যুব দর্পণ

কোভিড-১৯ 'ভয়', ভয়ার্ত সমাজ এবং ভয়কে জয় করা
বিশাখা অধিকারী
০৬ জুন ২০২১

নিজের কোভিড কালের কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে ভাগ করেছেন

বাংলা বিভাগ, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর চূড়ান্ত বর্ষের পড়ুয়া বিশাখা অধিকারী ...

কোভিড সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে কাউকে ফোন করলেই একটা বিরক্তিকর Caller tune শোনা যায়, যার শেষের দিকটা এরকম — রোগীর সঙ্গে নয়, রোগের সঙ্গে লড়তে হবে। আমার কোভিড হওয়ার পর এই কথাগুলো খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করি।

               

গত ৮ মে থেকে আমি হালকা সর্দিজ্বর অনুভূত হয় এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ১১মে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাই। হালকা বলছি এই কারণেই যে প্রতিবছর এই সময়ে অর্থাৎ ঋতু পরিবর্তনকালে আমার জ্বর হয়। যেহেতু সময়টা ভালো নয় তাই সুস্থ হলেও আমি নিজেকে আলাদা রাখছিলাম সবার থেকে; কারণ এই সময় 'একা'-র চিন্তা করার সময় নয়, নিজের আগে 'বহু'-র চিন্তা করতে হয়। কারণ আমার সমাজ, আমার চারপাশ ভালো থাকলে তবেই আমি ভালো থাকতে পারবো । ১৩ মে সকাল থেকেই একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছিলো, যা ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিলো। জীবনে এই প্রথম শ্বাসকষ্ট হয় আমার। হাসপাতাল যাবো বলতেই মা-বাবা বারণ করে। দুঃশ্চিন্তায় হোক বা কোভিডের ভয়েই হোক তাঁরা কিছুতেই চাইছিলো না যে আমি হাসপাতালে যাই। কারণ জানতে চাইলে মা ভয়ার্ত কন্ঠে বললো, "গেলেই করোনা টেস্ট করবো।" বাবা বললো, "তুমি সবসময় ভাবো করোনা হইছে এরলাগইয়া এখন মনে হর শ্বাসকষ্ট, ইটা মনের ভুল"। তারপর আমি জেদ ধরলে তাঁরা রাজি হয় এবং যাত্রাপথে প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে কালাইন হাসপাতালে পৌঁছাই বিকেল ৪:৩০ নাগাদ। মাত্র ৫ কিলোমিটারের যাত্রাপথের বর্ণনা দিয়ে যদি ৫ সেন্টিমিটার লিখি সেটাও হবে সমাজের লজ্জা। ছোটোবেলায় দাদুর মুখে একটা কথা শুনতাম 'কাল তো কাল বর্ষাকাল, ছাগলে চাটে বাঘের গাল' — তখন ঠিক এটাই মনে হলো। বিপদের সময়ে অন্যকে সাহায্য করা তো দূরের কথা, আত্মতৃপ্তির তাড়নায় আমরা তাকে আরো বিপদে ঠেলে দেই আর সেখানেই আমাদের পরম আনন্দ! সময় যেনো আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো মানুষের মতো দেখতে হলেই সবাই মানুষ হয় না। যাইহোক হাসপাতালে পৌঁছতে পেরেছি এই অনেক। সেখানে ইমারজেন্সিতে যে ডাক্তার ছিলেন তাঁর কাছে ছুটে যাই। একমুহূর্তও সময় নষ্ট না করে অক্সিজেন লেভেল চেক করে তিনি আমাকে Rapid Antigen Test করতে বলেন। ডাক্তারবাবুর কাছে যে আন্তরিকতা পেয়েছিলাম নার্স দিদিদের কাছে সেটা আশা করলেও পাইনি। যাইহোক রেপিড টেস্টে পজিটিভ এলে ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশন লিখে হোম আইশোলেশনের পরামর্শ দেন এবং শ্বাসকষ্টের জন্য সঙ্গে সঙ্গেই একটা ইনজেকশন দিতে বলেন। সমাজে একটা ধারণা আছে যে কোভিডের চিকিৎসা সম্পূৰ্ণ সরকারি খরচে হয়। কিন্তু না আমি বলতে চাই যে এই অতিমারীর সময়ে আমাদের যাদের নিজের চিকিৎসার খরচ বহন করার ক্ষমতা আছে তারা যেনো নিজেদের দায়ভার নিজেরাই বহন করি তাহলে এই বেঁচে যাওয়া ওষুধগুলো যাদের দরকার তারা পেয়ে যাবে। আমাকে ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন ওষুধ কিনতে পারবো কিনা। আমি হ্যাঁ বললে তিনি সেইমতো প্রেসক্রিপশন করেন। বাড়িতে আসার পর যেটা খুঁজে পাইনি; খোঁজাখুঁজি করে বুঝতে পারি বাবা ভয় পেয়ে সেটা হারিয়ে ফেলেছে। অবশ্য আমার কাছে ফটোকপি ছিলো তাই কোনো সমস্যা হয়নি। 

                     

সেদিন বিকেলে বাড়িতে আসার পর আপনজনেরা জানতে পারলে শুরু হয় শুভেচ্ছাবার্তার ঝড়! তখনই আমার সাহসের মাত্রাটা আরও বেড়ে যায়। মনে হয় এই লড়াই আমার একার নয়। যেমন মনে হয়েছিলো তেমনই গোটা ১২দিনের লড়াইয়ে আমার স্বজন এবং সুজনরা সাথে ছিলেন। যাঁদের কথা বিশেষভাবে না বললে নয় তাঁরা হলেন আমার শিক্ষাগুরুরা। বাবা-মায়ের পরে যাঁরা আমাকে নিয়ে খুব ভেবেছেন তাঁরা হলেন আমার স্কুল এবং আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপকরা; পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনযুদ্ধে কীভাবে জয়ী হতে হয়, তাঁদের থেকেই শেখা। ভৌগোলিক দূরত্বকে দূর করে কীভাবে পাশে থাকতে হয় — কোভিডকালে তাঁদের থেকে আমি শিখেছি। 

                   

আমি নিজের মতো করে ঘরে একা থাকতেই ভালোবাসি তাই প্রথমে ভেবেছিলাম সিনেমা দেখে, গল্পের বই পড়ে বা বন্ধুদের সাথে ফোনে আড্ডা দিয়ে এই কয়েকটা দিন কাটিয়ে দেবো। কিন্তু পরে 'আইশোলেশন' শব্দটাই হয়ে ওঠে ভীষণ যন্ত্রণার। মানসিক অবস্থা একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকে। আর যখন জানতে পারি সমাজের পাঁচজন লোক আমার বাড়ির লোক অর্থাৎ মা-বাবার সাথে পাঁচরকমের আচরণ করছে তখন নিজেকে কেমন যেনো অপরাধী মনে হয়। এমনকি আমার এক নিকটাত্মীয়কে আমার বাড়ির গেটে দুধ দিয়ে যাওয়ার অপরাধে গ্রামের অনেকের চোখরাঙানি সহ্য করতে হয়েছে। এখানে বলা প্রয়োজন যে আমার আইশোলেশন কক্ষ থেকে গেটের দূরত্ব ৭০-৮০ মিটার। আর এমন লোকেদের থেকে তাঁকে কথা শুনতে হয়েছে যাদের মাস্কে এলার্জি, পুলিশের ভয়ে থুতাস্ক পরে বাজারে যান, নিয়ম করে সকালে চা-কাকুর দোকানে আড্ডা দেন আর বিকেলে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে ডাক-ঢোল বাজিয়ে 'কলির জীব তড়াইতে আইলো রে নিতাই…' বলে কলিযুগের পাপ মোচন করেন! কেউ কেউ আবার পাড়াত্তো গদাধর বোস হয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং আমাকে হাজারটা পরামর্শ দিয়েছেন পুরোপুরি ফ্রীতে। আরেক ধরণের বন্ধু পেয়েছি যারা নিয়ম করে আমাকে কোভিডাক্রান্তদের মৃত্যুসংবাদ দিতো। আমি কাউকেই পাত্তা দেইনি। শুরু থেকে শেষ অবধি ডাক্তারের উপর পূর্ণ বিশ্বাস ছিলো। এই বিশ্বাস আর ভরসাই হয়তো আমাকে জিতিয়ে দিয়েছে !

                 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফোন করে আমার খবর নিতেন আর সেই ধন্বন্তরী ডাক্তার শান্তনু ধর তো আছেনই;  কোনো সমস্যা হলেই ফোন করতে বলেছেন। এই কথার সুযোগ নিয়ে তাঁকে ফোন করে জ্বালিয়েছি খুব। বলা বাহুল্য তিনিও যথেষ্ট প্রশ্রয় দিয়েছেন। যন্ত্রণা একটাই — 'আইশোলেশন!', প্রতিদিন ফোন করে বলতাম 'আমি সুস্থ কিন্তু এই বন্দীদশা ভালো লাগছে না'। কিছুটা বিরক্ত হলেও তিনি হাসিমুখে বলতেন এইতো আর কিছুদিন। Profession- কে যে কীভাবে Passion বানিয়ে নিতে হয় তাঁর ব্যবহারে এটা বুঝতে পারি। ১২ দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৫মে আবার টেস্ট করলে নেগেটিভ আসে। রিপোর্ট পেয়ে তাঁর কাছে গেলে তিনি খোশমেজাজে অনেক গল্প করেন। কোভিড ডিউটির অনেক অভিজ্ঞতা শুনান। একজন ডাক্তার যে সমাজের সাথে কতোটা গভীরভাবে জড়িত তাঁর সাথে আড্ডা দিয়ে সেটা বুঝতে পারি। এমন ঈশ্বরের দূতেরা থাকতে কোভিড নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে তাঁরাও আমাদের মতো মানুষ। তাই শরীরে কোভিডের কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই অন্তত সময়মতো হাসপাতালে গিয়ে তাঁদের সুযোগ দিতে হবে আমাদের সুস্থ করে তোলার। মনে সাহস নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শমতো খাওয়াদাওয়া করলে আর একটু আত্মসচেতন হয়ে শরীরের যত্ন নিলে খুব সহজেই কোভিডমুক্ত হওয়া যায়। আরেকটা ঘরোয়া টোটকা হলো কোভিডাক্রান্ত এবং তার পরিবারকে স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক কোকিলকন্ঠিদের সম্পূৰ্ণভাবে এড়িয়ে চলতে হবে। এই কয়েকটা কথা মাথায় রাখলেই 'কোভিড-১৯' কোনো ভয় নয়।