সাহিত্য পত্র

 তালাক

মাণিক চক্রবর্তী

(এক)

প্রতিদিন ভোরে আজানের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় আমিনার। হাতমুখ ধুয়ে নামাজ পড়ে নেয় সে। এটি তার নিত্য কর্ম । নামাজ সেড়ে আজ যখন বাইরে এলো,  তখন পূবদিক রাঙ্গিয়ে কোমল আলো ছড়িয়ে পড়েছে বাড়িটির আনাচেকানাচে । এখন কার্তিকের শেষ। এসময়ে একটা পাতলা কুয়াশার চাদর পরে আছে প্রকৃতি । বয়সের জন্যই বোধহয় একটু একটু শীত করছিল আমিনার। তার সাড়া পেয়ে খাঁচায় থাকা হাস গুলো কল কল করে উঠল। আমিনা গিয়ে দরজাটা খুলে দিতেই বেড়িয়ে এলো তারা সব। কঁৎ কঁৎ শব্দ করে হেলে দুলে চলে গেল ছোট্ট পুকুরটার দিকে । পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ায় আমিনা । রাতভর বাদুরের তাড়নায় অনেক গুলো পাকা সুপুরি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে তলায় । উবু হয়ে সে গুলোকে কুড়িয়ে নিল সে। সন্তানহীনা আমিনা, সংসারে একা। স্বামী মারা যাওয়ার পর  ভাগে পাওয়া সামান্য জমি জিরেত আর  নারকেল সুপুরি দিয়ে দুঃখে কষ্টে দিন চলে যায় তার। পশ্চিমের ভিটেয় শামীমের ঘর। শামীম তার ভাসুরের ছেলে । বিবি দিলারা আর ছোট ছোট দুটি ছেলে মেয়ে নিয়ে তার সংসার । অসুখে বিসুখে তাদের চাচিকে দেখাশোনা করে শামীম আর দিলারা। দিলারা মেয়েটি খুব ভালো, শান্ত প্রকৃতির । মায়ের মতোই সম্মান করে আমিনাকে। সুপুরি তলায় পড়ে থাকা বাগুড়ি গুলো কুড়িয়ে নিল আমিনা। জ্বালানির কাজ চলে সেগুলো দিয়ে । সে গুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে পুকুর ঘাটে নেমে হাতমুখ ধুয়ে  উঠোনে এসে দাঁড়ায় আমিনা । দেখে,  শামীমের ঘরের দরজা এখনও বন্ধ । এতো বেলা অব্দি ঘুমোয় না শামীম । দিলারাও উঠে পড়ে সকাল সকাল । কার্তিকের শেষ,  সামনে আঘোন মাস। গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে পেঁকে উঠেছে সুপুরি । শামীম এখন ব্যস্ত মানুষ ।

               

(দুই)

সকাল সকাল চাট্টি ভাত খেয়ে বেড়িয়ে পড়ে শামীম । হাতে সরু বাঁশ দিয়ে বানানো আঁকশি । এখন তার রোজগারের সময় । গ্রামে গ্রামে ঘুরে সুপুরি পেড়ে বেড়ায় সে। একদিনে শ দেড়শো গাছ সুপুরি পাড়ে সে।  রাস্তায় চলতে চলতে হাঁক পারে - সুপারি পাড়া-নি-ই, এই বলে । একটুকরো দড়িকে বাংলা চারের মতো করে পায়ের গোড়ালিতে জড়িয়ে নেয় শামীম। সরীসৃপের মতো তর তর করে উঠে যায় সুপুরি গাছের একেবারে মগডালে । সবুজ পাতার নীচে ঝুলে থাকা হলদে রঙের পুষ্ট সুপুরি । গাছটাকে একহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অপর হাত দিয়ে একটানে ছিড়ে আনে সুপুরি গাছের ছড়া গুলো । ছিপছিপে গাছ গুলো তার শরীরের ভারে নুয়ে পড়ে কুর্নিশ করার ভঙ্গিতে । মাঝে মাঝে মগডালের সবুজ পাতার ছায়ায় গাছটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে দেশ দুনিয়ার দৃশ্য দেখে শামীম । বড় মায়াময় সে দৃশ্য । যতদূর চোখ যায় সবই যেন আল্লাহর সাজানো বাগান । এর সীমা পেড়োলেই বোধ হয় মক্কা শরিফ,  কাবাঘর। ভাগ্যবান মুনিনরা হজ করতে যান সেখানে ।
           

বিকেলের রোদ মজে এলে বাড়ি ফিরে আসে শামীম । আসতে লতিফের দোকান হয়ে আসে । নিত্যদিনের চাল ডাল তেল মশলার সাথে বাচ্চাদের জন্য নিয়ে আসে লজেন্স,  পাউরুটি । গামছা আর লুঙ্গি নিয়ে সে সোজা চলে যায় মসজিদের বড় পুকুরে । ভরা পুকুরে চান করে ডুব দিয়ে দিয়ে । ঘরে এসে হাটের থেকে কিনে আনা সুগন্ধি তেল মাখে মাথায়। চুল আঁচরায় নিপাট করে। ছেলে মেয়ে দুটিকে কোলে নিয়ে দাওয়ায় এসে বসে শামীম । দিলারা এসে ফিকে লাল চা আর চালের তৈরী চিতল পিঠে  রেখে যায় তার সামনে। বাচ্চাদের মুখে পিঠে ছিড়ে দিতে দিতে তাড়িয়ে তাড়িয়ে চা খায় শামীম । এখন তার রোজগার ভালো । রোজগার ভালো বলে মনও ভালো ।
         

বাঁশঝাড় পেড়িয়ে গ্রামের সংকীর্ণ রাস্তাটা এঁকে বেঁকে মিশেছে গিয়ে কড়ই তলায় বড় রাস্তার সাথে। আজকাল বেশ কিছু দোকানপাট গজিয়ে উঠেছে সেখানে । বিকেলে জায়গাটা বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে । একটু আঁধার নামলে সেখানে গিয়ে দাঁড়ায় শামীম । বেচবে বলে কুদ্দুস মিয়া মাছ ধরে আনে বিল থেকে,  পুটি, ট্যাংরা,  শিঙী- ছোট মাছ সব।  তাকে ঘিরে ভীড় জমে যায় লোকের । যত লোক না মাছ কিনে, ভীড় করে তার তিনগুণ । খুটিয়ে খুটিয়ে দরদাম করে মাছ কিনে শামীম । কখনও বা বসে গিয়ে হাজি সাহেবের চায়ের দোকানে । চা খায়,  বাইরে পেতে রাখা বেঞ্চের এক কোনায় বসে। সেখানে এসে বসে গ্রামের মাতব্বর লোকেরা । তাদেরকে আদাব জানায় শামীম । কথা চলে দেশ নিয়ে,  সমাজ নিয়ে,  পঞ্চায়েতের রাজনীতি নিয়ে । সকলের কথা সসম্ভ্রমে শুনে যায় শামীম । এখন তার রোজগার ভালো । রোজগার ভালো বলে মনও ভালো ।

           

(তিন)


দিলারা শামীমের ভালোবাসার বিবি। বড় ভালো মেয়ে, শান্ত প্রকৃতির । সারাদিন নীরবে  কাজ করে যায়, কথা বলে কম। সংসারে এতো অভাব,  এতো অনটন। দিন আনতে পান্তা ফুরোয় । তথাপিও তার শরীর ঘিরে থাকে একটা তরল সৌন্দর্য ।একটা ভোরের স্নিগ্ধতা খেলা করে বেড়ায় যেন। কার্তিক আঘোন মাস শামীমের দুটি পয়সা রোজগারের সময় । সকাল সকাল উঠে নারকেল সুপুরির বাগুড়ি জ্বেলে উঠোনের কোনে থাকা উনুনে শামীমের জন্য ভাত চড়িয়ে দেয় দিলারা। কড়ইতল থেকে আনা চুনো মাছের ঝাল দিয়ে ভাত খেয়ে কাজে যাবার জন্য তৈরী হয় শামীম । একটুকরো পানের উপর পাতলা করে চুন মাখিয়ে তার উপর এক টুকরো কাঁচা সুপুরি সহ দিলারা গুঁজে দেয় শামীমের হাতে । বিবির হাতের কোমল স্পর্শের অনুভবটুকু  নিয়ে চালের ওপর রাখা আঁকশিটা কাঁধে নিয়ে বেড়িয়ে যায় শামীম । বাচ্চাদেরে খাইয়ে দাইয়ে নিজেও খেয়ে নেয় দিলারা। তারপর উঠোনে বসে চাচি শ্বাশুরী আমিনার সাথে চাল বাছে অনেকক্ষণ ধরে। ধান বেছে নিয়ে চালের ক্ষুদটুকু তুলে নিয়ে ভিজিয়ে রাখে আলাদা করে । বেলা পড়ে এলে সেটুকু পিষে চিতল পিঠে তৈরী করে রাখে শামীমের জন্য । উত্তরের জলা জমিতে এসময়ে প্রচুর কলমি শাক। ধুচুনি হাতে নিয়ে শাক তুলে আনে দিলারা। হাঁস মুরগী পোষে বেশ কিছু । ছাগলও পোষে বেশ কয়েকটি । বর্ষা বাদলের দিনে হাতে কাজ থাকে না শামীমের । এসব থেকে যা আয় হয়, দিলারা তখন সেটুকু তুলে দেয় শামীমের হাতে। বেলা বাড়ে, ঘরদোর নিকিয়ে উঠোন সুপুরিতলা ঝাড় দেয় দিলারা। কুড়ো মেখে খেতে দেয় হাঁসেদেরে। একমুঠো চালের ক্ষুদ ছিটিয়ে দেয় মুরগী গুলোকে । হাঁসের ছানার মতো তাঁর নিজের বাচ্চা গুলোও  সারাক্ষণ তার পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ায় । কাঁখে কলসী নিয়ে বাচ্চাদের হাত ধরে আলমের বাড়ির পুকুর ঘাটে চান করতে যায় দিলারা। যখন ফিরে আসে, তখন গাছগাছালির ছায়ায় সন্ধ্যা নেমে আসে । ঘরে ফিরে প্রথমেই শামীমের জন্য পিঠে তৈরী করে দিলারা। শামীম ফিরে এলে তাঁকে খেতে দেয় । হাসমুরগী গুলোকে ঘরে তোলে । ছাগল গুলোকে বেঁধে রাখে কাঁঠাল তলায় । তার এই নিস্তরঙ্গ জীবনে একটি বিপর্যয় ঘটে গেছে গতকাল । গত সন্ধ্যায় শামীমের সখের লাল মোরগটীকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলনা দিলারা। সন্ধের মুখে কেমন সুন্দর ঘুরে ঘুরে দানা খাচ্ছিল খুটে খুটে। দিলারা ভাবলো প্রতিদিনের মতো নিজেই গিয়ে ঢুকে পড়বে তার খাঁচায় । দরজা দিতে গিয়ে দিলারা দেখে অন্য সব গুলো রয়েছে,  নেই কেবল শামীমের লালঝুঁটি মোরগটী। সুপুরি পাড়তে গিয়ে দূর গ্রামের এক ব্যাপারীর কাছ থেকে অনেক সাধ্যসাধনা করে কম দামে মোরগটী কিনে এনেছিল শামীম । বেশ পোষ মেনে গিয়েছিল এ কদিনে। অন্য মুরগী গুলোর সাথে ঘুরে বেড়াতো বাড়িময়। লালঝুঁটি হলদে কালো, তার গা বেয়ে যেন সরষের তেল গড়িয়ে পড়তো। ভোরের আজানের সাথে সাথে সেও ডেকে উঠতো কু কুরু কঁ বলে। ছেলে কোলে নিয়ে যতদূর সম্ভব খুঁজে দেখলো দিলারা। অন্ধকার নেমে এসেছে বলে বেশী দূরে খুঁজতে যেতে সাহস হলো না তার। শামীমের বড় সখের মোরগ-- একথা  ভাবতে ভাবতে গভীর মনোকষ্ট নিয়ে বসে ছিল তারই অপেক্ষায় ।

     

 

(চার)

         

গতকাল কড়ইতলা থেকে একটু দেরি করেই ফিরেছিল শামীম । অনেকদিন পর দেখা হয়ে গিয়েছিল তার বাল্যবন্ধু সাদ্দামের সাথে। সাদ্দাম এখন কাজ করে আরবের কোন একটি দেশে। বিবিকেও নিয়ে গিয়েছে সেখানে । সেখানে নাকি প্রচুর রোজগার । গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে এসেছে মা বাবাকে দেখবে বলে। হাজির দোকানে বসে চা খেল দুজনে।  সুখদুঃখের কথা হচ্ছিল অনেকক্ষণ ব্যাপী । বাড়ি এসে  শোনে তার সখের লাল মোরগটীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । মুহূর্তে মাথা গরম হয়ে ওঠে তাঁর । নিজেই খুঁজতে নেমে যায় এদিকে সে দিকে , পুকুর পাড়ে,  বেতগাছের ঝোপে, বাঁশ ঝাড়ের নীচে । কেরোসিনের কুপি নিয়ে দিলারাও গেল তাঁর পেছনে পেছনে । কিন্তু কোথাও নেই সেই সখের মোরগটী। বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল শামীমের মন।  ক্রোধের বসে একটা ভারি চর বসিয়ে দিল দিলারার বাঁ গালে। বলল্ , কি করিস সারাটা দিন। বেলা থাকতে থাকতে  হাঁস মুরগী গুলোকে ঘরে তুলতে পারিস না? সংসারে কি এতো কাজ তোর। তালাক দেবো তোকে। তালাক,  তালাক--। দুবার বলেই অন্তর থেকে কার নির্দেশে যেন থেমে গেল শামীম । রাগে গজগজ করতে করতে পুকুরে পা ধুয়ে উঠে গেল ঘরে। অমোঘ দুটি বাক্য মুখ দিয়ে উচ্চারিত হওয়ার পর তার ভালোবাসার বিবির মনে কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে , একবারও ভেবে দেখার অবকাশ হয়নি তার। সখের মোরগ হারানোর বেদনা আর সারাদিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর ক্লান্তি নিয়ে গভীর ঘুমে ডুবে গিয়েছিল সে। পুকুর   পাড়ে কুপি হাতে চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে ছিল দিলারা। তার দুচোখ বেয়ে টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছিল অভিমানের অশ্রু ।

       

 

(পাঁচ)

   

হাতের টুকিটাকি কাজ সেড়ে আবারও উঠানে এসে দাঁড়ায় আমিনা । দেখে শামীমের ঘরের দরজা বন্ধ রয়েছে তেমনি । কেবল পাকঘরের দরজাটির আধখানা আবজানো রয়েছে  যেন । এতো বেলা অব্দি ঘুমোয় না শামীম,  দিলারাও না । এখন কার্তিকের শেষ, শামীমের রোজগারের সময় ।উদ্বিগ্ন আমিনা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় দরজার দিকে । দেখে পাকঘরের আধা আলো আধা অন্ধকারে শূণ্যে ঝুলে আছে যেন একজোড়া কোমল পায়ের পাতা। এক পাল্লার দরজাটা একটু খুলে ধরতেই রহস্যটা পরিস্কার হয়ে যায় প্রবীনার কাছে। দিলারা,  দিলারার দেহটি ঝুলে আছে শূণ্যে। তাঁর কোমল গলায় চেপে আছে শক্ত দড়ি । চোখ দুটি বিস্ফারিত,  যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। মাথাটি অসহায় ভাবে ঝুঁকে আছে সামনের দিকে । শামীম,  শামীম,  সর্বনাশ হয়ে গেছে,  এই বলে চিৎকারে করে উঠলো আমিনা । ঘুম থেকে জেগে উঠে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে শামীম । পাক ঘরের দিকে তাকিয়ে তার চক্ষু চড়কগাছ । একি করলো দিলারা। এতো বড় শাস্তি দিল তাকে । এতো বড় প্রতিশোধ?  ভালোবাসার এতো অভিমানও লুকিয়ে ছিলো তার ভেতরে । সংসার থেকে তালাক নিয়ে নিল সে চিরকালের মতো । হে আল্লাহ্! উচ্চারণ করে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে  বসে পড়ল শামীম । কুয়াশার চাদরটা সড়ে গিয়ে তখন চারিদিকে খেলে বেড়াচ্ছে গন গনে রোদ ।