গল্প - ৬

গোলাম
সৌরভ কুমার চলিহা
অনুবাদ : সিদ্ধার্থ শঙ্কর ভট্টাচার্য

"নভেম্বর ডিসেম্বর মাসে যখন গৌহাটীতে বরফ পড়তে আরম্ভ করে, তখন ছোটো ছোটো ছেলে -মেয়েদের ভারি আনন্দ হয়। রাস্তা, ঘরের চাল, ফুল আর গাছপালা, যানবাহন সমস্ত বরফে ঢাকা পড়ে সাদা হয়ে যায়। সমস্ত শহরের ওপরেই যেন একটা অবিচ্ছিন্ন সাদা আবরণ। সমস্ত পৃথিবী জুড়েই যেন একটা স্বচ্ছ সাদা আলো। পুকুরগুলোর জলও কখনো জমে যায়। গজাল লাগানো বুট আর রং-বেরঙের টুপি পরে ছোটো ছেলেমেয়েরা  হৈচৈ করতে করতে তাঁদের স্লেজ গাড়ী আর চাকা লাগানো রোলার স্কেটার গুলো নিয়ে পরম উৎসাহে বেরিয়ে পড়ে। বরফের বল বানিয়ে একে অন্যের গায়ে ছোড়াছুড়ি করে হাসতে হাসতে নিজেরাই বরফের ওপর পিছলে গড়াগড়ি যায়। শহরের ঢালু যায়গা গুলোতে এখন ওরা স্কিয়িং করে। রঞ্জু আর অঞ্জুদের ঘরের সামনের ছোটো সাঁতার কাটার পুকুরটার জল জমে গেছে আর তার ওপর সারা রাত ধরে বরফ পড়ে পাড়ের সঙ্গে প্রায় সমান হয়ে গেছে। অঞ্জু আর রঞ্জু মহা আনন্দে রোলার স্কেটিং করে পুকুরটা পেরচ্ছে। ঘরের সামনের ঢালু জায়গাটা বরফে ঢেকে সমান হয়ে যাওয়ায় রুনুমির খুব সুবিধা হয়েছে। সে তার ছোটবোনটিকে চাকা লাগানো কাঠের বাক্সটাতে বসিয়ে হড়হড়্‌ করে নিচে নেমে যাচ্ছে। আমরা সবাই জ্যাকেটের বোতামগুলো গলা পর্যন্ত বন্ধ করে বরফ দেখতে বেরিয়েছি। ভোরের তীক্ষ্ণ শিরশিরে বাতাস সূচ ফোঁটার মতো আমাদের গালে আর অনাবৃত কানে এসে বিঁধছে। তুলোর মত পাতলা থোকা থোকা বরফ আমাদের গালে মুখে আর পোষাকে পড়ে গলে যাচ্ছে। ঐযে ওখানে বাচ্চারা একটা প্রকাণ্ড ‘বরফের মানুষ’ বানাতে লেগে গেছে। ঐ তো, বরফে সাদা হয়ে যাওয়া গেটটা খুলে হের্‌ বড়ুয়া রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। একটা নীল রঙের মাফলার খুব ভালো করে তিনি গলায় জড়িয়ে নিয়েছেন। হের্‌ বড়ুয়া ঘরের সামনে পার্ক করে রাখা তার গাড়িটা খুঁজছেন, কিন্তু গাড়ীটার চারদিকে বরফ পড়ে এস্কিমোদের ইগলুর মতো দেখাচ্ছে। ইস্‌,এখন তিনি কিভাবে গাড়ীর ভেতরে ঢুকবেন? ঐযে, ফ্রাউ বড়ুয়া বাইরে এসে হের্‌ বড়ুয়াকে হাত নেড়ে নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন সঙ্গে চিঠির বাক্সটাও খুঁজে দেখতে এসেছেন যে কোনও চিঠি এসেছে কি না? কিন্তু চিঠির বাক্সটাও বরফের তলায় ঢাকা পড়ে একদম সাদা হয়ে আছে। ফ্রাউ বড়ুয়া তার এপ্রনে হাত ঘষে ঘষে গরম করে নিয়ে চিঠির বাক্সের ওপর থেকে বরফের কুঁচি সরাতে শুরু করলেন-"

 

আমার জার্মান রচনাখানার এইটুকু জোরে জোরে পাঠ করে ফ্রাউ ম্যূলার তাঁর গোলাকার কাঁচের পুরনো চশমাটা খুলে বললেন, “চমৎকার, চমৎকার। ব্যাকরণের ভুল একটাও নেই বলেই মনে হচ্ছে। অত্যন্ত প্রশংসনীয়। হুঁ, তারপর একটু অনিশ্চয়তার সঙ্গে বললেন, “কিন্তু, আপনাদের দেশে তো আমাদের এখানকার মতো বরফ পড়ে বলে জানতাম না।“ ফ্রাউ ম্যূলার তাঁর টেবিলে বইপত্রের মাঝখানে থাকা বড় গ্লোবটাকে তর্জনী দিয়ে ঘুরিয়ে ভারতবর্ষ খুঁজে বার করলেন এবং চশমাটা আবার পরে নিয়ে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলেন। “সত্যিই তো – তলা দিয়ে বিষুব রেখা গেছে – গ্রীষ্মমণ্ডল – অসম – অসম – আহ্‌ এই তো, গৌহাটী -গৌহাটী কোথায়, গৌহাটী দেখছি…- “ এই গ্লোবটাতে দেয় নি বোধহয়”, আমি তড়িঘড়ি করে বললাম “ এই যে এখানটায় শিলং – রাজধানী – পাহারের ওপরে, বেশ ঠাণ্ডা – তার ঠিক তলাতেই গৌহাটী-“ ফ্রাউ ম্যূলারের প্রশ্নটা এড়াবার জন্য আমি মহা উৎসাহে শিলং পাহাড়ের বর্ণনা দিতে আরম্ভ করলাম। খাসিয়াদের বাসস্থান, আঁকা বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, বেভেরিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের গ্রামগুলোর মত। ঝোরা আর ছোটো ছোটো পাহাড়ি জলধারা এবং সরল গাছ, আপনাদের ‘টামে’ গাছের মত, বিশাল বিশাল জলপ্রপাত, সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। আবহাওয়া ঠাণ্ডা বা মৃদু, গ্রীষ্মকালীন শৈল-বিহারের জন্য খুবই জনপ্রিয় জায়গা। সমতল থেকে গাড়ী করে গেলে প্রায় একশ কিলোমিটার। কিন্তু রাস্তা একমুখো (ওয়ান ওয়ে), এটা অবশ্য কিছুটা অসুবিধাজনক, যদিও—

 

‘আ? আ? ফ্রাউ ম্যূলার তার বেসামাল শুভ্র চুলে ঢাকা মাথাটা সন্মতিসূচকভাবে নাড়িয়ে নাড়িয়ে সাগ্রহে (কিন্তু যেন কিছুটা আশ্চর্য হয়ে) আমার কথা শুনলেন, আর এর মাঝে মাঝে নীল পেন্সিল দিয়ে আমার লেখাটির জায়গায় জায়গায় দাগ দিতে থাকলেন। যে ব্যবসা পরিচালনা(বা ব্যবসা প্রশাসন) প্রতিষ্ঠানে কাজ শেখার জন্য আমি জার্মানী এসেছি, তাঁরা আমাকে “পেডাগগিশ্বেস্‌ ইনষ্টিটিউট” (অর্থাৎ শিক্ষা স্কুল) এর এই ভদ্রমহিলার কাছে পাঠিয়েছে, জার্মান ভাষাজ্ঞানের একটা পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। এখন পর্যন্ত আমি শিক্ষানবিশ হয়েই আছি। এই পরীক্ষাটায় উত্তীর্ণ হলে তারা আমাকে নিয়মানুসারে ‘বেআম্‌টার্‌’ বা কর্মচারী রূপে নিয়োগ করবে। প্রশিক্ষণ শেষ হলে একটা ‘ডিপ্লোমা’ দেবে।

 

ফ্রাউ ম্যূলার বললেন যে তিনি জাপান আর ভারতবর্ষ সম্বন্ধে অনেক কিছু পড়েছেন,বিশেষ করে ভারতবর্ষ দেশটা দেখার জন্য, ঈশ্বর চাইলে, তাঁর একবার যাওয়ার খুব ইচ্ছে, প্রাচ্যের এই রূপকথার মত দেশগুলি দেখানোর জন্য তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের -গ্রেটশ্বেন্‌ আর ফ্রিৎস্‌কেও সঙ্গে নিতে চান (ডিপ্লোমা আনার জন্য নয়)। ভদ্রমহিলা প্রৌঢ়া, কিন্তু এখনো সব বিষয়েই তাঁর অপার কৌতূহল। “ভালো কথা, হের্‌ অমুক, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আপনার রচনাটি আমাকে সত্যিই অবাক করেছে। আপনার জার্মান সংশোধনগুলি ও বাক্যরচনাগুলি যদিও মোটামোটি চলনসই হয়েছে, কিন্তু তাতে এমন এমন দু-একটা প্রাথমিক ভুল রয়ে গেছে যা শুনলে আমাদের স্কুলের বাচ্চারাও হাসবে। অথচ রচনাটা…”, ভদ্রমহিলার রাঙা মমতা মাখা মুখটায় বিমূঢ়তার  ছায়া পড়ল,- “বেশ, সব মিলিয়ে এটাকে ভালই বলতে হবে। যাইহোক আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব ভালো লাগল” ভদ্রমহিলা টেবিলের পাশে থাকা বাল্টি থেকে দু-টুকরো কয়লা আগুনে ফেলে দিয়ে ডান্ডা দিয়ে খুঁচিয়ে দিলেন, আর হঠাৎ বোধহয় তাঁর মনে পড়ল যে আমি গ্রীষ্মমণ্ডল থেকে এসেছি, “এখানে বোধহয় আপনার প্রথম প্রথম খুব ঠাণ্ডা লাগত, তাই না? অবশ্য আপনার রচনায় যা বর্ণনা”-, ভদ্রমহিলার মুখে আবার একটা বিভ্রান্তির রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল-, “ঘরটা গরম হয়েছে না এখন-? যদি বেশি গরম লাগে তাহলে কোটটা খুলে রাখতে পারেন”-

“ধন্যবাদ ফ্রাউ ম্যূলার”, আমি বললাম, আর অনুমতি পেয়ে কোটটা খুলে চেয়ারের পিছনে ঝুলিয়ে রাখলাম।

 

ফ্রাউ ম্যূলার আমার কাগজটা আগাগোড়া আবার দেখে আরও কয়েকটা দাগ দিলেন তারপর কিছু একটা মন্তব্য লিখতে লিখতে বললেন, “আচ্ছা বলুন তো, এই ‘ব্যবসায়-পরিচালনা’ ব্যাপারটা – আমি অবশ্য এসব ব্যাপারে কিছুই জানিনা – এই ‘ব্যবসায়-পরিচালনা’ বিষয়টি আপনাদের দেশে কি এখনো শেখানো শুরু হয়নি? মানে, আপনাকে যে এই ডিপ্লোমাটির জন্য এতদূর আসতে হল- মানে”, ভদ্রমহিলা মাথাটা তুলে একটু বিব্রত ভাবে হাসলেন – “ মানে, আমিতো শুনি আমাদের দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রথা এবং কায়দা-কৌশল ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলি থেকে ভিন্ন, এশিয়ার সঙ্গে তো তাহলে নিশ্চয়ই অনেক অমিল হবে। এই ডিপ্লোমাটি নিয়ে তাহলে আপনাদের দেশের কি লাভ-?”

 

একথার কিই বা উত্তর দেব? কোনোরকমে ডিপ্লোমাটা নিয়ে দেশে যাব আর দেশের লোকেদের নাকের ডগায় সেটা নাচাব। জার্মানীর ডিপ্লোমা – পদোন্নতি অনিবার্য। প্রথম কয়েকবছর জমি কিনতে পারবনা, হয়তো গাড়ীও কিনতে পারবনা; কিন্তু ঘুরে ত এসেছি; রাম,শ্যাম,যদু সবাই ‘ঘুরে এসেছে’ বিচিত্র অছিলায়, বিচিত্র উপলক্ষে, ছলে বলে কৌশলে, নইলে যে জীবন বৃথা, নইলে জীবনে ধিক, তাহলে আমিই বা ছাড়ব কোন দুঃখে? নিজের জমি-জমা থাকলে বন্ধক দিতাম, মেধাবী হলে হয়ত বৃত্তি যোগাড় করতে পারতাম। সেসব যখন হল না তখন প্রচুর পরিমাণে তেলই দিলাম “যত্ত সব ইয়ে” মানুষদের, দেশের চাকরীর থেকে বেতনহীন ছুটি নিলাম, এবং অবশেষে আজ আমি এইখানে! আর কোনোমতে এইকটা মাস কাটিয়ে দিলেই………

 

কিন্তু এসব কথা ফ্রাউ ম্যূলার বুঝতেই পারবেন না। তাই সংক্ষেপে বললাম, “চাকরীর সুবিধা হবে”। “অ’?” ভদ্রমহিলা না বোঝার মত করে বললেন। তারপর যেন এই দুর্বোধ্য কথাবার্তার পালা শেষ করার জন্য কাগজপত্রগুলো গুটিয়ে সরিয়ে রাখলেন আর বললেন “ঠিক আছে, আপনার ভাষা-পরীক্ষার রিপোর্ট আমি আজকেই পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। অভিনন্দন”।

 

পাস করেছি তাহলে!

 

“ধন্যবাদ, ফ্রাউ ম্যূলার!”

 

ভদ্রমহিলা বললেন যে এর পর “রীকমান্‌ উল্ট রীকমান্‌” কোম্পানি আমাকে নিয়ে কি করল তাকে জানালে তিনি খুশি হবেন।

 

“নিশ্চয়ই জানাবো”, আমি বললাম – একলাফে দেড়শ মার্ক বেতন বাড়বে – এবার কোটটা নেওয়ার ভান করে চেয়ার ছেড়ে উঠবার উপক্রম করলাম।

 

“যাই হোক” ফ্রাউ ম্যূলার হাতঘড়ি দেখে বললেন – “আমার পরবর্তী পরীক্ষার্থীর আসতে এখনো প্রায় মিনিট কুড়ির মত সময় আছে – ইরানের ছেলে, তেল পাইপ লাইন রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আসছে। একেবারেই কাঁচা, আমি ঘর থেকে করে আনার জন্য যে কাজ দিয়েছি তা বোধহয় কিছুই……”, ভদ্রমহিলা আবার ঘড়ী দেখলেন – আমাদের ইনস্টিটিউটের এগারোটার কফি ব্রেকের সময় হয়ে গেছে – এ – আপনাকে এক কাপ কফি অফার করতে পারি কি?  (“ধন্যবাদ ফ্রাউ ম্যূলার”) …… যাক, এই ভাষা পরীক্ষার ঝামেলাটা যখন পার হল তখন ঈশ্বর করুন আর ছমাসের ভিতরে এদিকের কাজ শেষ করে আপনি ঘরে চলে যেতে পারবেন। আপনার বোধহয় এখানে এতদূরে এসে ঘরের কথা খুব মনে পড়ে – হ্যাঁ, ভাল কথা, আপনার ঘরে কে কে আছে?”

 

ঘর থেকে রওয়ানা হওয়ার দিনের দৃশ্যটা মনে পড়ল। সেই মাসে লাগাতার বৃষ্টি নেমেছিল- প্রায় অবিশ্রান্ত, আর শহরের একটু ভেতরের দিকে থাকা আমাদের ঘর থেকে যে সরু রাস্তাটা – গাড়ি যায়না এমনকি রিক্সাও যায়না – বড় রাস্তায় এসে পড়েছে, সেটা একটা স্রোতস্বিনী নদী বিশেষে পরিণত হয়েছিল। তাই আমাদের অফিসের খালি পায়ের বয়’টার হাতে বাক্স পত্র সমঝে দিয়ে আমি আর আমার ভাই জুতো-মোজা খুলে ট্রাউজারের ঠ্যাং গুটিয়ে নিয়ে ‘খালটা’ অতিক্রম করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বোন দুটিও যদিও এই গলি দিয়ে সব সময় মেখলা-চাদর গুটিয়ে স্যান্ডাল হাতে নিয়ে ইস্কুলে আসা যাওয়া করে, সেদিন আমি তাদের আর আমার সঙ্গে বড় রাস্তা পর্যন্ত আসতে দিলাম না। প্রথম কারণ, বড় রাস্তায় আমি ট্যাক্সিতে ওঠার পরই এরা দুজনেই ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে কাঁদতে সুরু করে দেবে, অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতি, আর এর ফলে বেশ কিছু দেরিও হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ঘরের বেড়ায় মেঝেতে ছোটো ছোটো ব্যাঙ, শামুক, বিচিত্র সব পোকা-মাকড় আর সঙ্গে নানাজাতীয় বিভিন্ন আকারের বিছেও বেরিয়েছে, দুজনের গায়েই বিছে লেগেছে, দু হাতেই লাল লাল দাগড়া দাগড়া দাগ, বিছে লাগার অব্যর্থ মহৌষধ হিসাবে দুই কানে দুই খাবলা চুন লাগিয়ে দুজনকেই একেবারে কিম্ভূত লাগছে। তৃতীয়ত, আমাদের অঞ্চলটার পেছন দিকে শুকনো বিলটার পারে যেসব অজ্ঞাতকুলশীল উদ্বাস্তু মানুষ নড়বড়ে কাঠের চেয়ার-টেবল বানানোর ছাউনি বা পচা আলু পেঁয়াজের স্তুপ বা চোরাই প্লাস্টিকের মাল, মানিব্যাগ, গগলস আর হাওয়াই চপ্পলের ব্যবসা পেতে নির্বিকার এবং অপ্রতিহত ভাবে বসে গেছে, তাঁদের ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের বিলের পাড়েই কখনো কখনো সার বেঁধে উলঙ্গ হয়ে বসে যেতে দেখেছি ( বড়রা কি করে সেটাই একটা রহস্য)। আর এখন বৃষ্টির জলের স্রোতে সেইদিকের জল বয়ে আমাদের গলিটা পর্যন্ত আসছে, আর তার সঙ্গে নানারকম সন্দেহজনক জিনিষ রাস্তার গর্ত গুলিতে এসে ধাক্কা খেয়ে জমে আছে, আর এর ফলে উদ্ভব হওয়া বিভিন্ন গন্ধের মধ্যে কেমন যেন একটা চিমসে……না, তাঁদের পায়ে ঘা হয়ে যাবে!

