মাঠে ময়দানে

ভোরের দেশে, আলোর খোঁজে

মৈত্রায়ণ চৌধুরী

০৯ আগস্ট ২০২১

Maitrayan Choudhury.jpg
WhatsApp Image 2021-08-07 at 10.57.15 PM.jpeg

আমার মুঠোফোনের যোগাযোগ তালিকায় যেক'জন বন্ধু আছেন, যারা ক্রিকেটের বাইরে গিয়েও সব খেলাকে ভালোবাসতে পারেন, তাদের নিয়ে একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করেছিলাম টোকিও অলিম্পিক শুরু হওয়ার দশ বারো দিন আগে। গ্রুপের সব সদস্যরা প্রথমে আমায় ধন্যবাদ জানালেন, তারপর অতি অবশ্যই প্রথা মেনে শুরু করলেন অলিম্পিক খেলায় আমাদের হতাশার গল্প। আসলে ভেবে দেখলে বিশ্বমঞ্চে, বিশ্বমানের তারকাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের অবস্থান অনেকটা ফ্লুরোসেন্ট বাল্ব এর নীচে জোনাকি পোকার আলোর মতো। আমরা এক ক্রীড়া উদাসীন দেশের নাগরিক। আমাদের জিনগত গঠন-ও খেলাধূলায় দুর্বলতার জন্য বহুলাংশে দায়ী। দারিদ্র্য, অনুন্নত পরিকাঠামো তার সাথে যোগ হয়ে অলিম্পিক এর পদক তালিকায় মন খারাপ করে নীচে বসে থাকে। এই অনুজ্জ্বল উপস্থিতি এক বৃহৎ জনসংখ্যার দেশের দিশাহীন নীতির ফল নয় কি? তাই, বিশেষ করে ব্যক্তিগত ক্রীড়ায় যেসব খেলোয়াড় নিজস্ব  দক্ষতায় পদক জিতে দেশের পতাকাকে মেলে ধরেন, তাদের জন্য কোন বিশেষণ বা উপাধি-ই যথেষ্ট নয় বলে আমার মনে হয়।
 

এবারে আমাদের ঝুলিতে এলো সাতটি পদক, ভারতের অলিম্পিক ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রদর্শন। দেশবাসীর সাথে হয়ে, আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্যরাও অনেকটাই উৎফুল্ল এবং আলোচনার রেশ এখনও কাটেনি। এবং স্বাভাবিক ভাবেই কেন্দ্রবিন্দু নীরজ চোপড়া। এবং অবশ্যই বাকি পদক প্রাপ্ত রাও আছেন আলোচনায় - লভলীনা, বজরং, সিন্ধু, মীরাবাঈ, রবি দহিয়া, এবং হকি দল। কিন্তু শুধু পুরুষ নয়, অত্যন্ত ভালো প্রদর্শন করা মহিলা দলও। এবং তাঁর সাথে একটুর জন্য পদক মিস করা অন্যান্য খেলোয়াড় রাও যেমন গলফে অদিতি অশোকের পুরো সময় দ্বিতীয় স্থানে থেকে শেষ মুহূর্তে চতুর্থ হওয়া।

আজ সকালে চা-র কাপ হাতে  খবরের কাগজের পেছন পাতায় চোখ রাখতেই চমকে উঠলাম। টোকিও অলিম্পিক এ কুস্তিতে রূপা জয়ী রবি কুমার দাহিয়ার গ্রামে ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পরিষেবা বজায় থাকে মাত্র দু'ঘন্টা। তারপর সব অন্ধকার-- অনেকটা আমাদের ভাগ্যের মতোই। এখানে মনে রাখতে হবে রবি-র ছোট্ট গ্রাম, নাহরি, ভারতকে অলিম্পিক মঞ্চে তিনজন কুস্তিগীর উপহার দিয়েছে। মহাবীর সিং (১৯৮০ মস্কো, ১৯৮৪ লস অ্যান্জেলেস), অমিত দাহিয়া (২০১২ লন্ডন), তৃতীয় জন রবি নিজে। জীবনের প্রাথমিক কিছু চাহিদা থেকে চূড়ান্ত বঞ্চিত হয়েও যে মানুষটি পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে গলায় রূপার পদক ঝুলাবার সামর্থ রাখে, সত্যিকারের পরিকাঠামো ও যত্নে সেই মানুষটি কী সম্পদে পরিণত হতে পারত তা ভাবতেই অবাক লাগে। ঠিক একইভাবে, আমাদের রাজ্য তথা গোটা মানচিত্রের গর্ব, চলতি অলিম্পিক এর ব্রোঞ্জ জয়ী বক্সার লভলীনার গ্রামের পাকা রাস্তার কাজে হাত দিয়েছে সরকার-- তাঁর বর্তমান সাফল্যের পর পরই।
 

শুরু হোক এবারের ট্র্যাক ও ফিল্ডের কথা নিয়ে। নীরজ স্বর্ণ পদক জিতেছেন এবং সেটা নিয়ে অনেকের প্রত্যাশাও ছিল কারণ শুধু তাঁর এই গেমস এর প্রদর্শন নয়, তিনি একাধারে যুব বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, যুব বিশ্বরেকর্ডধারী, কমনওয়েলথ ও এশীয় চ্যাম্পিয়ন। হিমা দাস আসতে পারেন নি। তিনিও যুব বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ছিলেন। হিমার অনুপস্থিতি রীতিমতো কষ্টের। অঞ্জু ববি জর্জ ভারতের একমাত্র  ট্র্যাক ও ফিল্ডে বিশ্বজয়ী। কিন্তু তারপর আর নয়া চেহারা নেই। নতুন বিজয়ী মুখ চাই। তবেই নতুন প্রজন্ম এই ট্র্যাক ও ফিল্ডে আসতে চাইবে। আর এটাই সবচেয়ে সহজ জায়গা খেলোয়াড় তৈরি করার। এই বিভাগে পদক এলে অ্যাথলেটদের জন্য বিনিয়োগও হাত ধরে আসবে, সেটা খুব প্রয়োজন। ভারতের প্রাথমিক বিদ্যালয় স্তর থেকে নজর দিলে এই ক্ষেত্রে অনন্ত সম্ভাবনা আছে।


এবার সবাইকে চমকে দিয়েছে আমাদের দুটো হকি দল। টোকিও অলিম্পিক এ ভারত-ই একমাত্র দেশ-- যার পুরুষ এবং মহিলা দুটো দলই সেমিফাইনালে উঠেছে। ৪১ বছরের পদক খরা কাটিয়ে পুরুষ দল ব্রোঞ্জ জিতে হকির নবজাগরণের সূচনা করেছে। সেই ধারা এবার মহিলা দলকেও অব্যাহত রাখতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা সলিমা টেটে, নভনীত কৌর, সবিতা পুনিয়া, রাণি রামপাল, বন্দনা কাটারিয়া, গুরজিত প্রমুখ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয়  মহিলা হকির এক এক জন আইকন। গ্রুপ স্তরের প্রথম তিনটি ম্যাচ হেরে গিয়েও প্রবল পরাক্রমে ফিরে এসে এই দল প্রমাণ করেছে তাদের ধাতুর ধাত ঠিক কতটুকু আলাদা। আসলে প্রবল দারিদ্র্যের সাথে লড়তে লড়তে এরা মহাযোদ্ধাদেরও আর পরোয়া করে না। 


তবে শুটিং এবং তীরন্দাজিতে আমাদের প্রদর্শন সত্যিই সবাইকে আশাহত করেছে। প্রচুর টাকা পয়সা খরচ করে শুটিং পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরও ফল আশানুরূপ হল না। অভিনব বিন্দ্রা, গগন নারাং এর সার্থক উত্তরসূরী প্যারিস অলিম্পিক এর আগেই খুঁজে নিতে হবে। আমার মনে হয়, অনুন্নত অঞ্চল থেকে অলিম্পিক এর মতো বড় আসরে খেলতে এসে আমাদের দেশের অনেক প্রতিযোগীই স্নায়ু চাপে ভোগেন। অনেক বছর আগে, Sports Authority of India (SAI) এক আদিবাসী যুবক লিম্বারাম এর মধ্যে সুপ্ত তীরন্দাজি প্রতিভার সন্ধান পেয়ে তাঁর পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করে। ফলও আসতে থাকে হাতে নাতে। অনেক প্রতিযোগিতায় লিম্বারাম স্বীয় প্রতিভার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। খুব সম্ভবত বার্সেলোনা অলিম্পিক এর আগে বিশাখাপত্তনমে, সাই-য়ের সদস্যরা লিম্বারামের প্রস্ততির ব্যবস্থা করে দেন। কারণ এটি সমুদ্র তীরবর্তী শহর, যেমনটি বার্সেলোনা। তাই বাতাসের বিপরীতে নিজের ক্ষমতাকে ঘষামাজা করার জন্য লিম্বারাম আদর্শ জায়গা এবং সুযোগ- সুবিধা পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই অলিম্পিকে আসল সময়ে তিনি চূড়ান্ত ব্যর্থ হন। হয়তো আদিবাসী লিম্বারাম এই আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে নিজের স্নায়ুকে বশে রাখতে পারেন নি।
 
মীরাবাঈ চানু, ভারোত্তোলনে নিজের সুনামের সাথে সমান্তরাল পথ অতিক্রম করেছেন। টোকিও-তে তাঁর হাত ধরেই ভারত প্রথম পদকের সন্ধান পেয়েছে। অন্যদিকে ব্যাডমিন্টানে সাইনা নেহওয়াল (ব্রোঞ্জ)-এর  পর সাফল্যের পালক আসে সিন্ধুর মুকুটে। রিও অলিম্পিক এ, পি.ভি সিন্ধু ফাইনালে উঠেও সোনা জিততে পারেন নি। তাঁর অসাধারণ লড়াই আটকে থাকে রূপোতেই। চারবছর পর এই টোকিওতে, সিন্ধুর জয়ের ক্ষুধা একই থেকে গেছে। গোটা প্রতিযোগিতায় শুধু সেমিফাইনালেই তিনি হোঁচট খেয়ে ফাইনালের দৌঁড় থেকে ছিটকে যান। তবে ব্রোঞ্জ ম্যাচে দুর্দান্ত ভাবে ফিরে এসে আমাদের পদক তালিকাকে সবল করেন। পর পর দুটো অলিম্পিক এর পদক বিজয়ী সিন্ধু, নিঃসন্দেহে ভারতের শ্রেষ্ঠতম ক্রীড়াবিদের আসনে ভাস্বর থাকবেন চিরকাল। সিন্ধু যদিও ইতিমধ্যে  জানিয়ে দিয়েছেন পরবর্তী প্যারিস অলিম্পিকেও তিনি কোর্টে নামবেন, তবু বয়েস প্রতিটি ক্রীড়াবিদের জীবনেই থাবা বসিয়ে আঘাত করে তাঁর রিফ্লেক্স-কে। তাই উঠতি বরুণ কাপুর, তানিয়া হেমন্ত এর ডেনমার্ক মাস্টার ব্যাডমিন্টান প্রতিযোগিতার প্রদর্শনের দিকে তাকিয়ে থাকব আমরা। হয়তো আগামী অলিম্পিক এর ব্যাডমিন্টান মশালে আগুন জ্বালাবেন এরাই। তবে টোকিওতে ভারতের পুরুষদের ডবলস ব্যাডমিন্টান দলের জন্য দুঃখ হয়। তিনটি ম্যাচের দুটিতে জিতেও তাদের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়া হয় নি। আশা করব, দেশবাসীর শুভেচ্ছা মাথায় নিয়ে চিরাগ শেঠি-সাত্বিক রেড্ডি জুটি প্যারিসে পদক ছিনিয়ে আনবেন।

 
এখন চলে আসি টেবিল টেনিসে-- অন্যান্যবারের মতো এবারেও সঙ্গী সেই ব্যর্থতাই। মনিকা বাত্রা, সুতীর্থা মুখার্জি, শরথ কমল সবার কাছেই আরো ভালো কিছুর আশায় ছিলাম আমরা। তবে পরিকাঠামোর উন্নতি না হলে সেই মানের ফলের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে আরো কয়েক বছর। শিলিগুড়ি বা বরাকের উধারবন্দে নিজস্ব উদ্যোগে যে টেবিল টেনিস ক্লাব বা টিটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা ছড়িয়ে পড়তে হবে পুরো দেশে। তাহলেই হয়তো নিরাশার ফলাফলগুলো উড়ে যাবে মাঝ গঙ্গায়। 


ডিসকাস থ্রো-তে কমলপ্রীত কৌরের প্রদর্শন মনে থাকবে অনেকদিন। ফাইনালের সন্ধেবেলার বৃষ্টি বা ফাউল থ্রো-র চক্করে না পড়লে ফল আরো ভালো হতো। 
 

সেদিন মাছ বাজারে পরিচিত এক ভদ্রলোক বলছিলেন আমায়, 'দেখছেন, অলিম্পিকে প্রায় প্রতিটি বিভাগেই প্রতিযোগী আছেন আমাদের দেশের, আগে হতো এমন? রোজ টিভি চালিয়ে পেতেন ভারতীয় অ্যাথলিটদের?' অটোয় চড়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে চিন্তা করলাম। ঠিকই তো, দুজন বক্সার একই সাথে দুটো ম্যাচ খেলছেন বা একই দিনে দুটো বিভাগে পদক জিতেছে আমাদের প্রতিযোগীরা, তেমন উদাহরণ আর আছে কি? আমার দর্শক হিসেবে অলিম্পিক অভিযান শুরু ১৯৯২ সাল থেকে, শূন্য হাতে। আটলান্টায় ১৯৯৬ সালে লিয়েন্ডারের হাত ধরে ব্রোঞ্জ জুটল, তারপর থেকে প্রতি অলিম্পিকেই অল্প হলেও কিছু না কিছু জুটছে। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে ছটি পদকের গর্বে ভেসে গেছিল গোটা দেশ। টোকিও লন্ডন-কেও ছাড়িয়ে গেছে। তারমানে আমরা থমকে নেই। খেলাধুলায় উন্নতির লেখচিত্রে অল্প হলেও মাথা তুলছে ভারতবর্ষ। সঠিক সুযোগ, পরিকাঠামো, পরিকল্পনা, অর্থ সাহায্য, স্থির লক্ষ্য--- আমাদের এক সোনার খনির সন্ধান দিতে পারে। এবারে পাখীর চোখ হোক প্যারিস ২০২৪ ... শুধু খেলোয়াড় দের নয়, সুযোগ সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার পেছনের ফেডারেশন গুলোরও ...