সাহিত্য পত্র

ডিহবাবার দয়া

আদিমা মজুমদার

Adima Mazumder.jpg

যামিনী হাসপাতালের সামনে দাঁড়ালে দেখা যায় হাসপাতালে ঢোকার রাস্তার দুই ধারে কি সুন্দর ফুলের বাগান। নানা প্রজাতির ফুল ফুটে আছে। তার পাশে অপেক্ষা করছে কিছু শববাহী গাড়ি। ভেতরে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভিন্ন ভিন্ন জাতের লোক সারিবদ্ধ বেডে শুয়ে যন্ত্রণার যে কত বিকৃত রূপ তারই যেন প্রদর্শন করছে। বাগানের  ফুলের মতোই ভয়াতুর  তাদের দৃষ্টি।       
               

প্রসূতি বিভাগের আলাদা চিত্র কিন্তু। বাইরে মাছির মত ভেন ভেন করে রোগীর এটেনডেন্ট। উফ বাবা যেন ন্যাশনাল হাইওয়ের মাছের বাজার।

 

একজন প্রসূতি মা তার বাচ্চাকে পরম যত্নে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। মাথায় মস্ত বড় জট। গুলাটে চোখ, সমস্ত শরীর ক্লেদাক্ত। বন মানুষের মত লাগছিল।
 

বিচিত্র মানুষের বিচিত্র জীবন কাহিনী শুনতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে থাকলেও উপায় থাকেনা। বড় কড়াকড়ি  ডিউটি। কাজ শেষ করে হোস্টেলে এসে নার্সের সাদা ইউনিফর্ম ছেড়ে জটাধারী মায়ের কাছে চলে আসি। সাদা ইউনিফর্ম দেখলে রোগীর আত্মীয় স্বজনরা নানা প্রশ্ন করে। সার্জারি ওয়ার্ড কোনদিকে, ব্লাড ব্যাংক কোথায়, আমার সিরাজুলকে কই পাইতাম সিস্টার, আমারে তোড়া সাহায্য করো ইত্যাদি। 

 

মাথা ঠান্ডা করে জবাব দিতে চাইলেও একসময় বিরক্তি বোধ হয়। নার্স হলে ও রক্ত মাংসের মানুষ  তো।
               

আজ সকাল থেকে ঠান্ডা হাওয়া বইছে, শরৎ এসে গেছে। শীত শীত লাগছে। জটাধারী মায়ের কাছে গিয়ে একটি টুল নিয়ে বসে পড়ি। তার মুখের দিকে চেয়ে নিজের জীবনের ফেলে আসা কাদামাটির জীবনটা মনে পড়ে। মাঠে সবজি খেতে জল দেওয়া, ফসল তোলা, ঢেঁকিতে ধান ভানা, তেল কালি-মাখা স্যাঁতসেঁতে  রান্নাঘর। খাল বিল নদী নালা। মস্ত বড় খেতের মাটে বিকেল জুড়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খেলা। এসব সুন্দর দিনগুলো ভুলা যায় না, যাবে না। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে প্রশ্ন করি, মাইনি তোমার বাড়ি কোথায়? কথা বলে না। তার মা সন্ধ্যা রিকিয়াসন উত্তর দেয়   - সাবাসপুর, দামছড়া বাগান।


হ্যাঁ, আমিও একটা বাগানের ফাংশনে ঝুমুর নাচ কাঠিনাচ  দেখতে গিয়েছিলাম, খুলিছড়া না বালাছড়া মনে নেই। ডলু বাগানে ও গিয়েছি। কাজল দেমতাকে  চেনো?হামদের বাত পত্রিকা করেন। সানজ ফঝির  তার বিখ্যাত গল্পের বই। _ নাগো চিনতে  নাই পারলাম।
_

না না তোমরা চিনবেনা। উনি বড়সিংগার মাইয়া। আমাদের কাছাড়ে অনেকগুলো চা বাগান আছে, নাম বলতে পারো কি?


__ কুম্ভা কাটলিছড়া   নারায়ণছড়া বড়সিংগা বালাছড়া পাতিছড়া...


__ বাব্বাঃ,  সব নাম জানো দেখি। এবার জিজ্ঞেস করি_ তোমার বাবার নাম কি? খোলা জানলার দিকে চেয়ে থাকে মাইনি। মাথা চুলকায়, বাবার নাম মনে করতে পারছে না। লজ্জায় তার মুখের শিরা-উপশিরাগুলো ফুলে উঠে। সহজ করার জন্য বলি, এই মাইনি লজ্জার কিছু নেই, অনেক সময় আমি আমার নাম ভুলে যাই। সংসারে কত রকম যন্ত্রণা, তারপর মাত্র একদিন হলো তোমার ডেলিভারি হয়েছে।পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করি।   আমিও সময় দেই। হঠাৎ বলে, বাবা নবকুমার রিকিয়াসন।


_  বাবা কি কাজ করেন?


_বাবা আর আমার মানুষটা মাটির কাজ করে, আমি আর মা পাতি তোলার কাজ করি। এবার স্বাভাবিক হয়ে যায় মাইনি।কথা বলতে বলতে মন চলে যায় দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশে। 


যেখানে ঝাড়ফুঁক ভুত-প্রেত অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে গড়ে ওঠে এক একটা মানুষের জীবন।ডাইনি  বলে হত্যা করা হয় কত মানুষকে।  

 

বাবু নামে ডাকে উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের। মনে হয় এখনও সাদা চামড়ার লোকের অধীনে সম্পূর্ণ পরাধীন একশ্রেণীর মানুষ। নির্যাতিত, অবহেলিত। পেটের ব্যাথায় একদিন কাজে না গেলে মাইনে কাটা যায়। খাপ পঞ্চায়েতের বিচার এখনো পুরোদমে চলে। মাইনির স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করলে তার মা-ই উত্তর দেন' মিলন রিকিয়াসন '। তোমার ছেলে মেয়ে? তিন মেয়ে, সানিয়া রুবিনা করিনা।


__- এবার তো ছেলে হলো কি নাম রাখবি?


___আপনি রাখেন দিদিমণি


__ ঠিক আছে রাখছি, রুদ্র ডাকবে। তিনজনে খুব হাসলাম। আসল প্রশ্নটিই এড়িয়ে যাই। এবার বলে ফেললাম__ মাইনি তোর মাথায় জট কেন?


__  ডিহবাবার দয়া 


__ ডিহবাবা কেরে?


_ শিবঠাকুরকে আমরা ডিহবাবা বলি। __আচ্ছা আচ্ছা তোমাদের ডিহবাবা তোমাকে তিন-তিনটি মেয়ে দিল, একটা ছেলে দিতে পারল না।


- দিয়েছিল দিদিমণি, মরে গেছে। ডিহ বাবা ক্ষেপে  গেছিল।


_- কেন 


_আমার মানুষটা চাইছিল আমার মাথার জটটা কাইটা ফালাইতে। সেই দোষে  ছেলেটা জন্মেই মইরা যায়।


__ তোমার এত বিশ্বাস শিব ঠাকুরের উপর? 


  ___ হ্যাঁ দিদিমণি। একটা ছেলের জন্য কত মানসা করেছি, এবার দয়া হলো।


ফোটো তোলার সখ আমার চিরদিনের।বলি- একটা ফটো তুলি মাইনি।


__-- তুলেন দিদিমণি। ফটো তুলে মাইনির আরো কাছে চলে আসি।
         

মা- মেয়ে দুজন আমার সাথে গল্প করতে আরম্ভ করে। একটু দ্বিধাবোধ করেনা। আমি এখন তুই সম্ভোধন করতে থাকি। আমাদের বাঙ্গালীদের তুই বললে অপমান হয়, কিন্তু বাগানে তুই হল ইংরেজি ইউ তুই তুমি আপনি সব বুঝাবে।বড় প্যায়ারা লাগে আমার।
 

ওয়ার্ডগার্ল এসে ব্রেড কলা ডিম দিয়ে যায়। ডাক্তার টিকিট চেক করে বলে ' সিস্টার হেলথ টক দিচ্ছেন নাকি?


__  না ডক্টর,  আপনারা রোগ নির্ণয় করেন আমি জট নির্ণয় করছি। মুচকি হাসি দিয়ে ডাক্তার বেরিয়ে যায়, যেতে যেতে বলে গল্পটা শোনাবে কিন্তু।


_---- মাইনি  তোর জটটা ভালো লাগছে না আমার, কাইটা ফেলি।


_-না দিদিমণি মইরা যাইবেন


-_-  আমি মরবো না, দে কাইটা ফেলাই,কাঁচি নিয়ে আসছি।


মাইনি  খিলখিল করে হাসে।


_-  কতদিন থেকে জট ধরেছে?


-__  বিয়ের আগে ছিলনা দিদিমণি। একটা বাচ্চা হওয়ার পর থেকে হয়েছে।


___  বুঝেছি সংসারের ব্যস্ততা আর গরিবের প্রতীক চিহ্ন। সময়মতো চুল আঁচড়াতে পারছিলি না, তেল দিস নাই। এই তো? এই কথা শুনে বড় করুন দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইল কতক্ষণ, কান্নাভেজা হাসি মুখে। বড়ই কষ্টের। রোগীর সাথে এই আমার সহৃদয় কথকের সম্পর্ক।


এবার সোজাসুজি অন্য প্রশ্ন
_- মাইনি শুনেছি তোদের বিয়ে বড় মজার। একটু বলবি তোদের বিয়ে কিভাবে হয়। মাইনির মা বলে, যে ছেলে মেয়েকে বিয়ে করবে তাদের রক্তের মিল থাকতে হবে।


_ সেটা আবার কি?


কন্যা এবং জামাইয়ের আংগুলের রক্ত নিয়ে একটা চাল জামাইর আঙ্গুলে পরিয়ে দেয়া হয়।চালটা ফিট হলে বিয়ে হবে।


__-- আচ্ছা, আরো বল


___  সাদির পর বউ যখন শ্বশুর বাড়ি আসে, তখন মুরগি কেটে রক্ত মেঝেয় লেপে দেয়া হয়, সেই রক্তে পা ডুবিয়ে স্বামীর ঘরে ঢুকে বউ।
               

কি মজার ব্যাপার। সত্যিই তো রক্তের মিল মানে বুঝাপড়া। একজন আরেকজনকে ভীষণভাবে বুঝতে হবে।

 

_-   মাইনি ওষুধ খেয়েছিস? কষ্ট হচ্ছে তোর শুয়ে থাক। তোর মার মুখ থেকে একটা তোদের ভাষায় গান শুনি। আর কবে তোদের সাথে দেখা হবে জানিনা।


___ না দিদিমণি , গাইতে পারব না।


দেখো কাল তোমাদের ছুটি হয়ে যাবে আর তোমাদের পাবোনা। আর আমরা মেয়েরা ছাড়া এখানে অন্য কেউ আসবেও না। নাতি পেয়েছেন খুশিতে একটা গান হোক। পাশের বেড থেকে আরেকজন প্রসূতি মা বলে উঠেন সিস্টারকে বড় ভালো লাগছে 'কেউতো আমাদের সাথে এভাবে কথা বলে না'। মনে মনে বলি জটা না থাকলে কি আমিও বলতাম


_  দিদিমণি পিরিয়া পূজা আমাদের মেয়েদের পূজা।


__আহা, বেশ বেশ তোমাদের মেয়েদের আলাদা পূজা আছে।


__ আমরা মেয়েরাই করি


_- খুব ভালো লাগলো মেয়েদের কিছু একটা আছে। জানো মুসলমান মেয়েদের কিছু নেই। শুধু রান্নার পর খাওয়া আর খাওয়ার পর রান্না। ইদের নামাজে ও যেতে পারে না।


__ গান কি শুনবো না সন্ধ্যাদি?  লজ্জা লজ্জা মুখ করে আরম্ভ হয় গান...


চায় বাগিচার শরমিক বটি
বালাছড়ায় ঘর গো।
সুখে দুখে জীওন বিতাই
লাল মাটিয়ার বিট্টি গো
ধিতাং ধিতাং ধিনতা ধিতাং
চায় বাগিচার হরেক কাম্
জিন্দেগিটাই বিতায় লাম্
নাই শুনলি লতুন হাওয়ার নাম
ধিনতা ধিতাং...।

 

সবাই বলছে আরেকটা শুনি,


এমন সময় আমার মোবাইলে মেসেজ আসে        

' সিস্টার দুটো সিজারিয়ান কেস আছে তাড়াতাড়ি অটি খুলেন '। (অপারেশন থিয়েটার) বাচ্চাটা ইতিমধ্যে কান্না আরম্ভ করে দেয়। আমি উঠে পড়ি, মাইনির গায়ে আমার হলুদ রঙ এর চাদরটি জড়িয়ে দিই। 


সন্ধ্যাদি আমাকে নামিয়ে দিয়ে আসে দুতলা থেকে। নামতে নামতে বলেছিল, দিদিমণি একদিন যাবেন আমাদের বাগানে।           
                     

সেদিন ঠাণ্ডা  উপেক্ষা করে অনেক রাত পর্যন্ত জানলা খুলে বসেছিলাম। কার যেন  চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। শক্ত জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম আকাশের দিকে। শুধু কুয়াশা। তবু যেন একটা আলো টর্চের আলোর মতো দূরে দেখা যাচ্ছিল। ভুলে গিয়েছিলাম আমি কে। আমি কি পারবো মাইনির জট খুলতে! মনে হচ্ছিল একদিন আমি মাইনিদের জট খুলবোই। সেই মুহূর্তের অপেক্ষায় আছি।