রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ভ্যাক্সিন ‌অসাম্য
গোবিন্দ ভট্টাচার্য
ভাষান্তর - জয়দীপ ভট্টাচার্য
০৯ জুন ২০২১

ভারতের বর্তমান কোভিড সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে ভ্যাক্সিন ব্যাপারটি বহু আলোচিত বিষয়।
ভ্যাক্সিন উৎপাদনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে কলম ধরেছেন গোবিন্দ ভট্টাচার্য।
তার এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে "দি স্টেটসম্যান" পত্রিকার ১৫ মের ইংরেজি সংস্করণে।
প্রাসঙ্গিকতা বিচারে এটির বঙ্গানুবাদ এখানে প্রকাশিত হল ...

অবশেষে বিশ্ব বানিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউ.টি.ও) কোভিড ভ্যাক্সিন এর ক্ষেত্রে পেটেন্টে ছাড় দেবার যে আবেদন করেছিল ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রকাশ্যে স্বীকৃত মেধাস্বত্ব নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তাতে সমর্থন জানিয়েছে। বলেছে বর্তমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই নিয়মবহির্ভূত স্বিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরী। কিন্তু এখনও এতে উল্লসিত হবার সময় আসেনি। মনে রাখতে হবে যে এখন অব্দি এই কোভিড ভ্যাক্সিন থেকে শুধু উন্নত এবং ধনী দেশগুলিই লাভ উঠিয়েছে, গরীব দেশের সমস্যা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। আফ্রিকা এবং এশিয়ার সল্প আয়ের দেশগুলোর ভাগ্যে এখনো বলতে গেলে ভ্যাক্সিন প্রায় জুটেইনি, উল্টোদিকে মুষ্টিমেয় কিছু দেশে প্রায় ১০০ কোটি ডোজ সাধারণ নাগরিকদের জন্য উপলব্ধ হয়েছে। ফলাফল -  এই দেশগুলোতে সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে হৃস পেয়েছে, যেখানে ৩৬ টি দেশে সংক্রমণ ক্রমবর্ধমান। ঘাতক ভাইরাসের প্রকোপে গত এপ্রিল মাস থেকে ভারতে আক্রান্তদের অবর্ণনীয় অবস্থা ও মৃত্যুর ক্রমাগত খবর আসছে, দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ ছাড়িয়েছে।

প্রত্যাশা মতোই ভ্যাক্সিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যারা গতবছর ভ্যাক্সিন বানিজ্য থেকে প্রভূত লাভবান হয়েছে (শুধু "ফাইজার"এর লাভই ৭০০ কোটি ডলার বলে ধরা হচ্ছে) তারা এই উদ্যোগের জোরদার প্রতিবাদ জানিয়েছে, তারা এটা ভুলে যাচ্ছে যে গরীব দেশগুলোতে যে হারে এই অতিমারীর প্রকোপ বাড়ছে, তার সাথে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা তাতে এখন লাভের কথা ভাবার উপযুক্ত সময় নয়। ফার্মা কোম্পানির এই দৃষ্টিভঙ্গি অতিপরিচিত এবং এরই প্রতিধ্বনি শোনা গেছে বায়োটেক বানিজ্য সংস্থা "বায়োটেকনোলজি ইনোভেশন অর্গেনাইজেশন"এর সি.ই.ও মিশেল ম্যাকমারির কথায় - 'পেটেন্ট ই একমাত্র কারণ যারজন্য কোভিড ১৯ ভ্যাক্সিন টিকে রয়েছে। এতে ছাড় দেওয়া মানে এই অতিমারী এবং ভবিষ্যত স্বাস্থ্যজনিত সঙ্কটে আমাদের উদ্যোগকে স্তিমিত করা।'

এটা সত্যি যে ওষুধ কোম্পানিগুলোকে এসব ক্ষেত্রে গবেষণা খাতে প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করতে হয় এবং সাফল্যের হারও যথেষ্ট কম। ম্যাকমারির কথায় এযাবৎ কোভিড ভ্যাক্সিন উৎপাদনের জন্য নেওয়া প্রায় দুশোটি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ১০ টি সাফল্যের মুখ দেখেছে এবং বাজারজাত হয়েছে এবং তাই এই ব্যার্থতা ও সাফল্যের যুগপৎ বিনিয়োগকে একসাথে ধরেই কোম্পানি গুলিকে বিনিয়োগের খরচা পুনরুদ্ধার করতে হবে। তার কথায় 'সেজন্যই পেটেন্টে ছাড় দেবার প্রস্তাবটি নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। এর মানে হচ্ছে যে সব প্রতিষ্ঠান এই ব্যাপারে সাফল্য পেয়েছে তাদের এবং তাদের বিনিয়োগকারীদের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের লাভ যেকোন কেউ ওঠাতে পারবে।' এটা ভিন্ন ব্যাপার যে অধিকাংশ কোম্পানি কিন্তু এই ব্যাপারে যথেষ্ট সরকারি অনুদান পেয়েছে, ছাড় পেয়েছে নিয়মনীতি এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ব্যাপারেও।

শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ছয়টি ভ্যাক্সিন কোম্পানি ১২০০ কোটি টাকার সরকারি অনুদান পেয়েছে। এস্ট্রোজেনিকা-অক্সফোর্ড ভ্যাক্সিন উৎপাদনের প্রায় পুরো ব্যায় সাধিত হয়েছে সরকারি অর্থানুকুল্যে। ফার্মা কোম্পানিগুলোর গবেষণা ও বিকাশ খাতে সরকারি অনুদানকে সবসময়ই খাটো করে দেখানোর একটা প্রবনতা রয়েছে বরঞ্চ কিছু স্থূল মন্তব্য ই চোখে পড়ে  যেমন - 'আন্তর্জাতিক পেটেন্টই সেই অদৃশ্য জীয়নকাঠি যা কোনো আইডিয়াকে পন্যে রুপান্তরিত করে ... এরফলে একসাথে বিনিয়োগকারী, অর্থনীতি এবং রোগী সবাই লাভবান হন, সর্বত্রই'। তবে এইসব অসার মন্তব্যের পাশাপাশি আরেকটি সতর্কবার্তাও উচ্চারিত হয় - 'যেসব দেশ এই পেটেন্ট ছাড়ের জন্য জোরালো আওয়াজ তুলছে তারা তা নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্যই করছে তারা যে এই অতিমারীর সুযোগ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে যেসব উদ্ভাবনী প্রযুক্তি আবিষ্কার হচ্ছে তাকে করায়ত্ত করতে চাইছে না সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এরফলে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বিপর্যস্ত হতে পারে কারণ এই এম.আর.এন.এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত জৈবিক অস্ত্র বানানো সম্ভব।'

আসলে এসব যুক্তি বহুব্যাবহারে "ক্লিশে" হয়ে গেছে এবং গরীব দেশ যাদের এইসব পন্যের বিশাল বাজারের সুযোগ নিয়ে ধনী দেশগুলি লাভের অঙ্ক কষে তাদের এমনতর নীতিগর্ভ বক্তব্য প্রায়ই শুনতে হয়। এইসব যুক্তি যারা দেন তারা ভুলে যান যে আজকের এই সময়ে সমস্ত দেশই একে অন্যের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং সবাই সুরক্ষিত না হলে কারুরই সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকা সম্ভব নয়। ভাইরাস কোনো সীমানা বোঝেনা, অবিশ্বাস্য গতিতে সে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং তার সংক্রমণের ক্ষমতাও দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। যদি এই সংক্রমণের গতিতে লাগাম টানা না যায় তবে অচিরেই তা আরও মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করতে পারে যখন হয়তো তা বর্তমান ভ্যাক্সিনের কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিতে পারে।

এর একমাত্র সমাধান যা মেরিয়ানা মাজুকুটো, জয়তী ঘোষ ও এলস টরিলে ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছেন তা হল একটি "জনগনের ভ্যাক্সিন বা প্রতিষেধক" যা সবার জন্য লব্ধ হবে এবং যা সবার ক্রয়ক্ষমতার নাগালে থাকবে। এটাই বর্তমান ভ্যাক্সিন বৈষম্য, যা  একসাথে নৈতিক, স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি করছে তার থেকে সমাধান সূচিত করতে পারে। তাদের মতে পেটেন্ট উঠিয়ে দিলে বিশ্বজুড়ে যে উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে তা একসাথে কাজ করতে পারে এবং এরফলে সবার টিকাকরণ সম্ভব -বিশ্ব জনসংখ্যার ৬০% কে এই বছর ও বাকিদের ২০২২ সালের মধ্যে।

এখন অব্দি ভ্যাক্সিন সরবরাহে প্রবল অসাম্য দেখা যাচ্ছে। মডার্না এবং ফাইজার মূলতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং এস্ট্রোজেনিকা ও জনসন এন্ড জনসন ইউরোপে ভ্যাক্সিন সরবরাহ করছে। একমাত্র ভারত, যার উৎপাদন ক্ষমতা বিশ্বে সর্বাধিক, গরীব দেশগুলোতে সরবরাহের জন্য ভ্যাক্সিন ব্যবহার করেছে। এবং তা শুধু প্রতিবেশী দেশে নয় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু ভারতও বর্তমান এই দ্বিতীয় ঢেউ এর ভয়াবহতায় রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়েছে। রাশিয়া এবং চীনের প্রতিষেধক মূলতঃ তাদের নাগরিকদের জন্যই ব্যাবহৃত হয়েছে যদিও এখন অন্যান্য দেশ সেগুলো সংগ্রহ করছে। কিছু ধনী দেশ কিন্তু ইতিমধ্যে প্রচুর ভ্যাক্সিন মজুত করে রেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  ৩০০ কোটির উপর ডোজ মজুত করে রেখেছে, যা তার দরকার নেই, অথচ বিশ্বের অধিকাংশ নাগরিকদের এখনো টিকাকরণ সম্ভব হয়নি এবং বর্তমান হারে উৎপাদন ক্ষমতা জারি থাকলে এটা করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। যখন সারা বিশ্ব এক অভূতপূর্ব সঙ্কটের মুখোমুখি তখন পেটেন্টের অধিকার, ঝুঁকি, মূল্য বা প্রতিযোগিতা এসব বিষয় এই মুহূর্তে অবান্তর বলেই মনে হয়।

ফার্মা কোম্পানিগুলোর আরেক যুক্তি হচ্ছে যে গরীব দেশগুলো খুব তাড়াতাড়ি তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হবেনা, উল্টে এই মুহূর্তে সল্প সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিযোগী হয়ে সামগ্রিক উৎপাদন কে ব্যাহত করবে। "ফাইজার" এর সি.ই.ও এলবার্ট ‌বৌরলার কথায় 'এর ফলে উৎপাদনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা আমাদের সুরক্ষিত ও কার্যকরী ভ্যাক্সিন তৈরি করার জন্য জরুরি তা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হবে। যে সব প্রতিষ্ঠানের ভ্যাক্সিন তৈরির দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা কিছুই নেই তারা এর কাঁচামাল আটকে রাখবে যার ফলে আমাদের উৎপাদন হার কমবে এবং একই সাথে সুরক্ষা ও নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।' এটাও আরেকটি "ক্লিশে"।

ভারত, ব্রাজিল, কিউবার মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ভ্যাক্সিন উৎপাদনের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও পরিকাঠামো রয়েছে। ভ্যাক্সিন উৎপাদনের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে সহযোগিতা দরকার কারণ ভ্যাক্সিনের কাঁচামাল এবং প্রযুক্তি তথা পরিকাঠামো দুইই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। মেধাসত্ত্বে ছাড় দেওয়া মানে প্রযুক্তির হস্তান্তর সহজ হবে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবেন, উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে এবং উপযুক্ত দামে সবার কাছে ‌ভ্যাক্সিন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে এস্ট্রোজেনিকা যে দরে বাংলাদেশ, উগান্ডা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ভ্যাক্সিন সরবরাহ করছে, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন কিন্তু তারচেয়ে কমদামে এটি ক্রয় করছে।

গত অক্টোবর মাসে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গেনাইজেশন (ডব্লিউ.টি.ও)এ ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা সওয়াল করেছিল যে একমাত্র পেটেন্ট ছাড় দিলেই এই কোভিড ভ্যাক্সিন সাধারণ্যে নায্যভাবে, সমতার ভিত্তিতে ও সাশ্রয়ী মূল্যে উপলব্ধ হওয়া সম্ভব। ১৮৬টি দেশের মধ্যে ১০০টি এই যুক্তিতে সমর্থন জানিয়েছিল। মে,২০২০ তে ডব্লিউ.টি.ও-র উদ্যোগ "কোভিড-১৯ টেকনোলজি এক্সেস পুল" যা মেধাসত্ত্বের একত্রীকরণের জন্য ভাবা হয়েছিল তা কার্যকরী হয়নি। একই ভাবে এপ্রিল,২০২০ তে "কোভ্যাক্স ইনিসিয়েটিভ" যা এই ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী মেধাসম্পদের একীভবন করে সবাইকে ভ্যাক্সিনের সুযোগ করে দেবার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল তাও শেষ অব্দি সফল হয়নি।ফার্মা কোম্পানিগুলো উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে অনুমতি ভিত্তিক চুক্তি (লাইসেন্সিং এগ্রিমেন্ট) করতে আগ্রহী থাকে। উদাহরণস্বরূপ ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউট অক্সফোর্ড-এস্ট্রোজেনিকা র সাথে লাইসেন্সিং এগ্রিমেন্ট করে তাদের ভ্যাক্সিন উৎপাদন করছে। এবং বলা বাহুল্য যে এরজন্য তাদের এস্ট্রোজেনিকা কে রয়্যালিটি দিতে হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক পেটেন্ট অধিকার রক্ষার্থে ডব্লিউ.টি.ও অনেক দিন ধরেই একটি চুক্তি পত্র তৈরি করে রেখেছে যাকে "ট্রেড রিলেটেড এস্পেক্ট অফ আই.পি রাইটস" বা সংক্ষেপে ট্রিপস্ (TRIPS) বলা হয়ে থাকে। এর ফলে জাতীয় স্বাস্থ্য সঙ্কটের মতো পরিস্থিতি হলে বাধ‌্যতামূলক অনুমতি (কম্পালসারি লাইসেন্স) বা সি.এল-র ভিত্তিতে কোনো দেশ পেটেন্ট যুক্ত আবশ্যিক ওষুধ ইত্যাদির সুযোগ নিতে পারে। বাধ্যতামূলক অনুমতি বা সি.এল সেই দেশ পেতে পারে যেখানে রোগীদের জন্য সেই বিশেষ অষুধটি উপলব্ধ নয়। উদাহরণস্বরূপ সাম্প্রতিক রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এর ওষুধ "বারিসিটিনিভ (Baricitinib)" এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ওষুধ কোম্পানি "ইলি লিলি" তৈরি করছে এবং এর মূল্য হিসেবে রোগীপ্রতি ৪৫,০০০ টাকা খরচা পড়ছে যার ক্রয় সামর্থ্য ভারতের অধিকাংশের নেই। 

এটি কোভিড-১৯ রোগীদের কাজে আসছে এটা জেনে হায়দ্রাবাদের "নেটকো ফার্মা" এটার লাইসেন্সিং এগ্রিমেন্ট এর জন্য আবেদন করে এবং তা পেয়ে একই ওষুধের ৪ মি.গ্রা ট্যাবলেট জেনেরিক ব্র্যান্ড হিসেবে শুধুমাত্র ৩০ টাকা প্রতি ট্যাবলেট ধরে সরবরাহ করছে যা "ইলি লিলি"র প্রতি ট্যাবলেটের দামের (৩২৩০ টাকা) প্রায় ১০০ ভাগের এক ভাগ। কিন্তু "সি.এল" অনেক ক্ষেত্রেই উদারভাবে প্রযোজ্য হয়না, উন্নত দেশগুলি তাতে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখে। এছাড়া এতে অন্যান্য বিষয়ও জড়িত রয়েছে। তাই মুষ্টিমেয় কিছু ক্ষেত্রেই এখন অব্দি বাধ্যতামূলক অনুমতি বা সি.এল গ্রাহ্য হয়েছে।

পেটেন্ট ছাড়ের সুবিধা নেবার ব্যাপারে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সঠিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাবস্থাপনা, যাতে বিভিন্ন দেশ  কাঁচামাল অনায়াসে উপলব্ধ হতে পারে, না থাকা পেটেন্ট ছাড়ের সুযোগ নেবার ক্ষেত্রে মূখ্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মেসেঞ্জার আর.এন.এ (এম.আর.এন.এ) ভ্যাক্সিন প্রযুক্তি ও জটিল যার জন্য অত্যাধুনিক পরিকাঠামো ও গুনমান নিয়ন্ত্রণ কে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হয়। তাই এই  প্রক্রিয়ার জন্য যথেষ্ট সময় ও অর্থের প্রয়োজন। ফলতঃ পেটেন্ট ছাড় পেলেই আদৌ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাবে কিনা তা নির্ভর করছে  কিভাবে কোভিড প্রতিরোধে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলি  পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় তার উপর।

যেহেতু ডব্লিউ.টি.ও সবার সহমতের ভিত্তিতে কাজ করে তাই আলাপ আলোচনা ও পেটেন্ট ছাড়ের প্রক্রিয়াটি এতটাই দীর্ঘায়িত হতে পারে যে তার মধ্যে ভাইরাসটি মিউটেশনের জন্য প্রচুর সময় পেয়ে যেতে পারে এবং আরো ঘাতক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ডের মতো ধনী দেশ যারা এই পেটেন্ট ছাড়ের বিপক্ষে, তাদেরও ঐক্যমত্যে পৌঁছতে হবে।যদি গরীব দেশগুলোকে বহুজাতিক কোম্পানির চোখ রাঙানোকে উপেক্ষা করার সাহস দেখাতে হয় তবে ঐক্যবদ্ধ হবার এই উপযুক্ত সময়। ডব্লিউ.টি.ও র সাথে আলাপ আলোচনার জন্য বসে না থেকে সরকারের ভ্যাক্সিন উৎপাদক কোম্পানি গুলির সাথে প্রত্যক্ষ আলাপ আলোচনা শুরু করা উচিত।

এটি অবশ্যই চিরাচরিত ব্যাবসার সময় নয়, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে এই উপলব্ধি করানো জরুরী যে তারা এতদিন ধরে উন্নয়য়শীল দেশের বাজারের উপযোগ করে যে লাভ করেছে এটি তার প্রতিদানের সময়। মানুষের জীবনের মূল্য তাদের লাভালাভ থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একযোগে ভ্যাক্সিন বানিজ্যে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য রোধে বাধ্য করতে হবে, দরকার হলে শেষ অস্ত্র হিসেবে দমনমূলক নীতি প্রয়োগ করতে হবে কারণ উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের অনুসৃত নীতিই মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমনটা উল্লেখিত হয়েছে বিখ্যাত সায়েন্স জার্নাল "নেচার"এ - 'একটি অতিমারী কিন্তু কোম্পানিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, এ মানবতা আর ভাইরাসের মধ্যে লড়াই।' তাই মানবিক ব্যাপারকে সবার উপরে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।