir G. Campbell বড়লাট Lord Mayo'র কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করেন ১৮ মে ১৮৭১ তারিখে। 


Sir G. Campbellএর সুপারিশক্রমে ভারত সরকারের গভর্নর জেনারেল ইন্ কাউন্সিল ১১ জুলাই ১৮৭১ সালে এক বিজ্ঞাপন জারি করেন যে পরবর্তী নভেম্বরের মধ্যভাগ থেকে ডিসেম্বরের এক তারিখের মধ্যেই কাছাড়-চট্টগ্রাম দু'দিক থেকেই সামরিক অভিযান শুরু হবে। কাছাড়ের ডেপুটি কমিশনার জন এডগার এবং চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন লেউইন সংশ্লিষ্ট কলামের  সিভিল অফিসার হিসেবে অভিযানে অংশগ্রহণ করবেন। সেনানায়ক হিসেবে কাছাড় কলাম (Left Column) এবং চট্টগ্রাম কলাম (Right Column) এর দায়িত্বে থাকবেন যথাক্রমে জেনারেল বোরসিয়া এবং জেনারেল ব্রাউনলো। 42nd & 44th Assam Light Infantry এবং 22nd Punjab Native Infantry-র   সেনাদল নিয়ে সমৃদ্ধ করা হবে কাছাড় কলাম। অনুরূপ ভাবে চট্টগ্রাম সেনাদলের মুল সামরিক শক্তি থাকবে Gurkha Regiment। ব্রিটিশ অনুগত লুসাই চিফ্ সুকপাইলাল এবং রতন পুঁইয়া যথাক্রমে কাছাড় এবং চট্টগ্রাম কলামের সহযোগিতায় থাকবেন। উভয় কলামের অভিযান শুরু হবে যথাক্রমে টিপাইমুখ ও দেমাগিরি থেকে নভেম্বর ডিসেম্বর ১৮৭১-এ এবং অভিযান সম্পূর্ণ করতে হবে ১০ মার্চ ১৮৭২ তারিখের মধ্যেই। উভয় কলামের সাথে সার্ভেয়ার থাকবেন, যারা সমগ্র লুসাই প্রদেশ সার্ভে করবেন। ত্রিপুরার Political Agent নির্ধারণ করবেন লুসাই ত্রিপুরার সীমানা।(৪১)

 

ভারত সরকারের গভর্ণর-ইন-কাউন্সিলের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে, এই সামরিক অভিযানে লুসাই চিফ্দের বুঝিয়ে দিতে হবে যে, সমগ্র লুসাই প্রদেশ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছে কোনোভাবেই দুর্ভেদ্য কিংবা অগম্য নয় (----to show the Lushais that there is no part of their hills to which our armed forces cannot penetrate )। ( Source - The North East Frontier of India by Alexander Mackenzie, page - 312 ).


ঐতিহাসিক লুসাই অভিযানের প্রস্তুতিপর্ব :

 

পূর্বকুল প্রদেশের ত্রিপুর রাজছত্রাধীন অঞ্চল ব্যতীত দক্ষিণাঞ্চলবর্তী সুবিশাল ভূখণ্ড প্রায় অনাবিষ্কৃত ছিল। তদুপরি স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা প্রস্তাবিত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যে এক বিরাট প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে সেটি Lister's Expdtn.-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। সুতরাং এ ব্যাপারে উভয় কলামের প্রয়োজনে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছিলেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। দেখা যায় গভীর জঙ্গল কেটে পায়ে চলার পথ করে দেওয়া, সামরিক অভিযানের অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ বহন করা এবং স্থানে স্থানে শিবির গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন হাজার হাজার শ্রমিক। স্থানীয় স্তরে এত শ্রমিক সংগ্রহ দুষ্কর, তাই দার্জিলিং সহ উত্তরভারতীয় শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছিল। সংগৃহীত শ্রমিক সংখ্যা থেকে কাছাড় কলামের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল 2764 জন এবং চট্টগ্রামের জন্য 2791জন। দুই টাকা বাট্টা সহ আট টাকা মাস মাইনে ধার্য করা হয়েছিল সাধারণ শ্রমিকের জন্য এবং তিন টাকা বাট্টা সহ দশ থেকে বারো টাকা বরাদ্দ ছিল সর্দারদের জন্য। জাহাজ পরিবহন ব্যবস্থায় কলেরা আক্রান্ত হয়ে দূরদেশাগত শ্রমিকের মৃত্যুর হার তেমন নগন্য ছিলনা, যেটি কাছাড়ের ক্ষেত্রে 5.9% এবং চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে 4.3% হারে দাঁড়িয়েছিল।


এছাড়াও ঐসময় স্থানীয় স্তরে (কাছাড় কলামের জন্য) শ্রমিক সংগ্রহ এবং রসদ সরবরাহ সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন হাইলাকান্দির হরিচরণ শর্ম্মা মহাশয়(1827--1907)। এই কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ এডগার সুহৃদ হরিচরণ বাবুকে "রায়বাহাদুর" অভিধায় ভূষিত করেছিলেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও 470 একর পরিমিত নিষ্কর ভূমিও পুরস্কার স্বরূপ লাভ করেছিলেন Special Extra Asstt. Commissioner হরিচরণ শর্ম্মা। (সূত্রঃ- শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত ( উত্তরাংশ), অচ্যুৎচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, সরস্বতী লাইব্রেরী পাবলিকেশন, শিলচর, 1324 বঙ্গাব্দ। পৃষ্ঠা-7)।


অনুরূপভাব চট্টগ্রাম কলামের ক্ষেত্রে ব্রিটিশের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্তর্গত রাঙ্গামাটির চাকমা চিফ্ কালিন্দী রাণী(কার্যকাল 1855--1873)। রাইট কলামের ক্ষেত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ কতৃর্পক্ষ কালিন্দীপৌত্র হরিশ্চন্দ্রকে "রায়বাহাদুর" উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। 1873 সালে রাণীর মৃত্যুর পর হরিশ্চন্দ্রকে রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। (Source -- "Chittagong Hill Tracts" by  R.H.Sneyd Hutchinson, page-- 38 )।


1871 সালের এই বৃহত্তর লুসাই Expedition এ 178 টি হাতিরও সাহায্য নেওয়া হয়েছিল, বিশষত কাছাড় কলামের প্রয়োজনে। প্রতিটি কলামের জন্য নিয়োজিত হয়েছিলেন অন্যূন 1500 জন সশস্ত্র সৈন্য সহ ছোটো বড়ো সেনা আধিকারিক সহ পুলিশ প্রশাসন।ছিলেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসনিক আধিকারিক এবং কর্মীরা। তদুপরি সামরিক অভিযানের নিত্যদিনের অগ্রগতি সহ আনুষঙ্গিক চিঠিপত্র, তারবার্তা আদান-প্রদান ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার জন্য ডাক ও তার বিভাগীয় উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও কর্মীরাও এই অভিযানে সামিল হয়েছিলেন। এ বিষয়ে কাছাড় কলামের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন বিভাগীয় আধিকারিক তথা "নীলদর্পণ" খ্যাত নাট্যকার ও লেখক দীণবন্ধু মিত্র। তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে "রায়বাহাদুর" উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। (সূত্র - "রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ" -by শিবনাথ শাস্ত্রী, পৃ --334)।


এক : কাছাড় কলাম (Left Column)-এর অভিযান


হস্তীযূথ সহযোগে সুবিশাল সৈন্যবাহিনী সহ অন্যান্য বিভাগীয় আধিকারিক-কর্মী এবং শ্রমিকরা পূর্বনির্ধারিত সূচী অনুযায়ী শিলচর থেকে রওয়ানা হয়ে বরাক-টিপাই সংযোগস্থল টিপাইমুখ এসে পৌঁছেন ১৫ ডিসেম্বর ১৮৭১ তারিখে। তারপর অনুগত চিফ্ সুকপাইলাল কাছাড় কলামের সহযোগিতার জন্য এখানে এসে মিলিত হন। শুরু হয় বৃহত্তর সামরিক অভিযান। এই কলামের অন্তর্গত এলাকা ছিল পূর্বে টিপাই ও সোনাই ভ্যালি, মধ্যে ধলেশ্বরী ভ্যালি, পশ্চিমে ছাতাচূড়া-হিচক পার্ব্যত্য পরিসর এবং প্রদেশটির  দক্ষিণ-পূর্বাংশের চম্পাই এলাকা। এত বড় প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার সাহস দেখাতে পারেননি দুর্ধর্ষ চিফটেইন সাম্রাজ্যের অধিপতিরা। তাঁরা একে একে ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হন। বশ্যতা স্বীকার করেন পাইবই, লালবোরা, বনপুইলাল, বনোলাল সহ অন্যান্য লুসাই চিফ্। এই অভিযানে কাছাড় কলাম লুসাই চিফ লালবোরার কাছে যে শর্তাবলী আরোপ করেছিল তা Mackenzie'র ভাষায় --- 


1) The Agents from the Govt. should have free access to Lalboora's village and transit though his country.

2) Three Hostages should accompany the Column to Tipaimukh.
3) The Arms taken at Monierkhal and Nundigram, or an equal no. of their own, should be surrendered.
4) That a fine of two elephants' tusks, 1set of war gongs, 1 necklace, 10 goats, 10 pigs, 50 fowls and 20 maunds of husked rice should be delivered within 24 hours. (The N.E.Frontier of India  by Alexander Mackenzie, page -314).


বলাবাহুল্য যে, কাছাড় কলামের শর্তাবলী যথাসময়েই পূরণ করা হয়েছিল। এই অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে বরাক সমতল থেকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হতভাগ্যদের। কাছাড় কলামের এই Expdtn. শিলচর থেকে লুসাই প্রদেশের 193 মাইল অভ্যন্তর অবধি পৌঁছেছিল, যে দূরত্বটি টিপাইমুখ থেকে 110 মাইল। কাছাড় কলাম অর্থাৎ লেফ্ট কলাম তাদের এই সফল অভিযান সম্পন্ন করে কাছাড়ে ফিরে এসেছিল 10 মার্চ 1872 তারিখে। (সূত্র -- পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা- 314)।


দুই : চট্টগ্রাম কলাম (Right Column)-এর অভিযান


এই কলামের অভিযান এলাকা ছিল দুর্ধর্ষ হাউলং, সাইলো অধ্যুষিত সুবিশাল পার্বত্য পরিসর, পার্বত্য চট্টগ্রাম-বার্মা ছিল এদের প্রতিবেশী এলাকা। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান এই যুদ্ধৃগোষ্ঠি গেরিলাযুদ্ধেও ছিল পারদর্শী। ধলেশ্বরীর উপরাংশ, কর্ণফুলি এবং ফেনী অববাহিকার এই জনগোষ্ঠীই ছিল 1871'র সমতল কাছাড় অভিযানের মূল চালিকাশক্তি। তাই ব্রিটিশ পরিচালিত এই অভিযানের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।


মূখ্যত জলপথই ব্যবহার করা হয়েছিল এই অভিযানের অভিকেন্দ্রে পৌঁছতে। এখানে উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম মহানগরের গা-ছুঁয়ে বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়েছে সুবিশাল কর্ণফুলি নদী। লুসাই প্রদেশের লুংলের উত্তরাংশ থেকে উৎপন্ন হওয়া এই নদীটির উজান বেয়ে যাত্রা শুরু হয় এই কলামের। পথে পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সদর স্টেশন রাঙ্গামাটি, বড়খাল প্রভৃতি সমৃদ্ধ জনপদ। মূলত গোর্খা প্রাধান্যে গড়ে তোলা মিলিটারি বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল ব্রাউনলো, মেজর ম্যাকডোনাল্ড, সিভিল অফিসার ক্যাপ্টেন থোমাস হারবার্ট লেউইন, পুলিশ সুবেদার মোহম্মদ আজিম সহ অন্যান্য বিভাগীয় সরকারি আধিকারিক-কর্মীরা এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন।বড়খাল থেকে এই Expdtn. কলামে এসে যোগ দেন অনুগত লুসাই চিফ্ রতন পুঁইয়া। কর্ণফুলি তীরবর্তী দেমাগিরিতে (বর্তমান কালের Tlabung ) গড়ে তোলা হয় কেন্দ্রীয় শিবির।


চিফ্ রতন পুঁইয়ার প্রাথমিকভাবে সংশয় ছিল যে ব্রিটিশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং দৌত্যকর্ম এসব পক্ষান্তরে অভিযানোত্তর পর্বে তাঁর জন্য কী ভয়ানক বার্তা বয়ে নিয়ে আসছে! কিন্তু দেমাগিরিতে এসে ব্রিটিশ বাহিনীর বহর এবং সমর সজ্জা দেখে সে আশঙ্কাটি দূর হয়েছিল। Alexander Mackenzie লিখছেন --


"---- but the prospect of a large force assembling at Demagiri in the neighbourhood of his own village no doubt influenced him to cast his lot with us---- and subsequently throughout the whole expedition, he was of the greatest possible assistance in carrying on negotiations". (The N.E.Frontier of India, Alexander Mackenzie, page -314-15).


যাই হোক, দেমাগিরিতে গড়ে তোলা শিবির থেকে চট্টগ্রাম কলামের অভিযান শুরু হয় ০৯ ডিসেম্বর ১৮৭১ তারিখে। এই পর্বে সাইলো, সাবোঙ্গা চিফ অধীন সাম্রাজ্য মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়। এর পর শুরু হয় শক্তিশালী লুসাই চিফ ভেঙ্কুইয়া, সাংভুঙ্গা সহ অন্যান্য চিফ অধীন উত্তর হাউলঙ্গ সাম্রাজ্য অভিযান। মূলত এরাই 1871সালের সমতল বরাক অভিযানের মূল কারিগর ছিলেন। এবং তাঁরাই আলেকজাণ্ডারপর, কাটলিছড়া, আয়নাখাল সহ অন্যান্য স্থানে অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন এবং অপহরণ করেছিলেন মেরি উইনচেস্টারকে। Cap.T.H.Lewin (1839--1916) এর বুদ্ধিশালিতা এবং রাজনীতি কুশলতার ফলেই সেসময় এদের কবল থেকে অপহৃতা বালিকাকে উদ্ধার করে আনা সম্ভব হয়েছিল। তাঁর প্রেরিত দু'জন দূত ভেঙ্কুইয়ার হাত থেকে মেরিকে উদ্ধার করে এনে সমঝিয়ে দেয় সুবেদার মোহম্মদ আজিমের হাতে, যিনি তাকে রতন পুঁইয়ার আশ্রয়ে রেখে আসেন। পরবর্তীতে Col. Tytler প্রেরিত আধিকারিক সেখান থেকে মেরিকে নিয়ে এসেছিলেন। সেদিন এই আধিকারিক মেরিকে সেখানে যেভাবে দেখেছিলেন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে Cap T.H.Lewin লিখেছেন--- 


"----- The Officer who was sent by Col. Tytler to take over her from Rutton Poia, found the little maid sitting on the log platform of the Chief's house, having for clothing only a blue rag round her loins, and with a pipe in her mouth, issuing sententious commands to a troop of small boys who were disporting themselves before her ". (Source :- "A Fly on The Wheel" by Thomas Herbert Lewin, 1885 Edn., page -414).


পরবর্তীতে Col. Tytler মেরিকে পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন বেঙ্গল গভ. এর হাতে, সেখান থেকে শিশুটিকে Scotland এ তার আত্মীয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষিতা মেরি উইনচেস্টারের (1865--1955) লাগাতার প্রচেষ্টার ফলে লুসাই প্রদেশ থেকে নৃশংসতম এবং অমানবিক দাস প্রথা (বাওয়াই প্রথা) আইনানুগ ভাবে (1919--1923 সালের মধ্যে) বিলোপ করা সম্ভব হয়েছিল। এটিই সেই প্রথা যার আগ্রাসী ক্ষুধায় সময়াসময় শশ্মাণের রূপ নিয়েছিল সুরমা-বরাকের সমৃদ্ধশালী সমতলীয় জনপদ।


যাই হোক এবার ফিরে আসি অভিযান প্রসঙ্গে। সাঙ্গভুঙ্গারা ভেবেছিলেন ব্রিটিশের এই অভিযান হয়তো অপহৃতা মেরিকে উদ্ধারের জন্যই পরিচালিত হচ্ছিল, তবে তাঁদের সে ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। চট্টগ্রাম কলাম ভেঙ্কুইয়া সাম্রাজ্যের দিকে অভিযান জারি রাখে। ঐসময়েই এক গভীর রাতে নিঃশব্দতা ভেদ করে এক কন্ঠস্বর Cap. Lewin এর শিয়রের পাশে এসে যেন বলে "Thangliena! Thangliena! do you hear?". হাড় হিম করা এ আওয়াজে ঘুম থেকে জেগে উঠেন লেউইন, যাঁকে লুসাইরা Thangliena বলেই জানতো, শুনতে চেষ্টা করেন জঙ্গল থেকে ভেসে আসা আওয়াজটির পরবর্তী ঘোষণা। গোটা শিবিরটি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, শুধু শোনা যাচ্ছে নাসিকা গর্জণ। আগন্তুকের কন্ঠস্বর আবার শোনা গেলো-- "The great Chiefs will be at the Tuldung stream tomorrow at dawn, but you must come alone, without any soldier". সেই রাতেই লেউইন সিদ্ধান্ত নিলেন "They needed personal dealing, personal authority, personal promises. After all, I had played with my life for much smaller stakes, so I determined to go". (Source -- A Fly on the Wheel, T.H.Lewin, page - 421-424 )।

 

পরদিন খুব ভোরে লেউইন একাকি রওয়ানা হন Tuldung (ধলেশ্বরী) নদীর দিকে, ক্যাম্পের সবাই তখনও গভীর ঘুমে। জঙ্গলাকীর্ণ পথ ধরে চলতে গিয়ে মনে হলো অলক্ষ্যে তাঁকে অনুসরণ করে চলেছে একাধিক সশস্ত্র লুসাই যোদ্ধা! ভয় প্রকাশ না করে তিনি নদী পেরিয়ে চিফদের ডেরায় গিয়ে হাজির হন। লেউইনের সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা এবং কৌশলগত অবস্থান ভেঙ্কুইয়া, সাঙ্গভুঙ্গা সহ অন্যান্য চিফদেরকে বাধ্য করে আনুগত্য প্রকাশে। চলমান যুদ্ধপরিস্থিতি থেকে তাঁদের নিষ্কৃতি পেতে গেলে কয়েকটি শর্ত আরোপ করেন লেউইন। Cap. Lewin এর ভাষায়  শর্তগুলি হচ্ছে --- 


"---- they should give up all British subjects whom they held captive, or account for them, according to lists which I had in my possession; also free and friendly access to their villages both now and future must be granted to us; and further, I required them to take a solemn oath to abstain from making any raids in future upon British territory. If they complied with these conditions our force would be withdrawn." (Source -- A Fly on the Wheel, p-424).
 

বলাবাহুল্য যে, লেউইন প্রদত্ত শর্তাবলি চিফরা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম কলামের এই অভিযানে সাইলো, হাউলোঙ্গ (নর্থ), হাউলোঙ্গ (সাউথ) অন্তর্গত সাভুঙ্গা, সাইলো, সাঙ্গভুঙ্গা, ভেঙ্কুইয়া, ভনদোলা মিলে সর্বমোট 22 জন লুসাই চিফ ব্রিটিশের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। (Source - The N.E.Frontier of India, A.Mackenzie, page --316).

 

নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই লুসাই অভিযান সম্পূর্ণ করে উভয় কলামের উদ্যোগে  মুক্ত করে আনা হয় অপহৃত চা-শ্রমিক বং অন্যান্য সাধারণ বন্দিদের। উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন বাগান থেকে লুণ্ঠন করে নিয়ে যাওয়া বিভিন্ন বস্তু। এ অভিযানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছে বশ্যতা স্বীকার করেন লালবোরা, পাইবই, বনপুইলাল, বনোলাল সহ সাইলো, হাউলং (উত্তর ও দক্ষিণ) প্রভৃতি অঞ্চলের চিফরা। চট্টগ্রাম কলামের অভিযানের সময় ১৮৭২ সালের ফ্রেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে উত্তর হাউলং অঞ্চলের চিফ ভেঙ্কুইয়ার হাত থেকে উদ্ধার করা হয় মেরি উইনচেস্টারকে। এ তথ্য জানা যায় Capt. T. H. Lewin-এর লুসাই অভিযান সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে (Secretary to the Govt. of Bengal, No.- 22, Dt. Chittagong, the 26th March 1872)


উক্ত অভিযানকালীন সময়ে সমগ্র লুসাই প্রদেশের ৬৫০০ বর্গমাইল এলাকা সার্ভে এবং মানচিত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল।


এখানে উল্লেখ্য যে হাইলাকান্দির অধিবাসী তথা Special Extra Asstt. Commissioner রায়বাহাদুর হরিচরণ শর্মা লুসাই অভিযান কিংবা তার পূর্ববর্তী সময়ে জেলাশাসক এডগারের লুসাই প্রদেশের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। স্থানীয় ব্রিটিশ প্রশাসন বহু ভাষাবিদ হরিচরণ শর্মার নিকট থেকে অভিযানকালীন সময়ে সাহায্য লাভ করেছিলেন বিভিন্নভাবে। তাঁর সাথে যেমন মিঃ এডগারের খুব হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তেমনই ছিল লুসাই চিফ সুকপাইলালের সাথেও। মৃত্যুকালীন সময়ে (১৮৮১খ্রি:) রায়বাহাদুরের একান্ত সাক্ষাৎপ্রার্থী ছিলেন সুকপাইলাল।উর্ধ্বতন মহলের অনুমোদনক্রমে মৃত্যু পথযাত্রী লুসাই চিফ তথা বন্ধু সুকপাইলালের শিয়রের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হরিচরণ শর্মা।(৪২) 

 

আট  : ১৮৭১ সালে চা বাগান পরিসরে লুসাই অভিযানের প্রেক্ষাপট

 

১৮৭১ সালে বরাক সমতলে লুসাই আক্রমণের সম্ভাব্য কারণ সম্বন্ধে সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট পণ্ডিত গবেষকরা। এখানে Sangkima লিখছেন - 


মিজোদের শিকারস্থল এবং স্বাভাবিক বিচরণ ক্ষেত্রে চা-বাগান পত্তন এবং সম্প্রসারণের ব্যাপারটি ব্রিটিশের আগ্রাসন বা অনধিকার প্রবেশেরই নামান্তর, সুতরাং চা-ক্ষেত্র এবং তার সন্নিহিত জনবসতিতে মিজো আক্রমণ আবশ্যকীয় হয়ে পড়েছিল। তিনি তাঁর যুক্তির স্বপক্ষে ডঃ সুহাস চট্টোপাধ্যায়ের উক্তিটি - ‘Lushai Country was annexed in the interest of the tea industry’তুলে ধরেন।(৪৩) 

 

শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সুজিৎ চৌধুরী তাঁর ‘Mizo Quest in Retrospect’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে ১৮৭১-এর মিজো Raids-এর পিছনে ব্রিটিশের চা-ক্ষেত্র সম্প্রসারণ ছাড়াও তাঁদের হাতি ধরা এবং হাতি খেদা ব্যাপারটি জড়িত ছিল। অধ্যাপক চৌধুরীর ভাষায় – 


‘Firstly, the expansion of Tea Estates in Southern Cachar and South East Sylhet …… was bound to give rise to tension and conflict became inevitable. The regions which were …… no doubt within the British dominion but the Mizos considered these areas as their natural habitat within their migratory tract, so the Mizos regarded plantation of Tea as an encroachment on their habitat. Secondly, the East India Company encouraged capturing of wild elephants in forest by Kheda system …… often Kheda operation damaged their crops …… they hindered the process of developing a co-ordial relationship.’ (৪৪)

 

শ্রদ্ধেয় সুজিৎ চৌধুরী, ডঃ সুহাস চট্টোপাধ্যায়, Prof. Sangkima প্রভৃতি চিন্তাবিদদের বিশ্লেষণ অতি অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। তবে ১৮৭১-এর ঐতিহাসিক লুসাই Raids এর প্রেক্ষাপটে সম্পৃক্ত হয়ে থাকতে পারে আরও একাধিক কারণ :-


প্রথমত,

১৮৬৯-৭০ সালের ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে জন এডগার এর লুসাই সফর সংক্রান্ত বিষয়ে Observer-এর প্রতিবেদন আমাদেরকে আরেকটু ভাবার সুযোগ করে দিচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৭১ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমরা দেখতে পাই কাছাড়ের Dy. Comm. John Edger সীমান্ত অঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলার প্রয়োজনে ধলেশ্বরীভ্যালীর লুসাই চিফ সুকপাইলালের হাতে তুলে দিচ্ছেন অধিকতর ক্ষমতা। ব্যাপারি বাজার (চাংশিল)-এ ব্যবসা বাণিজ্য ও ধলেশ্বরী-বাহিত পণ্যদ্রব্যের উপর একতরফাভাবে শুল্ক আদায়ের ছাড়পত্র তুলে দেওয়া ছাড়াও সুকপাইলালকে উপহার স্বরূপ দিচ্ছেন স্বর্ণ-খচিত পায়জামা ও কোর্তা, সিল্কের রঙিন টুপি, বাহারি নেকলেস ইত্যাদি।

 

Observerএর রিপোর্ট মতে, এ ব্যাপারগুলো অন্যান্য চিফ অনুগতদের মনে প্রচণ্ড আঘাত করেছিল। তাদের মতে, সুকপাইলাল যদি নিরীহ নিরস্ত্র ১০ জন কৃষক মেরে পায়জামার অধিকারী হতে পারেন তবে তারা কুড়িজন সশস্ত্র লোক সহ সাহেব মারার ক্ষমতা রাখেন। Observerএর ভাষায়-

‘If Sookpilal had slain his tens, they would slay scores. If sookpilal had butchered defenceless peasants, they would have heads of police, of sepoys, and of Sahibs'.


অন্যান্য চিফ অনুগতদের আত্মশ্লাঘায় আঘাত করার অন্য কারণও রয়ে গেছে। তাদের চিফদের হাতে রয়েছে সশস্ত্র সেনাবাহিনী, রয়েছে অফুরন্ত ক্ষমতা। তাদের পৌরুষের কোনও স্বীকৃতি আজ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি সরকার থেকে। Observer এর ভাষায় -
‘The Howlongs, whose war parties had spread panic and desolation Southward to Arracan, had never received such tribute to their Chief Vandoola had never been so honoured, leader though he be of at least 4000 fighting men, 2000 of them armed with guns..... It is more profitable to plunder Tea gardens with a view to contingent green Pyjamas, than to hurry the huts of Joomeas in the jungle of Chittagong. The war trail will in future point north instead of South.' (৪৫)


The Observerএর আগাম সতর্কবাণীই কার্ষে পর্যবসিত হয়েছিল। কাছাড়-সিলেটের চা-ক্ষেত্র আক্রমণের পিছনে লুসাই প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলের চিফরাই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। অপহৃতা মেরি উইনৃচেস্টারকে উদ্ধার করা হয়েছিল তাদের কবল থেকেই। কর্ণফুলি ভ্যালির দেমাগিরি (বর্তমান Tlabung) থেকে চালানো অভিযানেই তাঁকে উদ্ধার করা হয়।


দ্বিতীয়ত,

এককভাবে কোনও লুসাই চিফ্‌কে বিশেষ আনুগত্য প্রকাশের স্বীকৃতি স্বরূপ খেলাত প্রদান ও সনদ স্বাক্ষর। ডিসেম্বর-জানুয়ারি ১৮৬৯-৭০ সালে লুসাই সফর শেষ করে এসে Dy.Commissioner Edger ভারত সরকারের কাছে কাছাড়-লুসাই সম্পর্কের উন্নতির লক্ষ্যে কয়েকটি প্রস্তাব পাঠান, যেখানে ছিল আশানুরূপ কাজের পারিতোষিক হিসাবে চিফ্দের সনদ (Charter) প্রদানের বিষয়টিও; যেটি সরকারি অনুমোদন লাভ করেছিল যথাসময়েই। তাঁর প্রেরিত বিভিন্ন প্রস্তাবের অনুমোদন লাভ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই Edger-এর ১৮৭০-৭১ সালের লুসাই সফর, সুকপাইলালকে সনদ, সীমান্ত অঞ্চল বরাবর ব্রিটিশ প্রজা অভিবাসন, সীমানা নির্ধারণ ইত্যাদির সম্পাদন।

 

১৮৬৯-৭০ থেকে ১৮৭০-৭১ এই এক বছরের মধ্যে লুসাই চিফরা নিশ্চিতভাবেই সুকপাইলালের পারিতোষিক প্রাপ্তি, স্বর্ণ খচিত পায়জামা, কুর্তা উপহার তদুপরি সম্ভাব্য সনদ প্রাপ্তির ব্যাপারগুলি জানতে পেরেছিলেন। এককভাবে সুকপাইলালের সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্তি নিশ্চিতভাবেই লুসাই প্রদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাছাড়া এডগার- সুকপাইলাল স্বাক্ষরিত সনদে চিফ্দের ব্রিটিশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের ধারাটিও বর্ণিত রয়েছে। (The sunnad, besides the boundary settlement, ascertained the supremacy of “Burra Sahib’ over Suakpuilale and other Mizo chiefs-prof. Sangkima, Cachar Mizo Relation A.D 1832-1890). (৪৬) মাত্র হাতে গোনা দু'একজন ছাড়া সেসময় অধিকাংশ লুসাই চিফরা স্বাধীন ছিলেন, সুতরাং ব্রিটিশের Supremacy মেনে নেওয়ার ব্যাপারটি হয়ে দাড়ায় তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি কুঠারাঘাত। এটি তাদের ব্রিটিশ পরিচালনা চা-বাগান পরিসরে সুপরিকল্পিত আক্রমণের প্রেরণা জোগায়। বরিটিশের চা-বাগান পত্তন, সম্প্রসারণ বিষয়টি দক্ষিণাঞ্জলের চিফদের মনে “চিরাচরিত বিচরণ ক্ষেত্রে আগ্রাসন factor-টি ততটুকু প্রাসঙ্গিক ছিল না ছিল মাথা নোয়ানোর ব্যাপারটি।

 

তৃতীয়ত, কাছাড় সীমান্তে ব্রিটিশ settlement-এর সিদ্ধান্ত :

 

অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাইবুঝিয়ে দেয় লুসাই প্রদেশের উত্তরাঞ্চলের চিফরা উপনিবেশের ব্যাপারটি সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। কচুবাড়ি অঞ্চলের লোমহর্ষক ঘটনা এটির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সুকপাইলাল সনদ চুক্তি করলেও তাঁর অনুগত লোক কিংবা তার পুত্র এবং অন্যান্য পূর্বঞ্চলয়ীয় চিফ্রা সেটি নিশ্চয় সহজভাবে মেনে নেননি। সেটিও তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় চিফ্দের সাথে জোটবদ্ধ প্রয়াসে নেমে পড়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল। তাছাড়া সুকপাইলাল ও তার পুত্র কলখামার মধ্যে কতটুকু নিকট সম্পর্ক ছিল সেটিও বিচর্য বিষয়। কারণ সুকপাইলালের মৃত্যুর (১৮৮১) পর পরই তার অধীন প্রজারা কলখামার অত্যাচারে কাছাড় সমতলে নেমে আসতে বাধ্য হয়েছিল।(Migration on Mizo to Cachar took place after the death of Suakpuilal owing to atrocity caused to them by his son Kalkhama ........ Prof. Sangkima)।


চতুর্থত, মুক্ত বাজার অর্থনৈতিক কারণ :

 

চা বাগান পরিসীমার লুসাই আক্রমণের পূর্বভাস নিহিত রয়েছে Edgerএর Bengal Judicial proceedings, May 1870 No. 217
প্রতিবেদনে। কাছাড় লুসাই পরস্পর বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও দৃঢ়তর করার লক্ষ্যে British Trade Marts গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি যে চিফদের একতরফাভাবে চলে আসা অর্থকরী ব্যবসায় আঘাত করতে গিয়ে সেটি উল্লেখ করতে গিয়ে Edger জানান -

'But there is difficult for, the Lushai Chiefs will antagonize their personal loss. And would desist the Lushais to participate in the British marts.Even they would plunder the The Estate to compensate their loss.'

 

বহু আগে থেকেই বাঙালি ও মণিপুরি ব্যবসায়ীরা লুসাই প্রদেশের বিভিন্ন বাজারে ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে আসছিলেন, তার সাক্ষ্য আমরা পেয়েছি আহোম-ত্রিপুর রাজদূত আসা যাওয়া ও উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সমকালীন পর্বের উপর লিখিত রত্নকন্দলীর প্রতিবেদন, যেটি ত্রিপুর বুরুঞ্জী নামে প্রকাশিত হয়েছিল। সুতরাং অষ্টাদশ শতকের প্রথম দশক বা তারও আগে থেকে ব্যবসা বাণিজ্যের মূল কাণ্ডারী ছিলেন বাঙালি ও মণিপুরিরা, রাশ ছিল চিফদের হাতে। ব্যবসায়ীরা তাদেরকে যথোপযুক্ত সিধা প্রদান করার বিনিময়ে পেতেন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা। সুতরাং British Mart ও মুক্ত অর্থনীতি পক্ষান্তরে চিফ্দেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে, সেটাই স্বাভাবিক। সুতরাং Edger-এর সংশয় এবং পূর্বাভাস নির্মমভাবেই বাস্তবায়িত হয়েছিল ব্রিটিশের সৃষ্ট চা-বাগান পরিসরে।


যাই হোক 'The Eastern Bengal Frontier Regulation Act of 1873' এবং 'Inner Line Regulation,1873' যেটি প্রাথমিক ভাবে ০১ নভেম্বর ১৮৭৩ থেকে বলবৎ করা হয়েছিল কামরূপ, দরং, নগাঁও, শিবসাগর, লক্ষীমপুর, গারো পাহাড়, খাসিয়া ও জয়ন্তিয়া পাহাড়, নাগা পাহাড়, কাছাড় ও চট্টগ্রামে সেটি আগস্ট 1875 থেকে কাছাড়ের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জন্যও বলবৎ করা হলো। Inner Line এর সীমা নির্ধারণ করা হলো হাইলাকান্দির দক্ষিণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ছাতাচূড়া থেকে ঝালনাছড়া হয়ে বরুণছড়া-লোয়ারবন্দ-ধোয়ারবন্দ-মণিয়ারখাল-বরাক তীরবর্তী ময়নাডর পর্যন্ত। 1871 এর বৃহত্তর সামরিক অভিযানের পরও 1889-90 এবং 1892 সালে অনুরূপ অভিযানের প্রয়োজন হয়েছিল। প্রান্তীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য জিরিঘাট থেকে চরগোলা-লঙ্গাই-আদমপুর ও আলীনগর পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ছাউনি স্থাপন করা হয়েছিল বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায়। শেষ পর্যন্ত লুসাই প্রদেশটি ঔপনিবেশিক মানচিত্রে অঙ্গীভূত করা হয় 1891-98 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে উত্তরাংশ এবং সর্বদক্ষিণ অংশ 1930 খ্রিষ্টাব্দে। (সূত্র : সুরমা-বরাকে রাজনৈতিক ভূগোলের বিবর্তনঃ ঔপনিবেশিক পর্ব, স্মরণিকা- বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন ১৪১৫ বঙ্গাব্দ, বিবেকানন্দ মোহন্ত, পৃষ্ঠা 1-17 )।


উপসংহার

 

১৮৭১ সালের পর বরাক-লুসাই সম্পর্ক পুনরায় ইতিবাচক রূপ নেয়। ধীরে ধীরে আধুনিক শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ে পার্বত্য প্রদেশে, এ ব্যাপারে খ্রিস্টান মিশনারিদের অসামান্য অবদান অনস্বীকার্য। আজ সমগ্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে শিক্ষিতের হার অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে মিজোরামের আসন সর্বোচ্চ শিখরে। অতীতের কর্ম-সংস্কৃতি বর্তমান প্রজন্মের মনে যে রেখাপাত করেনি তা নয়। তাই তো আমরা দেখতে পাই ১৮৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহে তাঁরাও সমব্যথী এবং তারই স্থীকৃতি স্বরূপ আলেকজান্ডারপুর চা-বাগানের সেই উঁচু টিলায়, যেখানে ২৩ জানুয়ারি ১৮৭১-এর ভোরবেলা মিঃ জেমস্‌ উইনচেস্টারের নিথর দেহ পড়ে রয়েছিল, সেখানে আজ তারা প্রার্থনারত। সেদিনের raiding চিফ ভেঙ্কুইয়ার উত্তর প্রজন্ম ব্যথিত হৃদয়ে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন Winchester Memorial Prayer Hall-এর। কাটলিছড়া বোকাবিল পূর্ত সড়কের ডানপাশে চা-গাছের কার্পেট আচ্ছাদিত শৈলশিখরের পাদদেশে চোখে পড়বে –

VM Lushai 6.png

IN LOVING MEMORY OF Mr. JAMES WINCHESTER DIED ON 23 Jan 1871

ERECTED BY THLARAU BO ZAWNGTUTE,

SEEKER OF LOST SOULS, MIZORAM AIZAWL ON 23.01.1987

খ্রিস্টীয় উপাসনালয়। জেম্‌স উইনচেস্টার স্মৃতি মন্দির, আলেকজান্ডারপুর।

 

শৈলশিখরের শীর্ষদেশে চোখে পড়বে উইনচেস্টার স্মৃতি মন্দির ও উপাসনালয় । সামনের দেওয়ালে ও মন্দির অভ্যন্তরে লেখা রয়েছে -

VM Lushai 7.png
VM Lushai 3.png

THIS BUILDING STAND WHERE Mr. JAMES WINCHESTER WAS KILLED BY THE MIZOS IN 1871 

MIZO CHRISTIANS RETURNED TO THIS PLACE TO OFFER THEMSELVES TO GODS SERVICE IN 1963

LAND DONATED BY Mr. T.C. AGEAWALL ON 07.11.1986

SITE DEDICATED BY REV.ROBAIWA ON 23.01.1987

FOUNDATION LAID BY Mrs. SAIRENGPUI (GRAND DAUGHTER OF RAID LEADER)

BUILDING OPENED BY REV. ZAIREMA ON 10.06.1987

SPONSORED BY THLARAU BO ZAWNGTUTE (SEEKER OF LOST SOULS)

 

অন্যপ্রান্তে লেখা রয়েছে-

Building was laid by - Mrs. SAIRENGUPUII, The grand daughter of BENGKHUAIA.

অনুরূপভাবে পথিকের চোখে পড়বে ছাতাচূড়া শীর্ষদেশের গারদপুঞ্জি-কালীদাসপুঞ্জি পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছে “Winchester Memorial Mission and Residential School”

২৩ জানুয়ারি ১৮৭১ সালের ভোররাতে আলেকজান্ডারপুর চা-বাগানের প্ল্যান্টার মিঃ জেমস্ উইনচেস্টার একবারেই যে মরে যাননি, বেঁচে আছেন বর্তমান প্রজন্মের ব্যথিত হৃদয়ে, এগুলিই তার প্রমাণ।

 তথ্যসূত্র : 

1. শ্রীরাজমালা (দ্বিতীয় লহর) - সম্পাদনায় - শ্রীকালীপ্রসন্ন সেন বিদ্যাভূষণ ১৩৩৭ ত্রিপুরাব্দ, পৃঃ ১৪৮
2. Cachar Mizo Relation (A.D. 1832 - 1890) --- Prof. Sangkima
3. Prehistoric and Historic Migration of the Mizos --- Prof. Lalrimawia
4. The North-East Frontier of India --- Alexander Mackenzie P-293
5.
 Ibid P-293
6. Lalrimawia
7. British Relation with the Hill Tribes of Assam since 1858 --- BC Chakraborty P-47
8. An Etymological Study of the word ‘Mizo’ --- Prof Sangkima
9. Ibid
10. Cachar Mizo Relation -- Prof. Sangkima
11. Cachar under British Rule in North East India, --- Jayanta Bhushan Bhattacharjee. P-113
12. শ্রী অরুণ চন্দ্র মোহন্তের আত্মজীবনী, শরিক, শারদীয় ১৪০৯
13. শ্রীরাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস --- শ্রী কৈলাশ চন্দ্র সিংহ
14. Alexander Mackenzie P-88
15. স্মরণিকা, বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, ত্রয়োবিংশতিতম অধিবেশন, শিলচর
19. Cachar Mizo Relation, Prof. Sangkima
17. শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ) ৩য় অধ্যায়, ২য় ভাগ, ৫ম খণ্ড, বিবিধ --- শ্রী অচুৎ চরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, পৃঃ ৩৪
18. Early History of the Mizos --- Dr Suhas Chatterjee.
19. The Mizo Quest in Retrospect (1890-1966) --- Sujit Choudhury, P-5
20. Ibid - P13
21. শ্রী অরুণ চন্দ্র মোহন্তের আত্মজীবনী, শরিক, শারদীয় ১৪০৯
22. শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ) পৃঃ ১৩১-১৩২
23. The Mizo Quest in Retrospect --- Sujit Choudhury, P-14
24. ত্রিপুর বুরুঞ্জী, সম্পাঃ --- ডঃ সূর্যকান্ত ভূঞা

25. শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ) পৃঃ ৩১

26. Gazetteer of Bengal and North-East India --- B.C. Allens and others, P-461

27. The Mizo Quest in Retrospect --- Sujit Choudhury , P-17 

28. A report on the Boundary between British Frontier of Dist. Sylhet and Independent Hill Tipperah by

      Lt. Thomas Fisher in 1821 - Tripura : Historical Documents.

29. Alexander Mackenzie, P- 289

30. Ibid P-289-292

31. Cachar under British Rule --- J.B. Bhattacharjee, P- 116

32. Alexander Mackenzie, P-293

33. Ibid P-293

34. Ibid P-295

35. British Relation with Hill Tribes --- B.C. Chakraborty, Page — 53
36. শ্রীরাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস --- শ্রী কৈলাশ চন্দ্র সিংহ, পৃঃ -১৯৫
37. Bengal Judicial Proceedings July 1870. No. — 117-18

38.  শ্রীরাজমালা , পৃঃ -১৮৭
39. Alexander Mackenzie, P - 305-307
40. শ্রীরাজমালা , পৃঃ -১৯৯

41. Alexander Mackenzie, P - 310-312

42. B.C. Chakraborty, P-69

43. Cachar Mizo Relation -- Prof. Sangkima.

44. The Mizo Quest in Retrospect --- Sujit Choudhury, P-20-21

45. The Observer, Dt. 25th Feb, 1871

46. Cachar Mizo Relation --- Prof. Sangkima.

47. Ibid

48. Bengal Judicial Proceedings, May 1870, No. — 217

 

এছাড়াও অন্যান্য সহায়ক গ্রন্থাবলী ও প্রবন্ধ :


1. Cachar Dist. Records, vol-I & Il - Compiled by D. Dutta, Edited by - Sunanda Dutta.
2. The Eastern Frontier of India — R.B. Pemberton.
3. A Statistical Account of Assam Vol. II — W.W. Hunter.
4. British Administration in North East India 1826-74 — Meena Sharma Barkakati.
5. A History of Assam - Sir Edward Gait.
6. British Trade Relation with Mizoram till 1930 and its impact — O. Rosango.

7. Making of the Mizo Policy (1832-1850) : Role of the Cachar Frontier — J.B. Bhattacharjee

 সমাপ্ত