রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ভো বরাকভূম! অতঃ কিম!
নির্মলেন্দু রায়
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ 

বিখ্যাত অসম চুক্তির ৬নং দফা রূপায়ণের দায় এবার তা হলে বরাকভূমিকে নিতে হবে! কারণ, বরাকভূমি আসামের অন্তর্গত বলে! কিন্তু, বরাকভূমি কি চিরকাল আসামের অন্তর্গত ছিল! অতি সম্প্রতি বিধানসভার শেষ অধিবেশনে বিজেপির বিধায়ক করিমগঞ্জের নির্বাচিত জন প্রতিনিধিকে বিধানসভায় বাংলায় বক্তৃতা কালে বাধা দিয়েছেন।  অথচ, সেই ১৯৩৭ সালের আসাম বিধানসভার প্রথম অধিবেশন থেকে ধারাবাহিক ভাবে বরাকের জন প্রতিনিধিগণ বিধানসভায় বাংলায় বক্তৃতা করে আসছেন। এবার বিজেপির তরফে এই বিষয়ে বাধা প্রধান করা হল। আসামের বিজেপি যে অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে, এটাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। বরাকের লোকদের জন্য অসমীয়া ভাষা বাধ্যতামূলক হবে কেন! বরাকভূমি কি কোনকালে আহোম রাজারা জিতে নিয়ে নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন!


তাছাড়া, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা কোন কালে বরাক উপত্যকাকে প্রভাবান্বিত করেছিল! ১৯৬০ সালে তো বরাকের মানুষ রীতিমত আন্দোলন করে ১১ জন শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৯৮৬ সালে আরো দুজন বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার্থে নিজেদের প্রাণ বলিদান দিয়েছিলেন! বাংলা ভাষার জন্য বরাকের বাঙালির আত্মত্যাগ রীতিমত মত ধারাবাহিক। তাহলে বিধানসভার মত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এই বাধা প্রদান কেন! বরাকের লোকদের সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার লোকজন বরাবর একটি বিভাজন রেখা টেনে রেখেছেন। তাই স্বাধীনতার পর হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত বরাক থেকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যাতায়াতের প্রত্যক্ষ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আসাম সরকারের তরফেই ধারাবাহিক ভাবে অবহেলা করা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার লোকজনদের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রূপে নিয়োগ করে বরাক উপত্যকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যেন বরাকে সামান্য যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষেরও ভয়ঙ্কর আকাল রয়েছে। রাজ্য সরকার যে দলেরই হোক, এই বিভেদ রেখা বার বার সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই বিভেদের রাজনীতির ফলেই বরাকের লোকজন আশীর দশকে আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বিদেশি বহিরাগত বিতাড়ণ আন্দোলনে শরিক ছিলেন না। তবে রাজ্যস্তরে একই প্রশাসন হওয়াতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সংঘটিত আন্দোলনের যাবতীয় নগদ কুফল বরাক উপত্যকা ভোগ করেছে। যেমন, ১৯৮১তে সেন্সাস হয় নি। একটি শিক্ষাবছর হাইজ্যাক হয়ে গিয়েছিল। ১৯৮৪তে লোকসভা নির্বাচন হয় নি। ইত্যাদি। এমনিতে বরাক উপত্যকার জনজীবনে প্রত্যক্ষ ভাবে আন্দোলনের কোন প্রভাব ছিল না। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার প্রতিটি লাগাতার 'বন্ধ' কর্মসূচিসমূহে বরাক উপত্যকা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপারে কর্মচঞ্চল ছিল। তার মানে বরাক উপত্যকা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার আন্দোলনের ইস্যুর সঙ্গে সহমত ছিল না। তাহলে আন্দোলনের পরিণতিতে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বরাক উপত্যকা প্রভাবিত হবে কেন! অসম চুক্তিতে বরাকভূমির আঞ্চলিক সমস্যার কোন প্রতিফলন নেই। চরিত্রগত ভাবেও বরাকের সমস্যা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মত বরাক ভূমির জ্বলন্ত সমস্যাসমূহ নিয়ে তো জাতীয়তাবাদী আসাম আন্দোলনের নেতাদের কখনো কোন মাথাব্যথা ছিল না। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বিদেশি বিতাড়ণ আন্দোলনে বরাক উপত্যকার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমূহের কোন সমাধান দাবি করা হয় নি। সেই আন্দোলনে বরাকের মানুষের আশা-আকাঙ্খার কোন প্রতিফলন ছিল না। অসম চুক্তিতে বরাকের সমস্যার কোন সমাধান সুত্র নেই। সেদিন বরাকের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করার কোন তাগিদও ছিল না ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়। তাই, সেদিন বরাক ও ব্রহ্মপুত্রের সংযোগ সাধিত হয় নি। অসম চুক্তি স্বাক্ষর কারীদের মধ্যে কোন বরাকবাসী ছিলেন না। বরাকের কোন সংগঠনকে কোন আলোচনাতে আহ্বানই করা হয় নি। অসম চুক্তির দফাগুলো প্রণয়নে কোন বরাকবাসীর মতামতও নেওয়া হয় নি। তাহলে এখন হঠাৎ করে অসম চুক্তির বিভিন্ন দফা রূপায়নে বরাকের সামাজিক জীবন কেন প্রভাবিত হবে! বরাকের মানুষের বিধিসম্মত মতামত ছাড়া কেন এন-আর-সি হবে! আর কেনই বা অসম চুক্তির ৬নং দফার রূপায়নে বরাক উপত্যকায় তথাকথিত খিলঞ্জিয়া অসমীয়ার জন্য ৮০ বা ১০০ শতাংশ সংরক্ষণ করতে হবে! অসমীয়া জাতীয়তাবাদ তো কষ্মিনকালেও বরাকভূমিতে দিগ্বিজয় করে নি! উল্টে ১৭৮৬-৯৪ সালে মোয়ামারীয়া বিদ্রোহ কালে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মানুষ দলে দলে বরাক উপত্যকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাজা গৌরীনাথ সিংহ ১৭৮৮ সালে রাজধানী রংপুর ত্যাগ করে দীর্ঘ ৬ বছর ধরে কখনো গুয়াহাটি তো কখনো নগাঁওতে আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি যেখানেই যাচ্ছিলেন, সেখানেই প্রজাগণ বিদ্রোহ হচ্ছিল। শেষে উপায়ান্তর হয়ে গুয়াহাটি ছেড়ে ব্রহ্মপুত্রে ভেসে তিনি ইংরেজরাজ্যের গোয়ালপাড়া শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। এই অবস্থায় ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে তিনি গুয়াহাটিতে নিজের অধিকার পুনঃস্থাপন করেন। ইংরেজদের সাহায্য নিয়েই ১৭৯৪ সালের মার্চ মাসে তিনি রাজধানী রংপুর পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হন। মাত্র কয়েক বছর পরে ১৮২১-২৫ সালেও ব্রহ্মদেশ থেকে আক্রমণকারী 'মান-সেনা'দের বর্বরোচিত অত্যাচারে  অতীষ্ঠ হয়ে প্রাণ বাঁচাতে অসমীয়াভাষী মানুষ ঝাঁকে ঝাঁকে বরাকের সমভূমিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের অনেকেই বর্তমান সময় পর্যন্ত বরাকভূমিতে বসবাস করছেন। বরাকের মানুষের এই ব্যাপারে কোন বিবাদ নেই। 


কাছাড়ী রাজাদের শাসনকালে বরাকে বরাবর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিরই প্রচলন ছিল। তাহলে এখন নতুন করে বাংলাকে সরিয়ে বরাকে অসমীয়া ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে হবে কেন! বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামান্যতম কোন সম্পর্ক না থাকা বিদেশি শাসক গোষ্ঠী নেহাতই নিজেদের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য স্থানীয় অধিবাসীদের অমতে তদানীন্তন বাঙালি অধ্যুষিত কাছাড় ও শ্রীহট্ট জেলা দুটি ১৮৭৪ সালে নর্থ-ইষ্ট ফ্রন্টিয়ার রিজন তথা ক্ষুদ্র মূল আসামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। তাতেই বরাক উপত্যকায় অসমীয়া জাতীয়তাবাদের মৌরসী পাট্টা হয়ে গেল! সেই মৌরসী পাট্টা দেখিয়ে অসম সাহিত্য সভা নতুন করে দাবি করছেন বরাকের স্কুলগুলোতে অসমীয়া ভাষা বাধ্যতামূলক করার জন্য! কেন! বরাক কী অসমীয়া জাতীয়তাবাদের খাস তালুক! এই অসম সাহিত্য সভার দাবিতেই ১৯৬০ সালে অসমীয়া ভাষা সারা আসামে রাজ্যভাষা হলে বরাক উপত্যকায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। ১৯৬১ সালে ১১টি তরতাজা তরুণ-তরুণী নিজের প্রাণের বিনিময়ে বরাক উপত্যকার জন্য বাংলা ভাষার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করেন। ১৯৮৬ সালেও অসম গণ পরিষদের ভাষা সার্কুলারের প্রতিবাদে আরো দুটি প্রাণ বলিদান হয়। এত কিছুর পরেও বরাক উপত্যকায় অসমীয়া ভাষা বাধ্যতামূলক করতেই হবে!
১৮২৬ খৃষ্টাব্দে শুধুমাত্র ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় পূর্বে দিহিং নদী থেকে পশ্চিমে মানস নদী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ আহোম রাজ্য অর্থাৎ 'মূল আসাম' দখলের পর এই অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য বৃটিশদের কাছে বড় সমস্যাজনক উঠে। উত্তরবঙ্গ এবং গোয়ালপাড়া অঞ্চলে অজস্র খরস্রোতা নদীসমূহ পারাপারের জটিলতার জন্য আসামে যাতায়াত পথ বড় দুর্গম ছিল। বিপদজনক নদীপথই ছিল যাতায়াতের একমাত্র উপায়। বহু অর্থ ব্যয় করে নদী সমূহে সারি সারি পুল তৈরি করে সেদিকে স্থলপথ গড়ে তোলার কথা সেদিনের বিদেশি সরকার ভাবতে পারে নি। তাই সহজ উপায় হিসাবে তারা বরাক তথা সুর্মা উপত্যকার শ্রীহট্ট অর্থাৎ সিলেট শহর থেকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সীমাবদ্ধ মূল আসামে প্রবেশের সোজা পথ খুঁজে বের করে। ১৮২৬ সালেই শুরু হয় সিলেট থেকে খাসিয়া পাহাড় হয়ে গুয়াহাটি পর্যন্ত সড়কপথ নির্মাণের কাজ। কিন্তু, এই পথ নির্মাণের পর যখন ১৮২৭ সালে শ্রীহট্ট থেকে গুয়াহাটিতে যাতায়াত শুরু হল, তখন খাসিয়াদের সঙ্গে বৃটিশদের বিবাদ আরম্ভ হয়। সেই বিবাদ ১৮২৯ সালের ৪ এপ্রিল থেকে যুদ্ধে পরিণতি লাভ করে এবং ১৮৩২ সালের জুন মাস পর্যন্ত থেকে থেকে এই যুদ্ধ চলে। নংখলাওয়ের খাসিয়া সিয়েম তিরোথ সিংয়ের চূড়ান্ত পরাজয়ে সেই যুদ্ধের অবসান হয় এবং অব্যাহত হয় গুয়াহাটি-সিলেট পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই গুয়াহাটি-সিলেট পথই সংক্ষেপে জি. এস. রোড। প্রায় দুই শতাব্দী পুরনো আসাম সংযোগের সেই প্রাচীনপথকেই বর্তমানে আসামের স্বাভিমানী মানুষজন গুয়াহাটি-শিলং রোড বলে থাকেন। সেই সময় সাঁওতাল পরগণার রাজমহল পাহাড়ের নিকট গঙ্গা হতে কামাখ্যা-নীলাচল পাহাড়ের নিকট ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত কোথাও একটিও সেতু ছিল না। নানা ব্যবহারিক কারণে তাই কলকাতা থেকে সুর্মা উপত্যকা হয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা কেন্দ্রিক আসামে প্রবেশের পথই বৃটিশদের কাছে সহজসাধ্য বলে মনে হত। পরবর্তী কালে রেলওয়ে লাইন বসাতে গিয়েও সিলেটের কুলাউড়া থেকে বরাক উপত্যকার মহীশাসন, করিমগঞ্জ ও বদরপুর হয়ে হাফলং-লামডিং পথই বেছে নেওয়া হয়েছিল। সেটাই ছিল আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে, যা সেই সময়ের অবশিষ্ট ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের মুখ্য ব্যবস্থা।


আসামের জঙ্গলেই চা-গাছের আবিষ্কার হল আধূনিক আসামের একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আহোমরাজ্যে বৃটিশ অধিকার সাব্যস্ত হওয়ার আগমুহূর্তেই এক সময়ের আহোম রাজধানী রংপুর নগরের নিকটবর্তী বনাঞ্চলে ইষ্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানির মেজর রবার্ট ব্রুস ১৮২৩ সালে চা-গাছ আবিষ্কার করেছিলেন এবং সিংফৌ গোষ্ঠীপতি জনৈক বিসা গামের বাড়িতে সেই বন্য চা তিনি চেখেও দেখেছিলেন। কিন্তু, কিছু করে উঠার আগেই এক বছরের মধ্যে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। তবে মারা যাওয়ার আগে তার ভাই সেনা অধিকারী চার্লস ব্রুসকে এই বিষয়ে বলে গিয়েছিলেন। চার্লস ১৮২৪ সালে প্রথম ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধে একটি 'গান ভোট ব্যটেলিয়ন'-এর কম্যাণ্ডেট রূপে আসাম রাজ্যে প্রবেশ করেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কর্তৃপক্ষের আদেশে নিজের ব্যাটেলিয়ন সহ তিনি শদিয়াতে অবস্থান গ্রহণ করেন। তখনই তিনি সেই সিংফৌ গোষ্ঠীপতি বিসা গামের নিকট হতে বন্য চাগাছের বীজ ও চারাগাছ সংগ্রহ করে কিছু সংখ্যক পাঠালেন ল্যাবরেটরি পরীক্ষার জন্য কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনে এবং বাকি গুলো পুঁতে দিলেন শদিয়াতে নিজের বাসস্থানের আঙিনায়। ১৮৩০ সালে কলকাতার ল্যাবের পরীক্ষায় দেখা যায় যে সেই বন্য গাছের পাতাগুলো আসলে এক প্রজাতির চা-ই। এই বিশেষ প্রজাতির চা'য়ের নাম দেওয়া হল, 'ক্যামেলিয়া সিনেনসিস বার - আসামিকা'! ১৮৩৪ সালে গবর্ণর-জেনারেল লর্ড ব্যাণ্টিক চা-ব্যবসায়ের সম্ভাবনা পরীক্ষা করার জন্য একটি উচ্চস্তরীয় 'চা-সমিতি' গঠন করেন। ১৮৩৬ সালে চার্লস ব্রুস সেই 'চা-সমিতি'তে তাঁর দ্বারা প্রস্তুত 'চা' পাঠালেন স্বাদ আস্বাদনের জন্য। সমকালীন গবর্ণর-জেনারেল লর্ড অকল্যান্ড সেই চা পান করে 'ভাল জাতের চা' বলে সার্টিফিকেট প্রদান করেন। ১৮৩৭ সালে 'চা-সমিতি'র ব্যবস্থাপনায় চার্লস ব্রুসের তৈরি ৩৫০ পাউণ্ড চা ৪৬টি বাক্স বন্দী করে লণ্ডনে পাঠানো হয় নিলামে বিক্রি করার জন্য। ১৮৩৯ পালের ১০ জানুয়ারিতে সেই চা লণ্ডনে বিক্রি হয়। ইংরেজগণ সেই চা পান করে খুব উৎসাহিত হন। অতি উৎসাহে সেই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে লণ্ডনে 'আসাম (টি) কোম্পানি' গঠিত হয় ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চা উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তা বাণিজ্যজাত করার জন‌্য। শীঘ্রই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আসামে চা উৎপাদনের প্রচেষ্টা আরম্ভ হয়। কয়েক দশকের মধ্যে উজনি অসমে মালিজান টি কোম্পানি, যোরহাট টি কোম্পানি আদি গড়ে উঠে।আসাম টি কোম্পানির পরিচালনায় ব্রহ্মপুত্রের উত্তরপার তথা কাছাড় জেলায় চা-বাগান গড়ে উঠে। নিকটবর্তী সিলেট জেলাতেও মালিনী চা-বাগান আদি তৈরি হয়।


এই যে ১৮২৪ সালে আসামে চা-গাছের সন্ধান প্রাপ্তি এবং ১৮৬০ সাল নাগাদ ব্রহ্মপুত্র ও সুর্মা উপত্যকায় চা-শিল্প গড়ে উঠা, এটাই আসামের নতুন ভূ-রাজনৈতিক চরিত্র গড়ে তোলে। তার উপর সিলেট শহর হয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যাতায়াতের জন্য একমাত্র সড়ক 'গুয়াহাটি-সিলেট পথ'ও একটি সাধারণ 'ভূ-রাজনৈতিক চরিত্র' গঠনের জন্য আরো একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক। তাছাড়া, এই বিশাল সীমান্ত অঞ্চলে নানা জাতি-উপজাতি অধ্যুষিত সমগ্র ব্রহ্মপুত্র ও সুর্মা উপত্যকা প্রায় একই চরিত্র বিশিষ্ট ছিল। ঘন জঙ্গলে ঢাকা সমভূমি, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, পাতলা জন বসতি, অনুন্নত কৃষি ব্যবস্থা, বন্যার প্লাবন, রাজস্ব ঘাটতি, সীমান্তবর্তী এলাকা ইত্যাদিতে সমগ্র উত্তরপূর্ব অঞ্চলটি একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ছিল। বিভিন্ন জাতি-উপজাতি বহুল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মত বাঙালি প্রভাবান্বিত সিলেট জেলার টিলা অঞ্চলে খাসিয়া, কুকি আদি উপজাতি বসবাস করত। কাছাড় জেলার টিলাভূমিও তেমনি উপজাতি অধ্যুষিত ছিল।

 
বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রশাসনের অঙ্গীভূত অবস্থায় এই বিস্তীর্ণ সীমান্ত অঞ্চলের সমস্যারাজির মোকাবেলা করা অত্যন্ত দূরূহ ব্যাপার ছিল। ব্রহ্মদেশের সঙ্গে ইতিমধ্যে একদফা যুদ্ধ হয়ে যাওয়াতে সামরিক দিক দিয়েও এই অঞ্চলের আলাদা গুরুত্ব ছিল। এমনই এক রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং একই আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোর অন্তর্গত সমগ্র অঞ্চলটির জন্য একই পৃথক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ঊর্ধ্বতন মহলের সিদ্ধান্ত হয়। বিদেশি শাসক গোষ্ঠীর কাছে ভাষাভিত্তিক বা জাতিভিত্তিক রাজ্য গঠনের কোন দায়-দায়িত্ব বা প্রয়োজনবোধ ছিল না। তাদের কাছে এই  অঞ্চলের আর্থ-রাজনৈতিক চরিত্রই মুখ্য হয়ে উঠে। তাই, ১৮৭৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারিতে গবর্ণর-জেনারেলের ৩৭৯ নম্বর ঘোষণাতে আহোম শাসিত মূল আসামের সঙ্গে সংলগ্ন সমস্ত পাহাড়ী অঞ্চল এবং উত্তর কাছাড়সহ কাছাড় জেলাকে নিয়ে 'নর্থ-ইষ্ট ফ্রন্টিয়ার রিজন' নামে একটি প্রশাসনিক অঞ্চল গঠনের ব্যাপারে বৃটিশ ক্যাবিনেটের ভারত সচিবের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পরদিন ৭ ফেব্রুয়ারিতে ৩৮০ নম্বর ঘোষণার দ্বারা সেই আহোম শাসিত মূল আসাম, নর্থ-ইষ্ট রংপুর অর্থাৎ গোয়ালপাড়া, তুলারাম সেনাপতির রাজ্যসহ বৃহত্তর কাছাড় জেলা, গারো পাহাড়, খাসিয়া পাহাড়, জয়ন্তীয়া পাহাড়, নাগা পাহাড় নিয়ে 'নর্থ-ইষ্ট ফ্রন্টিয়ার রিজন' নামে নতুন সুবিশাল প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন করা হয়। খাসিয়া পাহাড়ের শিলং শহরে প্রতিষ্ঠিত  হয় সেই প্রশাসনিক অঞ্চলের প্রধান দপ্তর। একজন চীফ কমিশনার হন এই অঞ্চলের মুখ্য প্রশাসক। তীব্র জন প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারি মাসেই সিলেট জেলাকে এই নতুন প্রশাসনিক অঞ্চলে সামিল করা সম্ভব হয় নি। পরে গবর্ণর-জেনারেলের বিশেষ প্রতিশ্রুতিতে জন-অসন্তোষ কিছটাু স্তিমিত হয়ে আসলে পরবর্তী ১২ সেপ্টেম্বরের ২৩৪৩ নম্বর ঘোষণাতে সিলেট জেলাকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং ২৩৪৪ নম্বর ঘোষণা মারফৎ সিলেট জেলাকে 'নর্থ-ইষ্ট ফ্রন্টিয়ার রিজন' প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এভাবে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সীমাবদ্ধ আহোম শাসিত মূল আসামের সঙ্গে অতিরিক্ত উপত্যকা ও বিশাল পার্বত্য অঞ্চলের বৃহদাকার জেলাগুলো জুড়ে দিয়ে এক সুবৃহৎ 'নর্থ-ইষ্ট ফ্রন্টিয়ার রিজন' তথা 'বর্দ্ধিত আসাম' গড়া সম্পূর্ণ হয়।


পরে ১৯০৫ সালে শুধু বাঙালির নবজাগরণ চেতনাকে বিনষ্ট করার জন্য বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে পূর্ববঙ্গকে বর্দ্ধিত আসাম ভূখণ্ডের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে এবং স্যার জে বি ফুলারকে লেফটেন্যান্ট গবর্ণর পদে উন্নীত করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে একটি প্রদেশ গঠিত হয়। তবে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে জন আন্দোলন গড়ে উঠলে পূর্ববঙ্গ আবার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং বর্দ্ধিত আসাম আবার একজন চীফ কমিশনারের শাসনাধীনে চলে যায়। ১৯৩৫ সালে বর্দ্ধিত আসাম আবার একটি প্রদেশে উন্নীত হয়। ১৯৪৭ সালে সেই 'বর্দ্ধিত আসাম' স্বাধীন ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য রূপে আত্মপ্রকাশ করে। আর, কি আশ্চর্য! স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর পরই বর্দ্ধিত আসামের মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ অকপটে ঘোষণা করলেন যে 'Undoubtedly, Assam is for Assamese only'! অথচ, সেই সময় বর্দ্ধিত আসামের যা আয়তন ছিল, তা, পূর্বতন আহোমরাজ্য, অর্থাৎ, মূল আসামের দ্বিগুণেরও বেশি! তাছাড়া, ১৯৩১ সালের জনগণনা অনুসারে অসমীয়া ভাষাভাষীদের চাইতে সেই বর্দ্ধিত আসামে বাংলা ভাষাভাষীদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেশী ছিল। ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আপাতকালীন অবস্থার জনগণনা হয় নি। ১৯৪৭ সালে সিলেট জেলার অধিকাংশ পাকিস্তানে চলে যাওয়াতে বাঙালির সংখ্যা কিছু কমেছিল নিশ্চয়ই। এই সুযোগেই মুখ্যমন্ত্রী বলে বসলেন কি না যে 'আসাম শুধু মাত্র অসমীয়াদেরই'! অথচ, অন্যান্য ভাষাভাষীদের  এক বৃহৎ সংখ্যক মানুষ ১৮৭৪ সালে সৃষ্ট 'বর্দ্ধিত আসাম' প্রদেশে তখনো বসবাস করছেন! কোনরকম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়াই মুখ্যমন্ত্রীর অসাংবিধানিক এই ঘোষণায় অসমীয়া ছাড়া বাকি জাতি ও উপজাতিদের শিরদাঁড়া দিয়ে শৈত্য প্রবাহ বয়ে যায়। তারপর, ১৯৬০ সালের 'রাজ্য ভাষা আইন' সকলের রাতের ঘুম ছুটিয়ে দেয়। পার্বত্য উপজাতিগণ আসাম থেকে অতি শীঘ্র বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেন। তাদের নিরলস প্রয়াস সফলও হয়। এক এক করে আসাম থেকে বেরিয়ে যায় নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ। তারপর আশীর দশকের 'আসাম আন্দোলন' কালে অসমীয়া জাতীয়তাবাদ উত্তাল হয়ে উঠলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে অবশিষ্ট উপজাতিগণ একে একে সক্রিয় হয়ে উঠেন। এক এক করে 'ডিবাইড আসাম ৫০/৫০' শ্লোগান নিয়ে বড়োল্যাণ্ড আন্দোলন, কমতাপুর রাজ্য আন্দোলন, স্বশাসিত রাজ্যের দাবিতে কার্বি জনআন্দোলন এবং ডিমারাজি আন্দোলন অবশিষ্ট সারা 'বর্দ্ধিত আসাম'কে তোলপাড় করে তোলে। ইতিমধ্যে বড়ো জনগণ নিজেদের দাবি আদায়ের লড়াইতে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। অন্যরাও খুব একটা পিছিয়ে নেই। 


কিন্তু, বরাকের মানুষের এখনো কোন হেল-দোল নেই। বরাকের মানুষ এখনো অসমীয়াদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। বরাকের কোন কোন গোষ্ঠী নিজেদের খিলঞ্জিয়া বলে জাহির করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। কিন্তু, গোপীনাথ বরদলৈয়ের সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অসমীয়া শাসকগোষ্ঠীর উগ্র ভাষাপ্রেমবোধ বরাকের মানুষদের সংস্কৃতিকে বরাবর তাচ্ছিল্য করে গেছে। অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদী শাসকগোষ্ঠী বরাবর বরাকের মানুষদের হিন্দু, মুসলমান, মণিপুরী, ডিমাসা ইত্যাদিতে ভাগ ভাগ করে রেখে সমগ্র বরাকবাসীকে নিজেদের লেজে খেলিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীনতার পর থেকে অনবরতভাবে বরাকের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর তারা দুরমুশ চালিয়ে গেছেন। বরাকের ছাত্রদের গণ আন্দোলনের ফলে শিলচরে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন হলে তার প্রতিবাদে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় 'অসম বন্ধ' হয়। তারপর তেজপুরে অন্য একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত শিলচরের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আটকেই রইল। অটলবিহারী বাজপায়ীর প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে 'সুরাট থেকে শিলচর ইষ্ট-ওয়েষ্ট করিডর' ঘোষিত হলে তখনকার মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ প্রকাশ্যে বলেছিলেন, Why Surat to Silchar? Why not Surat to Saikhowa! তারপর 'ফরেষ্ট বিল' এলো আর সেই স্বপ্নের 'সুরাট থেকে শিলচর' রাস্তা আটকে গেছে। আজো আটকে আছে। যতদিন তরুণ গগৈ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, সেই সুদীর্ঘ ১৫ বছর ধরে লামডিং-বদরপুর বি. জি. রেলপথের নির্মাণকার্য শম্বুক-গতি-সর্বস্ব হয়ে রইল। সেই ১৯৬৯ সাল থেকে এই সেদিন পর্যন্ত বরাকের মানুষদের রাজ্যের প্রধান শহর তথা রাজধানী গুয়াহাটি-দিশপুরে শহরে যাতায়াতের জন্য অন্য রাজ‌্য মেঘালয়ের অভ্যন্তর হয়ে যাওয়া একমাত্র সড়কপথটির উপরই  ভরসা করতে হত। অসমীয়া জাতীয়তাবাদ পুষ্ট আসাম রাজ্য সরকার এবং শাসনযন্ত্র বরাকের মানুষদের সামান্য একটি মসৃণ যোগাযোগ ব্যবস্থা দিতে পারে নি। উল্টে বরাকের মানুষের স্বাভিমানকে আঘাত করে সেখানে সর্বস্তরে অসমীয়া ভাষা প্রচলনের জন্য বিভিন্ন দলের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের তরফে বার বার সার্কূলার গেছে। এই সময় একজন ক্ষমতাবান মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, শীঘ্রই এমন আইন হবে যাতে করে কোন চাকুরি প্রার্থীর নিজের মাধ্যমিক পরীক্ষার বিষয় সমূহে যদি প্রধান ভারতীয় ভাষা হিসাবে অসমীয়াভাষা না থাকে, তাহলে তিনি কোন সরকারী চাকরি পাওয়ার জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হবেন না। এভাবে অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদ বরাকের বাঙালির মুখের ভাষা ও ভাত দুই-ই কেড়ে নিতে চাইছে!


অতি সম্প্রতি, মাল্টি মডেল লজিস্টিক পার্কস (এমএমএলপি) নামে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি বৃহৎ প্রকল্পের জন্য দেশজোড়া ৩৪টি বিভিন্ন শহরের সঙ্গে বরাকের শিলচর শহরটিও চিহ্নিত হয়েছে। দুটি বিদেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ব্রহ্মদেশের সমীপবর্তী, তথা রেল, স্থল, জল ও বিমান যোগাযোগের দ্বারা এই শহরটি সংযুক্ত থাকার ফলেই এই বিশেষ প্রকল্পে শিলচরের চিহ্নিত করণ হয়েছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারিতে কাছাড়ের জেলাশাসকে একটি চিঠি পাঠিয়ে রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্য সচিব এস এস মীনাক্ষী সুন্দরম ঐ প্রকল্পের জন্য বিকল্প প্লট সহ ১০০ একর জমি বরাদ্দ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি এমনও লিখেছেন যে প্রকল্পটির জন্য চিহ্নিত স্থানে ভবিষ্যৎ পরিবর্দ্ধনের সুবিধা থাকতে হবে। অতীতের সকল ঐতিহ্য অনুসরণ করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী এবারেও কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা বিশেষ ভাবে চিহ্নিত শিলচর শহরকে বাতিল করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার একটি শহরকে এই প্রকল্পের জন্য পছন্দ করতে জোর তদ্বির চালাচ্ছে। বরাকের জন্য ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এভাবে বার বার একজন 'মাহীমাক' মানে সৎমা রূপে প্রতিপন্ন হয়েছে।


সর্বশেষে অসম চুক্তির ৬নং দফা রূপায়নের নামে জাষ্টিস বিপ্লব শর্মা কমিটি শতকরা ৮০/১০০ ভাগ সর্বস্তরীয় সংরক্ষণের প্রস্তাব করে একই সঙ্গে বরাকের মানুষের পেটে ও পিঠে বিরাশী সিক্কার কিল মারার ব্যবস্থা করেছেন।


এই অবস্থায় বরাকবাসীদের কি করা উচিত! এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ভূগোল, ইতিহাস, রাজনীতি, জনবিন্যাস, সমাজজীবন এবং সাংস্কৃতিক চর্চা আদি সব কিছুই সম্পূর্ণ আলাদা এবং পরস্পরের থেকে বিপরীতমুখী। বরাক ও ব্রহ্মপুত্রের জলস্রোত যেমন অন্ততঃ পক্ষে এই উপত্যকা দুটিতে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার জন্য কোথাও পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হতে পারে নি, তেমনিই, ১৮৭৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত একই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অবস্থান করেও এই উপত্যকা দুটির মানুষজন পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারে নি। বৃহৎ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা বরাবর ছোট্ট বরাক উপত্যকাকে নিজেদের জমিদারীর খাস তালুক ভেবেছে। এ ছাড়া আর কিছু ভাবে না। গত প্রায় ১৫০ বছরে মাত্র একবার টিভির লাইভ প্রোগ্রামে সঙ্গীতশিল্পী দেবজিৎ সাহাকে সমর্থন করার মত অতি নগণ্য একটি ব্যাপার ছাড়া বরাকের প্রতি ব্রহ্মপুত্রের আর কোন সহৃদয়তার পরিচয় নেই। বরাক উপত্যকার যে কোন আর্থ-সামাজিক ব্যাপারে তাঁরা একেবারেই উদাসীন। বরাকের মানুষের জন্য তাদের মন কখনো কাঁদে না। উল্টে ব্রহ্মপুত্রের মানুষ বরাকের মানুষের সর্বনাশের চূড়ান্ত করেছেন। ভারতের তদানীন্তন গবর্ণর-জেনারেল লর্ড ওয়াবেলের ১৯৪৬ এপ্রিল জার্নালে লিখিত বয়ান অনুসারে, 'সেই সময়ের আসাম প্রিমিয়ার গোপীনাথ বরদলৈ বিলাতের ক্যাবিনেট মিশনকে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছিলেন যে আসাম প্রদেশ সরকার নিজের অধিকার থেকে সিলেট জেলা প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে ছেড়ে দিতে সম্পূর্ণ তৈরি রয়েছে'। এছাড়াও, একজন কট্টর জাতীয়তাবাদী অসমীয়া হিসাবে গোপীনাথ বরদলৈ চাইতেন যে বাঙালি বহুল সিলেট জেলা এবং কাছাড়ের একটি অংশ বিশেষ আসাম প্রদেশ হতে চিরতরে বিদেয় হোক। তাহলেই, গোপীনাথ বরদলৈর মতে, 'আসামের মানুষের বিগত ৭০ বছরের মনের ইচ্ছা পূরণ হয়'। স্বাধীনতার পর পরই ১৯৪৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে চিঠি লিখে মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ ভারতের গৃহমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেলকে নিজের মনের এই অভীষ্ট সিদ্ধির কথা জানিয়েছিলেন।


বর্তমানের 'জাস্টিস বিপ্লব শর্মা কমিটি'র দ্বারা প্রস্তাবিত তথাকথিত খিলঞ্জিয়া অসমীয়াদের জন্য সাংবিধানিক প্রতিনিধিত্ব, সরকারী ও বেসরকারী চাকরি, ভূমিসত্বের অধিকার, শিক্ষার পরিসর, শিল্প-বাণিজ্য, ভাষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা ইত্যাদি সুস্থ জীবন-যাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ৮০/১০০ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা আসামের স্বাভিমানী বাঙালির সুস্থ জীবনযাত্রা স্তব্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। এই কমিটির রিপোর্ট সংবাদ মাধ্যমে যা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বাঙালির বিরুদ্ধে আর্থ-সামাজিক তথা রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রায় ১৫০ বছরের সুদীর্ঘ পরম্পরা এই সময় চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গেছে। কট্টর অসমীয়া জাতীয়তাবাদ এই সময় 'শরাইঘাটের শেষ রণ'-এর ব্যুহসজ্জা সম্পূর্ণ করে নিয়েছে। ইতিমধ্যে এন-আর-সি-তে লক্ষ লক্ষ বাঙালির নাম বাদ পড়াতে এটা অতি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে 'শরাইঘাটের শেষ রণ'-এ শত্রুপক্ষ রূপে তারা চিহ্নিত করেছে বাঙালিদেরই। এটা অত্যন্ত পরিতাপের যে বাঙালিদের সাহচর্যে মধ্যযুগে কামরূপ-কমতামণ্ডল রাজ্যে গৌড়েশ্বর প্রতাপধ্বজ-দুর্লভনারায়ণ-ইন্দ্রনারায়ণের রাজত্বকালে কামরূপীয় ভাষা-সাহিত্য গড়ে উঠেছিল, যে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় অসমীয়া ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজ প্রবেশাধিকার পেয়েছিল, যে সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক পরিপক্কতার ফলে আসামের প্রথম বিধানসভায় মোঃ সাদুল্লার নেতৃত্বাধীন মুশ্লিম লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে গোপীনাথ বরদলৈর দ্বারা প্রথম কংগ্রেস সরকার গঠন সম্ভব হয়েছিল এবং এর ফলেই পরে ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবিত 'গ্রুপিং প্ল্যান' থেকে আসামকে উদ্ধার করে পাকিস্তানের রাহুগ্রাস মুক্ত হয়েছিল, যে বাঙালি হেমাঙ্গ বিশ্বাস অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতির সেবায় নিজের জীবন অতিবাহিত করলেন, সেই বরাবরের অতি অসমীয়া-ঘনিষ্ঠ বাঙালিই শরাইঘাটের শেষ রণে শত্রু পক্ষে পরিণত হয়েছে!


এই অবস্থায় বাঙালি কি ভাতৃ দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হবে! না, তা কখনোই নয়। হাজার বছরের আত্মীয়তাকে তাচ্ছিল্য করা সম্ভব নয়। অসমীয়া সমাজ কোন অবস্থাতেই বাঙালির শত্রু হতে পারে না। কারণ, লক্ষ লক্ষ বাঙালি ইতিমধ্যে 'অসমীয়া' হয়ে অসমীয়া সমাজে বিরাজ করছে। জাতিগতভাবে এরা আমাদের শত্রু হতে পারে না। নিঃসন্দেহে এরা আমাদের পরম জ্ঞাতি। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে দুই জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর যুদ্ধের ফলাফল বড় ভয়ঙ্কর হয়েছিল। সুতরাং, আমাদের সমঝোতার পথেই এগোতে হবে।


এই সমঝোতার পথে বরাক উপত্যকাকে অতি সত্বর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভাবে আসাম রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। তাৎক্ষণিক ভাবে বরাক উপত্যকাকে একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বাঙালির ভূতকালের উপর নির্ভর করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সন্তান-সন্ততিদের জীবন-যাপন সুরক্ষিত করার জন্য উপত্যকার নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্যই বরাকভূমি গঠন করা আশু প্রয়োজন। কেন্দ্র শাসিত 'বরাকভূম' বাঙালির পৃথক গৃহভূমি হয়ে উঠবে। এই পৃথক বরাকভূম কারো রাজনৈতিক অভিসন্ধি পূরণের জন্য নয়। পৃথক বরাকভূমি অবশ্যই কারো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ব্যবহৃত হবে না।


কারণ, আন্তর্জাতিক সীমান্ত বেষ্টিত ও সামরিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল তথা ট্রান্স এশিয়ান যোগাযোগের ট্রানজিট পয়েন্ট বলে বরাকভূমিকে নিঃসন্দেহে একটি 'ইউনিয়ন টেরিটেরি' হতে হবে। উপত্যকার স্থায়ী বাসিন্দা তথা দেশভাগের ফলে ছিন্নমূল বাঙালির হোমল্যান্ডের জন্য আপাততঃ বিধানসভা ছাড়া বিশেষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমন সাংবিধানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে নতুন প্রশাসনিক অঞ্চলে সম্প্রদায় ভিত্তিক কোন রকম রাজনৈতিক রেষারেষির সৃষ্টি না হয়। জাতি-উপজাতি ও ধর্ম নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের বাস্তবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আপামর ভারতীয় নাগরিকদের যথার্থ মঙ্গল হয়।


ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা নিবাসী বাঙালিদেরও সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক এবং আর্থ-সামাজিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিদের অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণে কোন কালেই কোন আপত্তি ছিল না এবং আজও নেই। এই বিষয় তাদের ব্যবহারিক জীবনে বার বার প্রমাণিত হয়েছে।

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions