রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ভাবনায় নির্বাচন ২০২১
পর্ব ১৬
বিষয় : চরের নতুন ফুল-! "আশরাফুল"!
জয়শ্রী ভূষণ
০৬ এপ্রিল ২০২১
 
ভারতের ৫ রাজ্যে চলছে বিধানসভা নির্বাচন। ভোট গণনা হবে আগামি ২ মে।
এই নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক,
বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকা মানুষ এবং ছাত্রছাত্রী দের ভাবনাচিন্তা, মত-অভিমত, অথবা বিশ্লেষণমূলক লেখা 
গত ১ মার্চ থেকে ইশান কথায় প্রকাশিত হচ্ছে 
"ভাবনায় নির্বাচন ২০২১" ধারাবাহিকের মাধ্যমে...
আজ পর্ব ১৬ ...
আজকের পর্বে জয়শ্রী ভূষণ তুলে ধরেছেন নিম্ন আসামের চর এলাকার এক লড়াকু যোদ্ধা আশরাফুলের কথা
যিনি আজ আসামের শেষ দফার নির্বাচনে নিপীড়িত মানুষের জন্য লড়াইয়ে নেমেছেন...

আসলে মনে হচ্ছিল সিনেমা দেখছি বা নিদেন পক্ষে কোন দুর্দান্ত সিরিজ। সত্যি সত্যি আজও চোখের সামনে এসব হতে পারে এই ধারণা আমারও ছিল না। তাই ভাবলাম কিছু লিখি। যদি কিছুটা হলেও অন্তত বোঝাতে পারি সেই পরিবেশটা। যদি ছোঁয়াচে রোগের মত একটু হলেও সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

 

কোন না কোন ভাবেই মাঝে মাঝে হুটহাট করে বেরিয়ে পড়া প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, এবারেও তার ব্যতিক্রম নেই। কিছু ফোন নং, কোথায় যাচ্ছি সেই জায়গাটার নাম আর সাথে বন্ধু কাম গাইড কাম ফিলোসোফার কাম বোন কাম একমাত্র সাথীকে বগলদাবা করে এবারও পৌঁছে গেছিলাম বরপেটা। যাবার আগে এই দুটো নামই জানতাম বরপেটা এবং আশরাফুল।

 

২৭ মার্চ সকাল সকাল গৌহাটি থেকে বাসে চড়ে বরপেটার উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা দিলাম। পথে জানলাম আমরা আসলে যাচ্ছি "চ্যাঙা"। ঘন্টা দুই পরে বাস থেমে গেল "বহরী" নামের একটা জায়গায়, সেই সাথে আমরাও। আশেপাশে সব কিছুই আমাদের এখানের মতই। গাছ গাছালি, সাধারণ মানুষের আনাগোনা, মফস্বল যেমন হয় আর কি। মনে হচ্ছিল না অন্য কোথাও এসেছি। ভোটের মরশুম চলছিল। কিন্ত তেমন দবদবানি দেখতে পেলুম না কোথাও। খানে খানে পোস্টার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের জন্য অফিস এবং জমায়েতের জন্য আয়োজনের ব্যবস্থা চোখে পড়েছে মাঝে মধ্যে বাস থেকেই, কিন্ত তেমন ব্যাপক কিছু ছিল না।

 

আমরা একটু হেঁটে বড় রাস্তা পেড়িয়ে এক বাঁক নিয়ে পৌঁছে গেলাম আর এক তেমাথায়। আমি ব্যস্ত আমার মানুষ পড়ায়, আশেপাশের সব কিছু চোখ দিয়ে গোগ্রাসে গেলায়। এটাই আমার কাজ।  একটা টুকটুকিতে চড়ে বসলাম, চ্যাঙা"র উদ্দেশ্যে। ড্রাইভার দাদা সানগ্লাস পরা ছিল, ভালো ভাবে আমাদের দেখে টুকটুকিটা রওয়ানা করে দিল। রাস্তা ঘাটে তেমন গাড়িঘোড়া নেই, বিশাল রাস্তা, চারপাশে ধূ-ধূ ক্ষেত, সোনালী রোদ আর মাঝে মাঝেই কেমন জানি ছাই রঙা বালুমাটির মত মাটি মাঝে মাঝে চিকচিক করছে। বড় সড়কের পাশে মাঝে মাঝে বিশাল কিছু গাছগাছড়া। দারুণ লাগছিল। হঠাৎ কানের সামনে মুখ এগিয়ে এসে সাথী বললো- দিদি দেখছো একটাও পোস্টার নাই। প্রথমে বুঝিনি, তারপরেই বুঝে গেলাম কি বলতে চাইছে। ভেবে দেখলাম, সত্যিই তো! এতোটা পথ পেরিয়ে এলাম একটাও পোস্টার নেই আশরাফুলের। হ্যাঁ এই আশরাফুলের কথাই গল্প করবো আজ আপনাদের সাথে।

 

অল্প কিছুক্ষণ পরেই আমরা এসে পৌঁছে গেলাম আরও এক মোড়ে, সেখানে টুকটুক থেকে নেমেই আরেকজনের সাহায্যে পৌঁছে গেলাম আমাদের মূল গন্তব্যে। যেখানে থামলাম, নেমে মনে হলো একটি বাড়ির সামনে আছি। জানলাম আমরা এসে গেছি, হ্যাঁ এটি আশরাফুল হোসেইন এর বাড়ি। সামনে কাঠের দোকান মনে হলো। টিনের ঘর। বাড়ির ভেতরে যাবার জন্য আমন্ত্রণ করলেন কয়েকজন।

 

