রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

!!!!! বিপণনগুরু ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা !!!!!


শান্তনু গঙ্গারিডি
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

Shantanu Gangaridi.jpg

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় দুই শত বছর পথ অতিক্রম করেছেন। দু শ বছরের পরিক্রম পথে প্রশংসা সমালোচনা সবকিছু শুনেও তিনি বাঙালি হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন সন্দেহের অবকাশ নেই। সেই সময়ে আরো কত জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেছেন বাঙালি সে সবের খবর রাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেনি। শুধু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আলোচনায়, সমালোচনায় মনে রেখেছে।

 

তাঁর প্রতিভার যোগ্য সম্মান দেওয়ার জন্য প্রবীণ অধ্যাপক শম্ভুচন্দ্র বাচস্পতি মহাশয় প্রস্তাব করেছিলেন: ঈশ্বরচন্দ্রকে একটি উপাধি দেওয়া দরকার। জ্ঞানের বিরাট বারিধি তিনি অতি সহজে অঞ্জলিতে ধারণ করেছেন, তাই তিনি 'বিদ্যাসাগর'।

 

বিদ্যায়তনিক লেখাপড়া সমাপ্ত করে ১৮৪১ সালে বিদ্যাসাগর প্রথমে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের ‘প্রধান পণ্ডিতে’র পদে নিযুক্ত হন। এখানে তিনি ইউরোপীয় রাজকর্মচারিদের বাংলাভাষা শেখাতেন। বছর পাঁচেক পরে তিনি সংস্কৃত কলেজের ‘সহকারী সেক্রেটারি’র পদে নিযুক্ত হন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেক্রেটারি জে. টি. মার্শাল তাঁর এক সুপারিশপত্রে বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘তিনি ইংরেজি ভাষায় উল্লেখযোগ্য জ্ঞান অর্জন করেছেন। … আমার ধারণা এঁর মধ্যে অসাধারণ পরিমাণে, ব্যাপক ধরনের জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, শ্রমশীলতা, সুন্দর স্বভাব এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধার যোগ্য নৈতিক চরিত্রের একত্র সম্মিলন ঘটেছে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, এই কার্যোপলক্ষে বিদ্যাসাগর, 'যে-সকল ইংরেজ প্রধান কর্মচারীদের সংস্রবে আসিয়াছিলেন, সকলেরই পরম শ্রদ্ধা ও প্রীতিভাজন হইয়াছিলেন।’ সেইসঙ্গে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আত্মসম্মানবোধের নমুনার একটা বিবরণ দিতেও ভোলেননি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমাদের দেশে প্রায় অনেকেই নিজের এবং স্বদেশের মর্যাদা নষ্ট করিয়া ইংরেজের অনুগ্রহ লাভ করেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর সাহেবের হস্ত হইতে শিরোপা লইবার জন্য কখনও মাথা নত করেন নাই; তিনি আমাদের দেশের ইংরেজ প্রসাদগর্বিত সাহেবানুজীবীদের মতো আত্মাবমাননার মূল্যে বিক্রীত সম্মান ক্রয় করিতে চেষ্টা করেন নাই।"

ঈশ্বরচন্দ্রের প্রশংসকরা যখন উপরোক্ত কথা বলে তাঁকে মহিমান্বিত করছেন ঠিক তখন তাঁর সমালোচকরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, ১৮৫১ সালে ‘বোধোদয়’-এ বিদ্যাসাগর ছাত্রদের বলেছেন ‘সংস্কৃত ভাল না জানিলে, হিন্দি, বাঙ্গালা প্রভৃতি ভাষাতে ব্যুৎপত্তি জন্মে না’। পরে একটি অভিভাষণে তিনি এটাও বলেন যে 'ভারতে হিন্দি বাঙ্গালা ইত্যাদিকে ‘হীন’ অবস্থা থেকে উদ্ধার করার টোটকা হোল, ভুরি পরিমাণে সংস্কৃত কথা লইয়া ঐ সকল ভাষায় সন্নিবেশিত করা।'

প্রবন্ধকার দেবোত্তম চক্রবর্তী তাঁর বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণ আখ্যান বইটিতে লিখেছেন: বিদ্যাসাগর কখনও নিজেকে ‘শিক্ষাসংস্কারক’ বা ‘সাহিত্যসংস্কারক’ বলে চিহ্নিত করেননি, এবং তাঁর উপার্জন যে মূলত নানাবিধ গ্রন্থের রচনা, মুদ্রণ ও প্রকাশনার সুবাদে অর্জিত তাও গোপন করেননি। তিনি নিজেকে ‘গ্রন্থবণিক’ বলে পরিচয় দিতে লজ্জিত হননি। একটি আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নিজের পরিচয়ে বলেছিলেন— লেখক ব্যবসায়ী। ভূতপূর্ব প্রিন্সিপাল, অনেক সংস্কৃত ও বাঙ্গালা পুস্তকের লেখক।

অন্য দিকে বিনয় ঘোষের মতো লেখকরা ঈশ্বরচন্দ্রের প্রশংসা করছেন, ‘মুদ্রক, প্রকাশক ও গ্রন্থকার হিসেবে তিনি যে স্বাধীন বাণিজ্যের পরিকল্পনা করেছিলেন তা তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে আর কেউ বিশেষ করেননি।'

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বহু দোষত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার কথাগুলো এখন ব্যাপক ভাবে আলোচিত হচ্ছে।

জায়মান স্বাধীনতা সংগ্রামের পদক্ষেপগুলোকে মেনে নিতে পারেননি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি বলেছেন, “বাবুরা কংগ্রেস করিতেছেন, আন্দোলন করিতেছেন, আস্ফালন করিতেছেন, বক্তৃতা করিতেছেন, ভারত উদ্ধার করিতেছেন। দেশের সহস্র সহস্র লােক অনাহারে প্রতিদিন মরিতেছেন তাহার দিকে কেহই দেখিতেছেন না। রাজনীতি লইয়া কি হইবে?”

১৮৫৭-র সিপাহি বিদ্রোহ বা নীলচাষিদের লড়াইকে তিনি সমর্থন করেননি। বিদ্যাসাগরের সংস্কৃত কলেজে সিপাহী বিদ্রোহ দমনকারী ব্রিটিশ সেনাবাহিনীদের থাকতে দেওয়া হয়েছিল। এসব থেকে বোঝা যায় যে বিদ্যাসাগর স্বাধীনতা সংগ্রামী জাতীয়তাবাদী ছিলেন না।

কয়েকটি ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, ব্যক্তি ইংরেজের ঔদ্ধত্যের সমুচিত জবাব দিতে তিনি কোনাে কৃপণতা করেননি। তবে ইংরেজদের সমষ্টিগত শাসনের প্রতি বিদ্যাসাগরের কোনাে অভিযোগ ছিল না। ভারতের বুকে দীর্ঘস্থায়ী ইঙ্গ শাসন নিয়ে তাঁর বিরাগভাব প্রকাশ হতে দেখা যায়নি।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ (২য় ভাগ) বইটিতে ব্রিটিশ শাসকের প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ এবং সিরাজউদদৌলা বিষয়ে অত্যন্ত বিরূপ মন্তব্য রয়েছে।

তখনকার যা সমাজ ব্যবস্থা বহু বিষয়ে তিনি সেটাই মেনে চলেছেন। সংস্কৃত কলেজে কায়স্থদের প্রবেশাধিকা আদায় করেছেন কিন্তু শূদ্রজনের কথা চিন্তা করতে পারেননি অথবা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ধর্মের শিক্ষা লাভের সুযোগ ছিল না।

এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে তাঁর রচিত বর্ণপরিচয়-এ নীতিশিক্ষা নিয়ে যতটা কচকচানি রয়েছে আনন্দ ও হাসিখুশির মাধ্যমে শিশুশিক্ষার বিষয়টি ততটাই অনুপস্থিত।

এসব বলার পরেও এখানে মনে রাখতে হবে ঈশ্বরচন্দ্রকৃত বর্ণসংস্থাপন ও সংস্কার করা পথ ধরেই আমরা এখনও চলছি।

অনেকে বলেন, তিনি তো উপবীতধারী ব্রাহ্মণ ছিলেন।

এই সমালোচকেরা একথা ভুলে যান যে, ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা না হলে হিন্দুধর্ম সংস্কার নিয়ে কথা বলার locus standi থাকত না। সব কিছু সময় ও পরিপ্রেক্ষিত নির্ভর। আজকের যুগে বসে যেটা সহজ মনে হয় আজ থেকে দেড় শ বছর আগে সেটাই কঠিনতম বিষয় ছিল। তাই যে যতটুকু সংস্কারের কাজ করেছেন সেটা মানতে হবে। স্বীকার করে নিতে হবে। বিদ্যাসাগর বাংলার সংস্কৃতায়নের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। আবার অব্রাহ্মণ সন্তানরা যাতে সংস্কৃত কলেজে পড়ার সুযোগ পায় সেটার চেষ্টা করে গেছেন।

বিদ্যাসাগর যে আজও প্রাসঙ্গিক এবং অপ্রতিরোধ্য তার মূলে রয়েছে বাংলা বর্ণমালার সংস্কার। বিদ্যাসাগর বুঝে ছিলেন নারী শিক্ষা ছাড়া জনশিক্ষা সম্ভব না। এছাড়া হিন্দু বিধবা বিবাহ নিয়ে তাঁর অবস্থান তাঁকে এক আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

তবে আজকে আমরা বরং বিদ্যাসাগরের ব্যবসায়ীক সাফল্য (বহু নিন্দিতও) নিয়ে কিছু আলোকপাত করতে পারি। শাসকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি বইয়ের কাটতি বাড়িয়ে ছিলেন কিনা জানি না কিন্তু তাঁর প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ও ব্র্যান্ড পজিশনিংয়ের তারিফ করতেই হয়।

ভাষাবিদ আশিস খাস্তগীর মহাশয় লিখিত একটি প্রবন্ধ: বর্ণপরিচয় বৃতান্ত। তিনি লিখছেন:

"১৮৪৯ এবং ১৮৫৫। মাত্র ছ'বছরের ব্যবধান। এই ছ'বছরঘটে গেল বাংলা প্রাইমারে যুগান্তর। ১৮৪৯-এ মদনমোহন যখন ‘শিশুশিক্ষা' রচনা করেন তখনও বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধুত্ব। কিন্তু ১৮৫৫-তে বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়' লেখার সময় সে বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছে। দু'জনের বাক্যালাপ বন্ধ, হয়ত মুখ দেখাদেখিও। এ কারণেই কি বিদ্যাসাগর ভিতরে ভিতরে তাগিদ অনুভব করেছিলেন নতুন একটা প্রাইমার লেখার জন্য? ততদিনে ‘শিশুশিক্ষা’ চারিদিকে সাড়া ফেলে দিয়েছে। ১৮৫৫-র মধ্যে ১ম ভাগের ১০টি সংস্করণ, ২য় ভাগের অন্তত ৭টি সংস্করণ এবং ৩য় ভাগের ৬টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বিদ্যাসাগর নিশ্চয়ই জানতেন, তিনি যে পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত, যে পরিকাঠামো তাঁর হাতে আছে তাতে নতুন বই লিখলে তার মার্কেটিং-এ কোনো অসুবিধে হবে না। নইলে, বন্ধুর লেখা সিরিজের চতুর্থ খণ্ডটি (বোধোদয়) লেখার পরও নতুন করে আবার একটি প্রাইমার লিখতে যাবেন কেন? তবে কি একথাও আমাদের ধরে নিতে হবে, ‘শিশুশিক্ষা’য় কিছু অসম্পূর্ণতা দেখেছিলেন বলে ‘বর্ণপরিচয়' লিখে তা দূর করতে চেয়েছিলেন? দুটি ভাগের ‘বিজ্ঞাপনে তেমন কথাও নেই। বরং উলটোটাই দেখেছি, ২য় ভাগের শেষে ‘শিশুশিক্ষা’ থেকে কিছুটা তিনি গ্রহণ করেছিলেন, যা ৬০তম (১৮৭৬) সংস্করণে এসে ‘নিষ্কাশন’ করেন। ...

‘শিশুশিক্ষা' এবং 'বর্ণপরিচয়' ব্যবসায়িক সাফল্য লাভ করার পর উনিশ শতকের সত্তরের দশক থেকে এক শ্রেণির লেখক ব্যবসা করার সুযোগে প্রাইমার লেখার কাজে নেমে পড়েছিলেন। তাঁদের বইগুলি অবশ্য দুটি একটি সংস্করণের বেশি ছাপা হয়নি। তাঁরা কেউ মদনমোহন, কেউ বা বিদ্যাসাগরের পদাঙ্ক অনুসরণকারী। আবার কোনো কোনো লেখক মধ্যপন্থী। কিছুটা মদনমোহন, কিছুটা বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বই প্রকাশ করে ফেলেছেন। কেউ দাম সস্তা রেখে বাজার ধরার চেষ্টা করেছেন, আবার কেউ বিদ্যাসাগর-প্রদর্শিত পথে না হেঁটে নতুন পথে হাঁটতে চেয়েছেন। রাখালচন্দ্র চক্রবর্তী ও মদনমোহন সরকার ('বালকশিক্ষা'-১) স্বীকার করে নিয়েছেন, তাঁরা বিদ্যাসাগর-প্রদর্শিত পথেই অগ্রসর হয়েছেন। তবে রাখালচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো শুধু শব্দ দিয়ে উদাহরণ দেননি, বাক্যসহ উদাহরণ রেখেছেন। মদনমোহন সরকার বিদ্যাসাগর থেকে বেশি উদাহরণ দিয়েছেন। এ বিষয়ে মধ্যপন্থী মদনমোহন তর্কালঙ্কারের জামাতা যোগেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় (বিদ্যাভূষণ)।...

সাধারণত প্রাইমারগুলি হত ১০ থেকে ৫০ পৃষ্ঠার মধ্যে। বিক্রির থেকে দিক থেকে তখন শিশুশিক্ষা'র ৩ ভাগ, বর্ণপরিচয়'-এর ২ ভাগের অপ্রতিহত গতি। দুটি বইয়ের ধারে কাছে কেউ নেই। ১৮৭৫-এর মধ্যে সংস্করণের হিসেব দেখলেই তা বোঝা যাবে। 'শিশুশিক্ষা-১'র- ৭১তম “শিশুশিক্ষা-২’-র ৪৮তম, শিশুশিক্ষা-এ'-র ৪৫তম সংস্করণ ১৮৭৫-এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি 'বর্ণপরিচয় -এর ১ম ভাগ ৫৮তম এবং ২য় ভাগ ৫৭তম সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। ১৮৭১-১৮৭৫-এর মধ্যে শিশুশিক্ষা'র এবং 'বর্ণপরিচয়ের বছরে পাঁচটি করে সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। বিদ্যাসাগরের জীবৎকালের মধ্যে বর্ণপরিচয়-১'-এর ১৫২তম এবং 'বর্ণপরিচয়-২'-এর ১৪০তম সংস্করণ প্রকাশের খবর পাওয়া যাচ্ছে বেঙ্গল লাইব্রেরি ক্যাটালগ থেকে। লঙের দেওয়া হিসেবমতে ১ম ভাগের প্রথম ৯টি সংস্করণে বিক্রি হয়েছিল ৫৮,০০০ হাজার কপি। ১৮৬২-১৮৯৪ সালের মধ্যে ছাপা ৩টি সংস্করণের মুদ্রণসংখ্যা ৮০,০৫০ কপি। বিদ্যাসাগরের প্রয়াণের আগেই ১৮৮৯-এর সেপ্টেম্বরে 'বর্ণপরিচয়ে'র ১ম ভাগের ১৫০তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। যে কোন বাংলা প্রাইমারের ক্ষেত্রে এ এক বিরল সৌভাগ্য। ১৩৩তম সংস্করণ (১৮৮৫) থেকে 'বর্ণপরিচয়-১' প্রতি সংস্করণে ৫০০০০ কপি করে ছাপা হচ্ছে। এও এক রেকর্ড! ১৮৯০ এর ফেব্রুয়ারি মাসে 'বর্ণপরিচয়-১' এর ১৫২তম, ২য় ভাগের ১৪০তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। ২য় ভাগের প্রথম ছ'টি সংস্করণে ৩৩০০০ কপির মতো বই বিক্রি হয়েছিল। ১৮৬২-১৮৬৪-র মধ্যে প্রকাশিত ৩টি সংস্করণের মুদ্রাসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০০০০-এর মতো!

সেদিক থেকে অন্যান্য প্রাইমারের অগ্রগতি বেশ ম্রিয়মান। সাতকড়ি দত্তের 'প্রথম পাঠ', 'দ্বিতীয় পাঠ' বাদে একমাত্র চোখে পড়ে রামগতি ন্যায়রত্নের 'শিশুপাঠ'। ১৮৭৫-এ তার ৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। তবে কোন এক অজ্ঞাত লেখকের 'বঙ্গভাষার বর্ণমালা' বইটির কথাও উল্লেখযোগ্য। ১৮৭৫-এ জ্ঞানোল্লাস প্রেস থেকে তার ১৭তম সংস্করণ বেরিয়েছে। মুদ্রণসংখ্যাতেও 'শিশুশিক্ষা' ও 'বর্ণপরিচয়'-এর প্রাধান্য। ১৮৬৭-র পর থেকে 'শিশুশিক্ষা'-র ৩টি ভাগ ১০০০০ কপি করে এবং 'বর্ণপরিচয়'-এর ২ ভাগ প্রায়ই ২০০০০ কপি করে ছাপানো হত। অন্যান্য প্রাইমারের মধ্যে মাত্র কয়েকটি বইয়ের ৫০০০ বা তার বেশি কপি ছাপানো হত।

উনিশ শতকে “শিশুশিক্ষা' ও 'বর্ণপরিচয়'-এর সঙ্গে যে-দুটি বই সমানে পাল্লা দিয়ে চলেছে তারা হল – ‘শিশুবোধক’ ও ‘বাল্যশিক্ষা'। মূলত গ্রামাঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য লিখিত ও প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি অনুসরণকারী পদ্যাশ্রিত 'শিশুবোধক' যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল সন্দেহ নেই।" [বর্ণপরিচয় বৃত্তান্ত: আশিস খাস্তগীর। নন্দন- ফেব্রুয়ারি ২০০৫]

বিপণন ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে আমরা দেখতে পাই প্রডাক্ট ডিজাইন প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট প্রডাক্ট পজিশনিং প্রতিটি স্টেপ-এ ঈশ্বরচন্দ্র সফল। এই ঈশ্বরচন্দ্র ব্যবসা করতে এসে নিজের বাল্যবন্ধুকেও রেয়াত করেননি।

'বর্ণপরিচয়'-এর সঙ্গে অন্যান্য প্রাইমারের তুলনা করলে বোঝা যাবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামক ব্যক্তিটি নিজের ‘বর্ণপরিচয়'-কে বাজারজাত করে বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার বিপণন বিদ্যায় কতটা এগিয়ে ছিলেন। নমুনা হিসেবে ১৮৬৯ থেকে ১৮৮০— এই ১২ বছরের একটি পরিসংখ্যান ঘেঁটে প্রবন্ধকার আশীষ খাস্তগীর দেখিয়েছে যে, ঐ কালপর্বে বর্ণপরিচয় ১৭,৯০,০০০ কপি বিক্রি হয়েছিল। সেই একই কালপর্বে শিশুশিক্ষা ১২,৫১,০০০ কপি এবং শিশুবোধক ৩,৪০,৫০০ কপি বিক্রি হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন জনসংখ্যা ও শিক্ষা বিস্তারের অবস্থাকে মাথায় রাখলে বুঝতে পারা যাবে ঈশ্বরচন্দ্র কতটা সফল ছিলেন।

আধুনিক যুগের ছেলেমেয়েরা জানে, যে কোন ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট তুমুল জনপ্রিয় হলে কিছু দিন যেতে না যেতে সেটার পাইরেটেড ভার্সানে বাজার ছেয়ে যায়। কোনো বস্তুর নকল বের হওয়া মানে আসল বস্তুটার বাজারের চূড়ান্ত চাহিদা প্রমাণ করে। ১৮৮৯ সালে তেমনি এক নকল বর্ণপরিচয় বাজারজাত করা হয়েছিল। এই নিয়ে অনুসন্ধান পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশিত হয়েছিল।

এই ঘটনার উল্লেখ করার কারণ, আজকের যুগের বাজার অর্থনীতির ভালমন্দ সবটাই বর্ণপরিচয় নামক একটি নেহাত ছোট বইকে কেন্দ্র করে তখনকার যুগে ঘটেছিল।

কলকাতার বড়বাজার বহু আগেই হাতছাড়া হয়ে গেছে। কলেজ স্ট্রিট এখনো হাতে আছে।

চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙার গল্পে বিভোর বাঙালি বিদ্যাসাগরের এই সাফল্য দেখেও দেখে না কেন কে জানে।

তাঁর লেখা প্রাইমার বিপণন নিয়ে তিনি যা করে গেছেন সেটা আধুনিক মার্কেটিংগুরু / ম্যানেজমেন্ট গুরুদেরও চমকে দেবে। এটাকে "বানিয়াবৃত্তি" বলে যাঁরা গালমন্দ করে চলেছেন আমি তাদেরকে বিষয়টা নিয়ে একটু অন্যরকম ভাবতে অনুরোধ করছি।

তাঁরই তৈরি সিলেবাসে তাঁর ছাপা বই সরবরাহ করার সুবন্দোবস্ত করেছিলেন তিনি! এর ফলে তখনকার বাকি প্রাইমারগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যায়। "চাহিদা তৈরি করে জোগান দেবা"র এই অভিনব প্রচেষ্টাকে শত বছর বাদে পুঁজিবাদি ব্যবস্থায় "সাপ্লাই সাইড্ ইকোনমি" বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আশির দশকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সেই সাপ্লাই সাইড ইকোনমি নিয়ে নাড়াচাড়া করেছিলেন।

যে যাই বলুক, মার্কেটিং টেকনিক রপ্ত করতে না পারলে নাম ডাক হয় না সেটা আমরা ভালই জানি।

এই সোশাল মিডিয়া, এই ফেইস বুক, কত শত ওয়েবজিন-- সব কিছু মার্কেট নিয়ন্ত্রণে চলছে।

বিদ্যাসাগর দয়ারসাগর নামে অভিহিত এই ক্ষণজন্মা বাঙালি অবশ্যই ভারতের সফল ম্যানেজমেন্ট চিন্তাবিদ এবং মার্কেটিংগুরু।

তিনিই ফলিত সাপ্লাই সাইড ইকোনমিকস-এর জনক।

আইআইএমের মতো ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাঙালির বিদ্যাসাগরের বিপণন কৌশল তাদের কারিকুলামে ঢোকালে ভাল হয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বর্ণপরিচয় বাঙালির একটি নিজস্ব ব্র্যান্ড।

আমার জানা মতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবতকালে হাফ ডজন ব্যক্তিত্বকে বিদ্যাসাগর উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তিন বছর আগে এরকম জনা তিনেক বিদ্যাসাগরের নাম ধাম পরিচয় সোশাল মিডিয়ায় এক বিতর্কের অংশ নিয়ে খুঁজে পাওয়া গেছিল। আজকে অনেক চেষ্টা করেও সেই সেই বিদ্যাসাগরদের এক জনেরও কোনো খোঁজ পেলাম না। সকাল থেকে যতবার বিদ্যাসাগর विद्यासागर Vidyasagar শব্দ টাইপ করে খুঁজতে গেছি ততবার সেই ঈশ্বরে অবিশ্বাসী আদি অকৃত্রিম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় নামক মানুষটি গম্ভীর মুখে হাজির হয়েছেন। আর কারোর সুলুক সন্ধান নেই। কিমাশ্চর্যম্, দু শ বছর বয়সেও তাঁর ইউএসপি সকল আধুনিক সার্চ-ইঞ্জিনের দখল নিয়ে রেখেছে। অন্য সবাইকে হটিয়ে দিয়ে বিদ্যাসাগর ব্র্যান্ডটিকে নিজের একান্ত নিজস্ব ব্র্যান্ড বানিয়ে ছেড়েছেন তিনি। স্বীকার করতেই তিনিই আদি বিপণনগুরু, ম্যানেজমেন্টগুরু।

বিদ্যাসাগরের ব্যবসায়ী বুদ্ধি থেকে বাঙালির কিছু শেখার আছে কিনা ভাবছি ...

পরিসংখ্যান সারণির জন্য কৃতজ্ঞতা : আশিস খাস্তগীর

(ছবি নিচে দেওয়া হয়েছে)

SG1_edited.jpg
SG3.jpg
SG2.jpg