সাহিত্য পত্র

অন্নপূর্ণা

মহাশ্বেতা দেব

'আজকে কি রান্না হল রে বাতাসি।বুধি খেয়েছে তো পেট ভরে। পিউটা কাল চলে যাবে ভাবলেই কষ্ট হচ্ছে। পুজোর ছুটিতে লোকে বাড়ি আসে। মেয়েটা যে কি না ঘুরতে যাবে পুজোতে। কোনো মানে হয় তুই বল। --এক শ্বাসে কথাগুলো বলে থামলেন জয়া। বাতাসি তখন ব্যস্ত জয়ার মশারি টানাতে। এই কয়েকটা প্রশ্ন প্রত্যকে বেলায় বাতাসিকে করেন জয়া। উনার সব প্রশ্নের উওর দেওয়ার ক্ষমতা বাতাসির নেই। তাই কিছুই না বলে রাতের ওষুধ আর জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিল। ঢকঢক করে জল খেয়ে আরেক গ্লাস জল দিয়ে ওষুধটা খেলেন জয়া। লাইট অফ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে নিজের বিছানায় উঠে এল সে।

   

সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর এই ফোল্ডিং সিংগেল খাটটাই ওর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। সারাদিনের পরিশ্রমের পরও সবসময় ঘুম আসে না বাতাসির চোখে। এই যেমন আজকেও আসছে না। আশ্বিন মাস এটা। বেশ বুঝতে পারে বাতাসি। শিউলির গন্ধ পাচ্ছে বেশ কয়েকদিন থেকেই। নিজের ব্যস্ততারও শেষ নেই। জয়ার ঘরটা রয়ে গেছে পরিস্কার হয়নি এখনও। বাকীদের ঘর ঝাড়া, পর্দা, বেডকভার ধোওয়া প্রায় শেষ করে এনেছে। হিসেব করে বাতাসি মহালয়ার আর দেরি নেই খুব। এর আগেই জয়ার ঘরটা ঠিকঠাক করতে হবে।জয়ার জন্যই এবাড়িতে দেখতে দেখতে তার পাঁচ বছর হয়ে গেল। দাদা বৌদি দুজনেই চাকরি করে। মেয়ে পিউ আর ছেলে রোহন থাকে বাইরে। তাই জয়াকে দেখার জন্যই বাতাসি এসেছিল এই বাড়িতে। আগে বাতাসি শুধুই জয়ার দেখাশুনা করত। তখন প্রায় শয্যাশায়ী ছিলেন জয়া। এর মাত্র কয়েক মাস আগে জয়ার স্বামী মারা গেছেন। ফলে একদিকে একাকীত্ব আর অন্যদিকে লিভার আর আর্থাইটিসের অসম্ভব বাড়াবাড়ি। সব মিলিয়ে তার অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠে। ঠিক তখনই বাতাসি এসেছিল এই বাড়িতে।

 

বাতাসির জীবনটাও বড় অদ্ভুত। জীবন পাথরে ঠোকর খেতে খেতে আজ এই বাড়িতে এসেছে সে। অতীত টাকে মনে করতেই চায় না বাতাসি। সেখানের সবগুলো মুখ তার কাছে রাক্ষসে মত লাগে। একমাত্র দিদা ছাড়া। বাতাসি জন্মের পরই মা চলে যায়। বাবা আর সৎ মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে মামা বাড়িতে থেকেছিল বেশ কিছুদিন। কিন্তু দিদার চলে যাওয়াতে সেটাও শেষ। পেটে বিদ্যে বলতে ক্লাস এইট। কোনোরকমে স্বাক্ষর করতে পারে। মামাই এই কাজের খোঁজ এনে দিয়েছিল। মাসে মাসে মামাকেও কিছু টাকা দিতে হয়। 
   

আজ কয়েকদিন থেকে দিদাকে খুব মনে পড়ছে বাতাসির। দিদাটা খুব আদর করত। নিজে না খেয়ে খাওয়াত। তবে নিজে খেতে খুব ভালবাসত। দাঁত ছিল না তাও মাংস খেতে চাইত। ইলিশ মাছ খাবার বায়না করেছিল মরার আগে। বাতাসি কথা দিয়েছিল খাওয়াবে কিন্তু পারেনি। মাটির মিষ্টি কুমড়ো ভেংগে পেয়েছিল মাত্র একশো টাকা। বুঝেছিল এই দামে ইলিশ হবে না কোনোদিনই। ভেবেছিল নিজের রোজগারের টাকায় ইলিশ খাওয়াবে। কিন্তু এমনই এক আশ্বিনে শিউলির গন্ধ মাখা সন্ধ্যায় চলে গিয়েছিল দিদা। শেষ হয়েছিল বাতাসির একমাত্র আদর ও ভরসার জায়গা। তাই জয়াকে পেয়ে দিদা বলেই ডেকেছে। বাতাসি জানে বাতাসির কেউ নেই। আর জয়ার সব থেকেও কেউ নেই। পুরনো বাড়ি ভেংগে ছেলে যখন বাড়ি করেছিল তখন জয়ার খুব আনন্দ হয়েছিল। সুন্দর ছিমছাম দোতলা বাড়ি। সব রকমের সুযোগ সুবিধা। কিন্তু সেই অসুখ। উপরে সিঁড়ি ভাংগতে পারবেন না। জায়গা হল নীচে কোনার ঘরে। আজকাল লোকজন খুব একটা বেড়াতেও আসে না। বাকী ছেলে বৌমা রান্না ঘর সবই উপরের তলায়। ফলে বাতাসিই তার অবেলার সই। মাঝে মাঝে ছেলে বৌমা এসে দু একটা কাজের কথা বলে যায়। তখন জয়ার মনে আনন্দ বেদনার এক অদ্ভুত মিশেল তৈরি হয়।

 

আজ সকাল থেকে ব্যস্ততার শেষ নেই বাতাসির। এই বাড়িতে আজ সেলিব্রেশন। প্রি পুজো না কি একটা বলেছিল পিউ, তখনই শুনেছে।সারা বাড়ি আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে। মাছ, মাংসের গন্ধে ভরে গেছে সারা বাড়ি। ভালো ভালো রান্না হচ্ছে। বাতাসি জানে নীচে গেলেই দিদা জিজ্ঞেস করবে কি রান্না হচ্ছে। এটা দিদার একটা অভ্যাস। যার জন্য দিদার শিক্ষিত বৌমা আড়ালে খুব হাসাহাসি করে তাকে নিয়ে। লোভী পর্যন্ত বলতে শুনেছে। কতটুকই বা খায় দিদা। নিজেই তো ভাত দেয়। রাতের খাবার বন্ধ করে দিয়েছে বৌমা।একদিন রেস্টুরেন্টের পনির খেয়ে নিয়েছিলেন। পরের দুদিন বদহজম আর বার কয়েক পেটখারাপ। সংগে সংগেই রাতের খাবারে টান পড়েছে। এখন উনার জন্য রাতের খাবার শুধু মুড়ি জল আর লিকার চা। বাতাসি জানে দিদা খেতে আর খাওয়াতে খুব ভালবাসেন। রান্না তো করতে পারেন না তবে বাতাসির সংগে গল্প করেন কোন ডালে কি ফোড়ন দিলে স্বাদ হয়। ঝোল আর চচ্চড়ির ব্যবধান। কোন মাছে কোন সবজি মানায় সব বলেন। বাতাসিও এতে অনেক কিছু জানতে পারে। কখনো সুযোগ পেলে বাতাসিও দিদার রান্নার টিপস্ কাজে লাগায়।

   

এই মোক্ষম সময়ের অপেক্ষাই করছিল বাতাসি। জম্পেস নাচ গান পানীয়ের ফোয়ারা। সবাই ব্যস্ত চূড়ান্ত এনজয় করতে। এই সময়ে কেউ বাতাসিকে খুঁজবে না তা সে জানে। সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে থালা নিয়ে নীচে নেমে এল সে। আস্তে করে দরজা খুলে ঢুকল তার আর দিদার ঘরে। জয়া জানতেন না কিছুই। বাতাসির ডাকে উঠে বসলেন। আলো জ্বালতেই চোখে পড়ল বাতাসির হাতের থালার দিকে।সব তার খুব প্রিয় খাবার। কিন্তু পরক্ষনেই মনে পড়ল তার তো রাতের খাওয়া মানা। এগিয়ে এল বাতাসি। জয়ার পাশে বসল থালাটা নিয়ে। আস্তে আস্তে জয়ার মুখে তুলে দিল তার প্রিয় সব খাবার। কতদিন খাননি জয়া এমন করে। কেউ খাইয়ে দেয়নি। বুড়ো হলেই কি শুধু পাতলা খেতে হয়। বুড়োদের খাবারের প্রতি আকর্ষণ থাকতে নেই। কিন্তু কেন? বয়সটা কি ইচ্ছেকে পায়ে পিষে মেরে দেয়। কেউ বুঝতে৷চায় না। কিন্তু বাতাসি বুঝেছে। কতদিন পর পেটভরে খেয়েছেন জয়া। বাতাসিকে জড়িয়ে ধরেন জয়া। কেঁদে উঠেন দুজনেই।বাতাসিকে সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণার মতো মনে হয় জয়ার। বাইরে থেকে শিউলির গন্ধ ভেসে আসে।