যৌবনের আঙিনায়

একজন ইন্ডেপেন্ডেন্ট ই-উথ এর ডায়রি থেকে

কৃশানু ভট্টাচার্য

২২ আগস্ট ২০২১

 

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এর পর এক স্বাধীন যুবকের ডায়রির পাতা থেকে তাঁর কিছু কথোপকথন নিজের সাথেই ...

আমার আমি : হ‍্যাপী ইন্ডিপেনডেন্স ডে , কেমন সেলিব্রেট করলি দিনটা ?? ৭৫ বলে কথা । ভাবতেই এক্সাইটেড লাগছে।

আমি : এক্সাইটেড !! কেন ??

আমার আমি : একটা স্বাধীন দেশ ৭৫ বছরে পড়ল আর তুই এক্সাইটেড নয় ?? সারা বছর কত উদযাপন হবে, কত উৎসব হবে। সবাই কত খুশীতে আছে আর তুই জিজ্ঞেস করছিস কেন এক্সাইটেড ??

আমি : সবাই সত্যিই খুশীতে আছে ?? বাড়িতে বন্দি ছাত্রছাত্রীরা খুশীতে আছে ?? লকডাউনের ভুক্তভোগী ব্যাবসায়ী, শ্রমিক, দিন আনি দিন খাই মানুষেরা খুশীতে আছে ?? বিদেশী আদালত এর ত্রাস সহ্য করা গরীবেরা খুশীতে আছে ?? আত্মহত্যার চিন্তা করা কৃষকেরা খুশীতে আছে ?? আর ... ওভারটাইম ডিউটি করা সৈনিকেরা, পুলিশেরাও কি খুশীতে আছে ?? আরও বলবো ??

আমার আমি : নাঃ এটা তো ভেবে দেখি নি। সত্যিই তো ! এরাও তো স্বাধীন ভারতেরই নাগরিক। এরাও তো ৭৫ বছরে পা রাখা দেশেই থাকছে। 

আমি : শুধু এটুকু নয় রে। এবছর শুধু স্বাধীনতার ৭৫ ও নয়, দেশভাগের ও ৭৫ বছর। আমরা এটাও কি মনে রাখছি ?? এবং এই দ্বন্দ টাও আমার মতন হয়তো অনেকেরই মনে ঘুরছে যে ৭৫ কে উদযাপন করবো না এই যারা কষ্টে ভুগছেন, তাঁদের পাশে দাড়িয়ে সন্তাপ, হাহুতাশ করবো। আমরা এতো বছরে হয়তো পেয়েছি অনেক কিছুই, কিন্তু আবার অনেক না পাওয়ার যন্ত্রণাও আছে। দেশভাগের ভুক্তভোগী মানুষদের পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম আজ এই দেশেতেই নাগরিকত্বের পরিচয় ধরে রাখতে ধুঁকছে, আর তার মধ্যে গরীব হলে তো কথাই নেই, ডী সন্ত্রাস তাঁকে একদম নিংড়ে ছাড়ছে। অনেককে তো মরতেই বাধ্য করেছে এই দেশভাগ। তো বল, স্বাধীনতার উল্লাস, উদযাপন কি আমাদের মানায়।

আমার আমি : বুঝলাম, কিন্তু দেখ। সব কিছুর একটা ভালও দিক ও তো আছে। আজ যে আমরা স্বাধীন, তাই তো দেশভাগের ভুক্তভোগীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে পারছে। বাড়িতে বন্দী ছাত্রছাত্রীরা, লকডাউনের ভুক্তভোগী ব্যাবসায়ী, শ্রমিক, কৃষকেরা এবং অন্যান্য মানুষেরা রাস্তায় নেমে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিবাদ করতে পারছে। পরাধীন দেশে কি তা সম্ভব ?? পারছে তিব্বতের মানুষেরা নিজের জায়গায় মুখ খুলে দাঁড়াতে ?? পারছে আফগানিস্তানের সাধারণ নারীরা তালিবানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ?? পারছে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোর মানুষেরা বন্দুকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ?? এটাও তো স্বাধীনতার ও পরাধীনতার তফাৎ নয় কি ??

আমি :  হ্যাঁ, তোর কথাও ফেলে দেওয়া একদমই যায়না। আমরা হয়তো স্বাধীনভাবে উদযাপন করতে পারছিনা কারণ আমাদের মধ্যে অনেকেরই জীবন যাপনের বেশ কিছু বিষয় অন্যের ভাবনার অধীনে থাকার কারণে আমরা সেই বিষয়গুলো নিয়ে কিছু অসুবিধার মধ্যে আছি, কিন্তু এটা তো ঠিক আমরা সেটা নিয়ে ভাবার বা সেটার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য স্বাধীন আছি। তুই যেসব মানুষের কথা বললি, তাঁরা সত্যি সত্যিই পরাধীন। 

আমার আমি : এই ভালো মন্দ অবস্থার মধ্যেই আমাদের বাঁচতে হবে রে। Ideal State, রাম রাজ্য সব মুখেরই কথা। পৃথিবীটা রণ, বন, জল, জঙ্গল, পাহাড়, খাদ, আগ্নেয়গিরি, বাগান, গর্ত, নিয়েই। এটা এভাবেই থাকবে। এখন কথা হচ্ছে, যারা এখানে থাকছে, তাঁরা কিভাবে নিজের চারপাশ কে দেখছে, তাঁরা মানসিক ভাবে ও জীবন যাপনে কীরকম জায়গায় থাকছে ?? এবং আমাদের মনেই আমাদের স্বাধীন ও পরাধীন থাকা, আমাদের মনেই আমাদের উদযাপন, আমাদের উচ্ছ্বাস, অথবা আমাদের হাহুতাশ।

আমি : হ্যাঁ তোর কথাই ঠিক। সব কিছু আমাদের মনেই। এবং মানুষের মন কষ্টের মধ্যেও ভালো থাকার জন্য উদযাপন চায়, রুখে দাঁড়ানোর জন্য উচ্ছ্বাস চায়। আমরা ৭৫এ এই ভেবেই প্রবেশ করি যে আচ্ছে দিন যেন কারো বাপের সম্পত্তি না হয়। সবার অধিকার আছে আচ্ছে দিন দেখার। ভারতে থাকা প্রত্যেক মানুষ এই দেশের ৭৫ বছরে ভালো ভেবে (ভালো ভাবে থেকেও বড় বিষয়) বেঁচে থাকার জন্য তৈরি হোক। তাহলে গিয়েই হয়তো এই দেশের ১০০ বছর যেদিন হবে, আমরা কেউ কেউ নই, সবাই মিলে একসাথে খুশীতে দিনটাকে উদযাপন করতে পারবো ... আর তোর মতন বলতে পারবো "হ‍্যাপী ইন্ডিপেনডেন্স ডে" ...

 

"Happy 100 to Independent India" ...