গল্প - ১

ত্যাজ্যপুত্র
তৃণময় সেন
trinomoy sen.jpg

সারারাত ঘুম হয়নি বছর বাষট্টির প্রৌঢ় পিতাম্বরের। মর্নিং ওয়াকে যেতে ইচ্ছে না হলেও বাদ দিলে চলবে না, ডাক্তারের কড়া নির্দেশ। দোতলা বারান্দার আরামকেদারায় বসার মিনিট পাঁচেক চোখ জ্বালা করলেও শরৎ ভোরের স্নিগ্ধতায় তার সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গেছে। চোখের আদর পূবের রক্তজবা আকাশ ছুঁয়ে একটু নিচে নামলে নবীন সবুজ প্রাণে সাড়া জাগায়। দূরে ধানক্ষেতের মাঠের বুকে হাওয়ার দোলা মনটাকে শিশিরভেজা সকালের মতো স্নাত করে দেয়। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। পাশের বালিশে মৃন্ময়ীর দু’চোখ সারারাত নিঃশব্দে ঝরলেও বাইরের টুপটাপ ঠিক কানে আসছিলো তার।

--তুমি দেখো, ছেলেটাকে বিয়ে দিয়ে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ছেলের সাথে সোজাসুজি কথা না বলা পীতাম্বর মৃন্ময়ীর আবদার বেশি দিন উপেক্ষা করতে পারেননি। বাপের ওপর অঙ্কিতের যেন বহু জন্মের ক্ষোভ। বন্ধুদের সাথে পার্টি করে এসে অশ্রাব্য ভাষায় গালি-গালাজ করলেও, তাকে কোনোদিন জবাব দিতে যাননি তিনি। সেটা কি পুত্রস্নেহ না অবচেতন মনের কোনো পাপবোধ! কিন্তু তিনি তো সেরকম কোনো ভুল করেননি! এতকালের দুর্বলতাটা তাহলে কিসের ছিল? পাখির কলকাকলিতে শিউলি পাতার ফাঁকে সকাল আসে।

গ্যারাজের বুড়ো মেকানিক মেয়েটাকে আরও পড়াশোনা করাতে চাইছিল। কিন্তু পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৌয়ের চিকিৎসার খরচ দিয়ে সেটা আর সম্ভব হয়ে উঠছিল না। এককালের সমবয়সী বন্ধু হলেও দুটো করে ট্রাক-বাসের মালিক, শহরের অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিটি নিতান্তই এক কাপড়ে মেয়েকে তাঁর বাড়ির বৌ করতে চাইলে, দু'চোখ ভোরে উঠেছিল তার। কোনো দাবিদাবা তো নয়ই, উল্টে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেবার পক্ষপাতী শ্বশুর মশাইটির মধ্যে ঈশ্বরকে দেখতে পাচ্ছিল নয়না।

কিন্তু বিয়ের মাসখানেকের মাথায় তার ভুল ভাঙে। শ্বশুর-শাশুড়ি খুব ভালো মানুষ হলেও প্রায়ই নেশা করে বাড়ি ফেরার পাশাপাশি আর্থিকভাবে অসচ্ছল বাবাকে অপমান করতো তার বর। মিথ্যা উদারতা দেখিয়ে তাহলে বাড়ির বৌ করে নিয়ে আসার দরকারটা কি ছিল! বাবার সামান্য রোজগারের সাথে টিউশনি করে পরিবার চালানোর ক্ষমতা রাখে নয়না। রাগ, অভিমানে কিছু বলতে গেলে শ্বশুরের উদাস চেহারা দেখে কেমন থমকে যেত সে!

 

--স্নান-টান করে রেডি হয়ে যাও বউ। তোমার সব সার্টিফিকেটগুলো বের করে রেখো। দশটা নাগাদ বেরোতে হবে। 

 

পিতাম্বরের কথায় কিছুটা অবাক হয়েছিলেন মৃন্ময়ী। ছেলেটা মাঝরাতে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো... কোথায় একটু খবর নেবে তা না, উল্টে বউকে তৈরী থাকতে বলছে! অন্যদিন হলে কিছু বলতেন কিন্তু গতকাল রাতে পীতাম্বরের যে রুদ্ররূপ তিনি দেখেছেন, তা সহজে ভুলে যাবার নয়। এতোটা বছর একসাথে কাটালেও তাকে এতো রাগ করতে দেখেননি তিনি। 

 

আলমারি থেকে একটা বই বের করে তার ভেতর থেকে একটা সাদাকালো ফটোর দিকে কয়েক মিনিট স্থির চেয়ে থাকেন পীতাম্বর। তার মুখের আদল অনেকটা বাবার মতো। চওড়া কপাল, তীক্ষ্ণ নাক, গোঁফ রাখলে তাকে ঠিক বাবার মতোই দেখাতো। বাইশটা বছর পেরিয়ে গেছে অথচ ভাবলে মনে হয় এইতো সেদিনের কথা; যখন তিনি কারো কথা না মেনে মৃন্ময়ীকে সাথে নিয়ে আসলেন। মৃন্ময়ীর তখনও ডিভোর্স হয়নি। সাথে তার পাঁচ বছরের ছেলে। আঁচল দিয়ে গলায়-ঘাড়ে সিগারেটের ছোপ ঢাকার চেষ্টা অবিরত করে যাচ্ছিল মৃন্ময়ী। মা ছাড়া বাড়িতে কারোর মত ছিল না। মায়ের মত যে ছিলই তা ঠিক বলা যাবে না। কিন্তু মা বাদে বাবা, কাকা, কাকিমা কেউ তাকে ছেড়ে কথা কননি। সন্ধ্যাবেলা যখন মৃন্ময়ী আর অঙ্কিতের হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন কয়েক পা এগিয়ে ফের পেছন ফিরে দেখলে আঁচলে গোঁজা মায়ের মুখ অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তারপর ভাড়া বাড়িতে থাকা, কষ্ট করে দু'বেলা খাওয়ার সাথে অঙ্কিতকে ভালো স্কুলে পড়ানো, সেকেন্ড হ্যান্ড অটো থেকে একে একে চারটে গাড়ির মালিক হওয়া, এসব কিছু ভাবতে ভাবতেই ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে ন'টা বাজে। 

 

ড্রাইভার দিলু আজকে আসেনি, তাই নিজেই ড্রাইভারের সিটে বসে কলেজ পৌঁছতে মিনিট কুড়ি মতো সময় লেগে যায় পীতাম্বরের। সারারাত বৃষ্টির শেষে আকাশটা একদম পরিষ্কার। গাড়ির গ্লাস পার হয়ে আসা হলুদ রোদের ছোঁয়া আজ বেশ ভালো লাগছে নয়নার। গতরাতের ঘটনার রেশ কিছুটা হলেও কেটেছে। মাথার ডানদিকটা এখনও অনেকটা ফোলা, হাত দিলে ব্যাথা টের পাওয়া যাচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের কোণায় মাথাটা বাজেভাবে লাগার পরে কয়েক ফোঁটা রক্ত বেরিয়েছিল। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় সপাটে চড়ের শব্দ কানে আসলে পেছন ফিরে শ্বশুরের রক্তচক্ষু দেখতে পেয়েছিল সে। দরজায় দড়াম করে লাথি মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল অঙ্কিত।

 

টিডিসি ফোর্থ সেমিস্টার পরে আর কলেজে আসেনি নয়না। ফিফ্থ সেমিস্টারের অ্যাডমিশনের ব্যাপারটা বুঝতে শ্বশুরের কথায় সব কাগজপত্র নিয়ে এসেছে সে। কলেজের গেটে আসার পর নস্টালজিয়া ঘিরে ধরে তাকে। গত কয়েক মাসে জীবনে কত কিছু ঘটে গেছে, বিশ্বাসই হচ্ছে না। মনে হচ্ছিল পড়াশোনার বোধহয় এখানেই ইতি হলো। কলেজের কাজ সেরে অ্যাডভোকেট বিকাশ সান্যালের নম্বর ডায়াল করেন পীতাম্বর। ওদিক থেকে চেম্বারে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় তাকে। নয়নাকে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে বিকাশবাবুর বাড়ির পথ ধরেন পীতাম্বর। একটা উইল করতে হবে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বুঝি এভাবেই হয়। পুত্রকে নিজের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থেকে বেদখল করতে উকিলের বাড়ির সামনে গাড়ি থামে দু'দশক আগের ত্যাজ্যপুত্র পীতাম্বর সরকারের।