রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

এক লাখের স্বচ্ছলতা
সীমা ঘোষ
৩০ জুন ২০২১

আমার বাড়িতে কাজ করে, ওর নাম অনিতা। বয়স ২৫! দুটি কন্যা সন্তানের জননী। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন আর একবার গর্ভধারণের ঝুঁকি নিয়ে একটি পুত্র সন্তান এনে দিক অনিতা এমন আশায় দিন গোনে। অনিতা মোটেই রাজি নয়। বড় মেয়েটির বয়স ৭, ছোটটির বয়স ৫।

 

এই তো মাত্র কদিন হলো অনিতা কাজে যোগ দিয়েছে। এর মধ্যেই কাজেও আসেনি। তখন চৈত্র সংক্রান্তি, ১লা বোশেখের মরশুম। আর ও মাত্র ১৫/২০ দিন হলো আমার বাড়িতে কাজে যোগ দিয়েছে। আমার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত লেফটেন্যান্ট প্রণতি ৮/৯ বছর কাজ করেছে। কিন্তু ও আর আসবে না। ওর মেয়ের ছেলে হয়েছে ও মেয়ে আর নাতির দেখাশোনা করবে। সঙ্গে মেয়ের বড় ৪ বছরের মেয়েকেও আগলাতে হব। আর স্কুলে কলেজে পড়া ওর আরও দুই মেয়ে, ক্লাস টেনে পড়া ছেলে অভিজিৎ যাদের প্রাইভেট টিউশন আর বন্ধন ব্যাঙ্কের টাকা, ঘর ভাড়া এগুলো ওর এই ঠিকা কাজের আয় দিয়েই চলে। প্রণতি আর কাজ করবে না, তবে, এসব কীভাবে হবে, ভেবে বিমর্ষবোধ করি।

 

কিন্তু ,ও ফোনে বলেছে

- দিদি, আমি মানুষ দেখিয়া দিমু। তুমারে ঠেকাইতাম না। তুমি কলেজ যাইবায় কেমনে? মানুষ না হইলে, তুমার চলবো নি? 
 

সেই থেকে অনিতা। চটপটে মেয়ে। কাজে কথায় বেশ তুখোড়। আমার খুব পছন্দের। সে হেন অনিতা দিন ১৫ কাজ করে ডুব কেন?

 

ফোন করি দু একদিন অপেক্ষায় পর।
- কি রে অনিতা, কী হলো? কাজ আর করবি না?


- না, দিদি, আমার ফোনো ব্যলান্স নাই। ইতার লাগি তুমরারে ফোন করতে পারসি না। বছর শেষ বুঝরায় না নি। ঘরোর কাম কাজ কিসু আটাইতে লাগবো। সামনে বর্ষা আইবো। ঘরোর টিনউন ফুক্কা হই গ্যাসে। মেয়ের বাফে ইতা ঠিক করের। ঘরের জিনিস পত্র ইতা আমায় আটাইতে লাগে। আমি আরও দুই তিন দিন বাদে আইমু। 

আমার জহুরি মনে খটকা। এগুলো সত্য বচন নহে। বানানো কথা। আচ্ছা, দেখা যাক।

 

কদিন চলল। আমার সংসার আমার মতো। হ্যাঁ, অনিতা এসেছে আরও বিশদ তিন দিন পর। কথার খেলাপ করে নি। সুযোগ সুবিধা মতো চেপে ধরলাম। 
- কী ব্যাপার, সত্যি কথা বল। ওসব টিন লাগানোর গল্প তো ঠিক মনে হচ্ছে না। 


- দিদি ঘরে টিন লাগানি হইসে ঠিকই। কিন্তু আমি যে ভাংতি দিসি ইটা এর লাগি না।


- তো কের লাগি? (আমারও সিলেটি মাথা চাড়া দেয়)


- আমার শরীলটা ভালা আসিল না।


- কী হয়েছে ? জ্বর সর্দি ? (মধ্যবিত্ত মন করোনা কালে বাজিয়ে নিতে চায়)


- না গো। আর কইও না। ঔষদ খাইতে লাগসে। তবে গিয়া ঠিক হইসে।


- সব হেঁয়ালি ধরি ধরি, ধ‍রতে পারি না। ওর মুখে লজ্জার আঁকিবুকি রেখা আমার ধন্ধ দূর করে দেয়। 


- তা এরকম কতবার হলো।


-ইবার ইটা তিন নম্বর

 
- অ্যাঁ, বলিস কী ? বাঁচার ইচ্ছা আছে, না
, নেই? (আমার ৩০ বছরের মাস্টারি শুরু হয়ে যায়) এরকম ক‍রছিস। মেয়েদের কথা ভাবছিস না? তোর কিছু হলে, ওদের কী হবে ?

 
- ভাবিআর তো ! কিতা করতাম ? আমরার কতা কেউ শুনবো নি ? 