আস্তে আস্তে ভেতরে গেলাম। গোটা বাড়িতে উৎসব উৎসব ভাব। প্যাণ্ডেল বানানো। অনেকগুলো চেয়ার রাখা সারি করে। অনেক মানুষ আসছে যাচ্ছে। কিছু মানুষ চা খাচ্ছে। খুব সাধারণ একটি গ্রামের বাড়ি। গোটা বাড়িটাই বেশিরভাগই টিনের তৈরি। আমাদের জন্য বাড়ির সামনে একটি মাত্র পাকা ঘর ছিল, সেটি তালা চাবি দিয়ে খুলে দেওয়া হলো। ভেতরে গিয়ে বসলাম। একটু পরেই একজন সৌম্যকান্তি ফর্সা রোগা পাতলা প্রবীণ উপস্থিত হলেন। সোনালী সাদায় পাকা দাড়ি এবং সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত সেই প্রবীণ নিজেকে পরিচয় করিয়ে নিলেন আমাদের সাথে। তিনি আশরাফুলের বাবা। ভেতর থেকে আমাদের জন্য চা বিস্কুট ও আঙুর দিয়ে গেল একজন মেয়ে। একটু পরেই এলেন একজন লম্বা মহিলা যিনি নিজে এসে আমাদের সামনে বসে কথা বললেন, বললেন কিভাবে আশরাফুলকে মানুষ নিজের ছাওয়ালের মত ভালোবাসা উজার করে দিচ্ছে। একই সাথে তার কথায় প্রকাশ পেল মায়ের মনের উৎকণ্ঠা। ছেলেটা সময় মত কিছুই খাচ্ছে না দাচ্ছে না, ঘুমোচ্ছে না পর্যন্ত। ছেলের কথা বলতে বলতে একবার কেঁদেই দিলেন। সেই সাথে বললেন সবাই আশরাফুলের মা বাবার সাথে দেখা করতে আসছেন, কথা বলছেন, নানা ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তার জন্য তিনি আল্লাহ ও সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। কথায় কথায় বললেন কিছুদিন আগেও হাস্পাতালে ছিলেন, বাইক এক্সিডেন্টে। জানালেন বেঁচে আছেন পরিবারের শুভকামনায়। তিনি ব্রেইন টিউমারের রোগী ছিলেন ২০০৩এ, পরে অপারেশন হয়েছে। এখন মোটামুটি আছেন ভালোই। আশরাফুলের বাবা কি করেন, জানতে চাইলে বললেন, কিছুই না। উনার চিকিৎসার সময় অনেক কিছুই বিক্রি বাট্টা করতে হয়েছে। তিনি কৃষক এবং ছোটখাটো ব্যবসা করতেন। এবং আপাতত তিনি ঘরেই আছেন তাই বোঝালেন। যাই হোক, অর্থনৈতিক অবস্থা খুব শক্ত সবল নয়, তা বোঝা গেল।

 

চা খেতে খেতে বুঝতে পারলাম, সারাদিন-রাত এভাবেই মানুষ নিজেদের ভরসার কথা, নিজেদের পাশে থাকার শপথ নিয়ে একেরপর এক মানুষ আসছেন যাচ্ছেন। যেই আসছে, যার যা সামর্থ, সেইমত কিছু হাতে করে নিয়ে আসছে। আমরা দেখলাম বরপেটা ছাড়াও নগাঁও, ধুবড়ি, বরপেটা রোড, বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসা যাওয়া করছেন, শুভেচ্ছা বিনিময়ের সাথে সাথে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন। আমাদের জিজ্ঞেস করা হলো, আমরা কেন এসেছি, বিশেষ কোন কাজ কি। আমরা বললাম আমরা শুধুই দেখতে এসেছি কি হচ্ছে চারপাশে। খুব খুশী হলেন বাড়ির সবাই। এত দূর থেকে আমরা গেছি, তাতেও সবাই খুব সম্মানিত বোধ করছিলেন। বারবার বলছিলেন আমরা আপনাদের তেমনভাবে আপ্যায়ন করতে পারছি না দুঃখিত। অল্প ডাল ভাত খেয়ে নিন। আমরা আশ্বাস দিলাম আমরাও আপনাদের মতই সহজ সাধারণ। যখন ক্ষিদে পাবে আমরা খেয়ে নেব। আমরা একটু চারপাশ ঘুরেফিরে দেখবো।

 

আমরা কোথায় থাকবো জানা ছিলো না। তবে এখানে কোনও হোটেল নেই তা নিশ্চিত ছিলাম আসার সময় আশপাশ দেখেই। এরই মধ্যে গৌহাটি থেকে আমাদের আরও একজন খুব কাছের মানুষ বন্ধু কাম বোন (যে আশরাফুলেরও বন্ধু) ফোন করে বলে দিল, দিদি তোমরা এখানেই থেকে যাও। অসুবিধা হবে না, নিজের বাড়ি ভেবেই থেকো। আশরাফুল দিনরাত বিভিন্ন জায়গায় মিটিং সভায় ব্যস্ত, সেসব জানিয়ে আমাদের ওদের বাড়ির ভেতরে সব থেকে নিরিবিলি ও একটি পাকা ঘরে বিশ্রাম করার জন্য নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে যেতেই অন্দরমহলের ছোট বড় মহিলা শিশুরা আমাদের ঘিরে ধরলো। সবার নানা প্রশ্ন। আন্নেরা কইত থন আইছেন। অত মেলা দূর থন একলা আইছেন। ছোট মিষ্টি মাহফুদার বিস্ময় ভরা চোখে আমাদের প্রতি এই সব জিজ্ঞাসাবাদ আমরা খুব উপভোগ করছিলাম। দেখা করতে এলেন আশরাফুলের চাচা, তিনি জানালেন তাদের এই বাড়িটি সাত নং। আমি বুঝতে পারিনি বুঝে গেলেন। বললেন নদীর ভাঙনে এদের বাড়ি ছয় বার ব্রহ্মপুত্রে হারিয়ে গেছে। বর্তমান বাড়িটি তাদের ৭ নম্বর বাড়ি। একান্নবর্তী বাড়িতে থাকেন সবাই, চুলো আলাদা হলেও উৎসব পার্বণে দুঃখে সুখে তারা পাশে থাকেন একে অপরের। বাড়ির মেয়েরাও সবাই শিক্ষিত এবং মার্জিত পরিপাটি। টিনের ঘর, আসবাবপত্র প্রায় নেই বললেই চলে কিন্ত তাই বলে আদর আপ্যায়ন এবং আতিথেয়তায় কোন ত্রুটি ছিল না। বাড়িতে একটা ঘরে কয়েক বস্তা চাল রাখা। ওরা আমাদের দেখিয়ে বুঝিয়ে বললো, কিভাবে মানুষ নিজের সাধ্যমতো সাহায্য করছে। চাল, ডাল, সবজি, গাড়ি, যেভাবেই পারছে, আশরাফুলকে এই পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করছে। মনে হচ্ছিল, এভাবে এসে এদের বিব্রত করছি না তো। বাড়িতে বিশেষ করে বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা যারা ছিলেন, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় পরিজন, আত্মীয়দের আত্মীয় - বন্ধু বান্ধব, আশরাফুলের বন্ধুদের বন্ধু ও আত্মীয়রা সবাই সবাই পালা করে সাহায্য করছেন। কিছু লোক নিয়ম করে সকালে আসছেন - রান্না, সব্জি কাটাকাটি করছেন, কিছু লোক পরিবেশন করছেন, কিছু মানুষ কিভাবে আশরাফুলের প্রচারের জন্য কাজ করবেন তার তদারকি করছিলেন। আমার জন্য নতুন এসব এবং অবাক করে দেওয়া অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি। ভীষণ একটা ভালো লাগায় মনটা ফুরফুরে হয়ে গেছিল। আমার সাথী, গাইড আমায় মনে করিয়ে দিল, দিদি এরা খুব সহজ, তুমি এদের সাথে মিশে যাও, দেখবে কোন অসুবিধে হবে না। সত্যিই তাই। আমরা একটু বিশ্রাম করে ঠিক করলাম চর এলাকা ঘুরে দেখে আসবো।  ব্রহ্মপুত্রের চর এলাকা দেখতে যাবো। ছোটরা বললো যাবো যাবো, বড় কয়েকজন বললো আরে আজ ৩-৩০ হরিপুর জিপিতে আশরাফুলের সভা আছে তো। তোমরাও চলো না। দেখে আসবে। ইতিমধ্যে আশরাফুলের মা এবং পিসী ফুফু এসে আমাদের আশরাফুলের ঘরে নিয়ে গেল দুপুরের খাবারের জন্য। আমরা আলু গাজরের সবজি, ডিম, কাঁচালঙ্কা, পেয়াজ ভাজা, সেই সাথে ডাল দিয়ে খেয়ে নিলাম। খেতে বসেই গল্প করলেন আশরাফুলের মা, যে আসছে সেই অল্প ভাত খেয়ে যাচ্ছে, মানুষ দিচ্ছে, মানুষ খাটছে, তাই যারা যখন আসছে, অল্প যাই আছে তাই দিয়ে খেয়ে যাচ্ছে। বড্ড ভালো লাগলো এই সহজ সরলতা। খেতে বসেই গল্প করতে করতে আশরাফুলের মা জানালেন আশরাফুলের একমাত্র বোন বোবা, কথা বলতে পারে না। আশরাফুলরা তিন ভাই বোন। ছোট ভাই রেডিওলোজী নিয়ে পড়াশোনা করছে গৌহাটিতে, এখন ভাইকে সাহায্য করতে চ্যাঙাতেই আছে। খাওয়া সেরেই দেখা হলো লাকির সাথে, আশরাফুলের দিদির সাথে, তার চোখ হাত ঠোঁট কথা বলে, ইশারায় আমাদের সাথে পরিচয় হলো এবং সেই সাথে খুব বন্ধুও। আমাদের একা আসা আমাদের কাজ করা, পড়াশোনা সব নিয়ে ভীষণ এক্সাইটেড মনে হলো। আশরাফুল খুব প্রিয়, ওর জন্য কি কাজ করতে হচ্ছে, খাওয়া দাওয়া, ভাই এর কাপড় জামা, সব কিছুর খেয়াল রাখে এই লাকি। ভীষণ স্বতঃস্ফূর্ত একটা মানুষ। নিজের বাবার কথা বললো, সেই সাথে ইশারায় নিজের মায়ের সাথে আমাদের সাথে কথা বলে যাচ্ছিল অনর্গল শিশুর মত। চারদিকে তাকিয়ে একটাও ভালো আসবাবপত্র দেখতে পেলাম না, কিন্তু এমন হীরে মানিকের মত দরাজদিল মানুষ গুলো আমার মন ভরিয়ে দিল। এসব যে কত বড় প্রাপ্তি তা বলে বোঝানো যাবে না, লিখে বোঝানো তো আরও দুষ্কর।

 

এত কিছু বললাম যাকে কেন্দ্র করে কে এই আশরাফুল। আমি কি চিনি, দেখেছি কখনো? না এখনো দেখিনি। আশরাফুল তখনও শুধু একটি নাম যে নামের সাথে সামাজিক মাধ্যমে আমি পরিচিত হয়েছিলাম একজন মিঞা কবি হিসেবে। যে কবিরা নিজেদের কবিতার মাধ্যমে নিজেদের কষ্টের কথা, নিজেদের ভাষার কথা, নিজেদের সাহসের কথা, নিজেদের প্রতিরোধের কথা সহজ ভাবে তুলে ধরেছিলেন। যে কাজ বরাকের বাঙালি ও বাঙালরা করতে পারেনি এখনও, মিঞারা তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভরা গালি "বেটা মিঞা"কে সাদরে তুলে নিয়ে নিজের কথ্য ভাষায় কবিতা রচনা করে গোটা ভারতবর্ষে আলোড়ন তুলে ফেলেছিল, ওদের কবিতা এবং মিঞা কবিদের ভয় করতে শুরু করেছিল উগ্র ভাষিক জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীরা। আশরাফুলের নাম আমি শুধু অনেকের মধ্যে একজন মিঞা কবি বলেই জানতাম। জানতাম আশরাফুল একজন সমাজকর্মী যে এন আর সি, ডি ভোটার, ডিটেনশন ক্যাম্প নিয়ে আসাম যখন উত্তাল, তখন অনেকের মত সেও একজন মানবাধিকার ও সমাজকর্মী এবং সাংবাদিক হিসেবে চরের মানুষ গুলোর জন্য দিনরাত কাজ করেছে। আমি শুধু সেই আশরাফুলের নাম জানতাম, যে আশরাফুল লক ডাউনের সময় বন্যায় নিজের কাঁধে বয়ে চরের গরীব গুব্বো মানুষদের ঘরে ঘরে দুমুঠো চাল পৌঁছে দেবার চেষ্টা করেছে। আমি শুধু সেই আশরাফুলের নাম জানতাম যে এন আর সি পঞ্জীকরণের শেষ মূহুর্তে বরপেটার মানুষ কাছাড়ে, যোরহাটে, নগাঁওএ এবং অন্যান্য জায়গায় ভেরিফিকেশনের জন্য হাজির হওয়ার চিঠি পাবার পর কিভাবে সামাজিক মাধ্যমে আমাদের এদিকের সমাজকর্মী, মানবাধিকার কর্মী বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চরের মানুষদের সাহায্য করেছে। আমি শুধুই সেই আশরাফুলের নামটা জানি সামাজিক মাধ্যমের আমার বন্ধুদের বন্ধু হিসেবে। অন্য কোনও আশরাফুলকে আমি চিনি না। আশরাফুলের ঘরে বসে ওর মা বাবা বোন, আত্মীয় পরিজন, পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধবদের দেখে আশরাফুলকে নিয়ে আমার কৌতূহল সত্যি বেড়ে গেল।

 

দুপুরে খেয়ে ক্লান্ত আমরা দুজন কখন যেন ঘুমিয়ে গেলাম। আশরাফুলের মায়ের মুখে শুনেছি, আশরাফুলের ছয় ফুফু এবং পাঁচ মাসি। মাসি পিসির মেয়েরা ছেলেরা তাদের সকল জ্ঞাতিগুষ্টি সবাই পালা করে সারাদিন রাত সপ্তাহ ধরে রুটিন করে নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন ফুফু হাই স্কুলে চাকরি করছেন, এছাড়াও সবাই টুকটাক কিছু না কিছুতে সরাসরি জুড়ে আছেন। এরকমই একজন আশরাফুলের ফুফাতো বোন এল আমাদের সাথে দেখা হলো, এবং সে তার পরিবারের সবার পরিচয় দিতে দিতে জানালো, তার তিনটি ছেলে, শুধু একটি মেয়ে চাই বলে তার ছেলে তিনটি। আমি অবাক! একোন ভারতবর্ষ ? অজ পাড়াগাঁয়ে চরের স্বল্প শিক্ষিত সংখ্যালঘু পরিবারের এক গৃহবধূ বলে কি না ওর একটা মেয়ে শিশু চাই তাই ছেলে তিনটি! আসল শিক্ষা, বোধ, সচেতনতা, ভালোবাসা এগুলো জানতে হলে এভাবেই বোধহয় আমাদের গ্রামেগঞ্জে যাযাবরের মত ঘুরে বেড়াতে হয়। তবেই আসল বাংলা, আসল ভারত, আমাদের ভেতরের আসল চিত্রটুকু পেতে পারি। কি যে ভালো লাগলো। এ যে কত বড় সম্মান আমাদের দেশের মেয়েদের জন্য। এই একটি কথা সে যদি সদর্পে বলতে পারে, সেই চরের আশেপাশের সামাজিক অবস্থান অনায়াসেই কল্পনা করে নেওয়া যায়। অনবরত আমাদের সাথে দেখা করতেও বিশেষ করে মেয়েরা, আশরাফুলের পরিবারের বিভিন্ন পরিজন আত্মীয় বন্ধুরা এসে কথাবার্তা বলছিলেন। এত মানুষ, এত আসা যাওয়া, কিন্ত কোথাও কোন বচসা নেই, না আছে কোন হম্বিতম্বি, সবাই হেসে হেসে খুশির হাওয়া মেলে দিয়ে একে অপরের সাথে মিলেমিশে যা করার করছে, ছোট বাচ্চাগুলোও তাই, ওদের কারোরই কথায় কথায় প্যাঁ প্যাঁ করে কান্না নেই, এই বাচ্চা খাচ্ছে না, খাওয়া নিয়ে বাচ্চার পেছনে মা বাবা জ্ঞাতিগোষ্ঠীর দৌঁড়ঝাপের, পড়া পড়া পড়া, তেমন কিছু এখন পর্যন্ত চোখে পড়লো না। আসলে এত কিছুর পরেও আমি তেমন কিছু ভাবছিলাম না কারণ আমাদের আশেপাশে ভালোমানুষের, সমাজ কর্মীদের, মানবাধিকার কর্মীদের, রাজনৈতিক কর্মীদের অভাব নেই, যারা শুধুমাত্রই নীরবে মানুষের জন্য কাজ করে যায়, এমন অনেককেই আমি চিনি জানি, যারা কোন ভাবেই নিজেদের প্রকাশ করে না। আমি সেইসব মানুষদের খুঁজে বেড়াই, ওদের দেখি, জানি, শুনি, ওদের কাজ দেখে উদ্বুদ্ধ হই, অনুপ্রাণিত হই। ভেবে সাহস পাই, আসলে পৃথিবীতে মানুষই বেশি। বাকি সব যারা অমানবিক, অমানু্‌ পাশবিক, বর্বর, সাম্প্রদায়িক, হিংসুক, তারাই আসলে সংখ্যালঘু। এই ভাবনা, এই বিশ্বাস আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। এখানেও আমার সেই খোঁজেই আসা আসলে।

 

ইতিমধ্যেই দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে একদল রেডি, তারা যাবার জন্য তৈরি। আমাদের এসে জিজ্ঞেস করলো, 'তোমরা যাবা না?' আসলে আমাদের প্ল্যান ছিল অন্য। আমরা মানুষের সাথে, চরের আশপাশ, নদী, ক্ষেত, এসবের সাথেও বন্ধুত্ব করতে আসি। যাবার তেমন কোন প্ল্যান ছিল না। ফেরারও প্ল্যান। গৌহাটি থেকে খুব দূর নয়। কিন্ত সবাই এসে বললো, চলো দেইখ্যা আসবা, আমাগো আশরাফুলের নিজের সমষ্টির সভা। হরিপুর জিপিতে সভা হইব। একটু পরে দেখলাম আশরাফুলের মা, বোন লাকি, ফুফু দুই এক জন, কিছু কাজিন, মাসী সবাই যাবার জন্য তৈরি। আমাদের এসে জিজ্ঞেস করলেন আবারও 'তোমরা যাবা না? চলো দেইখ্যাইবা। আমাদের চর, আমাদের গ্রামও দেখবা।' এবার আমরা দুজন চটপট চটি গলিয়ে রেডি। সত্যি এই ফাঁকে অনেক কিছুর দেখা মিলতে পারে। দেখতে দেখতে বেশ অনেক মানুষই দেখলাম যাবার জন্য তৈরি। কিছু আবার নিজে থেকেই বলছেন, সবাই গেলে কি করে হবে, এদিকটাও তো দেখতে হবে। সত্যি কারো কোন অভিযোগ নেই, মন খারাপ করা নেই। এবার এতজন কিভাবে যাবে। না কোন ব্যবস্থা নেই। না আছে কোন বিশেষ গাড়িঘোড়া। আমাদের জন্য বোধহয় একটু আড়ষ্টতা ছিল, আমরা বললাম আমাদের গাড়ি লাগবে না। আমরা সবাই টুকটুক করেই যাবো। যেই বলা অমনি পথচলতি টুকটুক দিয়েই আমরা চললাম। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, পথে আরও টুকটুক যাদের রাস্তায় পাচ্ছে ডেকে ডেকে গাড়িতে চড়িয়ে সভায় পৌঁছে দিতে যাচ্ছে। মানে যার যেভাবে সম্ভব সেই ভাবে সাহায্য করছে। মাছওয়ালা মাছ দিয়ে, যার সবজি আছে সব্জি দিয়ে, যার গাড়ি আছে তার গাড়ি দিয়ে, চাল, ডাল, নিজের শ্রম দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে এটুকু বুঝতে পারলাম।

 

মাঠ, ঘা্‌ সবুজ ধান ক্ষেত, পেরিয়ে সেই সাথে চরের ছাই রঙা রূপালি চিকচিক বালুর রাস্তা, মাটির রাস্তা, পেরিয়ে আমরা চলছি। আশরাফুলের মা আমাদের সব চিনিয়ে দিচ্ছেন, 'ওই দ্যাখেন আশরাফুলের স্কুল, এহানেই ক্লাস টেন অবধি পড়ছে, পরে গৌহাটি গিয়া পড়াশোনা করছে। ওই দেহেন ঐটা ওর ছোট ফুফুর স্কুল। এই এলাকার জ্ঞাতিগুষ্টির বেবাক মানুষের ভোট আশরাফুল পাইবো। সব্বে কইছে তারেই দিবো। তার লাইগ্যা বেবাগতে খাটতাছে।' যেতে যেতে হাঁক পেরে জিজ্ঞেস করছেন বাকিরা, 'কি হইলো মিটিং এ যাইবা না।' কেউ কেউ বলছে 'যাও আইতাছি।' যেতে যেতে জানলাম এই রাস্তাঘাট সব বানপানির তলে থাকে। বৃষ্টি দিলেই রাস্তাঘাটের চরম অসুবিধা এখানকার মানুষের।

 

আঁকাবাকা মেঠো পথে আমরা এসে গেলাম যেখানে সভা হওয়ার কথা। একটা বড় বাড়ি, ভেতরে অনেকগুলো টিনের ঘর। আর মধ্যিখানে বিশাল উঠোন। বুঝলাম এখানেই সভা হবে। কিন্ত মানুষজন এক্কেবারেই নেই। দেখে মনে হলো না বিশেষ কিছু হবে। আমরা একটু এদিক ওদিক ঘুরে দেখলাম। কিছু চেয়ার উঠোনে রাখা ছিল। বেশিরভাগই মহিলা। আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে জমায়েত শুরু হলো। কিছু মহিলারা নিজেদের বাচ্চাদের নিয়ে এসেছেন। প্রায় সবাই শাড়ি পরা ছিলেন, খুব কমই ছিল বুর্খা। সবাই বাংলায় কথা বলছিলেন। কোন বিশৃঙ্খলা ছিল না। আস্তে আস্তে চেয়ার সব ভর্তি হয়ে গেল, হঠাৎ করেই দেখি প্রচুর লোক, বেশিরভাগ শুধুই মহিলা। ভীড়ের মাঝে পেছনে আশরাফুলের মা ও বোন লাকি বসা ছিল এক কোণায়। আমি আরেক দিকে। সবাই ব্যস্ত ছিল সব কিছু আয়োজনে, নিজেদের সাথে আলাপ আলোচনায়। ছেলেদের উপস্থিতি একেবারেই কম ছিল। মানুষ বেশি হওয়ায় তেরপাল এলো, মাটিতে ছড়িয়ে দেওয়া হলো, যারা চেয়ারে ছিলেন পেছনে চলে গেলেন । যা কিচিরমিচির বাচ্চারাই করছিল। এক দুজনের সাথে কথা হলো। মুখে মাস্ক পরিহিত থাকায় তারা অন্য কেউ ভেবে দিব্যি গল্প টল্প করে চলে গেল। এই সভাতেও না কোন মাইক, না পোস্টার,  না কোন জাঁকজমক, কিছুই ছিল না। বুঝে নিয়েছিলাম, না তেমন কিছু নয়। এ গ্রামের ভেতরের মধ্যেই ছোটখাটো এমনি মিটিং। এদিক ওদিক তাকিয়ে মানুষ দেখছিলাম। অনেক মানুষ হয়ে গেল। সামনে কয়েকটি চেয়ার পাতা হলো, আমাদেরও ডাকা হলো, আমরা দর্শকাসনেই বসে রইলাম। এক এক করে কয়েকজন এলেন, চেয়ারে বসলেন। ভীড়ের মধ্য থেকে দুই তিন জন মহিলাও গিয়ে বসলেন। ভালোই লাগলো। যদিও কিছুটা আড়ষ্টভাব ছিল। রোদ পুরোপুরি পড়ে যাবার পর একটা ছোট অটো ট্রাক এলো, তাতে একটা মাইক আর পোস্টার। গান বাজছে খেলা হবে খেলা হবে। বাচ্চা গুলো ধুমধামে নাচতে লাগলো। সবাই বেশ খুশি। অবশেষে সভা শুরু হলো। দেখতে কেউই তেমন নন, না পোশাকআশাক। মানে নেতা নেতা ভাব, বা তেমন কেউকেটা কাউকেই মনে হচ্ছিল না। সবাই খুবই সাধারণ মানুষ  এমনই মনে হলো। অতঃপর সভা শুরু হলো। মাইকে কথা বলা শুরু হলো। খুবই বাজে মাইক। একটাই, সব ভালো করে শোনাও যাচ্ছিল না। তবে আশরাফুল তখনও এসে পৌঁছায়নি। একে একে অল্প সময়ের জন্য সংক্ষেপে কথা বলতে লাগলেন। আরে বাপরে এত কথা নয় যেন একদম পিন পয়েন্টেড কথাবার্তা। কে বলবে এরা চরের বাসিন্দা, খেটে খাওয়া মানুষ। কেন আশরাফুলকে ভোট দেব- আমগো ছাওয়াল, আমরা কোলে পিঠে কইরা মানুষ করছি। আমাগো ভোট তো সে পাইবউ, বেবাগতের কেমনে পাওন যায়, হের লাইগ্যা আমগো সবে কাম করন লাগবো। আশরাফুল নেই সভায়। যিনি বলছিলেন, সেই আড়ষ্ট মহিলা। সোজা হয়ে বসলাম। তিনি আরও বললেন এত বছর কারে ভোট দিমু, দেওন লাগে তাই দিসি হাতে, কিন্ত ৫ বার জিত্যা, ২০ বছর ধইরা আমগো লাইগ্যা কিসসু করে নাই। তাই আমরা এবার আমাগো ছাওয়াল, গরীবের পোলা, আমাগো সুখে দুখে যে আমরারে দেইখ্যা রাখছে তারেই দিমু, যোগ্য নেতারে পাঠামু আমগো কথা কউন এর লাইগ্যা। বলে কি এত সব রাজনৈতিক কথাবার্তা। আমার গায়ের সব রোম শিহরণ দিয়ে উঠলো। তারপরেও আরও দুজন মহিলা, বাকি ৭/১০ পুরুষ মানুষ ৫/৭ মিনিট করে যা বললেন, একটাও গ্যাজ দেওয়া কথা নয়। বিকেলে চলে যাবার, মানে গৌহাটি ফেরার কথা ছিল। কখন অন্ধকার হয়ে গেছে খেয়াল নেই। সবাই কিন্তু বসে আছে। সেদিন ছিল সবে বরাতের রাত। তাও এত এত মহিলারা বাচ্চা সমেত বসা। আরেক জন মহিলা বললেন, এখনের সরকার তো আমাদের চায় না, বলে আমরা নাকি সব বাংলাদেশি। বানপানিতে কেউ এসে খোঁজ করে নাই। লকডাউনে, এন আর সি'র সময়ে আমাদের দুর্দশার দিনে কেউ তো আমাদের মানুষ বলে ভাবে নাই। আমাদের আশরাফুলকে জিতাইয়া বিধানসভায় পাঠামু, ও আমগো কথা তাগো কইবো। তাই আমরা আশরাফুলরেই ভুটটা দিমু। একজন দাদা বলে উঠলেন, আমাদের রাইজের ডাঙরিয়ায় কইসে, তাগো লুঙ্গি, টুপির ভুট লাগে না, আমগো ভুট চাইনা তাগো। তাইলে তাগো রে বেহায়ার মত আমরা ক্যান ভুট দিমু। আমরা আমাদের আদরের আশরাফুলরে দিমু। সবাই এমন ভাবে কাম করেন যাতে আমরা উদাহরণ তৈরি করতে পারি, গরীবের পুলাও নেতা হইতে পারে। ভবিষ্যতে আমাগো ছাওয়ালরাও গরীব হইলেও নেতা হওনের আউশ করতে পারবো। নেতা হউনের লাওগ্যা পইসা লাগে না। লাগবো আমগো আশরাফুলের মত দিল, আর মানুষের লাইগ্যা কাম করার মন। একের পর এক সবাই যুক্তি দিয়ে গুছিয়ে ৪/৫ মিনিট করে এত সুন্দর করে কথা বলে যাচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল এই শিক্ষাই হচ্ছে আসল শিক্ষা। বোধ আর বিবেকের শিক্ষা। সহজ সরল দিলদরিয়া হওয়ার শিক্ষা। তবে হ্যাঁ আশরাফুল তখনো মিটিং এ এসে পৌঁছায়নি। এত ভালোবাসা মানুষ এমনি এমনি পেতে পারে না কিচ্ছু না করে। একটা মানুষকেও ডেকে আনতে হয়নি। মুখে মুখে জেনেই এসেছে। পাশে বসা এক মহিলা দুষ্টু ছেলে কোলে নিয়ে বলছেন, আমরা তো দিমুই, বেইক্তে যেন তারেই ভুট দেয় তার লাইগ্যা আমগো একটু খেয়াল করন লাগবো কি কউ। মনে পড়ে গেল, আশরাফুলের বাড়িতে ওর এক কাজিন আশঙ্কা করছিল, কিভাবে কি হচ্ছে জানি না ভাই, জিততেই হবে। হারলে কি হবে, আমাদের টাকা পয়সা জমি জিরত কিচ্ছুই নাই। এখানেই এই মিটিং কয়েকজন সবাই মিলে স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন সবাই।

 

তখন প্রায় ৬টা। আশরাফুলের মা ও দিদি লাকি চলে গেছে। আমরা একটু পরে যাবো ভেবে রয়ে গেলাম। একটু পরেই আশরাফুল এলো। দূর থেকে দেখতে পেলাম ক্লান্ত একজন ফর্সা ঘামে সিক্ত ছেলে সাদা পাঞ্জাবি পরা। তার সাথে কয়েকজন। এসেই উঠোন পেরিয়ে মহিলাদের মাঝে চলে গেল। সবার সাথে খুবই আন্তরিক বোঝা যাচ্ছিল। মাত্র একটা বালব ঝুলিয়ে আলোর ব্যবস্থা। ইতিমধ্যেই সভা প্রায় শেষের পথে। আশরাফুল কিছু বলবে হয়তো। তাকে শোনা হলো না। আমরা উঠে পড়লাম। আমরা একটু রিজার্ভে যাবো। নেক্সট মিটিং ওদিকেই আছে। রাত হয়ে গেলে আর যাওয়া যাবে না। তাই আমরা আশরাফুলকে এক ঝলক দেখে উঠে পড়লাম।

 

অন্ধকারের হয়ে গেছিল। আশরাফুল আসায় তার সাথে দুই একটা গাড়ি ছিল, তার থেকে একটা গাড়িতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা রিজার্ভে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। বিশাল বড় বড় দীঘি বা বিলের মত। রাতে তেমন বোঝা যাচ্ছিল না। চারপাশে শুধু বালু আর বালু। অনেক দূর হেঁটে যাবার পর একটা বাঁক এলো, একটা দোকান, কিছু মানুষ। মাঝে মাঝে টিনের ঘর দেখা গেল। একজন হাঁক পাড়লো, ও ফুফু ভাত খাইসো, আমাদের যিনি নিয়ে আসছিলেন, উত্তর দিলেন না। তাইলে আমগো ঘরে খাইয়া যাইও দুইডা। আমার হাতে ধরা আমার বন্ধু কাম গাইড বলে উঠলো, দেখছো দিদি, এরা ভাত খাইতে কইল। সত্যি তারপর আমরা দুতিনটে বাড়িতে গেলাম। একজন খুবই বৃদ্ধা মহিলা সারা শরীরে ভাঁজ পরেছে। আসবাব বলতে একটা উঁচু চকি, আর কয়েকটা পিড়ি আর একটা টিনের আলমাড়ি। পাশে রান্না ঘরে মাটির চুলায় দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। রান্না হচ্ছে। খাইয়া যাইবা কিন্ত। এই বাড়িতে আমাদেরও রাতের খাবার খেয়ে যর জন্য অনুরোধ এলো।

 

লিখতে লিখতে আমার আঙুল ব্যথা। কত কিছু লিখবো। সব যদি লেখা যেত তাহলে তো আর হয়ে গেছিল। সব শেষে যে বাড়িতে এলাম তিনি দেখতে ছোটখাটো, মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি ছিলেন। যখন তাদের পুরো গ্রামটা ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে চলে গেছিল, অনেক অনেক পরিবার, মানুষ, তাদের কথা, লিয়াকত আলি খানের কথা শোনালেন। তাদের সংঘর্ষের কথা শোনালেন, কত কষ্ট করে তারা এই রিজার্ভে মাটি ভাড়া করে থাকতেন। যে চালের নীচে বসে ছিলাম, চারিপাশে শুধুই টিন, আর কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার, ঘুমোবার চকি,ব্যস রান্নাঘরের জন্য কয়েকটি বাসনপত্র। তাকিয়ে রইলাম এক পলকে, কত যুদ্ধ এদের জীবনে। একটু বেঁচে থাকার জন্য, একটু ছাদের জন্য, ৩৫৮ টা পরিবারকে নিয়ে ২০০৭ এ এখানে এসে আবার জীবন যাত্রা শুরু করার যে প্রয়াস দু লাইনের এই মানুষগুলোর জীবন যুদ্ধ কি করে লিখি। এক একটা মানুষের জীবন যেন ইতিহাস বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তিনি নিজে আশরাফুলের জন্য প্রচার এর কাজ করছেন। তিনি আশরাফুলের মধ্যে তদানিন্তন তাদের নেতা লিয়াকত আলি খানের ছায়া দেখতে পান। তারা এই চর অঞ্চলের সবাই চান আশরাফুল জয়ী হয়ে তাদের জীবন যাত্রা একটু থিতু করতে সাহায্য করুক।

 

এখানেও ভাত খেয়ে যাবার আব্দার পেলাম। মনে মনে ভাবলাম এদের জীবনে এরা দেখেছে বেঁচে থাকাটাই সংগ্রাম। তাই ত্তারা মানুষকে ভালোবাসে, দুমুঠো খাবার ভাগ করে খেয়ে আনন্দ পায়। শ্রদ্ধায় ভক্তিতে মনে মনে প্রণাম করলাম এই নমস্য ব্যক্তিদের। পেশায় তিনি কাঠমিস্ত্রী। এখন আর শক্তি দিয়ে পারেন না। চোখে জ্বালা করছিল তাদের জীবন কাহিনি শুনে। আমরা চা খেয়ে অন্যদিন ভাত খাবো বলে বেরিয়ে গেলাম সামনের একটা ছোট্ট খালি জায়গায়। বুঝিয়ে বললেন একজন, এই সব চর এলাকা। নদীর বান পানি যখন আয়ে, বড় বড় বিল খাল বানাইয়া পাশে এমন কিছু চর থাকে পইরা। আমাদের মত অভাগারা আইরা আবাদ করি।

 

বেশ রাত হয়ে গেছে। দেখতে দেখতে এখানেও অনেক মানুষের ভীড় হয়ে গেল। তবে এখানে মেয়েদের তুলনায় ছেলে, পুরুষ মানুষরা বেশী। সবাই বসে ছিলেন নীচে, কিছু দাঁড়িয়ে ছিলেন। সবাই খুব খেটে খাওয়া এবং দরিদ্র মানুষ। চেয়ার ছিল না বেশি। মাত্র কয়েকটি তার মধ্যে আমরা জুড়ে ছিলাম বেশ কয়েকটি। আশরাফুল এলো। প্রায় সাতটা বাজে। একজন একজন করে এই খেটে খাওয়া মানুষরা একশো, দুশো, কেউ বা দশ বা বিশ টাকার মালা বানিয়ে পরিয়ে দিচ্ছে, কেউ বা হাতে করে কিছু একটা গুঁজে দিচ্ছে পকেটে, এক বাটি মাংস, একটা ডিম সেদ্ধ, একটা ফুলের গামছা, কেউ কেউ আবার গিয়ে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে আশীর্বাদ করছেন। এত ভালোবাসা কি এমনি পাওয়া যায়। যায় না, আশরাফুলের কথা শোনার জন্য বসেছিলাম। কি এত করেছে,  কি বলবে সে, এত বয়স্ক মানুষরা মাটিতে বসে আছে কিসের আশে।

 

কয়েকজন বক্তার অল্প ভাষণের পরই এবার আশরাফুল মাইক নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো। তাকে মানুষ ভালোবাসবে না তো কাকে বাসবে। সে বললো,

'আমি জিতলে সে জেতা আপনাদের জেতা। আমি বিধানসভায় গিয়ে বলবো আমি চরের মানুষ, আমরা বাংলায় কথা কই, আমার বাপ দাদা চৌদ্দপুরুষ এই দেশের ক্ষেত খামারে কষ্ট করছেন, বানপানিতে সব নিসে গা যখন, আবার নতুন কইরা ঘর বান্ধছে, সেই আমাগো মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়নের কথা আমি কমু। আমাদের যারা মিঞা বলে, তুচ্ছা তাচ্ছিল্য করে, আমরা তাদের দেখামু, আমাদের কাজ, আমাদের সবার প্রতি মানুষের মত ব্যবহার।'

 

সে আরও বলে যে সেখানকার প্রতিটি সরকারি স্কুলের প্রতি ক্লাসের জন্য শিক্ষক নিযুক্ত করার জন্য প্রয়াস সে করবে। মহিলাদের স্বাস্থ্য, সবার জন্য রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করা, সব থেকে জরুরি হলো, এই চর অঞ্চলের মানুষদের জমির পাট্টা দেবার ব্যবস্থা করবে। এন আর সি প্রক্রিয়ায় সবার নাম যাতে আসে সেই ব্যবস্থার জন্য সে বিধান সভায় আশরাফুল নিজে কথা বলবে। আশরাফুল বলছে প্রতিটি মানুষের জানার দরকার তার অঞ্চলে কি কাজ হয়েছে। আশরাফুল বললো তাঁদের অঞ্চলে কি কাজ হয়েছে, কত  টাকা সেংশন হয়েছে, তার হিসাব সে দেবে প্রতি বছর রিপোর্ট কার্ডে। আশরাফুল কথা দিয়েছে সে বিধান সভায় গিয়ে, চরের মানুষের উন্নয়নের জন্য, রাস্তাঘাট, রেশন কার্ড, সব কিছুর জন্য কথা বলবে। আশরাফুলের কি দরকার ছিল, পুণের কর্পোরেট জীবন ছেড়ে এই চরে এসে মানুষদের জন্য রাজনৈতিক ভাবে সবার অধিকার আদায়ের কাজে ঝাপিয়ে পড়ার। আশরাফুল নিজে একজন মানুষ, ২৭/২৮ বছরের যুবক, যে নিজের মাটি, এই চর, এই চরের মানুষদের ভালোবাসে। তাই খেলা হবে, এবার খেলা হবে। আশরাফুল বদ্ধপরিকর দেখিয়ে দিতে মিঞা বলে যাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়, যারা তাঁদের বলে যে লুঙ্গি, টুপির ভোট লাগেনা, সেই ওরা ওদের অধিকারের জন্য নিজেরাই দেশ শাসন প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভাগ নেবে। আশরাফুল কথা দিয়েছে সে সুশাসন, সুশিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাটির স্থায়ী পাট্টা, এন আর সি, ডি ভোটার ডিটেনশন ক্যাম্প সব কিছু নিয়ে চীৎকার করবে। আমাদের হকের জন্য লড়বে সে।

 

সবে বরাতের রাতে মনে হচ্ছিল, আমাদের দেশে ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায় আশরাফুল ফুটুক, যে শুধু আমাদের কথা বলবে, মানবতার কথা বলবে, যে শুধু বলছে নয়, দেখিয়ে দেবে রাজনীতি করতে হলে কাড়িকাড়ি টাকার দরকার নেই, দরকার শুধু সুশিক্ষার। এই দেশে সেই ছেলে কবে হবে, কথায় না বড় হয়ে, কাজে বড় হবে। আশরাফুল ৪৭ নং চ্যাঙা সমষ্টির হয়ে এবার ভোটে দাড়িয়েছে তালা চাবি চিহ্ন নিয়ে। আশরাফুলরা কোন দলে আছে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, আমার শুধু স্বপ্ন এই দেশ আশরাফুলের মত ফুলে ভরে যাক।

 

আশরাফুলের সাথে এখনো কথা হয়নি। যাবো আবার। শুধু মানুষ আশরাফুলের সাথে কথা বলতে। আমরা আবার মননে, যাপনে শষ্য শ্যামলা হয়ে উঠি। একবুক আশা ও নতুনের স্বপ্ন নিয়ে ফিরে এলাম। আজ বরপেটায় ভোট। আশা করবো আমাদের বরাকে, বরপেটায়, গোটা আসামেই তমাল, আশরাফুলরা স্বপ্নের ডালি নিয়ে মানুষের জীবনে আশার আলো ফোটাবে। নতুন ভোর আসবে, পৃথিবী আবার সবুজ হবে ।

ঈশানের যোগাযোগ

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions