রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ভাবনায় নির্বাচন ২০২১
পর্ব ৪
বিষয় : "নির্বাচন ও বাম বা শ্রেণি রাজনীতি"
অরূপ  বৈশ্য
১৬ মার্চ ২০২১
 
দেখতে দেখতে এসে পড়লো ৫ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন।
আসামের নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়েছে ২৭ মার্চ, ০১ এপ্রিল এবং ০৬ এপ্রিল।
বরাক উপত্যকায় নির্বাচন আগামী ০১ এপ্রিল ২০২১।
আসন্ন নির্বাচন কে সামনে রেখে "ঈশান কথা" পুরো মার্চ মাস ধরে আপনাদের সামনে তুলে ধরবে এই ধারাবাহিক
"ভাবনায় নির্বাচন ২০২১"
যাতে থাকবে নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকা মানুষ এবং ছাত্রছাত্রী দের ভাবনাচিন্তা, মত-অভিমত, অথবা বিশ্লেষণমূলক লেখা ...
আজ পর্ব ৪ ...

নির্বাচন নিয়ে বাম বিতর্ক

শ্রেণি রাজনীতি বা সাধারণভাবে বললে বাম-রাজনীতিতে নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নির্বাচনকে কীভাবে দেখা হবে সেই প্রশ্নকে ঘিরেই মূলত সেই বিতর্ক আবর্তিত হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া ও বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোকে জনকল্যাণে ব্যবহার করা, নির্বাচনকে শুধুমাত্র রাজনীতি প্রচারের ও জনভিত্তি ধরে রাখার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা, নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের মোহ থেকে জনগণকে মুক্ত রাখার জন্য নির্বাচন বয়কট করা ইত্যাদি বিভিন্ন অবস্থানের মধ্যে এই বিতর্কের তীব্রতা একসময় ভারতীয় বাম মহলে পরিলক্ষিত হয়েছে। কিন্তু কোন অবস্থানেই আশানুরূপ ফল না মেলায় বিতর্কের এই তীব্রতা এখন স্তিমিত হয়ে এসছে। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে রাশিয়া ও চিনের বিপ্লবকে ভারতীয় বাস্তবতায় যান্ত্রিকভাবে বসিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা এই বিতর্কের অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল ছিল। বিপ্লব-পুর্ব রাশিয়ায় আধুনিক পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্কের যে প্রাধাণ্য ছিল বর্তমান ভারতে সেই সম্পর্ক তার চাইতে অনেক বেশি গভীর। যে আমূল সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে বিপ্লব হয়েছিল তা শুধু অপূর্ণই থাকেনি, ১৯২১ সালের মধ্যেই ইউরোপের বিপ্লবী সম্ভাবনা স্তিমিত হয়ে যাওয়ায়, রাশিয়ার বিপরীত যাত্রার ক্ষেত্র তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতিগত বাধ্যবাধকতার জন্য কৃষিতে যে নীতি অবলম্বন করতে হয়েছে তাতে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী ভেঙে যাওয়ায় বিপরীত যাত্রার ভ্রূণ তখনই জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু বিপ্লব-পূর্ব মুহূর্তে নির্বাচন সম্পর্কে লেনিনের ভূমিকা কী ছিল তা এই প্রসঙ্গে উল্লেখের দাবি রাখে। নির্বাচন সম্পর্কে লেনিন কোন সাধারণ সূত্রায়ণের পক্ষপাতি ছিলেন না, বাস্তব পরিস্থিতির বাস্তব ব্যাখ্যার উপর দাঁড়িয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৯১৭ সালের আগস্ট মাসে লেনিন শ্রমিকশ্রেণির ‘সোভিয়েতের হাতে সমস্ত ক্ষমতার’ দাবিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের শান্তিপূর্ণ পথকে সুযোগ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, কিন্তু অক্টোবর মাসে এসেই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তনকে বিবেচনায় রেখে ভিন্ন মত পোষণ করেন।

 