শুরু হয় পাখি পড়ানো আমার। আরও সন্তান মানে আরো কীকী সমস্যা। আর ছেলেই হবে তার কি গ্যারান্টি ? ছেলে তোর ভবিষ্যত দেখবে কে বলেছে ? হাজার একটা উদাহরণ ছড়িয়ে ছড়িয়ে দিই। সবচেয়ে বড় কথা, কত বড় জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছিস জানিস ? তুই নিজে যখন চাস না, তখন এর পাকাপাকি ব্যবস্থা কর।


- মাইনসে কর শরীল দুর্বল হইবো। কাম কাজ ভালা ফারতাম না।


- শোন, ও সব বাজে কথায় কান দিস না। তুই মরে গেলে ওরা তোর মেয়েদের দেখাশোনা করবে কিনা জিগ্গেস করিস।

 
কয়েকদিন চুপচাপ। আমি খালি আড় চোখে চেয়ে থাকি। মাস্টারির ফল তো ফলাতেই হবে। অবশেষে খবর পাই মনে, আকবর বাদশার সঙ্গে অনিতার ঠিকাগিরির একটা মিল পাওয়া গেছে। 

 

ইউরেকা ইউরেকা ! করেছে করেছে। আপাতত একটা ব্যবস্থা করেছে। করোনার এই খারাপ সময় পার হয়ে গেলে দরকারে পাকাপাকি হবে। পরিবারের লোকজন শেষমেষ রাজি হয়েছে। 
 

মনে বলি, "তব্বে "! এতদিনের ছাত্র পড়ানোর অভিজ্ঞতা বাবা! হুউঁ হুঁ ফেল হলে চলবে কেন? কঠিন জিনিস কত সড়জে বোঝানো যায়, তার কত আয়োজন। সব কি বিফলে যাবে ?

বাড়ির লোকজন ওর ইচ্ছাকেই বেশি করে মেনেছে কারণ, যত দিন যাচ্ছে স্বামীর কামকাজের কোনো নিশ্চয়তা থাকছে না। ওর কয়েকটি ঠিকা কাম রেশনের চাল ওদের সবার ভরসা হয়েছে। তাই পুত্র সন্তানের প্রেম আপাতত মুলতুবি। লকডাউনে বড় মেয়ের টিউশন বন্ধ। কিছু টাকা বাঁচে। দুর্মূল্যের বাজারে তাই বা কি কম ! মাঝে মধ্যে বরের ছোটখাটো কাজ আর ওর আয় মিলে চলছে। আচ্ছা, যখন সব কিছু ঠিক থাকে কত আয় হয় অনিতার পরিবারের ? মনে ভেতর উড়ছে মন্ত্রীর বাণী, "সচ্ছলরা রেশনকার্ড ফিরিয়ে দিন। নইলে ব্যবস্থা।'' তাহলে এই অনিতা, কাজ ছেড়ে যাওয়া প্রণতি ওরা কি "সচ্ছল" ? বছরে কত আয় ? ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বের করি - ১লক্ষ ১০ হাজার।

 
- রেশন তুলিস ?


- অয়।


- আর পাইতে না।


- কেনে ? কেনে পাইতাম না ? 


- সরকার বলছে, তুই স্বচ্ছল।

 
- কিতা কিতা কইলায় ?


- না, মানে তোরা ভালো আয় করিস। তোদের আর রেশন দেওয়া হবে না। আর এই আয়ের কথা লুকালে তোর জন্য সরকার ব্যবস্থা নেবে, মানে পুলিশ ধরবে।


- কিতাযে কও দিদি ? আমরা ক্যামনে সংসার চালাই সরকারো ইতা বুজেনি। খাওয়ার মদ্যে দিনের পর দিন ঐ শুটকি। তাও যে দাম! তেলের দাম শুনছো নি ? ক্যামনে চলে কও ? সবজি কিনা বন্দ হই গ্যাসে। ইতা আর কিনার কতা ভাবি ও না। আর সরকারে কয় আমরা ভালা আয় করি !  ইতা সরকারের মাথাত দুষ দরসে। কয়দিন আগে কিতা এন.আর.সি-এন.আর.সি করিয়া মারসে। কত দৌড়াদৌড়ি করিয়া কাগজ জুগাড় করসি আমরা। সরকারে ইতা বুজবো নি ?  "ভালা আয় করি " ! (প্রতিধ্বনি বিদ্রুপ ঝরাতে চায়)


- আউক তারা ! দেকি কিতা করে ! জিগাইমু, তুমার গরের কামকাজের মাইনষে রেশন বন্দ করসে নি? আগে ইতার কাগজ দেখাও আমরারে। বাদে আমরা দেখাইমু, কইমু আমরার কয় টেকা আয়।  ইস বেশি আয় করি ! 


গজর গজর করতে করতে অনিতা কাজ শেষে সিঁড়ি দিয়ে নামে। কথার আওয়াজ মিলিয়ে যায়। আমি "স্বচ্ছল" অনিতার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। ভাবি সরকারের চোখের দিকে চোখ তুলে জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দেওয়ার হিম্মত কি ওর দৃপ্ত পদধ্বনি শুনিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ?