রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

অর্জনের ঝুলি এত অপূর্ণ রেখে কেন থেমে গেল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষা সংগ্রাম
দিলীপ কান্তি লস্কর
১৯ মে ২০২১ 

ভাষা শহীদ দিবস উপলক্ষে দিলীপ কান্তি লস্করের এই গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল 'দৈনিক যুগশঙ্খ' পত্রিকায় বছর দুই আগে। প্রাসঙ্গিকতা বিচারে এটি আবার এখানে পুনঃপ্রকাশিত হল ... 

১৯শে মে'র শ্রেষ্ঠত্ব তার সংগ্রামের বিচারে। ভাষাকেন্দ্রিক অভ্যুত্থানের এমন আপামর ব্যপ্তি অন্য কোন ভাষা সংগ্রামে পাওয়া যায় না। গণ সংগ্রামের পন্থাপ্রকরণে, সত্যাগ্রহে, শহীদ শব মিছিলে, সময়ের তুলনায় এমন নজিরবিহীন সংখ্যক লোকের অংশগ্রহণে, বর্ণ নির্বিশেষে অধিবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে, যে এক অনন্য সংগ্রাম। সাধারণ খেটে খাওয়া লোক যেমন ড্রাইভার, দর্জি, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, বয়নশিল্পি, কেরানি, আধিকারিক, কৃষক, মজুর থেকে ধরে হাসপাতালের এম.ডি.এমও, সিভিল সার্জন, শিক্ষক-অধ্যক্ষ, ছাত্র-যুবা সবাই অংশগ্রহণ করেছিল এই সংগ্রামে। সত্যাগ্রহ এতটাই জোরালো ছিল যে প্রায় মাসাধিক কাল ধরে প্রায় গোটা প্রশাসনযন্ত্রকেই প্রায় অচল করে রেখেছিল। ১৪৪ধারার তো কথাই নেই, কার্ফু পর্যন্ত ব্যর্থ করে দিয়েছিল জনতা। পুলিশ-মিলিটারিদের ভাষাশহীদদের হত্যাকারী হিসেবে সাব্যস্ত করে ওদের পানীয় জলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ওদেরে বয়কট করে চলত। পণ্য বিক্রি করতে চাইত না ওদের কাছে। ভিখিরিরা সারাদিনের উপার্জন জোর করে জমা দিয়ে যেত ভাষাসংগ্রামের তহবিলে। বন্দুকের ভয় দেখিয়ে শত চেষ্টা করেও একটি শহীদশব গুম করতে পারে নি পুলিশ। বহু অবাঙালি নেতা ও জনতা অংশগ্রহণ করে ছিলেন এই বাংলাভাষা সংগ্রামে। নেতাদের মধ্যে কেউ তো আগাগোড়া নেতৃত্বও দিয়েছিলেন এতে। চালিহা সরকারের পুলিশ  মিলিটারির অকথ্য বর্বর ও হিংস্র অত্যাচার সংগ্রামীরা নীরবে দাঁত চেপে সহ্য করেছেন এবং কোনও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেননি সত্যাগ্রহের আদর্শ রক্ষায়।

 

১৯শে মে' সত্যাগ্রহের অনেক ঘটনাই পৃথিবীর ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। সত্যাগ্রহীরা আদালতের এজলাস দখল করে, একাদশ ভাষা শহীদের মৃত্যুর দায়ে মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা কে অভিযুক্ত করে বিচার করে এবং বিচার করে মুখ্যমন্ত্রীকে ফাঁসির আদেশ দেয়। ৭ জুন ১৯৬১ সাল। অকুস্থল জজ কোর্ট, শিলচর। শুরু থেকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েও শিলচর কমিটি থেকে কংগ্রেস দল সংগ্রামের দুদিন আগেই ইস্তফা দিয়ে দেয়, কমিউনিস্ট দলও সংগ্রামে অংশগ্রহণ থেকে নিরত থাকতে বলে ওদের সদস্যদের। ফলে মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্ববিহীন ছাত্র, যুব ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহে ও আত্মত্যাগেই ১৯শে মে'র ভাষা সংগ্রাম এমন সাফল্য অর্জন করেছিল। এই প্রতিটি বিষয়ই ১৯শে মে'র ভাষা সংগ্রামের একটি অনন্যতা। এই সব অনন্যতা নিয়েই ১৯শে মে'র বাংলাভাষা সংগ্রাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষাসংগ্রামের অভিধা পেতে পারে, অনায়াসেই।

