রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ভাবনায় নির্বাচন ২০২১
পর্ব ১৪
বিষয় : নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পত্রের নীরবতা
রাহুল রায় 
৩০ মার্চ ২০২১
দেখতে দেখতে এসে পড়লো ৫ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন।
আসামের নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়েছে ২৭ মার্চ, ০১ এপ্রিল এবং ০৬ এপ্রিল।
বরাক উপত্যকায় নির্বাচন আগামী ০১ এপ্রিল ২০২১।
আসন্ন নির্বাচন কে সামনে রেখে "ঈশান কথা" পুরো মার্চ মাস ধরে আপনাদের সামনে তুলে ধরবে এই ধারাবাহিক
"ভাবনায় নির্বাচন ২০২১"
যাতে থাকবে নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকা মানুষ এবং ছাত্রছাত্রী দের ভাবনাচিন্তা, মত-অভিমত, অথবা বিশ্লেষণমূলক লেখা ...
আজ পর্ব ১৪ ...

একটি দল বা প্রার্থী আগামী দিনে জনসাধারণের উন্নতিকল্পে কি করতে চায় নির্বাচনীয় প্রতিশ্রুতিতে তারই প্রকাশ পায় । অন্ততঃপক্ষে স্বাভাবিক বুদ্ধিতে তো এটাই নির্বাচনীয় প্রতিশ্রুতির সংজ্ঞা । কিন্তু বাস্তবভূমিতে দেখা যাচ্ছে অন্য পরিচিত্র । দল বা প্রার্থী আগামী দিনে কি করতে চায় সেটার পরিবর্তে কি করতে ইচ্ছুক বললে জনগণ সেই ইস্তেহার লুফে নেবে সেটার ভিত্তিতেই নির্বাচনীয় প্রতিশ্রুতি তৈরী করা হচ্ছে । এতে যদি আদর্শগত দেউলিয়াপনা প্রকাশ পায় তাহলে কোনো কিছু যায় আসে না, এমন মনোভাব নিয়ে প্রচার করা হচ্ছে । বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই । পাঁচ রাজ্যের চলতি বিধানসভা নির্বাচনের দিকে দেখা যাক । ইতিমধ্যে আট পর্বের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, তামিলনাড়ু ও পুডুচেরীতে বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে । আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ লাগোয়া দু’টি রাজ্য । বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে মৌলবাদীদের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে কোটির ওপর মানুষ এই দুই রাজ্যে এসে আশ্রয় নিয়েছেন । এখনও সেটা থামেনি, অর্থনৈতিক কারণে হোক আর ধর্মীয় অত্যাচারে হোক, সেই প্রবাহে ভাটা পড়লেও অস্তিত্ব হারায়নি । স্বাভাবিক ভাবেই এই দুই রাজ্যের অর্থনীতিতে তাঁর প্রভাব পড়ছে । অর্থনৈতিক ও ভৌগলিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া আসামের কথা এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য । রাজ্যের আদি বাসিন্দাদের অধিকারে আঁচড় পড়ছে । ‘বহিরাগতদের’ কাছে এভাবে অধিকার হারানোটা তাদের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না । মনে রাখতে হবে এখানে ‘বহিরাগত’ বলতে কিন্তু বাংলাভাষী , হিন্দু-মুসলিম উভয়ই । আসামের ক্ষেত্রে আদি বাসিন্দা বা ‘খিলঞ্জিয়া’রা এই ব্যাপারে সেই ৭০ এর দশক থেকেই আগ্রাসী আন্দোলন করছেন । এর পর দুই দশকে দু’বার এই আবেগে ভর করে জাতীয়বাদীরা সরকারও গঠন করে । পরবর্তীতে সেই আন্দোলনের ধার কমে আসতে শুরু করে । ২০১৪ সনে কেন্দ্রে জাতীয়বাদীদের সরকার গঠন হওয়ার পর আসামে আন্দোলনকারীরা কিছুটা অক্সিজেন পায় , ২০১৬ সনে তারা আসামে সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় । সমস্যা সৃষ্টি হয় কেন্দ্র সরকার নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করার পর । হিন্দু, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের পাশে টানার উদ্দেশ্যে সংবিধানের ধর্মনিরেপেক্ষ আদর্শকে পাশ কাটিয়ে বিলটি পাশ করা হয় । নতুন আইনে মুসলিমদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে , অমুসলমানরা এই দেশে স্থান পাবেন । তবে এটা সরকারের ভাষ্য হলেও প্রশ্ন হচ্ছে এই আইনে লেখা আছে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় কারণে দেশ ছাড়তে হয়েছে সেটা প্রমাণ করতে হবে । এই প্রমাণ্য নথী বের করা যে কতটুকু দুষ্কর সেটা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই । সে জায়গায় কতজন মানুষ আগামী দিনে দেশের নাগরিক হবেন সেটা নিয়ে একটি বিশাল প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যাচ্ছে । যাই হোক সে প্রসঙ্গে না গিয়ে যদি সরকারী চশমা পড়ে এই আইনটি যদি দেখি তাহলে বলতে হয় এই আইনের ফলে আসামে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু বাঙালিদের নাগরিকত্ব পাওয়ার কথা । এদিকে এই সম্ভবনা সামনে আসতেই আবার শুরু হয় অসমীয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলন । এই আন্দোলনের আঁচ যে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে পড়বে তা সরকার ভালো করেই জানতো । এবার শুরু হয় অন্য খেলা । বিপ্লব শর্মা কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আসাম চুক্তির ৬ নং ধারা প্রণয়ন ও ১৯৫১ সনকে ভিত্তিবর্ষ করে ‘বিশুদ্ধ নাগরিকপুঞ্জি’ করার কথা নির্বাচনের আগেই ঘোষণা করা হয়ে যায় । এই দুইই বাঙালিদের স্বার্থের পরিপন্থী । নির্বাচনীয় ইস্তেহারে আশ্চর্যজনক ভাবে নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের ব্যাপারটি এড়িয়ে যাওয়া হল । উদ্দেশ্য অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের পাশে রাখা ।

একই উদ্দেশ্যে নির্বাচনীয় ইস্তেহারে জাগীরোড কাগজ কল চালু করার কথা বলা হলেও ব্রাত্য রাখা হল কাছাড় কাগজ কলকে । অথচ অতীতে মুনাফা, ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় এশিয়ার একসময়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাগজ কল কিন্তু অনেক এগিয়ে ছিল । প্রধানমন্ত্রী দু’বার বরাকে এসে এই কাগজ কল চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন । অর্থাৎ বাস্তবে তিনি যেমন নিজের কথা রাখলেন না, রাজ্যে তাঁর দলও একই পথের পথিক হল । এখানে বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে থাকা এই কাগজ কলকে ব্রাত্য রেখে মূলতঃ যে বার্তা দেওয়া হল বলতে বাধা নেই অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ন্যাক্কারজনক । অসমীয়া অধ্যুষিত অঞ্চলে বন্ধ কাগজ কল খোলা হবে আর বাঙালি অধ্যুষিত পাঁচগ্রামে হবে না , সরকারের এই নীতি কার স্বার্থে পরিচালিত সেটা নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হয়না । অথচ কগজ কল নিয়ে যারা দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করে আসছেন তারা কিন্তু দুটো শিল্পোদ্যোগই চালু করার কথা বলে আসছেন ।

একই উদ্দেশ্যে বরাক উপত্যকার ওপর অসমীয়া ভাষা এবার চাপিয়ে দেওয়া হল । এখন থেকে উপত্যকার বসবাসকারী অনসমীয়া জনজাতি মানুষদেরও অসমীয়া বাধ্যতামূলক ভাবে পড়তে হবে । ভারতের মতো বহুভাষিক রাজ্যে ভাষা চাপিয়ে জনমনে ঐক্য আনা যায় না, বিভেদ বেড়ে যায় । বারবার এটা প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও এটা করা হচ্ছে । কারণ কোনো মহৎ উদ্দেশ্য সাধন নয়, উদ্দেশ্য বর্ণ অসমীয়াদের পাশে টানা এবং ভাষিক সংখ্যাগরিষ্ঠদের পাশে রেখে নিশ্চিত হয়ে এই রাজ্যে শাসন চালিয়ে যাওয়া ।

আবার পশ্চিমবঙ্গে দেখা যাচ্ছে অন্য পরিচিত্র । এখানে বাঙালীদের বলির পাঁঠা করা যাবে না । ওখানে এঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ । ওখানে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে যে সরকার গঠন করতে পারলে নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করা হবে । উদ্দেশ্য একটাই , বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু শরণার্থীদের বিশেষ করে মতুয়া সমাজকে নিজের পাশে রাখা । রাজ্যে ১০৩ টি আসনে উপস্থিত মতুয়া ভোটারদের সমর্থনে নির্বাচনীয় বৈতরণী পেরোনো । তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের সমালোচনা করে সেখানে মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক তৈরী করার চেষ্ঠা চলছে । সেখানে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে কথা হয়, নাগরিক পুঞ্জি নিয়ে কথা হয় না । কারণ সেখানকার মানুষের কাছে এই প্রতিশ্রুতি বুমেরাং হয়ে যেতে পারে ।

একই অবস্থা তামিলনাড়ুতেও , শ্রীলঙ্কা থেকে অনেক তামিল হিন্দু এখানে এসেছেন , নাগরিকপুঞ্জি নিয়ে এখানে বিশাল আন্দোলন হয়েছিল । জোট সরকার বাঁচাতে মরিয়া দল সেখানে এই বিষয়ে বাক্যব্যয় করতে চায়নি । কেরলা, পুডুচেরীতেও সরকার এই মর্মে মৌন ব্রত ধারণ করে রেখেছে । অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে , একই দল পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনীয় প্রচারে নামলেও দলীয় আদর্শ, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে দেওয়ার পরিবর্তে ভোটের স্বার্থে আলাদা আলাদা কথা বলছে, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে । সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে, এদের কথা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য । তাদের প্রস্তাবিত ভবিষ্যতপথ নিরাপদ, নাকি আগের মতোই মানুষকে নিজেদের অধিকার, অস্তিত্ব রক্ষায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে সর্বস্বান্ত হতে হবে । ইতিমধ্যে রাজ্যে ডিটেনশন ক্যাম্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে । এই আয়োজনের উদ্দেশ্য কি? জার্মানীর হিটলারের আদর্শ অনুসরণ করে তৈরী এই ক্যাম্পে তাহলে কে থাকবে? শাসক দলের নির্বাচনীয় ইস্তেহার এই প্রশ্নে নীরব । অস্তিত্ব রক্ষায় আগের বারের মতো গরীব, নিরপরাধ মানুষকে কি আবারও লাঞ্চিত হতে হবে ? এই প্রশ্নের উত্তরেও নির্বাচনীয় প্রতিশ্রুতিপত্রে সেই একই নীরবতা বজায় থাকছে । ঝড়ের আগের এই অস্বস্তিকর নীরবতা কিন্তু জনমানসে প্রশ্ন এবং একই সঙ্গে উদ্বেগ সৃষ্টি করে চলেছে ।

  

                         

ঈশানের যোগাযোগ

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions