মাঠে ময়দানে

ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন: ফুটবল-বিজ্ঞাপনে ভারাক্রান্ত বিশ্ব
ইকবাল বাহার লস্কর
১৭ জুন ২০২১
Eriksen 4.jpeg
Eriksen 1.jpeg
Eriksen 3.jpeg
Eriksen 2.jpeg

অতিমারি কোভিড আবহের মাঝে বিশ্বখ্যাত ফুটবল প্রতিযোগিতার দুটি আসর অতি সম্প্রতি শুরু হয়েছে। ফুটবলে শীর্ষ দেশগুলো নিয়ে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার একটি কোপা আমেরিকা এবং অপরটি ইউরো। কোপা আমেরিকায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা সহ ১০টি দেশের জাতীয় দল এবং ইউরোতে জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, পূর্তগাল সহ ২৪টি দেশ খেলছে। দল বেশী হিসেবে কিছুটা জৌলুস রয়েছে ইউরোর।

 

সে যাক, গত ১২ জুন ইউরোর দ্বিতীয় দিনেই আছড়ে পড়ে বিপদের যেন ঘনঘটা। ডেনমার্ক বনাম ফিনল্যান্ড ম্যাচে। ম্যাচের ৪২ মিনিটে বল সীমা রেখার বাইরে চলে গিয়েছিল। ডেনমার্কের থ্রো-ইন ছিল। স্কোরলাইন ছিল ০-০। বল রিসিভ করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন এবং এই সময়েই লুটিয়ে পড়েন তিনি। বল হাঁটুতে লাগলেও সঙ্গেসঙ্গেই পড়ে যান এরিকসেন। তখনই সতীর্থ মার্টিন ব্রেথওয়েট এবং টমাস ডিলানি তাঁকে সাহায্য করতে ছুটে যান। ডিলানি মেডিক্যাল সাহায্যের জন্য কার্যত হাত নেড়ে ইঙ্গিত করতে থাকেন। অবস্থা অনুধাবন করতে পেরে ম্যাচ রেফারি এন্থনি টেলর দ্রুত জরুরি মেডিক্যাল পরিসেবার ইঙ্গিত দেন। টটেনহ্যামের প্রাক্তন তারকার যখন আপদকালীন চিকিৎসা চলছিল সাইডলাইনের ধারে, সেইসময় তাঁর জাতীয় দলের সতীর্থরা বেষ্ঠনী করে প্রার্থনা করতে থাকেন। স্ট্রেচারে করে এরিকসেনকে নিয়ে যাওয়ার সময় স্টেডিয়ামের ১৬ হাজার দর্শকদের সমস্বরে চিয়ার আপ করতেও দেখা যায়।

 

ডেনমার্কের রাজধানী শহর কোপেনহেগেনে আয়োজিত হয়েছিল এই ম্যাচ। ম্যাচের প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে এই ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে ছুটে আসেন ডেনমার্ক ফুটবল দলের চিকিৎসকেরা। তাঁদের চোখমুখ দেখে ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর বলেই মনে হচ্ছিল। তাঁরা এরিকসেনের বুকে হাতের তালু দিয়ে চেপে চেপে শ্বাস-প্রশ্বাস (সিপিআর সিস্টেম) স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিলেন। মাঠের মধ্যেই প্রায় ১৩ মিনিট ধরে চলে চিকিৎসা। কিন্তু, সেই চিকিৎসায় সাড়া না দেওয়ার কারণে এরিকসেনকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেইসঙ্গে ম্যাচটিকেও পরিত্যক্ত বলে ঘোষণা করা হয়। মিনিট পনেরো মাঠে প্রাথমিকভাবে সিপিআর (কার্ডিও পালমোনারি রিসাক্সিসেশন) পদ্ধতি প্রয়োগের পর দলের ফুটবলাররা দুইদিক দিয়ে কর্ডন করে স্ট্রেচারে করে তাঁকে মাঠের বাইরে নিয়ে যান ৷ হঠাৎ করেই এই ধরণের ঘটনায় স্তব্ধতা সব মহলে নেমে আসে ৷ পরিস্থিতি এমনই হয় যে, ম্যাচটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাধ্য হন রেফারি। টুইট করে উয়েফা জানিয়ে দেয়, মেডিক্যাল এমার্জেন্সি'র জন্য ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হচ্ছে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার স্বস্তির খবরও আসে যে, এরকিসেনের আর কোনও প্রাণ সংশয়ের ভয় নেই। টুইটারে বলা হয় যে, এরিকসেনের অবস্থা এখন স্থিতিশীল। মেডিক্যাল টিম ও ইউরোর পরিচালকদের তৎপরতায় তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।

 
প্রসঙ্গত, এদিন ম্যাচের শুরু দিক থেকেই দাপট ছিল ড্যানিশদের। আর ডেনমার্কের সেরা ফুটবলার এরিকসেনও এজন্য প্রচুর দৌড়াঁদৌড়ি করেছেন প্রত্যাশিতভাবেই। এদিকে, ম্যাচ স্থগিত করার পর উয়েফার বিবৃতিতে পরে আরো জানানো হয়, এরিকসেনের মেডিক্যাল ইমার্জেন্সির পরে দু’দলের ফুটবলার এবং ম্যাচ আধিকারিকরা ক্রাইসিস মিটিং করেন মাঠেই। আপাতত, এরিকসেনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ডেনমার্ক সরকারের তরফ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়, রিগস্পোতিলেট-এ চিকিৎসা চলছে তারকা মিডফিল্ডারের। আপাতত তিনি সজাগ এবং চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন।
পরে স্থগিত হওয়া খেলা প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে দু’দলের সম্মতিতে পুনরায় চালু হয় ম্যাচের ৪১ মিনিট (ওই সময়ে খেলা বন্ধ হয়েছিল ) থেকে। ম্যাচে অবশ্য ১৯৯২ সালের ইউরো জয়ী ড্যানিশ দল ০-১ গোলের ব্যবধানে ফিনল্যান্ডের কাছে হারে অপ্রত্যাশিতভাবে।

 

এদিনের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে শিলচরের বাসিন্দা ফিফার প্রাক্তন সহকারী রেফারি ও এআইএফএফের রেফারি আ্যসেসর মৃণাল কান্তি রায়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এধরনের উন্নত মানের মেডিক্যাল টিম থাকলে ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেনের মতো ফুটবলারদেরও প্রাণ ফেরানো সম্ভব। মৃণালবাবু বলেন, এধরণের ঘটনায় অনেক খেলোয়াড় মাঠে প্রাণ হারিয়েছেন, আবার মৃত্যকে হারিয়ে ফিরে এসেছেন অনেকেই। এর এক উদাহরণ ভারতের ফুটবলারেরও রয়েছে। জাকার্তায় এশিয়ান কাপ খেলতে গিয়ে মৃত্যুর কোল থেকে বেঁচে আসেন লাল-হলুদ (ইস্টবেঙ্গল) ডিফেন্ডার দেবোজিৎ ঘোষ। তিনি বলেন, ফিফার রেফারিরা সিপিআর পদ্ধতি বিষয়ে ওয়াকিবহাল। এজন্য আলাদা কোর্স থাকে। এই কোর্সের আওতায় হিউম্যান ফিগার দিয়ে তাদেরকে ডেমো দেয়া হয়। তাছাড়া এধরনের বড়মাপের প্রতিযোগিতায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকসরাও থাকেন। থাকে বিএলএস (বেসিক লাইফ সাপোর্ট) আ্যম্বুলেন্সের সুবিধাও। ফলে মাঠে বা হাসপাতালে নিয়ে যাবার পথে ক্রিটিক্যাল সেবা দেয়া সম্ভব হয়। তিনি এও বলেন, এদিনের ঘটনার পর ক্যাট(ক্যাটাগরি) ফাইভ রেফারিদেরও এখন থেকে সিপিআর পদ্ধতি শেখানোর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনায় উঠে এসেছে। বিষয়টি অবশ্যই সময়ের দাবি বলে মনে করেন বদরপুর শহরের বাসিন্দা শিলচর ডিএসএ-র জাতীয় রেফারি নির্মল ভট্টাচার্য। এদিনের ম্যাচ স্থগিত ঘোষণা দেবার পরও আবার কীভাবে ম্যাচ শুরু হলো, এবিষয়ে জানতে চাইলে মৃণালবাবু ও নির্মল ভট্টাচার্যের বক্তব্য একই। বলেন, এধরণের যেকোন ম্যাচের বিষয় সম্পূর্ণভাবে আয়োজকদের উপর নির্ভর করে। এটা যেহেতু আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি খেলা। অতএব, সেখানে আরো অনেক কিছু জড়িয়ে রয়েছে। টিকিট কেটে দর্শকরা মাঠে ঢুকেছেন তাদের বিষয়টি সর্বাগ্রে দেখা হয়। তাছাড়া, আবার আরো একটি ভিন্ন দিনে ম্যাচ আয়োজন তো চাট্টিখানি কথা নয়। সেদিন, এরিকসেনের প্রাণ সংশয় কেটে যাওয়াতে সব ঝামেলা থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচেন আয়োজক উয়েফা কর্মকর্তারা। ফলস্বরূপ, এদিনই ঘন্টা দুয়েক পর পুনরায় ম্যাচ শুরু করতে কৃতকার্য হন তারা। এজন্য, দুই দলের খেলোয়াড়দের গা গরম (ওয়ার্ম আপ) করার জন্য বাড়তি সময় দেওয়া হয় এবং তাদের সবুজ সঙ্কেতের পর বল পুনরায় মাঠে গড়ায় বলে জানান বরাকের গর্বদ্বয় মৃণাল কান্তি রায় ও নির্মল ভট্টাচার্য।

 
এখানে উল্লেখনীয় বিষয় হলো, এদিন এই অবাঞ্ছিত ঘটনার পর এরিকসেনের জন্য প্রার্থনার মঞ্চ হয়ে উঠে ইউরো ফুটবলের আসর । সতীর্থরা বৃত্ত রচনা করে এদিন, তারকা মিডফিল্ডার এরিকসেনের ঘটনার গোপনীয়তা রচনা করেন। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য দর্শকরা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন ফ্লেক্স ব্যানার। প্রকৃতই, বাকরুদ্ধ, চোখে জল এনে দেওয়ার মত এই বিরল ফুটবল-বিজ্ঞাপনের ঘটনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে ফুটবল বিশ্ব। পরবর্তী ম্যাচে তো, বেলজিয়াম তারকা লুকাকু গোল করে বলে দিলেন, “ক্রিস, আই লাভ ইউ।” জার্মানি স্কোয়াড থাম্বস আপ সাইন দেখিয়ে মাঠে নামে। সত্যি, একমাত্র খেলার অঙ্গনই দেখাতে পারে এমন নজিরবিহীন দৃশ্য।