 

এতবড় একটি বিশ্বশ্রেষ্ঠ সংগ্রামের পরও ১৯শে মে'র অর্জনের ঝুলি কিন্তু বেশ শীর্ণই থেকে গেল। কিন্তু কেন? এই কেন-র উত্তরটাই খুঁজতে চাইছি এই নিবন্ধে। তবে হ্যাঁ, অর্জনের ঝুলি-তো শীর্ণই। ১৯শে মে'র প্রথম এবং প্রধান দাবি ছিল, 'বাংলাভাষাকে আসামের অন্যতম রাজ্যভাষা করতে হবে '। এই দাবির আংশিক সাফল্য অর্জিত হল, বাংলা ভাষাকে আসাম সরকার অন্যতম রাজ্যভাষা করল, কিন্তু শুধু তৎকালীন কাছাড় জেলা অর্থাৎ বর্তমান বরাদ্দ উপত্যকার জন্যে। রাজ্যের বাকি অংশে শুধু অসমিয়াই থাকল রাজ্য ভাষা। কেন গোটা আসামের জন্য রাজ্য ভাষার অনুমোদন পেল না বাংলা ভাষা? যেখানে গোটা আসামেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন বাঙালিরা, যাঁরা রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তর ভাষাভাষী গোষ্ঠী। তার প্রধান কারণ আসামের বাঙালিদের জাতীয়তাবাদের বাঁধনটা ছিল খুবই দুর্বল। যদিও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একযোগে নেমে পড়েছিল সংগ্রামে এবং এই অংশগ্রহণে কোন খাদ ছিল না। শুধু জাতীয়তাবাদের বাঁধনের দুর্বলতার সুযোগে ব্রিটিশ লালিত মুসলিম লিগের অনুসরণ কোনও ন্যায়সঙ্গত ও সুসংগঠিত আন্দোলনকে পিছন থেকে ছুরি মেরে মুখ থুবড়ে ফেলার মত ঘৃণ্য চক্রান্ত করে যে একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে লেলিয়ে দেওয়া যায় তা আসাম সরকারের জানা ছিল। কিন্তু নিজেকে উজাড় করে দেওয়া আন্দোলনকারীদের এটা একদম জানা ছিল না। আন্দোলনকারীরা এটাও জানত না যে গৃহশত্রু বিভীষণ কিংবা মীরজাফররা মরে যায় নি, ওরা বেঁচে আছে এখনও। বাঙালি জাতিসত্তার চিরশত্রু ওরা চির আয়ুষ্মান। ওরা যদি না থাকত তবে ১৯শ-এর প্রধান দাবি মানতেই হত আসাম সরকারকে অথবা কেন্দ্রকে দিতেই হত "পূর্বাচল" নামক পৃথক রাজ্য অথবা পৃথক বরাকের অনুমোদন। যা উনিশের জন্য শুধু সম্মানজনকই হত না, রাজ্যে বাঙালিদের জন্যে হত এক চিরশক্তি ও স্বাধিকারের জয়রথ। যদি শক্ত জাতীয়তাবোধের উপর ভর করে গড়ে উঠত আসামের বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দু বাঙালি, মুসলমান বাঙালি প্রত্যেকে প্রত্যেকের ধর্মাচারকে ধরে রেখে বৃহত্তর জাতীয় বাঙালি স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হত, তবে ক্ষমতা হত না কোনও রাজ্য সরকারের ১৯শে-এর ভাষা সংগ্রামকে দালাল দিয়ে ব্যর্থ করা। 

নেতাজির সহকর্মী কংগ্রেস সাংসদ ও সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতা শীলভদ্র যাজির সভাপতিত্বে ১৯৬১সালের ১৫ জানুয়ারি করিমগঞ্জে কংগ্রেস কর্মীদের এক গণকনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বিপুল সংখ্যক প্রতিনিধির উপস্থিতি, তাঁদের উৎসাহ-উদ্দীপনাও ছিল লক্ষণীয়। প্রথম প্রস্তাবটি ছিল বাংলাকে অন্যতম রাজ্যভাষা করতে হবে। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ছিল কাছাড় কংগ্রেসকে আসাম কংগ্রেস থেকে পৃথক করে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে হবে এবং তৃতীয় প্রস্তাবটি ছিল কাছাড় তথা বর্তমান বরাক উপত্যকাকে সন্নিহিত অঞ্চল সহ একটি পৃথক শাসনতান্ত্রিক সংস্থা হিসেবে গঠন করার স্বীকৃতি দিতে হবে (বাংলা রাজ্যভাষা না হলে)।দাবি অনাআদায়ে ৩০ চৈত্র ১৩৮৭ বঙ্গাব্দ অব্দি দেখে পয়লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল ১৯৬১) দিনটি সংকল্প দিবস হিসেবে পালন করে। ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত সভা, পথসভা, পদযাত্রা, শোভাযাত্রা ইত্যাদির মাধ্যমে গণচেতনা জাগ্রত করে ১৯শে মে তে  হবে সর্বাত্মক হরতাল। ঐতিহাসিক ও সমাজ বিজ্ঞানী ড. সুজিৎ চৌধুরী বলেন, 'প্রকৃতপক্ষে এতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ থেকে বরাক উপত্যকাকে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক দাবি এর আগে বা পরে কোনওদিনই উত্থাপিত হয় নি'। তিনি বলেন, সভাপতি শীলভদ্র যাজিও তাঁর ভাষণে মত প্রকাশ করে বলেন, 'স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে স্বীকৃতি না পেলে বরাক উপত্যকার ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন।' ড.সুজিৎ চৌধুরী আরও বলেন, 'কিন্তু এই কংগ্রেস কনভেনশনের বাইরের সমারোহের অন্তরালে যে সংকীর্ণ অন্তর্দ্বন্দের বীজ নিহিত ছিল, তার লক্ষণ সম্মেলনের সময়ই প্রকাশিত হয়েছিল।' এই বক্তব্য রেখেই তিনি চলে যান মওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরীর কথায়। বলেন, 'তিনি তীব্র আপত্তি তুলে সভা ছেড়েই বেরিয়ে যান। ড. চৌধুরীর ভাষায় মৌলানা চৌধুরী নাকি ছিলেন অত্যন্ত খোলামেলা ও সৎ প্রকৃতির মানুষ। অপ্রিয় সত্য বলতেও দ্বিধা করতেন না। কাছাড় কংগ্রেস ও বরাক পৃথকীকরণের দুটো প্রস্তাবের বিরোধীতা করার মত একটি শক্তিশালী চক্র যে বরাক উপত্যকার ভিতরেই সক্রিয় সেটা তার জানা ছিল এবং তিনি এটাও জানতেন যে ওরা সক্রিয় হলে কংগ্রেসিরা আর-এক-পা ও এগোবে না (বরাক উপত্যকার সমাজ ও রাজনীতি, লেখক সুজিৎ চৌধুরী)। পরবর্তীতে আমরা কী দেখলাম? বাস্তবে কিন্তু হলও তাই। আমরা এসব ক্ষেত্রে দেখেছি যে বাঙালি মুসলমানদের তরফ থেকে বিশেষ প্রতিরোধ ওঠে। নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ যেমন মনেপ্রাণে ভাষিক স্বার্থ দেখতেন, কেউ কেউ আবার আত্মস্বার্থ ও সরকারি সুযোগ সুবিধার দিকে ঝুঁকে সিদ্ধান্ত নিতেন। এতে ভাষা-মায়ের স্বার্থ তো ক্ষুণ্ণ হবেই, এতে তাদের কোন কুন্ঠাবোধই ছিল না। এই দ্বিতীয় ধরণের বাঙালি মুসলমান ভাইরা বলতে শুরু করেছিলেন যে পৃথক পূর্বাচল রাজ্য হলে বাঙালি মুসলমানরা নাকি নগণ্য সংখ্যালঘুতে পরিণত হবেন। ওদের নীতি ছিল অতএব এর বিরোধিতা কর। এই কথার সমর্থন পাই আমরা বিশিষ্ট লেখক ইমাদ উদ্দিন বুলবুলের "দেশি ভাষা বিদ্যা যার" বইয়েও। বর্তমান প্রবন্ধের অন্যত্র এ বিষয়ে  উদ্ধৃতি রয়েছে। হায় ওরা যদি এত আত্মস্বার্থপর না হয়ে মাতৃভাষা বাংলা ও বাঙালি জাতির স্বার্থটা দেখতেন তাহলে আজকের আসামের ডিটেনশন ক্যাম্প, ডি ভোটার ও এন আর সির বলির যে নিধন যজ্ঞ শুরু হয়েছে, তাতে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ভাষা মায়ের সন্তানদের বলি প্রদত্ত হতে হত না।  


১৯ জুনের ১৯৬১তে বেলা এগারো টা নাগাদ হাইলাকান্দিতে যে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল, তাতে যে সহস্র বাঙালি মুসলিম বাংলা ভাষাতেই উল্লসিত হয়ে শ্লোগান দিচ্ছিল, 'চালিহা সরকার জিন্দাবাদ', 'আসামে যদি থাকতে চাও, অসমিয়া ভাষা শিখে নাও', 'মইনুল হক জিন্দাবাদ ', তাদের অধিক সংখ্যকই অত্যন্ত দীন দরিদ্র ও অশিক্ষিত। হটাৎ করে এদের এত অসমিয়া ভাষা প্রেম উথলে উঠল কী করে?


কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদের পদযাত্রা প্রোগ্রামটি ১৯-০৪-১৯৬১ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত তিনটি মহকুমাতেই ব্যাপকভাবে হয়েছিল। 'সত্যাগ্রহীরা প্রায় সব জায়গায় গেছেন, সর্বত্র মানুষের মতামত নিয়েছেন। কেউ তো বলেনি, 'না,আমরা বাংলা ভাষা চাই না, অসমিয়া ভাষা চাই'। আর ওই শ্লোগান দিতে দিতে ওরা হাইলাকান্দির প্রধান রাস্তা প্রদক্ষিণ করল। এরপর কলেজ কলোনি, নূতন পাড়া, লক্ষ্মী শহর অঞ্চলে ৬০টি হিন্দু বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। লুঠতরাজ ও গৃহে অগ্নিসংযোগ পূর্বে কাছারি ময়দানে জড় হয়ে বড় বড় বাঁশের লাঠি, দা ও অন্যান্য অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহ করে উগ্রমূর্তি ধারণ করে, লাঠিনৃত্য চালায়। তারপর সার্কিট হাউসের দিকে ছুটে গিয়ে, ফের রাস্তায় আসে এবং  রাস্তার পাশের দোকানগুলিতে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। বেলা দেড়টায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়লে ওরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অথচ পুলিশের আইজি হায়দর হোসেন সকাল থেকেই শহরে ছিলেন। দেরিতে সংবাদ পেয়ে শিলচর থেকে ডেপুটি কমিশনার আর কে শ্রীবাস্তব বেলা ৪ টেয় হাইলাকান্দির ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং কলেজ কলোনিতে উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে ঘরবাড়িতে অগ্নি সংযোগ করতে দেখেন। প্রথমে সাবধান করেন, কিন্তু তাঁর সাবধানবাণীতে ওরা কর্ণপাত করেনি। তাই গুলির অর্ডার দিতে বাধ্য হন। গুলিতে ঘটনাস্থলেই ৫ জন নিহত হয়। পরে আরও ৮ আটজন দাঙ্গায় নিহত হয়েছে বলে জানা যায়। গণসংগ্রাম পরিষদের অনুসন্ধানে এই অনভিপ্রেত ঘটনার নাটের গুরু কে সেটা বেরিয়ে আসে। গণসংগ্রাম পরিষদ থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর কাছে আসামের কৃষি মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরীর নামে নালিশও করা হয়।

 

আসলে ১৯-এর ভাষা সংগ্রাম যে এত ব্যাপক ও সর্বাত্মক হয়ে উঠবে সেটা অসম সাহিত্য সভা, আসাম সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় সরকার কেউই আগে থেকে বুঝতে পারেনি। আন্দোলন এগিয়ে যাওয়ায় এর বিপুল শক্তি দেখে ওদের টনক নড়ে। শুরু হয়ে যায় টাকার খেলা। টাকা দিয়ে কেনা হয় গরিব ও নিরক্ষরদের মগজ। দালাল জাতীয় লোকদের নিয়ে রাতারাতি 'শান্তি পরিষদ' নামে ভুয়ো সংগঠন গড়ে ওঠে। যার সদস্যদের অধিকাংশই নানাবিধ ঘৃণ্য সামাজিক অপরাধ ও কেলেঙ্কারির নায়ক। ওদের সাহায্য নিয়েই চলতে থাকে ভাষাসংগ্রামের প্রতিসংগ্রাম। গুজবের পর গুজব, সাম্প্রদায়িক উসকানি, কুৎসা প্রচার, গণ সংগ্রাম পরিষদের প্রচার ও অনুষ্ঠানের পাল্টা প্রচার ও অনুষ্ঠান ইত্যাদি ছিল ওদের কর্ম পদ্ধতি।

 
নাগাড়ে ২৯ দিন তীব্র সংগ্রাম চলার পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা যখন  ভাষা সংগ্রামের নেতাদের  সসম্মানে দিল্লি ডেকে দীর্ঘ আলোচনা  করতে চেয়েছে, তখনই চালিহা সরকার ওদের শেষ তুরুপের তাস নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িক মিরজাফরদের  নিয়ে প্রতিসংগ্রামে অবতীর্ণ হলেন। আর উলুখাগড়ার মতো প্রাণ দিল ১৩ জন অজ্ঞ বাঙালি মুসলমান। পেশায় আইনজীবী ও নেশায় ভাষা সংগ্রামের গবেষক ইমাদ উদ্দিন বুলবুলের বই ''দেশি ভাষা বিদ্যা যার" থেকে নিচের উদ্ধৃতিটি পাঠ করলে আমরা আরও বিশদ জানতে পারি,'বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে এটা বলা যায় যে মইনুল হক চৌধুরী নিজের ওপর উপত্যকার জনগণ কর্তৃক ন্যস্ত দায়িত্ব পালন না করে বরং বাংলা ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন, যার পরিণতিতে আজও বাঙালি মুসলমানদের একাংশের ওপর বাংলা ভাষার প্রতি বেইমানি জনিত কলঙ্কের ছাপ রয়ে গেছে।'


বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের প্রাণের ভাষা বাংলা। নিজের মাতৃভাষার দাবিতে বিভেদ সৃষ্টি করে এভাবে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার ইতিহাস জগতে  খুবই বিরল। 

 

বরাক উপত্যকার প্রথম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দাপট ১৯৫০ সালে ব্যাপকভাবে অনুভব করা হয়। এই দাঙ্গা সমগ্র উপত্যকায় বিস্তার লাভ করেছিল। তারপর থেকে দাঙ্গার মানসিক পটভূমি বহাল তবিয়তে বর্তমান। বাংলাভাষা আন্দোলনে হিন্দু-মুসলিমদের বিভেদ হওয়ার কোনওরূপ কার্যকারণ ছিল না। কিন্তু হিন্দু-মুসলমানদের মানসিক দূরত্ব এবং সেই সঙ্গে অসমিয়া সম্প্রসারণবাদীদের 'আর্থিক মদতপুষ্ট বিভেদকামীদের উসকানি ও গুজব ছড়ানোতে হিন্দু-মুসলমানের পুরানো অবিশ্বাস আবার চাঙা দিয়ে ওঠে। গ্রামের সহজ সরল মুসলমানদের বিভ্রান্তকারীরা  ভালো করেই বুঝিয়েছিল যে আসামে থাকতে হলে অসমিয়া ভাষা গ্রহণ করতে হবে। আরও গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে কাছাড় কে ত্রিপুরার সঙ্গে একীকরণ করা হবে, ফলে বাঙালি মুসলমান এক উপেক্ষিত সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। সুতরাং বাংলা ভাষার বিরোধিতা তাদের রাজনৈতিক কর্তব্য। '


বুলবুল ভাইয়ের বইয়ে আরও অনেক তথ্য আছে। তাঁর আলোচনার উপসংহারে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেন যে---- পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ কিংবা এই ঈশান বাংলায়ও অখণ্ড জাতীয়তাবাদ চলছে-চলবে। কালের অমোঘ গতি কেউ রোধ করতে পারবে না। এই শেষ মন্তব্য শুধু আমার বোধগম্য হচ্ছে না ঈশান বাংলা বাঙালির অখন্ড জাতীয়তাবোধ নিয়ে কি আমাদের আত্মতৃপ্তির কারণ রয়েছে? কালের অমোঘ গতি কি বাঙালির অখন্ড জাতীয়তাবোধে উত্তরণ? তা কি এই আসামে তথা বরাক উপত্যকায়? হ্যাঁ, আমি স্বপ্ন দেখি এই সম্ভাবনা কে নিয়ে ঠিকই, কিন্তু এটা বাস্তব নয়, এ এক অনাগত স্বপ্নোপাদ্য! এই অখন্ড জাতীয়তাবোধ যা বর্তমান থাকলে যেমন বাংলা বিভাজন হত না, তেমন উনিশে'র মত শ্রেষ্ঠ ভাষাসংগ্রামকে অসময়ে বাড়ি ফিরতে হত না, অর্জনের ঝুলি এত শীর্ণ রেখে। পৃথক পূর্বাচল বরাককে কেন্দ্র থেকে যথাকালেই অনুমোদন করত। বাংলা কে অন্যতম রাজ্যভাষার দাবি শুধু বরাকের জন্য সীমিত থাকত না। আসামের বাঙালিকে এত মার খেতে হত না অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদের কাছে। যা স্বাধীনোত্তর কাল থেকে আজ অবধি তিলে তিলে কেবল বেড়েই  যাচ্ছে। ধন্যবাদ বুলবুল ভাই, এই প্রশ্নে এসে আরেক টি প্রশ্ন ঝেপে এসে দখল করে বসল মেধা জগৎ। অর্জনের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ ভাষা সংগ্রাম ২১শে ফেব্রুয়ারি এবং বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে বাঙালির অখন্ড জাতীয়তাবোধের কী ভূমিকা ছিল? বা কী ছিল তার সংজ্ঞা ও স্বরূপ?আমরা বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সালাহউদ্দিন আহমেদের বাঙালির সাধনা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ গ্রন্থে পাই, জাতীয়তাবোধ নামকরণের পেছনে যে উপাদানটি সর্বাধিক প্রয়োজন সেটি হল একটি সম্মিলিত ঐতিহ্যবোধ। এই ঐতিহ্যবোধ বা চেতনা যদি অনুপস্থিত থাকে তা হলে কেবল এক বংশজাত বা এক ধর্মাবলম্বী হলেই বা এক অঞ্চলে বা এক রাষ্ট্রের অধীনে বসবাস করলেই অথবা একভাষাভাষী হলেই জাতীয়তাবাদের পূর্ণ স্ফূরণ বা উন্মেষ ঘটে না। আরেক জায়গায় লিখেছেন, জাতীয়তাবাদ এক একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে অবস্থানকারী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত চেতনা বা অনুভূতি এবং এই চেতনা বা অনুভূতির পেছনে রয়েছে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। '


বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বকালে অভিজাত শ্রেণীর উচ্চমধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানরা আত্মপরিচয় নিয়ে একটি উভয় সংকটে পড়েছিলেন। তাঁদের দ্বন্দ্ব ছিল তাঁরা বাঙালি না মুসলমান? বাঙালি হলে কতটা বাঙালি, মুসলমান হলে কতটা মুসলমান? ওঁদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান কিংবা cultural identity সম্বন্ধে এই ধরনের প্রশ্ন বাঙালি মুসলমানের মানসচেতনা ও বিবেকচেতনাকে গভীর ভাবে আন্দোলিত করেছে। আমরা জানি পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে বাঙালি মুসলমানদের অবদানই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির অল্পকালের মধ্যেই ওদের মোহ ভেঙে যায়, যখন দেখতে পেল যে পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকদল ধর্মের জিগির তুলে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল তথা পূর্ব বাংলাকে ওদের অবাধ শাসনের ভুমি হিসেবে পরিণত করেছে। বাংলা ভাষা সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করে বাঙালিদের ওপর জোর করে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেবার চক্রান্তকে বাঙালি মুসলমানেরা ভালো চোখে দেখেনি। তখন থেকেই শুরু হল বাঙালি মুসলমানের মোহমুক্তির পালা। বিখ্যাত তাত্ত্বিক বদরুদ্দিন উমরের ভাষায় "বাঙালি মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন", যে বাঙালি মুসলমান আরব, ইরাণ ও তুরস্কের প্রতি অধিক আকৃষ্ট ছিল, তাদের মধ্যে দেখা দিল নবজাগরণ। স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওরা নিজেদের জাতিয়তাবোধে সচেতন হতে শুরু করল। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৪৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে ইসলামের একনিষ্ঠ সেবক বাংলার প্রখ্যাত মনীষী ডঃ মহম্মদ শহীদুল্লাহ বিনা দ্বিধায় ঘোষণা করলেন, আমরা হিন্দু মুসলমান যেমন সত্য তারচেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।

 

এই সচেতনতার মধ্য দিয়েই কালক্রমে জন্মলাভ করল এক নতুন বাঙালি জাতিয়তাবাদ। এই জন্যই যে এটা ধর্মনিরপেক্ষ এবং বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাষ্ট্রীয় সীমান্তের মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত চেতনা যা ১৯৪৭ সাল পরবর্তীকালে নানা কারণে এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। এই নতুন চেতনাই হল নতুন বাঙালি জাতিয়তাবাদের মূল ভিত্তি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জনগণ তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য--- যে ঐতিহ্য কোনও বিশেষ ধর্মের বা বর্ণের সংকীর্ণ গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেই সমন্বয়ধর্মী, মানবতাবাদী ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠল, যা সম্পূর্ণ লোকায়ত ও ভূভিত্তিক। এই শেষ শর্তটাও অপরিহার্য।

জাতিসত্ত্বার একটি প্রকৃত গুনগত পার্থক্য তথা চারিত্রিক লক্ষণের বিশেষ পরিবর্তন সাধনে চাই একটি প্রকান্ড বড় আঘাতের অনুঘটক, একটি ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণ। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ সময়কালে সমস্ত পূর্ব বাংলায় যখন গনতান্ত্রিক আন্দোলন সুদৃঢ়ভাবে দানা বেঁধে উঠল, তখন শাসকগোষ্ঠীর দোসর সেনাবাহিনী ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে একবারে আকস্মিকভাবে পূর্ব বাংলা দখল করে বসে। ওরা ওই সামরিক কুশাসন একেবারে মুক্তিযুদ্ধ অব্দি কায়েম রাখে। সামরিক শাসক ইয়াইয়া খান নাটকীয়ভাবে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তরের কপট আলাপ আলোচনা চালাতে থাকেন। আসলে এটা ছিল একটি নাটক, যার যবনিকার আড়ালে কার্যতঃ তিনি প্রধান শাসক জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে চক্রান্ত মাফিক বাঙালির কন্ঠরুদ্ধ করে দেবার পরিকল্পিত চক্রান্ত রচনা করেছিলেন। চক্রান্তের চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ শেষ রাতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র নির্দোষ বাঙালিদের ওপর বিশ্বাসঘাতক পৈশাচিক আক্রমনে হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। সংগঠিত হল এক বিশাল ভয়ানক গনহত্যাকান্ড। লক্ষ লক্ষ বাঙালি মুসলমান ও হিন্দু বাঙালির রক্তে লাল হয়ে উঠল পূর্ব বাংলার মাটি। বিশাল আঘাত, বিরাট হত্যালীলা। প্রায় তিন লক্ষ বাঙালি শহীদ হল। ঘাতক হিন্দু দেখেনি, মুসলমান দেখেনি, দেখেছে বাঙালি। ঘাতক মালা-তিলক-টিকি কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাঁড়ি দেখে হ্রাস বৃদ্ধি করেনি ওদের আঘাতের মাত্রা। 

 

এই নির্মম ঐতিহাসিক বাঙালি নিধনযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করল পূর্ব বাংলার বাঙালি। ওই দৃশ্য ওদের বাঙালি জাতিয়তাবাদের অস্তিত্বে পরিয়ে দিল শেষ রত্নহার। যেমন জড়াজড়ি করে মরণ হল হিন্দু-মুসলমান বাঙালির তেমন গলা জড়িয়ে ওরা বাঁচতে শিখল, লড়াই করতে শিখল। বিশাল আঘাতের প্রত্যাঘাতে তৈরি হল তেমনই বিশাল সংগ্রাম, যার ফলে বাংলাদেশের জন্ম। ফলে দেখা যায় বাঙালি জাতিয়তাবাদের পরমতম স্ফুরণের শক্তিই ছিল মুক্তি সংগ্রামের আসল শক্তি। এই শক্তিতে বলিয়ান হতে পেরেছিল বলেই পৃথিবীর বুকে প্রথম ও একমাত্র ভাষিক দেশ - বাংলাদেশ হল ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা সংগ্রামের শ্রেষ্ঠ অর্জন।

এদিকে  ১৯ শে মে'র ভাষা সেই ঢাকার বিশাল গনহত্যার মত কোনও বিরাট অনুঘটকের উপস্থিতি ছিল না। এত বিশাল ও গভীর প্রক্রিয়া একই সঙ্গে একযোগে হয়নি। অথচ যুগসন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছিল ঠিকই যা বাঙালির ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার দাবি রাখে। গনহত্যা হয়েছিল কিন্তু দফায় দফায়। উপুর্যপরি ভাষা দাঙ্গা ও বঙ্গালখেদার রক্তক্ষয়ী ঘটনা ব্যাপকভাবে ছেয়ে গেছিল গোটা ব্রহ্মপুত্র উপত্যাকায়  হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে, হাজার হাজার মানুষ মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার বাঙালির মৃত্যু হচ্ছিল হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে। দিনে দিনে,পরে পলে নির্যাতিত হচ্ছিল গোটা বাঙালি সমাজ, সেই ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০/৬১ অব্দি। ১৯ কে কেন্দ্র করে যে মহাসংগ্রামের প্রস্তুতি হচ্ছিল তাতে সম্মিলিত ভাবে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ, নেতা ও প্রতিনিধিরা সমবেত হয়েছিলেন জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে। গুলিবর্ষণের স্থানে মুসলমান বাঙালিরা সংখ্যায় কম উপস্থিত হয়েছিলেন বলে শহীদ হতে পারেননি তবে আহত হয়েছেন। আর বাঙালি হিসেবে একটা জাতীয়তাবোধ তো ছিলই, কিন্তু সেই জাতীয়তাবোধ ধর্মনিরপেক্ষ ছিলনা। একজন লোক, তিনি কতটা হিন্দু আর কতটা বাঙালি কিংবা কতটা মুসলমান আর কতটা বাঙালি এই প্রশ্ন জরুরি বাঙালি জাতীয়তা যাচাই করার জন্য। এই জাতীয়তাবোধ ধর্মকে অস্বীকার করে নয়, একটু গৌন রেখে, যাতে বাঙালিত্ব জোরালো হয়। তখন "বাংলা" ও "বাঙালি" দুটো শব্দের যে লোকায়ত ও ভূমিজ আবেগ তার চিরাচরিত ঐতিহ্য নিয়ে হৃদয়কে উদ্বেল করবে এবং সেই অবস্থাতেই বাঙালি জাতীয়তাবোধ সঠিক রূপ ধারণ করতে পারে। এমন অনুপ্রেরণা ও আদর্শে যখন বাঙালি জাতীয়তাবোধ জারিত হবে তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিভেদের কোন সুঁচও গলবে না। এবং এই উত্তরণে পৌঁছলেই বাঙালি জাতীয়তাবোধে বেসরকারি, সরকারি বা শাসক কারও উস্কানি ই নাক গলাতে পারবে না। ১৯ শের ভাষা সংগ্রামে জাতীয়তাবোধে গড়বড় ছিল বলেই সাম্প্রদায়িক দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং দাঙ্গা সংগ্রামকে সংগ্রামের একদম তুঙ্গে ওঠা অবস্থায় পেছন থেকে ছুরি মেরে শেষ করে দিল।

                           

---------------
 

তথ্যসূত্র -
১. বরাক উপত্যকার সমাজ ও রাজনীতি (সুজিৎ চৌধুরী)
২. দেশি ভাষা বিদ্যা যার (ইমাদ উদ্দিন বুলবুল)
৩. বাঙালির সাধনা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (সালাহ উদ্দিন আহমেদ)
৪. উনিশে মে'র ইতিহাস (সম্পাদনা - দিলীপ কান্তি লস্কর)
৫. বাংলা ভাষা আন্দোলন ও যুগশক্তি (১৯৬০-৬১) - যুগশক্তি প্রকাশন, করিমগঞ্জ, আসাম