 

মা’কে প্রণাম করলাম, বাবাকে প্রণাম করলাম আর বিদায় দিতে আসা বয়স্ক কয়েকজনকে। মা চাদরের খুঁটে চোখ মুছছেন আর নাক দিয়ে সোৎ সোৎ করছেন- সম্ভবত রান্নাঘরের বেড়াগুলোর নানা ফাঁকে-ফোঁকর দিয়ে জল ঢুকে ঘরটা স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যাওয়ায় মা’র ঠাণ্ডা লেগেছে। শোবার ঘরটারও চালে একটা ফুটো হয়ে জল ঢুকছে (বর্ষার সময় এলেই মা’র আপাত শৃঙ্খলিত সংসারের হাল বেহাল হতে শুরু করে। বাসন ধোওয়ার সিমেন্টের ভাঙ্গা চাতালখানার চারিদিকে কাঁদার ডোবা সৃষ্টি হওয়ায় কাজের মেয়েটা আর সেদিকে যেতে পারেনা, না-ধোয়া বাসন-কোসন্‌ রান্নাঘরে স্তূপাকৃতি হয়ে পড়ে থাকে)। এদিকে  পর্দাটা খামচে ধরে মা কান্নাকাটির মাঝে মাঝে একেকবার সন্ত্রস্ত হয়ে নিজের খালি পা দুটোর দিকে দেখে নিচ্ছেন (কেন্নো কে মা খুব ভয় পান, দেখলেই নাকি গা’টা শির্‌শির্‌ করে ওঠে। আর এই সময়টাতে ঘরের মেঝেতে প্রচুর কেন্নো এক্সপ্রেস যাতায়াত করে, পায়ে কিছু একটার ছোঁয়া টের পেলেই মা- ‘ও মাগো, এটা কিগো!’ বলে চিৎকার করে লাফিয়ে ওঠেন)। চটির ভিতরে বাবার মোজা পরা পা, বাবা আমাকে বিদায়কালীন উপদেশ, নিষেধাজ্ঞা আর নির্দেশ দিচ্ছেন (বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক), হাতে হুঁকো, বাবার কথাবার্তা রুক্ষ। বাবার বাতের ব্যথা আছে, এরকম আবহাওয়ায় মেজাজ ইস্কুলের দিদিমণির মত খিটখিটে হয়ে থাকে, তার উপর এখন এই প্রায়ান্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে সংকীর্ণ ঘরের ভেতরে – বস্তুতঃ, ঘরটির সর্বত্র -কানের কাছে মশা পন্‌ পন্‌ করতে থাকে, যেখানে বসা যায় সেখানেই ছারপোকা কামড়ায়, পান থেকে চুন খসলেই থেকে থেকে আমাদের ওপর চেঁচামেচি করেন, আর সারা গা চুলকোতে চুলকোতে চেয়ারে বসে হুঁকো টানতে থাকেন। আমি আন্দাজ করতে পারছি যে আমি চলে আসার পর, বোনেরা ও অন্যান্যরা সরে গেলে পর যখন মা আলাদা করে একটু আম কেটে এনে দেবেন আর চায়ের কাপটা সামনে রাখবেন, তখন বাবার কর্কশ কণ্ঠ একটু কোমল হবে। কিন্তু বেশি সময়ের জন্য নয়, কারণ চায়ের কাপটা যেই মুখে দিতে যাবেন তখনই একটা মাছি এসে চায়ের কাপে পড়বে, আমের টুকরোগুলোর ওপর কোথা থেকে বড় বড় নীল মাছি এসে ভন্‌ভন্‌ করতে থাকবে। আজকে সন্ধ্যায় বাবা আর কোথাও যাবেননা (এই জলাশয় অতিক্রম করে যাবেনই বা কিকরে?) লম্ফটা জ্বালিয়ে কপাল কুঁচকে ‘অসম বাণী’ পড়বেন ঃ বর্ষার প্রকোপে অমুক জায়গার ক্ষেত-কৃষি নষ্ট হয়েছে, বন্যা, বন্যা, বন্যা। অমুক স্থানে দুর্ভিক্ষ, তমুক স্থানে মড়ক আর তমুক জায়গায় মহামারী। অতএব চালের দাম আরও বাড়বে। বৃষ্টিতে রাস্তা ভাঙছে, পুল ভাঙছে, শহরের রাস্তা চলাচলের অনুপযুক্ত বাস স্টেশন আর রেল স্টেশনের ভেতর মহাসাগর সৃষ্টি হওয়ার দরুন যাত্রীরা উঠতে পারে নি, রিকশাওয়ালারা চম্পট দিয়েছে- রেল বন্ধ, ডাক, তার বন্ধ পরিবহন স্থগিত। ঘর হারানো আর খড়ের চালা হারানো মানুষের ভিড়, ইত্যাদি পৌনঃপুনিক কাহিনী – আর স্থানীয় জেলা গ্রন্থাগার ভবনে ‘মধুগুঞ্জন’ কৃষ্টি সংস্থার উদ্যোগে ‘বর্ষামঙ্গল’ উৎসব উদ্বোধন করবেন একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট…………

 

আমার ছোটভাই নীরেন কলেজে পড়ে, সেও ‘মধুগুঞ্জন’রসী অন্যতম ভ্রমর, কিছুটা রোমান্টিক টাইপের। আমাকে বিমানবন্দরে ছেড়ে আসার পর সে কি করবে সেটাও আমি অনুমান করতে পারছি। মোটরগাড়ির ছিট্‌কানো কাদাজলের ছিটে লাগা পায়জামা দুহাতে উপরে টেনে তুলে মিউনিসিপালিটিকে জাহান্নমে যেতে বলে সে আমাদের গলিতে ঢুকবে। গলির প্রায় মুখেই মানিক বাবুর নতুন ঘরটা, মানিকবাবু ওয়ার্ড কাউন্সিলার। সেদিকে অভ্যাসমত একটা ক্রুদ্ধদৃষ্টি নিক্ষেপ করে মানিক বাবুর মুণ্ডপাত করবে (কারণ এলাকার মধ্যে শুধু উক্ত ওয়ার্ড কাউন্সিলারের ঘরের সামনে থেকে বাইরের বেরোনোর গলির অংশটিই রহস্যময় ভাবে পাকা আর গমনযোগ্য)। সামাজিক কর্তব্য শেষ; এসব ছোটোখাটো ব্যাপার। তারপর সে কোনোমতে ঘরে ঢুকে পায়জামা আর জহর কোটটা খুলবে, পা ধুয়ে বোনের স্যান্ডালটা পরবে, বোনকে খুঁজেপেতে এককাপ চা খাবে আর তারপর তার ঘরে গিয়ে ঢুকবে। ‘বর্ষামঙ্গলে’র প্রয়োজনমত সে তার বইয়ের তাকে থাকা তার ‘সঞ্চয়িতা’ নামের মোটা কবিতার বইটা টেনে নামাবে না নামাবে না সেটা বলতে পারবোনা (মেজাজ নিয়ে কথা), যেখানে বলা হয়েছে যে আমাদের দেশের শ্যামগম্ভীর  নবযৌবনা বর্ষা সুন্দর, অপরূপ, এর তুলনা নেই, এমন দিনে যখন ‘বাহিরে জল ঝরে অনিবার নিভৃত নির্জন চারিধার – আমরা দুজন যুবক যুবতি দুজনে মুখোমুখি বসে গভীর দুঃখে দুঃখিত হয়ে পরস্পরের মুখের দিকে চোখ স্থির করে চেয়ে থাকতে হবে বোকার মত ( বোধহয় বাইরে যাওয়াটা অসম্ভব তাই)। (আর আমাদের নিজেদের চোখ নাকগুলো এখন আমরা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে দিতে পারি, কারণ বিলেতের মানুষ যখন এই কবির তারিফ করেছে, তাঁর কথাই নিশ্চয় ঠিক ঃ আমাদের দেশটা এতো সুন্দর, এতো পরিষ্কার, এতো সৌম্যস্তব্ধ সমাহিত শান্তিতে ভরা আবেশ বিহ্বল স্বপ্নপুরী; বর্ষা নামলে প্রতিটি শহর, প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি জঙ্গল আরও পরিষ্কার আরও সুন্দর আরও অপরূপ হয়ে ওঠে, এর কোনও তুলনা নেই!)। অবশ্য এর পরবর্তী সমস্যাটা হবে আমার রচনাটার মতো ঃ ঐযে নীরেন দত্ত ডিস্ট্রিক্ট লাইব্রেরী যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়েছেন…… ইস্‌ আজকের এই সন্ধ্যায় তিনি তাঁর বুদ্ধিজীবীর পোশাকের পারিপাট্য বজায় রেখে বড় রাস্তায় কিভাবে উপনীত হবেন?

 

কফিতে চুমুক দিয়ে পরিতৃপ্ত হলাম। আঃ! অবশেষে আমার স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। আগামী মাসে ঘরে তিন-চারশো মার্ক যা পারি পাঠাতে হবে। বাবার ঘরের বেড়াগুলো আর মা’র রান্নাঘরের ফুটো চালটা কিছুটা হলেও সারিয়ে নিক।

 

ঘরে ফিরে গিয়ে মানিকবাবুকে বলে কয়ে পারলে ঘরের সামনে থেকে কিছুদূর পাকা করিয়ে নিয়ে বন্ধ নর্দমা দুটো কাটিয়ে নেওয়ার (পারলে ঢেকে দেওয়ার) একটা চেষ্টা করব ( একটা চেষ্টা! – আমার আর বোনেদের নাহলে খুব অসুবিধা হয়।) এলাকার বাকিটুকু অবশ্যই আমার চেষ্টার মুল্লুকে পড়েনা। সব কাজ কি একজনই করবে? এতো কাঠ-খড় পুড়িয়ে জার্মানীতে এসেছি কি বাড়িতে ঘুরে গিয়ে জনগণের কথা ভেবে মরবার জন্য? আমি কি গর্দভ?

 

ইরানী ছেলেটার আসার সময় হয়ে এসেছে। ফ্রাউ ম্যূলার চেয়ার থেকে উঠে করমর্দন করলেন এবং আরও একবার না বলে থাকতে পারলেন না যে “তোমার শহরের একটা বর্ণনা” যেটা আমি জার্মান ভাষায় লিখে এনে দিয়েছি, সেটা ‘আউফাজাৎস্‌’ -সেই রচনাটি তার কাছে একেবারে আশাতীত মনে হয়েছে, সম্পূর্ণ নির্ভুল আর একেবারে পাকা হাতের বর্ণনা। এরকম জানলে তিনি আমাকে আরও দীর্ঘ (আরও কঠিন) কাজ দিতেন, যেমন ধরুন – এই বিষয়বস্তুটাই যদি নেওয়া যায় যে বরফ গলতে আরম্ভ করার পর আপনার শহরের অবস্থা কিরকম হয় তার একটা বর্ণনা –

 

আমি মনে মনে প্রমাদ গুনতে থাকলাম, কিন্তু একটা মুচকি হাসি দিলাম।

 

“বোধহয় মোটামোটি আমাদের এখানের মতই, আপনার ‘আউফজাৎস্‌’টা পড়ে আমার যা ধারনা হয়েছে’, ফ্রাউ ম্যূলার তার সাদা চুলগুলির মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে ধীরে ধীরে ভেবে ভেবে বললেন, “ বরফ গলছে, ঘরের লাল চালগুলো, নানান জিনিষের অবয়ব, গাছপালা, রাস্তা-ঘাটের ওপর থেকে বরফের আবরণ সরে গেছে, নিজ নিজ রূপে আবার আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছে, আবার যানপ্রবাহ আর জীবনের চাঞ্চল্য ……… অবশ্য ধুলো কাঁদায় গলিত বরফের জলে রাস্তাঘাট কিছুটা নোংরা হয়েছে প্রথম প্রথম, রাস্তার জায়গায় জায়গায় জল জমা হয়েছে। যদিও খুব শীগগিরই বরফ চেঁচে নেওয়ার গাড়ীগুলো আসবে, কয়েকঘন্টা পরই সবকিছু আবার আগের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে। (সামূহিক পরিচ্ছন্নতার ভার নগর-পিতা’রাই নিয়েছেন, সে বিষয়ে আর যাইহোক আজকাল আর নাগরিকদের চিন্তিত হতে হয়না) অবশ্য কিছু কিছু রাস্তায় এই বেঢপ গাড়ীগুলো ঢুকতে পারেনা, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে সে সব জায়গায় আমরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করে নিতে এতদিনে শিখে গেছি। এই ধরুন, আমার ঘরটা, ক্লিন্‌কার্‌ফ্যুস্‌গাসে নামের সরু একটা গলির ভেতর- সেদিকে কখনো গিয়েছেন কি? জ্যাকবি গির্জার পাশ দিয়ে যে রাস্তা ঢুকে গেছে – সেখানেও এইসব গাড়ী ঢোকেনা,আমাদের ঘরের সামনের বরফগুলো আমার ছেলে-মেয়ে দুটোই কোদাল দিয়ে সাফ করে দেয়। দু দিকের দুটো বাড়িতে আবার তেমন কোনও কর্মঠ মানুষ নেই, শুধু বুড়ো-বুড়ি থাকে, সেইজন্য আমার গ্রেটশ্বে’ন্‌ আর ফ্রিৎস্‌ কে বলেছি, তোরা এই দুটো বাড়ির সামনের বরফগুলোও পরিষ্কার করে দিস্‌…… যাইহোক, আশাকরি আপনাদের ওদিকেও-“

 

মুচকি হাসিটা কোনোমতে বজায় রেখে সামান্য মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে শুনে গেলাম। ভবিষ্যতে যদি আমার ছেলে-মেয়ে হয়, তাহলে আমার ‘গ্রেট্‌শ্বেন্‌’কে পারলে এইদিকের থেকে ঘুরে যাওয়া কোনও ছেলের সঙ্গেই বিয়ে দেব, আর আমার ‘ফ্রিৎস’ কে এদিকের একটা ডিপ্লোমা আনার জন্য পাঠাবো। আর এই ফ্রাউ ম্যূলার কিনা তাঁদের দিয়ে অন্য লোকের ঘর পরিষ্কার করানোর কথা বলতে শুরু করেছে  বুদ্ধি-টুদ্ধি একেবারেই নেই নাকি? তুষারপাত শেষ হলে- বা বৃষ্টি থামলে পরে – আমার শহরটির রাস্তা-ঘাট, নালা-নর্দমা কিভাবে আত্মপ্রকাশ করবে, আমার মা যে গলিটা দিয়ে বেরোন আর পিছনদিকের বিলের পারের রিফিউজি কলোনির চালা ঘরগুলো কি রূপে প্রকট হয়ে উঠবে (গন্ধের কথা আর উহ্যই রাখলাম) সেই বর্ণনা দিয়ে একটা ‘আউফ্‌জাৎস্‌’ লিখে আমি অবশ্যই এই ভদ্রমহিলাকে দিতে পারবোনা, কারণ ততটুকু জার্মান ভাষাজ্ঞান আসলে আমার নেই- যে বর্ণনাটা লিখে দিয়েছি সেটা সহজেই অনুমেয়- ‘সরল জার্মান শিক্ষা’ নামের একটা পুরনো জার্মান-ইংরেজি বই থেকে তস্কৃত, ‘আমাদের শহরে বরফ’ – শুধু নামগুলো বদলে দিয়েছি, ‘আমাদের শহরের’ জায়গায় ‘গুয়াহাটী’ বসিয়ে দিয়েছি। 

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions