গল্প - ২

"চোর"
মৈত্রায়ণ চৌধুরী
(অনুবাদ গল্প, পথ প্রদর্শক Ruskin Bond-এর একটি ছোট গল্পের ছায়া অবলম্বনে)
মৈত্রায়ণ চৌধুরী। জন্ম প্রান্তিক শহর করিমগঞ্জে,পেশা শিক্ষকতা। প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক। ভালোলাগার বিষয় সিনেমা ও কবিতা। সম্প্রতি 'ঝাপসা কাঁচের কবিতা' নামে তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৭ সালে 'দেবী-উৎসবের আড়ালে' নামে একটি ছোট ছবিও তিনি পরিচালনা করেন,যা মুক্তি পায় ঋত্বিজের বার্ষিক চলচ্চিত্র উৎসবে।

।। ১।।

'তোমার নাম?'
'আজ্ঞে,হরি সিং।'
'তোমার বয়েস?'
'আজ্ঞে,১৯।'

 

প্রথম দিন যখন আমার অনিলের সাথে সাক্ষাত হয়,এ'ভাবেই শুরু হয়েছিল আমাদের কথোপকথন। অনিল রোগা পাতলা চেহারার এক যুবক। তার চোখের মণিতে চোখ রাখলেই বোঝা যায়,সে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। একটি সবুজ রংয়ের সস্তা সুতির শার্ট গায়ে দিয়ে সে এসেছিল ফুটবল মাঠে। আপাদমস্তক তাকে জরিপ করে আমার বুঝতে অসুবিধে হয় নি,অনিলের রোজগার গড়ের মাঠ। অবশ্য পরে আমি তার মুখ থেকেই জেনেছিলাম,'ঈশানলিপি' নামের এক পাক্ষিক ম্যাগাজিনে সে গল্প,কবিতা লেখে। সম্পাদক সোহম মৈত্র অনিলকে বেশ মায়াই করেন,তাই প্রতিটি লেখায় তার খুব একটা মন্দ রোজগার হয় না। গল্প লিখে অনিল পায় দু'শ টাকা,কবিতায় আশি। অনিল খরচ করে মেপে,কারণ সে জানে গল্প হোক বা কবিতা,রোজ রোজ তারা মাথায় এসে ভিড় করবে না,আর তাদের অবর্তমানে পয়সার টানাটানি তার লেগেই থাকবে।


'আজকের খেলা দেখে কেমন লাগলো হে?' অনিল আমায় প্রশ্ন করল। আজ আমাদের এই মফস্বল শহরের প্রথম ডিভিশন ফুটবল লিগের অতি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ ছিল। দু'টি ছড়ানো গ্যালারিতেই গিজগিজ করছিল লোকের মাথা। মাঠের মধ্যে দু'দলের খেলোয়াড়েরাই গোলের সন্ধানে ব্যস্ত ছিলেন,আর আমি ব্যস্ত ছিলাম আমার পরবর্তী শিকারের খোঁজে। 'খুব একটা ভালো লাগে নি,মাঝ মাঠে বলের লড়াই তেমন জমল না? স্পোর্টিং স্টার,ছাত্রদল দু'পক্ষই বল টেনে খেলছিল, তাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে স্বাভাবিক ভাবেই।' অনিলের প্রশ্নের জবাব এ'ভাবেই দিয়েছিলাম আমি। 'তুমি কি ফুটবল খেল?' এ'প্রশ্নের নেতিবাচক উত্তর দিয়ে,আমি অনিলকে জানিয়েছিলাম আমি বক্সিং পছন্দ করি। যদিও এ'কথাটি ছিলো নির্জলা মিথ্যে,আমার বাকী সব কথার মতোই। আমি অনিল-কে আমার নামখানাও মিথ্যে বলেছিলাম,কিন্তু সে আমার কথা বিশ্বাস করেছিল। পেশার প্রয়োজনে আমায় অহরহ নাম বদলে চলতে হয়,পুলিশের নজর থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে,কারণ আমি একজন পাকা চোর। লোকের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে,আমি তাদের সর্বস্বান্ত করি,এই নব্বই মিনিটের ফুটবল ম্যাচেও আমি আমার আগামীর ঠিকানা বেছে নিলাম অনিলের আস্তানায়।
                                   

।। ২।।


শহরের এক নীরব পাড়ায় অনিলের দু'কামরার ছোট্ট আশ্রয়। তার নীচে 'যমুনা মিষ্টান্ন ভান্ডার'--- এ'দোকানটির নাম অবশ্য পুরো শহরবাসীর মুখে মুখে ছুটে বেড়ায়,এ'পাড়া থেকে অন্য পাড়ায়। অনিলকে আমি জানাই,আমি এক অনাথ কিশোর। জন্মের সময় আমার মা-র মৃত্যু হয়,আমার এগারো বছর বয়েসে আমার বাবাও আমায় একা রেখে পৃথিবীর মায়া কাটান। অনিল আমার সব কথা বিশ্বাস করে,তার শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমি সব বুঝতে পারি। নিজের পেশার খাতিরে অন্যের স্নায়ুতন্ত্র এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপরেও আমার বেশ ভালো আন্দাজ গড়ে উঠেছে। অনিলের মতো সরল সোজা যুবকের উপর নিজের অর্জিত ক্ষমতা খুব বেশী খরচ করতে হবে না ভেবে,আমার বেশ খারাপ লাগলো। সেদিন রাতে ভীষণ ক্লান্ত ছিলাম,যদিও অনিলের আদেশে ডিম ঝোল বানিয়ে অনিলকে খেতে দিলাম,নিজেও খেলাম। প্রথম রাত্রি,কেমন একটা অস্বস্তি ছিল মনে,তবে আধঘন্টা পর তা কেটে যেতেই আমি ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম। অবশ্য অনিলের বুকের ওঠা-নামার শব্দে আমি বুঝতে পারছিলাম,সে বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।
 

সকালে ঘুম ভাঙ্গলো যমুনা মিষ্টান্ন ভান্ডারের খদ্দেরের কোলাহলে। অনিল আমার আগেই বিছানার আহ্লাদ ত্যাগ করেছে,আমার  খানিকটা অপ্রস্তুত লাগলো। অনিল আমার দিকে তাকিয়ে বলল,'হরি সিং,কাল রাতে ঘুম হলো?' আমার আসল নাম হরি সিং নয়,তাই হয়তো অনিলের কথার জবাব দিতে আমার একমুহুর্ত দেরী হলো,যদিও অনিল তা লক্ষ্য করল না। সে আমার হাতে একটি পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে,নীচের মিষ্টির দোকান থেকে কচুরি আনতে বলল। আমিও সময় নষ্ট না করেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম।
                                         

।।৩।।
 

অনিলের লেখার টেবিলে বসে চা দিয়ে কচুরি সাবাড় করলাম আমরা। অনিল কথায় কথায় আমায় জানালো, সে একজন নিতান্তই সাধারণ লেখক। একটি ম্যাগাজিনে কলম চালিয়ে তার একার সংসার চলে। অনিল আমায় এও বলল,আমি যদি তাকে সহযোগিতা করি,তবে সে আমায় লেখাপড়া শেখাবে। স্নান শেষ করে অনিল আলমারি খুলে শার্ট বের করল--- কোথায় যাচ্ছে প্রশ্ন করায়,অনিল বলল ম্যাগাজিন সম্পাদক সোহম মৈত্র আজ তাকে অফিসে গিয়ে টাকা আনতে বলেছেন---দু'টো গল্প এবং তিনটে কবিতায় খুব একটা মন্দ উপার্জন হবে না ভেবে আজ সে বেশ খুশি হয়েছিল। অনিল বেরিয়ে যেতেই আমার 'চোর' স্বত্বা তার অস্তিত্বের জানান দিল। আমি ভাবতে থাকলাম,অনিল টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরে,সে টাকা রাখবে কোথায়? এ'বাড়িতে মাত্র দু'টি ছোট কামরা--কাজেই অনিলের পক্ষে লুকোছাপা করে আমার নজর এড়িয়ে টাকা রাখা সম্ভব নয়। অনিলের বাড়ি থেকে রেল স্টেশন খুব একটা দূর নয়,তাই কার্যসিদ্ধির পর আমায় খুব একটা কষ্ট করতে হবে না।
 

প্রায় দেড়ঘন্টা পর অনিল ফিরে এলো,হাতে একটি প্যাকেট নিয়ে। আমি দরজা খুলতেই সে প্যাকেটটি আমার হাতে চালান দিলো। আমি খুলে দেখলাম,একটি হলদে কালো শার্ট ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে ---অনিল হেসে বলল,স্নান শেষ হলে, এটি গায়ে দিও,তোমায় মানাবে বেশ।' কথা শেষ করেই নিজের শতছিদ্র মানিব্যাগটি অনিল রেখে দিল নিজের বিছানার তোশকের নীচে। আমার ধূর্ত চোখ,ঐ বিশেষ মূহুর্তকে চোখবন্দি করে রাখল।
 

দুপুরে ভাত খাওয়ার পর,অনিল আমায় জানিয়ে দিলো,খাওয়া দাওয়ায় কষ্ট হলে,আমি যেন তা সঙ্গে সঙ্গে তাকে জানাই। অনিলের ভালো ব্যবহার প্রতিক্ষণে আমায় দুর্বল করে দিচ্ছিলো,যদিও চূড়ান্ত পেশাদার আমি,অামার আরো পাঁচটি শিকারের মতোই অনিলকে আক্রমণের ছক কষছিলাম মনে মনে।
 

বিকেল এবং সন্ধে বেশ একঘেয়ে কাটলো আমার। অনিল ডুবে ছিলো তার লেখার জগতে। আমি একবার পায়ে হেঁটে স্টেশন পর্যন্ত ঘুরে এলাম---সেখানে জানতে পারলাম আজ রাত ১১ টায় এলাহাবাদ এক্সপ্রেস এখান থেকে ছাড়বে। আমি যখন যমুনা মিষ্টান্ন ভান্ডারের বারান্দায় পৌঁছলাম,ঠিক তখনি শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি।
   

বাইরে বেজায় বৃষ্টি,অনিল আমায় রাতে খিচুড়ি বানাতে বলল। আমি রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম,যদিও আমার মনের সুতো বাঁধা ছিলো অন্য কোথাও।
 

গতকালের চেয়ে বেশ খানিকটা আগেই, আজ রাতের খাওয়া পর্ব শেষ হলো। বাইরে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। একটানা লেখতে লেখতে ক্লান্ত অনিল খিচুড়ি খেয়েই তার বিছানায় আশ্রয় নিলো। এদিকে আমি,সময়ের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহারের আশায় জেগে রইলাম। রাত বাড়ার সাথে সাথে মিষ্টান্ন ভান্ডারের কর্মীদের কোলাহল থেমে গেলো একদম। আমি দেওয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম,সময় দশটার ঘরে প্রবেশ করেছে। আমি আস্তে করে অনিলের বিছানার সামনে দাঁড়ালাম,সে বাঁদিকে শুয়ে আছে,এখন হাত বাড়ালেই আমি তার তোশকের নীচে হাত চালাতে পারি। যেমন ভাবলাম,কাজও করলাম তেমনটি----মানিব্যাগটি নিজের পকেটস্থ করে, দরজা খুলে একছুটে চললাম রেলস্টেশনের দিকে।
                                             

।।৪।।
   

বৃষ্টিতে আমার পায়জামা ভিজে গেছে। আমি অনিলের মানিব্যাগ খুলে ভেতরে পাঁচশত টাকার অস্তিত্ব টের পেলাম। এদিকে এলাহাবাদ এক্সপ্রেস গুরু গম্ভীর আওয়াজ তুলে,প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে। সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসা আমার শরীর কাঁপছিলো ঠকঠক করে। বৃষ্টিতে ভিজে নয়,আমার কাঁপুনির কারণ,আমি বারবার অামার চোখের সামনে ভালোমানুষ অনিলের মুখখানি দেখতে পাচ্ছিলাম। সে আমাকে বিশ্বাস করেছিল,অবশ্য আমার অন্য শিকারেরাও 'বাজপাখি' আমায় বিশ্বাস করে নিজেদের ভুল প্রমাণ করেছে। তবে অনিল ছিল বিশেষ এক,সে আমায় পড়ালেখা শেখাবে বলেছিল,আজ দুপুরেই সে আমার জন্য কিনে এনেছিল নতুন শার্ট,যেটি গায়ে চড়িয়ে আমি এই স্টেশনের বেঞ্চিতে বসে আছি। আমি আর ভাবতে পারছি না,স্টেশনে কুলির চিৎকার,যাত্রীদের ছুটোছুটিতে লক্ষ্য করলাম এলাহাবাদ এক্সপ্রেস দুলকি চালে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আর কিছুই চিন্তা করার মতো শক্তি আমার অবশিষ্ট  ছিল না,একছুটে আমি স্টেশনের বাইরে চলে এলাম। বৃষ্টি একটু থেমে এসেছে---- ভেজা মাটির গন্ধেরা আমায় অনুরোধ করছে,অনিলের কাছে ফিরে যেতে।

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions