রাজ-সমাজ-অর্থ + নীতি

ভাবনায় নির্বাচন ২০২১
পর্ব ৮
বিষয় : দাক্ষিণ্যের রাজনীতি
জয়দীপ ভট্টাচার্য  
২২ মার্চ ২০২১
 
দেখতে দেখতে এসে পড়লো ৫ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন।
আসামের নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়েছে ২৭ মার্চ, ০১ এপ্রিল এবং ০৬ এপ্রিল।
বরাক উপত্যকায় নির্বাচন আগামী ০১ এপ্রিল ২০২১।
আসন্ন নির্বাচন কে সামনে রেখে "ঈশান কথা" পুরো মার্চ মাস ধরে আপনাদের সামনে তুলে ধরবে এই ধারাবাহিক
"ভাবনায় নির্বাচন ২০২১"
যাতে থাকবে নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকা মানুষ এবং ছাত্রছাত্রী দের ভাবনাচিন্তা, মত-অভিমত, অথবা বিশ্লেষণমূলক লেখা ...
আজ পর্ব ৮ ...

নির্বাচনের ঢাকে আবার কাঠি পড়েছে এই রাজ্যে। শুরু হয়েছে শাসক ও বিরোধী দলের নেতা নেত্রীদের কুচকাওয়াজ। শোনা যাচ্ছে অনেক মনোমুগ্ধকর প্রতিশ্রুতি। এসবই আমাদের অর্থাৎ যাদের ভোটে নেতা নেত্রীরা বৈতরণী পার হবার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের পরিচিত অভিজ্ঞতা। তবে যতদিন যাচ্ছে এই ব্যাপারটি আর 'গরিবি হটাও' এর বিমুর্ত শ্লোগান কিম্বা ভোটের আগের রাতে খাদ্য পানীয় বিতরণের এর মতো স্থুল পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এখন ভোটের পাটিগণিত অনেকটাই নির্দিষ্ট। একদিকে যেমন ভোটারের আর্থ সামাজিক অবস্থান এবং সুক্ষ্ম মনস্তত্বকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে অন্যদিকে স্পষ্টতই 'দেয়া নেয়া' র অঙ্কটিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সোজা কথায় ব্যাপারটি অনেকটাই অর্থ তথা অঙ্কনির্ভর হয়ে পড়ছে।

এই রাজ্যের কথাই যদি ভাবা হয় তাহলে শহরে, গ্রামে কান পাতলেই দেখবেন শাসক দলের সমর্থকরা বলে বেড়াচ্ছেন যে গত পাঁচ বছরের শাসনে এই সরকার সাধারণ প্রান্তিক জনগনের কাছে এতটাই লাভ পৌঁছে দিয়েছে যে এই বার চোখ বুজে এই শ্রেণীর মানুষরা তাদের মূল্যবান ভোটটি বর্তমান শাসক দলের ভাঁড়ারে ই সমর্পণ করবেন। প্রশ্ন হচ্ছে কেমন লাভ ?

আসুন আসামের পরিপ্রেক্ষিতে এই ব্যাপারটি একটু বোঝে নেওয়া যাক। গত ছয় ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের সফরসূচি ছিল আসামের চা বাগান এলাকায়। ঘোষণা করা হয় যে আসামের আট লক্ষ চা শ্রমিককে এককালীন ৩০০০ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। এবং এই টাকা সোজাসুজি তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টএ স্থানান্তরিত করা হবে। এই সরকারের আমলে এর আগেও দু'কিস্তিতে তাদের একাউন্টে মোট ৫০০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। বরাক, ব্রহ্মপুত্র উপত্যাকা মিলিয়ে এই রাজ্যে চা শ্রমিকদের সংখ্যা ৬০ লক্ষের কাছাকাছি। ফলে যে কোন‌ দলের ক্ষমতায় আসতে গেলে এদের কথা ভাবতেই হয়। দারিদ্র সীমার নিচে যারা রয়েছেন এবং যারা মূলত গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা তাদের জন্য একটাকা দরে চালের সংস্থান তো আগেই করা হয়েছে। এছাড়াও কৃতী শিক্ষার্থীদের স্কুটি দেওয়া হচ্ছে , কাউকে দেওয়া হচ্ছে মোবাইল ফোন এবং আরো অনেক কিছু। বাদ যাচ্ছেন না সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিকরাও বা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিমূলক সংগঠনগুলোও।

 

এবার একটু চোখ বোলানো যাক ভোটের অঙ্কে। আসামে বর্তমান মোট ভোটারের সংখ্যা ২ কোটি ২৯ লক্ষ। একটি হিসাব বলছে যে তার মধ্যে শাসকদল বিজেপির হিতাধিকারি অর্থাৎ যারা সরকার থেকে কোন না কোন অনুদান পেয়েছেন তার সংখ্যা ৯৬ লক্ষ। এর মধ্যে কিছু হিতাধিকারী রয়েছেন যাদের ভোটাধিকার নেই। সেই ৫ শতাংশকে বাদ দিলেও প্রত্যক্ষ হিতাধিকারির সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৯১ লক্ষ ২০ হাজারে। এবং যেসব ছাত্ররা স্কুটি পেয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যদেরও কিন্তু পরোক্ষভাবে হিতাধিকারি বলা চলে। যাইহোক হিসেব অনুযায়ী এই সংখ্যা মোট ভোটারের ৪০ শতাংশ, এবং শাসকদল আশা করছেন এই আনুকূল্য ভোটে রুপান্তরিত হবে। তাহলে কিন্তু কেল্লা ফতে। কারণ পরিসংখ্যান বলছে যে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল ৩৬.৬৩ শতাংশ ভোট। এরপর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পায় ২৯.৭ শতাংশ ভোট। অগপর সাথে জোট বাঁধায় কিন্তু এই নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায় বর্তমান সরকার। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে এই হিসেব আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৩০.৩ শতাংশে। অর্থাৎ একটি কথা স্পষ্ট যে সব হিতাধিকারির ভোট পেয়ে গেলে এই দলের আবার ক্ষমতায় ফিরে আসা প্রায় নিশ্চিত। প্রকৃতপক্ষে ৩০ শতাংশ ভোট পেলেই বর্তমান শাসকদল অনায়াসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাবে, বিরোধী দলের অনৈক্য কে পুঁজি করে। এরপর তো ক্যাডার ভিত্তিক জনসংযোগ, হিন্দুত্ব কার্ড ইত্যাদি রয়েছেই।

প্রশ্ন হচ্ছে এইসব স্বল্পমেয়াদী অনুদান দ্বারা কি সঠিক উন্নয়ন বা সম্পদ সৃষ্টি সম্ভব? চলুন একটু চোখ বোলানো যাক বাস্তব পরিস্থিতির দিকে। রাজ্যের চা শিল্পের কথাই যদি ধরা হয় তাহলে দেখা যাচ্ছে কোভিড পরিস্থিতির ফলে এই শিল্পক্ষেত্রে লোকসান হয়েছে ১০৫৯ কোটি টাকা, উৎপাদন কমেছে ৪৮.৩২ শতাংশ। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো মানের দিক দিয়ে আসাম চা মোকাবেলা করতে পারছে না শ্রীলঙ্কা, চীন কিম্বা কেনিয়ার চা এর সাথে। উৎপাদনের খরচা যোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোগপতি এবং কৃষকরা। ২০১৪ থেকে নিলাম বাজারে প্রতি কেজি চায়ের দাম ঘোরাফেরা করছে ১৫৩ টাকা থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে যেখানে প্রতি কেজি উৎপাদনের খরচাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ টাকা। যে শিল্পক্ষেত্র রাজ্যের ৫ শতাংশ জিডিপির যোগানদার তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে দরকার আধুনিক প্রযুক্তি এবং মেশিনারীর ব্যাবহার। যেসব বাগানের চা গাছ অনেক পুরোনো দরকার সেগুলোকে উৎপাটিত করে নতুন চারা লাগানো। এবং আগামী পাঁচ বছর নতুন উৎপাদনের জন্য অপেক্ষা করা। তাহলেই আবার মানোন্নয়ন হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্বমহিমায় ফিরে আসতে পারে আসাম চা। সরকার কিন্তু এসব ভালো করেই জানেন। কিন্তু এসব দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে কি আদৌ আগ্রহী ?

কৃষিক্ষেত্রের উপর এখনো এই রাজ্যের অর্ধেক শ্রমশক্তি নির্ভরশীল, যদিও মোট অর্থনীতিতে কৃষির যোগদান স্বাধীনোত্তর কালের ৬৮ শতাংশ থেকে হালের ১৭ শতাংশতে এসে ঠেকেছে। গ্রামেগঞ্জে আজকাল নিজেদের জন্য যতটুকু দরকার তার বাইরে কৃষকরা চাষ করতে চাননা কারণ তা বিক্রি করে উৎপাদনের খরচা ওঠেনা। এবং ১ টাকা কেজি চালের দাক্ষিণ্যে তাও বন্ধ হতে চলেছে। গ্রামের কৃষক এখন শহরমুখী হচ্ছেন, দিনমজুরি করে যা পাচ্ছেন সেই মুল্য দিতে অক্ষম তার কৃষিজমি। অথচ ঠিকঠাক পরিকল্পনা বা সরকারি উদ্যোগ থাকলে পাঞ্জাব, হরিয়ানার মতো আরেকটি 'সবুজ বিপ্লব' কি ঘটানো যেতোনা এই রাজ্যে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন আলবাৎ যেতো, কারণ নদীনালার বাহুল্য থাকায় উর্বরতার দিক দিয়ে আসাম অধিকাংশ রাজ্য থেকে এগিয়ে। দরকার ছিল বন্যা সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান, জলসেচ ব্যাবস্থার আধুনিকিকরণ এবং সারা বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের শষ্য তথা অন্যান্য কৃষি পন্যের উৎপাদনের ব্যাপারে জোর দেওয়া। তাহলে হয়তো শহরমুখী কৃষকটি আবার চিরস্থায়ী ভাবে ফিরে আসতেন তার গ্রামে, চাঙ্গা হতো গ্রামীন অর্থনীতি, সমোন্নয়নের স্বপ্ন সফল হতো, অন্তর্ভুক্তি মূলক উন্নয়ন আর 'ডিসপারিটি' শব্দগুলো শুধু বৌদ্ধিক সেমিনারের বিষয় হয়ে থাকত না।

চা ছাড়া অন্য শিল্প ধরলে সেই মান্ধাতা আমলের পেট্রোলিয়াম, ন্যাচারাল গ্যাস এবং তেল শোধনাগার ছাড়া নতুন কোন ক্ষেত্র এখনো এই রাজ্যে বিশেষ ভাবে ওঠে আসেনি। পুরো উত্তর পূর্বই অবশ্য এই সমস্যায়‌ ধুঁকছে। যোগাযোগের অপ্রতুলতা এবং সঠিক পরিকাঠামোর অভাবে এতদঞ্চলে বাইরের পুঁজিনিবেশ একদমই সীমিত। এক্ট ইস্ট পলিসি নিয়ে হয়তো কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে তবে এখনো তা থেকে উল্লেখযোগ্য কোন সুফল ওঠাতে পারেনি এই রাজ্য। এবং ওঠালেও তা কতটা অন্তর্ভুক্তি মূলক হবে তাও বিতর্কিত বিষয়।

 

এবারের কেন্দ্রীয় বাজেটে আসামের চা শ্রমিকদের উন্নয়নে বরাদ্দ হয়েছে ১০০০ কোটি টাকা। দুর্জনরা বলছেন এই ঘোষণা আসন্ন নির্বাচনকে মাথায় রেখে। সে যাই হোক এতদিন চা শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি পেতেন ১৬৭ টাকা। সম্প্রতি রাজ্যের অর্থমন্ত্রী সবার মজুরি দৈনিক ৫০ টাকা করে বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন যা অনুদান হিসেবে এই বরাদ্দ পুঁজি থেকে ব্যায়িত হবে। অর্থাৎ এখন থেকে তারা দৈনিক ২১৭ টাকা পাবেন । শ্রমিকদের দাবি কিন্তু ছিল ন্যুনতম ৩১৫ টাকা, এবং বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে  একটি পরিবারের বেঁচে বর্তে থাকার জন্য এই দাবি মোটেই অযৌক্তিক নয় কারণ আজকাল অন্যান্য অনেক সুবিধা যা আগে বিনামূল্যে বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের দিতেন তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে।

বাকি রইল বানিজ্য এবং সেবা ক্ষেত্র। যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রথমটির ক্ষেত্রে অন্তরায়। সেবা ক্ষেত্রে গত কয়েকবছরে বৃদ্ধির পিছনে রিয়াল এস্টেট ব্যাবসার একটি বড় ভূমিকা ছিল। কোভিডোত্তর  পরিস্থিতি তাতেও থাবা বসিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে যে কোন সরকার এইসব দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপে জোর দেবেনই বা কেনো ? কারণ এসবের সুফল পেতে অপেক্ষা করে থাকতে হবে অনেকদিন। জনপ্রতিনিধিরা জানেন যে তাদের স্থায়ীত্ব পাঁচ বছর। এরমধ্যেও আবার চলে আসে পঞ্চায়েত, পৌরসভা ইত্যাদি বিভিন্ন নির্বাচন। তাই চটজলদি সমাধান না করলে চলবে না। তাদের পাখির চোখ তাই নিবদ্ধ থাকে সেই ৪০ শতাংশের দিকে। তাই কংগ্রেস সরকার বিলিয়েছেন সুতো, কম্বল এরা বিলোচ্ছেন ৩০০০ বা ৫০০০ টাকা। আর জনগণ ? তারা কোন দলকেই হয়তো সেই অর্থে বিশ্বাস করেন না। তাই আশাও করেন না তেমন কিছু। বিচ্ছিন্নতার সীমান্তে দাঁড়িয়ে তারা সল্পমেয়াদী এইসব আনুকূল্যকেই  হয়তো পরম প্রাপ্তি হিসেবে ভেবে নিচ্ছেন, আর মূল্যবান ভোটটি ও সেই হিসেবে বরাদ্দ হচ্ছে।

জনপ্রতি আয়ের নিরিখে দেশের ৩৩ টি রাজ্যের মধ্যে এই রাজ্যটি ৩০তম অবস্থানে থাকলেও, জাতীয় গড় আয়ের অনেক নীচে থাকলেও তাই কিচ্ছু যায় আসেনা।  

'সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে ...'

ঈশানের যোগাযোগ

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions