রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

কোভিড-১৯ এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট
অরবিন্দ রায়
১৬ মে ২০২১ 

কোভিড-১৯ পৃথিবীর ১৯০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব এ–জাতীয় সংকট দেখেনি। আগে কেউ ভাবতেও পারেনি এটি ঘটতে পারে। করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলেছে। মহামারিতে বিশ্বের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা লাফিয়ে ওঠার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি সামাজিক ভাঙন এবং রাজনৈতিক বিভাজনও ঘটবে।
 

বিগত শতাব্দীতে এইডস, জিকা ভাইরাস, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু ইত্যাদি নতুন নতুন ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে মানুষের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।
 

একবিংশ শতাব্দীতে এসে যে কোভিড-১৯ ভাইরাসটি পৃথিবীকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে সেটা অতীতের ভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে ক্ষতিকারকতার দিক থেকে তুলনা করা যায় না। 

 

আদতে যে কোনও বৃহৎ ঘটনারই দুটি দিক থাকে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। যুদ্ধে সরাসরি জড়িত পক্ষ তো বটেই, যারা নয়, তাদেরও জীবন প্রবলভাবে প্রভাবিত হয় পরবর্তী ঘটনাক্রমে। বলা বাহুল্য, ভালোর থেকে মন্দ প্রভাবই বেশি। সারা বিশ্ব জুড়েই আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটের রূপরেখাটাই বদলে দেয় যুদ্ধ।


আমাদের জীবদ্দশায় করোনা ভাইরাস (Sars-Cov-2) সম্ভবত সেই বিশ্বযুদ্ধের আঁচই নিয়ে এল। এর সরাসরি প্রভাব কতটা ভয়াবহ, তা প্রতি মুহুর্তে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা বা সরকারি ব্যবস্থায় প্রাপ্ত খবরের আপডেটের মাধ্যমে অবগত হচ্ছি আমরা। আপাতত সেই প্রত্যক্ষ প্রভাব নিয়েই উত্তাল বিশ্ব। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। যদিও এর থেকে কোনও অংশে কম নয় এর পরোক্ষ বা পরবর্তী প্রভাব।
 

শেয়ার বাজারের ওঠানামার সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি ও তার প্রেক্ষিতে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার তুল্যমূল্য বিচার বাজার বিশেষজ্ঞরা করছেন প্রতিনিয়ত। তবে, বিশেষজ্ঞ না হয়েও শুধুমাত্র সাধারণ বুদ্ধিবলেই অনেকটা বোঝা যায় বিষয়টা। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক লেনদেন ভয়ঙ্কর সংকটের মুখে। পর্যটন, বিমান ও রেল পরিষেবা, বিনোদন জগৎ, ছোট-বড় ইন্ডাস্ট্রি, সব ধরনের ট্রেডিং থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রথম সারির উৎসব-অনুষ্ঠান সব বন্ধ। কাজ বন্ধ। আয়ও বন্ধ। এর ফলে বহু প্রতিষ্ঠান আগামীতে মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা। কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা অগণিত মানুষের।
 

বোঝাই যাচ্ছে, এমন এক প্রেক্ষিতে শ্রমজীবি মানুষের চিরন্তন লড়াই কঠিনতর হয়ে উঠতে চলেছে। সংগঠিত ক্ষেত্রে তবু কিছুটা ভরসা আছে। কিন্তু অসংগঠিত ক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করেন, সেই সব মানুষ প্রবল অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি যে হতে চলেছেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

 

আর্থ-সামাজিক পতনকে ঘিরে সমাজে আর একটি অসুখেরও প্রাদুর্ভাব ঘটে। সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধের কালো দুনিয়া। কালোবাজারিরা সুযোগ পাওয়া মাত্রই মজুত ও যোগানে ঘাটতির খেলা শুরু করে দিয়েছে। ইতিমধ্যেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একদিকে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের রোজগার বন্ধ।রোজগার নেই অথচ মূল্যবৃদ্ধি। “কদিন পরে বাজারে কিছুই পাওয়া যাবে না” বা “বাজার বন্ধ হয়ে যাবে”, এই আতঙ্কে আমরা সকলেই ঘরে ঘরে এখন এক একটি মজুতদারে পরিণত। একটা কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। বেঁচে থাকার অত্যাবশ্যক প্রয়োজনীয় উপকরণ কী, আর কী নয়, পরিস্থিতি সেই পাঠ পড়াচ্ছে আমাদের এখন।
 

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে  দীর্ঘমেয়াদী  লকডাউন বজায় থাকলে কর্মহীনতা ও দারিদ্রতা লাগামহীন হারে বাড়তে পারে, ----এতে এমন এক পরিস্থিতি সামনে আসতে পারে যেখানে অর্থনীতিজনিত মৃত্যুর সংখ্যা করোনা মহামারীতে প্রাণ হারানো সংখ্যার সমানুপাতিক হয়ে যেতে পারে। সঙ্কটের আরো গভীরতর রূপ সামনে আসে যখন দেখা যায় যে, এই করোনা দুর্যোগের আগে যে পরিবারগুলোর আয় জাতীয় দারিদ্র্যসীমার বেশ উপরে ছিল, তাদের ৮০% এর বেশি বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে। এই স্বল্পমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে,পূর্বের অর্থনৈতিক সামর্থ্যে ফিরে আসা নির্ভর করছে  এই সঙ্কটে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো কতটা  দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও যুৎসই তার উপর ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী সামাজিক অস্থিরতা ও দুর্ভোগের চিত্র ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেমন ভারতে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী দিনমজুর তাদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য লকডাউন উপেক্ষা করেছে, কেনিয়ায় দোকানীরা পুলিশের সাথে দাঙ্গা বাধিয়েছে, খাদ্য সংকটের প্রভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়ার রাস্তায় মারামারি শুরু হয়েছে, এমনকি বাংলাদেশেও জরুরি ত্রাণ বহনকারী গাড়ির উপর আক্রমনের খবর সামনে এসেছে।

 

ভাইরাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক পরিণতি সামাজিক অস্থিরতার মাত্রা বাড়িয়ে দেবে। সুতরাং এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য যত্নশীল, উদ্ভাবনী এবং চিন্তাশীল সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম বলেছিলেন যে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সময় অ্যানোমি ঘটে। ‘অ্যানোমি’ হলো আদর্শহীনতা ও লক্ষ্য-স্বল্পতার পরিস্থিতি। ডুর্খেইমের মতে, দ্রুত সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময় আত্মহত্যার হার বেড়ে যায়। ডুর্খেইমের কাছে আত্মহত্যা সামাজিক অস্থিরতার উদাহরণ ছিল। করোনার এ সময়টিকে একটি অ্যানোমি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ভয়, অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ একং আর্থিক কষ্ট সমাজকে গ্রাস করেছে এবং করতে থাকবে। জার্মানির এক মন্ত্রী এই সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে আত্মহত্যা করেছেন।


এই মহামারি চলাকালীন আমরা সমাজে অস্থিরতার কিছু উপাদান দেখছি। উদাহরণস্বরূপ চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের তাদের ভাড়া বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ থাকার অভিযোগে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা অস্বীকার করা হচ্ছে। এমনকি স্বাস্থ্য–সম্পর্কিত কলঙ্ক বা নেতিবাচক মনোভাবের কারণে সাধারণ রোগীরা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না।  এগুলো অ্যানোমো পরিস্থিতির কিছু উদাহরণ।

 

সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে লকডাউনে গিয়েছিল প্রায় প্রতিটি দেশ। ফলে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। কোটি মানুষ তাঁদের ঘরবন্দী। কিন্তু গৃহহীনরা রাস্তাতেই আছে। তাদের জন্য বাড়িতে থাকার বার্তা তাদের জন্য একটা রসিকতা। এদিকে যাঁরা প্রতিদিনের ভিত্তিতে উপার্জন করেন, তাঁরা আয় হারিয়েছেন।

 

দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন দুর্নীতি এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে করোনাভাইরাসটি দরিদ্রদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করবে। বিগত বছরগুলোতে দেশে দেশে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা রোধ করবে এই ভাইরাস। 

 

সুতরাং অত্যন্ত জরুরী বিষয় হলো – মহামারীকালীন মৃত্যু এবং অর্থনৈতিক পতন – এ দুইয়ের মধ্যে কিভাবে ভারসাম্য তৈরি করা যায়? আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, মহামারীকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দেশগুলি কিভাবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পারে? এসময়ে সামাজিক পর্যায়ে করনীয়গুলি কী? করোনা মোকাবিলা ও একইসাথে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কি ধরণের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাই বা গ্রহণ করা উচিত?

 

সামাজিক জীব হিসেবে আমরা অন্যদের সাহায্য আশা করি। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানীরা (Humanistic/Positive Psychologists) মানব প্রকৃতিকে (Sonodiatitvave) সন্দেহ ছাড়াই ‘ভালো’ বলেন। সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এটি একটি সমাজবান্ধব আচরণ (Prosocial) হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

 

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, দারিদ্র্য একা দরিদ্রদের সমস্যা নয়। এটি ধনী ব্যক্তিদেরও সমস্যা। তাঁর কথা করোনাভাইরাসটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ, সামাজিক জীব হিসেবে প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্বায়নের যুগে সব দেশ, রাজ্যগুলো পরস্পর সংযুক্ত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। ভাইরাস কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করে না এবং যেকোনোটি অন্য ব্যক্তির কাছে পাঠাতে পারে। মহামারি–পরবর্তী সময় বিশ্ব এক হবে না। কাজ এবং শিক্ষা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন হবে।
 

এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়, বিশ শতকের গোড়ার দিকে স্প্যানিশ ফ্ল’র কথা যেটির দ্বিতীয় আঘাত প্রথমটির তুলনায় অধিক বিভিষীকাময় ছিল।

 

ইতিহাস বলে, ভেঙে পড়া অর্থনীতি যতবার সমাজের গায়ে আঁচড় বসিয়েছে, যতবার দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে মানুষের, ততবারই বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে সমাজে। আর এভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে মানুষ। এই ঘুরে বা উঠে দাঁড়ানো, এই সংকটে হাতে হাত দিয়ে, পায়ে পা মিলিয়ে চলাই তো সভ্যতা।