মাঠে ময়দানে

'কুমড়ো দিয়ে ক্রিকেট খেলে কেন রাজার পিসি'

সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়

১২ সেপ্টেম্বর ২০২১

Sumit Ganguly 1_edited.jpg
Sukumar Ray.jpeg

'কুমড়ো দিয়ে ক্রিকেট খেলে কেন রাজার পিসি'- ----

মানে শুধু ওই 'বোম্বাগড়ের রাজা' ছড়া আর 'জগ্যিদাসের মামা' গল্পেই নয়। ক্রিকেট হলো সুকুমারের রক্তের জিনিস। বাবা উপেন্দ্রকিশোর 'রঞ্জি'কে নিয়ে বাংলায় প্রবন্ধ লিখেছেন, জ্যাঠা বাংলা ক্রিকেটের পথিকৃৎ। বাবার ঠিক পরের ভাই সে আরেক ক্রিকেটার। তার সব ছেলে ক্রিকেটার। একজন তো আবার ১৯৩২ এ ভারতীয় দলে প্রথম টেস্টের সফরে সুযোগ পেয়ে গেলোই না ! ইঞ্জিনিয়ারিং এর ফাইনাল পরীক্ষা! অন্য এক ভাই রঞ্জি খেললো, এক ভাই সি এ বির ফাউন্ডার মেম্বার। পরের দুই কাকাও ক্রিকেটার; সবার ছোটজন বাংলার প্রথম ফাস্ট মিডিয়াম বোলার।  পিসতুতো ভাইয়েরাতো বিখ্যাত --- - সাধে কি আর ১৭/১৮ বছরের ছোট খুড়তুতো বোন পিসতুতো দাদাদের নিজের খেলনার পুতুল ছোটবেলায় ভেঙে দেওয়ার পরেও বুড়ো বয়সে বলতে পারেন 'আমি কার্তিক-গণেশের বোন- ক্রিকেট বাড়ির মেয়ে'। 

নিজে খেলেননি বটে, কিন্তু খেলা পাগল ছিলেন। 

১৯১২  সালে  সুকুমার ইংল্যান্ডে ছিলেন পড়াশোনার জন্য। ওই বছর তিনি ১৬.২.১৯১২ তারিখে কুলদারঞ্জনকে চিঠি লিখছেন যে 'ক্যালকাটা' ম্যাচে "তোমরা এতো ভালো খেললে অথচ আশ্চর্য্য এই যে এখানে স্টেটসম্যান এই ইংলিশমেন এর উইকলি এডিশন আসে তাতে এ খেলার কোনো উল্লেখ নেই '। (সুকুমার সাহিত্য সমগ্র -সম্পা:-সত্যজিৎ রায় )।

এখন প্রশ্ন হলো এটা  কোন খেলা ? বলা মুশকিল। কিন্তু যদি  বুনো হাঁসের পেছনে ছুটি তাহলে পাবো কি ? জানি না| দেখা যাক।

সত্যজিৎ রায়ের "যখন ছোট ছিলাম " নামক স্মৃতি কথায় আছে যে তার ধন দাদু ( অর্থাৎ কুলদারঞ্জন ) তাকে গল্প বলেছিলেন যে কিভাবে একবার তিনি ৯৯ এর গেরোয় পরে সেঞ্চুরি পাওয়ার থেকে প্রায় আধঘন্টা আটকে  ছিলেন ক্যালকাটার বিরুদ্ধে। আর এক জায়গায় কুলদারঞ্জন নিজে সে যুগের ক্রিকেটের স্মৃতিচারণায় বলেছেন যে তিনি একবার একটি ম্যাচে ১৭০ রান করেছিলেন ক্যালকাটার বিরুদ্ধে। ওই খেলা দেখে নাটোরের রাজা যতীন্দ্রমোহন তাকে ৪০০ টাকার হিরের আংটি দিয়েছিলেন। এখন সেই যুগে কলকাতায় 'ক্যালকাটা' ম্যাচ বলতে বোঝাতো  'ক্যালকাটা টাউন ক্লাব' বনাম 'ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের ' ম্যাচ। হতে পারে কুলদা, সত্যজিৎ , সুকুমার একই খেলার কথা বলেছেন।

আর একটি চিঠি আরো আকর্ষণীয়। সম্ভবত: ৩১শে মে  ১৯১২ সালে লেখা।  তাতে তিনি যথারীতি কুলদারঞ্জন কে 'কুলিকাকা' সম্বোধন করে লিখছেন পুনশ্চতে 'এখানে এখন ক্রিকেট সিজন আরম্ভ হয়েছে- 'রঞ্জি' খেলছে। 'বাজানা' সমারসেটের হয়ে বেশ খেলছে। 'ট্রায়াঙ্গুলার ম্যাচ' এর সময়ে আমাদের লং ভেকেশন আরম্ভ হবে। তখন  বেশ খেলা দেখা যাবে '। (পূর্বোক্ত গ্রন্থ)।

বেশ ভাবানোর চিঠি। রঞ্জি ১৮৯৩ সালে থেকে ১৯০৪ অবধি টানা ওখানে খেলেন। তারপরে ১৯০৮ এ খেলেন। তারপরে এই  ১৯১২ সালে। এরপর ১৯২০ তে শেষবার। যাই হোক , ওই বছর তিনি বেশ ভালো ফর্মে ছিলেন যদিও টেস্ট আর খেলেননি। প্রথম শ্রেণীতেও অনিয়মিত। ওই বছর তিনি সাসেক্স , লর্ড লন্ডেনবার্গ একাদশ, জেন্টলম্যান এবং এম সি সির হয়ে মোট ১৯ খানা প্রথম শ্রেণীর খেলায় ৪২.৮০ গড়ে ৪খানা  শতরান সহ এক হাজার একশো তেরো রান করেন।

বাজানা হলো মানেকশ বাজানা। ভারতে থাকতে খেলোয়াড় হিসেবে নাম করেন। ১৯১১ সালে যখন ভারতীয় দল ইংল্যান্ড যায় সেই সফরে চারখানা প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেন। সমারসেটের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে ১০৮ করেন। পরের বছর তাকে সমারসেট ডেকে নেয়। মোট ৫৫ খানা প্রথম শ্রেনীর খেলায় তিনটি শতরান সহ ১৯৭৫ রান করেন। কোনোদিন ভারতে খেলেননি। সব সময়ে ইংল্যান্ডেই খেলেছেন। ওই মরশুমে তিনি ১৮ ম্যাচে ৬৩৫ রান করেন। ২টি হাফ সেঞ্চুরি। সর্বোচ্চ ৯৫। ওই চিঠির আগে তিনি ৫ ম্যাচে ২২১ রান করেছিলেন। সর্বোচ্চ হ্যাম্পশায়ারের বিরুদ্ধে ৭১। ১০ খানা ইনিংহসের মধ্যেই ৯ বার ওপেন। এমন কিছু না হলেও রঞ্জি -দলীপের মধ্যবর্তী এই একজনই নিয়মিত কাউন্টি খেলেন।

আর ট্রায়াঙ্গুলার ? সেটা ঐতিহাসিক ব্যাপার । সেই ১৯১২ সালে প্রথম ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক ত্রিদেশীয় প্রতিযোগিতা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড কে নিয়ে। তার কথাই সুকুমার বলছেন।দেখা যাচ্ছে  এই চিঠির আগেই অস্ট্রেলিয়া আর দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ একটা টেস্ট হয়েগেছে। কিন্তু বাকি গুলো বেশি কিছু দিন বাদে। সম্ভবত সেই সময় ছুটি ছিল।

'আমাকে ভাবায় - সুকুমার রায়'।