সাহিত্য পত্র

বন্ধু

শর্মিলী দেব কানুনগো

Sharmilee Deb Kanungo_edited.jpg

অনেকক্ষণ থেকেই  ল্যান্ডফোনটা বাজছে। হাতটা ধুয়ে রান্নাঘর থেকে দ্রুতপায়ে এসে ফোনটা উঠালেন শমিতা। ওদিক থেকে কোনও শব্দ নেই। অগত্যা রাখলেন ফোনটা। মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। একটু খারাপ। আজকাল কথা বলতে খুব ভালো লাগে। এতদিন তো চুপ করে নিজের সঙ্গেই কাটল। এখন মাঝে মাঝে তীব্র ইচ্ছে করে কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে।

 

সেই সকালবেলা সুমি অফিস বেরিয়ে যায়। তারপর থেকে সারাদিন একা বাড়িতে থাকেন শমিতা। দাদা আর বৌদি দুজনেই দুই বছরের সুমিকে রেখে এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তখন থেকেই ছোট্ট সুমিকে মানুষ করার  দায়িত্ব  নিজের মাথায় তুলে নেন শমিতা। শিক্ষকতা আর সুমির দেখাশোনাতে আবদ্ধ হয়ে যায় শমিতার জীবন। নিজের দিকে আর তাকান নি পাছে সুমির অবহেলা হয়। দুই একজন প্রেমের হাত বাড়িয়েছিলেন। বিয়েও করতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি আর সাহস করে উঠতে পারেননি। তাই সুমিতেই আবর্তিত শমিতার জীবন। আজ সুমি সুপ্রতিষ্ঠিতা। শমিতাও তৃপ্ত। অবসর জীবনে এসে আজকাল বড় একা লাগে। সুমি অফিস থেকে ফিরে আসলে অবশ্য কথার ফুলঝুরি ফুটতে থাকে। পিসি ছাড়া কেই বা আছে ওর। তবু কোথায় যেন একটা ফাঁকা লাগে শমিতার। 

                       

আজ আবার ফোনটা বাজছে। আশা নিরাশা  নিয়েই ফোনটা উঠালেন। ওপাশ থেকে ভরাট পুরুষালি গলা বলল

— নীলা আছে? 


মন উদাস হয়ে গেল। তিনি তো নীলা নন। ওপাশ থেকেও ফোন রাখার কোনও তাড়া নেই। বরং কথা বলতে আগ্রহী। ছোট ছোট কথা বিনিময় হল। পরের দিন আবার ফোন আসল । এবার নীলা নয়, শমিতার কাছেই ফোন এল। একটু কথা একটু গল্প। ভাল লাগছে শমিতার। 

এখন রোজই ফোন আসে। অপেক্ষা করেন শমিতাও।সমব্যথী সমমনস্ক দুইজন মানুষের বেশ একটা বন্ধুত্ব হয়ে যায়। পিসিকে  যে কদিন থেকে খুব প্রাণবন্ত লাগছে  সেটা দৃষ্টি এড়ায় না সুমির। ভালোই লাগলো পিসিকে ভালো দেখে। সুমির সুখের জন্যই তো পিসির এত বড় আত্মত্যাগ। 

             

মিঃ দত্ত একা মানুষ। মাতৃহারা মেয়েকে  একা হাতে মানুষ করেছেন। আজ মন সঙ্গ  চায়। সমব্যথী কারও সাথে কথা বলতে খুব ভালো লাগে। এ বয়সে আর শরীরের কোন চাহিদা নেই। যেটুকু আছে সব মনের।মেয়ে অফিস গেলে তাই ফোন নিয়ে বসে নাম্বার ডায়েল করেন। যে কোনও। বেশিরভাগ মানুষ বিরক্ত হয়। কিন্তু একদিন ঠিক পেয়ে গেলেন একজন।উনিও একাকীত্বের শিকার। গল্প করে ভালই কাটছে দিন। বাঁচার ইচ্ছেটা আজকাল বেড়ে গেছে। মনের মত বন্ধু জীবনে এক আশীর্বাদ হয়ে আসে। এই বন্ধুত্ব লিঙ্গ বৈষম্যের অনেক উর্ধে। 

               

অবাক লাগে শমিতার। নিজেকে আজ আবার নতুন করে জানলেন। এত সুন্দর করে কথা বলেন ভদ্রলোক। না দেখেই ভরসা করা যায় এমন মানুষকে। প্রথমে একটু  ইতস্তত করতেন শমিতা। ভয় হত। একজন অচেনা পুরুষের সঙ্গে কথা বলছেন। কিন্তু দিন কয়েক পর বুঝলেন ইনি বন্ধু। শুধুই বন্ধু। নিজের স্ত্রীকে আজও ইনি সযত্নে মনের আসনে বসিয়ে রেখেছেন। আর শমিতাকেও যথেষ্ট শ্রদ্ধা করেন। এমন মানুষকেই মন খুলে  সব কথা বলা যায়। আজকাল ছোটখাটো ব্যাপারেও শমিতা উনার সাথে একটু আলোচনা করে নেয়। খুব প্রাণবন্ত মানুষ। জীবন নৌকার পালে হাওয়া লাগে এমন লোকের সংস্পর্শে এলে। 

           

সুমিকে বলব বলব করেও আর বলা হয়ে ওঠেনা ব্যাপারটা। কেমন একটা সংকোচ হয়। কিভাবে নেবে কে জানে।এই প্রজন্মকে বোঝা বড্ড কঠিন।বড় চঞ্চল এরা, এদের সব কিছুতে তাড়াহুড়ো। আসলে এখনও আমাদের সমাজ এতটা উদার হয়নি। এখনও একজন বয়স্ক অবিবাহিতা ও একজন বিপত্নীকের বন্ধুত্বকে সব মানুষ সহজভাবে নেবে না। দুই বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের বন্ধুত্বে অনেকেই রহস্য খুঁজে। আর তারপর সেই বন্ধুত্বের একটা সামাজিক নাম দেওয়া খুব জরুরী হয়ে পড়ে। অথচ সবার ক্ষেত্রে এমনটা নাও হতে পারে। নিজেকে খুব ভালো চেনেন শমিতা। তাই বুঝে গেছেন অবেলার এই বন্ধুত্বটুকু খুব দামী। এর বেশি কিছু আজ মন আর চায় না। 

       

কি যে হল বুঝতে পারছেন না শমিতা। রোজ মনে মনে অপেক্ষা। কিন্তু ব্যর্থ। উনি কি তবে অসুস্থ? ইস নামটাও জানা হয়নি। ঠিকানা, ফোন নাম্বার তো দুরের কথা। ধীরে ধীরে অপেক্ষার রেশ কমে আসে। আবার ফিরে যান সেই একাকীত্বে। মাঝের দিনগুলো যেন স্বপ্ন। 

         

অফিস থেকে ফিরে সুমি পিসির গলা জড়িয়ে ধরে। চোখে জল। কলিগের বাবা আই সি ইউ তে। যদি পিসির এমনটা হয় এই ভেবে চোখে জল। হাসলেন শমিতা। রোজ খবর নেন সুমির কাছে ভদ্রলোকের অবস্থার। একদিন শুনলেন জ্ঞান ফিরেছে। সুমির জোরাজুরিতে দেখতে গেলেন। কথা এখনও স্পষ্ট বোঝা যায় না। সুমি আর ওর কলিগ মৌ ডাক্তারের সাথে কথা বলতে গেল। ভদ্রলোক শমিতাকে অস্পষ্ট ভাবে অনুরোধ করলেন উনার ফোন থেকে একটা নাম্বার ডায়েল করার জন্য।বন্ধুর নাম্বার। অসুস্থতার খবরটা জানানো দরকার। 

শমিতার ল্যান্ডফোনটা বাজছে। ও... এইজন্য এতদিন ফোন আসেনি। এবার বন্ধুর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ালেন শমিতা। সেবায় শুশ্রূষায়  সুস্থ করে তুললেন মৌ এর বাবাকে। 

         

মিথ্যাই ভয় পাচ্ছিলেন দুজনে। খুব সহজ ভাবে এই বন্ধুত্বের সম্পর্কটা মেনে নিল এই প্রজন্মের সুমি আর মৌ। না, সামাজিক নাম দেওয়ার জন্য কেউ জোর করল না।মৌ জানত বাবার মনে মায়ের স্থায়ী আসন পাতা। আর সুমিও জানে পিসি আত্মসচেতন মানুষ। নিজের জন্য কারও রেখে যাওয়া জায়গা উনি  দখল নেন না। ষাট ঊর্ধ্ব  দুই বন্ধুও জানতেন সম্পর্কে বন্ধুত্ব ঢুকলে সম্পর্কের মধুরতা বাড়ে।