সাহিত্য পত্র

বাৎসরিক


তৃণময় সেন

trinomoy sen_edited.jpg

পুরোহিত মন্ত্র শুরু করতেই টিনের চালে সরব হয়ে উঠলো ভাদ্রের আকাশ। বেশ বড়বড় ফোঁটা ঝরছে। দু'দিন থেকেই কিছুটা বেলা হওয়ার পর বৃষ্টি শুরু হচ্ছে। ঘাড় তুলে ঠাকুরকাকার দিকে চাইলে বর্ষীয়ান ভজহরি চক্রবর্তী ক্ষান্ত হন। দু'জন মুখোমুখি বসে থাকলেও তুমুল বর্ষণের কাছে হার মানতে হয় তাকে। চিৎকার দিয়ে মন্ত্র পড়লেও তা সুমেধের কান অবধি যে পৌঁছাবে না, সেই বিষয়ে একপ্রকার নিশ্চিত তিনি। সুমেধ আর ভজহরির মাঝের গজ তিনেকের মধ্যে স্টিলের ছোট দু’টো বাটিতে যথাক্রমে দুধ আর দই, কাঁচের শিশিতে মনোরমা ঘি, আর একটা বিশাল কাঁসার থালাতে আছে একমুঠো তিল, মধু, চিনি, ধূপ, দূর্ব্বা আর তুলসী। আর একটা পাশে বেশ সুন্দর বাঁশের ধুচুন অর্ধেকটা ভরে আছে সুগন্ধি চালে। তার উপরে দু'টো আলু, কোয়াস আর বেগুনের মাথার উপরে প্রথমে ধুতি, তার পিঠে লাল গামছা। দেখতে কিছুটা ঘোমটার মতো দেখাচ্ছে। আজকে সতেরো ভাদ্র। যার কারণে আজকে এই আয়োজন সে আজকের দিনেই দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। সে সুমেধ আর সৃজার বাবা সমীরণ দাস।

বেশ কিছুক্ষণ ধরে বসে থাকা সুমেধ এইবার কুশের আসনের নিচে টাটকা বৃষ্টির জল টের পাচ্ছে। একডজন টিনের অস্থায়ী আচ্ছাদন বৃষ্টির ফোঁটা থেকে সরাসরি রক্ষা করতে সক্ষম হলেও সরীসৃপের মতো বেয়ে চলা জলকে সামাল দেওয়ার কথা মাথায় আসেনি। ভজহরি ততক্ষণে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে গিয়ে বসেছেন। বাৎসরিক হলে কী হবে! শ্রাদ্ধানুষ্ঠান মাঝপথে ফেলে উঠে গেলে বিদেহীর চরম অকল্যাণ! কাদাজলের মাঝে ঠায় বসে থাকে সে। অনেকক্ষণ থেকেই ভেজা ভেজা লাগছিল। আসলে মাটিতে বসলে এমনটা হয়। বছর আগে এই অভিজ্ঞতা প্রথমবারের মতো হয়েছিলো। শ্মশানের কাজ সেরে পুকুরে ডুব দিয়ে আসার পর, দু'খন্ড সাদা থানের কাপড় আর বসার জন্য কুশের আসন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাকি রাতটা আর ঘুম আসেনি। সৃজা বিছানার একপাশে শুয়ে পড়লেও সুমেধ আর তার মা বসেই কাটিয়ে দিয়েছিলো পুরো রাত। কয়েক দফায় চোখ দুটো ভিজে তারপর নিজে থেকেই শুকিয়েছে। ঝপ করে নেমে আসা সহসা অন্ধকারে দুনিয়াটা লাটিমের মতো বনবন ঘুরছিলো। প্রথম দু'দিন ইন্দ্রিয় সাড়া দেয়নি। ক্ষুধা-তৃষ্ণা... এমনকি কারও কথাও কানে আসছিলো না। নানা ঘটমানতায় সময় চলে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তিনটে মানুষ হঠাৎ করে কোথাও যেন আটকে গেছিলো। এগোতে পারছিল না কিছুতেই। এতো আপন মানুষটিকে পেছনে ফেলে এগোনো যে অসম্ভব।

রোজকার মতো দোকানের ঝাঁপ ফেলে স্কুটিতে বসেছিল সমীরণ। টিপটিপ বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করেনি। এমন দূর্যোগের দিনে পাথর বোঝাই ট্রাকখানার একটা হেডলাইট খারাপ হয়ে যাওয়াতে বিপত্তিটা ঘটলো! সমীরণ ভেবেছিলো বড়জোর তিন চাকার অটো হবে। সামনে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ার পরেও দিব্যি উঠে ড্রাইভারকে কড়া কথা শুনিয়ে এমনকি কেস করার হুমকি দিয়ে বাড়ির পথ ধরেছিলো সে। বাড়ির ভিতরে ঢুকেই পুকুরপাড়ে নিয়ন্ত্রণ হারায়। পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে তৎক্ষণাৎ হাঁক পাড়লে কোনো জবাব আসেনি। মালবিকা দৌঁড়ে বের হলে সুমেধ টর্চ নিয়ে মায়ের পিছনে যায়। ওরা ভেবেছিল হয়তো পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। চিৎকার-চেঁচামেচিতে লোকজন জড়ো হলে সবাই ধরপাকড় করে ঘরে নিয়ে আসে। বাতির আলোয় কান দিয়ে তরল গড়াতে সুমেধই প্রথম দেখেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে নাক দিয়ে কয়েক ফোঁটা রক্ত গড়াতে দেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল মালবিকা। সমীরণ আর ওঠেনি। ঘন্টাখানেকের মধ্যে ডাক্তার আসার পর বিষয়টা নিশ্চিত হয়ে যায়। প্রতিবেশীরাও ঘুমায়নি সারা রাত। ওদিকে ট্রাকটাও আটক করা হয়েছিল। অবিশ্বাস্য ঘটনাটিকে মনেপ্রাণে দুঃস্বপ্ন বলে বিশ্বাস করতে চেয়েছে মালবিকা। শুধুই মনে হচ্ছিল এই বুঝি তার ঘুম ভাঙলো। কিন্তু কঠোর বাস্তবতাকে সাথে নিয়ে আরেকটা নিষ্ঠুর সকাল এসেছিলো। পর পর এতোগুলো সকাল পেরিয়ে আজ বছরপূর্তি। মালবিকার এখন মনে হয় যে অতীতটাই স্বপ্ন ছিল। বাস্তবে পা রাখার বেশিদিন হয়নি তার।

পরদিন সকালে পঞ্জিকা সমেত এসে দ্বিপাদ দোষের ব্যাপারটা খোলসা করেন ভজহরির বড় ভাই বৈকুণ্ঠনাথ। বিষ্ণুপূজা, শিবপূজা ছাড়াও বেশ কয়েকটা বিধান দেন তিনি। মৃতে দোষ থাকায় অশৌচের নিয়মাবলীতে কোনো শিথিলতা চলবে না। সবকিছু নিষ্ঠার সহিত কঠোরভাবে মানতে হবে। অথচ পুরোহিতগিরি ছাড়া জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এই বৈকুণ্ঠনাথই সমীরণের হাত দেখে সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের কথা বলেছিলেন। এটাও জানিয়েছিলেন যে পঁচাশি বছরের আয়ু আছে সমীরণের। ফাঁড়া আছে বটে, কিন্তু তা এখনই নয়। বয়স সত্তর পেরোনোর পরে। বর্ষাকাল শেষে প্রকৃতিতে খুব হালকা হলেও শরতের ছোঁয়া লেগে গিয়েছিলো। দু'বেলা স্নানের পরে নিয়মানুযায়ী ভেজা কাপড় গায়ে শুকাতে গেলে প্রথমে সর্দি, তারপরে মা-ব্যাটা দুজনেরই জ্বর হয়েছিলো। গায়ে কাপড় কি না শুকালেই নয়! ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়লে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানটাই বা কে করবে! সবকিছু জেনেবুঝেও কেন যে নীরবে সব মেনে নিচ্ছিল, তা মালবিকা জানে না। একটু পরপরই পথের পানে চেয়ে রইতো সে। এই বুঝি সমীরণ স্কুটি নিয়ে বাড়ি ঢুকলো। সাদা কাপড় গায়ে দেখে রাগারাগি করলো তার ওপর।

শহরের শো-রুমে বাবার সাথে গিয়ে বাইক পছন্দ করে এসেছিলো সুমেধ। উচ্চ-মাধ্যমিকে ফল ভালো করলেও মায়ের রাগারাগি ও জেদের কাছে বাবাকেও হার মানতে হয়েছিল। বাইকের জন্য আরও দু'বছর অপেক্ষা করতে হতো। এখন সকাল-বিকাল দু'বেলা করে দোকানে বসতে হয়। কলেজ জয়েন করলেও যাওয়া-টাওয়া তেমন একটা হয় না। বোনের স্কুল ছুটি হলে দোকান থেকে বেরিয়ে সৃজাকে সাথে করে খেতে আসে। বিকেলবেলা খেলতে যাওয়া, ঘুড়ি ওড়ানো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া সব কিছুই বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি পছন্দের খাবার, টিভির রিমোট নিয়ে বোনের সাথে খুনসুটিগুলোও কেমন যেন ফিকে হয়ে গেছে। সৃজাও বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকে। স্কুল থেকে ফেরার পথে এমনকি বাড়িতেও তেমন একটা কথাবার্তা বলে না। সবকিছু আগের মতো করে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে সে। বাবা মারা যাবার পরে সবাই খুব কান্নাকাটি করলেও সে তেমন একটা কাঁদেনি। আত্মীয়দের শুকনো সহানুভূতি বা করুণা কোনোটাই তার চাই না। হঠাৎ করে বড় হয়ে যাওয়াটা মনে মনে টের পায় সুমেধ। বাবা মারা যাওয়ায় সপ্তাহখানেকের মাথায়ই জেঠুর জমিজমা থেকে শুরু করে সম্পত্তির হিসাব বোঝানোর ব্যাপারটা তার মোটেই পছন্দ হয়নি। তবে কান্না পায় না বললে ভুল হবে, কান্নাটা কেমন একটা বিষণ্ণতার শক্ত খোলস পরে ঘাপটি মেরে আছে। চাইলেও আসে না। হাউহাউ করে না হোক অন্তত নিঃশব্দে একটু কাঁদতে পারলে হয়তো ভালো হতো! ধূসর কালো মনের আকাশ ঝরে পড়লে হয়তো একটু শান্তি পেতো সে।

"সোমত্ত মেয়ে রেখে বাপটা মারা গেলো! বাপ মরা মেয়েটার বিয়ে-টিয়ে কেমন করে হবে কে জানে?"

এইসব কানাঘুষো সৃজার কানেও গেছে বলে ধরেই নিয়েছে মালবিকা। আগামী বছরে মাধ্যমিকে বসবে সৃজা। সমীরণ নেই বলে এই বয়সেই বিয়ে নিয়ে ভাবতে হবে! পড়াশোনা তো বটেই, এইসব কথাবার্তা কৈশোর মনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু প্রতিবাদ করে কতজনের মুখ বন্ধ করাতে পারবে মালবিকা! ননদ থেকে শুরু করে পিসিশাশুড়ি সবাই তো কাছের জন!  

 

"সংসার করার জন্য কপাল চাই গো বৌ! সবার ভাগ্যে সুখ সয় না!"

শুধু এই কথাটুকু জানাতে সমীরণের বড় মাসি ফোন করেছিলেন। উত্তরে কিছু বলেনি মালবিকা। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পরে ইচ্ছে করছিলো ফোনটাকে তুলে আছাড় মারবে। মাছস্পর্শের পরের দিন গ্রামের বাড়ি থেকে আসা ননদ নিজের পছন্দমতো যখন আলমারি থেকে বের করে তার সাজগোজের জিনিস ব্যাগে ভরছিল তখনও কিছু বলেনি মালবিকা। জাগতিক জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সব কিছু থেকে তখন সে অনেক দূরে চলে গেছিলো। কিন্তু আজকে এইসব ভাবলে মনটা বিষিয়ে ওঠে। এই তাহলে আপনজনের ভালোবাসার ছিরি!

"সময়টা কঠিন চলছে, বছরখানেক পরে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।" প্রায় সবার মুখে অনেকবার এই কথাটা শুনে মালবিকা-সুমেধ-সৃজারাও এটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। প্রাণের মানুষটার স্মৃতি হৃদয়ের চিলেকোঠায় সযত্নে রেখে এইবার এগোতে হবে। নতুন উদ্যমে আবার শুরু করতে হবে জীবন। এতোদিন বোঝানোর পর কিছুটা হলেও মনটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে মালবিকা। সুমেধ-সৃজার মধ্যে সেই পুরোনো দিনের খুনসুটি দেখা যাচ্ছে। সামনে পুজো, এইবার কাপড়-জামা কিনতে কোনো বাধা নেই। সমীরণের জীবন বীমার টাকাটাও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে। বাৎসরিকের আগে অবধি সবকিছু ভালোর দিকেই এগোচ্ছিল। অনুষ্ঠানের দু'দিন আগে থেকেই স্মৃতিরা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে ব্যথিত করে দেয় হৃদয়টাকে। তবে এইবার তা অনেকটাই সংযত। আগের মতো এবার আর দিশেহারা মনে হচ্ছে না।

ব্যতিক্রম ঘটে অনুষ্ঠানের সকালবেলা। বাৎসরিক ক্রিয়া সম্পাদন করতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৈকুণ্ঠনাথের এইবার আসা হয়নি। এসেছেন তার অনুজ ভজহরি চক্রবর্তী। আত্মীয়-স্বজনরাও যথারীতি এসেছেন। সকাল থেকেই আকাশে ছিল ধূসর মেঘের আনাগোনা। সেই দুর্দিনের স্মৃতি রোমন্থন করে নানা অছিলায় মালবিকা-সুমেধদের দুর্ভাগ্যকেও দায়ী করা হচ্ছে। সৃজা জন্মের বহু বছর বাদে মানে সমীরণের মারা যাওয়ায় বছর শরীর-স্বাস্থ্যের উন্নতি হওয়াকে বড় জা কুলক্ষণ হিসাবে গণ্য করলেন। হঠাৎ করে স্ত্রীর গায়ে-গতরে উন্নতি হওয়াটা নাকি স্বামীর পক্ষে অমঙ্গল। কাজের ফাঁকে মাকে চোখের জল ঝরাতে দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি সৃজা। যদিও সেটা কারও চোখে পড়েনি। ওদিকে মন্ত্র পড়া বন্ধ করে পুরোহিত মশাই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলেও রীতিমতো কাদা-জলের উপরে বসে আছে সুমেধ। পা দুটো ভিজে অবশ হয়ে গেলেও শাস্ত্রীয় বিধি-বিধানের সামনে নিরুপায় সে। ভেজা কাপড় গায়ে শুকানো, একসেদ্ধ খাওয়া, তেল-সাবানহীন খসখসে মুখ-চোখ... গতবারের স্মৃতিগুলো তাজা হয়ে উঠছে। মা একটু দূরে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অসহায়-বিমর্ষ চেহারার দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারে না সে। তার পাশ ঘেঁষে জলচকিতে বসে আছে সৃজা। বাড়িতে এতো মানুষজন থাকতে আর কেউ নেই তাদের পাশে। আধাঘন্টা মুষলধারে ঝরে একটু শান্ত হয়েছে আকাশ। চেয়ারে বসেই বাকি মন্ত্রাবলী সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ঠাকুরকাকা। আবার শুরু করতে যাবেন ঠিক তখনই কুশের আসন ছেড়ে উঠে পড়ে সুমেধ। কেউ কিছু বলার আগে হনহন করে সোজা ঘরে ঢুকে পড়ে। তাকে অনুসরণ করে মালবিকা-সৃজা। ভেতর থেকে দরজার খিল তুলে দেয়। মা আর বোনকে জড়িয়ে ধরে ভেঙে পড়ে কান্নায়। মালবিকার চোখে আজ জল নেই। পরম স্নেহ-আদরে ছেলের মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।

হাজার চেষ্টাতেও এতদিন হৃদয়ের বরফ গলেনি। কান্নাটার খুব দরকার ছিল, সুমেধ জানতো। অনেকটা কেঁদে ফেলে মনটা হালকা হয়। বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস নেয় সে। নতুন ধুতি পরে বাইরে বেরোয় সে। বাবা তাকে জল-কাদা মাখা ভেজা কাপড়ে নিশ্চয় দেখতে চাইতেন না। হালকা কানাঘুষো চলতে থাকলেও কেউ আর কিছুই বলে না। বিনা প্রতিবাদে আবার মন্ত্র পড়া শুরু করেন ভজহরি।