রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ভাবনায় নির্বাচন ২০২১
পর্ব ১০
বিষয় : জাতিতে জাতিতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ‘যুদ্ধ’ বাঁধানোটা কী খুব ভালো নীতি?
—নিজের প্রথম ভোটটা দেব এই প্রশ্নটি মনে রেখেই 
পৌষালি কর (ছাত্রী) 
২৫ মার্চ ২০২১
দেখতে দেখতে এসে পড়লো ৫ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন।
আসামের নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়েছে ২৭ মার্চ, ০১ এপ্রিল এবং ০৬ এপ্রিল।
বরাক উপত্যকায় নির্বাচন আগামী ০১ এপ্রিল ২০২১।
আসন্ন নির্বাচন কে সামনে রেখে "ঈশান কথা" পুরো মার্চ মাস ধরে আপনাদের সামনে তুলে ধরবে এই ধারাবাহিক
"ভাবনায় নির্বাচন ২০২১"
যাতে থাকবে নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকা মানুষ এবং ছাত্রছাত্রী দের ভাবনাচিন্তা, মত-অভিমত, অথবা বিশ্লেষণমূলক লেখা ...
আজ পর্ব ১০ ...

এইটা সত্যি যে ১৮ বছর হতে হতে একটা মানুষের সমাজ নিয়ে একটা ভালো ধারণা হয়ে যায়, তাই মানুষ তার প্রথম ভোট ১৮ বছর বয়স হলে পরে দিতে পারে। ছোট থেকে বড় হয়েছি ধীরে ধীরে সমাজ ও রাজনীতিকে বুঝতে পারছি। এই দুটোর  মিল আর অমিল স্পষ্ট হচ্ছে। আমি সবার মতো স্রোতে ভাসতে চাই না, মানে যেটা সাধারণ মানুষেরা করে। যে দিকে প্রচার সেই দিকে দৌড়তে আমি পারি না। 
আজ আমি ভারতের নাগরিক হয়ে, ভারতের ও ভারতবাসীদের যা দুর্গতি হচ্ছে সেই ভেবে আমার জীবনের প্রথম ভোট দেব। আমি আমার প্রথম ভোট তাকে দেব যে ব্যক্তি বা দল এই আসনে নির্বাচিত হবার যোগ্য। এই নির্বাচনে হয়তো তিনি বিজয়ী হবেন না, অথবা হতেও পারেন। কিন্তু কোনো আদর্শ ছাড়াই যেই বিজয়ী হবে বলে স্রোতে ভাসা লোকে বলবে তাঁকেই ভোট দেওয়া যাবে না।


আমি তিনসুকিয়া থাকি। ছোট থেকে বড় এইখানেই হয়েছি। ছোট বেলায় শুনতাম আলফার  ঝামেলা আর আজ শুনি সঙ্ঘের ঝামেলা। দেশ বিগড়ে ফেলছে তারা! আমরা স্কুলে পড়েছি আর এখনো পড়ি যে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। কিন্তু এই কথাটা এখন মুছে দেওয়া হচ্ছে ধীরে ধীরে। পুরো দেশ যেন এই কয়েক বছরের মধ্যে রামভক্ত হয়ে উঠছে। কেন? রামই কেন? কালি শিব দুর্গা কৃষ্ণ নন কেন? বুদ্ধ বা নানক নন কেন? আল্লাহ বা গড নয় কেন? আর আমি যদি নাস্তিকই হই, আমার অবিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকবে না কেন? সংবিধান তো আমাকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছে। তাঁর মানে এই রাম ধর্মের রাম নন, তিনি রাজনৈতিক রাম। তিনি আমাদের সংবিধান মানেন না। এইভাবে এই ধর্মনিরপেক্ষ  দেশ হিন্দুত্ববাদী হয়ে গড়ে উঠছে। লোকের মুখে মুখে আজ শুধু ‘জয় শ্রী রাম’ শোনা যায়। জয় সিয়ারামও নয়। এটি আমাদের সংস্কৃতি নয়। এটি রামানন্দ সাগরের একটি টিভি সিরিয়াল থেকে রাজনৈতিক কারণে ধার করা। কংগ্রেস আমলে এইসব শুনিওনি,দেখিওনি। এই নয়া রাজনীতির লোকেদের তাই লোকে বিদ্রূপ করে ‘ভক্ত’ নাম দিয়েছেন। কথায় আছে অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। হিন্দিতে একটি কথা আছে--মুহমে রাম নাম, বগলমে ছোরা। এরা এই রকম। তাঁরা বলেন, তাদের নাকি ধর্ম খুব বিপদে, অন্যরা তাদের ধর্মকে ছিনিয়ে নিতে চায়। আশ্চর্যজনক কথা হলো, এই যে ভারত--- যেখানে অধিকাংশ জনসংখ্যা হিন্দু, আর তাদের বুঝি ধর্ম সংকট হচ্ছে! বাহ! এ অনেকটা যেমন বহু অসমিয়া মনে করেন, বাঙালিরা তাদের ভাষা কেড়ে নিতে চায়। আমাদের বাঙালিদের কি সত্যিই সেরকম কোনো পরিকল্পনা আছে? এও এরকম। অহিন্দু বা মুসলমানের কি আদৌ সেরকম পরিকল্পনা আছে, না থাকতে পারে? আমরা যখন এই সবের বিরুদ্ধে কথা বলি তখন আমাদের কে pseudo secular বলা হয়। আচ্ছা, একবার ভাবুন, তারা কি সেই কাজটাই করছে কি না? 


আমার যত বন্ধু বান্ধবী আছে তাদের সবাই না হলেও অধিকাংশই ভক্ত। তাদের সাথে আমার কোনো রাজনৈতিক কথার তাল মেল নেই। তারা স্রোতে ভাসছে, আর আমি তার বিপরীত কথা বলি। আমি জানি, আমি বুঝি কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে। কোনটা অন্যায়, কোনটা ন্যায়। ব্যোমকেশ বক্সীর, ‘পথের কাঁটা’ series টাতে ব্যোমকেশ একবার বলেন, ‘শব্দে শব্দ ঢাকে, গন্ধ ঢাকে কীসে?’ আপনারা মিলিয়ে নিন এই কথাটাকে আজকের পরিস্থিতির সাথে। এত কিছু রহস্য লুকিয়ে রয়ে আছে জীবনে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে অন্ধভক্ত করে তোলা হচ্ছে।
 

শুধু এই না, আমাদের দেশে আর কত কত সমস্যা হচ্ছে --কিন্তু কেউ এই কথাগুলো  বেশি গুরুত্ব দিতে চায় না। এই সেদিন হাথরস দেখিয়েছে মেয়েরা দেশে কতটা অনিরাপদ;  গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে আর ধনিরা আরও ধনি হচ্ছে; এন আর সি নিয়ে সমস্যা থেকেই গেছে, CAA নিয়ে এসেছে আরেক সংশয় আর সন্দেহের বাতাবরণ; কোভিডের দুর্গতি যায়নি এখনো, কত লোক প্রাণ এবং কাজ হারিয়েছেন; এরই মধ্যে তিন আইন এনে বাড়ানো হচ্ছে  কৃষকের দুর্গতি। অসমে লাখো লাখো চা-শ্রমিকেরা এখনো দিনের হাজিরা পান মাত্র ১৫১ টাকা! এই একুশ শতকেও! ভাবা যায়? অথচ, আমাদের ভাবানো  হচ্ছে কী? সভ্যতার যুদ্ধে নামানো হচ্ছে। আমাদের বুঝি ধর্ম বিপন্ন। বিপন্ন ভগবান। অথচ আমাদের বিশ্বাস বলে, ভগবানই আমাদের সবার রক্ষা কর্তা। সেই ‘রক্ষাকর্তা’কেই রক্ষার কাজে ভোটার মানুষকে  নামানো হচ্ছে--- ভাবুন কাণ্ডখানা!
 

যদি হিটলারের জীবনীখানা পড়ত কেউ! পড়বে না। তিনিও কি যুদ্ধ বিধ্বস্ত জার্মানির অর্থনীতির বাস্তবতাকে ঢাকতে মানুষের নজর ঘুরিয়ে দেননি, দেশের ভেতরে ইহুদি সহ সমস্ত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে। শ্রমিক কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে যারা সত্যকে সামনে তুলে ধরতেন তাঁদের বলা হত সুসভ্য জার্মান জাতির শত্রু। দেশে নির্বাচন হত বটে, কিন্তু গণতন্ত্রের কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। হিটলারভক্ত জনতা আর রাষ্ট্রের ভয়ে বাকি সব নাগরিককে আত্মগোপনে যেতে হয়েছিল। আমাদের দেশকেও কি সেই দিকে নিয়ে যেতে চাওয়া হচ্ছে?  সেরকম হলে সম্ভব হয়, সেই সব মানুষের জন্যে যারা রাজনীতি বুঝে না বলে দাবি করে, কিন্তু সহজ দেশপ্রেমের নামে ক্ষমতার থেকে যা শুনে তাই বিশ্বাস করে, আর পেছনে পেছনে স্রোতে ভাসতে থাকে। হিটলারের পরাজয় হয়েছিল দ্রুত, কেননা অতি উৎসাহী হয়ে তিনি বিশ্বজয়ে নেমেছিলেন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়েছিলেন। ততটা হবে না আমাদের দেশে, তবু এই কথা মনে রাখতে দোষ কী যে হিটলারের মতো পরম শক্তিশালী শাসককেও জীবনের শেষে আত্মগোপনে যেতে হয়েছিল এবং আত্মহত্যাও করতে হয়েছিল। এই তো সেদিন দেখলাম ডোনাল্ড ট্রাম্পের কী অবস্থা করলেন মার্কিন জনতা। 
 

ইলেকশন  propaganda-র জন্য প্রধানমন্ত্রী আর রাজ্য নেতৃত্বের অনেকে এসেছিলেন আমাদের শহরে। কেউ কেউ পদযাত্রাও করেছেন। মানুষের ভিড় দেখে হাসি পাচ্ছিল! পাচ্ছিল এরই জন্য যে এদের বহু মুখকেই এক বছর আগে অন্য মিছিলে দেখেছিলাম। ভাবছিলাম তারা সেই একই লোক যারা CAA আন্দোলনের সময় গলা ফাটিয়ে ভাজপা কে ‘হায়! হায়!’ বলছিলেন; ঠিক সেই একই মানুষ কি এরা! তখন খানিকটা হলেও অসমিয়া বাঙালি বিরোধ দেখা দেবে দেবে করছিল। মিছিলে যোগ দিয়েও আমরা নিরাপদ মনে করতে পারছিলাম না। যেহেতু আমাদের পরিচয় আমরা বাঙালি। অনেকেই বাঙালি বিরোধী স্লোগান দিচ্ছিলেন। অথচ, আমাদের নজরে সাম্প্রদায়িক বলেই ‘কা’ গ্রহণযোগ্য ছিল না। স্রোতে ভাসমান মানুষকে নিয়ে এটাই সমস্যা। এরাই এখন হিন্দু ঐক্যের জিগির তুলছেন, মুসলমানের ভয় দেখাচ্ছেন। আর আমি ভাবছি, উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে পড়ব কী, করব কী? সেখানে কোনো মুসলমানকে তো আমার পথের কাঁটা হিসেবে দেখছি না। যদি দেখছি, তবে সে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে। যার প্রচুর দুর্বলতা আছে বলেই আমি রাজ্যের বাইরে যাবার কথা ভাবছি, আর আমার মতো বহু অসমিয়া বাঙালি হিন্দু মুসলমান বন্ধু বান্ধবীরাও সেরকম ভাবছে, বা আগেও ভেবেছে। 
 

তাই যেটি বলেছিলাম, সাধারণ মানুষ স্রোতে ভেসে যায়। আমি যেটা চাই সেটা হলো এই দেশে এক ভালো দল শাসনে আসুক যারা মানুষের সাথে লড়াই  করে না, মানুষের মধ্যে ‘সভ্যতার যুদ্ধ’ বাঁধিয়ে দেয় না। বরং মানুষের জন্য লড়াই করে। আমাদের ব্যবস্থার মধ্যেই দুর্নীতি আছে। ফলে অধিকাংশ শাসকদলই ‘দুর্নীতি’র সঙ্গে কম বেশি আপোস করে। কিন্তু তাদের মধ্যেও ভালো মন্দ থাকে।  

 

দুর্নীতি মানে কী? কেবল টাকা পয়সা হাপিস করা? টাকা পয়সা তো এখনও আম্বানি আদানিরা প্রকাশ্যেই হাপিস করছে, দেশের সমস্ত সরকারি সম্পদ এরা কিনে নিয়ে ব্যক্তিগত বানিয়ে দিচ্ছে। এন আর সি প্রক্রিয়াতে যে স্বদেশিদের বিদেশি বানানো হলো, সেটা দুর্নীতি নয়? এই যে আমাদের মাতৃভাষাতে পড়বার লিখবার স্বাধীনতা সেরকম নেই—সেই সব দুর্নীতি নয়? জাতিতে জাতিতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ‘যুদ্ধ’ বাঁধানোটা কী খুব ভালো নীতি? 
 

এই মুহূর্তে দেশের সবচাইতে বিপজ্জনক দুর্নীতি হচ্ছে এই সাম্প্রদায়িকতা --- গণতন্ত্র ও সংবিধানের বিপদ। ধর্মনিরপেক্ষতার বিপদ।  

 

আমি চাই দেশের গরিবের কল্যাণ হোক। আমি চাই দেশের ছেলে মেয়েরা সমান অধিকার পাক। আমি চাই হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খৃষ্টান, জৈন সবাই এক হোক। আমি চাই মানুষ মানবতার ধর্ম কে পালন করুক। আমি এইবার প্রথম ভোট দেব, আর তাকে দেব যে এই রাষ্ট্রকে সঠিক পথে নিয়ে যাবে। ফরাসি বিপ্লবের সেই স্লোগান --- ‘সাম্য, মৈত্রী ও  স্বাধীনতা’- (equality liberty and fraternity) –কে যারাই উপরে তুলে ধরবেন, তারাই বিজয়ী হোন। এই স্বপ্নকে যারা ধূলিসাৎ করতে চায় তাঁরা পরাস্ত হোক।

ঈশানের যোগাযোগ

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions