সাহিত্য পত্র

 গণু

অভিজিৎ মিত্র

Abhijit Mitra.jpg

রবিবার। ১লা অগস্ট। লকডাউনের মাঝে আজ থেকেই সাধারনের জন্য লোকাল ট্রেনের টিকিট খুলে দেওয়া হল। আর আজ দুপুরেই টিকিট কেটে বেলা তিনটের ট্রেনে উঠে পড়লাম। এই প্রথম, লকডাউনের মাঝে। দুপুরের ট্রেন, সুতরাং প্রায় সুনসান। আমি একদম বর্ধমান অব্ধি যাব, তাই জানলার ধারের সিট ম্যানেজ করতেই হবে। এক লম্বা-চওড়া ঢাউস লোকের পাশে বসে পড়লাম, ওদিকে ফিচফিচ করে হেসে চলা দুজন কলেজ যুবতী। আশেপাশে আর কেউ নেই। শুধু উল্টোদিকে জানলার ধারে দুজন।

ব্যাগ মাথার ওপর বাঙ্কে তুলে এবার পাশের লোকটাকে ভাল করে দেখলাম।

- আরে, গণু না?

গণু আমার দিকে ফিরল। ভুরুদুটো সামান্য কুঁচকে। আমার মুখের দিকে চেয়ে সেই কোঁচকানো ভুরু হাসিতে পরিনত হতে অবশ্য বড়জোর দশ সেকেন্ড সময় লাগল।

- রাজা? তোকে এই রুটে এভাবে দেখব ভাবিনি। এত পাকা দাড়ি কেন রে?

- আমি তো এখন বর্ধমানে পোস্টেড। কিন্তু তুই যে হঠাৎ ভুবনেশ্বর ছেড়ে বর্ধমানের ট্রেনে জার্নি করবি, সেটাও তো আমি ভাবতে পারছি না।

- না রে, অনেকদিনে ধরেই ভাবছিলাম ওয়ার্ক ফ্রম হোম করব। এবার অনেকটা ফুরসৎ পেয়েছি, তাই চলেই এলাম। বাবা-মার জন্য বড্ড মন কেমন করছিল। আজ এক বন্ধুর কাছে যাচ্ছি বিজনেস কস্টিং-এর কিছু ব্যাপার নিয়ে।

আমার অনেক দূরের জিনিষ, মাথার ওপর দিয়ে যাবে। অতএব এইসব নিয়ে বেশি কিছু কমেন্ট না করাই ভাল। প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বললাম,

- তোকে প্রায় দু’বছর পর দেখছি। তোর তো বেশ মোটাসোটা চেহারা হয়ে গেছে রে! কি খাচ্ছিস?

- কিছুই না। প্রায় সব ছেড়ে দিয়েছি। তাতেও আস্তে আস্তে ফুলছি। ভুবনেশ্বর গিয়ে তো শেষ দু’বছর কটা সিগারেট খেয়েছি সেটাও মনে করে বলতে হবে।

- শুনলাম তোর সুগার, প্রেশার...বেশ কিছু রোগ হয়েছে। চেক কর। ব্যায়াম করিস?

- হ্যাঁ, দুবেলা ওষুধ খাই। হাঁটাহাঁটি করি। কিন্তু তোর সুন্দর মুখ এরকম হল কি করে? টেনশনে ভুগছিস?

একটু হাসলাম। 

- তোর মনে আছে গণু...?

- হ্যাঁ, তা আছে বইকি। সেবার অরুনাচলের জিরো থেকে ফেরার পথে তোর গুয়াহাটির কোয়ার্টারে এক রাত্তির ছিলাম। দুজন মিলে কত মাল খেলাম। তুই মেঘালয়ের একটা অদ্ভুত হুইস্কি খাইয়েছিলি। কি যেন নাম...

- হ্যাঁ, তুই তো আবার হুইস্কি পেটে পড়তেই ফ্রয়েডের স্বপ্ন আর মনস্তত্ব নিয়ে লেকচার দিতে শুরু করলি। তোর লেকচার শুনে আমি তো শালা বুঝতেই পারছিলাম না আমি প্রফেসর না তুই!

হাসতে হাসতে উল্টোদিকের দুই যুবতীর দিকে চোখ গেল। ওরাও চাপা গলায় কিছু বলছে আর হাসছে। গণুর কানের কাছে মুখটা নিয়ে গেলাম একটা কথা বলব বলে।

- থাক, এসব আর বলতে হবে না। আমি জানি তুই সেই পুরনো দিনের কথা বলবি। আমরা ঠিক করেছিলাম দুজনে একসঙ্গে একই ক্লাসের দুজন কলেজপড়ুয়া মেয়ের সঙ্গে প্রেম করব। কিন্তু সেসব কুড়ি বছর আগের কথা। এখন আমার ছেলের ষোল বছর বয়স হয়ে গেল।

অবাক হলাম। আমি যেটাই বলতে যাচ্ছি, গণু সেটা আগে থেকেই বুঝে ফেলছে কি করে?

- তুই কত বদলে গেছিস গণু। কিরকম একটা গজকচ্ছপ টাইপ হয়ে গেছিস। অথচ আমরা দু মাসতুতো ভাই মাত্র সাত দিনের ছোট-বড়। কোন এককালে আমরা প্রতি মাসে অন্তত একবার একসঙ্গে হতাম, খেলতাম, হাসি ঠাট্টা করতাম। আর এখন – তোর সঙ্গে প্রায় দু’বছর পর দেখা! অবশ্য কোভিডের জন্য অনেক কিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে।

গণু কিরকম একটা ঘোলাটে অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইল। ওর চোখে চোখ রেখে মাথা ঘুরতে শুরু করল, চেয়ে থাকতে পারলাম না।

- কোভিড আমার কি কি ক্ষতি করেছে, সে এক লম্বা লিস্ট। তোকে পরে বলব রাজা।

- তোর বউ ছেলে এখন কেমন আছে? ওরা কোথায়? ভুবনেশ্বর?

- হ্যাঁ, কিন্তু কেউ ভাল নেই। আমি জানি। আবার যদি আমরা সেই ছোটবেলায় ফিরে যেতে পারতাম, তাহলে হয়ত আবার নতুন করে শুরু করা যেত। ভুলগুলো শুধরে নেওয়া যেত।

- ঠিক। ছোটবেলায় আমরা সব মামাতো-মাসতুতো-পিসতুতো ভাই-বোনেরা কত ক্লোজ ছিলাম। একসঙ্গে খেলাধূলো থেকে শুরু করে সবার ভেতর ইউনিটি, পুরোটাই। আর আজ সবাই একেকটা দ্বীপ। সেই সেবার –

- হ্যাঁ, সেই সেবার, আমরা ক্লাস ফাইভে, যখন আমার ঠাকমার চোখ অপারেশনের পর চোখে কালো চশমা, আমি আর তুই উঠোনে ফুটবল খেলছি, তুই মারলি আর বলটা সোজা গিয়ে ঠাকমার মাথায়। সেবার তোকে আড়াল করে আমি নিজের কাঁধে দোষ নিয়েছিলাম। নাহলে তুই তোর বাবার হাতে সেদিন খুব মার খেতিস। 

আমি আর থাকতে পারলাম না। চেঁচিয়ে উঠলাম,

- গণু, তুই আমার মনের কথাগুলো বুঝছিস কি করে? তুই কি জাদু জানিস?  

গণু হেসে উঠল। হঠাৎ এক দমকা হাওয়া। ওমনি চারদিক অন্ধকার। কিছুই বুঝতে পারছি না, একটু ঠাহর করে চোখ সইয়ে নিয়ে বুঝলাম আমরা কোনো এক বিশাল বড় ঝিলের ধারে বসে আছি, প্রায় নিশুতি অন্ধকার। ঝিঁঝিঁর অনবরত ডাক আর ঝিলের চারদিক একসারি করে সোনাঝুরির গাঢ় ছায়ায় ঢাকা।

- তুই মাছ ধরতে এত ভালোবাসিস রে রাজা, আর দ্যাখ, আমি কোনদিন তোকে নিয়ে কোথাও মাছ ধরতে যেতে পারলাম না। তাই ভাবলাম আজ তোকে নিয়ে ঝিলের ধারে একটু বসা যাক। দু’দন্ড শান্তি।

- কিন্তু আমরা তো ট্রেনে আসছিলাম। এখানে কি করে এলাম? ট্রেনটা কই? এটা কি করে সম্ভব হয়?

- হয়, হয়, তোরা বুঝতে পারিস না। এই কোভিড পিরিওডে সব সম্ভব।

গণু ঐ আবছা অন্ধকার বরাবর দূরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। ওকে ডাকতে যাব, ওমনি ঘটাং করে ট্রেনে আবার আলো ফিরে এল। শেষ বিকেলের আলো। চোখ ধাঁধাঁনো। দেখি গণু আমার পাশেই বসে আছে। জানলার দিকে তাকিয়ে। ওর হাতের কব্জিটা চেপে ধরলাম। ঠান্ডা।

- এই মানুষজন, দেশ, আমাদের ছেড়ে কোথাও দূরে চলে যাবি না তো? দ্যাখ, তোর দিকে তাকিয়েই কিন্তু আমি নিজের বয়স বুঝি। আমরা মাত্র সাত দিনের ছোট-বড় - ভুলিস নি যেন।

- ওরে ক্ষ্যাপা, সে তো আমিও তোকে দেখেই বয়স গুনি। এত ইমোশনাল হচ্ছিস কেন?

দেখতে দেখতে পালসিট চলে এলাম। মাটি থেকে অনেক ওপরে। এবার সন্ধে হবে। চোখটা কখন লেগে গেছিল। কাঁধে এক মৃদু ধাক্কা খেয়ে চোখ খুললাম। এক হকার ডাকছে।

- দাদা, উঠে পড়ুন। বর্ধমান ঢুকছে। অনেকক্ষণ চোখ বুজে হাত পা নেড়ে কি সব বিড়বিড় করছিলেন। আমরা দুজন হকার এই গোটা কামরায় ছিলাম, তাই কিছু হল না। যদি একা থাকতেন, তাহলে হয়ত চুরি বা ছিনতাই হয়ে যেত।

চমকে পাশে তাকালাম। গণু কই? যুবতী মেয়েদুটো কই? ওপাশের লোকদুটো কই? দুজন হকার বাদে গোটা কম্পার্টমেন্টে আমি একা।

 

ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা টোটোয় উঠলাম। বোরহাট যাব। পকেট থেকে মোবাইল বের করে মেসেজ খুললাম। একটাই মেসেজ। সেই ১৯শে মে’র। প্রায় ৭২-৭৩ দিন পুরনো। সেদিনের পর থেকে আর একটাও মেসেজ জমাই নি, উদ্বৃত্ত হিসেবে সব একে একে সব ডিলিট করে দিয়েছি, শুধু এইটা বাদে। পিকার মেসেজ, আমার প্রায় সমবয়সি মামাতো বোন। পিকা লিখেছে – ‘গণু আর নেই রে রাজা। পনেরো দিন ভুবনেশ্বরের এক নার্সিং হোমে কোভিডের সঙ্গে লড়ছিল। আর পারল না’।