শ্রেণিসংগ্রাম তথা গণসংগ্রামের ধারাবাহিকতায় নির্বাচনী সংগ্রামের অন্তর্বস্তুকে দেখার এক প্রায়োগিক ধারণা সিপিআই থেকে সিপিএম হয়ে কয়েকটি রাজ্যে ক্ষমতায় আরোহণের একটি ধারা বামপন্থীরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ধারণার মধ্যে বামপন্থী রাজনীতির অন্তর্বস্তু ছিল। কিন্তু ‘জনগণের জন্য কাজ’ এই অজুহাতে সেই ক্ষমতায় যেন তেন প্রকারেণ টিঁকে থাকার প্রবণতা থেকে জন্ম নেয় বামপন্থা বা কম্যুনিস্ট ভাবধারা (বামপন্থাকে সেই অর্থে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে) থেকে বিচ্যুতি। গণসংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামের গর্ভ থেকে যে প্রতিস্পর্ধী বাম ধারার জন্ম নেয়, সেই ধারা অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে সংসদীয় নির্বাচনী মোহকে শ্রেণি-সমঝোতার প্রধান রূপ হিসাবে পর্যবসিত করে। ফলে নির্বাচনকে দেখার ক্ষেত্রে ভ্রান্তি বিভিন্ন বাম অবস্থানের জন্ম দেয়। এই ‘দেখার’ প্রশ্নটি গুরুত্ত্বপূর্ণ, এই দেখা ‘ফিলোজফি’ বা দর্শন অর্থে ‘দেখা’ নয়, এটা হচ্ছে বাস্তব সামাজিক ডায়নামিক্সকে তার গতির অভ্যন্তরে পর্যবেক্ষণ, কিন্তু পর্যবেক্ষক হিসাবে ব্যক্তি বা দলকে নিয়ন্ত্রণ করে তার ‘ফিলোজফি’ বা দর্শন। সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর (ব্যতিক্রম ছাড়া) নির্বাচন আসে, সুতরাং এটা ব্যবস্থার একধরনের রুটিন কর্মসূচী, সেই রুটিন কর্মসূচীতে বহুবিধ সমীকরণ ও অ্যান্টি-ইনকাম্বেসি ফ্যাক্টর ক্ষমতায় কে যাবে তা নির্ধারণ করে দেয় – এটি হচ্ছে বুর্জোয়া ধারণা। কিন্তু আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে অন্যত্র। পাঁচ বছরের অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ে সমাজের অভ্যন্তরে যে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ, সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় চলমান শ্রেণিসংগ্রাম চলতে থাকে তাকে সুনির্দ্দিষ্ট রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়েই বামপন্থীরা নির্বাচনকে শ্রেণিশক্তির এক রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপান্তরিত করতে পারে। অন্যথায় জনগণ সেই সংগ্রামে অসচেতনভাবে শাসকদলের যে কোন একটিকে বেছে নেয়, যেহেতু অসচেতন সংগ্রাম তাই ‘ইলেকশন মেশিনারির’ জোরে যে দল জনগণের চাহিদাকে যত বেশি প্রভাবিত করতে পারে সে’ই ফসল ঘরে তুলে। বামপন্থীরা যখন সেই দীর্ঘস্থায়ী সচেতন সংগ্রাম বাদ দিয়ে নির্বাচনকে দেখে বা ক্ষমতায় টিঁকে থাকার চেষ্টা করে, তখনই ঘটে বিচ্যুতি। আমাদের এই বরাক উপত্যকার পার্শ্ববর্তী রাজ্য ত্রিপুরার উদাহরণই দেখা যাক।

 

ত্রিপুরায় শ্রেণি সংগ্রাম ও বামফ্রন্ট

ত্রিপুরায় ১৯৭৮ সালে বামফ্রন্টের ক্ষমতায় আরোহণ ছিল শ্রেণি সংগ্রামের ধারাবাহিকতার ফসল। কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৮৬৩ সালে সামন্তীয় প্রভুদের কর না দেওয়ার দাবিতে জামাতিয়া বিদ্রোহ, ১৯০৫ সালের স্বদেশী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪২-৪৩ সালে রিয়াং বিদ্রোহ, ১৯৪৬-৪৯ সালে লুসাই চিফদের অতিরিক্ত ক্ষমতার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমাজ সংস্কার আন্দোলন যা এই ব্যবস্থাকে বাতিল করে সফল হয়। ১৯৪৫-৪৮ সালে বীরেন দত্ত, নীলমণি দেববার্মা, দশরথ দেব, সূধণ্য দেবের মত বামপন্থীদের নেতৃত্বে ত্রিপুরা জনশিক্ষা সমিতি গঠন করে মহজনী শোষণের বিরুদ্ধে জনজাতীয়দের মধ্যে শিক্ষা আন্দোলন। ১৯৪৮ সালে কম্যুনিস্ট পার্টি অবৈধ ঘোষিত হয়। দেশভাগের ফলে উদ্বাস্তু আগমণের ফলে জমি ও জনসংখ্যার সামাজিক ভারসাম্যের সমস্যা দেখা দেয়। জনজাতীদের জনসংখ্যা ১৯৪১ সালে ছিল ৫১%, ১৯৭১ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ২৮.৭%। কিন্তু দেশভাগজনিত উদ্বাস্তুদের আগমনকে বামপন্থীরা শাসকীয় রাজননীতির পরিণতি ও উদ্বাস্তুদের দেশভাগের শিকার হিসাবে দেখে। একথা স্মরণে রাখা উচিত যে দেশভাগের প্রথম প্রস্তাবনার রচয়িতা ভারতীয় কম্প্র্যাডর বুর্জোয়া ঘনশ্যামদাস বিড়লা। কম্যুনিস্টরা দশরথ দেব ও অঘর দেববার্মার নেতৃত্বে গঠন করে ‘ত্রিপুরা রাজ্য মুক্তি পরিষদ’ এবং জনজাতীয় সমস্যা ও উদ্বাস্তুদের অমানবিক পরিস্থিতি উভয় সম্পর্কে এক গণতান্ত্রিক অবস্থান গ্রহণ করার ফলে বাঙালি ও জনজাতীয়দের মধ্যে ঐক্য বিঘ্নিত হয়নি। দেওয়ানি ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে খোয়াই জেলায় ট্রাইবেল মহিলাদের নিয়ে গঠিত হয় ‘শান্তি সেনা বাহিনী’। তখন এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে সামরিক বাহিনীর লটবহর বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রাইবেল শ্রমিকদের বাধ্য করা হত, এই ব্যবস্থার নাম ছিল ‘তিতুন সিস্টেম’। মহিলাদের এই বিদ্রোহে ১৯৪৯ সালে পুলিশের গুলিতে শহিদ হয় তিনজন জনজাতীয় মেয়ে। ১৯৪৮-১৯৫১ সালে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে জনজাতীয়দের ‘গণ মুক্তি পরিষদ’ আন্দোলন গড়ে তুলে। শ্রেণি সংগ্রামে এধরনের দীর্ঘ সচেতন হস্তক্ষেপের পরিণতিতে ১৯৭৮ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। ১৯৮৮ সালে বামফ্রন্টের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আবার দশরথ দেবের মুখ্যমন্ত্রীত্বে ১৯৯৩ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৮ সালের নির্বাচনের পর মানিক সরকারের মুখ্যমন্ত্রীত্বে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। ১৯৯৮ পর্যন্ত বামফ্রন্ট সরকার বেশ কিছু জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু ততদিনে ব্যবস্থা পরিবর্তন না করে ক্ষমতায় টিঁকে থেকে ‘জনগণের কল্যাণে’ কাজ করার মোহ সর্বস্তরে জাঁকিয়ে বসেছে। শ্রেণি সংগ্রামের আগুনে শুদ্ধ হওয়ার ও সামাজিক প্রাণশক্তিকে রিলিজ করে সমাজ-পুনর্গঠনে নিয়োজিত থাকার মানসিক শক্তিও ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। ক্ষমতায় টিঁকে থাকার ও কিছু পাইয়ে দিয়ে সংগঠনকে বাঁচিয়ে রাখার অদম্য বাসনা কেন্দ্রের শাসক দলের নেওয়া নিও-লিবারেল নীতির কাছে আত্মসমর্পণ ও সমঝোতার দিকে ঝুঁকে পড়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

 

শাসনে থেকে বাস্তব সামাজিক সমস্যা সমাধানের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তার পথ খোঁজা হয় শাসকশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গীতে। মানিক সরকারের সরকার জাপানি ও জার্মানি ঋণ পুঁজির মাধ্যমে ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের যে নীতি গ্রহণ করেন তাতে বিকৃত বিকাশের পথ বেয়ে সামাজিক সম্পর্কে বিকৃতি ঘটতে থাকে, দেখা দেয় সামাজিক সঙ্কট এবং সেই সঙ্কট মোকাবিলায় দেখা দেয় জনজাতীয় সংকীর্ণতা থেকে উদ্ভূত উগ্রজাতীয়তাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ এবং তার বিপরীতে সুপ্ত বাঙালি উগ্রজাতীয়তাবাদ। কম্যুনিস্ট আন্দোলনের মূল অন্তর্বস্তু শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিকতবাদ সেই ধারণার উপরে ভিত্তি করে কী বিকাশের বিকল্প পথ খোঁজা যেত না? সামজিক শক্তিকে ও ক্যাডার বাহিনীর সমাজ পরিবর্তনের ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করে সামাজিক যৌথ প্রয়াসে নিশ্চয়ই বিকল্প পথ ভাবা যেত। অবশ্য এই বিকল্প পথ অবলম্বনের ফলে ব্যবস্থার অভ্যন্তরে ‘পাওয়ার প্লে’র মাধ্যমে কুঠারাঘাতের প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্তকে কাজে লাগিয়ে শাসকশ্রেণি বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতা থেকে ফেলে দিতে পারত। সেই সম্ভাবনাকে স্বীকার করেই বিকল্প পথ অবলম্বনে জনগণের দরবারে পুনরায় ফিরে গেলে গণচেতনার উল্লম্ফন ঘটার সম্ভাবনাও দেখা দিত। কিন্তু নির্বাচনী ও ক্ষমতায় টিঁকে থাকার মোহ ইতিমধ্যে ক্যাডারবাহিনীকে করে তুলেছে সমাজের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার, এক নিস্তরঙ্গ সমাজে শাসক দল হারিয়ে ফেলে মনোবল, নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ব্যবস্থার উপর আধিপত্য বিস্তারকারী শাসকশ্রেণির উপর। সেজন্যই ২০০৫ সালে কেন্দ্রের তৎকালীন বিজেপি সরকার মানিক সরকারের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। তবে এটাও স্মরনে রাখা উচিত যে পুঁজির নিও-লিবারেল পলিসির সামনে সমগ্র বিশ্বজোড়াই বামপন্থীরা তখন পিছু হঠছিল। বামফ্রন্টের বাইরের বামপন্থী শক্তিরা ক্ষমতায় না থাকায় অন্তত সেই বিষইয়ে চিন্তাচর্চা ও অনুসন্ধান জারি রাখতে অনেকটাই সক্ষম হয়, যদিও কোন বিকল্প রাজনীতির জন্ম দিতে তারাও ব্যার্থ হয়েছে। বামফ্রন্ট এবং মুখ্যত সিপিএমের অভ্যন্তরে নিও-লিবারেল ভাইরাস ও শাসকীয় দম্ভ এতটাই গভীরে প্রোথিত হয়েছে যে, তাদেরই সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার গর্ভে যে বিজেপি ও ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান ঘটছে সেটা স্বীকার করে তাকে সংশোধন করার মানসিকতাও হারিয়ে ফেলেছে।

 

জয়-পরাজয় ও বামপন্থী মনন  

    

বামপন্থী কিংবা ডানপন্থীকে যদি একধরনের ট্যাগ হিসাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে সেই ট্যাগ দিয়ে যাদের চিহ্নিত করা হয় তাদের মধ্যে একধরনের “ট্র্যায়াম্ফেলিজম” বিরাজ করে। তারা পরাজয় বা বিয়োগাত্মক পরিণতিকে মেনে নিতে পারেন না, সেই পরিণতির দায় নিজের কাঁধ থেকে অপর বা বাইরের কারণের দিকে সরিয়ে দিতে অতি-সক্রিয় হয়ে উঠেন। তারা এটা ভাবেন না যে পরাজয় বা বিয়োগাত্মক পরিণতি বাস্তবের গর্ভে বাস করে ও বাস্তবেরই অঙ্গ হয়ে উঠে। সামাজিক নাটক-উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে নায়ককে সামাজিক সংঘাতে বিজয়ের ইতিবাচক বার্তাকে বহন করতেই হবে। তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের পঞ্চগ্রামে তারা যে স্বস্তি বোধ করেন মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পুতুল নাচে বা বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালিতে তারা সেই স্বস্তি অনুভব করেন না।

 

এই ডান ও বামপন্থীদের বাইরে একদল লোক আছেন, তারা কখন যে কীসে মাহাত্ম্য আরোপ করে জন্মভূমিকে ‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’ করে তুলবেন তার অনুমান লাগানো কঠিন। এই দলের লোকরা ডান থেকে বামে ও বাম থেকে ডানে উভয় দিকে নিরন্তর যাত্রা করতে থাকেন।

 

তবে বামপন্থী অনুশীলনে পরাজয়কে বাইরের কারণ দিয়ে ও চক্রান্তের তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করে অপরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি প্রবল। বামপন্থীদের মধ্যে প্রবল, কারণ ডানপন্থীদের সমাজ পরিবর্তনের কোন দায় নেই। বামপন্থীদের দায় আছে এবং সেই দায় থেকে তারা নিজেদেরকে জনগণের মুক্তিদাতা ভাবতে শুরু করেন। মুক্তিদাতার তো আর ভুল থাকতে পারে না, সমাজ তো আর মুক্তিদাতার নিয়ন্ত্রনের অবস্থানে চলে আসতে পারে না। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাসে, পিছিয়ে পড়া চেতনায় জনগণ যে বামপন্থীদের কখনও কখনও পরিত্যাগও করতে পারে, জনগণের প্রগতিশীল চাহিদাকে জাগিয়ে তুলতে কখনও কখনও বামপন্থীরা ব্যার্থও হতে পারে মুক্তিদাতারা সেই বোধ হারিয়ে ফেলে। সাময়িক জয় পরাজয়ের দম্ভ ও গ্লানি তাদের মনোজগতকে বিকল করে দেয়। অথচ বিয়োগাত্মক পরিণতি সবচাইতে বড় শিক্ষক, কারণ সেই পরিণতি আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে সাহায্য করে, দুর্বার অগ্রগতি অনেক সময় দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে, অনেককিছু দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়। দৃষ্টির সেই অস্বচ্ছতার পরিণতি হয়ত আরও ভয়ানক হতে পারত, এটা হয়ত আমাদের সৌভাগ্য যে বিয়োগাত্মক পরিণতি আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে সাহায্য করছে, পথচলার নিয়মকে নতুন করে আবিষ্কার করতে সাহায্য করছে।

 

বাম রাজনীতির দুর্বলতা ও  ফ্যাসিস্ট উত্থান

বামপন্থী রাজনীতির এই দুর্বলতাই ফ্যাসিস্ট উত্থানের মূল কারণ। যখন সামগ্রীকভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়, তখন মানুষ বিকল্প পথের সন্ধান করে, সেই বিকল্প মানুষের সামনে হাজির হয়েছে ব্যবস্থাকে টিঁকিয়ে রাখতে ফ্যাসিস্ট আবেদনের স্বরূপ নিয়ে, ফ্যাসিস্ট সামাজিক অবয়ব নিয়ে, সেই অবয়বের জন্মই হয়েছে, কর্পোরেট পরিচালিত রাষ্ট্র ও হিন্দুত্বের সমাজ-রাজনীতির সংশ্লেষে।

 

বামপন্থী রাজনীতির এক বিয়োগাত্মক পরিণতি হচ্ছে সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্বের রাজনীতির উত্থান ও কেন্দ্রে বিজেপির ক্ষমতা দখল। নির্বাচনী ও সামাজিক এই ফলাফল যাতে ফ্যাসিস্ট ক্ষমতা দখলে গিয়ে সমাপ্ত না হয়, তার জন্য অতীত ভুলগুলিকে সংশোধন করে নিতে হবে। সংশোধনের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হল, জনগণকে এই বিপদ সম্পর্কে সচেতন করা। জনগণকে এ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলা যে নির্বাচনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট রাজনীতি যাতে শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে। ফ্যাসিস্ট ক্ষমতা দখলের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে, সংসদীয় গণতন্ত্রের অভ্যন্তরে যে প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলি রয়েছে সেগুলিকে ধ্বংস করে দেওয়া। সেরকমই একটি প্রাথমিক বাধা হল, সাংবিধানিক ফেডারেল কাঠামোর কেন্দ্র -রাজ্য সম্পর্ক। ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি শাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক কূটচালের ফলে শুধুমাত্র পশ্চিমবাংলা ও তামিলনাড়ুকে ফেডারেল কাঠামো ভাঙার প্রতিরোধে সর্বশেষ ঘাঁটি হিসাবে বজায় রেখেছে। পশ্চিমবাংলার দীর্ঘ শ্রেণি ও গণসংগ্রামের ইতিহাস সেই প্রতিরোধের ভিত্তি, যদিও বাংলার নবজাগরনের এলিটিস্ট ডায়মেনশন এই প্রতিরোধের জায়গাকে আরও সুদৃঢ় করতে ব্যার্থ হয়েছে। অন্যদিকে দ্রাবিড়ীয় আন্দোলনের জড় যেভাবে তামিল সমাজের গভীরে প্রোথিত, তামিল সত্তার বোধ থেকে জাত তামিল দরিদ্র শ্রেণির প্রতি মধ্যশ্রেণির একাত্মতা ও দায়বোধের জন্ম দিয়েছে, এক জাতি -এক ভাষা - এক সংস্কৃতির ভিত্তিতে এককেন্দ্রিক শাসনের প্রতি তাদের এক সহজাত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সুতরাং সঙ্ঘ পরিবারকে এককেন্দ্রিক শাসন কায়েম করতে হলে এই দুটি প্রতিরোধের পরিসরের দখল নিতে হবে। দ্রাবিড়ীয় দল বা ডিএমকে এবং বাংলার দল মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের যতই দুর্বলতা থাকুক, যতই সুবিধাবাদ কিংবা দুর্নীতি থাকুক তাদের আঞ্চলিক দল হিসাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে বিজেপি’র এজেণ্ডাকে প্রতিরোধ করতেই হবে এবং তারা এই প্রতিরোধে খানিকটা সক্ষম সামাজিক শ্রেণি সম্পর্কের সেই নির্দ্দিষ্ট বাস্তবতার জন্যই। অন্যদিকে অসমের দিকে তাকিয়ে দেখুন, অসমের আঞ্চলিক শক্তি উগ্রজাতীয়তাবাদের পথ ধরে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এই আত্মসমর্পণের মূল কারণ নিহিত আছে অসমের জাতীয়বাদের সামাজিক প্রাণশক্তিকে দমিয়ে দেওয়া ও চুড়ান্ত অগণতান্ত্রিক ভূমিকার অভ্যন্তরে। অসমের জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থানের ইতিহাস হচ্ছে কৃষক  আন্দোলন ও কৃষকদের সঙ্ঘ শক্তিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়ে, জাতীয়তাবাদ শক্তি সঞ্চয় করেছে জনজাতীয় সংকীর্ণতাকে উস্কে দিয়ে। অসমের শাসনের কেন্দ্র সর্বদাই পরিচালিত হয়ে এসছে কখনও উগ্র, কখনও বা নম্র উগ্রজাতীয়তবাদী নীতিতে।

 

বরাক উপত্যকা ও বামপন্থা

অসমবাসীকে বিভাজিত করে রাখা অসমের জাতীয়তাবাদের এই চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল রূপ বরাক-উপত্যকার আলোকপ্রাপ্ত জনমানসকে বাংলা বা কলকাতা-নির্ভর করে রাখার ক্ষেত্রে এক গুরুত্ত্বপূর্ণ কারণ। দ্বিতীয় গুরুত্ত্বপূর্ণ কারণটি হচ্ছে, বরাক উপত্যকার সমাজের অভ্যন্তরিণ স্থবিরতার কাঠামো। অবিভক্ত সুরমা উপত্যকার অংশ হিসাবে এবং ব্রিটিশের চালু করা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারি শোষণের গ্রামীণ কৃষি সম্পর্কের ফলে করিমগঞ্জ জেলায় সামাজিক আলোড়ণের বা স্থিতাবস্থার সামাজিক সম্পর্ককে অস্বীকার করার করার সীমিত কিছু নজির রয়েছে, কিন্তু উপত্যকার এক বড় অংশ এস্টেট ল্যাণ্ড হিসাবে সামাজিক স্থবিরতা এক মুখ্য বৈশিষ্ট্য হিসাবে থেকে গেছে। নানকার বিদ্রোহ, চরগোলা এক্সোডাস, সিপাহী বিদ্রোহের অপ্রত্যক্ষ প্রভাব, তেভাগা আন্দোলন ইত্যাদির একেবারে সীমিত কিছু অঞ্চলে ও জনগোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ থাকলেও সামগ্রীকভাবে বরাক উপত্যকার ইতিহাস এক সামাজিক অচলায়তনের ইতিহাস। ঠিক একই কারণে একষট্টির ভাষা আন্দোলনও সামগ্রীকভাবে বরাক উপত্যকার জনমানসকে প্রভাবিত করতে পারেনি, আবার তার বিপরীত কারণে করিমগঞ্জ জেলায় তার প্রভাব ছিল সর্বাধিক। সেই জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে সাধারণভাবে আমাকে বলতেই হচ্ছে, সীমিত বামপন্থী প্রয়াস ও জনগোষ্ঠীগত যোগসূত্রকে ব্যবহার করে তার ব্যাপ্তির প্রসারের নজির থাকলেও, এই উপত্যকার তেমন কোন সার্বিক বামপন্থী ইতিহাসও নেই। বাংলার নবজাগরণের প্রভাবে এখানকার আলোকপ্রাপ্ত এবং এমনকি বামপন্থী চিন্তাধারাও এলিটিস্ট দৃষ্টিভঙ্গী থেকে মুক্ত ছিল না, বাংলায় যেভাবে সেই প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গোটা সমাজের মননকে নাড়িয়ে দেওয়ার মত বামপন্থী বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছে বরাক উপত্যকায় সেরকম কোন সামাজিক আলোড়ন তৈরি হয়নি। স্থিতাবস্থার শান্তিতে এই উপত্যকার জনমানস এতাবৎ আচ্ছন্ন থেকেছে। অনেকে অভিযোগ করতে পারেন, এভাবে বলা অতি-সরলীকরণের’ দোষে দুষ্ট। অতি-সরলীকরণ তখনই বলা যায়, যদি আমি বলতাম উপত্যকার কোন ইতিহাসই নেই। ইতিহাস তৈরি হয়েছে পুঁজির অনুপ্রবেশে ও স্বাধীনতা-উত্তর দীর্ঘ পুঁজিবাদী গঠনপ্রক্রিয়ায় সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই পরিবর্তনে যে সামাজিক অস্থিরতার জন্ম নিচ্ছে তাকেও গ্রাস করে নিতে উদ্যত হয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুত্বের রাজনীতি। অসমের উগ্রজাতীয়তাবাদী আঞ্চলিক সত্ত্বার উপর হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য বরাক-ব্রহ্মপুত্রের ঐক্যের নতুন এক প্রতিক্রিয়াশীল বয়ান রচনা করেছে যার মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙালি-অসমিয়ার সামগ্রিক ধ্বংস।

 

বাম রাজনীতি ও আসন্ন নির্বাচন

বরাক উপত্যকাকে আলাদাভাবে যদি কিছুটা এই পাপচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হয়, তাহলে বরাক-উপত্যকার সাথে সাথে বাংলায়ও প্রগতিশীল বাম আন্দোলনের উত্থান জরুরি। কিছুটা বলছি এই কারণেই যে, সামগ্রীকভাবে নতুন সমাজের গঠনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হলে অসমিয়াদেরকেও হিন্দুত্ব ও উগ্রজাতীয়তাবাদকে পরিহার করার স্তরে উন্নীত হতে হবে। কিন্তু বামপন্থীরা এই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সমাজকে দেখার ইচ্ছা রাখেন কিনা, অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে সক্ষম কিনা, বাম রাজনীতিকেই পুনরাবিষ্কার করার মানসিক শক্তি বহন করছেন কিনা – সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অনিশ্চিত, অনিশ্চিত কারণ এধরনের কোন লক্ষণ এখনও প্রধান দিক হিসাবে পরিস্ফুট হয়নি।

 

আসন্ন নির্বাচনে বাংলা ও বরাকে বিজেপির পরাজয়ে বামপন্থীদের নতুন করে ভাবার ও অনুশীলনের সামাজিক পরিসর তৈরি করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক এই যে, বামপন্থীরা এখনও তাদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ ও দলের আধিপত্যকে প্রাধাণ্য দিতে গিয়ে সামাজিক সচেতনতার গতির নিয়ম ও চেতনার উল্লম্ফনের মৌলিক শর্তকে অস্বীকার করে চলেছেন। আশু লাভের আশায় ভবিষ্যত সমাজকে আবারও স্থিতাবস্থার দিকে ঠেলে দিতে উদ্যত হয়েছেন। সামাজিক প্রাণচাঞ্চল্যকে দলের লক্ষ্যে কম্যুনিস্ট ভাবধারায় পরিচালিত করতে হয়। সামাজিক প্রাণশক্তির যদি অপমৃত্যু হয়, দলীয় লক্ষ্যে আধিপত্য খবরদারি, জ্ঞানের দম্ভ ও রেজিমেন্টেশনে পর্যবসিত হয়। এবারের নির্বাচন তাই পথের বাঁক নেওয়ার নির্বাচন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপেই পথের এই বাঁক নির্মিত হয়েছে।  

 

    

ঈশানের যোগাযোগ

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions